• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • বৃত্তরৈখিক (২০)

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ৩০ জানুয়ারি ২০২১ | ৮৮৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ~২০~

    যদিও বিষম পানীয়ের ছড়াছড়ি, মহেশের নির্দেশে আজ জয়ি একবারেই টীটোটালর। অনেক কাগজের সাংবাদিকরা আসবে, বোম্বেতে আর্ট ক্রিটিক নামে যাদের কিছুমাত্রও পরিচয় আছে, তাদের অনেককেই নেমন্তন্ন করা হয়েছে; কলেক্টর যারা, শিল্পপতি থেকে শুরু করে ইনভেস্টর পর্যন্ত – লম্বা লিস্ট তাদের – সবাই নিমন্ত্রিত। ব্রোশিয়োর সহ নিমন্ত্রণপত্র তাদের পাঠানো হয়েছে আগেই; বোম্বের আর্ট-সার্কিটে ঘোরাঘুরি করা ঘনিষ্ঠ মানুষ যারা, তাদের সাথে কথা বলে ওয়র্ড-অব-মাউথ প্রচার, কিছু করতে বাকি রাখেনি মহেশ। ফলে, হাইপ যাকে বলে, সেটা তৈরি হয়েছে ভালোই। কলকাতায় এগজিবিশন করার আগে ভূদেবদার সাথে যখন কথা বলেছিলো জয়ি আর সুদেশ তখন ভূদেবদা যেটাকে বলছিলেন ফুট ফল, সেটা যে মন্দ হবে না এটা বোঝা যাচ্ছিলো আগে থেকেই।

    মহেশ বললো, সেন্টার অব অ্যাট্রাকশন তুমি, এটা মনে রেখো। ট্রাইবাল আর্টিস্টের এগজিবিশন যারা দেখতে আসছে, তোমাকে দেখে তারা যদিও প্লেজেন্টলি সারপ্রাইজড হবে, তোমাকে ছেড়ে দেবে না কিন্তু কেউ। কাজেই, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে তোমার। নো ড্রিঙ্কস টোডে। বাড়ি ফিরে তোমাকে আমি স্কচ খাওয়াবো। গ্যাদারিং যখন জমে উঠবে, তখন, দেখে মনে হবে ইমপ্রম্পটু, এ রকম একটা মীট-দি-আর্টিস্ট আমি অর্গানাইজ কোরে দেবো হঠাৎ, মাত্র পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে। সেখানে তোমাকে ফেস করতে হবে দুঁদে সাংবাদিকদের, অ্যাডভার্সারি ক্রিটিকদের, এবং পোড়-খাওয়া ইনভেস্টরদের। মনে রেখো, সাক্‌সেস ডিপেণ্ডস অন সেল্‌স্‌ম্যানশিপ। অফেণ্ডেড হবার মতো কোয়শ্চেন থাকবে, আপসেট হলে চলবে না। অ্যাণ্ড, ট্রাই টু টাচ পিপল্‌স্‌ হার্ট, সেটাই সবচেয়ে ইমপর্ট্যান্ট।

    তুলি চেয়েছিলো এগজিবিশন হলে একটা ট্রাইবাল ম্যুজিক থাকুক ব্যাকগ্রাউণ্ডে। মহেশ নাকচ কোরে দিলো। দুটো ঘটনা ঘটতে পারে, বললো মহেশ, এবং দুটোই ডেটারেন্ট। অনভ্যস্ত ম্যুজিক ব্যাকগ্রাউণ্ডে থাকলে সিনার্জী হয় না, উলটো এফেক্ট হতে পারে, এটা এক। আর দ্বিতীয়টা হলে আরও অসুবিধে। আমি ঠিক ঠিক জানিনা, তুমি আর জয়ি ভালো বলতে পারবে, আমার মনে হয় ট্রাইবাল ম্যুজিক অনেক বেশি রিদ্‌মিক। সেটা হলে বডি জাইরেট করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। আর্ট এগজিবিশনের পক্ষে সেটা ভালো নয়। অতএব, কোন ঝুঁকি না নিয়ে রবিশঙ্কর।

    একটু দূরে দাঁড়িয়ে সমস্ত ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিলো সুদেশ। এমনিতেই ও এদের সবায়ের চেয়ে একটু বয়েসে বড়ো, ঠিক জেনারেশন গ্যাপ না হলেও কোথাও একটু দূরত্ব আছেই। তা ছাড়া, ভূদেবদার অধীনে চাকরির সুবাদে দুচারজন শিল্পী-সাহিত্যিককে চিনলেও শিল্পী-সাহিত্যিকদের সাথে সাধারণভাবে খুব একটা স্বচ্ছন্দ বোধ করে না ও, এমনকি ভূদেবদার সব বন্ধুদের সাথেও না। শক্তিদার কথা আলাদা, নিজে যে অত বড়ো কবি সেটা শক্তিদা নিজেই মাঝে মাঝে ভুলে যান বলে মনে হয়। প্রথম যেদিন দেখেছিলো জয়মালিকাকে, বিপদে-পড়া আরষ্ট মেয়েটাকে দেখে একটু স্নেহই জেগেছিলো ওর মনে, তার বেশি কিছু নয়। শক্তিদার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন ও হতে পারেনি, তাই ওকে অফিসে বসিয়ে রেখে শক্তিদাকে ডেকে এনেছিলো খালাসিটোলা থেকে। তারপর থেকে জয়িই এসেছে নানা কারণে, যখনই এসেছে ওর কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে যা ও চাইছে সেই মুহূর্তেই সেটা না করে দিলে খুব অসুবিধে হয়ে যাবে ওর। ছেলেমানুষ মেয়েটাকে তাই সাহায্য করতে যেতেই হয়েছে ওর। আর ওর সাহায্য পাওয়াটা জয়ির যেন একটা দাবিই প্রায়। এই করতে করতে কখন যে ওরা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলো, সেটা সুদেশের কাছে খুব স্পষ্ট নয় আজও। একেবারেই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে, পড়াশোনা করেছে পাড়ার বাংলা স্কুলে, তারপর বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বি-এ, বিশেষ কোন উচ্চাশা নেই জীবনে। বিধবা মাকে কী কোরে খুশি রাখবে, জয়ির সাথে আলাপ হওয়ার আগে পর্যন্ত এ ছাড়া কখনো ভাবেইনি কিছু। এখন অবিশ্যি জয়ির উপর ওর টান একটু অন্যরকমের, সেটা ও বোঝে। কিন্তু বোম্বে আসার পর থেকে নিজেকে কেমন যেন একটু বেমানান লাগছে ওর। জয়ি যখন কলকাতায় প্রথম এগজিবিশনের কথা বললো, ততদিন পর্যন্ত কোন আর্ট এগজিবিশন দেখেইনি ও। এখানে এসে বুঝছে, এ জগৎটা ওর চেনা জগতের তুলনায় একেবারে অন্য রকমের।

    একজন একজন করে আমন্ত্রিতরা আসতে আসতে আধঘন্টাটাক সময়ের মধ্যেই বেশ ভালো জনসমাগম। এ রকমটাই হবে বলেছিলো মহেশ। ওর গ্যালারির এগজিবিশনে রিসেপশন যে ভালোই হয় বোম্বের আর্ট-সার্কিটে সবাই তা জানে। এ সব শর্ত করিয়েই ও গ্যালারি স্পেস ভাড়া দেয়। কোণের দিকে বেশ বড়ো একটা বার তৈরি করা হয়েছে, টেবিলে অনেক গ্লাস সাজানো, মাঝখানে গোটা কয়েক প্লেটে নানারকমের টুকিটাকি, পেছনে উর্দি পরা দুজন ওয়েটার। হলটায় ঢোকার মুখে ঘোরাঘুরি করছে মহেশ আর তুলিকা, সুদেশও ওদের কথা মতো দাঁড়িয়েছিলো কিছুক্ষণ, কিন্তু ওকে যেহেতু কেউ চেনে না, ওর দিকে এগিয়ে আসছে না কেউই। সুদেশ তাই একটু দূরে একাই দাঁড়িয়ে রইলো। বেশ দেখতে লাগছে সুদেশের, কেমন যেন একটা অলিখিত প্রোটোকল আছে, আর সবাই মেনে চলছে সেটা। বেশির ভাগ অতিথি এসেই হেসে একটু কথা বলছেন তুলি অথবা মহেশের সাথে, তাঁদের অনেকের কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরা, বাকিরা খালিহাত, তার পর সোজা চলে যাচ্ছেন তাঁরা ঐ সাজানো বারটার দিকে, তারপর হাতে গ্লাস নিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন আর্টিস্ট কোথায়। যাঁরা প্রথমেই এসেছেন তাঁদের একজন জয়ির সাথে কথা বলছেন, পরে যাঁরা আসছেন কেউ কেউ সেখানে গিয়ে যোগ দিচ্ছেন, একটা মোটামুটি বৃত্তের মতো হয়ে গেছে জয়িকে ঘিরে, বাকিরা এর ওর সাথে গল্পগাছা করছেন, দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলোর দিকে এখনও বিশেষ কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

    হঠাৎ দ্রুতপদে প্রবেশ করে গ্যালারির রিসেপশনিস্ট মেয়েটি, ওকে দেখে এগিয়ে যায় মহেশ, কথা বলার প্রয়োজন হয় না, মেয়েটি শুধু হাত তুলে ঘাড় নাড়ায় একবার। যেখানে জয়ি আছে অনেকের মধ্যে, দ্রুত সেখানে গিয়ে মহেশ জয়ির হাত ধরে টেনে এনে সোজা এগিয়ে যায় গ্যালারির প্রবেশমুখে, তারপর দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যায় দুজনেই। আবার যখন ঢোকে ওরা সঙ্গে চোস্ত-কুর্তা-জহর কোট পরা মোটাসোটা এক ভদ্রলোক, তাঁর পেছনে প্যান্ট-শার্ট পরা আর একজন। এঁরা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকটা ক্যামেরা ঝলকিয়ে ওঠে। তুলির নির্দেশে একজন ওয়েটার একটা ট্রে হাতে নিয়ে – যে ট্রেতে পানীয় সহ কয়েকটা গ্লাস – চোস্ত-কুর্তার সামনে ধরে। হেসে অসম্মতি জানান তিনি, ওয়েটার ফিরে যায়। নিমন্ত্রণপত্র তো দেখেইছে সুদেশ, সে বোঝে ইনি মাইনরিটি অ্যাণ্ড ট্রাইবাল অ্যাফেয়ার্স মিনিস্টার, উদ্বোধন করার জন্যে এসেছেন।

    উদ্বোধনের ব্যবস্থা করাই ছিলো, রিসেপশনিস্টের নির্দেশে চাদরে ঢাকা একটা টেবিল নিয়ে আসে একজন, তার ওপর একটা বড়োসড়ো পেতলের প্রদীপ। মন্ত্রীকে আহ্বান করে মহেশ, জয়ি তাঁর হাতে তুলে দেয় একটা ফুলের তোড়া। জয়িকে আনুষ্ঠানিক ভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়: জয়মালিকা, কুরুখ জনজাতির মেয়ে, বিহার-বাংলা-ওড়িশা অঞ্চলের সারাণ্ডা পর্বতমালার আদি অধিবাসী, স্বতস্ফূর্ত ছবি-আঁকিয়ে। প্রদীপ জ্বালান মন্ত্রী, ছোট বক্তৃতায় বলেন এতদিনে গণতন্ত্রের সুফল এ দেশের মানুষ পেতে শুরু করেছে। সব ভারতবাসী যে সমান, সারাণ্ডার জঙ্গলের শিল্পী বোম্বের গ্যালারিতে প্রদর্শনী কোরে তারই প্রমাণ রাখলো। মহেশকে ধন্যবাদ দেন মন্ত্রী শিল্পীকে এই সুযোগ কোরে দেওয়ার জন্যে, এবং দ্রুত প্রস্থান করেন।

    এ বার দেখা যায় কিছু কিছু দর্শক দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো দেখছে। জয়ির খুব চাহিদা, ওর সাথে কথা বলতে চায় অনেকেই। কোন কোন ক্যামেরাম্যানকে প্রদর্শনীর ছবি তুলতেও দেখা যায়, জয়ির ছবিও তোলে কেউ কেউ। কোন কোন উৎসাহী দর্শককে দেখা যায় কোন একটা ছবির সামনে জয়িকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বিশদ বুঝতে চাইছে, আর এত কিছুর মধ্যেও বারের সামনের জনতার ভিড় কমে না এক মুহূর্তের জন্যেও।

    ধীর লয়ে, অথচ উচ্চকিত, হাততালির শব্দ শোনা গেলো হঠাৎ। শব্দের উৎসের দিকে চোখ যায় সবায়ের। মহেশ। সে ইংরিজিতে বলে, আমি বেশ কিছুক্ষণ থেকে লক্ষ্য করছি শিল্পী জয়মালিকাকে আর একটু জানতে চাইছেন অনেকে, স্বাভাবিক কারণেই এই অসাধারণ প্রতিভার উপজাতি শিল্পীকে বহুবিধ প্রশ্ন আছে অনেকের। আমি সমবেত দর্শকের কাছে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে নিচ্ছি। আপনারা প্রদর্শনীর ছবি দেখুন, আপনাদের পানীয় উপভোগ করুন, আমি তার মধ্যে একটা কাজ-চলা গোছের মীট-দি-আর্টিস্ট সাজিয়ে ফেলছি।

    ভিড় আরও বেড়ে যায় বারের কাছাকাছি, দুয়েকজন অবিশ্যি খুঁটিয়ে প্রদর্শনী দেখতে ব্যস্ত থাকেন, এবং এর মধ্যে হালকা চেয়ার পাতা হয়ে যায় অনেকগুলো। একটা ছোট টেবিলের পেছনে একটা চেয়ার দিয়ে জয়ির বসার ব্যবস্থা হয়। সেই টেবিলে মাইক্রোফোন একটা। কর্ডলেস মাইক হাতে নিয়ে দর্শকদের মধ্যে তিন চার জন ঘোরাঘুরি করছে। জয়ি তার চেয়ারে বসে, এবং মহেশের আহ্বানে এক এক কোরে অন্য চেয়ারগুলো ভর্তি হতে থাকে। প্রায় সবায়েরই হাতে গ্লাস।

    প্রথম কথা বলেন একজন মহিলা। পরে জয়ি জানতে পেরেছিলো ইনি একটা ফ্যাশন পত্রিকার চিত্র সমালোচক। ম্যাডাম জয়মালিকা, বলেন মহিলা, আমরা শুনলাম আপনি নাকি কুরুখ নামের কোন উপজাতির মেয়ে। কুরুখ কারা আমি জানিনা। কিন্তু আপনার মতো সুন্দরী মহিলা এ দেশের কোন ট্রাইবাল সমাজে আছে, এমনটা জানা ছিলো না আমার।

    মিষ্টি হাসে জয়মালিকা। সামনের গ্লাসটার কমলা রঙের সফ্‌ট্‌ ড্রিঙ্কটায় ছোট একটা চুমুক দিয়ে বলে, থ্যাঙ্ক য়্যু। একটা কথা একটু বিশদে বলে দিই। কুরুখ আমাদের ভাষার নাম, ঐ ভাষার সুবাদেই আমাদের অঞ্চলের লোকরা আমাদের কুরুখ বলে পরিচয় দেয়। আসলে যে উপজাতির মানুষ আমরা, তার নাম হলো ওরাওঁ। এ নামটা অনেক বেশি পরিচিত, আপনারা অনেকেই শুনেছেন নিশ্চয়ই। আর, সৌন্দর্যের যে কথা ম্যাডাম বললেন, সেটার সম্বন্ধে শুধু এইটুকুই বলবো, আমি আমাদের অঞ্চলের সেরা সুন্দরী নই, এমনকি, সেরাদের মধ্যে একজনও নই। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, আমাদের গণমাধ্যমে তথাকথিত ট্রাইবালদের যে অতি পরিচিত মুখটা দেখানো হয়, সেটা কোন্‌ ট্রাইবের কেউ জানে না। ট্রাইবাল-মেনস্ট্রীম ডিভাইডের ট্রাইবাল ফেস ওটা। এখানে আমার আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে বার বছরের এক প্রসাধনরতা কিশোরীর ছবি আছে। কল্পিত ছবি নয়, কিন্তু ঠিক পোট্রেটও নয়, কাজেই ও যে কতটা সুন্দরী তা হয়তো পুরোপুরি ছবিটায় বোঝা যাবে না, তবুও আমার মনে হয় ছবিটা দেখলে আপনারা ওর সৌন্দর্যের খানিকটা আন্দাজ পাবেন ।

    পরের জনের প্রশ্ন: আপনার প্রদর্শনীর নাম ড্রয়িংস বাই আ ট্রাইবাল আর্টিস্ট, কিন্তু কী ড্রয়িং? কী এঁকেছেন আপনি? কী কমিউনিকেট করতে চাইছেন?

    প্রথম কমিউনিকেশন এগুলো ড্রয়িং। পেন্টিং বা অন্য কিছু নয়। ট্রাইবাল আর্টিস্ট বলার প্রয়োজন হতো না যদি প্রাতিষ্ঠানিক চিত্রকলার টেকনিক অনুসরণ করে ছবিগুলো আঁকা হতো। তা হয়নি, কারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ এই আঁকিয়ের হয়নি। স্বতস্ফূর্ত চিত্রণ এই ছবিগুলো, যে কোন একটি ওরাওঁ – আর ওরাওঁই বা বলি কেন, সাঁওতাল, মুণ্ডা, খাড়িয়া বা অন্য যে কোন জনজাতির – ছেলে বা মেয়ে এই ছবিগুলো আঁকতে পারতো, যা সে চোখের সামনে দেখে তারই ভিত্তিতে।

    আপনি কী বলতে চাইছেন আমরা যাদের উপজাতি বলি তাদের সবায়েরই সহজাত প্রতিভা আছে ছবি আঁকার? যে কোন একজন আঁকতে পারতো বললেন, তাই জিজ্ঞেস করলাম – বলে ওঠেন আর একজন।

    শুধু উপজাতি নয়, আমি বিশ্বাস করি সাধারণভাবে প্রায় সব মানুষই ছবি আঁকার বা অন্যান্য সৃষ্টিশীল কাজ করার যোগ্যতা নিয়ে জন্মায়। নানা কারণে কেউ কেউ এমন পরিবেশ পেয়ে যায় যাতে এই যোগ্যতা ধীরে ধীরে প্রতিভার দিকে এগোতে থাকে। ট্রাইবালদের, বিশেষ করে শহরের মোহ ছেড়ে নিজেদের অভ্যস্ত পরিবেশে জীবন কাটায় যে ট্রাইবালরা তাদের, জীবনে জটিলতা অনেক কম, কাজেই জন্মসূত্রে পাওয়া ক্ষমতার প্রয়োগের প্রায় অবাধ স্বাধীনতা পায় তারা অনেকেই। সে জন্যেই বোধ হয়, শহরে বড়-হয়ে-ওঠা ছেলেমেয়েদের তুলনায় ট্রাইবাল ছেলেমেয়েরা গান গাওয়া, নাচা, তীর ছোঁড়া, ছবি আঁকা, এ সব ব্যাপারে অনেক স্বতঃস্ফুর্ত। যে ছবিগুলো আমি এগজিবিট করেছি তার মধ্যে গোটা তিনেক ছবি আছে যেগুলো, যে জনজাতিকে নিয়ে এঁকেছি আমি, তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েদের আঁকা আলপনা গোছের প্যাটার্ণের অনুকৃতি। অনুকৃতিই মাত্র, তবুও ওগুলো দেখলে ঐ আলপনা শিল্পীদের প্রতিভার সম্বন্ধে খানিকটা ধারণা হবে আপনাদের।

    কোন্‌ জনজাতিকে নিয়ে এঁকেছেন আপনি? ওরাওঁ নয়?

    না, ওরাওঁ নয়। নানা সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে বেশির ভাগ জনজাতিই এখন নিজেদের স্বাভাবিক বাসস্থান থেকে বেরিয়ে অন্যরকমের পেশায় আসতে বাধ্য হয়েছে। আমাদের অঞ্চলে এখন সাঁওতাল, মুণ্ডা, বা ওরাওঁদের নিজেদের সংস্কৃতি বুঝতে পারাই শক্ত; হিন্দী সিনেমা, রোড ট্রান্সপোর্ট, নিবিড় ধানচাষ পদ্ধতি, ব্রয়লার চিকেনের সাথে মিলেমিশে অনেকদিন আগেই জগাখিচুড়ি হয়ে গেছে, কোরে দেওয়া গেছে। আমি যাদের নিয়ে এঁকেছি এরা খাড়িয়া। খাড়িয়াদের মধ্যে অতি ছোট একটি অংশের নাম পাহাড়ি খাড়িয়া। এখনো এরা জঙ্গলে থাকতে চায় নিজেদের সভ্যতা-সংস্কৃতি-ইকনমিক্‌স্‌কে আঁকড়ে ধরে। এদের দুটি গ্রামে আমি এদের সাথে থেকেছি কিছুদিন, দু দফায়, এবং তখনই এই ছবি-আঁকার প্রাথমিক কাজটা করেছি। একটি গ্রাম মাত্র তিরিশটি পরিবারের, গভীর জঙ্গলের ভেতরে, হাতির উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্যে গ্রামের সীমানার বাইরে পরিখা কাটা। আরেকটি গ্রাম জঙ্গলের প্রান্তে, অপেক্ষাকৃত বড়ো। ছোট গ্রামটির একটি ছেলের সাথে বড় গ্রামটির একটি মেয়ের বিয়েতে কাটিয়েছি ওদের সাথে। বিয়ের উৎসব ছাড়াও ওদের শিকারের উৎসব, সামাজিক নানা সম্পর্ক, ক্রিয়াকলাপ, রীতিনীতি, জঙ্গলের সম্পদ আহরণ, এ সব ব্যাপারে ওদের সঙ্গী হয়েছি আমি, আর সে ছবিই এই প্রদর্শনীতে দেখতে পাচ্ছেন আপনারা। আমি জানি, আপনাদের মধ্যে কারও কারও মনে হতে পারে এ কাজ তো নৃতত্ত্ববিদের, শিল্পীর নয়। আসলে তফাৎটা হলো, নৃতত্ত্বের কর্মীরা যা দেখেন তার অন্তর্নিহিত সামাজিক কারণ বিশ্লেষণ করেন তাঁরা, আর আমি দেখেছি অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য। নৃতত্ত্ববিদদের আপনারা সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট বলেন, আমাকে কেউ যদি সোশ্যাল আর্টের কর্মী বলেন, আমি খুশি হবো।

    এ রকম নানা প্রশ্ন এলো আমন্ত্রিত মানুষদের কাছ থেকে, এবং যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ উত্তর দিলো জয়ি। আচ্ছা, থ্যাঙ্ক য়্যু বলার সাথে সাথেই এলো শেষ প্রশ্নটা, একজন ফটোগ্রাফারের কাছ থেকে: ম্যাডাম, জঙ্গলে থেকে এ রকম ইংরিজি বলতে শিখলেন কী করে?

    হেসে ফেললো জয়ি, বললো, আমি যদি এই ইম্প্রেশন দিয়ে থাকি আপনাদের যে আমি জঙ্গলে থাকি, তাহলে আমি দুঃখিত। আমি জঙ্গলে থাকি না, কারণ আমি একটু অন্য রকমের পরিস্থিতিতে বড়ো হয়েছি। সারাণ্ডা রেঞ্জের যে অঞ্চলে আমার জন্ম এবং বড়ো হওয়া, আপনারা জানেন স্বাধীনতার পরেই সে অঞ্চলে একটি স্টীল প্লান্ট গড়ে ওঠে। স্টীল প্লান্টটা তৈরি হতে চার-পাঁচ বছর সময় লেগেছিলো। এবং এই তৈরির কাজে স্থানীয় মানুষদের কাজে লাগানো হয়। ট্রাইবাল নন-ট্রাইবাল সব ধরণের মানুষ। তাদের আশা দেওয়া হয় প্লান্ট তৈরি হলে সেখানে তারা চাকরি পাবে। এই মানুষদের মধ্যে আমার বাবাও ছিলেন, যদিও প্লান্ট চালু হওয়ার পর তিনি চাকরি পাননি। চাকরি পাননি, কিন্তু একটা কনসোলেশন প্রাইজ পেয়েছিলেন। প্লান্টের নিম্নতম কর্মীদের যেখানে বাসস্থান সেখানে একটা ঘর, এবং প্লান্টের ইংলিশ মীডিয়ম স্কুলে একটি সন্তানের শিক্ষার সুযোগ। আমিই আমার বাবার সেই ভাগ্যবতী সন্তান। অতএব ইংরিজি শিখেছিলাম। স্কুলের পর আর পড়িনি, ছবি আঁকতে শিখেছি জঙ্গল-পাহাড়-নদী-ঝর্ণার কাছ থেকে।

    স্বতঃস্ফুর্ত হাততালি। তারপর ফটোগ্রাফার ভদ্রলোক টেবিলের উল্টোদিকের জয়মালিকার ফটো তুললেন একটা। ঝলকিয়ে উঠলো আরও অনেক ক্যামেরাও ।

    মীট-দি-আর্টিস্টের প্রভাব লক্ষ্য করে সুদেশ। আগে এবং পরে। বার ঘিরে গ্লাসের পর গ্লাস শেষ করাই যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য বলে মনে হচ্ছিলো, হঠাৎ যেন কোন যাদুবলে তারা ছড়িয়ে পড়লো গ্যালারিতে। প্রতিটি ছবির সামনেই ভিড়, খুঁটিয়ে দেখা, নানান আলোচনা, জয়িকে ডাকাডাকি, এটা কোথায় এঁকেছেন, এই ছেলেটি কী সীটিং দিয়েছিলো আপনাকে !

    ধীরে ধীরে ভিড় পাতলা হয়ে আসে ঘন্টা দেড়েক পর। অনুষ্ঠানের ইতি ঘোষণা করে মহেশ। একজন পুরুষ আর একটি মহিলাকে ধরে ধরে গাড়িতে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসতে হয় সিকিউরিটির ছেলেটির। বাইরে বেরিয়ে আসে ওরা চারজন।

    গাড়িতে উঠতে উঠতে মহেশ বলে, ওয়েল ডান, জয়ি।

    সুদেশ বলে, জয়ি? এ তো তোমার শো। তুমিই তো হিরো আজকের, মহেশ !


    (ক্রমশঃ)

    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ৩০ জানুয়ারি ২০২১ | ৮৮৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ৩০ জানুয়ারি ২০২১ ১৬:১৯102200
  • ভালো লেগেছে।

  • প্রতিভা | 115.96.108.67 | ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১০:৫২102329
  • বেশ আগ্রহ জাগিয়ে শেষ হল এই কিস্তি ! চরিত্রগুলো ক্রমশ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে। তাদের ঘিরে থাকা প্রতিবেশও। 

  • moulik majumder | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০০:১৮102371
  • ভালো লাগল

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন