(গুরুর প্রথম দিকে আমরা যারা নাইভ লিখিয়ের দল ছিলাম তাদের বেশীরভাগ লেখার বিষয়ের আধার হত সোজাসাপটা স্মৃতিচারণা, ফিরে দেখা সময়। অবশ্য তার জন্যে সমালোচনাও ভালোই শুনতে হত, জ্ঞানী তাত্ত্বিক লোকেরা সময়ে সময়ে এই নিয়ে বেশ নাক টাক কুঁচকে থাকতেন, কিন্তু নবীন উৎসাহীদের দমানো যেত না। টইয়ের পাতা ভরে ভরে আমরা খেয়াল খুশীর আঁচড় কেটে যেতাম মনের আনন্দে। তারপরে সময়ের সাথে সাথে আস্তে আস্তে অভিজ্ঞ নামী লিখিয়েদের ভিড় বাড়তে থাকল, সেসব দেখে শুনে মরা মরা শুনতে শুনতে আমাদেরও রামোদয় হল, নিজের পুরনো লেখা পড়ে মনে হল, নাঃ সত্যিই বড় কাঁচা কাজ হয়ে গেছে, এভাবে পাতা না ভরলেই ভালো ছিল। এসব বাল্যখিল্য স্মৃতিচারণ তাই সরে গেল অন্যত্র, হয়ত কোনো বন্ধ খাতার পাতায়।
সে যাইহোক, চারিদিকে যা ভারী আবহাওয়া, তাই আজ সেই গুরুর পুরনো দিনে ফিরতে ইচ্ছে করছে। সেইসময়ের এদিক সেদিকের টুকরো টাকরা লেখা এক হয়ে থাক।)
**************************************************************
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছি তার সিলভার জুবিলিরও প্রায় এক দশক হতে চলল। কিন্ত মনের ভাবখানা এখনো, যেন এই তো সেদিনের কথা সব! শুধু আমার কেন,সবার হয়ত তাই মনে হয়, গল্পে আড্ডায় এভাবেই কথা বলে থাকি আমরা সবাই,যখন দেখা হয় বা যদি কখনো দেখা হয় ক্বচিৎ। জীবনে কিছু কিছু সময় থাকে যারা বয়ে যায় না, রয়ে যায়। সেসব কাল আমরা আমাদের মধ্যে ভরে নিয়ে চলি, তাদের ছায়ায় আমরা বড় হই, বুড়ো হই একসময়, অথচ তারা সজীব সবুজ, ডালপালা বিছিয়ে চলে। আরো অনেক মুহূর্ত যোগ হয়, গহন গহীন স্থিরকালে। তার ফুল আমাদের সুখস্মৃতি, গন্ধে ও রূপে আপ্লুত করে রাখে, ফলের নাম দিই অভিজ্ঞতা, কিছু আস্বাদ নিই উপলব্ধিতে, কিছু ফেলে দিই কামড়ে বা হাতে নিয়ে, ভুলে,বিস্বাদে।
তিরিশ চল্লিশ বছর দীর্ঘ সময়, সন তারিখে এবং ইতিহাসের নিরিখে। যখন হঠাত কোন দুপুরে একদা চেনা শহরের রাস্তায় একলা দাঁড়িয়ে, ঘুম ভাঙা মনে, “ইস কত বদলে গেছে জায়গাটা”, ভেবে উথালপাথাল হয় মন, তখন আস্তে আস্তে জেগে ওঠে সত্তা, এই তো হয়, এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল, কুড়ি কুড়ি কুড়ি বছরের পার!
ভালো লাগার সময়, শহর, লোকজন, সবেতে এখন রূপোলী ছোঁয়া, সময়ের পলি ছাপ। আমাদের বাস্তব টইটম্বুর দীঘি, কবে যেন শুকনো ডোবা, অর্ধেক তার মেঘের দেশের বাসিন্দা হয়েছিল, এখন সেসব গল্পকথায় বৃষ্টি হয়ে আসে, ঝরতে চায়। মাঝে মাঝেই ভাসায় সে আমায়, আমিও তাই দু এক আঁজলা ছড়িয়ে যাই এখান সেখান, যখন যেমন পারি।
বড়বেলার প্রথম ধাপে, অচেনা শহরের অলিগলি রাজপথ দিয়ে চলা কলেজের প্রথম দিন। দুরত্ব আর যানব্যবস্থা সড়গড় না হলে, বাসস্থান থেকে কলেজের দূরত্ব কম নয়, তায় আবার পথে দুবার বাস বদলানো। বাড়ির লোকে চিন্তায়। আমাদের বাড়িতে আবার যে কোনো বিষয় হোক, বাহানা জুটলেই হইহই করে মিটিং বসে যেত। তা আমার কলেজ যাওয়া নিয়েও বসে গেল। এত দূর, কেউ পৌঁছতে যাবে তাও সম্ভব নয়, সবারই কাজ আছে। শেষমেশ ঠিক হল ধাতস্থ হওয়া ইস্তক মামাবাড়ি থেকে কলেজ করব। কারণ সেখান থেকে টানা বাস, কলেজের দোরগোড়ায় না হলেও দু পা দূরে মোড়ের মাথায় নামিয়ে দেবে। তায় আবার মামাতো বোন একই বাসে তার স্কুলে যায়, খানিকটা পথ সঙ্গী হতে পারবে।
সেই কোন ছোটবেলা থেকে তেত্রিশ নম্বর কে আমরা আমাদের মামাবাড়ির বাসই মনে করতাম। চেতলা পার্কের সামনে বাসের স্ট্যান্ড। পার্কে খেলতে এসে ছোটরা দাঁড়িয়ে থাকা ফাঁকা বাসের দোতলায় উঠে হুরদুর দাপিয়ে নিতাম কিছুটা। দোতলা লাল বাস সবকালে সব বাচ্চাদেরই প্রিয়।
তা সেই শুভদিনে সকালে মামা নিজে এসে দুই বোনকে বাসে তুলে দিয়ে কন্ডাক্টরকে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে গেল, কলেজযাত্রীনিটিকে যেন ডেকেডুকে ঠিকঠাক নামিয়ে দেয়। বোন এগারো ক্লাসে এই স্কুলে নতুন গেলেও, ওর ক্লাস শুরু হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন হল, ও ততদিনে সব চিনেটিনে গেছে।
স্বভাবমত বাসের দোতলায় উঠতে গিয়ে মামার ধমক খাই। ভিড়ে দোতলা থেকে নামতে অসুবিধে হবে, একতলায় দরজার কাছে বসিয়ে দেয়। চেনা পাড়ার চেনা বাসে, অভিভাবকের তদারকিতে, কলেজ স্টুডেন্টের হনু ভাবটা এল না, একটু বেজার মেঘলা মুখেই দুর্গা দুর্গা করে যাত্রা শুরু হল। সে মেঘ আবশ্য অচিরেই কেটে দুজনের গল্পগাল এমন শুরু হল, যে ট্র্যাফিক ও অফিস টাইমের ভিড় গায়েও লাগল না।
সঙ্গিনী নেমে যাওয়ার পর থেকে শুরু অল্প উত্তেজনা, বারবার কন্ডাক্টরের দিকে তাকাচ্ছি, কান খাড়া করে তার স্টপেজের নামের চেঁচানি শুনছি, আশেপাশে আর মনোযোগ নেই তেমন। শেষমেশ কোন অঘটন ছাড়াই নির্ধারিত স্টপেজে নামা হল। ভিড় কমে গেছিল তখন, বাড়ি থেকে পইপই করে নামার আগে জুতো, ছাতা ব্যাগ সামলানোর নির্দেশ দেওয়া ছিল, তা সেসব নিয়ে ও নিজেকে আস্ত নিয়েই নামতে পেরেছিলাম সে যাত্রা। একেবারে কলেজের গেটে না হলেও, উল্টো দিকেই পাঁচিল দেখা যাচ্ছিল। সহজেই দিক চিনে রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাথ ধরে হেঁটে গেটে পৌঁছনো। সবুজ নিবিড় গাছপালা ঘেরা হলুদ সবুজ রঙের সারি ইমারত, সামনের রাস্তায় ভিড় কম, মাঝে মাঝে একটা দুটো বাস পেরিয়ে যাচ্ছে, ওপারে সেই বিখ্যাত পার্ক।
গেটের ভেতরে ঢুকে দেখি, বিল্ডিং গুলির মাঝে অনেকটা ফাঁকা জায়গা, সামনে ও পেছনে। একে তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে, আমাদের ডিপারটমেন্টের দিকে এগোই গুটি গুটি। জায়গাটা একটু নিরিবিলি, পেছনের দিকে। কলেজ কম্পাউন্ডের সামনের দিকের মত সাজানো বাগান নয়, অনাদরের বুনো গাছপালা আর ঝোপঝাড়ে তার পরিবেশকে এক অন্যরকম মনোরম করে তুলেছে।
তখনো আসলে আমার প্রিয় শহরের গন্ধ, সদ্য ফেলে আসা স্কুলের মায়া জড়িয়ে আছে আষ্টেপিষ্ঠে। সেই স্কুলের আশেপাশেও ছিল এমনি বুনো গন্ধ, ভরা সবুজের পশরা নিয়ে যেখানে বসত করত রূপকথারা। এ ইঁটকাঠের শহরকে ভালোবাসতে আমার সময় লাগবে। করিডর দিয়ে একা হাঁটতে হাঁটতে ফেলে আসা বন্ধুদের কথা ভেবে মন মেঘলা হয়। চারিদিকে ছোট ছোট জটলা, উচ্ছল ভিড়, কোথাও কোনো ভিড়ে নেই আমার চেনা কেউ।
এরকমই একটা জটলাকে অনুসরণ করে লম্বা টানা বারান্দার শেষে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাই। কীভাবে একটা ক্লাস রুমে জড়ো হয় এদিক ওদিক কজন। কেউ কেউ আমারি মত প্রবাসের, একা। কিছুজন আবার এখানেই পড়েছে এগারো বারো ক্লাসে, গল্প গলা তাদের বেশী শোনা যাচ্ছে। সেই দলে একজনকে দেখে আমি চিনতে পারি, ভর্তির পরীক্ষার দিন তার সাথে আলাপ হয়েছিল, পাশাপাশি বসেছিলাম, অনেকক্ষণ দুজনে গল্পও করেছিলাম পরীক্ষার পরে। খুশীতে এগিয়ে যাই, দলটার দিকে। নামটাও মনে আছে, ডাক দিই নাম ধরে। শহর আমার, সে চিনতেও পারে না।
খুব খুব খারাপ, অপ্রস্তুত লাগে। এই কলকাতার কথা আমি প্রবাসে অনেকের কাছে অনেক শুনেছি, পর কে এরা পরই করে রাখে, আপন করে না।
আমি দলছুট, কী করে থাকব এখানে?
দলের একজনের মনে হয় আমার মুখ দেখে কিছু মনে হল, তাই তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, “আরে, ও সারাদিনে এত লোকের সঙ্গে আলাপ করে যেচে আর এত কথা বলে, যে সব মনে রাখা ওর পক্ষে সম্ভব হয় না। তুমি কিছু মনে কোরো না, ও এরকমই।“
না, মনে তেমন করিনি, সেসব বয়সে মনে মেঘ ভেসে বেড়ায়, জমে থাকেনা। তার ওপর ছোট শহর থেকে এসেছি, চারিদিক নতুন লাগে, ভাবনায় ভরপুর মন, বেশীক্ষণ এক জিনিসে আটকে থাকেনা যে। খুঁটিয়ে কলকাতার মেয়েদের সাজপোশাক ফ্যাশন দেখতে থাকি, এবং দিল্লি দেখা অভ্যস্ত চোখ সব দেখেশুনে মোটামুটি আশ্বস্ত। যাইহোক,এই বাহানায় তবু একজন তো কথা বলল, আইসব্রেকার, বরফগলা আলাপ। নতুন জনের সহজ হাসিমুখ দেখে বেশ ভালো লাগে, টুকরো আলাপে এও জানা গেল তার নিত্য আসা যাওয়ার পথ আমার পথে অনেকটাই মেশে। ভবিষ্যতে আমরা চলার পথের সঙ্গী হলেও হতে পারি!
ক্লাস টাস হল না সেদিন। একটু টুকটাক কথা টথা আলাপচারিতা হয়ে, ডিসমিসড। এদিকে মনে না হলেও, বাইরে আকাশে জমিয়ে মেঘ জমেছে, হাওয়া বয় শন শন। পার্ক সার্কাসে এত গাছপালা চারিদিকে হওয়া সত্বেও, সারা এলাকা জুড়ে কেমন একটা বিজাতীয় গন্ধ পাওয়া যেত সারাক্ষণ। এখনো মনে করলে নাকে লাগে, একমাত্র যেদিন বৃষ্টির সাথে হাওয়া বইত, সেদিন গন্ধটা তেমন মালুম হত না!
গেট দিয়ে বেরিয়ে গুটি গুটি মোড়ের পানে হাঁটা দিই, সঙ্গী নেই কেউ। আফসোস, আফসোস, বাড়ি থেকে এলে ওই নতুন আলাপী মেয়েটি সঙ্গে থাকত, এমন বৃষ্টি বাদলার দিনে, অচেনা পথ ঘাট, অল্প চেনা শহর, সঙ্গী চায় মন!
বৃষ্টি নেমেছে, দাঁড়িয়ে আছি স্ট্যান্ডে শেডে, কোনোরকমে জলের ছাট এড়িয়ে। সবাই চলে যায়, সব গন্তব্যের বাস আসে, আমার তেত্রিশের আর দেখা নেই। আমি আর কিছু জানিনা, শুধু জানি তেত্রিশ ছাড়া সোজা বাস আর নেই এখান থেকে। আস্তে আস্তে বুকে জমাট বাঁধে অস্বস্তি, মনে হয় যেন অনন্তকাল ধরে আমি এই স্ট্যান্ডে তেত্রিশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। আরো মনে হয়, পৃথিবীর সব খারাপ লোকেরা সেইদিন সেই সময় পার্ক সারকাসের মোড়ে আমার আশেপাশে জমায়েত করছে। আমি তাই কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারিনা, তেত্রিশ যদি আদৌ না আসে আমি কী করব!
কিছু সময় এভাবে কেটে যাওয়ার পর একটি মেয়ে (বিশ্বাস হবেনা কিন্তু আমার এখনো তার মুখ মনে আছে, বেশ মোটাসোটা, শ্যামলা বরন, পরনে একটা কোরা মেরুন পাড়ের শাড়ি, বয়স আমারই কাছাকাছি, একটু বড় হবে) আমায় এসে জিজ্ঞেস করল, “তেত্রিশ চলছে না?”
“পথিক তুমি কী পথ হারাইয়াছ” ......... ক্লাস টেনেই আমি বঙ্কিম রচনাবলী গুলে খাইয়াছিলাম, নবকুমার কী পাইয়াছিল জানিনা, কিন্তু সেই সন্ধ্যে নামার খানিক আগে, বাদলা দিনে, আমি হাতে চাঁদ পেলাম।
প্রথমত আমার মত একই পথের যাত্রী, কোনো সন্দেহজনক চেহারার লোক নয় বরং আমারই মত কেউ। এতক্ষণ নানা আশংকা আর ভয়ের কল্পনায় এতই মগ্ন ছিলাম, খেয়াল করিনি যে এও অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে আছে, আমারই মত। জমাট ভাবটা কেটে গিয়ে, মাথা পরিস্কার হতে, জোড়া সাহসের দমে তখন জনে জনের কাছে গিয়ে জানতে চাই, তেত্রিশ চলছে কিনা। দেখা গেল আমরা শুধু দুজন না, আরো গুটি কয়েক আছে,একই পথের পথিক।
টানা দু ঘন্টা অপেক্ষার পর বাকীরা এই ওই বাসে চেপে এদিক সেদিক চলে গেল, ভেঙে ভেঙে যাবে বলে, আমরা তিনজন রয়ে গেলাম, যারা একান্তই নভিস, ঠিক কোথা দিয়ে কোথায় গেলে, কোন জায়গায় পৌঁছনো যায় এশহরে, সে সম্বন্ধে ঠিক নিঃসন্দেহ নই, তারা আর কী!
খুব সাহসে (আবার কী, ষোল সতেরোতে ওর নামই সাহস) শেষে ট্যাক্সি ধরা হল, তিনজনে, একটি ছেলে ও আমরা দুটি মেয়ে। সন্ধ্যের মুখে যখন চেতলা পার্কে ট্যাক্সি থেকে নামছি, মামা দাঁড়িয়ে বাসস্ট্যান্ডে, মুখে উৎকণ্ঠা। বাড়ি ফিরতে, মামী ও বোন এবং আশেপাশের জটলা দরজার মুখে, কলকাতা না চেনা মেয়ে বাড়ি ফেরেনি।
কী এক অ্যাকসিডেন্ট করায়, ভাংচুর ইত্যাদি হয়ে, তেত্রিশ দুপুর থেকে বন্ধ। বোন অন্য বাসে দুপুরে ফিরে, খবর দেওয়া ইস্তক সবাই ভাবনায় অস্থির।
সব শুনে সবাই খুব বাহ বাহ দিল, সাহস করে ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরেছে, প্রথম দিনেই, একে নিয়ে আর ভাবনা করতে হবেনা। সরাসরি বাস থাকাও যে খুব কাজের হয়না সব সময়, ইহা বুঝে মিটিং করে আবার বাড়ি ফেরাই সাব্যস্ত হল। আমি তখন জানি সাথী পেয়েছি, একসাথে যাতায়াত করার, চিন্তা নেই আর।
এরপরের তিন বছরের বাসযাত্রা তো পুরো ঐতিহাসিক, বেয়াল্লিশ আর বেয়াল্লিশের বির দিনগুলি, চিরকালীন বন্ধু হয়ে ওঠার দিন সেইসব, নানা টক মিষ্টি গল্পে মোড়া।
সেদিনের স্মৃতিতে আর উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু নেই। তবে খিদেয় পেট চুরচুর করেছিল আর ন্যাশনালের মোড়ের, রোলের দোকানের সুগন্ধ সম্ভবত সে খিদে আরো অসহনীয় করে তুলেছিল! কিন্তু সে অবস্থায় সে দিন একটা রোল কিনে খাবার কথাও মনে হয়নি (সেটাও তাহলে সাহসনামায় যেত গো)।
পরবর্তীতে এই রোলের দোকানে ছিল আমাদের নিত্য আনাগোনা। দেড় টাকায় একটা ভেজ রোলে আমার মতনের লাঞ্চ ডিনার হয়ে যেত!
এজাতীয় গল্পে সাধারণত যা হয়, নানা মানুষজনের নানা কথায় ভরে পাতা। এক্ষেত্রেও হয়ত এমনটা হবে। তবে এখানে মানুষের সাথে সাথে সেই সময় আর সেই শহর, এদের কথা বলতেই হয়, কিন্ত ইতিহাসের দায় দায়িত্বে নয়, নিজের অনুভবের খামখেয়ালে।
শিরার মত অলিগলিতে, শোণিতের মত মানুষ বয়ে যেত, এমন জীবন্ত ছিল আমাদের সেই শহর।
কলেজ শুরু হল, তার সাথে হল আমার প্রতিদিনের দীর্ঘ বাসযাত্রার সূচনা, পরবর্তী তিন বছরের মেয়াদী। ট্রাম ধরে তারাতলায় এসে বাস ধরা। দুটি বাস, টালিগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে দুটি দুই রাস্তা ধরত, একটি হাজরা হয়ে, অন্যটি গড়িয়াহাট হয়ে। প্রথমটিতে কম দুরত্ব, বেশী ট্র্যাফিক, দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে পুরো উলটো। এবার অফিস টাইমে বেশীরভাগ দু নম্বরটিই আগে পৌঁছত গন্তব্যে, তবে সংখ্যায় কম ছিল, সকালে যাওয়ার সময় তাই অত বাছাবাছির অবকাশ থাকতনা। যা আগে পাই তাতেই চড়ে বসি।
ফেরার বিকেলে আমরা দেখেশুনে, অনেক বাস ছেড়ে দ্বিতীয়টি ধরতাম। দুটি বাসেরই এক টার্মিনাস, মোড়ের মাথায়, ট্রামডিপোর উল্টোদিকে, পার্কের গা ঘেঁসে। যাতায়াতের পথে কিছুদিনের মধ্যেই কন্ডাক্টর, ড্রাইভার, হেল্পার রা অনেকেই মুখ চেনা হয়ে গেলে, অনেক সময় এক নম্বর বাসের লোকেরা ডাকাডাকি করত। বা কলেজ থেকে বেরিয়ে টার্মিনাসের দিকে হাঁটার পথে কখনো ঘ্যাঁচ করে ড্রাইভার দাদা গাড়ী থামিয়ে দিল, চেনাযাত্রী তুলে নিতে...... তখন তাদের উপকারী ভাবনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কিঞ্চিৎ মিথ্যাচারণ করে থাকতাম, “দাদা, আজ একটু না গড়িয়াহাট যেতে হবে”।
পরে জানাচেনা বাড়লে সবাই আমাদের এই পছন্দের ব্যাপারটা টের পেয়ে যায় এবং সাধ্যমত নিজেরা এই ছেলেমানুষীতে প্রশ্রয় দিয়ে থাকত। আমরা হয়ত কলেজের সামনে থেকে এক নম্বরে উঠে পড়ছি বেখেয়ালে অন্য দিকের যাত্রী বন্ধুদের সংগে গল্প করতে করতে, কন্ডাক্টর পাদানীতে দাঁড়িয়ে মনে করিয়ে দেয়, “দিদি, পেছনে বি আসছে”। ফেরার পথে বি বাসে ফেরা আমাদের একটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছিল, না পেলে মনে হত, বিকেলটাই মাটি! এবার এর একটা যুক্তি আমরা দুজন নিজেদের মত করে গড়ে নিয়েছিলাম। তা হল, সারা বিকেলটা যেহেতু আমাদের বাসে কাটে, সেহেতু গড়িয়াহাট ঢাকুরিয়া এইসব এলাকার দোকানপাট, সুসজ্জিত মার্কেটের মধ্যে দিয়ে গেলে বেশ একটা নিজেরাই বেড়াচ্ছি এমন ভাব আসে, ভালো লাগে, তাই এ রুটে ফেরা!
এর সাথে উপরি পাওনা ছিল খালি বাস। অপেক্ষাকৃত লম্বা ও ঘোরা পথ বলে কিনা কে জানে, গড়িয়াহাটের পর থেকে বি বাসে ভিড় কম হত। গড়িয়াহাটের মোড়ে জ্যাম হলে আমরা মহা আনন্দে ফুটপাথের ওপর নানা সম্ভার বিশেষ করে ঝুটো গয়না চটি ইত্যাদি নতুন কী এল ভালো করে দেখে রাখতাম। তবে আমাদের তো শুধু চোখের দেখা, মহাবীরতলার নিত্য জ্যামে কিছু অফিসযাত্রী মুখচেনা কাকীমা বৌদিরা ব্রিজের ওপরে নেমে দিব্যি সবজি বাজার সেরে নিত। এই মহাবীরতলার জ্যামের জন্যই আমাদের বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে পেরিয়ে যেত আর এখানে এসে দুটি বাসেরই পথ যে এক হয়ে যেত, সে তো আগেই বলেছি। আমরা দুজন বাসে পিছনের গেটের লম্বা টানা লেডিজ সিটের একদিকে বসতাম। পুরো যাত্রাপথ জুড়ে দুজনের কলেজের বন্ধু, গল্পের বই ও টিভির অনুষ্ঠান ইত্যাদি নিয়ে যাবতীয় গালগল্প বাসেই সারা হত। বিকেলের আড্ডাটা মোটকথা আমরা বাসেই জমাতাম।
গল্পের সময় আমাদের প্রায় বিশ্ব সংসার ভুলে যাওয়ার মত অবস্থা হত, আর আশেপাশের নিত্যযাত্রীরা কেউ কেউ বেশ মিটিমিটি হেসে প্রশ্রয় সুলভ মনোযোগে দুই শালিখের কিচিরমিচির শুনত! কোনোদিন জোড়ার একজনকে না দেখলে প্রশ্ন ভাসত, “ কী আজ বন্ধু নেই, তাই চুপচাপ?”। তিন বছরে এদের কারুর কারুর সাথে ভালো গল্পের আলাপ হয়ে গিয়েছিল। মানে রাস্তায় বাজারে দোকানে চোখাচোখি হলে একগাল হেসে চেনা দেওয়ার মত চেনা!
যাওয়ার পথে স্টপেজে স্টপেজে আমাদের কলেজের বিভিন্ন ক্লাস ও নানা বিভাগের মেয়েরা বাসে উঠত, আমরা যারা দুর থেকে বসে আসতাম, তারা বাকিদের ব্যাগ ধরতাম, কেউ নিজেই এগিয়ে দিত, কারুর আমরাই চেয়ে নিতাম.....মাঝে মাঝে কোলে এমন ব্যাগের পাহাড় জমত যে প্রায় “মুখ ঢেকে যায় ব্যাগে” অবস্থা!
এছাড়া আমার স্টপ থেকে আমরা প্রায় বারোজন বাস ধরতাম,অন্তত প্রথম বছরে। তবে অনেক সময় বিশেষ করে পরের বছরগুলিতে ক্লাসের সময়ের হেরফেরে একসাথে এক জায়গার সংখ্যাটা কমে এলেও আমাদের মত কিছু বিজ্ঞান বিভাগ গুলোর মেয়েরা নিয়মিত একই সময়ে বাস ধরতাম। একবার আটজন জড় হয়েছি,সকালে আগে পিছে করে, কীসব গণ্ডগোলে দুটি বাসই বন্ধ। অফিস টাইমে ব্রেক জার্নি করে সময়ে ক্লাস ধরা সেসময় এ শহরে দুঃসাধ্য ছিল বললেও কম বলা হয়। বিপদে পড়লে সাহসের পারা নাকি আপনিই চড়ে যায়,আমাদেরও তাই হল। ঠিক হল ট্যাক্সি করে যাওয়া হবে। কিন্তু আটজন মেয়ে “একা” কেমন করে ট্যাক্সিতে যাবে?
অতএব স্টপেজের গাছতলায় অপেক্ষারত একটি পেন্সিলসদৃশ চেহারার মুখচোরা প্রথমবর্ষীয় ন্যাশনাল মেডিক্যালের ছাত্রকে ধরা হল,আটজন তরুণী, গড়পড়তা ওজন যাদের মোটামুটি পাহারাদারের থেকে খানিকটাই বেশী, তাদের পাহারা দিয়ে, দরকার হলে বদমাশ ট্যাক্সিওয়ালার থেকে বাঁচিয়ে অক্ষত অবস্থায় গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার, যার পাঁচিলের ওপারে তার নিজের গন্তব্য।
ছেলেটির সম্মতি, হ্যাঁ বা না যাইহোক, তা ভালো করে শোনার আগেই একধারে দাঁড়ানো একটি হলুদ কালো ট্যাক্সির সামনের সীটে তাকে হই হই করে তুলে দেওয়া হল। ট্যাক্সিওয়ালার আপত্তিও ওই এক শোরগোলেই চাপা পড়ে গেল। সামনে ট্যাক্সিওয়ালাকে ও আমাদের রক্ষককে নিয়ে চারজন, পেছনে আমরা বাকী ছ জন, ট্র্যাফিক রুলের ফুল এইসি কী ত্যায়সি করে, যাত্রা শুরু হল। আজকের যুগ হলে এমন দৃশ্য ভিডিও উঠে ইন্সটা রিলে মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যেত। ট্যাক্সির দরজা বন্ধ হচ্ছিল না ভালো করে, ট্যাক্সিওয়ালা ভয়ে স্টিয়ারিং ধরে জবুথবু,এই পুলিশ ধরল বুঝি। তার তখন আগে রাম, পেছনে রাবণ দশা, সিগন্যাল এলে লুকিয়ে চুরিয়ে একপাশে দাঁড়াচ্ছিল। গোপালনগরের মোড়ে,এক পুলিশ এগিয়ে এসে, প্রায় ডজনখানেক সীটজুড়ে কোলেকাঁখে বসা আনকোরা কলেজগন্ধীদের দেখে, হা হা করে হেসে,ভালো করে চেপে দরজাদুটো বন্ধ করে দিতে, তবে ড্রাইভার দাদা হাঁফ ছেড়ে বসে।
আর সত্যি বলছি,একেবারে সব ধরণের উপরওয়ালার দিব্যি, রাখী ও ভাইফোঁটা না নিয়েও, তার মান রাখা সেদিনের সেই বীরপুরুষটিকে এরপর তিন বছরে আর কোনোদিন ওই বাসস্টপে দেখা যায়নি। সেই মাসুম প্রাণ সেদিনের ট্যাক্সিযাত্রা ও তদজনিত গুরুদায়িত্বের ভারে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে কলেজ ছেড়ে দিয়েছিল,না পাকাপাকি হস্টেলে চলে গিয়েছিল, ও পথে আর যাবে না বলে, মানে ঠিক কী হয়েছিল তা আমাদের কাছে এক রহস্যই রয়ে গেল চিরকাল!
প্রায়শই যাত্রাপথে এক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের মেয়ে একটি নির্দিষ্ট স্টপ থেকে উঠে, বাসের রড ধরে ঝুলত, এমনকি খালি বাস হলেও। কন্ডাক্টররা এ নিয়ে গজগজ করত, কিন্ত মেয়েটীকে হাজার বললেও সে বাসের ভেতরে ঢুকত না। বাসের রড ধরে ঝুলে ঠিক কী ধরণের মেসেজ দেওয়া হত, অনেক ভেবেও আমাদের শালিখ মগজে তা ঢুকত না।
বাসে নিত্য যাতায়াতে বাজে লোক আর পকেটমারের দল, এসব মোটামুটি কিভাবে যেন জানা হয়ে যেত। কন্ডাক্টর যাদের খুব কড়া ভাবে সরে যেতে বলত বা নেমে যেতে বলত, তারা সন্দেহজনক, অবশ্যই পকেটমার। মেয়েদের সংগে অসভ্যতা করা লোকেরা অনেক ক্ষেত্রেই ভদ্রবেশী, তাদের সংগে বাস কর্মচারীদের কোনো বিরোধ ছিলনা। তারা নিজেরাও কেউ কেউ যে ও রোগের রোগী ছিলনা তেমন নয়। পয়সা ও টিকিট দেওয়া নেওয়ার ছুতোয়, হাত ছুঁয়ে দেওয়া, কলেজের স্টপেজে, মেয়েদের নামার সময় দরজায় সেঁটে টিকিট দেখার অছিলায় গায়ে পড়া......তাই এই ব্যপারে মেয়েরা নিজেরাই সচেতন থাকত, তেমন লোক দেখলে, চোখের ইশারায় অন্যদের সাবধান করে ভিড়ে যতটা বাঁচানো যায়!
এরকমই একবার আমরা সবাই এক দল উঠেছি কলেজ থেকে। আমাদের দুরের যাত্রীদের বসতে দিয়ে যারা কাছে হাজরা ল্যান্সডাউন যাবে তারা লম্বা সীটের সামনে দাঁড়িয়ে। হই হই গল্প গাল চলছে, যাত্রী ভরে বাস কখন চলতে শুরু করেছে, কারুর সেদিকে হুঁশ নেই। তার মধ্যে আমার পাশে বসা জনের খেয়াল হল যে সামনে দাঁড়ানো বন্ধুর পেছনে এক মক্কেল অসভ্যতা করার চেষ্টায় রত। মুহূর্তে চোখে চোখে সবাই অপরাধীকে শনাক্ত করে ফেলে, প্রথমে নানাভাবে আমরা মেয়েটিকে ইশারা করি ওই জায়গা থেকে সরে আসতে। ইনি সেই প্রথম দিন আমাকে চিনতে না পারা গপ্পুনি, তার স্বভাবসিদ্ধ ভূমিকায় সে তখন হাত মুখ নেড়ে বকেই চলেছে, আমাদের চোখের ইশারা বোঝার মত মনোযোগ তার নেই। ততক্ষণে আরো মেয়েরা এবং আশেপাশের কিছু লোকও ব্যাপারটা অনুধাবন করে, একটা চাপা শোরগোল উঠছে। এবার আমরা আর থাকতে না পেরে ইশারা ছেড়ে চাপা স্বরে বন্ধুটিকে ব্যাপারটা বলতে চেষ্টা করি, একটু ধমকানির গলায়। এতক্ষণে তার খেয়াল হলে সে একটুও না ঘাবড়ে খুব ধীরেসুস্থে পেছনে ঘুরে লোকটির মুখোমুখি হল। লোকটির দৃষ্টি তখন অন্যদিকে, ভাবটা যেন কিছুই হয়নি, কিছু বুঝতে পারছেনা,উদাস যোগী।
আমাদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা,কী হয় কী হয় ভাব,তাকিয়ে আছি ক্লাইম্যাক্সের দিকে,শ্বাসরুদ্ধ সবার। মেয়েটি লোকটিকে একবার আপাদমস্তক দেখে,আর তারপর ঘুরে আমাদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
” ওমা, দ্যাখ, এটা একটা লোক। আর আমি কখন থেকে ভাবছি কোনো মাসিমা দাঁড়িয়ে আছে আমার পেছনে এমনি করে চেপে”। পুরো চ্যাঙরামো কেস, কিন্ত কাজ হয় মন্ত্রের মত, আমরা মহিলা পল্টনরা হ্যা হ্যা করে উঠলাম, সাথে অন্য মহিলা যাত্রীরাও কেউ কেউ যোগ দিল, এবং উক্ত জিনিসটি পুরো ভোজবাজির মত সেখান থেকে গায়েব, আর তাকে বাসে দেখা গেল না!
বাসভাড়া ছিল পঞ্চান্ন পয়সা, পরে বেড়ে পঁচাত্তর। ছোটবেলায় মনে আছে বড়রা তাদের পুরনো দিনের কথা বলতে গিয়ে যখন টাকায় এক মণ চালের গল্প করে হাহুতাশ করত, আমরা হাসতাম, মজা করে ভাবতাম, এই শুরু হল। এখন আমাদের সেই বেলা চলছে, তবে অন্যান্য কারণের সংগে ওই টাকায় মণের গল্পটা টা মনে আছে বলেই বোধহয়, হাহুতাশ আর করে উঠতে পারিনা!
কলেজ শুরু হয়ে গেল পুরো দমে। ওই একা যাতায়াত টুকু ছাড়া আর সব দিক দিয়ে আমরা স্কুল শেষ করেছি, কলেজে এসেছি, মালুমই হতনা। হোমওয়ার্কও করছি, সকাল সোয়া নটা থেকে শুরু করে বিকেল অবধি ক্লাস, চারিদিকে টিচারদের কড়া নজর, এমনকি পাসের ক্লাসও কখনো সখনো কাটব ভাবলে কিভাবে যেন দিদিরা টের পেয়ে বেছে বেছে আমাদের সামনেই হাজির হয়ে “চল চল” করে ধরে নিয়ে যেতেন। বিশেষ করে অংকের ক্লাসে!
প্রথম kaleidoscope অর্থাৎ কলেজ ফেস্টে মনে আছে আমাদের মেয়েরা বিশেষ করে হস্টেলের সবাই বেশ শাড়ি পরে সেজে হাজির, ক্লাস ট্লাস হবে না, বাইরের কলেজের প্রতিযোগীরা সব আসবে, ঠাসা প্রোগ্রাম দিনভর। সকালে সবাই বিশাল অডিটোরিয়মে গিয়ে আগেভাগে চেয়ার দখল করে বসে আছি। হেনকালে ভগ্নদূত আমাদেরই কেউ, সবাইকে ডেকে ছাগল তাড়িয়ে নিয়ে যায়। খালি ক্লাস দেখে দিদি নাকি মহা চটে গিয়ে একাকার!
তখন শাড়ি পরিহিতারা ছুটতে ছুটতে কাঁদো কাঁদো হয়ে কোনোরকমে ঘসে লিপস্টিক তুলছে, সাজ দেখলেই ইজি নির্ঘাত পড়া ধরবে, এদিকে ফেস্ট বলে কেউ বই খোলেনি আগের দিন।
আমি বা আমরা যারা শাড়ি বা সাজে ছিলাম না, কিছু আগে অবধি অন্যদের কাছে সেই কারণে বকুনি ও হ্যাটা খাচ্ছিলাম, তাদের তখন মহাফুর্তি....পড়া বলার খাঁড়া আজ সাজনেওয়ালীদের ওপর দিয়েই যাবে সম্ভবত!
মুখ চুন করে ক্লাসে ঢোকার পর দিদির প্রশ্নের উত্তরে কোনো এক সাহসিনী ফেস্ট ইত্যাদি মিনমিন করতে, দিদির চোখ কপালে, “ফেস্ট, ওখানে তোমরা কী করছিলে? ফেস্ট করতে হলে ফিজিক্স পড়তে এসেছ কেন, .....পড় গিয়ে।” পরবর্তী সময়ে এই বাক্যটি আমরা দিনে দশ বার পান থেকে চুন খসার প্রতি অবসরে শুনে শুনে, তিন বছরে প্রায় হাজার কয়েক বার মরমে .....না মরে থাকব না, তবে বেজার হব, হতেই থাকব!
মাত্র তিন বছর, কিন্ত জীবনের অর্ধেক কাহিনি বোধকরি ওই সময়েই লেখা হয়ে গিয়েছে। তারপরে তো শুধু ফিরে দেখা, স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ঝাড়ামোছা, নতুন গল্প আর তেমন করে কবে কোথায় তৈরি হয়েছে!
আপাতত অফুরান মজার রসদ, বাসের সেই নানা রঙের দিনগুলোর গল্প শেষ করব ফাল্গুনীকে দিয়ে। ফাল্গুনী একদিন কলেজে ঢুকেই রুমালটাকে স্বভাবসিদ্ধ মুখে গুঁজে, মুখটাকে হাসি হাসি করতে গিয়েও হাল্কা গম্ভীর হয়ে বলল,
“আজ না বাসে একজন মহিলা আমার গায়ে পানের পিক ফেলেছে। “
ফাল্গুনীর ভাগের অনুপস্থিত ক্রোধ ও বিরক্তি আমরা চারিয়ে নিয়ে সেই অজানা মহিলাকে কল্পনা করে, এবং তাকে সামনে না পেয়ে, ওকেই ঝাঁঝিয়ে উঠি, “সেকী, তুই কিছু বললি না। এমনি এমনি চলে এলি?”
ভাবটা এমন যেন পারলে ওকে আবার ফেরত পাঠাই ঠেলে ঠুলে, সেই বাস ও মহিলাকে খুঁজে কথা শুনিয়ে আসতে। আমাদের অবস্থা দেখে, ও গলাটা একটু খাদে নামিয়ে ষড়যন্ত্রকারীর মত বলে,
“খুব ঝগড়া করে এসেছি”।
আমরা যারপরনাই কনফিউজড, এবং এমন বিপ্লবী ঘোষণা শুনেও ঘোর সন্দেহে তাকিয়ে থাকি। অচেনা বাসের মহিলা, পানের পিকে চান করিয়ে দিলেও ফাল্গুনী তার সঙ্গে ঝগড়া করে আসবে, এ ভরসা আর আশা, কোনটাই আমাদের নেই।
“হ্যাঁরে সিরিয়াসলি, খুব শুনিয়েছি। “
আর পারা গেলনা। আমাদের রীতিমত জেরা শুরু।
“কী বলে ঝগড়া করলি?” আমরা নাছোড়বান্দা, অবিশ্বাসীর দল।
“কেন? বললাম, কাকীমা, আপনি এটা কী করলেন?”
ব্যস, সন্দেহের নিরসন হয়ে, সবাই শান্তিতে ক্লাসের দিকে এগোই। চাঁদ সুজ্যি এখনো আকাশে উঠছে তো, নাকি, ফাল্গুনী করবে ঝগড়া! বিতস্তা ফ্যাচ ফ্যাচ করে হেসে বলে, দেখেছিস, আদর করে কাকীমা বলে ডেকে এসে আবার আমাদের বলে কিনা, খুব ঝগড়া করে এসেছি!
পার্ক সার্কাসের আশপাশ সেইসব দিনে বেশ শান্ত ছিল অনেকটাই, ভিড় গাড়ির সার বুকে নিয়ে, এবং সবুজ, বিজাতীয় চামড়ার গন্ধ ভরা, তবু উদাস হাওয়ার বেহিসেবী যাওয়া আসা পিচগলা সেইসব দুপুর ছিল বড় আপন, মনকাড়া। ট্রাম ডিপোর ওখানটা কী নোংরা ছিল, আশেপাশে যাওয়া যেত না, তবু আজ যখন দেখি সেই পরিচিত নোংরা ডিপো উধাও হয়ে সুদৃশ্য দোকানের সুসজ্জিত ম্যল, তখন বুকের কোথায় যেন একটা চিনচিন ব্যথা লাগে! রাজপ্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে, নদীর ধারের কুঁড়েঘরের জন্যে মন খারাপ হওয়া, হয়ত এমনটাই হয়!
ডিপোর উল্টো দিকে, রাস্তা পেরিয়ে আমরা যেতাম আলমদার দর্জির দোকানে। ফুটপাথের গা ঘেঁসে এক চিলতে ছোট দোকান, রাস্তা থেকে একটু নীচুতে তার মেঝে। অন্দরমহলের সঙ্গে বাহির দোকানের সংযোগস্থলে এক ছিটের কাপড় দিয়ে পরদা ঝোলানো। দুপুরে লাঞ্চের সময় যেতাম, তাই অনেকসময় আলমদা বা তার ভাই হয়ত ভেতরে খাচ্ছে, হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে মাপ নিল। রসুনের গন্ধ পেতাম আর কেন যেন মনে হত আলমদা নির্ঘাত বেশ গরগরে গরুর ঝোল দিয়ে ভাত খাচ্ছিল! পরে মনে পড়লে খুব মন খারাপ হত, হয়ত রোজ মাছের ঝোলও পেত না ওরা!
আলমদা আমাদের পোশাক বানাতো। আসলে কাপড় কেটে, পুরনো মেশিন চালিয়ে ওই এক চিলতে ছিটকাপড় ভরা ঘরে, কয়েকজন সদ্য ডানা মেলতে শেখা চোখের জন্যে স্বপ্ন বুনত। আমরা অদ্ভুত সব আবদার নিয়ে যেতাম, আর আলমদা ধৈর্য ধরে সেসব শুনত, রায় দিত, তারপরে যা দাঁড়াত তা সবসময় আমাদের চাহিদার বেশী। কচিকাঁচা সবুজ মনের কল্পনারা আলমদার মুন্সিয়ানা আর হাতের কেরামতিতে, রঙে রূপে অপরূপ সব সৃষ্টির আকার নিত। রোজকার ছকে ও কঠিন নিয়মানুবর্তিতায় বাঁধা কলেজের দিনগুলোতে, আলমদার দোকান তাই আমাদের খোলা হাওয়ার শীতল ছোঁয়া এনে দিত। টিফিনের ওই ফাঁকটুকুতে, দৌড়ে যেতাম, রোদে গরমে ঘেমে নেয়ে, তাড়াহুড়ো করে।
সাজসজ্জা আর কিছু তেমন ছিলনা, কলেজে শখ বলতে ছিট কিনে আলমদার কাছে জামা বানানো। যতদিন শহর থেকেছে আমার সঙ্গে, ততদিন পার্ক সার্কাসের গলিতে ফুটপাথ চত্বরের এক দোকান ও দোকানের মালিক যাকে অন্যরা আলমদা বলে ডাকত আর আমি ডাকতাম ভাইয়া, থেকেছি তাদের সঙ্গে। ভাইয়ার দোকানের সামনের সরু রাস্তায় অনেক বড় গাড়ি এসে দাঁড়াত মাঝে মাঝেই, এমন তার হাতযশ ছিল, কিন্তু তাতে তার দোকানের চেহারার কোন বিশেষ রকমফের হয়নি, প্রায় একইরকম রয়ে গেছে, সব কিছু।
মাঝে মাঝেই ওই দিকে গেলে, ট্যাক্সিকে বলতাম ভেতরের সরু রাস্তা দিয়ে বেকবাগানের দিকে যেতে। শেষ দেখেছি দোকানের মাথার নিওন সাইন, ও ভাইয়ার কোঁকড়ানো চুলের সাদা হওয়া ছাড়া আর সব অপরিবর্তিত। বন্ধু অবশ্য শহরে ফিরেছে অনেকদিন, আলমদার দোকানেও, এবং যবে থেকে শুনেছি এখনো আলমদা এই দিদির কথা জিগ্যেস করে প্রায়ই, তবে থেকে জানি, আমার ফেরাও শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল!
বেকবাগানের কথায় মনে পড়ল, কাকুর অর্ডার করা রবীন্দ্র রচনাবলীর সেট, একটা করে বই আসত, বিশ্বভারতীর আধো অন্ধকার অফিসে। খবর এলে আমরা দুই বন্ধু কলেজ শেষে রোজের রাস্তা না ধরে, বেকবাগানের বাস ধরতাম। ছিল মিঠাইয়ের দোকান আর কিছুটা আগে জিমিস কিচেন। সেই আমলে আঠেরো বছুরেরা জিমিস কিচেনের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়েই বড় হয়ে যেত এক চুল, ভেতরে ঢোকারও দরকার হতনা!
স্কুল থেকে কলেজে উঠে বদলটা কী হাতি ঘোড়া হল ভেবে ভেবে আমি অস্থির হলেও, বাড়ির লোকে আস্তে আস্তে ঠেলেঠুলে প্রমোশন দিয়ে দেয় প্রায়। প্রথম বছর পুজোয় দিদি এসে কলেজের গেটে দাঁড়াল, আর আমি বেরোলে সঙ্গে করে নিয়ে সোজা গড়িয়াহাট, ও দক্ষিণাপন। রোজ কলেজ পরে যেতে হলে অনেক জামা লাগবেনা? ঘুরে ঘুরে জামা কাপড় এবং মনের খুশীতে বাসের জানালা দিয়ে দেখা গয়নাগাঁটি কেনা এবং কেনা শেষে সিঁড়ি ভেঙে উঠে ফিশফ্রাই বা কবিরাজী খাওয়া, তখনো আমি বেদুইনের রোলের সমঝদার হয়ে উঠিনি। আবার ওই সিঁড়ির তলায় ফুটপাথে পানের দোকান পেরিয়ে, ঝুটো গয়নার পসরা নিয়ে যারা বসত, সেখানেও আমি ছিলাম বাঁধা খদ্দের। আসলে রঙ্গিন চুড়ি পরার শখ ছিল ষোলআনা, কিন্তু এমন লিকলিকে হাত যে সবচেয়ে ছোট সাইজের কাঁচের চুড়িও হাতে ঢলঢল করত, অতঃপর উপায় কাঁচের মত দেখতে মেটালের চুড়ি। গড়িয়াহাটে তখন শুধু ওই এক জায়গাতেই মেটালের চুড়ি পাওয়া যেত!
কলেজে উঠে প্রথম পুজো, সে কলেজ যতই আমাদের বড় না ভাবুক, দিদিরা যতই পড়া না পারলে চোখ পাকিয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া করে দিক, বাইরের দুনিয়া বিশেষ করে আত্মীয়স্বজন যে যেখানে আছে, পুজোবাড়ির দেখাসাক্ষাতে, তাদের কাছে নিজের বড় হওয়াটা জাহির করতে হবে তো বটেই। এছাড়া কচিকাঁচাদের ভিড়ে নতুন ফ্যাশন দেখিয়ে কলেজের মুখটা তো রাখতে হবে!
তাই এরপরে কিছুদিন সুযোগ পেলেই এটা বদলাতে, ওটা কিনতে গড়িয়াহাটে ঢুঁ দেওয়া হতেই থাকল। সপ্তাহের টেস্ট ও পড়াটরার মত বেরসিক জীবনে, বৈচিত্র আনতে, পুজো বাজারের বিচিত্র সম্ভারের মত আশ্চর্য মলম আরা দুটি হয়না!
তখনো সকালে উঠে সোনারোদের দিকে তাকিয়ে, আমরা কড় গুনতাম মহালয়া কবে বলে, তখনো কোন দিন কোনটা পরব তার নিত্য পরিকল্পনা সকালে শুরু হয়ে রাতে শুতে যাবার সময় শেষ হয়ে শুরু হত। নীল আকাশ দেখলেই সাদা মেঘ খুঁজত দৃষ্টি আর বাসে পাশে বসা অচেনা সমবয়সীকে হাসিমুখে চেনা প্রশ্ন, “এবার পুজোয় কলকাতায় থাকবে”?
রোজ আমরা সকাল থেকে বিকেল অবধি প্রায় বিরতিরহিত ক্লাস করে যেতাম, এবং কলেজে উঠে দারুন লায়েক হয়ে যাওয়ার যেসব গল্পকথা, বইয়ের পাতায়, সিনেমার পর্দায় তদ্দিন অবধি দেখেশুনে এসেছি, সেসবের অসারতাকে মনে করে উদাস হতাম। কেউ ভাবতে পারে, কলেজের ক্লাসে আগেরদিনের পড়া ধরা হয়! এর চেয়ে সারাজীবন স্কুলে পড়লেই পারতাম। প্রায় কিছুই না পাওয়া যাওয়া ক্যান্টিনের আধোঅন্ধকার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে টিফিন বক্স খুলে তাড়াহুড়োয় খাবার গিলতে গিলতে এরকমই সব আজেবাজে ভাবনা ভিড় করত।
তবু কলেজের এই সামনের দিকটা অনেক হইচইয়ে ভরা, সরগরম ছিল। কিন্ত সেখানে বেশীক্ষণ কাটাবার জো ছিল না আমাদের। লম্বা করিডর পেরিয়ে যখন পিছনের দিকে যেতাম, সামনের রঙ বেরঙ উষ্ণতাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে আসত যেন। ঝোপঝাড় মায়াবী সবুজের জমিনের বুনো গন্ধ বুকে নিয়ে, গ্রাম্যতা মেখে, কিছু অকৃত্রিম মানুষের কড়া তত্বাবধানে, আমরা তখন ভবিষ্যতের জীবনযুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। সেই সময়, সেই শহর, তবু থাকে অপেক্ষায়, খেলার মাঠের প্রিয় সাথীর মত, কখন আমরা পড়ার ফাঁকে গোল্লাছুট বা বউ বসন্তে দান দিয়ে যাই!
তবে এ শুধু বছর দুয়েকের গল্প, তারপরে আমরা সিনেমা গল্পের মত না হলেও কিছুটা লায়েক হয়ে উঠলাম বইকি!
পার্ট ওয়ানের পর থেকে একটু হলেও ব্যবস্থার কড়াকড়ি শিথিল হয়েছিল, হয়ত আর বেশীদিন মেয়াদ নেই বলে দিদিরা তেমন তেমন জায়গায় হাল্কা প্রশ্রয়, একটু ছুট, দিতে শুরু করেছিল। পাস ক্লাস না থাকায়, চাপ যেন কিছুটা কম হয়েছিল, যদিও দায়িত্ব অনেকটাই বেড়ে গেসল পার্ট ওয়ানের সেই বিখ্যাত ডিজাস্টারের পর। তবু ক্লাসে ফাঁকফোকর বেরোলো এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সাহসের বেড়াল ঝুলি থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক পা বাড়াতে শুরু করল। সবচেয়ে ঐতিহাসিক সাহসিক কাজ আমরা ভীতুর দলের অগ্রণী যারা করতে পেরেছিলাম তা হল সিনেমা দেখতে যাওয়া, অবশ্য ক্লাস কেটে নয়, ওই কোনো কারণে পরীক্ষার আগে ক্লাস কম থাকলে বা একেবারেই না থাকলে,লাইব্রেরীর বা গ্রুপ স্টাডির নামে বাড়ি থেকে কলেজে এলে।
তেমনি একবার আমরা সবাই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে একটি সিনেমা হলে পুরনো দিনের ( মানে আমাদের তখনের হিসেবে পুরনো দিন, এখনের প্রাগৈতিহাসিক যুগ!) বিখ্যাত একট হিন্দি ফিল্ম দেখতে গেলাম মর্নিং শোয়ে। এসব ব্যাপারে হস্টেলের মেয়েরা এগিয়ে থাকত, অভিজ্ঞ লোকজন সব। এ যাত্রায় আমরাও তাদের পিছু নিলাম। বাসে অন্যদের আলোচনা শুনলাম যে টিকিটের নাকি খুব মারামারি চলছে, আগের দিন যারা গিয়েছিল,হস্টেল থেকে, অন্য বিভাগের, তারা ব্ল্যাকে টিকিট কেটেছে। সেই শুনে আমার নিত্য বাসযাত্রার সঙ্গী বন্ধুটি খুব আপত্তি জানালো, টিকিট ব্ল্যাক করার মত একটা অসামাজিক অন্যায়কে কক্ষনো প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়, আমরাও তাকে পূর্ণ সমর্থন জানালাম। ব্ল্যাকে টিকিট? আমাদের মত ভালো কলেজের ভালো মেয়েরা? তাহলে আর ফিজিক্স অনার্স পড়ছি কেন? মানে ইজি শুনলে হয়ত এমনটাই বলবেন। ভবিষ্যতের ভুবনের ভার তো আমাদের ওপরেই থাকবে,সমাজ গড়তে হবেনা!
অকুস্থলে পৌঁছে দেখি ভিড় শুধু ভিড়,হাউসফুলের বোর্ড তার মাঝেই দূর থেকেই জ্বলজ্বল করছে। কোথা হইতে কী হইয়া গেল, কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম,আমার ব্ল্যাকবিরোধী বন্ধুটি দৌড়ে পাশের পার্কের পাঁচিলের ওপর বসে থাকা ব্ল্যাকারদাদাদের একজনের সামনের জটলার মাঝে ঢুকে রীতিমত লাফিয়ে লাফিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে, “দাদা এদিকে চারটা টিকিট, এদিকে চারটে টিকিট।“
সে যাত্রা তার এই অসমসাহসিকতার কারণেই আমরা সিনেমাটি দেখতে পেয়েছিলাম, তাই বৃহত্তর সমাজের চিন্তাটা কিছু সময়ের জন্য মুলতুবি রাখাই শ্রেয় মনে হয়েছিল,সবারই। তাছাড়া পার্ট ট্যু র বেশী দেরী নেই,কলেজ ছাড়ার ঘন্টা বাজল বলে; আমাদের সব বাঘা বাঘা দিদিরাই যখন সমস্ত বাধানিষেধ নিয়ম নির্দেশ শিথিল করে দিয়েছে, তখন আমরা নিজেদের এটুকু ছুট দিতে পারব না?
আমাদের সেই তিন বা তিনের মত অথবা তিন থেকে তিরিশের কলেজবেলার কথামালার কোনো শেষ হয় না, গল্পের রাজকন্যার গুলি সুতোর মত,তার বুনন অন্তহীন।
বুকের ভেতরে সেইসব গল্পকথার ঝাঁপি নিয়ে বসে আছি সবাই। কখনো একান্তে অথবা সবাই এক হলে,তখন রূপকথা নয়, মধ্যবিত্ত আটপৌরে সব কথারা আঁচল বিছিয়ে দুপুর রাতে শীতলপাটিতে ভিড় করে আসর পাতে। চাঁপা ফুলের হাল্কা মদির গন্ধ ভরা কলকে ছায়ায়, আলো খেলে। আলতো মায়ায়, আমরা কজন বিষন্নতার সুতোর ফোঁড় তুলে বুনে চলি সুখের মত কারুকাজের নানান কথা। মাত্র তিন বছর,কিন্তু আসলে তা অনন্তের মত, আমাদের চিরকালীন বেঁচে থাকার উষ্ণতা হয়ে রয়ে যায়,ভালোবাসা রঙ বেরঙের দিনগুলি।
**************************************~~~~~~****************************************
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।