মহাকালের কালজয়ী কলম : শব্দ যখন বিপ্লবের অস্ত্রবিষয় : প্রবন্ধ
লেখক : শংকর হালদার শৈলবালা
রচনাকাল : ২১ জুন ২০২৬
ভূমিকা : অক্ষরের অগ্নিবাণ ও ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন
ইতিহাসের পাতায় মহাকালের বহমান স্রোতকে যারা লেখনীর মাধ্যমে নথিবদ্ধ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই কেবল ঘটনার দর্শক ছিলেন না; বরং তাঁরা ছিলেন পরিবর্তনের অগ্রদূত। বন্দুকের গুলি বা কামানের গোলার চেয়েও অনেক সময় বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে কাগজের বুকে কালির আঁচড়। কোনো একটি জলন্ত প্রতিবাদের ভাষা যদি সঠিক এবং সুতীক্ষ্ণ হয়, তবে তা একটি পুরো জাতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। পরিবর্তন রাতারাতি আসে না, কিন্তু সমাজ বা রাষ্ট্রে আমূল পরিবর্তন আনতে হলে সেই পরিবর্তনের উপযোগী ক্ষুরধার লেখনী অপরিহার্য। বিশ্বের ইতিহাস সাক্ষী, বহু বছর ধরে চলা অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল কবি-সাহিত্যিকদের এই বিপ্লবী মনন।
কাজী নজরুল ইসলাম : ব্রিটিশ রাজের ভিত কাঁপানো এক ‘বিদ্রোহী’
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম হলেন এক অনন্য ও প্রদীপ্ত দৃষ্টান্ত, যাঁর প্রতিবাদের ভাষা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে তাঁর কালজয়ী 'বিদ্রোহী' কবিতাটি রচনার পর তা সমগ্র ভারতবর্ষে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে।
> "আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
> বিষ্ণু করিব নিছক-ক্ষত্রিয়, করিব বিশ্ব শান্ত!"
>
নজরুলের এই অগ্নিগর্ভ বাণী কোনো সাধারণ পঙ্ক্তি ছিল না, এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক মহাকাব্যিক ডাক। তাঁর 'অগ্নি-বীণা' কাব্যগ্রন্থ, 'ধুমকেতু' ও 'লাঙল' পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধগুলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির রাজনীতি ও শাসনতন্ত্রকে চরম সংকটে ফেলে দিয়েছিল। ফলস্বরূপ, তাঁর 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতার জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয় এবং তাঁর একাধিক গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু লিখনের মাধ্যমে যে গণ-আন্দোলন ও মানসিক জাগরণ তিনি তৈরি করেছিলেন, তার সফলতা এসেছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রতিটি ধাপে।
বিশ্ব ইতিহাসের আয়নায় বিপ্লবী সাহিত্যিক ও ঘটনার বিবর্তন
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শুধু বাংলায় নয়, বিশ্বজুড়ে শোষণের বিরুদ্ধে সাহিত্যিকেরা অস্ত্র হিসেবে তুলে নিয়েছিলেন তাঁদের কলমকে:
নীলকরদের অত্যাচার ও দীনবন্ধু মিত্র : ১৮৬০ সালে রচিত দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটকটি ছিল বাংলার নীল চাষীদের ওপর ব্রিটিশ ও শোষক শ্রেণীর নির্মম অত্যাচারের এক জীবন্ত দলিল। এই একটিমাত্র নাটক সমকালীন শিক্ষিত সমাজকে এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে, তা নীল বিদ্রোহের আগুনকে আরও তীব্র করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারকে নীল কমিশন গঠন করতে বাধ্য করে।
ফরাসি বিপ্লবের নেপথ্যে ভলতেয়ার ও রুশো : ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব কিন্তু একদিনে বা শুধু অস্ত্রের জোরে হয়নি। তার বহু বছর আগে থেকেই ভলতেয়ার, জঁ-জাক রুশোর মতো দার্শনিক ও লেখকদের লেখনী মানুষের মগজে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বীজ বুনে দিয়েছিল। রুশোর 'সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' গ্রন্থের প্রথম বাক্য— "মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত" —ইউরোপের রাজতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
রুশ বিপ্লব ও মাক্সিম গোর্কি : ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পটভূমি তৈরিতে মাক্সিম গোর্কির কালজয়ী উপন্যাস 'মা' (Mother) এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, লড়াই এবং আত্মত্যাগের সেই নথিবদ্ধ কাহিনী রাশিয়ার সাধারণ মানুষকে জারের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
উপসংহার : অনাগত ভবিষ্যতের পাথেয়
পরিশেষে বলা যায়, বাস্তব পরিস্থিতিকে কেবল মেনে নেওয়া নয়, বরং তাকে অক্ষরের ফ্রেমে বন্দি করে প্রতিবাদের সঠিক ভাষা দেওয়াই হলো একজন প্রকৃত সাহিত্যিকের ধর্ম। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কিংবা বাংলা ভাষা আন্দোলনের মতো বিশাল সাফল্যগুলো অর্জিত হয়েছিল, কারণ পর্দার আড়ালে থেকে কবি-সাহিত্যিকেরা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে অধিকারের চেতনাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। ২০২৬ সালের এই দাঁড়িয়েও আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন—সমাজকে বদলাতে হলে, মানুষের চিন্তায় রূপান্তর আনতে হলে, আজও কাজী নজরুল ইসলাম বা মহর্ষি বাল্মীকির মতো সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভীক লেখনীর কোনো বিকল্প নেই। নথিবদ্ধ হওয়া এই বিপ্লবী ইতিহাসই অনাগত প্রজন্মের পথ দেখানোর একমাত্র বাতিঘর।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।