• হরিদাস পাল  বইপত্তর

  • সমরবাবুর বৃত্তান্ত

    Chayan Samaddar লেখকের গ্রাহক হোন
    বইপত্তর | ২২ নভেম্বর ২০২১ | ১৫৯ বার পঠিত
  • "ঘুণধরা আমাদের হাড়,
    শ্রেণী ত্যাগে তবু কিছু
    আশা আছে বাঁচবার" -

    কবি সমর সেন বারবার চেয়েছিলেন সাধারণ মধ্যবিত্ত চেতনাকে অতিক্রম করতে। তাঁর একান্ত কামনা ছিল,

    "তিলকে তাল করার ভ্রান্তি পার হয়ে
    আত্মকরুণার ক্লান্তি পার হয়ে
    সহজ জীবনে সহজ বিশ্বাসে ফেরা।"

    কিন্তু গত শতকের সত্তরের দশকে নিজের জীবনের দিকে চেয়ে তাঁর মনে হয় : "জনগণের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ছিল না, পরিধি ও পরিবেশ ছিল মধ্যবিত্ত। আমার ছাত্রাবস্থায় বাবা বলতেন আমার বন্ধু বান্ধব সবাই স্বচ্ছল। কথাটা ঠিক।" (বাবু বৃত্তান্ত)।

    বিংশশতকের তৃতীয় ও চতুর্থ দশক। ইওরোপীয় আধুনিকতার ঢেউ এসে পৌঁছেছে বাংলায়। খণ্ডিত মহাবিশ্বে টুকরো হওয়া 'আমি'কে নিয়ে বিভ্রান্ত কবি সাহিত্যিকরা। ব্যক্তিপরিচয় ও শ্রেণী পরিচয়ের দ্বন্দ্ব একই সত্তার মধ্যে। মার্কস, ফ্রয়েড, ইয়ুঙের প্রভাবে নিজেকে খুঁড়ে, বা সামূহিক অবচেতনার অংশ হিসেবে ধরে অথবা বৃহত্তর এক সামাজিক প্রেক্ষায় ক্ষুদ্র 'আমি'কে স্থাপন ক'রে এক আত্মন নির্মাণ প্রয়াস দেখা যাচ্ছে বাংলা সাহিত্যের শাখা, উপশাখায়। এই 'আত্মন' ও 'নির্মাণ' শব্দদুটি খুব জরুরী। এদের কাছে আমরা পরে ফিরব। এই মুহূর্তে আমরা ভাবছি ব্যক্তিসত্তার ভেতরে চলা দ্বন্দ্ব নিয়ে যে দ্বন্দ্ব জন্ম দেয় এক সংশয়ী আত্মসচেতনতার। এই সংশয়ই তার কন্ঠস্বর খুঁজে পায় সমর সেনের আত্মচরিত বাবু বৃত্তান্ত-তে। ছত্রে ছত্রে তার শ্লেষ ; আত্মকথনের নামে আত্মরতিপরায়ণতাকে ব্যাঙ্গ; নিজের শ্রেণীচরিত্র নিয়ে কুন্ঠা এবং তার ফলে এক সদাজাগ্রত আত্মসমালোচনা। অন্যভাবে বলতে গেলে, ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে অস্থির, উত্তাল ত্রিশ, চল্লিশের দশকের স্মৃতিচারণার সময় যাতে কিছুতেই তাঁকে 'বাবু' বলে মনে না হয় তার জন্য লেখক আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেন।

    এখান থেকেই আমাদের ভাবতে শুরু করতে হবে। বুঝে নিতে হবে 'বাবু' শব্দের অর্থ। প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে বঙ্কিমচন্দ্রের সুপরিচিত সংজ্ঞাটির বিস্তৃত আলোচনা আমরা করছি না কারণ আপনাদের প্রত্যেকের তা মনে আছে। কিন্তু, এর ব্যবহার আমাদের করতে হবে। যাই হোক, আরম্ভে আমরা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শব্দকোষ-টা একবার দেখে নিই। এই অভিধান বলছে যে 'বাবু' শব্দের উৎস মুণ্ডারি এবং এর মানে গ্রামাধ্যক্ষের ছোটোভাই। তাহলে, উৎপত্তিস্তর থেকেই শব্দটির গায়ে একটা ক্ষমতার গন্ধ মাখানো আছে। এ কথাটিও আমাদের যথাকালে মনে করতে হবে। এবার একবার বঙ্কিমের 'বাবু' কে মনে করুন। ইংরেজের কাছে বাবু মানে কেরাণী, গরীবের কাছে এর মানে বড়োলোক, ভৃত্যের কাছে এর মানে প্রভু। কিন্তু, বঙ্কিমচন্দ্র এদের কাউকেই আক্রমণের লক্ষ্য করেননি। তাঁর কাছে বাবু মানে অনাচারী, অপদার্থ কুলকজ্জ্বলের দল। ১৮৭২ থেকে '৭৩ এর মধ্যে এই রচনা বঙ্গদর্শনে প্রকাশ পায় এবং 'কৌতুক ও রহস্য' গ্রন্থভুক্ত হয় ১৮৭৪ সালে। ঐ বছরেরই জুলাই মাসে তাঁর 'গ্রামবার্তা প্রবেশিকা'য় কাঙাল হরিনাথ 'বাবু' নামে এক প্রতিবেদন লেখেন। সেখানে তিনি বলেন যে তাঁর মতে এই শব্দ যাবনিক এবং এর কোনও প্রকৃত অর্থ আছে বলেও তাঁর মনে হয় না। তিনি আরও বলেন যে এটিকে তিনি একটি সম্ভ্রমসূচক শব্দ বলে মনে করেন। এরপর তিনি 'বাবু'দের চারভাগে ভাগ করেন। প্রথম পর্যায়ে আছেন ইংরেজের নকল নবিশি করা নব্যধনী সম্প্রদায়, দ্বিতীয়টিতে রয়েছেন ইংরিজিনবিশ রাজকর্মচারীরা, তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত ইংরেজের কাছে পাত্তা না পাওয়া কিন্তু ভীষণভাবে তাদের নজরে পড়তে চাওয়ার দল, আর সবশেষে আসেন শহরবাসী, অপব্যয়ী উমেদারগোষ্ঠী। এরপরই হরিনাথ এক আশ্চর্যকথা লেখেন। এই উমেদাররা চাকরির উমেদার নয়। খাওয়া পরা জোটাতে সে উমেদারি তো করতেই হবে। তাই, "আমরা সাধারণতঃ উমেদারদিগকে উল্লেখ করিতেছি না। যাঁহারা ভদ্রলোক এবং যাঁহাদিগের পারিবারিক চিন্তা আছে, যাঁহাদের অপমমানের ভয় আছে, যাঁহাদিগের মনুষ্যত্ববোধ আছে, তাঁহাদিগকে আমরা কিছু বলিতেছি না, তাঁহারা আমাদিগকে ক্ষমা করিবেন।" কাদের বলছেন তবে? যাদের ব্যবহার ভদ্র নয়, যারা গালাগালি শুনে বা দিয়ে লজ্জা পায় না, মদ খেয়ে রাস্তায় গড়ায় এবং বেশ্যাবাড়ি যায়। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে এই চতুর্থশ্রেণীর বাবুরা কতগুলো বিশেষ 'শীল' আয়ত্ত করতে পারলেই 'ভদ্রলোক' হয়ে যান। নীহাররঞ্জন রায় বলেন,"প্রত্যেক মানুষ বা মানবগোষ্ঠীই বাস করে কোনও দেশে বা কালে, এবং প্রত্যেক কালেরই কিছু কিছু নূতন প্রশ্ন থাকে, সমস্যা থাকে, দায়দায়িত্ব থাকে যা সেইকালেরই... সমসাময়িক কালের মানুষকে তার... সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয় এবং সেই সংগ্রামের ভেতর দিয়ে প্রশ্ন ও সমস্যার উত্তর খুঁজতে হয়, পেতে হয়, দায়দায়িত্বের উদ্ধার করতে হয়।" এই সংগ্রাম, সন্ধান, এই সচেতন গুণগত পরিবর্তন(Qualitative Change) প্রয়াস -এরই নাম শীলাচরণ যা ব্যক্তির অর্ধেক পরিচয়। বাকী অর্ধেক রয়েছে তার পারিবারিক ও সামাজিক আবহের মধ্যে বা কুলে। কুলশীল মিলে ভদ্রলোক। এখন প্রশ্ন হলো ভদ্রলোক বাবু কিনা? আমরা একবার হরিনাথের রচনার আরম্ভটা দেখে নিই :"আজকাল বাবুর অভাব নাই,রাজা হইতে কুলিমজুর পর্যন্ত সবাই বাবু।" আর একটু এগোলে দেখছি: "যদি ইংরাজদিগকের মধ্যে করোনার সাহেব(Esquire) হইতে পারিলেন; আমাদের মধ্যে রামা বাগদি যে বাবু হইবে, ইহাতে আশ্চর্য কি?" অতএব?

    অতএব,সদকুলজাত, সচেষ্টায় শীলিত ভদ্রলোক মধ্যবিত্তের দল যদি কুলিমজুর, রামা বাগদি অথবা ভৃত্যস্থানীয়দের কাছে 'বাবু' হয়ে ওঠেন তবে বঙ্কিম বা হরিনাথের আপত্তি নেই তত। কারণ, সেক্ষেত্রে এটি একটি সম্ভ্রমজনক অভিধা যাকে এই শ্রেণীর মানুষজন নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতার সময়ও ব্যবহার করে থাকেন। 'বাবু' বলতে যে ঘৃণিত সম্প্রদায়কে তাঁরা বোঝেন এই চাকরবাকরের বাবুরা সেই দলে পড়েন না। না পড়ুন কিন্তু নতুন অর্থে প্রয়োগ হলেও 'বাবু' শব্দের গায়ে ক্ষমতার গন্ধটা লেগেই থাকে।

    বঙ্কিমের বা হরিনাথের রচনার আঁতমহলে একটা টানাটানি খুব স্পষ্ট। আর এই দ্বান্দ্বিকতাই ঊনবিংশ শতকের 'মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক' সম্প্রদায়ের অন্যতম শ্রেণী চরিত্র। ইংরেজ প্রভুদের কাছে তাঁরা বাবু আবার তাঁদের ভৃত্যদের তাঁরা বাবু। তাঁদের ঘেন্নার পাত্র আবার আরেকদল বাবু। ইংরেজের বাবু ডাকের মধ্যে যে অসীম তাচ্ছিল্য তা যে তাঁরা বোঝেন না এমন নয়। কিন্তু, " For the middle class Bengali Babu of late nineteenth century Calcutta, the figures of the White Boss in a mercantile office or jute mill, the magistrate in court, the officer in the district, the police sergant or uniformed soldiers roaming the streets of Calcutta (invariably, it seems,in a state of drunkenness) were not objects of respect and emulation: they were objects of fear"(Partha Chatterjee)। মানে, উনিশ শতকের শেষ ভাগে, বাঙালি বাবুদের কাছে, আপিস বা চটকলের সাহেব, আদালতের গোরা ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা সদরের সাহেব হাকিম, পুলিশ সার্জেন্ট বা মাতাল গোরা সৈন্যরা ভয়ের পাত্র ছিল, ভক্তির নয়।

    সেই সময় উপন্যাসের চন্দ্রনাথ ওঝাকে মনে পড়ে? সে যেসব অসুখের চিকিৎসা করত তার মধ্যে একটা হলো সাহেবের ভয়। কী ছিল চন্দ্রনাথের চিকিৎসা পদ্ধতি? তার সহকারী সুলতান রোগীকে সাহেব সেজে ভয় দেখাত আরও বেশী করে। চোখ লাল ক'রে বলত, "ড্যাম পামকিন, ড্যাম কিউকাম্বার, ড্যাম, ড্যাম, ড্যাম..."। ভয়ের শেষ সীমায় পৌঁছে রোগী যখন টেবিলে রাখা মুগুর হাতে ঘুরে দাঁড়াত তখনই রোগ সারত তার। সুলতান হেসে বলত : " মুই ছুলতান সাহেব।" চন্দ্রনাথ এগিয়ে এসে মনে করিয়ে দিত যেমন কুকুর তেমনি মুগুর। আপনারা নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ভয় আর প্রতিরোধ দুটিকেই ভাষাস্তরে স্থাপন করেছেন? মনে আসছে নিশ্চয়ই চন্দ্রনাথের ইংরিজি ভাষার ওপর দখল? ঠিক এই উপায়েই প্রতিরোধ গড়েছিলেন কেশববাবু(সেন), বঙ্কিমবাবু(চট্টোপাধ্যায়)রা। ক্ষমতার ভাষা ইংরিজিকে আত্মস্থ ক'রে তাঁরা ইংরিজি কাগজ বার করছিলেন; ইংরিজিতে উপন্যাস লিখে হাত মকশো ক'রে বাংলা নভেল লিখছিলেন, জাতির ইতিহাস খুঁজছিলেন। একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক সমাজের বাসিন্দারা এক আত্মন (Self) নির্মাণও করে চলছিলেন। তারই দেখা পাওয়া যায় সেই সময়ে রচিত আত্মজীবনীগুলির মধ্যে। "Historians of Bengali Literature conventionally agree that the modern forms of the biography and the autobiography made their appearance in Bengal sometime in the middle of the nineteetnth century because of the emergence of the new concept of the 'individual' amnog the English educated elite।" কিন্তু, এই আত্মজীবনীগুলিও আত্মসচেতন। বস্তুতঃ রচয়িতারা জানতেন যে তাঁরা এলিট। এদিকে তাঁরা ইংরেজনির্মিত নেইশনহুডের ধারণা নিজের দেশে প্রয়োগ করতে চান। আর সেই দেশে রামা বাগদিদের সংখ্যাই বেশী। তাই সমাজ সংস্কারক রামতনুবাবুর (লাহিড়ী) জীবনীর আকারে লেখা হয় উনিশ শতকের বাংলার প্রথম সামাজিক ইতিহাস 'রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ'; সুরেনবাবু (সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়) ইংরিজিতে তাঁর আত্মজীবনী লেখেন বটে কিন্তু "the foremost political leader of Bengal at the turn of the century entitled his autobiography 'A Nation in Making'. The 'new individual', it would seem, could represent the history of his life only by inscribing it in the narrative of the nation।" এলিট বাবুদের আত্মজীবনী লিখতে বসে সংশয় তাহলে অনেক পুরনো এক সমস্যা।

    শ্রেণীচরিত্র নিয়ে সমর সেনের কুন্ঠার কারণ এবার আমরা বুঝতে আরম্ভ করেছি। একে তো তাঁর সাম্যবাদী মনোভাব তাঁর নিজের মধ্যবিত্ত অবস্থানকে বুর্জোয়া ব'লে চিনতে শিখিয়েছে। উপরন্তু ইংরিজি ভাষার ওপর তাঁর অধিকার প্রবাদপ্রতিম। Power Language এর ক্ষমতাবৃত্তের মধ্যেই যে তাঁর অবস্থান তা তিনি বিলক্ষণ জানতেন। এবং তাঁর পূর্বসূরিদের মতোই এই কারণে তাঁর অস্বস্তি ছিল। আর সেই কারণেই তাঁদেরই মতো এক বৃহত্তর ন্যারেটিভের মধ্যে তাঁর জীবনকাহিনিকে প্রতিস্থাপন করেছিলেন তিনি। নিজেকে বিশ্লিষ্ট ক'রে তিনি যেন দেখতে আর দেখাতে চাইছিলেন বাঙালি, মধ্যবিত্ত, ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধতা এবং তাদের যুক্তিহীন ব্যক্তিপূজার প্রবণতাকে। তাই তাঁর আত্মসমালোচনা: "আমাকে কেউ বিপ্লবী বললে মনে হতো - এবং এখনও হয় - যে বিপ্লবকে হেয় করা হচ্ছে। চিন্তায় ও কর্মে সমন্বয় আনতে না পারলে বড়ো জোর 'বিপ্লবী' সাপ্তাহিক চালানো যায় কিন্তু বিপ্লবী হওয়া যায় না।"

    এই কারণেই বাঙালি আইকনদের সচেতনভাবে আঘাত করা : "নাট্যমঞ্চে তখনো সম্রাট শিশিরবাবু তবে তাঁর অভিনয় নির্ভর করত মাদক মাত্রার ওপর। সীতা নাটক, প্রথম দৃশ্যে রামের অঙ্কশায়িনী সীতা (শ্রীমতী প্রভা), সিন উঠলো, রাম (শিশিরবাবু) জড়িত কন্ঠে বললেন, 'সীতা তুমি যদি রাম হতে আর আমি সীতা, তাহলে একটু জিরোনো যেত।' পট নেমে আসত।" এই উদ্দেশ্যেই রবীন্দ্রনাথকে রবিবাবু ব'লে সম্বোধন এবং সেই অমর উক্তি, "শান্তিনিকেতনে পরচর্চার আবহাওয়া দেখে বলতাম ব্রাহ্ম পল্লীসমাজ (বুদ্ধদেববাবুর 'সব পেয়েছির দেশ' অন্য সুরে লেখা)।"

    কিন্তু, এসব সত্ত্বেও সত্যের খাতিরে তাঁকে আরও কিছু লিখতে হয়েছে যা তাঁর কুল-শীলের পরিচয় দেয়। যেমন:

    "ঠাকুরদা [রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন] ঘোড়ার গাড়িতে বেহালা থেকে যেতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে"; "দিলীপ রায় পণ্ডিচেরী থেকে কলকাতায় এসে বিদগ্ধ ও সম্ভ্রান্ত সমাজে গানের আসর বসাতেন...তাঁর সূত্রে ঘরোয়া আসরে গান শুনেছি কেশরবাঈ ও হীরাবাঈ বরোদেকরের"; "একবার বিষ্ণুবাবু...আমাদের বৈঠকখানায় যামিনী রায়ের একটি ছবি টাঙিয়ে দিয়ে যান";

    "যামিনীদা'কে ছোটোবেলা থেকে চিনতাম"; "আমার বেশি অনুরাগ ছিল এলিয়টের প্রতি। 'Poetry is not a turning loose of emotion' কথাটি এখনও মনে পড়ে বাংলা কবিতা পড়লে"।

    রাধারমণবাবু (মিত্র)কে মননঋদ্ধ কিন্তু 'সহজ জীবনের, সহজ বিশ্বাসের' দিশারি হিসেবে মেনে নেওয়া; ক্রিস্টোফার কডওয়েলের উল্লেখ; সেকাল - একালের ছাত্র চরিত্র নিয়ে হঠাৎ তুলনায় যে সমর সেনের দেখা আমরা পাই, তাঁকে সসম্ভ্রমে সমরবাবু ছাড়া অন্য কোনও অন্তরঙ্গ প্রিয় সম্বোদ্ধনের কথা ভাবাই যায় না। তাঁর এই আভিজাত্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন বলেই রচনা থেকে গড়ে ওঠা মেধাবলে ক্ষমতাশীল এক শ্রেণীর প্রতিভূস্বরূপ লেখকের ব্যক্তিত্ব ও তাঁর উদ্দেশ্যের মধ্যে এক দ্বান্দ্বিক টানাপড়েন বাবুবৃত্তান্ত-এর কথাশরীর জুড়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়।

    বাবুবৃত্তান্ত-এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তার নাগরিকতা বা কলকাতা কেন্দ্রিকতা। তাঁর এক স্মৃতি চারণায় অশোক মিত্র বলেন: "In the Babu's Tale one can savour his passionate attachment to North Calcutta and the Sagar Manna Road in the neighbourhood of Behala।" রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন যে, বাঙালির উনিশশতক চর্চার প্রায় সবটাই কলকাতা কেন্দ্রিক। ১৮২৩ সালে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কলিকাতা কমলালয়' প্রকাশিত হওয়ার সময় থেকেই তার বিশেষত্ব ও মহিমার কারণে কলকাতাকে কৃষ্ণনগর, ঢাকা, মুর্শিদাবাদের মতো আরও পুরনো সব জনপদের ওপরে রাখাটা রেওয়াজ হয়ে ওঠে। "কলকাতা বনাম বাকি বাংলা - এমন একটা খাড়াখাড়ি ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছিল" উনিশ শতকে; গড়ে উঠেছিল বিখ্যাত ক্ষমতাকেন্দ্র 'কলকাতা কালচার' যার প্রবক্তা মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক বাবুর দল। বাবুবৃত্তান্ত-এর প্রতিটি শব্দ এই সাংস্কৃতিক নির্ধারক প্রসূত।

    এবার সাহস ক'রে বলার সময় হলো যে 'ভদ্রলোক বাবু' শব্দজোড়টি একটি 'নির্মাণ' বা 'Construct' হিসেবে এক 'সাংস্কৃতিক বয়ান' বা 'Cultural discourse' এর অংশ। ঊনবিংশ শতক থেকেই ভদ্রলোকদের আত্মজীবনীর 'আত্মন নির্মাণ' বা 'Construction of the Self' কে এই বয়ান নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৭৯ সালে আত্মজীবনী সম্পর্কে 'Autobiography as De facement' নামে এক বৈপ্লবিক প্রবন্ধ লেখেন Paul de Man। তাঁর মতে আত্মজীবনীতে প্রকাশ পায় যে, "all knowledge including self knowledge, depends on figurative language or tropes. Autobiographies thus produce fiction or figures in place of self knowledge they seek. What the author of an autobiography does is to endow his inscription within the text with all the attributes of a face in order to mask or conceal his fictionalization or displacement by writing" (Linda Anderson)। লিখন মানেই কথাবিশ্ব রচনা। ভাষা দিয়ে গড়া আত্মজীবনীর 'আত্নন'ও ভাষাসৃষ্ট। লেখক আত্ম - কথাকে নিজের মুখ ধার দিলেও কথাশরীরে সে মুখ শব্দে আঁকা ছবি হয়ে ওঠে। শব্দের নানান কোণ আর খাঁজ থেকে বিচ্ছুরিত হয় অর্থ ও বোধের বিভিন্ন মাত্রা। শোনা যায় বহুল স্বর: ঐতিহ্যের, ইতিহাসের, নির্ধারকের। তাই তাঁর জীবনকাহিনি লিখতে গিয়ে বহুস্তরী কাহিনিই রচনা করতে হয় সমর সেনকে। বয়ান ও লিখনের শক্তি তাঁর ব্যক্তিত্বকে করে তোলে এক প্রবাহিত বৃত্তান্তের অংশ। বাবু বৃত্তান্ত।

    ঋণস্বীকার :

    ১) উনিশ শতকের সামাজিক আন্দোলন, কাঙাল হরিনাথ ও গ্রামবার্তা প্রবেশিকা - ডঃ অশোক চট্টোপাধ্যায়।
    ২) The Nation and its Fragments - Partha Chatterjee।
    ৩) ভারতেতিহাস জিজ্ঞাসা - নীহাররঞ্জন রায়।
    ৪) A Way of Putting It - Asok Mitra।
    ৫) পরশুরামের নাগরিকতা - রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য।
    ৬) Autobiography - Linda Anderson।

     

  • আরও পড়ুন
    রণছোড় - Chayan Samaddar
    আরও পড়ুন
    মালিক - Chayan Samaddar
  • বিভাগ : বইপত্তর | ২২ নভেম্বর ২০২১ | ১৫৯ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন