এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • কোজাগরী ও লক্ষ্মী - 

    Goutam Dutt লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ০৯ অক্টোবর ২০২২ | ২৬৬ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)

  •  
    (১)

    “যেয়োনা, রজনি, আজি লয়ে তারাদলে!
    গেলে তুমি দয়াময়ি, এ পরাণ যাবে ! –
    উদিলে নির্দয় রবি উদয় – অচলে
    নয়নের মণি মোর নয়ন হারাবে!
    বার মাস তিতি , সতি , নিত্য অশ্রুজলে,
    পেয়েছি উমায় আমি! কি সান্ত্বনা-ভাবে –
    তিনটি দিনেতে, কহ , লো তারা-কুন্তলে,
    এ দীর্ঘ  বিরহ-জ্বালা এ মন জুড়াবে?
    তিন দিন স্বর্ণদীপ জ্বলিতেছে ঘরে
    দূর করি অন্ধকার; শুনিতেছি বাণী –
    মিষ্টতম এ সৃষ্টিতে এ কর্ণ-কুহরে!
    দ্বিগুন আঁধার ঘর হবে, আমি জানি,
    নিবাও এ দীপ যদি!” – কহিলা কাতরে
    নবমীর নিশা-শেষে গিরীশের রাণী।        ( - বিজয়া দশমী – মাইকেল মধুসূদন দত্ত)

             বাঙালির প্রাণের পুজোয় নবমীর রাত যখন দশমীর দিকে গড়াতে থাকে তখন মধুসূদন দত্ত-র এ কবিতাখানা মনে পড়ে আবার। একটা আনন্দোৎসবের পরিণতি’র পরে পরেই শারদীয় আকাশে রাতের চাঁদ পূর্ণ হতে থাকে কোজাগরী’র আবাহনে। শরৎ ঋতুর শেষ মাস অর্থাৎ আশ্বিনের পূর্ণিমাকেই বলা হয় কোজাগরী। হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবী মর্তে আবির্ভূতা হন। আর তাই নিঃশব্দে চলে তাঁর আরাধনা সারা রাত জুড়ে। কোজাগর শব্দ থেকে নাকি এসেছে কোজাগরী। আবার অনেকের মতে ‘কে জাগরী’ বা ‘কে জেগে আছে’ থেকে এসেছে কোজাগরী আর এ থেকেই এসেছে কোজাগরী পূর্ণিমা।



    কো জাগতী – মানে নাকি ‘কে জেগে আছো ?’  হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ এ বলছেন—“কোজাগর - পুং [কঃ (কে) জাগর (জাগিতেছে)—এই পূর্ণিমায় কে জাগে ; পৃষো ] আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথি ; দ্যূতপূর্ণিমা, লক্ষ্মীপূর্ণিমা। “ঘুমে লক্ষ্মী হন বিরূপা, জাগরণে লক্ষ্মীর কৃপা, নৈলে কেন জাগে কোজাগরে॥” দা ২৬। [ লক্ষ্মী বলেন, এই পূর্ণিমায় যে জাগে, তাহাকে ধন দিব। এই তিথিতে অক্ষক্রীড়া নারিকেলজল-পান ও চিপিটক-ভক্ষণ বিহিত (তিথ্যাদিতত্ত্ব)। ]”

    জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’-এ বলছেন—“কোজাগর (র্) [ কঃ (কে) জাগব (জাগ্রৎ)—জাগৃ (জাগ্রৎ থাকা) + অ (কর্ত্তৃ—অচ্)  যে তিথিতে লক্ষ্মী বলেন আজি নারিকেলের জল পান করিয়া কে জাগিয়া আছ, এস তাহাকে সম্পত্তি দান করিব] বি, পুং, আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথি ; কোজাগর পূর্ণিমা।”

    তাহলে মোদ্দা ব্যাপারটা দাঁড়াল—যার কিছু (মানে সম্পত্তি) নেই সে জাগে সম্পত্তি পাওয়ার আশায়, আর সম্পত্তি আছে সে না হারানোর আশায় জাগে। প্রচলিত আছে যে কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার রাতে দেবী খোঁজ নেন – কে জেগে আছে ? যে জেগে অক্ষক্রীড়া করে, লক্ষ্মী তাঁকে ধন সম্পদ দান করেন।

    শারদীয়া পূর্ণিমাতে যে লক্ষ্মীপূজা হয়—যার প্রচলিত নাম কোজাগর-লক্ষ্মীপূজা-তা এখনও হিন্দুর নিকট একটি প্রধান পর্ব। পূজনীয় স্মার্ত্ত-শিরোমণি রঘুনন্দন তাহার তিথিতত্ত্বে শাস্ত্রীয় বচন উদ্ধৃত করে এই তিথির করণীয় কার্য্যের বিধান দিয়ে গেছেন। কোজাগর-পূর্ণিমাতে লক্ষ্মী ও ঐরাবতস্থিত ইন্দ্রের পুজা এবং সকলে সুগন্ধ ও সুবেশ ধারণ করে অক্ষক্রীড়া করে রাত্রি জাগরণ করবে;  কারণ, নিশীখে বরদা লক্ষ্মী বলেন, “কে জাগরিত আছে ? যে জাগরিত থেকে অক্ষক্রীড়া করে, তাহাকে আমি বিত্ত প্রদান করি। নারিকেল ও চিপিটকের দ্বারা পিতৃগণ ও দেবগণের অর্চনা করবে এবং বন্ধুগণের সাথে উহা ভোজন করবে।” যে নারিকেলের জলপান করে অক্ষক্রীড়ায় নিশি অতিবাহিত করে, লক্ষ্মী তাহাকে ধন দান করে থাকেন।

    আশ্বিন-পূর্ণিমায় এই কোজাগর লক্ষ্মীপূজা একটি বহু প্রাচীন উৎসবের সাথে জড়িত। বহুশতাব্দী পূর্বে শরৎকালে শস্য কর্তন হলে সীতা-যজ্ঞ হোত এবং তাতে সীতা এবং ইন্দ্র আহুত হতেন। পারস্কর-গৃহ্যসূত্রে এই স্থানে সীতাকে ইন্দ্রপত্নী বলা হয়েছে; কারণ, সীতা লাঙ্গলপদ্ধতিরূপিণী শস্য-উৎপাদয়িত্রী ভূমিদেবী; ইন্দ্র বৃষ্টি-জলপ্রদানকারী কৃষিকার্য্যের সুবিধাদাতা দেব। পূর্বে সীতা-যজ্ঞে ইন্দ্র আহুত হতেন বলে তিথিতত্ত্বে কোজাগর-পূর্ণিমায় ইন্দ্রের পূজার বিধি আছে। লক্ষ্মী যে সীতার রূপান্তর, তা রামায়ণাদি গ্রন্থে বার বার বলা হয়েছে। তা ছাড়াও লক্ষ্মীর যে-মূর্তি কল্পনা করা হয়েছে, তাঁতে দেখতে পাওয়া যায়, লক্ষ্মীর হস্তে ধান্যমঞ্জরী। তন্ত্রে মহালক্ষ্মীর একটি ধ্যানে লক্ষ্মীর হস্তে শালিধান্যের মঞ্জরী। এখনও লক্ষ্মীপূজার সময় কাঠায় ভরে নবীন ধান্য দেওয়া হয়ে থাকে।



    “নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ জাগরত্তীতিভাষিণী।
    তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ।।”

    অক্ষক্রীড়া মানে পাশা খেলা। কিছু লোক এই দিন পাশা খেলার মাধ্যমে জুয়া খেলেন। আবার কেউ কেউ পরের বাগানের ফলমূল চুরি করে গাছপালা নষ্ট করেন। এরাও ভাবেন যে এই সমস্ত কুকর্মের মাধ্যমে লক্ষ্মীদেবীর কৃপা তারা পাবেনই।

    অক্ষ শব্দের এক অর্থ হ’ল কেনা-বেচার চিন্তা অর্থাৎ ব্যবসা বা বাণিজ্য। তাই বৈশ্য সম্প্রদায় এই দিনে লক্ষ্মী-আরাধনা করে ব্যবসার উন্নতি কামনা করেন।

    অক্ষ শব্দের অন্য অর্থ রুদ্রাক্ষ বা জপমালা। তাই দেবীর কৃপা পাবার আশায় ভক্তেরা নামজপ করেন এইদিন। লক্ষ্মী পূজোর রাত্রে দেবী আসেন মর্ত্যের সমস্ত দুয়ারেই। কিন্তু যে ঘুমিয়ে থাকে তার দুয়ার থাকে লক্ষ্মী দেবী চলে যান। কিন্তু যিনি জেগে ভক্তিভরে  লক্ষ্মী জনার্দনের উপাসনা, নাম স্মরণ করেন - দেবী তাঁকেই কৃপা করেন। এ কথাও বলে থাকেন অনেকেই।

    আমরা আমাদের উত্তরাধিকার কিছুতেই মানি না। মানতেও চাই না। জীবনানন্দের কবিতায় যখন “পেঁচা জাগে” তখন আমরা কতই না রুপকের অন্বেষনে মত্ত হই। অথচ দেখুন আমাদের দেশে-গ্রামে ধান’ই হ’ল লক্ষ্মী। ধানের গোলা হ’ল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। আর লক্ষ্মীর বাহন হ’ল পেঁচা।

    পেঁচা’রা কি খায় জানতে চাননি জটায়ু। জানতে চেয়েছিলেন উটেরা কি খায় ? কিন্তু আমরাও কি জানি পেঁচারা কি খেয়ে বাঁচে ! পেঁচাদের খাবার হল ইঁদুর। হেমন্তের রাতে যখন গ্রামের শিশিরভেজা ধানক্ষেত শুধু জেগে থাকে, ধানগাছের গোড়াতে তখনই ইঁদুরের প্রাদুর্ভাব। এমন কি ধানের গোলার চারপাশেই এরা বাসা বাঁধে। রাতে যখন আমরা নিদ্রায় কাতর তখন কে রক্ষা করে আমাদের এই ধানের গোলা ? রক্ষা করে এই পেঁচারাই।

    এইজন্যেই তো পেঁচারা দিনে দেখতেই পায় না। পেঁচা দিনে অন্ধ। তখন আমরাই পাহারা দিই। আর তাই পেঁচা রাত্রে জাগে আর পাহারা দেয়। পেঁচাকে অনেকে বলে থাকেন, কুৎসিত ও দিবান্ধ। যারা সারা জীবন শুধু ধনলাভের চিন্তায় মগ্ন থাকে, তারা ঐ পেঁচার মতই অন্ধ হয়ে যায়। তাই জ্ঞানের আলো তাদের অন্তরে প্রবেশ করতে পারে না। পেঁচা যেমন কালো অন্ধকারে পথ চলে, ধনলোভীরাও তেমনি কালো পথে অর্থাৎ অসৎ পথে ধাবিত হয়। ধনের দেবী তাঁর সঙ্গে পেঁচা রেখে সকলকে জানিয়ে দেন, যিনি ভক্তিধন অন্বেষণ করবে, তিনি আমাকে পাবে আর যিনি পার্থিব-ধন অন্বেষণ করবে তিনি আমাকে নয় আমার পেঁচা কে লাভ করবে।

    কি মনে হয় আপনাদের ? এতো ভালো রূপককে জীবনানন্দ কেন বার বার ব্যবহার করেছেন তাঁর কবিতায় !   

    “ধানক্ষেতে– মাঠে
    জমিছে ধোঁয়াটে
    ধারালো কুয়াশা!
    ঘরে গেছে চাষা;
    ঝিমায়েছে এ পৃথিবী –
    তবু টের পাই
    কার যেন দুটো চোখে নাই এ ঘুমের
    কোনো সাধ!
    হলুদ পাতার ভীড়ে ব’সে,
    শিশিরের পালক ঘ’ষে ঘ’ষে,
    পাখার ছায়ায় শাখা ঢেকে,
    ঘুম আর ঘুমন্তের ছবি দেখে দেখে
    মেঠো চাঁদ আর মেঠো তারাদের সাথে
    জাগে একা অঘ্রানের রাতে
    সেই পাখি–……………”        ( - পেঁচা – জীবনানন্দ দাশ)
     
    (২)

    লক্ষ্মীর আর এক নাম শ্রী, সম্পদ। তাই ছন্নছাড়া জীবনযাপনকারীকে লক্ষ্মীছাড়া বলা হয়। আবার সাজানো গোছানো বাড়ি-ঘর দেখে তবেই লোকে বাড়ির গৃহিণীকে লক্ষ্মীমন্ত বলেন। আর এর বিপরীত হলেই লক্ষ্মীছাড়া বা অলক্ষ্মী।


    ভাগবত, পুরাণ, মহাভারত এসকল গ্রন্থেই রয়েছে লক্ষ্মীর আবির্ভাব তত্ত্ব। সমুদ্র থেকে লক্ষ্মীর উৎপত্তি। সেই মাথা গরম করা এক মুনি ছিলেন না – যাঁর নাম দুর্বাসা, তাঁর অভিশাপে স্বর্গ একসময় লক্ষ্মীছাড়া হয়ে যায়। তখন আর উপায় না পেয়ে স্বর্গের দেবতারা এক নতুন পরিকল্পনা করে ফেলেন, যে সমুদ্র সেঁচে ফেলতেই হবে। সে কি কম কথা গা !

    যাই হোক, শুরু হয় কাজ। সেতো আর আমাদের কলকাতার মেট্রোরেলের কাজ নয়। সে হ’ল গিয়ে - ধর তক্তা মার পেরেক ! শুরু হয় সমুদ্র-মন্থন। কতো রত্নরাজি, মণি-মাণিক্য মায় অমৃত উঠে আসে সেখান থেকে। আর উঠে আসেন লক্ষ্মী। ধন ও সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী বা মালকিন্‌। উঠে এসে নাকি ঝাঁপিয়ে পড়েন বিষ্ণুর বুকেই। তিনিই তো জগতের রাজা !

    শ্রীসূক্তে লক্ষ্মী হিরণ্যবর্ণা, আবার পদ্মবর্ণা বলে বর্ণিতা। তন্ত্রে মহালক্ষ্মীর ধ্যানে দেবী বালার্কদ্যুতি, সিন্দূরারুণকান্তি, সৌদামিনী সন্নিভা। তিনি নানালঙ্কারভূষিতা। তিথিতত্ত্বে আদিত্যপুরাণ হতে লক্ষ্মীর যে ধ্যান উদ্ধৃত হয়েছে, তাতে তিনি গৌরবর্ণা। তাঁহার হস্তসংখ্যা এবং হস্তে তিনি কি কি ধারণ করে থাকবেন, এই দুইটি বিষয়ে অনেক বিভিন্নতা দৃষ্ট হয়। দেবী কোথাও দ্বিহস্ত, কোথাও বা চতুর্হস্তা, কোথাও বা তিনি ষড়ভূজা বা অষ্টভুজা। আবার এক স্থানে মহালক্ষ্মী অষ্টাদশভূজারূপে কল্পিত হয়েছেন। এই মহালক্ষ্মী মহাকালীমুর্ত্তির অন্যরূপ বিকাশ। কোন কোন স্থলে লক্ষ্মীপূজায় যে বলিদানের বিধি আছে, তাহ বোধ হয় এই মহালক্ষ্মীর পুজা।

    তিথিতত্ত্বে উদ্ধৃত আদিত্যপুরাণ অনুসারে লক্ষ্মীর হস্তে পাশ, অক্ষমালা, পদ্ম ও অঙ্কুশ। লক্ষ্মীর প্রত্যেক মুর্ত্তিকল্পনাতেই হন্তে পদ্ম থাকে। কোন কোন মূর্তিতে হস্ত বসুপাত্র (রত্নপূর্ণ পাত্র) স্বর্ণপদ্ম ও মাতুলুঙ্গ (লেবু) থাকে। কমলার হস্তধৃত লেবুই কমলালেবু নামে অভিহিত হইয়াছে কি না, তা বলা যায় না। অষ্টাদশভূজা মহালক্ষ্মীর হস্তে যথাক্রমে অক্ষ, বজ্র, পরশু, গদা, কুলিশ, পদ্ম, ধনু, কুণ্ডিকা (কমণ্ডলু,) দণ্ড, শক্তি, অসি, ঢাল, শঙ্খ, ঘণ্টা, সুরাপাত্র, শূল, পাণ ও সুদর্শন (চক্র)। শুক্রনীতিসার অনুসারে লক্ষ্মীর এক হস্তে বীণা, দুইটি হস্তে বর এবং অভয়মুদ্রা থাকবে। তথায় আর-একটি হস্তে লুঙ্গফলেরও উল্লেখ আছে। লুঙ্গফল সস্তবতঃ মাতুলুঙ্গ। মূর্তিবিশেষে দেবীর এক হস্তে শ্রীফল থাকবে, এইরূপ উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্রীফল সম্বন্ধে একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে যে, একদা শিব-পুজাকালে একটি পদ্মের অভাব ঘটায় লক্ষ্মী মুকুলিত পদ্মসদৃশ আপনার একটি স্তন কর্তন করে দিয়েছিলেন। মহাদেবের বরে তাঁহাই বিল্ব বা শ্রীফল হয়। মৎস্যপুরাণে বর্ণিত লক্ষ্মীমূর্তির হস্তে পদ্ম ও শ্রীফল। এই গজলক্ষ্মীমূর্তি দেবী পদ্মাসনে উপবিষ্টা, দুইটি হস্তী দেবীর উপর জলবর্ষণ করিতেছে।

    আমাদের ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ বলছে, শ্রেষ্ঠ মহালক্ষ্মী। স্বর্গে ইন্দ্রের সম্পদরূপা স্বর্গলক্ষ্মী, পাতালে আর মর্ত্যের রাজাদের তিনি রাজলক্ষ্মী, আর আমাদের জন্যে তিনি গৃহলক্ষ্মী ও অংশরূপে গৃহিনী এবং সম্পদরূপিণী মঙ্গলকারিণী মঙ্গলা।  ব্রহ্মবৈবর্ত্ত-পুরাণে লক্ষ্মীচরিত্র যেমন অঙ্কিত হয়েছে, তা দেখলে মনে হয়, দেবী যেন কোন বঙ্গ গৃহস্থের কুলবধূ। তিনি নারায়ণের পত্নী—গঙ্গা ও সরস্বতী তাঁহার সপত্নী। পুরাণকার সপত্নীগণের কলহ ও তাঁহার মধ্যে লক্ষ্মীর অবিচল শান্তভাব বর্ণনা করেছেন; লক্ষ্মীচরিত্র আদর্শ বধুচরিত্র।



    বিষ্ণুমূর্তিসহ যে লক্ষ্মীমূর্তি দেখা যায়, তা দ্বিহস্তবিশিষ্ট। শ্রীযুক্ত বিনোদবিহারী কাব্যতীর্থ বিদ্যাবিনোদ মহাশয়ের ‘বিষ্ণুমূর্ত্তি পরিচয়’ নামক পুস্তক হতে জানা যায় যে, বাসুদেব, ত্রৈলোক্যমোহন, নারায়ণ প্রভৃতি বিষ্ণুমূর্তিতে লক্ষ্মীমুর্তিও আছেন। লক্ষ্মীনারায়ণমূর্তিতে দেবী নারায়ণের বাম অঙ্কের উপর উপবিষ্ট এবং কোন কোন স্থলে তাঁহার হস্ত দ্বারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে রয়েছেন। অগ্নিপুরাণ হতে জানা যায়, লক্ষ্মী বরাহরূপধারী বিষ্ণুর পদতলে উপবিষ্ট থাকেন। অনন্তশায়িনী বিষ্ণুমূর্তিতে বিষ্ণু নাগের উপর শয়ান এবং লক্ষ্মী তাঁহার পদসেবা করছেন। অগ্নিপুরাণের হরিশঙ্কর মূর্তিতে নারায়ণ জলশায়ী অবস্থায় বামপার্শ্বে শয়ান। ইঁহার শরীরের এক অংশ রুদ্র (মহাদেব)-মূর্তি এবং অপর অংশ কেশব (বিষ্ণু)-মুর্তির লক্ষণযুক্ত এবং মূর্তিটি গৌরী ও লক্ষ্মীমুর্তিসমন্বিত। ভারতবর্ষে শৈব বৈষ্ণব প্রভৃতি ধর্ম প্রচলিত থাকলেও তাহাদের উপাস্য দেবদেবীগণের মধ্যে ঐক্য-সম্পাদনের চেষ্টা ছিল। সেই সেই চেষ্টার ফলে হরিশঙ্কর মূর্তি ও মহালক্ষ্মী মহাকালী মহাসরস্বতীমূর্তি।

    “স্কন্দপুরাণ বলে, নারায়ণকে পেতে লক্ষ্মীকেও তপস্যা করতে হয়েছিল। স্কন্দপুরাণের ‘আবন্ত্য’ খণ্ডে আছে, লক্ষ্মী - ঋষি ভৃগু ও তাঁর পত্নী খ্যাতির কন্যা। নরনারায়ণের বর্ণনা শুনে লক্ষ্মী তাঁর প্রেমে পড়ে যান। তাঁকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য এক হাজার বছর সমুদ্রধারে তপস্যা শুরু করেন। সে তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতারা নারায়ণের ছদ্মবেশে এসে তাঁকে বর দেন। লক্ষ্মী সেই বরে বিশ্বরূপ দেখতে চান। দেবতাদের ছলনা ধরা পড়ে যায়। তাঁরা লজ্জিত হয়ে ফিরে যান। এই খবর পেয়ে নারায়ণ নিজে আসেন লক্ষ্মীর কাছে। তিনি লক্ষ্মীকে বর দিতে চাইলে লক্ষ্মী বলেন, “আপনি যদি সত্যিই নারায়ণ হন, তবে বিশ্বরূপ দর্শন করিয়ে আমার বিশ্বাস উৎপাদন করুন।” নারায়ণ তা-ই করে লক্ষ্মীর সংশয় দূর করেন। তারপর নারায়ণ তাঁকে বলেন, “ব্রহ্মচর্যই সব ধর্মের মূল ও সর্বোত্তম তপস্যা। যেহেতু তুমি ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে এখানে তপস্যা করেছো, সেহেতু আমিও ‘মূল শ্রীপতি’ নামে এখানে অবস্থান করব এবং তুমিও এখানে ব্রহ্মচর্য-স্বরূপা ‘ব্রাহ্মী মূলশ্রী’ নামে পরিচিত হবে।

    পৌরাণিক যুগের লক্ষ্মী চরিত্রের তুলনা নাই। পুরাণকারগণ দুঃসাহসী। লক্ষ্মীর স্বাভাবিক নম্রতার জন্য তাঁহাদের সাহস বেড়ে গিয়েছিল। ফলে, দেবীভাগবতের গ্লানিকর বৃত্তান্ত। লক্ষ্মীর ভ্রাতা উচ্চৈঃশ্রবার পৃষ্ঠে আরোহণ করে যখন সূর্য্যপুত্র রেবন্ত আসছিলেন, তখন অশ্ব ও অশ্বারোহীর প্রতি একান্তে দৃষ্টিপাত করতে লক্ষ্মী, নারায়ণ কর্তৃক অভিশপ্ত হলেন। লক্ষ্মীকে অশ্বীরূপ ধারণ করতে হল। তাহার পর অশ্বরূপী বিষ্ণুর ঔরসে তাহার পুত্র হয়। অশ্বরূপধারণের কাহিনীটি বৈদিক সূর্য্য-সরণ্যু বা পৌরাণিক সূর্য্যসংজ্ঞার কাহিনী অবলম্বনে লিখিত। বৈদিক সূর্য্য ও বৈদিক বিষ্ণু একই দেবতা। পুরাণের যুগেও বিষ্ণু ও সূর্য্য উভয়েই আদিত্য।।

    এই দেবীভাগবত পুরাণেই লক্ষ্মীর চরিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে—তিনি পতিব্রতাদের মধ্যে প্রধান, সকল জীবের জীবন, স্বর্গে স্বর্গলক্ষ্মী, রাজগৃহে রাজলক্ষ্মী ও সাধারণ মর্ত্যবাসীর ঘরে গৃহলক্ষ্মী। তিনি বণিকদের কাছে বাণিজ্যলক্ষ্মী। আবার পাপীদের কলহ উৎপাদিনী।”

    কোন কোন স্থলে মানব কি কি অনুষ্ঠান করলে শ্রী তাঁহার গৃহে অধিষ্ঠান করেন, তাহার বিবরণ মহাভারতের লক্ষ্মীবাসর-সংবাদে আছে।
     
    (৩)

    'এসো মা লক্ষ্মী
    বসো ঘরে
    আমায় এই ঘরে থাকো আলো করে।'  ( - চলিত।)

    - এ গান যেন আমাদের রোজকার জীবনের গান। ভূ-ভারতে মা লক্ষ্মীর আটটি রূপকে পূজা করা হয় যত্নের সঙ্গে। শাস্ত্রমতে এই আটটি রূপই রয়েছে তাঁর।

    ১  বিদ্যালক্ষ্মী – মা লক্ষ্মীর বিদ্যালক্ষ্মী রূপটি চারহাতবিশিষ্ট। তিনি পদ্মাসনে উপবিষ্ট থাকেন। তার এক হাতে অভয় মুদ্রা, অন্য হাতে বরদা মুদ্রা এবং বাকি দুটি হাতে থাকে দুটি পদ্মফুল।

     ২ গজলক্ষ্মী – মা লক্ষ্মী এই রূপটি সমুদ্রমন্থনকালে আবির্ভূত হয়। পদ্মাসনে উপবিষ্ট এই দেবীরও দুই হাতে দুটি পদ্মফুল থাকে এবং অন্য দুই হাতে অভয় ও বরদা মুদ্রা। পদ্মাসনে বসে থাকা এই দেবীর দুই দিকে দুটি হাতি শুঁড় দিয়ে দেবীকে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে। দুই গজ শুঁড় বিশিষ্ট অবস্থায় দেবী উপবিষ্ট থাকেন বলেই তিনি গজলক্ষ্মী।

     ৩ ধান্যলক্ষ্মী – অখণ্ড বাংলা ও ভারতের শস্যের দেবী হলেন ধান্যলক্ষ্মী। এই দেবী আট হাত বিশিষ্ট এবং পরনে চিরসবুজ বস্ত্র, যা শস্যের সবুজের পরিবাহক। এই আট হাতে তিনি ধরে থাকেন আখ, কলা, ধানের গুচ্ছ, গদা এবং অভয় ও বরদা মুদ্রা। তিনি তার ভক্তদের আশীর্বাদ হিসাবে কৃষিধন দান করেন।

     ৪  বিজয়লক্ষ্মী – পরনে রক্তবর্ণা বস্ত্রপরিহিত মা লক্ষ্মীর অন্যরূপা এই দেবীও আট হাত বিশিষ্ট। এই আট হাতে চক্র, শঙ্খ, তলোয়ার, পাশ, ঢাল, পদ্ম এবং অভয় মূদ্রা ও বরদা মুদ্রা থাকে। জীবনের যে-কোনও অশুভ পরিস্থিতিতে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিজয়ালক্ষ্মী দেবীর উপাসনা করা হয়।

     ৫  ধৈর্য্যলক্ষ্মী – মা লক্ষ্মীর এই ধৈর্যলক্ষ্মী দেবীও অষ্টভুজা। চক্র,শঙ্খ, ধনুক, তির, ত্রিশূল, তলোয়ার, পুস্তক এবং অভয় মুদ্রা ও বরদা মুদ্রা বিশিষ্ট আটহাতে সেজে থাকে দেবী ধৈর্য্যলক্ষ্মী। শক্তি ও সাহসের দেবী হিসাবে অনেকে একে বীরলক্ষ্মীও বলে ডাকেন।

     ৬ ধনলক্ষ্মী – ষড়ভুজা এই দেবীর লালবস্ত্র পরিধান করে থাকেন। ছয় হাতে শঙ্খ, চক্র, কলসি, তির-ধনুক, পদ্ম ও এক হাতে থাকে অভয় মুদ্রা। অভয় মুদ্রিত হাত থেকে স্বর্ণমুদ্রা গড়িয়ে পড়ছে এটাও অনেক পটচিত্র বা সরাচিত্রে দেখা যায়। এই দেবী তার ভক্তদের ধন-সম্পদ ও জাগতিক সমস্ত সুখ দান করেন।

     ৭  সন্তানলক্ষ্মী – সন্তান কামনা ও ধন সম্পদ লাভের জন্য অনেকেই এই দেবীর পূজা করেন। মা লক্ষ্মীর এই রূপটিও ছয় হাত বিশিষ্ট। ঢাল, তলোয়ার, দুটি হাতে কলসি ও অভয় মুদ্রা এবং একটি হাতে পদ্মফুল ধরা একটি মানবশিশু থাকে।

     ৮  আদিলক্ষ্মী – আদিলক্ষ্মী চারহাত বিশিষ্ট দেবী। এই দেবী চার হাতে পদ্ম, সাদা পতাকা, অভয় মুদ্রা ও বরদা মুদ্রা থাকে। আদিলক্ষ্মীকে বলা হয় বিষ্ণুর চালিকা শক্তি। মূলত  তিনি বিষ্ণুর স্ত্রী হিসাবেই পূজিত হন। তার একটি নাম ইন্দিরা, অন্য নাম শ্রী বা শ্রীদেবী। কোথাও কোথাও আদিলক্ষ্মী রমা নামেও ডাকা হয়।

    বাংলাতে মা লক্ষ্মীর সঙ্গে সমানভাবে পূজিত হয় তার বাহন পেঁচাটিও। তবে পেঁচাকে অনেকে অলক্ষ্মীর প্রতীক হিসাবেও চিহ্নিত করেন। ইউরোপ ও আমেরিকাতে পেঁচাকে মৃত্যুর দূত হিসাবে দেখা হয়, তাই অশুভ প্রাণী হিসাবে মানা হয় একে। মূলত পেঁচার নিশাচরী স্বভাবের জন্য এই বাংলাতেও ভুতুম পেঁচাকে মৃত্যুদূত বলা হয়।

    সারা বাংলায় লক্ষ্মীর মন্দির কিন্তু দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু প্রতি গেরস্থ বাড়িতেই লক্ষ্মী আছেন। সে ছবিই হোক বা মূর্তিই হোক অথবা পট বা সরাতেই হোক। এমনকি বাড়ির ঠাকুরঘরের দেওয়ালে কিংবা গোলাঘরেও তাঁর উপস্থিতি আল্‌পনায়, ধানের হাঁড়িতে কিংবা ধান্যছড়ায়। ছবিতে তিনি চতুর্ভুজা—অন্তত বাঙালীর ঘরে। বাঙালীর কাছে তিনি শিবের এক কন্যা। সৌন্দর্যময়ী, অপরূপা।

    বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য লিখেছেন, “তবে শুধু হিন্দু ধর্মে নয়, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মেও উল্লেখ রয়েছে দেবী লক্ষ্মীর। যেমন বৌদ্ধ ‘অভিধানপ্পদীপিকা’-তে তিনি সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির দেবী। তেমনই ‘শালিকেদার’ এবং ‘সিরি-কালকন্নি’ জাতকে তাঁকে সৌভাগ্য ও জ্ঞানের দেবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার বৌদ্ধতন্ত্রে তিনি বসুধারা নামে পূজিত হতেন। তিনি দেবী লক্ষ্মীর বৌদ্ধ প্রতিরূপ।

    অন্য দিকে জৈন ধর্মে তাঁর উল্লেখ রয়েছে মহাবীরের মাতা ত্রিশলা, যে রাতে জিনকে স্বপ্নে ধারণ করেছিলেন সেই রাতেই গজলক্ষ্মীকে স্বপ্নে দেখেছিলেন। প্রাচীণ ভারতের শিল্পকলায় এমনকী মুদ্রায় দেবী লক্ষ্মীর অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রাচীন বৌদ্ধ শিল্পকলায় ভারহুত, সাচী কিংবা অমরাবতীর ভাস্কর্যে লক্ষ্মীর সন্ধান মেলে। ভারতীয় সংগ্রহালয়ে রক্ষিত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের, বেসনগরের যে কল্পবৃক্ষ রয়েছে তাতে প্রচুর ধনসম্পদের সঙ্গে শঙ্খ ও পদ্মের চিহ্ন দেখা যায়”।
      
    পৌরাণিক কাহিনী—বিভিন্ন পুরাণে লক্ষ্মীদেবীর উৎপত্তি সম্বন্ধে কয়েকপ্রকার কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে। তবে মূলতঃ এই কয়টা বিষয় এক, যথা— তিনি নারায়ণ-( বা বিষ্ণু-) পত্নী এবং বৈকুণ্ঠে অবস্থান করেন। তিমি তপ্তকাঞ্চনবর্ণাভা এবং সর্বপ্রকার সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ও সর্বসৌভাগ্যদায়িনী।

    ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে আছে যে এক সময়ে নারদ নারায়ণকে লক্ষ্মীদেবীর উৎপত্তি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেন। তদুত্তরে নারায়ণ বলেন—

    সৃষ্টির প্রাক্কালে রাসমণ্ডলস্থিত শ্রীকৃষ্ণের বাম ভাগ থেকে লক্ষ্মীদেবী উৎপন্ন হয়েই তিনি দ্বিধা বিভক্ত হলেন—এই দুই দেবী রাধিকা ও লক্ষ্মী। রাধিকা প্রথমে কৃষ্ণকে প্রার্থনা করেন ও পরে লক্ষ্মীও তাঁহাকে প্রার্থনা করেন। শ্রীকৃষ্ণ উভয়ের প্রার্থনাই পূর্ণ করলেন। তিনি দ্বিভুজ শ্রীকৃষ্ণমূর্তিতে রাধিকাকে গ্রহণ করলেন ও চতুর্ভুজ নারায়ণ মুর্তিতে লক্ষ্মীকে গ্রহণ করেন। ঐ কৃষ্ণ রাধিকা ও গোপগোপীসহ গোলকে ও নারায়ণ লক্ষ্মীয় বৈকুণ্ঠে অবস্থান করতে লাগিলেন।

             আবার দেবসেনা রূপে লক্ষ্মী জন্মেছিলেন বলে কার্তিক বা স্কন্দের স্ত্রী। মন্ত্রমহোদধি গ্রন্থানুসারে তিনি গণেশের স্ত্রী। কলাবউ রূপে লক্ষ্মীপুজো হয়তো এই কারণেই। 

             ‘শ্রী’ লক্ষ্মীর আরেক নাম। পরাশর-সংহিতায় রয়েছে তিন শক্তির কথা। ‘শ্রী’, ‘ভূ’ আর ‘লীলা’। জয়াখ্য-সংহিতায় উল্লেখ আছে চার দেবীর - ‘লক্ষ্মী’, ‘কীর্তি’, ‘জয়া’ ও ‘মায়া’।

             অহির্বুধণ্য-সংহিতা’য় আছে লক্ষ্মীর কথা।

             ঋগ্বেদের ৫ম মণ্ডলে ‘শ্রী দেবী’-ই লক্ষ্মী।

             এছাড়াও বৈষ্ণব ভাবের জন্যে তিনি ‘শ্রী’। তাঁর মধ্যে কোনো পুং-ভাব না থাকর জন্যে তিনি ‘পদ্মা’। কামদান করার জন্যে তিনিই ‘কমলা’। বিষ্ণুর ভাব পালয়িতা বলে তিনি ‘বিষ্ণুশক্তি’। রমণ বা আনন্দদান করান বলে – ‘রতি’ অথবা রমা’। এছাড়াও তিনি ‘আর্দ্রা’, ‘গজশুণ্ডাগ্রবতী’, ‘পুষ্টিরূপা’, ‘পিঙ্গলবর্ণা’, ‘পদ্মমালিনী’, ‘চন্দ্রাভা’, ‘হিরণ্ময়ী’, ‘ষষ্টিহস্তা’, ‘সুবর্ণা’, ‘হেমমালিনী’, ‘সূর্যাভা’ প্রভৃতি।

             অবাঙালীদের মধ্যে লক্ষ্মী পূজিত হন সাধারণতঃ দেওয়ালির দিনে। কিন্তু বাঙালীঘরে লক্ষ্মীর পূজা সারাবছর ধরে হলেও মূল পুজোটি হয় দেবীপক্ষের শেষের ওই কোজাগরী পূর্ণিমাতেই।

    আসলে লক্ষ্মী হলেন বাঙালির লৌকিক দেবী। আগে আমাদের সমাজে বিশেষ করে গ্রামে দুর্গাপূজা নিয়ে এত মাতামাতি ছিল না। বরং কোজাগরী লক্ষ্মীপূজাই ছিল বড় উৎসব। কোজাগরীর রকমফের ছিল দেখার মতো। ছড়া কেটেই মা লক্ষ্মীকে আবাহন করত গৃহস্থ। করজোড়ে বাড়ির নারীরা একসঙ্গে বলতেন, ‘আঁকিলাম পদ দু’টি, তাই মাগো নিই লুটি। দিবারাত পা দু’টি ধরি, বন্দনা করি। আঁকি মাগো আল্পনা, এই পূজা এই বন্দনা।’

             অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাংলার ব্রত’ বইতে এই লক্ষ্মীপূজা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন।

             “লক্ষ্মীব্রতটি মেয়েদের একটি খুব বড় ব্রত। আশ্বিনপূর্ণিমায় যখন হৈমন্তিক শস্য ঘরে আসবে, তখনকার ব্রত এটি। সন্ধ্যার সময় লক্ষ্মীপূজা। সকাল থেকে মেয়েরা ঘরগুলি আলপনায় বিচিত্র পদ্ম, লতাপাতা এঁকে সাজিয়ে তোলে। লক্ষ্মীর পদচিহ্ন, লক্ষ্মীপেঁচা এবং ধানছড়া হল আপনার প্রধান অঙ্গ। বড়ো ঘর, যেখানে ধানচাল, জিনিসপত্র রাখা হয়, সেই ঘরের মাঝের খুঁটির—মধুম খামের গোড়ায় নানা আলপনা-দেওয়া লক্ষ্মীর চৌকি পাতা হয়। আলপনায় নানা অলংকার, এবং চৌকিতে, লক্ষ্মীর সম্পূর্ণ মূর্তি না লিখে কেবল মুকুট আর দুখানি পা কিংবা পদ্মের উপরে পা-এমনি নানারকম চিত্র দেওয়া হয়। খুঁটির গায়ে লক্ষ্মীনারায়ণ আর লক্ষ্মীপেঁচা বা পদ্ম, ধানছড়া, কলমিলতা, দোপাটিলতা, লক্ষ্মীর পদচিহ্ন আঁকা থাকে। চৌকির উপরে ডোল ও বেড়–ডালা ও বিঁড়ে। বেড়ের মধ্যে শুয়োরর দাঁত ও সিঁদুরের কৌটা এবং তার উপরে নানারকম ফল ইত্যাদিতে পূর্ণ রচনার পাতিল বা ভাঁড় রাখা হয়। রচনার পাতিলখানির গায়ে লক্ষ্মীর পদচিহ্ন ও ধানছড়া ; রচনার পাতিলটির উপরে লক্ষ্মীর সরা ; সরার পিঠে লাল নীল সবুজ হলদে কালো এই কয় রঙে লক্ষ্মীনারায়ণ, লক্ষ্মীপেঁচা ইত্যাদির আলপনা। লক্ষ্মীর কাপড়ে সবুজ রঙ, গায়ে হলুদবর্ণ, কালির পরিরেখ, এবং অধর ও পায়ের এবং করতলের জন্য লাল ; নীলবর্ণ পটভূমিকার কারুকার্যে দেওয়া হয়। লক্ষ্মীসরার উর্ধে আধখানা নারিকেলের মালাই—মেয়েরা এই মাইকে কুবেরের মাথা বা মাথার খুলি বলে। যশোর অঞ্চলে সবার পশ্চাতে একটি শীষ সমেত আস্ত ডাব— সেটিকে ঘোমটা দিয়ে, গহন ইত্যাদি দিয়ে অনেকটা একটি ছোটো মেয়ের মতো করে সাজানো হয়। এবং কলার খালুই নিয়ে ধানের গোলার অনুরূপ কতকগুলি ডোলা, তাতে নানাবিধ শস্য পূর্ণ করে আর একটি কাঠের খেলার নৌকোর প্রত্যেক গলুয়ে নানাবিধ শস্য—ধান, তিল, মুগ, মুসুরি, মটর ইত্যাদি দিয়ে লক্ষ্মীর চৌকির সম্মুখে রাখার প্রথাও আছে। পূজা শেষ হওয়া পর্যন্ত ব্ৰতীর উপবাস। দেশভেদের কোনো গ্রামে লক্ষ্মী, নারায়ণ ও কুবের-এই তিনটিকে তিন রঙের পিটুলির পুতুলের আকারে গড়ে দেওয়া হয়। এমনি নানা গ্রামে অনুষ্ঠানের একটু অদলবদল আছে”।

             অবনীন্দ্রনাথ আরো বলেছেন যে – “মোটামুটি হিসেবে দেখা যায়, এই জাগরপুর্ণিমার ব্রতটির মধ্যে অনেকখানি অনার্য অংশ রয়েছে। শুয়োরের দাঁত—যার উপরে ফলমূল মিষ্টান্নের রচনার পাতিল ; কুবেরের মাথা—যেটা সৰ-উপরে রয়েছে দেখি ; কিংবা সরার পিছন থেকে উঁকি দিচ্ছে একটি ঘোমটা-দেওয়া মেয়ের মতো ডাব-হলুদ-সিঁদুর মাখানো ; আর পেঁচা ও ধানছড়া — এক লক্ষ্মীর বাহন, আর এক লক্ষ্মীর শস্যমূর্তি — এ কয়টিই অহিন্দু ও অনার্য বা অন্যব্রতদের। আমার এই কথা সমর্থন করার জন্যে হিন্দুস্থানেই যদি প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয় তবে একটু মুশকিল। কেননা, শুয়োরের দাঁত-সে বরাহ-অবতারের যুগে বেদ উদ্ধার করে পবিত্র হয়ে গেছে ; মড়ার মাথা-সেও তন্ত্রের মধ্যে দিয়ে মহাদেবের হাতে উঠেছে ; বাকি থাকেন পেঁচা ও ধাননছড়া ; হয়তো গরুড়ের বংশাবলীতে পেঁচাকেও পাব, এবং ধানই যে লক্ষ্মী, সেটা তো লক্ষ্মীর ঝাপিতে লুকোনো আছে। কিন্তু ভারত-সমুদ্র ছাড়িয়ে বহুদূরে প্রশান্ত-মহাসাগরের পারেও যখন দেখি, ধানছড়া মূর্তিতে পুজো পাচ্ছেন ঠিক এমনি আর-এক মা-লক্ষ্মী বা ‘ছড়া-মা’ মেক্সিকো পেরু প্রভৃতি দেশের অনার্যদের মধ্যে, তখন কী বলা যাবে?
     
    (৪)

    শস্যসংগ্রহের কালে পেরুতে লোকেরা ভুট্টার ছড়গুলি দিয়ে তাদের মালক্ষ্মীর মৃতিটি গড়ে। পূজার পূর্বে তিন রাত্রি জাগরণ করে ছড়ামাম্মা বা সরামাম্মাকে নজরে-নজরে রাখা নিয়ম। একে পুর্ণিমা-জাগরণ বা কোজাগর বলা যেতে পারে। পুজোর দিন এরা ভুট্টাছড় বা এদের লক্ষ্মীমূর্তির সামনে রচনার পাতিলে নানারকম খাবার সাজিয়ে একটি সিদ্ধ-করা ব্যাঙ সকলের উপরে রাখে ; এবং সেই ব্যাঙের পিঠে একটি জনারের শীষের মধ্যে নানা শস্য—ভুট্টা, মুগ, মুসুরি ইত্যাদি চূর্ণ করে ভরে গুঁজে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের মধ্যে মেয়েরা এলোচুলে নৃত্য করতে করতে একটি কুমারীকে হলুদে-সিঁদুরে অলকা-তিলকা দিয়ে মুখটি সাজিয়ে—কতকটা আমাদের লক্ষ্মীপুজোর ডাবটির মত—এবং নানা অলংকার ও ভালো কাপড় পরিয়ে পুজারির সামনে উপস্থিত করে। পূজারি কুমারীকে পুজা দেন ও সকলের একসঙ্গে নরবলির নাচ শুরু হয়। তার পরে সেই কুমারীকে বলি দিয়ে তার সদ্যছিন্ন রক্তমাখা হৃৎপিণ্ডটি রচনার পাতিলে রেখে পুরোহিত ছড়ামাম্মাকে প্রশ্ন করেন—মা, তুমি তুষ্ট হয়ে রইলে তো ? যদি পুরোহিতের প্রতি আদেশ হয়-রইলুম, তবে জনারের ছড় তারা পূজার ঘরে তুলে রাখে, আর যদি আদেশ হয়—রইব না, তবে জনারের ছড় পুড়িয়ে নতুন ছড়ামাম্মার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা হয়”।

    “লক্ষ্মীপুজার এদেশে আর-একটা অনুষ্ঠান রয়েছে, যেটা নজর করে দেখলে শাস্ত্রীয় লক্ষ্মীপূজা-পদ্ধতি যে অনার্য এবং প্রাচীন লৌকিক একটি ব্রতের স্থান পরে অধিকার করেছে, তা বেশ বোঝা যায়। গৃহস্থের বড়োঘরের মধ্যে লক্ষ্মীপূজার পূর্বে, ঘরের বাহিরে একটি পূজা চলে; তাকে বলা হয় ‘অলক্ষ্মী বিদায়’। এটি শাস্ত্রোক্ত দীপান্বিতা। লক্ষ্মীপূজার একটি অনুষ্ঠান, যথা; প্রদোষসময়ে বহিরে গোময়নির্মিত অলক্ষ্মীকে বামহস্ত দ্বারা পূজা করিবে। আচমনান্তে সামান্যার্ঘ্য ও আসনশুদ্ধি করিয়া অলক্ষ্মীর ধ্যান যথা—ওঁ অলক্ষ্মীং কৃষ্ণবর্ণাং কৃষ্ণবস্ত্রপরিধানাং কৃষ্ণগন্ধানুলেপনাং তৈলাভ্যক্তশরীরাং মুক্তকেশীং দ্বিভুজাং বামহন্তে গৃহীত ভস্মনীং দক্ষিণহস্তে সন্মর্জিনীং গর্দভারূঢ়াং লৌহাভরণভূষিতাং বিকৃতভ্রংষ্ট্রাং কলহপ্রিয়া-এই বলিয়া ধ্যান করিয়া আবাহনপূর্বক অলক্ষ্মীর পূজা; পূজান্তে পাঠ্য মন্ত্র যথা–ওঁ অলক্ষ্মী ত্বং কুরূপাসি কুৎসিতস্থানবাসিনী সুখরাত্রে ময়া দত্তাং গৃহু পূজঞ্চ শাশ্বতীম্। পরে গৃহমধ্যে গিয়া লক্ষ্মীপূজা যথাবিধি আরম্ভ-গৌরবর্ণাং সুরূপাঞ্চ সর্বালংকারভূষিতাম্ ইত্যাদি।

    পাড়াগাঁয়ে মেয়েরা অলক্ষ্মী-বিদায় নিজের করে না; পূজারিকে দিয়ে এ-কাজ সারা হয়। এই অলক্ষ্মীই হলেন অন্যব্রতদের লক্ষ্মী বা শস্যদেবতা। শাস্ত্র নিজেদের মা-লক্ষ্মীকে এই প্রাচীনা লক্ষ্মীর স্থানে বসিয়ে অলক্ষ্মী নাম দিয়ে কুরূপা-কুৎসিতা বলে একে ছেঁড়া চুল ও ঘরের আবর্জনার সঙ্গে বিদায় দিতে চাইলেন। মেয়েরাও ব্ৰহ্মকোপের ভয়ে অলক্ষ্মীর পুজোর জায়গা বাইরেই করলেন ; এবং যথাবিধি পূজা করা না-করার দায়-দোষ সমস্তই পূজারিরই নিতে হল এবং এখনকার হিন্দু-পরিবারে ব্রাহ্মধর্মের শালগ্রাম ফেলার মতো তখনও একটু যে গোলযোগ না হল তা নয়। মেয়েরা পুজারির কথা শুনে প্রাচীনা লক্ষ্মীকে বেশিরকম অপমান করতে ইতস্তত করলেন। এখন অলক্ষ্মীই বলি আর যাই বলি, একসময়ে তিনি তো লক্ষ্মী বলেই চলেছিলেন, কাজেই তার কতকটা সম্মান ধূর্ত পুজারি বজায় রেখে মেয়েদের মন রাখলেন : নিজেরও মনে অলক্ষ্মীর কোপের ভয় না-হচ্ছিল তা নয় ; ঘরের বাইরে হলেও মা-লক্ষ্মীর আগে অলক্ষ্মীর পূজা হবে, স্থির হল”।

    নীহাররঞ্জন রায় তার ‘বাঙালীর ইতিহাস’-গ্রন্থে  লিখেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্মীর পৃথক মূর্তিপূজা খুব সুপ্রচলিত নয়।আমাদের লোকধর্মে লক্ষ্মীর আর একটি পরিচয় আমরা জানি এবং তাঁহার পূজা বাঙালী সমাজে নারীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। এই লক্ষ্মী কৃষি সমাজের মানস-কল্পনার সৃষ্টি; শস্য-প্রাচূর্যের এবং সমৃদ্ধির তিনি দেবী। এই লক্ষ্মীর পূজা ঘটলক্ষ্মী বা ধান্যশীর্ষপূর্ণ চিত্রাঙ্কিত ঘটের পূজা। বাঙালী হিন্দুর ঘরে ঘরে নারীসমাজে সে পুজা আজও অব্যাহত। বস্তুত, দ্বাদশ শতক পর্যন্ত শারদীয়া কোজাগর উৎসবের সঙ্গে লক্ষ্মীদেবীর পূজার কোনও সম্পর্কই ছিল না।’

    ‘লক্ষ্মীপূজা আমাদের জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আসলে কেবল টাকাকড়িই ধন নয়। চরিত্রধন মানুষের মহাধন। যার টাকাকড়ি নেই সে যেমন লক্ষ্মীহীন, যার চরিত্রধন নেই সে তেমনি লক্ষ্মীছাড়া। যারা সাধক তারা লক্ষ্মীর আরাধনা করেন মুক্তিধন লাভের জন্য। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা কেন? কেউ কেউ বলেন, লক্ষ্মীর দেওয়া ধন যারা অপব্যবহার করে, তাদের কপালে লেখা আছে যমের দণ্ড—এই কথা ঘোষণা করে লক্ষ্মীর বাহন। তাই কথায় বলে, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’। এছাড়া ধনসম্পত্তি, সে টাকাকড়ি হোক বা সাধনধনই হোক, সদাজাগ্রত অবস্থায় রক্ষা করতে হয়। রাতে সবাই যখন ঘুমায়, তখন পেঁচা জেগে থাকে। পেঁচাই সেই ধনসম্পদ পাহারা দেয়’।



    মৈমনসিংহ গীতিকার মতো প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে লক্ষ্মীপূজার উল্লেখ দেখে বোঝা যায়, সেকালে এই পূজার জনপ্রিয়তা কতটা ছিল।

    একটা লোককথায় আছে যে, বাংলার জগৎ শেঠ অল্প বয়সে বিদ্বান হয়ে উঠলে দিল্লীশ্বরের কানে তা পৌঁছয়। তিনি তাঁকে দেখতে চান। এরপর জগৎ শেঠ দিল্লি গেলে রাজা তাঁর কথাবার্তায় খুশি হয়ে তাঁকে দিল্লিতে থাকতে বলেন। জগৎ শেঠও দিল্লিতে থেকে যান। কিছুদিন পরে রাজা তাঁকে বলেন, তোমার উপর আমি অত্যন্ত প্রীত। তুমি যা চাইবে আমি দান করব। তখন জগৎ শেঠ বাড়ি ফিরে মাকে সব বলেন। বুদ্ধিমতী জননী পুত্রের মঙ্গলের জন্য বলেন, আগে রাজাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিয়ে নিয়ে তারপর জানাতে যে কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দিল্লিতে কোনও গৃহস্থ বাড়িতে যেন আলো না জ্বালায়। রাজার নির্দেশে ওই রাতে কেউ আলো জ্বালালো না। জগৎ শেঠের মা ঘি-এর প্রদীপ জ্বেলে ঘর আলো করে দরজা খুলে বসে থাকল। যথাসময়ে দেবী এলেন এবং বললেন, আমি খুব পরিশ্রান্ত। আমাকে একটু আশ্রয় দেবে ? জগৎ শেঠের মা দেবীর ছলনা বুঝতে পারলেন। তিনি দেবীকে ঘরে আশ্রয় দিলেন এবং বললেন, আমি নদীতে স্নান করতে যাচ্ছি। ফিরে না আসা অবধি আপনি এখানে থাকুন। দেবী তাতে রাজি হলেন। এবার জগৎ শেঠের মা নদীতে স্নান করতে গিয়ে প্রাণত্যাগ করলেন। ফলে সেদিন থেকে দেবী জগৎ শেঠের ঘরে থেকে গেলেন। আজও ধন সম্পদের দেবী লক্ষ্মীকে পাওয়ার জন্য গৃহস্থ বাড়িতে সারারাত ঘি-এর প্রদীপ জ্বালানো হয়।

    গবেষকদের মতে লক্ষ্মী আদিতে লৌকিক দেবী ছিলেন। বিশিষ্ট গবেষক কল্যাণকুমার দাশগুপ্তর মতে তিনি ছিলেন আদিমাতা ও পৃথ্বীমাতার রূপভেদ। তিনি লিখেছেন—“আদিতে লক্ষ্মী লোকায়ত দেবী ছিলেন তার প্রতিধ্বনি মেলে জৈনসাহিত্যে তাঁকে গন্ধর্ব কিন্নর প্রমুখ ব্যন্তর দেবতা বা মধ্যবর্তী দেবতাদের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করায়”।

    সুতরাং লক্ষ্মী শুধু লৌকিক দেবী নন, তিনি আদি ধরিত্রীমাতা। অবশ্যই বলা যায় তিনি আদিতে অনার্যদের পূজিতা ছিলেন। পাল সেন আমলের যে ভোগবিষ্ণুমূর্তি দেখা যায় সেখানে বিষ্ণুর দুপাশে লক্ষ্মী বা ধরিত্রী আর সরস্বতী রয়েছেন স্ত্রী রূপে। পুরাণে এই বসুধা বা পৃথিবী বিষ্ণুর স্ত্রী রূপে কল্পিত। রামায়ণে রামচন্দ্রকে বিষ্ণু ও লক্ষ্মীকে শ্রী বা সীতা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায় সীতা ছিল মৌর্যযুগে কৃষিদেবী। আর এই কৃষিদেবী যে কৃষিলক্ষ্মীর রূপান্তর সেকথা বলাই বাহুল্য।

    লক্ষ্মীপূজা আমাদের জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আসলে কেবল টাকাকড়িই ধন নয়। চরিত্রধন মানুষের মহাধন। যার টাকাকড়ি নেই সে যেমন লক্ষ্মীহীন, যার চরিত্রধন নেই সে তেমনি লক্ষ্মীছাড়া। যারা সাধক তারা লক্ষ্মীর আরাধনা করেন মুক্তিধন লাভের জন্য। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা কেন? কেউ কেউ বলেন, লক্ষ্মীর দেওয়া ধন যারা অপব্যবহার করে, তাদের কপালে লেখা আছে যমের দণ্ড—এই কথা ঘোষণা করে লক্ষ্মীর বাহন। তাই কথায় বলে, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’। এছাড়া ধনসম্পত্তি, সে টাকাকড়ি হোক বা সাধনধনই হোক, সদাজাগ্রত অবস্থায় রক্ষা করতে হয়। রাতে সবাই যখন ঘুমায়, তখন পেঁচা জেগে থাকে। পেঁচাই সেই ধনসম্পদ পাহারা দেয়।

    ‘পেঁচায় চড়ে লক্ষ্মী আসেন ঘরে, ভূত পালায় ডরে।
    লক্ষ্মীর হাতে ধানের বালা, মাথায় সোনার ছাতি,
    ভূত পালাল, জ্বালা তোরা হাজার সোনার বাতি।’

    ভূত মানে যদি দারিদ্র্য হয়, ইঁদুর হয়, খেতের শস্য নষ্টকারী পোকামাকড় হয়, তবে পেঁচায় চড়ে লক্ষ্মীর আগমনের তাৎপর্য স্পষ্ট বোঝা যায়।

    ওঁ পাশাক্ষমালিকাম্ভোজ-সৃণিভির্ষাম্য-সৌম্যয়োঃ।
    পদ্মাসনাস্থাং ধ্যায়েচ্চ শ্রিয়ং ত্রৈলোক্যমাতরম্।।
    গৌরবর্ণাং সুরুপাঞ্চ সর্বলঙ্কার-ভূষিতাম্।
    রৌক্মপদ্ম-ব্যগ্রকরাং বরদাং দক্ষিণেন তু।।

    অর্থঃ দক্ষিণহস্তে পাশ, অক্ষমালা এবং বামহস্তে পদ্ম ও অঙ্কুশধারিণী, পদ্মাসনে উপবিষ্টা, শ্রীরূপা, ত্রিলোকমাতা, গৌরবর্ণা, সুন্দরী, সর্বালঙ্কারভূষিতা, ব্যগ্রহস্তে স্বর্ণপদ্মধারিণী এবং দক্ষিণহস্তে বরদাত্রী দেবীকে ধ্যান করি। এই হ’ল লক্ষ্মীদেবীর ধ্যানমন্ত্র।

    “আদিম বসন্তপ্রাতে উঠেছিলে মন্থিত সাগরে,
    ডান হাতে সুধাপাত্র বিষভাণ্ড লয়ে বাম করে,
    তরঙ্গিত মহাসিন্ধু মন্ত্রশান্ত ভুজঙ্গের মতো
    পড়েছিল পদপ্রান্তে উচ্ছ্বসিত ফণা লক্ষ শত
                   করি অবনত।
          কুন্দশুভ্র নগ্নকান্তি সুরেন্দ্রবন্দিতা,
                   তুমি অনিন্দিতা।”                   ( - উর্বশী – রবীন্দ্রনাথ।)

    লক্ষ্মী হলেন প্রসূতি গর্ভে দক্ষকন্যা অর্থাৎ দক্ষ রাজার পত্নীর সন্তান রূপে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এছাড়াও তাকে খ্যাতির গর্ভে ভৃগু কন্যারূপেও জন্ম গ্রহণ করতে অনেক পুরাণে উল্লেখ করা হয়েছে।  

    কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো অনেকেই সরায় করেন। এটা বাংলার লোকসংস্কৃতির একটা বিশেষত্ব। আগে ১৩ রকমের সরা তৈরি হত। এখন তা ৬ রকমে ঠেকেছে। একলক্ষ্মী সরায় থাকে লক্ষ্মীর দুপাশে পদ্ম, নীচে প্যাঁচা। সে আবার উড়ছে। তিন পুতুল সরাতে লক্ষ্মীর দুপাশে দুজন সখী থাকে। এটাতেও নীচে থাকে প্যাঁচা। ঢাকাই সরা নানা রকমের হয়। কোনওটাতে জোড়া লক্ষ্মী থাকে, কোনওটাতে পাঁচ লক্ষ্মী, কোনওটাতে আবার লক্ষ্মীর সঙ্গে থাকেন চার সখী কিংবা রাধাকৃষ্ণ। দুর্গা সরাকে আড়াআড়ি দুভাগে ভাগ করা হয়। ওপরে সপরিবারে মা দুর্গা, তার ওপরে শিবের মুখ, নীচে প্যাঁচা–সহ লক্ষ্মী, আলাদা করে। এই দুর্গা সরার আর একটি রকম বা প্রকার হল গণকা বা আচার্যি সরা। সুরেশ্বরী সরায় আবার দুর্গার পরিবারের প্রত্যেকের ছবি আলাদা আলাদা করে আঁকা থাকে। আসলে সরা এক গর্ভবতী নারীর প্রতীক। এর সঙ্গে উৎপাদনশীলতা আর সমৃদ্ধির যোগ আছে। দুই, সরা হল পৃথিবীর পিঠ। বসুন্ধরার পুজোই লক্ষ্মীপুজো, সেজন্যও এই আয়োজন।
     
    (৫)

    আলোচনার সমাপ্তি টানি এবার।

    ১৮২২ সালের কলকাতা।

    ‘১৮২২ সালের ১২ এপ্রিল, নববর্ষের দিন কলকাতায় রামমোহন রায় তাঁর ফারসি পত্রিকা প্রকাশ করেন। নাম ‘মীরাৎ-উল-আখবার’। গোটা ভারতে এই প্রথম কোনো ফারসি সংবাদপত্র প্রকাশিত হল। আর সেটাও হল কলকাতার বুকে, অর্থাৎ বাংলায়। মুদ্রিত হত ধর্মতলা থেকে। নিজের মতামত, ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা-সহ নানা লেখা বের করতে লাগলেন রামমোহন। কোনো রাখ-ঢাক নেই সেখানে। ফারসি ভাষায় পত্রিকা বের করা প্রসঙ্গে রামমোহন নিজে বলেছেন, “… পাঠকগণের মনোরঞ্জনের জন্য এই শহরে অনেকগুলি সংবাদপত্রের সৃষ্টি হইয়াছে সত্য, কিন্তু যাহারা ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত অথচ ইংরেজিতে অনভিজ্ঞ— বিশেষত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লোকেরা— তাহাদের পাঠের জন্য একখানাও ফারসি সংবাদপত্র নাই…” এই কারণের জন্যই ‘মীরাৎ-উল-আখবার’-এর অবতারণা’।

    এই বছরের ৫ মার্চ ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় “সম্বাদ কৌমুদী’র” সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে প্রকাশ করলেন নতুন পত্রিকা। নাম – “সমাচার চন্দ্রিকা”।

    এই বছরেরই কোনো এক হৈমন্তিক বিকেলে সুদূর ইংল্যাণ্ড থেকে জলযানে চেপে এসে কলকাতায় পা রাখলেন এক সাতাশ বছরের সুন্দরী তন্বী। নাম – ফ্যানি পার্ক্স (Fanny Parkes)। ফ্যানি’র বড় বোন অ্যান কলকাতাতেই থাকতেন তখন। ২৫ মার্চ ১৮২২। ফ্যানি বিবাহসূত্রে বাঁধলেন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির এক ‘রাইটার’ ২৩ বছরের এক জোয়ান চার্লস ক্রফোর্ড পার্ক্স-কে। আশপাশে সবে জঙ্গল কাটানো চৌরঙ্গী অঞ্চলে একটা দোতলা বাড়ি ভাড়া নিলেন পার্ক্স দম্পতি। মিস্টার তখন কাস্টম ডিপার্টমেন্টের কলেক্টারের অধীনে এক করণিক মাত্র। এরপর চার্লস চাকরীর জন্য ফতেপুর, কানপুর, এলাহাবাদ ইত্যাদি জায়গায় বদলি হতে থাকলে ফ্যানি ও সাথে সাথে ডেরা বাঁধতে থাকেন স্বামীর সাথেই।

    ফ্যানি কলকাতায় এসেছিলেন ১৮২২ এর নভেম্বরে। চব্বিশটা বছর ধরে ঘুরে বেরিয়েছেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে। সেসময়ের কলকাতার প্রচুর ছবি ফ্যানি এঁকেছেন তাঁর লেখায়।  বাইনাচ, চরক, দুর্গাপুজো ইত্যাদি সবই জীবন্ত হয়ে আছে তাঁর এ বইতে।



    ফ্যানি কিন্তু সত্যি সত্যিই ভ্রমণ লেখিকা ছিলেন। তিনি নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। পরবর্তীকালে ইংল্যাণ্ড থেকে তাঁর দুখণ্ডের “Wanderings of a Pilgrim in Search of the Picturesque” বইয়ের প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয় ১৮৫০ এ। ফ্যানি’র সেই বই থেকে আমাদের লক্ষ্মী ঠাক্‌রণের যে অধ্যায়টি রয়েছে তার থেকে কিছু অংশ না শুনিয়ে পারছি না। কতোখানি নিষ্ঠা নিয়ে সমস্ত কিছু অবলোকন করেছেন এই মহিলা তা দেখে সত্যি শ্রদ্ধায় মাথা আপনিই নত হয়ে আসে।

    “There is to be a raffle for an English imported chestnut horse I have taken a ticket, but not without first invoking Lachhmī, the goddess of beauty and prosperity She who is painted yellow, and dwells in a water-lily, the goddess of fortunate signs; she who holds the water-lily in her hands, she in whom all take refuge, the wife of Hŭrēē
    If a man be growing rich, the Hindoos say, “Lachhmi is gone to abide in his house : ” if he be sinking into poverty, “Lachhmi has forsaken him” If they wish to abuse a man they call himn “ Lachhmi-chara," i e luckless”

    শ্রী আর ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মী’কে মনেপ্রানে ডেকেই আমি একটা বিদেশি বাদামী ঘোড়া পাওয়ার জন্য একখানি লটারি-র টিকিট কাটি। হরি বা নারায়ণের স্ত্রী হলদে-বর্ণা এই লক্ষ্মী পদ্মের ওপরে আসীনা, যে পদ্ম জলের ওপরের ভেসে থাকে। তাঁর আরেক হাতেও জলপদ্ম।

    হিন্দুরা বলে থাকেন যে ধনবান ব্যাক্তিদের ওপরে লক্ষ্মীর নজর আছে। আর লক্ষ্মী যখন তাঁর কৃপাদৃষ্টি তুলে নেন তখন ধনবান যখন গরীব হয়ে যায়। তখন সে হয়ে যায় “লক্ষ্মী-ছাড়া”।

    ভাবুন, এক ইংরেজ তন্বী কী অপুর্ব সরসতায় ১৮২২ সালে তাঁর ডায়েরিতে লিখে রাখছেন আমাদের বাঙালির এই অতিপরিচিত “লক্ষ্মীছাড়া” শব্দখানি !  মানুষ, অঞ্চল আর ভাষাকে ভালো না বাসলে এই বাঙলা চলিত শব্দের ব্যবহার ওই সময়ে কি করে যে করলেন ফ্যানি – তা ভাবতে গেলেই আমার সমস্ত রোম খাড়া হয়ে উঠছে আজ।

    তিনি বইতে আরো লিখছেন – “ Vishnoo obtained this goddess of beauty from the sea, when it was churned by the good and evil spirits for the amrita, or immortal beverage Like Venus she arose beautiful from the foam of the ocean, ascended to the heavens, and captivated all the gods



    In the sketch which I copied from a native picture at Prāg, the beautiful goddess, seated in a water-lily, is bathing in a novel style Four elephants, from their trunks, are pouring the Ganges water over her 
    Oh! Lachhmī, send the chestnut horse to abide in my stables ! let me rejoice in Akbal! (good fortune)
    “From the body of Lachhmî the fragrance of the lotus extends 800 miles This goddess shines like a continued blaze of lightning!”

    - বিষ্ণু এই সৌন্দর্যের দেবীকে সমুদ্র থেকে পেয়েছিলেন। যখন শুভ এবং অশুভ শক্তি অমৃত পাবার আশায় সমুদ্র-মন্থন করছিলেন। সমুদ্র ফেননিভ শয্যা থেকে উঠে এসে এই দেবী স্বর্গে উঠে যান সমস্ত দেব-দেবঈকে বিমোহিত করে রেখে।

    - এ ছবি আমি কপি করেছি এক প্রাচীন ছবি দেখেই। লক্ষ্মীশ্রী দেবী রাজকীয় ভঙ্গীতে পদ্মফুলের ওপরে বসে স্নান সারছেন। চারটি হাতি তাদের শুঁড় দিয়ে গঙ্গাজল ঢালছেন দেবীর ওপরে।

    - ও লক্ষ্মী ! তুমি আমার আস্তাবলে এই বাদামী ঘোড়া এনে দাও। আমাকে আমার সৌভাগ্যে আনন্দিত করো !

    - লক্ষ্মী’র দেহ থেকে পদ্মের সৌরভ আটশ মাইল অব্দি পরিব্যপ্ত। এক অনির্বার জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে দেবীর থেকে।

    কি বলা যায় ফ্যানি-কে ? শুধুই ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানানো ছাড়া ?

    (সমাপ্ত)

    ##
    কৃতজ্ঞতা আর ঋণ -

    বই - বাঙ্গালীর ইতিহাস - আদি পর্ব - নীহাররঞ্জন রায় – ৪৯১ পৃঃ
    বই - বাংলার ব্রত – অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
    বই - দেবদেবীতত্ত্ব – ১ম খণ্ড – সতীশচন্দ্র শীল (পৃঃ ২২—২৮)।
    বই - প্রতিমা শিল্পে হিন্দু দেবদেবী - কল্যানকুমার দাশগুপ্ত (পৃ ১২১)
    বই - Wanderings of a Pilgrim in Search of the Picturesque - Fanny Parkes
    বই - বঙ্গীয় শব্দকোষ - হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
    বই - বাঙ্গালা ভাষার অভিধান - জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস।

    অন্যান্য বিভিন্ন সূত্র –

    লক্ষ্মীদেবীর কাহিনি - চিররঞ্জন সরকার – আর্কাইভ ডট ওআরজি।
    শ্রী শ্রী কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর খুটিনাটি – শুভ্র ভট্টাচার্য – বেঙ্গলি ওয়ানইণ্ডিইয়া ডটকম।
    বাংলার আকাশ জুড়ে কোজাগরী পূর্ণিমা এবং লক্ষ্মীসাহিত্য - মাহফুজ সাদি – কোলকাতা২৪ X৭ ডটকম।
    দেবী লক্ষ্মী ও কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা - রানা চক্রবর্তী – এখনখবর ডটকম।
    ভারতজুড়ে চেনা-অচেনা আটটি রূপ লক্ষ্মীর, পূজিত হয় পেঁচাও - সম্পর্ক মণ্ডল – প্রহর ডটইন।
    নানা রূপে লক্ষ্মী – স্বপনকুমার ঠাকুর – বেঙ্গলিকৌলাল ডটকম।
    কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা - প্রণব কুমার কুণ্ডু – প্রণবকে৩ব্লগস্পট ডটকম।
    পুরাণের অজানা লক্ষ্মী-কাহিনি – বঙ্গভারতীওয়ার্ল্ডপ্রেস ডটকম।
    ভারতের প্রথম ফারসি সংবাদপত্র বেরোল কলকাতা থেকে, প্রকাশক রাজা রামমোহন রায় – অরিত্র সোম। প্রহর ডটইন)

    ছবি ও সূত্রের জন্য - 
    লক্ষ্মীর প্রাচীনতম রূপের সন্ধানে - সুদীপ্ত পাল -- ইতিহাসআড্ডা ডট ইন।
    অবশ্যই গুগুল।

    ‘####’
  • আলোচনা | ০৯ অক্টোবর ২০২২ | ২৬৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন