• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ভূতপুরাণকথা : তারাশঙ্কর ও বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্য

    Chayan Samaddar লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ২৪২ বার পঠিত
  • প্রেমেন্দ্র মিত্রের ভূত শিকারি মেজকর্তা, প্রেতপুরাণ লিখতে চেয়েছিলেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু লিখেছিলেন ভূত-পুরাণ।এই হতে হতে না হওয়া বই, আর হয়ে ওঠা বই, দুয়েরই অস্তিত্বভূমির নাম বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্য। বাংলার ছোটোরা, একদিক থেকে অসম্ভব সৌভাগ্যশালী। কারণ, প্রায় প্রত্যেক শক্তিশালী সাহিত্যিক তাদের জন্য কলম ধরেছেন। তবে, প্রত্যেকে নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছেন, ছোটোদের জন্য লেখা বলতে কী বোঝায়। আর এগোনোর আগে আমরাও একবার যাচিয়ে নিই বরং, সাহিত্যের এই শাখার সংজ্ঞা। 
     
    শিশু সাহিত্য বা শিশু-কিশোর সাহিত্য বলতে আমরা কী বুঝি? সাহিত্যের একটি শাখা যা ছোটোরা পড়ে, তাই তো? কিন্তু, প্রথমেই আমি আপনাদেরকে বলতে চাই শিশু-কিশোর সাহিত্য নামের জিনিসটা মহা গোলমেলে। শুনে মনে হয়, শিশু আর কিশোর/কিশোরীদের জন্য লেখা সাহিত্যকীর্তি এই নাম ধরে। কিন্তু, ভেবে বলুন তো, বড়োদের লেখা, প্রকাশ করা, বিপণন করা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খরিদ করা বইগুলো কীভাবে ছোটোদের জন্য হয়? আসল কথাটি হলো, এই সব বইয়ে রক্তমাংসের শিশুদের ছায়া-ছোঁয়া খুব বেশি নেই। এই বইগুলো ধরে রেখেছে শৈশব সম্বন্ধে বড়োদের ধারণা। একটা আসল খুদে নিশ্চয়ই মডেল হতে পারে ন্যারেটিভের; কিন্তু, তার ওপর চড়ে লিখিয়ের কল্পনা-ভাবনার রঙ-রসান। সে হয়ে ওঠে একটা আইডিয়া। তাহলে, শিশু সাহিত্য পাঠের সময় এবং রচনা করার সময়, দয়া করে মনে রাখবেন, যার কথা পড়ে হাসছেন, ভাসছেন, রাগছেন, কাঁদছেন, যাকে অবলম্বন করে বা যার কথা ভেবে কথাশরীর গড়ছেন : সে আদতে এক ভাষাপ্রতিমা। আরেকটা কথা, শিশু কিশোর সাহিত্যে যে ছোটো ছেলে বা মেয়েটির কাছে রচয়িতাকে হামেশা ফিরতে হয়, সে হলো তাঁর নিজের বাল্যরূপ বা ছোটোবেলার বন্ধুবান্ধবরা। Every child in Children's Literature is an ex-child। যাপিত অভিজ্ঞতা ছাড়া শিশু_কিশোর সাহিত্য রচনা বা পাঠ কিছুই সম্ভব নয়। আর প্রাপ্তবয়স্করা ছোটোবেলার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সন্ধান পেতে পারেন একমাত্র অতীতে।
     
    এবার প্রশ্ন ওঠে, শিশু-কিশোর সাহিত্যের বিষয় বস্তু কী হবে? এর উত্তর হলো, প্রায় যা খুশি। অনেকে বলেন এই সাহিত্য হবে সহজ, সরল, উপভোগ্য। জটিল জীবনের সঙ্গে ছোটোদের আলাপ করিয়ে দেওয়ার কোনও দায় এ সাহিত্যের নেই। কিন্তু এই সংজ্ঞাটা একেবারে সঠিক বলা যায় না। ভেবে দেখুন, 'মহেশ' বা 'ছুটি' কি ছোটোদের কথা ভেবে লিখেছিলেন শরৎচন্দ্র আর রবীন্দ্রনাথ? অথচ এই দু'টো গল্পই ইস্কুলের ছেলেমেয়েরা পড়ে থাকে। 'ভোম্বল সর্দার' স্বীকৃত কিশোর সাহিত্য। ক্লাসিক বলে এর খ্যাতি। সেখানেও দেখি এই ভাগাভাগি খুব একটা মানা হয়নি। ভোম্বলের অস্থিরতা, বড়োদের ওপর তার রাগ, জীবনকে দেখার তার দৃষ্টিকোণ আর সবার ওপর এ বই এর ভাষার চলন -কোনওটাই ঠিক সরল নয়! এ বই আসলে দুই ধরনের পাঠকের সঙ্গে কথা বলে। এক, যারা শুধু গল্পটা পড়বে, মানে ছোটোরা; আর দুই, যারা এর রচনা কৌশলও নজর করবে সঙ্গে সঙ্গে, অর্থাৎ বড়োরা। এই দুই স্তরে কথোপকথন বহু সার্থক ছোটোদের জন্য লেখা সাহিত্যের মূল শক্তি। এটা বারবার দেখা যায় যে সত্যিকারের শিশু কিশোর সাহিত্য রচয়িতারা কখনও ছোটোদের বোধশক্তিকে তুচ্ছ জ্ঞান করেন না। পেট্রনাইজ করেন না তাদের। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে একেবারে হালের সুজন ভট্টাচার্য বা সৈকত মুখোপাধ্যায় কাউকেই এ কাজ করতে দেখিনি আমরা।
     
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একবার লিখেছিলেন, 'বড়োদের জন্য লেখা এমন গল্প যদি বেছে নেওয়া যায় যাতে কিশোর মনকে বিগড়ে দেবার মতো কিছুই নেই। বরং গল্প পড়ে বড়োদের জীবন সংঘাতের কমবেশি পরিচয় পেয়ে কিশোর মন নাড়া খাবে, বিস্ময় ও অনুসন্ধিৎসা জাগবে,সেরকম গল্প কিশোরদের পড়তে দিলে দোষ কি?' বুঝতেই পারছেন, তিনি খোকাপনা বাদ দেওয়া, মানুষের গন্ধ মাখা, জীবনের তাপে উত্তপ্ত লেখার কথা বলছেন - যা ছোটো-বড়ো সবার।
     
    প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে, ছোটোদের জন্য লেখা বইগুলোতে লেখার ধরনটা কী হবে? ১৯৯১ সালে, বারবারা ওয়ল বলেন, বাস্তব জীবনে বড়োরা ছোটোদের সঙ্গে যে ভাবে কথা বলেন, বইগুলোর কথককন্ঠও সেই ধারা অনুসরণ করে। ওয়ল তিনরকম বাচনভঙ্গীর কথা বলেছেন। প্রথমটার নাম ডাবল্ অ্যাড্রেস, যেখানে কথক একই সঙ্গে ছোটোদের এবং তার অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন। মানে কিছু কিছু জায়গা ছোটোদের জন্য আদৌ নয়। যাঁরা ছোটোদের পড়াশোনার দেখভাল করেন তাঁদের জন্য।এই হলো সেই ধরনের বই, যেগুলো প্রাপ্তমনস্ক হওয়ার পর পাঠ করে আপনি ভাবেন : আরে! এটা ছোটোবেলায় খেয়াল করিনি তো! সিঙ্গল অ্যাড্রেস সহজ ব্যাপার, এক্কেবারে ছোটোদের জন্য। এরপর আসে ডুয়েল অ্যাড্রেস। একই সঙ্গে, একই ন্যারেটিভের মধ্যে ছোটো আর বড়োদের সঙ্গে কথা বলা। আট থেকে আশি একই বই পড়ে নিজের নিজের মতো আনন্দ পাবে ঠিক। যে কোনও কালজয়ী শিশু-কিশোর সাহিত্য এই ডুয়েল অ্যাড্রেস ব্যবহার করবেই।
     
    এর থেকে একটা সরাসরি সিদ্ধান্ত টানা যায়। রতি-মৈথুন প্রসঙ্গ ছাড়া প্রায় যে কোনও বিষয় নিয়েই ডুয়েল অ্যাড্রেসে গল্প বলা যায়। অর্থাৎ, ছোটোদের লেখা - বড়োদের লেখা এই বিভাজনটা, নেহাৎই আরোপিত। ভাষা নির্মিত শিশুকে অ্যাড্রেস না করেও ডুয়েল অ্যাড্রেস সম্ভব। আর, ঠিক এখান থেকেই তারাশঙ্কর আর বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের সম্পর্ককে আমরা বোঝার চেষ্টা করতে পারি।
     
    একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করতে হবে। কিশোর সাহিত্যিক তারাশঙ্করের সঙ্গে আমার পরিচয় আট বছর বয়সে, ১৯৮০ সালে। হাতে এসেছিল দেব সাহিত্যকুটীরের একটি বই। ছোটোদের শ্রেষ্ঠ গল্প, লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।  প্রথম গল্প - কান্না। বিশ্বাস করুন, একদম হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলাম। চূড়ান্ত প্রাপ্তবয়স্ক পৃথিবীর কাহিনি। অন্ধকারে ভরা। ভাষাও তেমনি। কোনওভাবে ছেলে ভুলোনো নয়। অথচ, একটা গান বেজে চলেছে গল্প জুড়ে। আমার কান্না পাচ্ছে। পরে জেনেছিলাম, ঠিক নামেই তারাশঙ্করের একটি বয়স্কপাঠ্য উপন্যাস আছে। অর্থাৎ, একদম প্রথম থেকেই তিনি বড়ো-ছোটো-র আরোপিত ফারাককে অস্বীকার করেছেন।
     
    এই বইতে যত গল্প আছে, তার সব কটাই, পরে, দেব সাহিত্য কুটীরের বিভিন্ন পূজাবার্ষিকীতে পড়েছি। পড়ে একটা সিদ্ধান্তে এসেছি। তারাশঙ্কর সেই অর্থে ছোটোদের নিয়ে লিখতে চাননি। একমাত্র সুকু ও ভুকু ছাড়া। এছাড়া, চিনু মণ্ডলের কালাচাঁদই হোক, বা বিষ্টু চক্রবর্তীর কাহিনি, কাক পণ্ডিত হোক বা দিগ্বিজয়ী ও নগ্ন সন্ন্যাসী, কমল মাঝির গল্পই হোক বা ভুলোর ছলনা - সবই ছোটো, বড়ো সবাই পড়তে পারে। বিগত দিনের দুটি মানুষ, মনের আয়নায় নিজের ছবি, সাহিত্যতীর্থ নান্নুর বা বারো মাইল ভ্রমণ কথা তো রীতিমত কঠিন লেখা। তাঁর অমর পুণ্যগ্রন্থ দুটি - গণদেবতা আর পঞ্চগ্রাম থেকে ন্যায়রত্নের বলা গল্প দুটো যে তিনি ছোটোদের শুনিয়েছেন, সে আমি বুঝেছি পরে। এবং জটায়ু গল্পটা তো রীতিমতো রহস্য। পরে কখনো তাকে নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার ইচ্ছে রইল। কিন্তু, আমার বিচারে বাংলা কিশোর সাহিত্যে তারাশঙ্করের শ্রেষ্ঠ অবদান তাঁর ভূত-পুরাণ ট্রিলজি।
     
    ১৯৬৮, ৬৯, আর ৭০- এ যথাক্রমে দেব সাহিত্যকুটীর-এর পূজাবার্ষিকী ইন্দ্রনীল, শুকসারি আর মণিহার - এ প্রকাশিত ভূত পুরাণ, অক্ষয়বটোপাখ্যানম্‌ এবং স্বর্গলোকে ভূমিকম্প এমন এক কাহিনি গড়ে তোলে  বাংলা সাহিত্যে যার কোনও জোড়া নেই।
     
    ভূত-পুরাণ নিয়ে কিছু বলার আগে আমাদের অপর একটি মানুষ সম্বন্ধে জেনে নিতে হবে। বস্তুত, তিনি না থাকলে তারাশঙ্কর এই লেখা লিখতেন কিনা সন্দেহ। তাঁর নাম যতীন্দ্র মোহন দত্ত বা যম দত্ত। ১৩৭০ সনের  যষ্টিমধু পত্রিকার জৈষ্ঠ থেকে চৈত্র এবং কথাসাহিত্য পত্রিকার ১৩৭৪ সনের পৌষ- ফাল্গুন ও ১৩৭৫ এর আষাঢ়-ভাদ্র সংখ্যায় তিনি ভূত নিয়ে তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছিলেন। ভূতদের উৎপত্তি, স্থিতি, লয় থেকে আরম্ভ করে, কুনি-বুনির গল্প পর্যন্ত। এখান থেকেই আমরা জানতে পারি মানুষ মরে যেমন ভূত হয়, তেমনি ভূত, পেত্নীর পরিণয় জাত সন্তানও ভূতই হয়। দুই পুরুষে খাঁটি ভূতের ভৌতিক কৌলিন্য খুব বেশি। ভূত মরে কী হয়? ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় তো বলেই গেছেন-মার্বেল হয়। মানুষ মরা ভূতের পরলোক গমনের ফলে সৃষ্ট মার্বেল দ্বারাই গয়ার চারিদিকে রামশিলা, প্রেতশিলা…প্রভৃতি সৃষ্টি হয়েছে। আর, দু’পুরুষের ভূত মরলে? যম দত্ত বলেননি।তবে উত্তরটা আমরা পেয়েছি। সে কথায় পরে আসছি। ভূতের ওজন কত? নীচের সমীকরণটি সমাধান করলেই জানা যাবে –
    dy/dxf(cx+iy)=(a+ib) √ni।
     
    তারাশঙ্কর এহেন মৌলিক গবেষণা, পত্রিকাগুলিতে পড়েছিলেন, না যম দত্তের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল, তা বলতে পারব না, তবে ভূত পুরাণে যম দত্ত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে উপস্থিত। এবং তাঁর গবেষণা থেকে অনেক উপাদান নিয়েছেন তারাশঙ্কর।
     
    বস্তুত, ভূত-পুরাণ আরম্ভই হচ্ছে গবেষণার কথা দিয়ে। যম দত্ত লেখককে রাবিশ কথা-কাহিনি লিখে সময় নষ্ট না করে, ভূত সংক্রান্ত যুগান্তকারী মৌলিক গবেষণায় মনোনিবেশ করতে বলছেন। এর ফলে, ধর্ম-এবং বিজ্ঞান-ইহকাল এবং পরকাল-জন্ম এবং জন্মান্তর-অদৃষ্টবাদ এবং নাস্তিক্যবাদ-স্পিরিচুয়ালিজম এবং কম্যুনিজম-এক কথায় আলো অন্ধকার দিন রাত্রি সমস্ত কিছুর দ্বন্দ্বের বা বিরোধের মীমাংসা হয়ে যাবে। খুব হালকা চালে, ছোটোদের জন্য লিখলেও গল্পের শুরুটা খুব একটা সরল নয়। যে দ্বন্দ্বের কথা বলা হচ্ছে, তা মানবজীবন আর সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। লেখক নিজেও তার বাইরে নন। অন্য কোথাও সমাধান সম্ভব নয় বলে, কথালোকে, ফ্যান্টাসির সাহায্যে, তিনি একজাতীয় সমাধান খুঁজছেন, আমরা দেখব। অবশ্যই, তিনি যে সব বাইনারির কথা বলেছেন, সেগুলো গল্পের জন্য বাড়িয়ে বলা। মৌলিক দ্বান্দ্বিকতা আসলে অন্য।
     
    দ্বন্দ্বটা দুটো দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে, এবং লেখকের মনোভূমিতে। ৩০ জুন, ১৯৩০-এ বন্ধু পরিমল রায়কে লেখা এক চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন,
     
    আমরা যখন ছোটো ছিলাম পরিমল,
    মনে কি নেই কী হতো?
    ইচ্ছে চলেই চলে যেতাম ইস্পাহান
    কটোপাক্সি, কিয়োতো।
    জ্যোছনা-রাতে দেখতে পেতাম পরিদের
    জানলা থেকে লুকিয়ে
    অন্ধকারে ভূতের পায়ের আওয়াজে
    রক্ত যেত শুকিয়ে।
    এখন-মোরা যেথায় আছি, দিনরাত
    আটকে আছি সেখানেই,
    চাঁদের আলোয় নাচে না আর পরিরা,
    ভূত-পেরেতের দেখা নেই।
     
    ভূত-পুরাণ ট্রিলজিতে তারাশঙ্কর আসলে দেখতে চান, সেই ভূত-প্রেত-পরী ভরা জগৎটায় আরেকবার ফেরা যায় কিনা। প্রাপ্তবয়স্ক মন নিয়ে, যম দত্তের সিউডো গবেষণার আড়ালে লুকোনও বিশুদ্ধ খেয়ালরসালো মজার পথ ধরে। ছোটোদের জন্য লিখতে গেলে, সেটাই তাঁর করা উচিত কিনা, তাঁর গবেষণার আসল বিষয় সেটাই।
     
    তাই তিনি ফেরেন তাঁর জন্মভূমি লাভপুরে, যেখানে রামাই ভূতের গল্প শুনেছিলেন ছোটোবেলায়। দেখা যায়, কুনি-বুনির গল্প আছে, রামাইয়ের অসামান্য গল্পটা আছে (তারাশঙ্কর সেটা আমাদের শুনিয়েওছেন) কিন্তু রামাই কোথাও নেই। নেই কালীবাবুর বাড়ির শিউলিগাছে থাকা ব্রহ্মদৈত্য, গাছটাও মরে গেছে; মরে গেছে সেই অশ্বত্থ গাছ যার আড়ালে বাস করত এক পেটুক ও বিনয়ী ভূত; নেই শ্যামাপদ মোদকের বাড়ির ভূত, নেই মামদোরা- নেই লেখকের ছোটোবেলার লাভপুর। কোথাও নেই।
     
    চণ্ডী বা ভারতচন্দ্রে পড়া ভূতের বর্ণনা কোনও সাহায্য করছে না। চারপাশে একটা কান্না শুনছেন লেখক, বিশ্বাসভরা হারানো ছোটোবেলার কান্না, তারা ভূত খুঁজছে। ঠিক এইখানটায় এসে, তারাশঙ্করের লেখনী ভূত গড়তে শুরু করে।
     
    তাঁর কল্পনা একটা স্থান গড়ে প্রথমে। স্বর্গের এলাকার শেষ প্রান্ত হলো মৃত্যুপুর যার সীমানা রক্ষা করে বইছে বৈতরণী নদী। এই নদীর দুই পারে একটা লোক- সেই লোকের অধিবাসীরা হলো কুলীন ভূত, যাদের কথা যম দত্ত লিখেছিলেন। এর নাম ভূতভুবনপুর বা ছিটভুবনপুর। এই ভূতলোকের জমিদার মহেশ্বর ভোলানাথ। তিনি এই জমিদারি পত্তনী দেন যমরাজকে। তিনি এর দারপত্তনী  দিতে চাইলে চিত্রগুপ্ত নিজের মাসতুতো ভাইকে সেটা পাইয়ে দেন। তিনি গত হলে দারপত্তনী পান মহিমার্ণবা গয়েশ্বরী ঠাকরুন। এরপর, তারাশঙ্কর কাহিনি গড়তে শুরু করলেন।
     
    আরও পড়ুন
    মালিক - Chayan Samaddar


    হারানো বিশ্বের কান্নায় তাঁর মনে প্রথমে জাগল কষ্ট, তারপর প্রাপ্তবয়স্কসুলভ রাগ। সব মিথ্যে। ভূত নেই। ছিল না কখনো। এমন সময় গয়েশ্বরী তাঁকে পিতৃশ্রাদ্ধে নিমন্ত্রণ জানালেন। লেখক প্রত্যাখ্যান করলেন তা। কারণ, তখন তিনি স্থির করে ফেলেছেন, যেহেতু তিনি তাঁর বাস্তুভূমিতে ভূতদের ডেকে সাড়া পাননি, তারা মিথ্যে। এখন, তিনি ভূত বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলবেন। সকলকে জানাবেন, নো গোস্টস, নো গোস্টস, অল গোস্টস মুর্দাবাদ।
     
    এরপর, একটা অপূর্ব সাহিত্যিক প্রকরণ ব্যবহার করেছেন তারাশঙ্কর। একদিকে তাঁর মন তাঁর ভবিষ্যৎ আন্দোলনের আগমনী গান রচনা করছে :
     
    মিথ্যা-মিথ্যা-বিলকুল মিথ্যা-।আ-
    ভূত প্রেত ব্রহ্ম-দত্যি-একদম মিথ্যা-। আ-
     
    অন্যদিকে, মনের অপর এক কোণে, তিনি মনে করছেন, তাঁর পিসিমার বলা গল্প। ভূতদের দৈনন্দিন জীবনের নিখুঁত কল্পনাচিত্র। ঠিক, এই যুক্তি-কল্পনার সন্ধিক্ষণে, গয়েশ্বরীর অনুচররা ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে তাঁকে, বা আরো পরিস্কার করে বললে, তাঁর এক কল্পসত্তাকে কিডন্যাপ করে। তিনি হাজির হন সেই লোকে, যেখানে সব রকম ভূত এখন বাস করে। লেখক তারাশঙ্করের হাসিভরা স্বর, ভৌতিক কণ্ঠ হয়ে ওঠে। গুরুগম্ভীর সাধু ভাষায় জানায়, অবিশ্বাসী, বিজ্ঞানমনা মর্ত্যলোকে যাওয়ার জন্য ভূতেরা এখন পাসপোর্ট পাচ্ছে না। তার মানে এই নয় যে, তারা নেই। তারা আছে কল্পনার মধ্যে। কথাসাহিত্যিক হিসেবে সেটা লেখক রামকালী শর্মা (এই ট্রিলজিতে তারাশঙ্করের পারসোনা)-র বোঝা উচিত ছিল। লেখকও একপ্রকার মেনে নেন, ভয়ের মধ্যে ভূতের বাস। শৈশবের স্মৃতি, অন্ধকারের ভয়ের মধ্যে সে থাকে।
     
    এরপর তারাশঙ্কর যা করেছেন, তা তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাঁর ষাটের দশকের সমকালকে তিনি আচমকা এনে ফেলেছেন, এই কিশোর সাহিত্যে। এরকম নিপুণ ডুয়েল অ্যাড্রেসের প্রয়োগ বড়ো একটা দেখা যায় না। রামকালী জানছেন, কুলীন ভূত মরে মার্বেল হয় না, মানুষ হয়। গয়েশ্বরীর গতাসু পিতা মর্ত্যে যাচ্ছেন। সেখানে ‘তিনি চোঙা প্যান্ট পরিবেন, ভূত প্রেত আঁকা জামা পরিবেন, সিগারেট খাইবেন, বিড়ি খাইবেন, ধেই ধেই করিয়া নাচিবেন, ট্রাম পোড়াইবেন, বাস পোড়াইবেন, হিপি হইবেন, হাংরি হইবেন, অ্যাংরি হইবেন…’। ভূতের দল এখন আত্মঘাতী হয়ে মানুষের ঘরে গিয়ে জন্মাচ্ছে। মানুষের বিজ্ঞানবুদ্ধি ভূতের ভয়কে নাশ করেছে। আর ভয় না পেলে, ভূত কায়া ধরতে পারে না। তাই, ভূতরা এখন একালের চোঙা প্যান্ট, কাকের বাসার মতো চুল, লিকপিকে চেহারার বঙ্গযুবার রূপ ধরেছে। এরা মানুষের পৃথিবীকে ভূতের পৃথিবী করে তুলতে বদ্ধপরিকর।
     
    তারাশঙ্কর এই লেখা লিখলেন ১৯৬৮তে। এর ঠিক ছয় বছর পর, যুক্তি তক্কো আর গপ্প ছবিতে সিনেমার ভাষায় একেবারে এক কথা বললেন ঋত্বিককুমার ঘটক – সারা বাংলায় ভূতের নাচ চলেছে। নাবালক-সাবালক দ্বন্দ্ব যে শিল্পভুবনে অনেক সময়ই অর্থহীন, একথার এর চেয়ে জোরালো প্রমাণ বোধহয় আর হয় না। কিন্তু, তারাশঙ্কর লিখছেন কথাসাহিত্য, যার উপজীব্য ‘কী হচ্ছে’ নয়; ‘কী হলে ভালো হতো’। তাই, রামকালীকে যখন মরজগৎ নাম ধরে ডাকে, গয়েশ্বরীর কল্পনাবিশ্ব, ফুস-ধা হয়ে যায়, বিলীন হয়। তারাশঙ্কর বলছেন, ভেতর-বাইরের সব ভূতের মোকাবিলা করতে পারে নিজের ওপর আস্থা, আর ধর্মবোধ। মানুষকে ভূত পারবে না।
     
    ট্রিলজির দ্বিতীয় গল্প অক্ষয়বটোপাখ্যানম্‌-এ এই বার্তা আরো স্পষ্ট। তারাশঙ্কর এখানে বুড়ো বটের আত্মার জবানীতে পরিস্কার বলছেন, শুধু ভূত নয়, মানুষের বিশ্বাস দেবতাও গড়ে।
     
    ‘রামকালীবাবু…দেবতা কেউ চোখে দেখেনি, স্বর্গে কেউ যায়নি-কেউ স্বর্গ থেকে আসেনি-কিন্তু দেবতা স্বর্গ পরকাল আর ভূত এরা জীবন্ত মানুষের রাজ্যে এক অদ্ভুত সাম্রাজ্যবাদ বিস্তার করে বসে আছে।’ 
     
    সাম্রাজ্যবাদ-ইম্পিরিয়ালিজম! তারাশঙ্করের ন্যারেটিভ এবার রাজনীতির সীমা ছুঁচ্ছে। তিনি লিখছেন, ধর্মের নামে ব্যবসার কথা, মেলা বসিয়ে উৎসবের কথা-আবার তার থেকে কিছু লোকের লাভ হওয়ার কথা। কিন্তু, যদি ধর্ম একজাতীয় এম্পায়ারই হয়, তবে তার রাইটিং ব্যাকের জন্যও প্রস্তুত থাকা উচিত। অক্ষয় বট উপাধ্যায় মানেন সে কথা। তাই তিনি বলেন,
    ‘হঠাৎ কাল পালটাল। মানুষ পরশমণির চেয়েও দামী মণি পেলে।
    বিজ্ঞান মণি।
    যে জ্ঞানের বলে আগের কালের সকল বিশ্বাসের ওপর আলো ফেলে বিশ্বাসের কালো অন্ধকার ঘুচিয়ে বিশ্বাসকেই মুছে দিলে।’
     
    ভূত-পুরাণের রামাইয়ের কী হয়েছিল এবার জানা যায়। এক অবিশ্বাসী মিছিলের শ্লোগান-ভূত-প্রেত মুর্দাবাদ-তাকে বেবাক নেই করে দিয়েছিল। সে শিমূল ফলের মতো ফেটে বিলীন হয়ে যায় নাস্তিতে।
     
    এই গল্পে দেখা যায় যে সব প্রাকৃতিক শক্তি, লৌকিক বিশ্বাস, এমনকি এই বুড়ো বট –যাকে লোকে ঠাকুর ভেবেছে- চিন্তিত। কারণ, মানুষ চন্দ্রলোক জয় করল বলে। এর মানে, চন্দ্রের দেবত্ব ঘুচবে, যেমন ঘুচেছে, পবন, বরুণ, অগ্নির। আদত ঔপনিষদিক একক ভগবানের তাতে কিচ্ছুটি যাবে আসবে না। কেবল ধ্বসে যাবে অনেকের তথাকথিত দৈবী মহিমা। তাদের আগুন, জল, হাওয়া, চাঁদ বা স্রেফ গাছ হয়ে থাকতে হবে। যেমন, মানুষ মানুষ হয়ে আছে।
     
    ফ্যান্টাসির পাখা (এখানে প্রলয়ঙ্কর ঝড় আর গাছের ডালে ঝোলা বাদুড়-চামচিকের পাখার ঝাপট)-তে ভর করে, অক্ষয়বট একটা শেষ চেষ্টা করে দেখেন, মানুষের আগেই চন্দ্রলোক জয় করে, প্রাচীন বিশ্বাসের জয় ঘোষণা করতে; কিন্তু, বিজ্ঞানের নিয়মেই উৎপাটিত হওয়া ছাড়া আর কিছু পারেন না। তাই, তিনি রামকালীর কাছে পরাজয় স্বীকার করে যান।
     
    এই পরাজয় সম্পূর্ণ হয়, ট্রিলজির শেষ লেখা স্বর্গলোকে ভূমিকম্প-তে। এ গল্প বিশুদ্ধ অ্যানার্কির। স্বর্গ, নরক, ভূতভুবনপুর সব এক হয়ে সৃষ্টি হয়েছে অলীকপুর। বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে দেবতাদের বাহনরা। মর্ত্যের অবিশ্বাসের ঢেউ এখানেও এসে লেগেছে। চূড়ান্ত নাস্তির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন স্বয়ং চার্বাক আর একজন, যিনি কার্ল মার্কস হলেও হতে পারেন। এখানে রামকালীকে আনা হয়েছে, এই অবস্থার ইতিহাস রচনা করার জন্য। দেখা যাচ্ছে, এখানে একটা পার্লামেন্ট আছে যেখানে সুরথ পরিণাম বিলের নতুন অ্যমেন্ডমেন্ট রচনা হতে চলেছে। প্রেসিডেন্ট পরমব্রহ্ম অবাঙমানসগোচর। তিনি ছাড়া ভাইস প্রেসিডেন্ট মহাশক্তি, লর্ড মেয়র অব স্বর্গধাম ইন্দ্র, প্রলয় এবং লয় মিনিস্ট্রির মিনিস্টার মহারুদ্র ও তাঁর মিনিস্টার অব স্টেট যম – এবং আরো সকলে উৎকন্ঠিত, লয় মিনিস্ট্রির ডেপুটি মিনিস্টার  মহারাজ সুরথ কী বলেন তা শোনার জন্য। ব্যাপার হলো, সত্য যুগে, এক লক্ষ বলি দিয়ে শক্তি আরাধনার পর স্বর্গে এসে সুরথ জানেন যে তাঁকেও এক লক্ষ কোপ খেতে হবে, কারণ, স্থিতি দপ্তরের মিনিস্টার এবং প্রাইম মিনিস্টার শ্রীহরি বলছেন, রেকর্ড রয়েছে যে,  তাঁর গিন্নি এবং ফিনান্স, ফুড এবং এগ্রিকালচারের মতো তিন তিনটে ডিপার্টপমেন্টের মিনিস্টার মহালক্ষ্মী একবার চৈত্র মাসে মর্ত্যভুমের এক বামুনের জমি থেকে একমুঠো তিলফুল তুলে, কানে আর চুলে পরেছিলেন বলে, ঝাড়া একটি বছর সেই বামুনের বাড়ি দাসীবৃত্তি করেন। সুতরাং সুরথকে জন্তুদের হাতে খাঁড়ার কোপ খেতেই হবে। এই হলো সুরথ পরিণাম বিল। কিন্তু, এর অ্যমেন্ডমেন্ট দরকার হলো কেন? কারণ, দেবতারা এতদিন তাঁদের বাহনদের সঙ্গে যা যা করে এসেছেন, তার জন্য, তাঁরাও এই বিলের আওতায় আসতে বাধ্য। বিশেষত এখন, যখন, মিনিস্টার অব এডুকেশন অ্যান্ড নলেজ সরস্বতী এবং তাঁর অধীনস্থ ডেপুটি মিনিস্টার বিশ্বকর্মার ইনফ্লুয়েন্সে মানুষ প্রমাণ করে ফেলেছে, দেব-দেবীরা প্রকৃতপক্ষে মানুষের বিশ্বাসের মূর্তি, মানে তাঁরাও মানুষের নিয়মেরই অধীন। সুতরাং গড়ুর, ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা, ব্রহ্মার হাঁস, যমের মহিষ, গণেশের ইঁদুর, এমনকি বীর হনুমান সকলেই নিজের নিজের হিসেব বুঝে নিয়ে, তাদের প্রভুদের পিঠে ওঠার অধিকার পাওয়ার অধিকারী।
     
    পার্লামেন্টে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে, তখন হরিণবাহন এক জ্যোতির্ময় পুরুষ বিধানালয়ে উল্কাবেগে প্রবেশ করে বললেন, মানুষ তাঁর অর্থাৎ চন্দ্রদেবের বুকের ওপর এসে নেমেছে, এই মুহূর্তে দেবতা-অপদেবতা সকলেরই অস্তিত্ব বিপণ্ণ।
     
    তখন পরমব্রহ্মের চেতনাতীত স্বর শোনা গেল,
    -তাহলে এই মুহূর্ত থেকে ‘ফুস ধা’ বিল পাস হয়ে গেল। সেই বিল অনুযায়ী ভূত, প্রেত, প্রেতিনি পিশাচ ডাকিনী হাকিনী অপদেবতা, উপদেবতা মায় সবাহন সব দেবদেবী ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর সব ফুস ধা হয়ে পরম ব্রহ্মে বা কিছুই না-তে মিশে গেলেন।
     
    স্বর্গ-নরক-দেবতা-ভূত গিয়ে রইল শুধু মানুষ।
     
    এই গল্পের মধ্যেও তারাশঙ্কর তাঁর ছোটোবেলায় শোনা গিন্নিমা ভূতের গল্প বলেছেন, বলেছেন চেনা ধোপা দুর্যোধন, আর মুনিশ সতীশের কথা –যারা সুরথ পরিণাম বিলের জন্য তাদের গাধা আর গোরুর দাসত্ব করছে। মানে, আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বাস যদি আকার দিতে নাও পারে, ভূত-দেবতা এঁরা কথাশরীর ধরতে পারেন।
     
    তাহলে, এই হলো ভূত-পুরাণ ট্রিলজি। তারাশঙ্করের সবচেয়ে বেশি সেল্‌ফ রিফ্লেক্‌সিভ আর বহুস্তরী কিশোর সাহিত্য। এই কাহিনিতে কোনও কিশোর-কিশোরী নেই, নেই তাদের দৃষ্টিকোণ।লেখক ছোটোবেলার পৃথিবীতে ফিরতে গিয়ে দেখছেন, সেখানে ফেরা যায় না; তিনি বড্ড বেশি বড়ো হয়ে গেছেন।  তাই, তাঁর কাহিনিবিশ্বে প্রাপ্তবয়স্ক চরিত্ররা পরিণতমনস্ক আচরণ করে, একটা বিশেষ দর্শন ও রাজনৈতিক বিশ্বাস নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়, তবু এই কাহিনি ছোটোদের উপভোগ করতে কোনও বাধা নেই। কারণ, তারাশঙ্কর বুঝেছেন, স্মৃতি-কল্পনার জাদুতে তাঁর ছোটোবেলা এখন একটা সুন্দর গল্প হয়ে গেছে। যে দ্বন্দ্ব দিয়ে ভূত-পুরাণ শুরু হয়েছিল, এইবারে তার মীমাংসা হলো। তিনি এখন নিশ্চিত, তাঁর ছোটোবেলায় শোনা গল্পগুলোতে, তাঁর অনাবিল আনন্দের স্মৃতিচারণায় ছোটোরা আনন্দ পাবেই।কুনি-বুনি, রামাই, গয়েশ্বরী, গিন্নিমাভূত, অক্ষয়বট উপাধ্যায়-এঁরা কাঁচা মনে পাকা ছাপ রাখবেনই। ভূত নেই তাতে হলো কী? তাদের গল্প শোনার আনন্দ থেকে ছোটোদের বঞ্চিত করছেন না তারাশঙ্কর। একই সঙ্গে শুধু সতর্ক করে দিচ্ছেন, যা তাঁর কচিকাঁচা পাঠক-পাঠিকা পড়ছে তা কেবলমাত্র গল্প-আর কিছু নয়। ভয়-কল্পনা আর গল্পে বাঁচে ভূত-ভগবান এটা যেন তারা না ভোলে।
    বড়োরা পড়লে, এই ট্রিলজি একেবারে নতুন চেহারায় ধরা দেবে তাদের কাছে। অর্থের নানা খাঁজ থেকে বিচ্ছুরিত হবে বোধের নানা রঙ।
     
    এই হলো সার্থক ডুয়েল অ্যাড্রেস করা শিশু-কিশোর সাহিত্য, যা বিভিন্ন বয়সী পাঠকের কাছে নতুন নতুন রূপে নিজেকে প্রকাশ করে।
     
    C.S.Lewis বলেছিলেন, ‘No book is really worth reading at the age of ten which is not equally (and often far more) worth reading at the age of fifty…’
     
    তারাশঙ্করের ভূত-পুরাণের ক্ষেত্রে এই কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।          
     
    (নির্মাল্য ওয়েব পুজোসংখ্যা ২০২০ তে প্রকাশিত)
  • বিভাগ : ব্লগ | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ২৪২ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৩:২৬498145
  • ইন্দ্রনীল, শুকসারি আর মণিহার এই তিনটেই আমার ৭২-৭৩ নাগাদ পড়া। গয়েশ্বরী ঠাকরুন আর যমদত্তের কথা মনে ছিল দিব্বি বড় হয়েও। ফলে যখন কল্যাণী দত্তের লেখায় যমদত্তের কথা পাই,  তখন বেশ খানিকটা খটকা লেগেছিল যে এঁর কথা তো গল্পে পড়েছিলাম, ইনি তাহলে সত্যিকারের মানুষ। কি কান্ড। আরো পরে যমদত্তের বইটা দেখে কিনি। 
     
    এই লেখাটা অতি চমৎকার লাগল। এক তো বিশ্লেষণটা পছন্দ হয়েছে। আর  দ্বিতীয়ত অনেক অনেকদিন বাদে তারাশঙ্করের লেখা নিয়ে আলোচনা দেখলাম, সেটা ভাল লাগার বিশেষ কারণ। 
  • Ranjan Roy | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৩:৫৭498148
  • সত্যিই অতি চমৎকার। বিশ্লেষণ বেশ ভাল লাগল।
    যমদত্তের একটা বই (স্মৃতিকথা) বোধহয় বৈজয়ন্ত অনেক আগে গুরুতে 'বিশুদ্ধ ভাট' বলে রেকমেন্ড করেছিল, বইমেলায় কিনে পড়ে বেজায় আনন্দ । দ বলতে পারবেন ওটাই কিনা, যাতে পেনেটি তে ইলেকশন ক্যাম্পেন এবং বৃটিশ জমানায় পুলিশের চাকরি করতে গিয়ে গোয়ালে গোবরের গাদায় লুকিয়ে থাকার গল্প রয়েছে।
     আমার নিবেদনঃ তারাশংকরের এই কিশোর সাহিত্য আমি পড়িনি। কারণ ১৯৬৮ থেকে ৪০ বছর বাংলা বই পড়া হয়নি, আমার অক্ষমতা।
    এখন ওই বইগুলি কোথায় বা কীভাবে পাওয়া যাবে যদি কেউ জানান! কোন সহৃদয় চন্ডাল!
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন