• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • বৃত্তরৈখিক (৫৬)

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৩ অক্টোবর ২০২১ | ৪১৬ বার পঠিত
  • ~৫৬~

    রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ। এক এক কোরে অতিথিরা যে যার ঘরে চলে গেছে। পুলকেশ তরফদারও মহুয়ার শেষ গ্লাসটা খালি কোরে উঠে গেছেন ওপরের গেস্ট হাউজে নিজের ঘরে। প্রতি রাতে উৎপলের যেটা শেষ কাজ, নিজের ঘরের সামনে ছেলেমেয়েদের দাঁড় করিয়ে তাদের সারাদিনের কাজকর্মের চলন-বলনের পর্যালোচনা, কে কোথায় ভুল করেছে, কোন্‌ পাপের জন্যে আজীবন ভুগতে হবে কাকে, এমনকী মৃত্যুর পরেও মুক্তি নেই কার, ভগবানকে বেজায় চটিয়েছে কে, কার আপাতত কান ধরেই মুক্তি, হাত পেতে দিয়ে উৎপলের হস্তধৃত বেতের পাঁচ ঘা সপাং সপাং বাড়ি খেয়েই পাপমুক্ত কে, কার ক্ষেত্রে উপর্যুপরি দুদিন একই অপরাধ করার পরের ফলে দ্বিগুণ-সংখ্যক বেত্রাঘাত জামা খুলে নিতে হবে পিঠে, পরের দিন কার সকালের খাওয়া বন্ধ, খালি গায়ে পুকুর-পাড়ে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কাকে, আর কার দায়িত্ব হবে তার ওপর নজর রেখে পরের দিন সকালে উৎপলের কাছে রিপোর্ট দেওয়া, শেষ হয়ে গেছে এসবও। এক-এক কোরে সব ঘরে আলো নিভে যায়, আপাতশুনশান খুশিঝোরা।

    আধঘন্টাটাক পর উৎপলের গলা শোনা যায়, নির্জন অঞ্চলে ঘুমিয়ে-পড়া রাতে তার ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর যেন বজ্রনির্ঘোষ, তোমার আস্কারাতেই আমার এই অপমান !

    প্রতুলবাবুর ঘুম আসছিলো না, এমনিতেই বয়েস বাড়ার পর ঘুম কমে আসছে, কোন কিছু নিয়ে চিন্তা থাকলে ঘুম আসতেই চায় না আজকাল। জানতেনই আজ রাতে চেঁচামেচি হবে। গত কয়েকবছর ধরেই লক্ষ্য করছেন ব্যাপারটা। প্রতুলবাবুকে প্রথম যখন জলধর নিয়ে আসে এখানে, তখনও উৎপল ছিলো। কীই বা তখন বয়েস তার ! সবায়ের কথা শুনতো, একেবারে ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াতো, আর সবাইকে সব কাজে সাহায্য করতো। তখন রঘুনাথ নামে একজন ছিলো, সে আদিবাসী, রান্না করতো বাজার করতো খুব ভালো, তার কাজেও সাহায্য করতো উৎপল। গরমের ছুটিতে হিমালয়ে গিয়েছিলেন প্রতুলবাবু, তাঁর মা মারা যাওয়ার পর কনখলে পিণ্ডদানের ইচ্ছে ছিলো, ফিরে এসে দেখলেন উৎপল অনেক বদলে গেছে, সে এখন হুকুমের স্বরে কথা বলে অনেকের সাথে। অবিশ্যি তাঁর সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি, সেটা অন্য কথা। কিন্তু সবায়ের সাথেই যে উৎপল ভালো ব্যবহার করে তা নয়। কিছুদিন পরেই দেখা গেলো স্কুলের ব্যাপারে শেষ কথা বলে সে-ই, এমনকী অন্য ব্যাপারেও। ওর দুর্ব্যবহারেই শেষ পর্যন্ত চলে গেলো রঘুনাথ। খুশিঝোরায় সবার চেয়ে পুরোনো লোক বুধিয়ার মা, অষ্টমী যার নাম। তার কাছে প্রতুলবাবু শুনেছেন সে আর রঘুনাথ ছিলো ম্যাডামের বাবার আমলের লোক। রঘুনাথ ছেড়ে দেবার পর অষ্টমীও ঠিক করেছিলো চলে যাবে। ম্যাডামই তাকে বলে-কয়ে আটকে রেখেছেন।

    গত কয়েক বছর ধরে এই একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছেন প্রতুলবাবু। ম্যাডাম যদি কোন কারণে কয়েকদিনের জন্যে বাইরে যান, যেদিন ফেরেন তাঁর সাথে রাত্তিরে ঝগড়া করে উৎপল। সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর। করেই। যেদিন থেকে শুরু হয়েছে তার পর একবারও অন্যথা হয়নি এই নিয়মের। আর ঝগড়া মানে শুধু ঝগড়া নয়। এটা-ওটা ছোঁড়া-ছুড়ি, বাসন-পত্র ভাঙাভাঙি সবই হয়। আর ম্যাডামেরও গলা শোনা যায় মাঝে মাঝেই। পরের দিন সকালে অবিশ্যি বোঝা যায় না কিছু আর। সবকিছুই আগের মতো।

    প্রথম যেবার হয়েছিলো এরকম গণ্ডগোল, ঠিক ঠিক বুঝতে পারেননি প্রতুলবাবু। ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো হঠাৎ। ম্যাডামের ঘরের দিক থেকে একটা ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার ঝনঝনানি শব্দ। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। ম্যাডামের ঘরের আলোটা জ্বলছিলো। দরজার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে উৎপল। পেছন থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো সে প্রবল উত্তেজিত, দিগ্বিদিকশূন্য প্রায়। তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ম্যাডাম। তাঁর জামার সামনেটা ছিঁড়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেকটা। এক মুহূর্ত ! এক মুহূর্তই দেখেছিলেন তিনি। তারপর ভাবতে হয়নি। লজ্জা ক্রোধ বিস্ময় – কী তাঁর অনুভূতি হয়েছিলো তিনি জানেন না। মুহূর্তেই সরে আসাটা ছিলো স্বতঃস্ফুর্ত। আর তারপরেই সশব্দে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো দরজাটা।

    তারপর থেকে এটাই দেখে আসছেন। এটাই প্যাটার্ণ। প্রথমে উত্তেজিত বাদানুবাদ, তারপর ভাঙাচোরার ভয়ঙ্কর আওয়াজ, সশব্দ দরজা বন্ধ তারপর। তারপর, মুহূর্তেই সব শান্ত। শুনশান।

    কেউ তোমাকে অপমান করেনি, অপমান তোমার মনে, ম্যাডামের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর কানে এলো প্রতুলবাবুর।

    কেন তুমি ডেকে এনেছো এইসব লোকদের? নিজের হাতে গড়া আমার স্কুল, তার দখল নিয়ে নেবে এরা !

    তুমি মানুষ চেনোনা উৎপল, যেদিন বলবে সেদিনই চলে যাবেন মাষ্টারমশাই। কিন্তু এই স্কুল চালানো তোমার বিদ্যেতে কুলোবে না এখন।

    তাই বলে ছেলেমেয়েদের দিয়ে অপমান করাবে? আর তুমি চেয়ে চেয়ে দেখবে সব? একটা একটা কোরে হাতছাড়া হয়ে যাবে সব। আজ ছেলেমেয়েদের হাত করছে কাল তোমাকে হাত করবে। মুখের ওপর একটা কথা বলতে পারতো না যারা কে তাদের সাহস যোগাচ্ছে এতো? মাষ্টারমশাই মাষ্টারমশাই মাষ্টারমশাই ! যে আসছে তারই মুখে
    মাষ্টারমশাই ! কী হবে এতো লেখাপড়া শিখিয়ে ওদের? এইটুকু শিখেই মুখে বুলি ফুটেছে দেখতে পাচ্ছো না? পুরোনো হয়ে গেছি আমি, না? আর ভালো লাগছে না? শেষ করে দেবো সব কিছু আমি, আগুন জ্বেলে দিয়ে চলে যাবো।

    এরপর ঝনঝনানি শুনতে পান প্রতুলবাবু। এবার আর একটা কিছু ভাঙবে, তারপরেই শান্ত হয়ে যাবে সব!

    প্রতুলবাবুর পাশেই অন্য দুটো চৌকিতে শুয়ে আছেন ডাক্তারবাবু আর মুজফ্‌ফর সাহেব। ওঁরা ঘুমোচ্ছেন না জেগে আছেন প্রতুলবাবু জানেন না, ঘুমোলেই ভালো। পাশের ঘরেই তিনটে ছোট ছোট মেয়ে, কে জানে তারা কী করছে, কী শুনছে !

    পরের দিন সকালে ছোটদের ছুটি হয়ে গেলে মুজফ্‌ফর আসে ম্লানমুখে সোমেশ্বরের কাছে, উৎপলদা রাজি নয়। বলছে, তিনটে মেয়ে আছে, ওই অন্ধকার ভেঙে তাদের নিয়ে স্কুলবাড়ি পর্যন্ত যাওয়া যাবে না। রাত্তিরে স্কুলে যাওয়া নয়।

    তাহলে নয়, সোমেশ্বর বলে, শেষ অবধি মনে হচ্ছে না পড়ানো যাবে এখানে। আমরা তাহলে ফিরেই যাবো।

    দুপুরে খাওয়ার সময় আসে জয়মালিকা। এটা নিয়মের মধ্যে পড়ে না। জয়মালিকা আর উৎপল খায় সবার শেষে। ইদানিং ছুটির দিনগুলোতে আর রোজই রাত্তিরে সম্ভৃতা আর সোমেশ্বরও ওদের সাথেই খায়। কিন্তু স্কুল যখন খোলা থাকে, সোমেশ্বররা দেড়টার সময় খেয়ে আবার ফিরে যায় স্কুলে। পুলকেশ তরফদার ছিলেন কাল, তাই নিয়ম ভেঙেছিলো জয়মালিকা। আজ আবার নিয়ম ভাঙা কেন, ভাবে সোমেশ্বর।

    জয়মালিকা বলে, মাষ্টারমশাই, এতোদিন তো ডাইনিং হলেই চলছিলো আপনার ট্যুইশন, এখন শুনছি স্কুলে পড়াতে চাইছেন। কেন?

    ডাইনিং হলে তো রেস্ট্রিকশন হয়ে গেছে।

    রেস্ট্রিকশন? আপনি ভাবলেই রেস্ট্রিকশন। বাচ্চারা মেঝেতে বসলে আপনার কী অসুবিধে?

    বুড়ো হয়েছি, বলে সোমেশ্বর, গতকাল আমিও বসেছিলুম মেঝেতে, কষ্ট হয়েছিলো খুব।

    আপনাকে কে মেঝেতে বসতে বলেছে? আপনার জন্যে তো চেয়ার থাকবেই।

    ওরা যদি মেঝেতে বসে, আমাকেও বসতে হয়। মাষ্টার-ছাত্র এক লেভেলে না বসলে পড়ানো যায় না।

    এটা তো খারাপ ট্রেনিং হচ্ছে মাষ্টারমশাই। ছাত্র শিক্ষকের পদতলে বসবে এটাই তো হওয়া উচিত।

    ঔচিত্যবোধ সকলের সব সময় এক হয় না ম্যাডাম। কিন্তু সেটা ছাড়াও, এটা ইনকনভিনিয়েন্ট। এক লেভেলে না বসলে খাতার লেখা শুধরে দিতে অসুবিধে হয়, ধরে ধরে পড়তে শেখানোয় অসুবিধে হয়।

    আসলে উৎপল পছন্দ করছে না রাত্তিরে স্কুলে যাওয়াটা। আমাদের স্কুলের কম্পাউণ্ডে তো আলো নেই, অন্ধকারের মধ্যে – বুঝতেই তো পারছেন তিনটে মেয়ে আছে, আর এতগুলো ছেলে – আমাদের তো পাঁচজনকে নিয়ে চলতে হয়।

    সত্যি কথা বলছি ম্যাডাম, বুঝতে পারছি না। কিন্তু দেখুন, এসব নিয়ে তর্কাতর্কি করে লাভ নেই। আপনি আমাদের ডেকেছিলেন, আমরা এসেছি। পড়াতেই এসেছি। আমাদের যদি ঠিক ঠিক মতো পড়ানোর সুযোগ আপনারা না দিতে পারেন তাহলে আমাদের থাকার কোন মানে হয় না।

    একটা কথা বলবো মাষ্টারমশাই, কিছু মনে করবেন না তো? কী দরকার আপনার এতো কষ্ট কোরে স্কুল-আওয়ারের বাইরে পড়ানোর? পড়ান না স্কুল যতক্ষণ চলবে, তারপর রিল্যাক্স করুন। আপনি তো নাটক লেখেন, লিখুন না সেসব। আশপাশে ঘোরাঘুরি করুন। এতো সুন্দর এই অঞ্চলটা, ঘুরে ঘুরে দেখে নিন না সবটা। স্কুলের বাসটা তো আছে, বিশুকে বলে দেবো আপনাদের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে। আমি বরঞ্চ উৎপলকে বলে দেবো আপনার সাথে কথা না বলে হঠাৎ হঠাৎ যেন স্কুলে ছুটি দিয়ে না দেয়।

    হেসে ফেলে সোমেশ্বর, খুবই লোভনীয় প্রস্তাব ম্যাডাম। ফ্রী হলিডেয়িং ! কিন্তু আমরা তো এসেছি পড়াতে। প্রথম দিন পড়িয়েই আপনাকে জানিয়েছিলুম আমাদের কী অ্যাসেসমেন্ট। স্কুল-আওয়ারের বাইরে না পড়ালে ওদের ক্ষেত্রে চলবে না। গোড়াটা খুবই কাঁচা থেকে গেছে। ওদের যদি শেখাতে হয় এই সময়টুকু ওদের দিতেই হবে।

    সে তো বুঝলাম, আর এ-ও ঠিক যে প্রথম দিনেই আপনি বলেছিলেন এসব কথা। কিন্তু পড়াশোনায় কতোটা উন্নতি ওদের হচ্ছে জানি না, ইদানিং দুর্বিনীত হয়ে যাচ্ছে খুব, তাই ভয় হয়। দেখুন না আগে ওদের যে কথাই বলে দেওয়া হতো, সেটাই ছিলো শেষ কথা। কোন কথা না বলে মেনে নিতো ওরা। আমি শুনলাম গতকাল এমনকি উৎপলেরও মুখে মুখে তর্ক করেছে। যা বলেছে উৎপল, প্রত্যেকটা কথা কেটেছে ছেলেমেয়েরা, ভাবতে পারেন?

    এ কথার কোন জবাব দেয়না সোমেশ্বর।

    জয়মালিকা বলে আবার, উৎপল ওদের গতকাল সন্ধ্যের পড়া বন্ধ রাখতে বলেছিলো। আগে হলে ওরা চলে যেতো কথা না বলে, কাল ফিরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছে, কেন? উৎপল বুঝিয়েছে ওদের, অনেক লোকজন এসেছে, তাড়াতাড়ি কোরে এক-একটা ঘরের গেস্টকে খেতে বসিয়ে দিতে হবে। এখানেই ব্যাপারটা শেষ হয়ে যেতে পারতো, কিন্তু হয়নি। মিনতি, মিনতির মতো মুখচোরা মেয়ে, সে-ও জিজ্ঞেস করেছে, কতো তাড়াতাড়ি? কতো তাড়াতাড়ি খাইয়ে দিতে হবে? তখনো ধৈর্য হারায়নি উৎপল, বলেছে আটটার মধ্যে। তখন লক্ষ্মীকান্ত বলেছে, ঠিক আছে, আমরা ছটার সময় পড়তে বসে যাবো, আটটার মধ্যে পড়া হয়ে যাবে। উৎপল তো কখনও এরকম জবাব দিতে শোনেনি ওদের, ও রেগেমেগে বলেছে, কী পড়তে বসে যাবো পড়তে বসে যাবো করছো, একজনও বসবে না ডাইনিং হলের চেয়ারে। তখন নাকি তিন-চারজনে মিলে একসাথে বলেছে, ঠিক আছে স্যর, আমরা মেঝেতে বসবো। আর তারপর আস্পর্ধা দেখুন, ক্লাস সেভেনের নবীন ঝাঁঝিয়ে উঠে বলেছে তখন, স্যরকেও কী মেঝেতে বসতে হবে ! বিশেষ কোরে নবীনের এই প্রশ্নে উৎপল খুবই আপসেট। আর সত্যি কথা বলতে কী, আমিও একটু শঙ্কিত।

    কিছুক্ষণ চুপ কোরে থাকে সোমেশ্বর, তারপর বলে, আমাকে কী করতে বলেন?

    নাঃ, আপনি আর কী করবেন! – বলে জয়মালিকা, ব্যাপারটায় আমরা একটু চিন্তিত, তাই আপনার সাথে শেয়ার করলাম।

    কিছুক্ষণ পর কথা বলে সোমেশ্বর, তাহলে কী ভাবছেন, ফিরেই যাই আমরা কলকাতায়?

    না মাষ্টারমশাই, কোন প্রশ্নই ওঠে না আপনাদের ফিরে যাওয়ার। স্কুলের ঘরেই পড়ান, ওখানেই ভালো হবে। শুধু একটা কথা। মেয়ে তিনটেকে বলে দেবেন সরাসরি স্কুলে না গিয়ে আপনাদের ঘরের সামনে গিয়ে যেন দাঁড়িয়ে থাকে। যাওয়ার সময় আপনার সাথেই যাবে ওরা, আপনার সাথেই ফিরবে।

    চুপ করে থাকে সোমেশ্বর বেশ খানিকক্ষণ। কিছু একটা বলতে যায় সে, কিন্তু যা বলতে চায় তা বলে না। সে বলে, ঠিক আছে, তাই হোক।

    মুজফ্‌ফর খুব খুশি। সন্ধ্যে সাড়ে ছটা নাগাদ সোমেশ্বরদের দরজায় টোকা দেয় সে। বলে, স্কুলে ছেলেদের সে বসিয়ে দিয়েছে। মেয়েদেরও বলে দিয়েছি আপনার ঘরের সামনে চলে আসতে। ওরা এলেই চলে আসুন স্যর।

    কিন্তু যা ওরা কেউই ভাবেনি, অথচ যা অবশ্যম্ভাবী ছিলো, তা-ই ঘটলো। মিনিট পঁয়তাল্লিশ পড়ার পর লোড শেডিং। এখন চলবে বেশ কিছুক্ষণ। খুশিঝোরায় সর্বত্র, সব ঘরে, আলাদা করে সোলার পয়েন্ট আছে একটা। লোড-শেডিঙের বিশেষ কোন প্রভাব এখানে পড়ে না। স্কুলটাই একমাত্র ব্যতিক্রম। স্কুলটা দিনের বেলার, তাই বোধ হয় ওখানে সোলার পয়েন্ট করা হয়নি, কী হবে এখন !

    নিজের পকেটে একটা ছোট টর্চ ছিলো সোমেশ্বরের। সেটা জ্বাললো, আলোর সুইচগুলো ছেলেরা বন্ধ করলো। ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে টর্চের আলোয় সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে এলো সে, বললো পরের দিন বড়ো স্কুলটার সামনে যে দোকানগুলো হয়েছে, সেখান থেকে মোমবাতি কিনে আনবে ও, পড়া হবে।

    মোমবাতি কিন্তু পাওয়া গেলো না। এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা সোমেশ্বরের। গ্রামের লোকরা মোমবাতি জ্বালে না। কেরোসিন জোগাড় করতে পারে যে ভাগ্যবানরা তারা জ্বালে হ্যারিকেন অথবা কেরোসিনের লম্ফ, বাকিরা আলো জ্বালেই না। কাজেই পরের দিনও অনিশ্চয়তার মধ্যেই স্কুলবাড়িতে পড়তে বসে ওরা, বসে একটু তাড়াতাড়িই, ছটার আগেই, আর আবার আলো নিভে যাওয়ার আগে পর্যন্ত পড়াশোনা হয়। পরের দিন কলকাতায় যাওয়ার কথা সোমেশ্বরদের, ও বললো কলকাতা থেকে কিনে আনবে মোমবাতি।

    জুতোর কথাটা ইচ্ছে করেই অনেকদিন তোলেনি, আজ রাত্তিরে খাওয়ার সময় কথাটা তুললো সোমেশ্বর। কথাটা ওঠায় স্পষ্টতই বিব্রত জয়মালিকা, এক রাশ অস্বস্তি ওর চোখেমুখে। সঙ্কোচে বলে, একেবারে ভুলে গেছিলাম মাষ্টারমশাই। কলকাতায় যখন যাই হাজারটা কাজ থাকে, একটা করতে আরেকটা ভুলি। আপনি তো যাচ্ছেন কলকাতা, একটা ফোন নম্বর আপনাকে দিয়ে দেবো, একবার ফোন কোরে দেখবেন?

    ঠাণ্ডা তো পড়েই গেছে ম্যাডাম, বলে সোমেশ্বর, এখন অর্ডার দিয়ে ডেলিভারি পেতে পেতে অনেকদিন কেটে যাবে। আমার মনে হয় আমাদের রেডিমেড জুতো কিনে নেওয়াই ভালো। আমি কলকাতায় খোঁজ নেবো, আপনি বান্দোয়েনে একবার দেখবেন নাকি? ওখানে তো দেখেছি বেশ দুয়েকটা বড়ো বড়ো দোকান আছে।

    উত্তর দেয় উৎপল, না না, বান্দোয়ানে স্কুলের ছেলেমেয়েদের জুতো পাওয়া যাবে না। এখানে জুতো পরবে কে? অতো বাবুগিরি করার লোক এখানে কোথায়? রাস্তাঘাটে দেখেছেন নাকি এখান
    কার কোন বাচ্চাকে জুতো পরে স্কুলে যেতে?

    দেখেছি বৈকি, বলে জয়মালিকা, তুমি বান্দোয়ানে যাও না বেশি, তাই দেখতে পাও না। দু-তিনটে বড়ো স্কুল আছে ওখানে, সবরকমের ছেলেমেয়েরাই পড়ে। তারপর সোমেশ্বরকে বলে, আপনি কলকাতায় একটু খোঁজ নিয়ে আসুন, আমিও দেখছি এখানে।

    পরের দিন সকালে সোমেশ্বরের গাড়ি যখন খুশিঝোরার গেট পেরোচ্ছে, গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুজফ্‌ফর আর চার-পাঁচজন ছাত্রছাত্রী বলে, মোমবাতিটা ভুলবেন না স্যর।


    (ক্রমশঃ)

    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক

     

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৩ অক্টোবর ২০২১ | ৪১৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন