• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • বৃত্তরৈখিক (৫০)

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৩৯ বার পঠিত
  • ~৫০~


    সকাল সাতটায় অ্যাসেমব্লি। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোর পর্যন্ত সব ছেলেমেয়েরা যোগ দেবে অ্যাসেমব্লিতে। এ ছাড়া হোস্টেলে যে আঠেরো জন থাকে তারাও। ক্লাস এইটে মোট সাতজন ছাত্রছাত্রী আর সেভেনে নজন, সবাই হোস্টেলের আবাসিক। এছাড়া ক্লাস সিক্স-এর আর ফাইভ-এরও একজন করে হোস্টেলে থাকে। ক্লাস ওয়ান থেকে ফোরের ক্লাস হয় সকাল সাড়ে নটা পর্যন্ত, তারপর সকালের খাওয়ার পর তাদের ছুটি। ক্লাস ফাইভ আর সিক্স সাড়ে নটার মধ্যে পৌঁছিয়ে যায় স্কুলে, তারা অ্যাসেমব্লিতে যোগ দেয় না, তাদের ক্লাস শুরু হয় সকালের খাওয়া শেষ হলে, সাড়ে দশটা থেকে। ফাইভ সিক্স সেভেন এইট। বেলা দেড়টায় তাদের দুপুরের খাওয়ার ছুটি, আড়াইটে অবধি। আড়াইটে থেকে চারটে অবধি আবার ক্লাস। ছুটি তারপর।

    পৌনে সাতটায় সম্ভৃতা আর সোমেশ্বর পৌঁছিয়ে যায় খেলার মাঠে। হোস্টেলের আঠেরোটি ছেলেমেয়ে সবাই সোম স্যর আর সোম ম্যাডামকে চেনে, কয়েকবার দেখেছে খুশিঝোরায়। সম্ভৃতা আর সোমেশ্বর পৌঁছোবার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে এরাও সবাই হাজির। আর একটু পরেই আসেন দুজন শিক্ষক-শিক্ষিকা, এঁদের কথা সোমেশ্বর শুনেছে, কিন্তু দেখা হয়নি কখনো। রাজীব আর সন্ধ্যা। রাজীব হাত তুলে নমস্কার করেন সোমেশ্বরদের, বলেন, আমি রাজীব স্যর, আমি ক্লাস ওয়ানে বাংলা আর ইংরিজি পড়াবো। সন্ধ্যা একটু হাসে, জানায় সে হাতের কাজ শেখায়। বাস বোধ হয় দেরিতে পৌঁছেছে আজ, দুদ্দার করে দৌড়োতে দৌড়োতে ছেলেমেয়েরা সবাই যতক্ষণে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রস্তুত ততক্ষণে সাতটা বেজে গেছে। প্রতুলবাবু আর মুজফ্‌ফর সাহেবও এসে গেছেন, কিন্তু কেন যে অ্যাসেমব্লির কাজ শুরু হচ্ছে না বুঝতে পারে না সোমেশ্বর। মিনিট দশেক পর আসে উৎপল, তাকে দেখে সবাই বলে গূড মর্ণিং স্যর, সে-ও উত্তর দেয়। মুজফ্‌ফর সাহেব লাইনের সামনে গিয়ে মিলিটারির কায়দায় বলেন, সাবধান। সবাই অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়ায়। তারপর বলেন, স্টার্ট। গান শুরু হয়, সাঁওতালি গান, যা এর মধ্যে বহুবারই শুনেছে সোমেশ্বর আর সম্ভৃতা: ধারমু উদুঃক্‌ আকাৎ লেকা ইত্যাদি। তারপর গাওয়া হয় মেঘের কোলে রোদ উঠেছে, আমরা নূতন যৌবনেরই দূত আর গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ। গান শেষ হলে উৎপল এগিয়ে গিয়ে লাইনের সামনে দাঁড়ায়। ছেলেমেয়েরা অপেক্ষায় থাকে, কিছু একটা ঘোষণা হবে। উৎপল বলে, আজ থেকে আমাদের স্কুলে একজন নতুন স্যর আর একজন নতুন ম্যাডাম পড়াবেন। সোম স্যর আর সোম ম্যাডাম। তারপর ফিরে যায় সে।

    প্রতুল বাবু বলেন, ঠিক রুটিন কিছু নেই সোমদা, আপনি আর সোমদি যে যে ক্লাসে পড়াতে চান, চলে যান। তারপর আমি আর মুজফ্‌ফর যাবো। ইংরিজি প্রায় পড়ানোই হয়নি কখনো, যে দুয়েকজন একটু-আধটুও জানে তাদের মুজফ্‌ফর আর আমি আলাদা করে ক্লাসের বাইরে গাইড করার চেষ্টা করেছি। বাকিরা কিছুই জানে না প্রায়। বাংলার অবস্থাও খুবই খারাপ, তবে বোধ হয় ইংরিজির মতো অতটা নয়। ক্লাস ওয়ানে রাজীবই যাক, ওটা ও-ই ম্যানেজ করতে পারে ভালো।

    ক্লাস টূ থ্রী আর ফোর-এ যায় সোমেশ্বর, ছেলেমেয়েরা কী জানে কতোটা জানে বোঝার চেষ্টাই করে না, ওদের সাথে শুধু ইংরিজিতেই কথা বলে। তিনটে ক্লাসেই। ইংরিজি শুনে প্রথম মিনিট দশেক ছেলেমেয়েরা একেবারেই নীরব, একটু ঘাবড়েই গেছে মনে হয়। একটু পর সোমেশ্বর 'এইট লিট্‌ল্‌ ফিঙ্গার্‌স্‌ স্ট্যাণ্ডিং আপ টল' শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ দেখিয়ে হাত-পা নেড়ে অভিনয় করে। তারপর বাচ্চাদের দাঁড় করিয়ে দিয়ে ওর সঙ্গে সঙ্গে একই অভিনয় করায়। একটু একটু করে সব বাচ্চাই যোগ দেয়, খুবই খুশি তারা, ওদের প্রাণখোলা হাসির পুরস্কার সোমেশ্বরের জন্যে। সাড়ে নটায় ছোটদের ছুটি, বড়ো বড়ো নৌকোয় খাবার নিয়ে আসে হোস্টেলের ছেলেরা, এর মধ্যে ক্লাস ফাইভ আর সিক্সও এসে গেছে, খাবারের লাইনে তারাও। শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও জলখাবার খাওয়ার সময় এখন। সম্ভৃতা আর সোমেশ্বর ডাইনিং রূমে যায়, ওদের বরাদ্দ রুটি-তরকারি-চা খেয়ে আবার ফিরে আসে স্কুলে।

    ক্লাস এইটে সাতজনের মধ্যে দুটি মেয়ে, মিনতি আর সঙ্গীতা। এই দুজন ছাড়া আর কেউ ইংরিজি পড়তেই পারে না, উচ্চারণের সাধারণ নিয়মগুলোও কখনো শিখেছে বলে মনে হয় না। ক্লাস সেভেন-এও একই অবস্থা, নিজের চেষ্টায় ইংরিজি পড়তে পারে হাসি নামের মেয়েটি, আর একটু একটু পারে নবীন মুণ্ডা। ক্লাস সিক্সের রিমিল মাহাতো আর ক্লাস ফাইভের হেমালও পড়তে পারে ইংরিজি। দুজনেই হোস্টেলে থাকে, ওদের ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়েরা বাড়ি থেকেই যাতায়াত করে।

    একটু চিন্তায় পড়ে যায় সোমেশ্বর, যথেষ্ট বড়ো হয়ে গেছে এই ছেলেমেয়েরা, কীভাবে এখন এদের শেখানো যাবে ইংরিজির মতো একটা ভাষা একেবারে গোড়ার থেকে, যে ভাষার একটা অক্ষরও পড়তে পারে না গ্রামের পর গ্রাম একটিও মানুষ। ক্লাস সেভেন আর এইট-এর ক্ষেত্রে একটা সুবিধে অবিশ্যি আছে। ছেলেমেয়েরা সবাই থাকে হোস্টেলে, তার মানে, ক্লাসের বাইরেও তাদের সাথে কথা বলা যাবে, মেশা যাবে, আলাদা করে পড়ানোও যাবে। এই স্কুলের ক্লাস এইট-এর ছেলেমেয়েদের এইটিই শেষ বছর। এর পর ক্লাস নাইনে ওদের যেতে হবে অন্য স্কুলে। ক্লাস এইট-এর সাধারণ একজন ছাত্রের যতটা ইংরিজি জানা উচিত ততটা নিশ্চয়ই ওদের শিখিয়ে দিতে হবে মাত্র চার-পাঁচ মাসের মধ্যে। তাছাড়া খুশিঝোরার এই স্কুল পশ্চিমবঙ্গের মধ্য শিক্ষা পর্ষদের অনুমোদন প্রাপ্ত। পর্ষদের একটা নির্দিষ্ট পাঠক্রম আছে। ক্লাস এইটের পর যে স্কুলে ওদের যেতে হবে তারা নিশ্চয়ই যাচাই করে দেখে নেবে নির্দিষ্ট পাঠক্রম অনুযায়ী যতটা শেখার ততটা ওরা শিখেছে কিনা।

    স্কুলের ছুটির পর জয়মালিকার সাথে কথা বলে সোমেশ্বর। ক্লাস সেভেন আর এইটের ছেলেমেয়েদের সে সন্ধ্যেবেলা আলাদা কোরে পড়াতে চায়। অনেকটাই পিছিয়ে আছে ওরা। এ ভাবে না পড়ালে চলবে না।

    শুনে খুবই খুশি জয়মালিকা, পড়ান না মাষ্টারমশাই যতক্ষণ পড়াতে চান, এই জন্যেই তো আপনার আসা। আপনাদের মতো মানুষের অপেক্ষাতেই তো ছিলাম এতদিন !

    ক্লাস ওয়ান আর ক্লাস টূ-এর ইংরিজি বই চাই আমার, ক্লাসে সিলেবাসের পড়া পড়ানো হবে, সন্ধ্যেবেলা আমি ওদের ইংরিজি পড়তে শেখাবো, যে পড়াগুলো আগেই হওয়া দরকার ছিলো সেগুলো শিখতে হবে এখন।

    জয়মালিকার নির্দেশে নীচের ক্লাসের কয়েকটা বই ওকে দেয় উৎপল। ডাইনিং হলে রোজ সন্ধ্যেবেলা চালু হয় সোমেশ্বরের নিজস্ব স্কুল, ক্লাস সেভেন-এইটের ছেলেমেয়েরা ছাড়াও সেখানে অন্য একটি ছাত্র, তিনি মুজফ্‌ফর সাহেব, বলেন, ছোটবেলায় ফাঁকি দিয়েছিলাম, এখন সুযোগ পেয়েছি, শিখে নিই ! গেস্ট হাউজের অতিথিরা সন্ধ্যেবেলার মজলিশে যোগ দেওয়ার জন্যে ডাইনিং হলে এসে পড়াশোনা দেখে চমৎকৃত হন, কেউ কেউ এক কোণে বসেও পড়েন, পড়ানো শেষ হলে সোমেশ্বরের সাথে আলাপও করেন কেউ কেউ।

    বানান না করেও একটু একটু পড়তে শিখতে সময় লাগে না বেশি, সাত-আট দিনেই কয়েকজন ছাত্রের উন্নতি দেখা যায় স্পষ্টই, ফলে উৎসাহ বাড়ে সবার মধ্যেই। এরই মধ্যে একদিন, সেদিন এগারো বা বারো তারিখ হবে আগস্টের, পড়াশোনা চলছে জোর কদমে, হঠাৎ উৎপল হাজির। বললো, সোমদা, আজ একটু ছেড়ে দিন ওদের। দ্বিতীয় রাউণ্ড পড়া হচ্ছিলো, প্রথম রাউণ্ডের ভুলগুলো ঠিক করে দিচ্ছিলো সোমেশ্বর, সে বলে, হঠাৎ?

    না, স্বাধীনতা দিবস আসছে তো, প্রোগ্রাম হবে স্কুলে, তাই।

    ঠিক আছে, এই রাউণ্ডটা হয়ে যাক।

    পরের দিন সন্ধ্যেবেলা যথাসময়ে সোমেশ্বর ডাইনিং হলে। সাধারণত ছেলেমেয়েরাই চলে আসে আগে, আজ ডাইনিং হল ফাঁকা। কিছুক্ষণ পর আসেন মুজফ্‌ফর সাহেব, বলেন, মনে হয় আজ ছাড়বে না কাউকে। রিহার্স্যাল চলছে। কথা বলতে বলতেই জনাদশেক বয়স্ক মহিলার একটি দল ঢোকেন ডাইনিং হলে, সোমেশ্বরকে দেখে পরিচিতের হাসি। আপনিই সোমেশ্বর মাষ্টারমশাই, তাই না?

    অপ্রস্তুত ভাবে একটু হেসে সোমেশ্বর বলে, হ্যাঁ, আপনারা?

    আমরাও স্কুল টীচার, ওঁদের মধ্যে বলেন একজন, তবে রিটায়ার করেছি। একসাথে সবাই মিলে ঘোরাঘুরি করি। অনেকদিন ধরে এই আশ্রমে আসবার ইচ্ছে ছিলো, হয়ে উঠছিলো না। আমরা এসেছি আজ দুপুরে। জয়মালিকাদি বলছিলেন আপনাদের কথা। আপনাদের একমাত্র মেয়ে তো আমেরিকায় থাকে, তাই না ! সব ছেড়েছুড়ে গাড়ি-টাড়ি নিয়ে চলে এসেছেন বাচ্চাদের পড়াবার জন্যে, ভাবা যায় ! আমরা কিন্তু আপনাদের পাশেই আছি, যেটা পুরোনো ব্লক সেখানে। আপনার স্ত্রীর সাথেও আলাপ হলো এইমাত্র, উনি জামাকাপড় শুকোতে দিচ্ছিলেন। সত্যি, কতো কষ্ট কোরে আছেন আপনারা নিজেদের আদর্শের জন্যে।

    আরে না না, ওসব কিছু নয়, হেসে বলে সোমেশ্বর, রিটায়ার করেছি, সময় কাটে না, তাই।

    না না, সে তো আমরাও করেছি। কতো জন পারে এমন স্বার্থত্যাগ করতে !

    স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন সন্ধ্যেবেলা বড়ো একটা গাড়িতে সাত-আট জন, সবাই পুরুষ, তাদের সাথে কয়েক বস্তা চাল-ডাল-আলু, তা ছাড়া কম্বলের বাণ্ডিল। এদের গাড়িতে ঝাড়খণ্ডের নম্বর, চেহারা দেখে সোমেশ্বরের মনে হয় মারোয়াড়ি। জয়মালিকা আলাপ করিয়ে দেন সোমেশ্বরের সাথে, আমাদের নতুন মাষ্টারমশাই, খুব কোয়ালিফায়েড, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ম্যানেজার ছিলেন, একমাত্র মেয়ে বিদেশে থাকে, গাড়ি-টাড়ি নিয়ে সস্ত্রীক চলে এসেছেন এখানে সব ছেড়েছুড়ে, করসেবা দিচ্ছেন।

    বহোৎ ভালো কাজ করছেন দাদা, হিন্দী উচ্চারণে বাংলাতেই বলেন ওঁদের মধ্যে একজন, আপনারও বহোৎ পুন্‌ হোবে। আর জয়মালিকা দিদি তো সর্‌গ্‌ থেকে আসিয়েছেন মনে হয়, আদিবাসীদের তো উনি দেওতা। আমরা তো কবে থেকে বলছি, আপনিও লাগিয়ে থাকুন দাদা, ধর্‌ণী মাতার একটা মন্দির এখানে চাই।

    পরের দিন স্বাধীনতা দিবসের উৎসব। মহিলাদের মধ্যে যাঁকে মনে হয় সবার বড়ো, তাঁকে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে অনুরোধ করেন জয়মালিকা। ভদ্রমহিলা কোন স্কুলে হেডমিস্ট্রেস ছিলেন মনে হয়, অভ্যস্ত ভঙ্গিতে ভালোই বক্তৃতা করলেন। তারপর ঝাড়খণ্ড থেকে আসা অতিথিদের একজন। তিনি বললেন স্বাধীনতার মানে হলো নিজেদের সংস্কৃতি আর ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা। দেশ যখন পরাধীন ছিলো তখন আদিবাসীদের জোর করে বিদেশী ধর্ম পালন করানো হয়েছে। আজ আর কোন ভয় নেই, সমস্ত দেশের সাথে এক হয়ে আদিবাসীরাও এখন আমাদের প্রাচীন ধর্ম পালন করবে। এই স্কুল যিনি চালাচ্ছেন সেই জয়মালিকা দিদি সবাইকে গাইড করবেন, ধরণ্যৈ নমঃ, ভারত মাতাকি জয়।




    বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর মাইকের সামনে আসেন জয়মালিকা সেন। তিনি বলেন, এই স্কুল তিনি চালান না, যিনি চালান তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করেন মাত্র। উৎপল স্যর, উৎপল স্যরই এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনিই চালান। স্কুল উৎপল স্যরের। মাত্র কয়েকদিন আগেই এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা তাদের ডাকঘর নাটকের অভিনয়ে কলকাতা মাতিয়ে দিয়ে এসেছে, এখন উৎপল স্যর – ঠিক নাটক নয় – নাটকের মতো তাঁর এক অসাধারণ সৃষ্টি, যা তিনি ছেলেমেয়েদের নিজেই শিখিয়েছেন, এখানে দেখাবেন। এরপর কলকাতাতেও তা দেখানো হবে। কয়েকজন ছেলেমেয়ে, যারা নীচের তলার ক্লাসরূমে সাজগোজ করছিলো এতক্ষণ, বিভিন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামীর মতো সেজে এক এক করে এবার মাইকে আসে, ঠিক ঐতিহাসিক ক্রমে যে আসে তা নয়, আর এসে যাঁর মতো সেজেছে সেই মহাপুরুষের এক-এক লাইন বিখ্যাত উক্তি বলে চলে যায়। গান্ধীজীর সাজে যে আসে, সে বলে, করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে, নেতাজীর সাজে, তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো, গোখলে বলেন, হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টোডে, ইণ্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো ! এই রকম !

    আজকাল সোমেশ্বরদের রাতের খাওয়া জয়মালিকা আর উৎপলের সঙ্গে একসাথে। সবার শেষে। ছুটির দিন দিনের বেলাতেও তাই। অনুষ্ঠান শেষে নিরামিষ ভোজনের পর ঝাড়খণ্ডের অতিথিরা ফিরে গেলো। পরের ব্যাচে বয়স্কা মহিলারা। তাঁরা খোঁজ নিলেন আবার ডাকঘর দেখা যাবে কবে। জয়মালিকা বলে, কবে দেখতে চান?

    মানে?

    আপনাদের প্রোগ্রাম কী? কবে যাবেন আপনারা?

    আপনারা অনুমতি দিলে কাল আপনাদের ছেলেমেয়েদের একটা গান শেখাতে চাই, বক্তৃতা দিয়েছিলেন যে মহিলা বলেন তিনি, আমাদের স্কুলের প্রার্থনাসঙ্গীত ছিলো যেটা। তাহলে পরশুদিন যাবো।

    গান শেখানোর ব্যাপারে উৎপলের সাথে কথা বলতে হবে। তবে, কাল যদি থাকেন, কাল ডাকঘর দেখাতে পারি।

    কোথায়?

    সেটা আমার ওপরেই ছেড়ে দিন।

    দুপুরের খাওয়ার সময় জয়মালিকা সোমেশ্বরকে জানায় পুজোর সময় য়্যোরোপ যাওয়ার যে কথা ছিলো ওর, সেটার ব্যবস্থা পাকা। পঞ্চমী বা ষষ্ঠীর দিন যাবে ও, সপ্তা' তিনেকের জন্যে। অনাবাসী ভারতীয়দের একটি সংস্থা, কোপেনহেগেনে যোগাযোগ আছে যাদের, তারা য়্যোরোপের বিভিন্ন শহরে জয়মালিকা সেনের ধরণী বিষয়ক চিন্তা নিয়ে কয়েকটা সেমিনার করতে চায়। যারা ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছিলো তারা এবার পুরো প্রোগ্রামটা দেখিয়ে কনফার্ম করিয়ে নিয়ে গেলো। জয়মালিকার একটা ব্যক্তিগত ইচ্ছে ছিলো, য়্যোরোপ যখন যাওয়াই হচ্ছে, য়্যোরোপীয়ান মাস্টার্সদের কিছু ছবি দেখে আসা। তারও ব্যবস্থা হয়েছে। সোমেশ্বরের অসুবিধে নেই তো পুজোর কদিন এখানে থাকার?

    পুজোয় কলকাতায় থাকার বিশেষ উৎসাহ নেই আমাদের, কিন্তু স্কুলের ছুটি কতোদিন?

    জবাব দেয় উৎপল, দু সপ্তাহ আমরা ছুটি দিই পুজোর, পঞ্চমীর দিন থেকে শুরু।

    ঠিক আছে, আমার মনে হয় না কোন অসুবিধে হবে।

    সোমেশ্বর বুঝতে পারছিলো না স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সন্ধ্যের সময়েও ছেলেমেয়েদের ছুটি দিতে হবে কিনা। সে জিজ্ঞাসাই করে ফেললো উৎপলকে। উৎপল বললো, ও একটা সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করছে সন্ধ্যেবেলায়, সেটা দেখার পর আর কী পড়াশোনার সময় হবে?

    না থাক, সোমেশ্বর বলে, ছুটিই থাক আজ।

    ছুটি পরের দিনও। জয়মালিকা কথা রেখেছে, ডাইনিং হলের বারান্দার সামনে, খোলা জায়গাটায়, একটা টেবিলকে জানলা বানিয়ে ডাকঘরের অভিনয় হলো। একবার তো দেখেছে সোমেশ্বররা, এবারও দেখতে ভালোই লাগে। মহিলারা একেবারে উচ্ছ্বসিত: এরকম অভিনয় শেখালেন কী কোরে, কে শেখান, এতো কাজের মধ্যে কখন শেখান ওদের?

    এক কোণে বসে থাকা উৎপলকে চোখের ইশারায় দেখিয়ে জয়মালিকা বলে, উৎপল খুব হার্ড টাস্কমাস্টার ! বিকাশ বসুর নাম উচ্চারিত হয় না একবারও!

    ডাকঘরের কল্যাণে সন্ধ্যের পড়াটাই যে শুধু আজ বন্ধ রইলো তা নয়, সারাদিনই আজ স্কুলে পড়াশোনার পাট ছিলো না। অ্যাসেমব্লি শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিট আগেই উৎপল হাজির। মুজফ্‌ফর সাহেবকে বলাই ছিলো, তিনি একবার সাবধান বলেই চুপ করে গেলেন, স্টার্ট কথাটি উচ্চারণ করলেন না। এগিয়ে এলো উৎপল, ওর পিছনে বয়স্কা মহিলাদের মধ্যে চারজন। উৎপল বললো, আজ তোমাদের একটা গান শেখানো হবে, এই যে চারজন ম্যাডাম, এঁরা শেখাবেন। ভালো করে শিখে নাও, কাল থেকে অ্যাসেমব্লিতে এটাই প্রথম গান।

    ক্লাস এইটের সঙ্গীতা বলে, আর সাধু রামচাঁদের জনম দিনের গানটো? সেটা হবেক নাই?

    সোজাসুজি সঙ্গীতার চোখে চোখ রেখে কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থাকে উৎপল, তারপর আস্তে আস্তে – যাকে বলে চিবিয়ে চিবিয়ে বলা, সেইভাবে – বলে, অ্যাসেমব্লিতে হবে না। অন্য সময় কেউ গাইতে বললে তোমরা গাইতে পারো।

    কোন বিশ্বপিতার করুণা ভিক্ষা করা একটি গান শেখাতে শুরু করেন মহিলারা। ক্লাস হয় না। উৎপল ফিরে যায় না আজ, গান শেখানোর সময় সবাই মন দিয়ে শিখছে কিনা লক্ষ্য রাখে। সাড়ে নটা পর্যন্ত শেখানো হলে বলে, এবার তোমরা খেয়ে এসো। সাড়ে দশটা থেকে আবার গান শেখা শুরু। এখানেই। ক্লাসে যেতে হবে না। এই কথা বলে উৎপল সোজা চলে যায় অফিস ঘরের দিকে, অপেক্ষমান শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিকে সে ফিরেও তাকায় না।

    সেদিন আর স্কুলে ফেরেনি সোমেশ্বর-সম্ভৃতা।


    (ক্রমশঃ)

    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৩৯ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • JollY Dipankar | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৫:৫৪497737
  • কি হবে আগামীদিনে খুশিঝোরাতে? উৎপলকে এত গুরুত্ব দেবার কারণ ki?
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন