এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • চৌখাম্বার চত্বরে - ৪

    সুদীপ্ত লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ২০ নভেম্বর ২০২৩ | ৫৬৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • “শিবো হে, শিবো হে , অ শিবো শঙ্কর হে - 
    হাড়মালা খুলে ফুলোমালা পরো হে,
    অ শিব শঙ্কর হে।
    হায় – হায় – হায় – হায় –
    ফুল যে শুকায়ে যায় –
    গলায় বিষের জ্বালায় শিবো জ্বরজ্বর হে!
    অ শিবো শঙ্কর হে”

    ১৯৯১-৯২ সাল হবে, ক্লাস টু সম্ভবতঃ। দূরদর্শনে তখন বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্মরণে (জন্ম বা মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে) ‘রেট্রোস্পেকটিভ’ হত, এতে মোটামুটি পাঁচ বা সাতদিন ধরে সেই অভিনেতা বা অভিনেত্রীর একটি করে চলচ্চিত্র দেখানো হত। তাতেই প্রথম বোধ হয় দেখে ফেলা ‘চাঁপাডাঙার বৌ’। সে ছবি দেখে আর কিছু সেই সময় বুঝি না বুঝি, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের এই গাজনের গানটা একেবারে মাথায় ঢুকে বসেছিল।  আসল কাহিনী পড়তে বা তার কাহিনীকারকে (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়) চিনতে আরও বহু বছর। আর একটা ছিল তরুণ মজুমদারের ‘নিমন্ত্রণ’ ছবির গান –

    ‘চ্যাং ধরে ব্যাং, ব্যাং ধরে চ্যাং,
    নাচো গনাই-এর বাপ গামছা মাথায় দিয়া
    অ শিব নাচো!...
    ভাঙ খায়, গাঁজা খায়, ভাঙ না পেলে চোখ ঘুরায়
    চোখ ঘুরায়ে মন ভুলায়, রসের নগরে যায় -
    রসের নগরে গিয়া, রসবতী সঙ্গে নিয়া,
    রঙ্গরসে দিন কাটায়’

    সুতরাং আমাদের বাংলার বুকে বসে এইসব ছবি, গান, গল্প পড়ে-দেখে-শুনে ছোটো থেকেই আলাভোলা নাদুস-নুদুস, মোটা গোঁফওলা ভূত-প্রেত-সাহচর্যে গাঁজা-ভাঙে অনুরক্ত ত্রিশূল আর ডম্বরু নিয়ে নৃত্যরত নীলকন্ঠ শিবের যে চেহারা মনের মধ্যে জন্ম নেয়, তার সাথে বলাই বাহুল্য এই উত্তরাখন্ডের পেশী-সর্বস্ব, প্রবল-পুরুষাকার সুকঠিণ শিবের মূর্তিগুলোর কোনোরকম সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া দায়। হয়ত স্থানভেদে এই পরিবর্তন, হয়ত বাংলার নরম-সরম জলবায়ু আর ঈশ্বর-কে নিজেদের বাড়ির লোক/পরমাত্মীয় মনে করে সেই অনুযায়ী তাকে আকার দেওয়ার চেষ্টা আমাদের শিবকে আলাদা করেছে। সেখানে গাড়োয়ালের রুক্ষ প্রকৃতি, দুর্গম পার্বত্য পরিবেশে জীবন-যাপনের কাঠিণ্য গড়ে তুলেছে হয়ত এই পেশীবহুল সর্বশক্তিমান শিবের রুদ্ররূপ।

    আজকের যাত্রা তুঙ্গনাথ, সেই শিবের-ই এক বাসস্থান! রাতে খোলা বুগিয়ালে স্যুইস ক্যাম্পের ভিতরে সব বন্ধ রেখেও ঠান্ডা সেভাবে দমানো যায় নি। একমাত্র কম্বল ছিল নিরাপদ আশ্রয়। ভোর হতে না হতেই ঘোড়াদের ঘন্টার টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙলো। বাইরে এসে দেখি আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে, ঘড়িতে সাড়ে ছ’টা। গতকাল রাতে নৈশাহারে ছিল গরম গরম রুটি, ঘন তুর ডাল আর পাঁচমিশালি সব্জী। রান্নাও ছিল বেশ ভালো! আমাদের ক্যাম্প থেকে কুড়ি-পঁচিশ পা নীচে নেমে গেলে এদের ক্যান্টিন। রাতে রীতমতো টর্চ জ্বেলে সে ক্যান্টিনে পৌঁছতে হয়। বললে আবশ্য টেন্টেও দিয়ে যায় খাবার, প্রতিটা টেন্টের বাইরে টেবিল-চেয়ার পেতে বসার ব্যবস্থা। সকালে ম্যাগি আর কফি দিয়ে প্রাতঃরাশ সারছি আর দেখছি প্রকৃতিকে, ঝকঝকে আকাশে কেদার, ভার্তেকুন্ট, থালায়সাগর, যোগিন, ভাগীরথী, বান্দরপুঞ্ছ সব সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে। আমাদের মধ্যে বোধ হয় একটা মানসিকতা ঢুকে গেছে সব সৌন্দর্য-কেই ‘মিনি সুইজরল্যান্ড’ বা ‘ভারতের সুইজারল্যান্ড’ নাম দেওয়া আর একে অপরের সাথে তুলনা করা! অথচ চোপতার এই সৌন্দর্য কল্পনার অতীত, খানিকটা ঘাসজমি আর ওক-পাইন-দেওদার নিয়েই তো সব নয়, স্তরে স্তরে এই সামনের যে পাহাড় উঠে গেছে আর দূরে এই যে প্রাচীরের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে হিমালয়, এ-জিনিস পৃথিবীতে আর কোথায়! প্রতিটা জায়গাকে যদি তেমন মন দিয়ে দেখা যায়, কারও সাথেই কারও মিল নেই। খাজিয়ার যখন গিয়েছিলাম, তখন-ও এই কথাই মনে হয়েছিল। আমরা আজকেও বড় ট্রলি এই ক্যাম্পসাইটেই রেখে যাবো, কাল বিকেলে ফিরবো আবার, থাকবোও এখানেই। সাড়ে সাতটায় রওনা দেওয়া গেল। প্রার্থনার পায়ের অবস্থা আজ বেশ কাহিল, তাই দুজনে ঠিক করলাম প্রার্থনা ঘোড়ায় যাবে, আর আমি হেঁটেই উঠবো। নামার সময় নাহয় দুজনেই একসঙ্গে হেঁটে নামবো। আমাদের তুঙ্গনাথের আশ্রয় আকাশগঙ্গা, প্রার্থনা কে সেসব বিশদ দিয়ে  পেমেন্ট-এর সব ছবি দিয়ে দিলাম যাতে গিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারে। চোপতার মূল রাস্তা থেকে নামতে যতটা অসুবিধে, উঠে যাওয়া তুলনায় সহজ। মূল রাস্তার একেবারে সামনেই প্রবেশদ্বার, সেখান থেকে পেল্লায় ঘন্টা দুলছে। তুঙ্গনাথের চড়াই বলে কথা, সামনে দেখাই যাচ্ছে তার বহর শুরু থেকেই। যাত্রা শুরু করে পঞ্চাশ পা যেতে বাঁদিকে একটা গুমটি ঘর, সেখানেই ওজন ক’রে সেই অনুযায়ী দাম দিয়ে পর্ছি নিয়ে ঘোড়া ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে। এর একপাশে বিরাট জায়গা জুড়ে দেখলাম আস্তাবল, শ’খানেক ঘোড়া-টাট্টু-খচ্চর।  টাকা মিটিয়ে পর্ছি নিতেই মাইক্রোফোনে ডেকে দেওয়া হল  মহাদেও কে, সঙ্গে এলো তার ঘোড়া ধান্নো, সত্যিই ঐ নাম।  প্রার্থনা উঠে বসতেই পায়ে কপ কপ শব্দ ক’রে উঠে চলল পথ ধরে। আমিও শুরু করলাম হাঁটা।
     
    শুরুর পথ 
     
    চোপতা থেকে তুঙ্গনাথ মন্দিরের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। অনেকে হয়ত মাইল আর কিলোমিটারে ভুল করে ফেলেন, বেশ কিছু ভ্রমণকাহিনীতে এই দূরত্ব পেয়েছি তিন কিলোমিটার, আসলে তা তিন মাইল। এখন অবশ্য তা স্মারক ফলক তৈরী করে রাস্তার পাশেই পরিষ্কার লেখা আছে। চোপতা থেকে তুংনাথ পাঁচ কিলোমিটার আর তুঙ্গনাথ থেকে চন্দ্রশিলা দুই কিলোমিটার (যদিও আগে পড়া ছিল দেড় কিলোমিটার মতো)। আর এই রাস্তায় সমতলে বা উৎরাই-তে হাঁটার কোনো প্রশ্ন-ই নেই। পথ উপরের দিকে উঠেই চলে, উঠেই চলে। আর এইটুকু রাস্তায় উচ্চতা বেড়ে যায় প্রায় ৩০০০ ফুট। তবে পথ পুরোটাই পাথর দিয়ে গাঁথা, আর রাস্তা ভুলের কোনো সম্ভাবনাই নেই, কারণ রাস্তা ওই একটাই। চলতে শুরু করার সময় বেশ জঙ্গলের ছায়ায় রাস্তা এগোতে থাকে। প্রায় এক কিলোমিটার মতো চলার পর একটা বিস্তীর্ণ সবুজ বুগিয়াল রাস্তার বাঁ-পাশে। এই জায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর। সামনে চৌখাম্বা থেকে লম্বা হয়ে বিস্তীর্ণ গিরিশ্রেণী আকাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে, মেঘমুক্ত আকাশে যেন মুক্তোদানারা হিমালয়ের কিরীটে জ্বলজ্বল করছে, তারপরে স্তরে স্তরে পাহাড়ের খাঁজ নেমে এসে মিশে গেছে ওক,দেওদার, রডোডেনড্রনের বনানীতে আর সেই বনানী এসে মিলেছে এই প্রশস্ত তৃণভূমির (বুগিয়ালের) প্রান্তরে। চোখ জুড়িয়ে যায় দেখে, তুঙ্গনাথ ওঠার শ্রান্তি ভুলিয়ে দেয় এই দৃশ্যই, আর পুরো যাত্রাপথে রাস্তার বাঁপাশ জুড়ে এই পাহাড় আর ঐ শিখর-রাই সাথী হয়। চৌখাম্বা-কে দেখে মনে হয় রাজা তার চারপাশে মন্ত্রী-সান্ত্রী-কোটাল নিয়ে রাজসভা বসিয়েছেন, আমরা চলেছি রাজসন্দর্শনে! উপঢৌকন কী-ই বা দেবো, কৃপণ কবিতা মনে পড়ে – ‘তোমায় কেন দিই নি আমার সকল শূন্য করে।‘
     
     বুগিয়াল (এই ছবি নামার সময় , বেলা বেড়েছে তাই এত সুন্দর রোদ)

    ওই নীচে বুগিয়াল , উপর থেকে 


    এই বুগিয়ালের আশে পাশে কিছু দোকান রয়েছে, তবে বুগিয়ালে নামা বারণ, কারণ লোকজন নেমে পিকনিক করে, প্লাস্টিক ইত্যাদি বর্জ্য ছড়িয়ে নোংরা করে আসে, উত্তরাখন্ড সরকার এই ব্যাপারে এখন বেশ কড়াকড়ি করছে। ভালো, আমি ছবি তুলে আবার হাঁটতে থাকি। বুগিয়াল অবধি ছিল একরকম চড়াই, বুগিয়ালের পর চড়াই আরও কষ্টকর হয়, প্রতিটা বাঁক অনেকটা করে উপরে তুলে দিতে থাকে। দু’কিলোমিটার নির্ঝঞ্ঝাটে উঠে আসার পর ঘোড়াদের আনাগোনা শুরু হয়, ঘোড়াদের মতিগতি বুঝে রাস্তার অন্যপাশে সরে পথ করে দিই, নইলে ঘাড়ের উপরেই এসে পড়ে বুঝি। পথে তাজা বিষ্ঠার আলপনাও পড়তে থাকে, সেসব-ও যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলি। তবে তাও কেদারের পথের মতো এত অসহনীয় নয় যেটুকু শুনেছি। ধীরে ধীরে পথের আশেপাশের রডোডেনড্রনের সারি অদৃশ্য হতে থাকে। এখানে আশেপাশের কিছু দোকানে রডোডেনড্রন ফুলের (স্থানীয় ভাষায় ‘বুরান্‌শ্‌’) রস পাওয়া যায়; আসার সময় যেহেতু দুজনেই হেঁটে নামবো, সুতরাং তখন-ই সে-জিনিস চেখে দেখা যাবে। আপাততঃ চকোলেট আর পানীয় জলেই কাজ চালাই। এই সময়েই হঠাৎ চোখে পড়ল পথের প্রায় পাশেই পাথরের উপরে বসে থাকা এক মোনাল! দেখে ক্যামেরা তাক করার আগেই হৈ-হৈ শব্দ পিছন থেকে উঠে আসা একটি দলের ‘মোনাল’, ‘মোনাল’ করে। সে শব্দব্রহ্মে পাহাড় কেঁপে না উঠুক, মোনালটি ডানা মেলতে এক মুহূর্ত-ও দেরী করল না। যাক চোখে দেখেছি এই সান্ত্বনা! প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার মতো চলার পর ফাঁকা একটা জায়গায় এসে পড়ি, দুদিকেই পাহাড়ের ঢাল; উপরে তাকিয়ে এবার তুঙ্গনাথ মন্দিরের শীর্ষদেশ দেখতে পাই, তার উপরে চন্দ্রশিলা। এইসময় হঠাৎ বুঝলাম বাঁ পায়ের লিগামেন্টে টান ধরেছে। শেষ এক কিলোমিটার বেশ কষ্ট করে উঠতে হল ট্রেকিং পোলে ভর দিয়ে, পা ভাঁজ করতে গেলে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। পথের একেবারে শেষ মাথায় ঘোড়ার পথ শেষ, এর পর আর ঘোড়া যায় না। আর সেখান থেকে আর একটু উঁচুতে শ’খানেক মিটার পরেই মন্দির। এখান থেকে মন্দিরের যাওয়ার পথেই পর পর ছোটো ছোটো হোটেল চার-পাঁচটা, কালি-কমলিওয়ালার ধর্মশালা, মন্দিরের গেস্ট হাউজ এইসব। আর সারি দিয়ে খাবারের দোকান, তার সামনে থরে থরে তুঙ্গনাথের পুজোর সামগ্রী সাজানো। এখানে এই পুজোর সামগ্রী নানারকম মাপের ছোটো ব্যাগে বিক্রি হয়, ব্যাগের উপর মন্দির আর তার আশেপাশের পাহাড়ের সুন্দর ছবি বসানো। একটূ এগোতেই দেখি রাস্তার পাশে দু-তিন ধাপ নেমেই আমাদের আস্তানা আকাশগঙ্গা, আর সামনেই টেবিলে বসে রোদ পোহাচ্ছে প্রার্থনা। পিঠের ঝোলা  নামিয়ে চেয়ারে বসে রোদে গা এলিয়ে খানিক বিশ্রাম। সময় লাগলো ঘন্টা আড়াই, ঘড়িতে প্রায় সাড়ে দশটা। এখানে ঘরের ব্যবস্থা সাধারণ, তবে খান তিনেক কম্বল আর টয়লেটের অবস্থাও ঠিকঠাক। আর ঘরের আর একদিকে আর একটা দরজা, যেখান দিয়ে বেরোলেই বাইরের দিকে টানা লম্বা খোলা একটা বারান্দা, আর তার সামনেই মস্ত এক বুগিয়াল আর তুঙ্গনাথ আসার রাস্তা, শিখরশ্রেণী সব দৃশ্যমান। কিন্তু ঠান্ডার যা প্রকোপ, এই খোলা জায়গায় রাত্রে কি অবস্থা হবে কে জানে! যাক এবার তুঙ্গনাথের দর্শন করে আসা যাক। পুজোপাঠে দুজনেরই উৎসাহ/আগ্রহ না থাকলেও পুজোর সামগ্রী-সমেত ব্যাগ একটা কিনতেই হল, কারণ এটি স্মারক হিসেবেও বেশ আর শুধু ব্যাগ বিক্রি নেই! ব্যাগের দাম বেশ সস্তা-ই বলতে হবে , যতদূর মনে পড়ছে একশো বোধ হয়; এর ভিতরে আছে একটি নকুলদানার প্যাকেট, একটি ছোটো ছাড়ানো নারকেল, কিছু ফুল আর জয় কেদার লেখা একটি চেলির কাপড়।  এখান থেকে দশ পা গেলেই মন্দিরের সিঁড়ি। পথের দুপাশে বরফের পুরু স্তর, উপরের দিকে ঝুরো বরফ। গতকাল-ও নাকি ভোরের দিকে হালকা তুষারপাত হয়ে গেছে, তার-ই চিহ্ন চতুর্দিকে।
     
    ওঠার পথের সঙ্গীরা , ভার্তেকুন্টের পিছন থেকে থালায়সাগরের উঁকি
     
    কেদার-দর্শন (বাঁদিক থেকে থালায়সাগর - ভার্তেকুন্ট - কেদার - কেদার ডোম) 
      

    সুমেরু আর খর্চাকুন্ড 

     
    তুঙ্গনাথ, তৃতীয় কেদার। পঞ্চকেদারের (কেদারনাথ, মদ্‌মহেশ্বর, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, কল্পেশ্বর/কল্পনাথ) সবচেয়ে উচ্চতম অবস্থান এই তুঙ্গনাথ মন্দিরের, প্রায় বারো হাজার ফুটের উপরে। সেইজন্যেই নাম তুঙ্গনাথ। পুরাণের গল্প অনুযায়ী, কুরুক্ষত্র যুদ্ধে জয়লাভ করার পর পান্ডবরা স্বজন-হত্যার পাপ ও শোক লাঘবের উদ্দেশ্যে হিমালয়ে এসে মহাদেবের তপস্যা করেন; এদিকে শিবও সহজে দেখা না দিয়ে পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। হঠাৎ মধ্যম পান্ডব ভীম তাঁর দেখা পেয়ে ধরে ফেলতে যান। শিব তখন মহিষের রূপ নিয়ে পাতালে লুকোতে গেলে ভীম তাঁর পিছনের অংশ ধরে ফেলেন। এর ফলে শিবের দেহাংশ মাটির বাইরে থেকে যায় হিমালয়ের পাঁচটি স্থানে। কেদারনাথে পশ্চাৎভাগ, মদ্‌মহেশ্বরে নাভি, তুঙ্গনাথে বাহু, রুদ্রনাথে মুখ, কল্পেশ্বরে জটা। শীতের সময় যখন মন্দির তুষারপাতের জন্যে বন্ধ হয়ে যায়, তুঙ্গনাথের মূর্তি (ডোলি) নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরের মুক্কুমঠে। পরের পাঁচ-ছয় মাসের জন্যে। মন্দিরের পাশেই আকাশগঙ্গার ঝোরার ক্ষীণ ধারা। ওপাশে ডানদিকের ফলকে চন্দ্রশিলা যাওয়ার দিক-নির্দেশ। সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ ওঠার পরেই বেশ প্রশস্ত চত্বর, মন্দিরের প্রবেশদ্বার, প্রবেশদ্বারের বাইরে জুতো রাখার ব্যবস্থা। কিন্তু সেসব নিজের দায়িত্বে রাখা। কেদারের যা সব গল্প শুনি, তাতে কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে আমরা ঠিক করলাম একজন করে ভিতরে যাবো, দর্শন করে চলে আসবো। জুতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস এই পথে, খোয়া গেলে চলবে না।  পরে প্রবেশদ্বারের ভিতরে ঢুকে আর-ও একটা খোলা জায়গা, তারই বাঁদিকে রেলিং-এর ধার ঘেঁষে বসাও যায়। সেখানেও লোকে জুতো রাখছে দেখে, সেটাই ভালো মনে হল, আর সেখান থেকে আট-দশ ধাপ উঠেই প্রকৃত মন্দিরের চত্বর।  এখন ভিড় অতটা নেই। প্রার্থনা গিয়ে ঘুরে এল, তারপর আমি উঠলাম, মন্দিরের সামনেই বাঁ-পাশে শিবের ষাঁড় নন্দীর মূর্তি, তারপর মন্দির। মন্দিরের দরজার চারিদিক দিয়ে লাল-নীল-হলুদ রঙের প্রলেপ।  আর মাথায় কাঠের কারুকাজ করা চাঁদোয়া, তাতেও লাল-নীল-হলুদের কাজ, সবার উপরে ধ্বজা। মন্দিরে ঢোকার মুখের উপরেই মুখ-ব্যাদান করা সিংহের মূর্তি। মন্দিরের ভিতরে দুটো অংশ - ঢুকে কিছুটা খোলা জায়গা, সেখানে বেশ কিছু বহু পুরনো পাথরের মূর্তি, হরগৌরী, এমনকি এক বুদ্ধের মূর্তিও রয়েছে। তারপর গর্ভগৃহ, ভিতরে আলোর ব্যবস্থা খুব কম। দুজন পূজারী দুদিকে বসে আছেন,  পূজারীর অনুমতি নিয়ে স্পর্শ করে দেখি, কঠিণ অথচ মসৃণ তুঙ্গনাথের লিঙ্গ, পুরাণ অনুসারে মহিষরূপী শিবের বাহুর অংশ। সামান্য তির্যক-ভাবে মাটিতে প্রবিষ্ট; অন্য চার কেদারের মূর্তিও রয়েছে। বাইরে এসে, মন্দিরের চারপাশ ঘুরে দেখি । মন্দিরের ডানপাশ ঘেঁষেই লাল রঙের ছোটো মন্দির, মহানন্দা পার্বতীর।  পঞ্চকেদারের প্রতীকী মন্দির, ভৈরবনাথের মন্দির। এর মধ্যেও চিন্তার কথা, এ এস আই-এর পরীক্ষায় সম্প্রতি উঠে এসেছে যে তুঙ্গনাথের মন্দির প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ডিগ্রী হেলে পড়েছে, আর মন্দিরের চাতালের অন্য ছোটো মন্দির বা স্থাপত্যগুলি আরও বেশী, প্রায় দশ ডিগ্রী হেলে পড়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান চলছে যদিও, কিন্তু ব্যাপার খুব সুবিধের নয়। চাতালে দাঁড়িয়ে মন্দিরের পিছনে তাকালে মনে হয় কেউ যেন যত্ন করে তুষার-ধবল শিখরশ্রেণী আর সবুজ-শ্যামল পাহাড়ের কারুকাজের চালচিত্র গড়ে দিয়েছে। আমাদের আলাভোলা সর্বত্যাগী বাঘছাল-সম্বল শিবের তপস্যার এই বুঝি শ্রেষ্ঠ স্থান! মন্দিরের বাইরের চাতালেই রেলিং এর ধারে রোদে বসে সেই দৃশ্য উপভোগ করি চুপচাপ। যাত্রীর সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে।  তুঙ্গনাথের জয়জয়কারে ভরে ওঠে প্রাঙ্গন, তীর্থযাত্রীরা তুঙ্গনাথ-দর্শনে দেহকষ্ট ভোলেন। আমরাও ফিরি।
     
    তীর্থপথ - তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলা 


    তুঙ্গনাথ মন্দিরের প্রবেশদ্বার 


    তুঙ্গনাথ মন্দির 


    তুঙ্গনাথের অন্যান্য মন্দির 

     
    মন্দিরের চাতাল থেকে 


    দুপুরে আলুর পরোটা দিয়ে পেট ভরানো গেল। এখানে সন্ধ্যে ছ’টা থেকে রাত  দশটা বিদ্যুতের ব্যবস্থা। হাত-মুখ ধুয়ে খানিক বিশ্রাম নিয়ে বাইরের সেই টানা বারান্দায় রোদে বসলাম দুজনে। আমাদের  পাশের ঘরে আরও এক দম্পতি এসে উঠেছেন, তাঁদের সাথেও আলাপ হল। সাড়ে চারটে বাজতেই হাওয়া বাড়ল আর তাপমাত্রা কমতে শুরু করল। সূর্যাস্তের সাথে পাহাড়ের গায়ে সাদা থেকে, হলুদ হয়ে, কমলা, শেষে লালচে আভায় রঙ্গমঞ্চের পর্দা নেমে এল। আমরাও ঘরে ঢুকে পড়লাম। কালও আমাকে একাই যেতে হবে চন্দ্রশিলা। তুঙ্গনাথ থেকে চন্দ্রশিলার চড়াই দেখে প্রার্থনা হাল ছেড়ে দিয়েছে। এদিকে আমার পায়ের পেশীর টানটা এখনো রয়েছে, পা ভাঁজ করতে অসুবিধে হচ্ছে। ভলিনি স্প্রে করে দেখবো কি হয় রাতে। রাতে আমাদের মেনু ছিল খিচুড়ি, আলু চোখা আর পাঁপড়। সে গরম গরম অমৃত পেটে চালান করে সকালের জন্যে প্রস্তুতি সেরে রেখে শুয়ে পড়লাম তাড়াতাড়ি।

    বারো হাজার ফুটের ওপর থেকে রাত সাড়ে তিনটেয় উঠে হাড়-কাঁপানো ঠান্ডায় চোগা-চাপকান চাপিয়ে বেরনো মুখের কথা নয়। পৌনে চারটেয় টর্চ জ্বেলে বাইরে বেরিয়ে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার! তবে কিছুক্ষণ পর বুঝলাম আকাশ পরিষ্কার আর চাঁদের আলো সঙ্গে আছে। কোজাগরী পূর্নিমার একদিন বাকি। কিন্তু পথ একেবারে জনমানবশূন্য। চন্দ্রশিলার জন্য কিছু মানুষ নিশ্চয়ই বেরোবেন, কিন্তু কাউকেই দেখি না। মন্দির পার হয়ে দাঁড়াই মিনিট পাঁচেক, যদি সঙ্গী জোটে। কিন্তু নাহ, কেউ নেই। অগত্যা পথ ধরে এগোই। রাস্তা একটাই, কিন্তু মিনিট দশেক চলার পর মনে হল এ-রাস্তা নীচের দিকে নামে কেন, চন্দ্রশিলা তো একেবারে খাড়া চড়াই হওয়ার কথা। কিন্তু পথ তো আর কই দেখলাম না! তাহলে হয়ত কিছুদূর নেমে তারপর ওঠা। কিন্তু তাও রাস্তা নামতেই থাকে! দাঁড়াই পাঁচ মিনিট। আগে এসে একবার পথটা দিনের বেলা দেখে যাওয়া উচিৎ ছিল; দেখি পেছনে আর একটি টর্চের আলো! যাক ঠিক রাস্তায় আছি তাহলে! এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা এগিয়ে আসেন, দুজনে হাঁটতে থাকি, কিন্তু তারপরেও রাস্তা নেমেই যায় নীচে, বেশ কঠিণ হয়ে ওঠে উৎরাই। এবার আমার সন্দেহ হয়, প্রায় নিশ্চিত হই ভুল পথ ধরেছি। ভদ্রমহিলা-কে সেকথা বলে উঠে আসতে বলি আমার পিছনে।  আন্দাজে প্রায় এক কিলোমিটার নেমে এসেছি মিনিট কুড়ি-তে। এবার আধা কিলোমিটার ফিরে আসি চড়াই পথে! তখনও ঘন অন্ধকার, শুধু টর্চ আর লাঠি ভরসা। মোবাইলের নেটওয়ার্ক তো নেই-ই! হঠাৎ দেখি আরও খান চার-পাঁচ টর্চ নেমে আসছে। এইবার মনে সাহস জাগে। এগিয়ে তাদের বলি ভুল পথের কথা। চন্দ্রশিলার পথ নির্ঘাৎ আগেই উঠে গেছে উপরে। সেই ভদ্রমহিলাও উঠে আসেন ততক্ষণে। আমি এগোই সামনে আর পথ খুঁজতে থাকি, পেছনে পাঁচ-ছ’জন আসতে থাকেন। কিছুদূর থেকে মন্দিরের প্রবেশদ্বারের আলো যখন দেখতে পাচ্ছি, তখন-ই দেখি রাস্তার পাশেই ঠিক পাথুরে সিঁড়ি উঠে গেছে, আমি বাকিদের দাঁড়াতে বলে কিছুটা উঠে সামনেই দেখি সর্পিল পথে আরও কিছু টর্চের আনাগোনা চন্দ্রশিলার দিকে! ইউরেকা! পাওয়া গেছে তাহলে। বাকিদের বলি এবার নির্ভয়ে উঠে আসতে, এটাই ঠিক পথ।  কিন্তু কি কঠিণ রাস্তা! একবার ভুল করে শর্টকাট নিয়ে ফেলে পা পিছলে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম। আবার ঠিক রাস্তায় পড়ি। সরু রাস্তা, টর্চের আলোয় সাবধানে পা ফেলে উঠি, গলা শুকিয়ে আসে, দম ফুরনোর জোগাড়, পায়ের ব্যথা কম হলেও কখনো-সখনো জানান দিয়ে যাচ্ছে, মনে জোর রেখে চলেছি, উমাপ্রসাদের লেখা মাথায় ঘুরছে “চন্দ্রশিলাই তুঙ্গনাথ-যাত্রার অক্লান্ত পরিশ্রমের শ্রেষ্ঠ দান।“ আমার পিছনে সেই দলটিও উঠে আসছে ধীরে ধীরে, কখনো তাদের টর্চের আলো ফেলে পথ বাতলে দিচ্ছি। প্রায় দেড় কিলোমিটার উঠে এসেছি, আকাশের সেই অন্ধকার আর নেই, আবছা আলোয় এইবার দেখতে পেলাম চন্দ্রশিলা, এসে পড়েছি প্রায়। চন্দ্রশিলা পৌঁছে সামনেই একটি ছোটো মন্দির, তার পাশ দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। তীব্র ঠান্ডা হাওয়ায় ততক্ষণে হাতের আঙুলে ফ্রস্ট বাইট হওয়ার জোগাড়! এতক্ষণে খেয়াল হয় যে হাতে গ্লাভস না পরেই বেরিয়ে এসেছি।  দেখি ততক্ষণে প্রায় পাঁচ-ছ’জন এসে জড়ো হয়েছেন, এমনকি ক্যামেরাও লাগিয়ে ফেলেছেন কেউ কেউ ট্রাইপড লাগিয়ে। একেবারে সামনে এসে দাঁড়াই। সূর্য ওঠার সময় সাড়ে ছ’টা। এখনো পঁয়তাল্লিশ মিনিট!   

    চন্দ্রশিলা! পুরাণমতে, দক্ষ রাজার সতী ছাড়াও আরও সাতাশজন কন্যা ছিলেন যাঁদের স্বামী ছিলেন চন্দ্র। কিন্তু এঁদের মধ্যে রোহিণীর প্রতি চন্দ্র ছিলেন কিছুটা বেশী অনুরক্ত। সেকথা জানতে পেরে দক্ষ চন্দ্রকে শাপ দেন। চন্দ্র দৃষ্টিশক্তি হারান। সেই দৃষ্টি ফিরে পেতে এই শিলার উপরে বসেই তিনি তপস্যা করে শিবকে তুষ্ট করে শাপমুক্ত হন। তাই এই শিলার নাম চন্দ্রশিলা। এরই সামনে দিগন্তপ্রসারী হিমালয় তার শিখরশ্রেণীকে নীল নির্মেঘ আকাশের নীচে ঢেলে সাজিয়েছে। বাঁদিকে বান্দরপুঞ্ছ থেকে শুরু করে ডানদিকে থারকোট পর্যন্ত মণি-মুক্তো-হীরে থরে থরে সাজিয়ে রেখেছে কেউ! অথবা এ যেন এক রাজসভা, যার রাজা যদি হয় চৌখাম্বা, তবে রাণী অবশ্যই নন্দাদেবী! ঠিক সামনে ঘোড়া পর্বত থেকে থারকোট পর্যন্ত শিখরশ্রেণী, এই শিখরশ্রেণীর পিছন থেকে সূর্যোদয় হবে, তাই এদের শরীরের আলোর এখনো কোনো আভাস নেই; চৌখাম্বা থেকে শুরু করে তার বাকি সঙ্গীসাথীরা বাঁপাশে আর বেশ কিছুটা সামনে, মনে হয় হাত বাড়ালেই যেন ধরা যাবে তাদের! ক্যামেরায় দেখে মনে হয় অনেক দূরে বুঝি, এত ছোটো মনে হয়, কিন্তু আসলে একেবারে সামনেই! এই শিখরেরা অনেক বেশী স্পষ্ট। লালচে আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে ধীরে ধীরে, সূর্য উঠে গেছে বোঝা যাচ্ছে, তার প্রথম আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে  চৌখাম্বার মাথা, কেদারের কাঁধ। কিন্তু এপাশে তার রশ্মির উপস্থিতি নন্দাদেবীর শরীরে, যদিও সূর্য এখনো হিমালয়-প্রাচীরের পিছনে। বেথারটোলি শৃঙ্গের ঠিক উপর দিয়ে বেরোবে বেরোবে করছে, কিন্তু সেভাবেই কেটে গেল আরও মিনিট পাঁচেক! প্রায় জনা পনেরো মানুষ, ত্রিশ জোড়া চোখ অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে; তারপর?

    অত:পর বিরিঞ্চিবাবা দুই বাহু প্রসারিত করে সূর্যকে নির্দেশ দিলেন, "ওঠ্, ওঠ্, ওওওওঠ্"। সূর্যবিজ্ঞান যাঁর হাতের মুঠোয়, তাঁর আহ্বানে অতএব সূর্যোদয় হল! ঐ বেথারটোলির উপর দিয়েই নন্দাদেবী, বেথারটোলি, নন্দাঘুন্টি, ত্রিশূল, দুনাগিরিকে সাক্ষী রেখে শতসহস্র উজ্জ্বল রশ্মির দ্যুতির সপ্তাশ্বরথে চড়ে তিনি আবির্ভূত হলেন। আর আমরা চন্দ্রশিলায় উপনীত মর্ত্যলোকের কীটপতঙ্গ সমুদয় চর্মচক্ষে সেই স্বর্গীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম! 

    সমবেত মানুষের আন্তরিক উল্লাসধ্বনিতে মুহূর্তের জন্যে চন্দ্রশিলা মুখর হয়ে উঠেও আবার আগের মতোই ধ্যানমৌন হয়ে গেল। কারণ সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত এই দৃশ্য, পরিবেশ হয়ত মানুষকে নিস্তব্ধ করে দেয়; সকলেই যেন বিস্ময়-বিভোর হয়ে সেই অলৌকিক ভোরের আস্বাদনে মগ্ন! জীবনে আর হয়ত কখনো আসবো না এখানে এভাবে, অথবা আসবো, কিন্তু এই যে সঞ্চয় মুঠো ভ’রে নিলাম হিমালয়ের প্রাঙ্গনে, চৌখাম্বার চত্বর জুড়ে প্রকৃতির এই যে  খেলা দেখে গেলাম, অমূল্য হয়ে রয়ে যাবে সেই অভিজ্ঞতা! একটু তফাতে গিয়ে একটা পাথরে বসে সেই শোভা দেখছিলাম চুপচাপ। এই যে সূর্যোদয় দেখলাম, এ কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো রঙের ছটায় রাঙানো ক্যানভাস দেয় না, এমনকি কার্তিকস্বামীতেও সেই রঙ কিছুটা দেখেছি। এখানের বৈশিষ্ট্য হল এই সারবদ্ধ পনেরো-কুড়ি-পঁচিশ হাজারী শিখরের উন্মুক্ত সমাবেশ আর তাদের মাঝখান থেকে পরিণত সূর্যের টুপ করে বেরিয়ে এসে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া! একেবারে সামনে বাঁদিকে - বাঁদিক থেকে ডানদিক বরাবর রয়েছে বান্দরপুঞ্ছ, গঙ্গোত্রী শিখরশ্রেণী, যোগিন, থালায়সাগর, ভার্তেকুন্ট, কেদারনাথ, কেদার ডোম, সুমেরু, খর্চাকুন্ড, ভাগীরথী, মন্দানি, সতোপন্থ, স্বচ্ছন্দ, জহ্নুকুট,  চৌখাম্বা। এত ওপরে বলেই স্বচ্ছন্দ আর সতোপন্থ দেখা দিয়েছে জহ্নুকুট আর মন্দানির মাঝে! আর ওপাশের দ্বিতীয় সারিতে চন্দ্রশিলার সরাসরি সামনে রয়েছে বাঁদিক থেকে ডানদিক বরাবর ঘোড়া পর্বত (বা গৌরী পর্বত), হাতি পর্বত, তারপর কিছুটা ছেড়ে গরুড় পর্বত, ত্রিশূলি, হরদেওল, দুনাগিরি, কলঙ্ক, দেও দামলা, ঋষিকোট, নন্দাদেবী, বেথারটোলি, রন্টি, নন্দাঘুন্টি, ত্রিশূল, থারকোট। বাকি দিকে যতদূর চোখ যায়, শুধু সারি সারি পাহাড়ের ঢেউ খেলে গেছে, কেউ সবুজ, কেউ ধূসর!  ৩৬০ ডিগ্রী উন্মুক্ত দশ দিগন্ত!
     
    বাঁদিক থেকে ডানদিক বরাবর - হাতি পর্বত, তারপর কিছুটা ছেড়ে গরুড় পর্বত, ত্রিশূলি, হরদেওল, দুনাগিরি, কলঙ্ক, দেও দামলা, ঋষিকোট, নন্দাদেবী, বেথারটোলি, রন্টি, নন্দাঘুন্টি, ত্রিশূল, থারকোট

     
    আর একটু কাছে ঃ বাঁদিক থেকে গরুড় পর্বত, ত্রিশূলি, হরদেওল, দুনাগিরি, কলঙ্ক, দেও দামলা, ঋষিকোট, নন্দাদেবী, বেথারটোলি, রন্টি, নন্দাঘুন্টি, ত্রিশূল, থারকোট

     
    নন্দাদেবী


    সবচেয়ে দূরে,বাঁদিক থেকে ঘোড়া (গৌরী) পর্বত হাতি পর্বত 


    চৌখাম্বায় প্রথম আলো 


    চৌখাম্বার চত্বরে 


    চন্দ্রশিলা থেকে - চৌখাম্বা থেকে বান্দরপুঞ্ছ 


    চন্দ্রশিলার গঙ্গা মন্দির 


    ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াই; এবার নামার পালা, নামার সময় দেখি পাথরের ধাপে ধাপে বেশ বরফ ছিল, ওঠার সময় উত্তেজনায় সেসব পায়ের নীচে অনুভব করিনি। এবার চোখে দেখে মুশকিল হল, কারণ পাথরের উপর ঝুরো বরফ পায়ের চাপে পিছল হয়ে গেছে, নামার সময় ঢালু পথে সমস্যা হবে। কিছুদূর নেমে আসি, এক জায়গায় এসে বেশ জোরেই আছাড় খেলাম, আর সেই জখম হাঁটুতেই চোট! উঠে তো দাঁড়ালাম কোনোক্রমে, কিন্তু সামনে রাস্তা এত তির্যক উৎরাই আর একটা সরু ধাপে এমনভাবে বরফ রয়েছে তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই! এদিকে পাশেই একেবারে খাদ। কি করব বুঝতে পারছি না। পা এগিয়ে দেখলাম বরফে বসছে না, পিছলে যাচ্ছে গ্রিপ থাকা সত্ত্বেও! ঠিক সেই সময়ে স্থানীয় দুজন নামছিলেন তাঁরা এসে সাহস দিলেন, একজন নীচে নেমে হাত ধরে নিলেন, খাদের ঠিক পাশে তিন-চার ইঞ্চির এক ফালি একটা শুকনো পাথরে পা রেখে নেমে এলাম। কিন্তু দু পা গিয়ে দেখি একটা পাথরে প্রচুর রক্ত, পরে একটু নেমে শুনলাম নামতে গিয়ে একজন ভদ্রলোকের পিছলে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে গেছে! সেই রক্ত তারপর প্রায় সব পাথরে এক-দু ফোঁটা পড়তে পড়তে গেছে। সেসব ধীরগতিতে পেরিয়ে এসে ফিরে এলাম সেই মন্দিরের কাছের রাস্তার বাঁকে, ঘরে যখন ঢুকছি, ঘড়িতে সকাল আটটা।

    ফেরার গল্প সামান্যই, সাড়ে আটটার মধ্যেই ম্যাগি আর কফি দিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়ি তুঙ্গনাথ থেকে। লক্ষ্যভেদ হওয়ার পর মনের আনন্দেই পায়ের ব্যথা ভুলে নীচে নামতে থাকি চোপতার দিকে আর প্রার্থনাকে চন্দ্রশিলার গল্প শোনাই, ছবি দেখাই, ভিডিও দেখাই। যাঁরা সবে উঠতে শুরু করেছেন তাঁদেরও সাহস যুগিয়ে বলি, এগিয়ে যান, পৌঁছে যাবেন! রৌদ্রোজ্জ্বল দিন, নামার পথে এক দোকানে দাঁড়াই, বুরান্‌শ্‌-এর রস পান করা বাকি আছে। শুধু রডোডেনড্রন ফুল নিংড়ে বানানো এই রস শুধু সামান্য চিনি আর জল দিয়ে পাতলা করে নেওয়া হয় প্রয়োজনমত, আর কোনো উপকরণ নেই। জ্যারিকেন থেকে সেই ঘন রস গ্লাসে ঢেলে দিলেন দোকানের কর্তা। আমাদের তো বেশ লাগলো খেয়ে, শুধু স্বাদ নয়, রডোডেনড্রন ফুলের সুবাস রীতিমতো আর টকটকে লাল রঙ! যাওয়ার সময় একসাথে ছবি তুলতে পারিনি, নামার পথে সে-আশও মিটিয়ে নিই দুজনে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই আবার আমাদের স্যুইস ক্যাম্পে এসে পড়ি। বাকি দিন চোপতার সৌন্দর্য উপভোগ করে আর তুলে আনা ছবি দেখেই  কাটালাম, তবে এদিন বিকেলে আমাদের ক্যাম্প চত্বর জুড়ে ঘোড়াদের দৌরাত্ম্য ছিল ভালোই, তাদের বুগিয়ালের ঘাসে গড়াগড়ি আর টগবগিয়ে দল বেঁধে ছোটাছুটির খেলা দেখেও কেটে গেল সময়!

    আগামীকাল রওনা হবো কনকচৌরি, উদ্দেশ্য কার্তিকস্বামীর মন্দিরের চাতাল থেকে সূর্যোদয় দর্শন।
     
    বিঃ দ্র ঃ সূর্যোদয়ের শুধুই ভিডিও আছে, প্রায় দেড় মিনিটের সে এখানে দেওয়া গেল না। সূর্যোদয়ের পর নন্দাদেবীর দিকটায় ছবি তোলা অসম্ভব এত তেজ আর উজ্জ্বল। অন্ততঃ ঘন্টা দুই বসে থাকলে সূর্য আরও উপরে উঠে গেলে তবেই সম্ভব। 
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ভ্রমণ | ২০ নভেম্বর ২০২৩ | ৫৬৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • দীমু | 182.69.183.54 | ২১ নভেম্বর ২০২৩ ০০:০০526316
  • এতগুলো শিখরের আলাদা আলাদা নাম দেখে মনে রাখাটাই একটা শক্ত কাজ। আমার তো দেখে সবই একরকম লাগছে। বুরান্‌শ্‌র রসটা একবার খেয়ে দেখতে হবে। yes
  • | ২১ নভেম্বর ২০২৩ ০৯:৫৫526340
  • দারুণ যথারীতি।
    এই মোনাল দেখতে পাবার জপ্ন্যই আমার তুঙ্গনাথ চন্দ্রশীলা যাবার খুব ইচ্ছে। ভারতের মধ্যে এখানেই সবচেয়ে বেশী মোনাল দেখা যায়। 
    তবে তুঙ্গনাথ যদিবা হয় চন্দ্রশীলা হবেই না যা বুঝলাম। 
    ভিডিওটা ইউগিউবে তুলে এখানে লিঙ্ক দিয়ে দে। 
    এই ব্লগটা বেশ ইনফর্মেটিভ হচ্ছে।
  • সুদীপ্ত | ২১ নভেম্বর ২০২৩ ১৯:৩২526351
  • দীমু, প্রায় বছর দশ আগে যখন প্রথম কুমায়ুন যাই, ত্রিশূল, নন্দাদেবী, পঞ্চচুল্লী বাদে আর প্রায় কিছুই চিনতাম না। ছবি তুলে এনেছিলাম, পরে দেখি সেসব বেশ উঠেছিল, একেবারে নন্দাঘুন্টি থেকে নীলকন্ঠ, এমনকি চৌখাম্বার সূর্যোদয় বিনসর থেকে!  তারপর ধীরে ধীরে উৎসাহ বাড়তে দেখলাম, শিখরগুলো আলাদা ভাবে চিনে নিলে বেশ লাগে, আর স্থানীয় লোকজন আর গাইডের ভুল তথ্য নিজে যাচিয়ে নেওয়া যায়। আমার সামনেই এবার এক গাইড তার পার্টিকে জহ্নুকুট-কে দেখিয়ে বলছিল নীলকন্ঠ আর পঞ্চচুল্লী চেনাচ্ছিল, অথচ পঞ্চচুল্লী এই অঞ্চল থেকে দেখাই যায় না! পরে সময় পেলে শিখরগুলো চিহ্নিত করে দেবো।
    বিনসর থেকে চৌখাম্বা
  • সুদীপ্ত | ২১ নভেম্বর ২০২৩ ১৯:৩৫526352
  • থ্যাঙ্কিউ দমদি, বৃষ্টি পড়লে বা বরফ থাকলে চন্দ্রশিলা থেকে নামা একটু সমস্যার। দেখি যদি সূর্যোদয়-টা আপলোড করে দিতে পারি
  • সুদীপ্ত | ২১ নভেম্বর ২০২৩ ২০:১৯526353
  • চন্দ্রশিলা থেকে সূর্যোদয়
     
  • kk | 2607:fb91:89d:9cdb:d93d:3ff2:1a91:6db5 | ২১ নভেম্বর ২০২৩ ২১:২৩526357
  • হ্যাঁ, খুবই ইনফর্মেটিভ হচ্ছে এই সিরিজটা। খুব স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে জায়গাটা চোখের সামনে, লেখা আর ছবি দুটোরই কারণে। উফ্্‌, এই যারা "মোনাল, মোনাল" করে চিৎকার করে মোনাল উড়িয়ে দেয়, শান্ত প্রকৃতিকে ডিস্টার্ব করে তাদের ওপর আমার বড্ড রাগ ধরে! অনেক জিনিষ আছে যেগুলো চুপ করে অনুভব করাটাই আসল। তা না, কী দেখলাম সেই নিয়ে এত চিলামিল্লি যে জিনিষটাই পুরো নষ্ট হয়ে গেলো!
  • সুদীপ্ত | ২২ নভেম্বর ২০২৩ ১৮:৪০526380
  • ধন্যবাদ kk! মোনালের ব্যাপারটায় বিরক্ত হয়েছিলাম ঠিক, কিন্তু রাগ করতে পারিনি, এই সবকিছুই চলার পথের সঞ্চয়, মোনালের বসে থাকা বা ডানা মেলে উড়ে যাওয়া দুই রকমই দেখা হলো। এই আর কি! 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন