• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • বৃত্তরৈখিক (৪৫)

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ৩১ জুলাই ২০২১ | ৪৭৭ বার পঠিত
  • ~৪৫~

    জলধরকে জয়ি বলে, বাচ্চাদের সাঁওতালি গান শেখাও না একটা, লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে গান শিখুক ওরা। ভালোই যখন শিখছে, শিখুক। একটা কিছু তো ভালোভাবে শেখা হবে।

    জলধরের ইচ্ছেই ছিলো। এমনিতেই এই ছেলেমেয়েদের সুরের ওপর জন্মগত টান, এতো তাড়াতাড়ি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখে ফেলার রহস্য এটাই। তা ছাড়া সাঁওতালি ভাষায় অপূর্ব সব গান আছে যা জলধরের মনে হয় ওদের মানে-টানে বুঝে শেখাই উচিত, খোরোয়াল জনজাতির বংশধর ওরা সবাই, মুণ্ডা সাঁওতাল বা যে নামেই ডাকা হোক না কেন, নিজেদের সংস্কৃতি সম্বন্ধে জানবে না ! জলধর শেখায় ওদের:

    ধারমু উদুঃক্‌ আকাৎ লেকা দেবন মানা কারাম।
    সাধু উদুঃক পারসি হরতে দেবন তাড়াম তাড়াম।।
    তেহেঞ্‌ কবিয়াঃ জানাম দিন আতু কামারবান্দি।
    অনড় হেয় গাগেঃ তাঁহে শিনাম সুতাম বিন্দি।।

    প্রথমে সুর করে গায় জলধর এক একটা লাইন, ছেলেমেয়েরা গায় তারপর, এইভাবে কয়েকবার। তারপর পুরো গানটা কয়েকবার গাওয়া হয় একসাথে, মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায় জলধর। কেউ বোঝে না স্যর থেমে গেছেন, গান চলতে থাকে, শেখা হয়ে যায় গান। জলধর হেসে বলে, আর এক বার ! আর এক বার গায় সবাই, তারপর থামে। জলধর বলে, এই খুশিঝোরায় আমরা করম পুজো করেছিলাম সবাই মিলে, তখন তোরা সবাই জন্মাসনি। জন্মিয়েছিলি যারা, তারাও খুব ছোট ছিলি, তোদের কারোর মনে আছে সে পুজোর কথা? চুপচাপ সবাই, অনেকক্ষণ পরে একটা হাত ওঠে। ক্লাস ফাইভের ভোজরাই কিস্কু।

    আমার দিদি তো জাওয়া এনেছিলো, আমার মনে আছে, বলে ভোজরাই। করম ভাসানের পর সবায়ের সাথে আমিও তো নেচেছিলাম। আর তারপর সবাই রাস্তার পাশে পাশে কী সব লেখা কাপড় টাঙিয়ে দিলো, আমার মনে আছে সব। যারা পড়তে পারে তারা লেখাগুলো দেখে বললো ঠিক ঠিক। তারপর সবায়ের সাথে মিলে আমিও তো জল ঢেলেছিলাম ঐ নতুন লাগানো গাছের চারায়।

    কেন আমরা সবাই জল ঢেলেছিলাম বল্‌ তো।

    ভোজরাই জবাব দেবার আগেই ক্লাস ফোরের আলাদি বলে, জল দিলে গাছ বাড়বেক নাই?

    বাড়বেক, বলে জলধর, গাছ আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি। তাই তো জল দিয়ে গাছ বাঁচানো। আমরা গাছের ফল খাই, পাতা দিয়ে থালা বানাই, গাছ আমাদের পরিষ্কার অক্সিজেন দেয় নিশ্বাস নেবার জন্যে, ছায়া দিলে রোদ্দুর থেকে বাঁচি, শাক-তরিতরকারী-ভাত যা খাই সে সবই তো গাছের থেকে আসে, ছোট গাছ আর বড়ো বড়ো বনের গাছ। বছর বছর যে গাছ লাগাই সেটাকে বলে চাষ করা, আর জঙ্গল বাঁচানোর জন্যে যে গাছ লাগাই সেগুলো বড়ো বড়ো গাছ। করম ঠাকুর চাষের দেবতা, বনের দেবতা, গাছ বাড়ানোর দেবতা। এই দেবতার পুজো আমাদের শিখিয়েছিলেন ধারমু। পুজো মানে পুজো শুধু নয়, পুজো মানে গাছকে ভালোবাসা আর গাছকে বাড়ানো। ধারমু আমাদের গাছকে ভালোবাসতে শেখালেন, আমরাও শিখলাম, তাই আমরা আজও সম্মান নিয়ে বেঁচে আছি, গাছের সাহায্যে। যে গানটা আমরা শিখলাম তার প্রথম লাইনটা আবার গা তো।

    ছেলেমেয়েরা গায় সমবেত: ধারমু উদুঃক্‌ আকাৎ লেকা দেবন মানা কারাম।

    এই লাইনের মানে কী হলো? – জলধর বলে, ধারমুর শেখানো করম পুজো আমরা এখন সবাই মানি; মানি, তাই বাঁচি মাথা উঁচু করে। অনেক দিন আগে, তা প্রায় একশো বছর হবে, আমাদের পূর্ব পুরুষরা নিজেদের ভাষা প্রায় ভুলতে বসেছিলেন। তখন ইংরেজ আমল, আমাদেরই জঙ্গলের জমি কেটে খনি বানিয়ে ওরা আমাদের বাপ-দাদাদের তখন কুলি বানাচ্ছে, হাজার মাইল দূরে ওদের চা-বাগানে ধরে নিয়ে যাচ্ছে কুলির কাজ করার জন্যে, আর আমাদের বাপ-দাদারাও নিজেদের ভাষা ভুলে ওদের ভাষাই শেখার চেষ্টা করছেন। সেই সময়ে জন্ম নিলেন এক আশ্চর্য মানুষ যিনি অনুভব করলেন মাতৃভাষা মানুষের কাছে কত বড়ো সম্পদ। আমাদের তিনি মনে করিয়ে দিলেন নিজের ভাষাই নিজের সম্মান। কে জানিস? জানিস কী নাম তাঁর? সাধু রামচাঁদ। তিনি সাঁওতালি ভাষায় গান লিখলেন, সুর দিলেন তাতে, সবাইকে শেখালেন সে গান, আর এমনকী বইও ছাপলেন। কবিতা, গান, নাটক লিখলেন সাঁওতালি ভাষায়, সাঁওতালি ভাষা সম্মানের আসন পেলো। যে গানটা তোরা শিখলি আজ তার দ্বিতীয় লাইনটা মনে আছে? গাইতে পারবি?

    ছেলেমেয়েদের গলায় যেন জোর বেড়ে গেলো: সাধু উদুঃক পারসি হরতে দেবন তাড়াম তাড়াম।

    জলধরের গলা শোনা যায় আবার, প্রথম লাইন যে বললো ধারমুর কাছে শেখা করম পুজোয় আমাদের সম্মান যেমন বাঁচালাম আমরা, দ্বিতীয় লাইন বলছে ঠিক তেমনি সাধু রামচাঁদ আমাদের যা দেখালেন, সেই ভাষার রাস্তায়, সেই ভাষাপথেই, হেঁটে আমরা সম্মানিত হবো। এই সাধু রামচাঁদ কোথায় জন্মেছিলেন জানিস? কে জানিস হাত তোল।

    কোন হাত ওঠে না। জলধর চুপ করে থাকে কয়েক মুহূর্ত, তারপর বলে, আমাদের এই জঙ্গলমহলেই জন্মেছিলেন তিনি। বেশি দূর নয়, গ্রামটার নাম কামারবান্দি। এই যে তোদের উৎপল স্যর আছেন, ওঁর যেখানে বাড়ি, ঝাড়গ্রামের কাছে বিনপুর, সেখান থেকে খানিকটা দূরে একটা ছোট শহর আছে, শিলদা তার নাম। সেই শিলদার কাছেই কামারবান্দি গ্রাম। যে গানটা আমরা শিখছি আজ, সেই গানটা লিখেছেন গোমস্তাপ্রসাদ সোরেন নামে একজন বিখ্যাত সাঁওতাল কবি। কেন লিখেছেন জানিস? লিখেছেন সাধু রামচাঁদের জন্মদিন উপলক্ষে। গানের তৃতীয় লাইনটা গাইতে পারবি তোরা?

    শোনা যায় লাইনটা: তেহেঞ্‌ কবিয়াঃ জানাম দিন আতু কামারবান্দি।

    তেহেঞ্‌ কবিয়াঃ, বলে জলধর, সেই কবির, অর্থাৎ কবি সাধু রামচাঁদের, যাঁর জন্ম কামারবান্দি গ্রামে, তাঁর আজ জন্মদিন। সে কবি কেমন কবি? চার নম্বর লাইন, মানে শেষ লাইনটায় সে কথাই বলেছেন গোমস্তাপ্রসাদ। সাধু রামচাঁদ তাঁর কবিতা বেঁধেছেন সূক্ষ্ম ছন্দে, অতি সূক্ষ্ম ছন্দ, যেন মাকড়সার জালের সুতোর মতো: অনড় হেয় গাগেঃ তাঁহে শিনাম সুতাম বিন্দি।

    সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েদের মুখের ওপর ঘুরে ঘুরে যায় জলধরের চোখ, সে চোখে টলটল করে জল। আবেগঘন গলায় জলধর বলে, সাধু রামচাঁদের জন্ম যেন আমাদের জাতির নবজন্ম। আয়, কবি সাধু রামচাঁদের সেই জন্মের কথা মনে করে আমরা আর একবার সবাই মিলে গাই গানখানা। সবাই মিলে গায় গান, সে গানের শব্দ কতদূর ভেসে যায় জানে না জলধর, দূরে দূরে থাকে খোরোয়াল জনজাতির যে মানুষ তারা কী শুনতে পায় এই গান?

    এই নিয়ে চারখানা গান শেখা হলো ছেলেমেয়েদের। শেষ গানটা শিখিয়েছে জয়ি, মেঘের কোলে রোদ উঠেছে বাদল গেছে টুটি। স্কুলে আজকাল নতুন একটা নিয়ম হয়েছে। বাস থেকে নেমে সোজা নিজের নিজের ক্লাসরূমে না গিয়ে স্কুলবাড়ির পাশের মাঠটায় লাইন করে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় ছেলেমেয়েরা। বাসটা তাদের নামিয়ে দেয় গেটের বাইরে, আর সেখান থেকেই লাইন করে তারা হেঁটে যায় শুরকির রাস্তাটা ধরে, ছোট দরজাটা পেরিয়ে সোজা পৌঁছিয়ে যায় মাঠটায় আর লাইন করে দাঁড়িয়ে পড়ে। উৎপল তাদের শিখিয়েছে বয়েসে বড়ো চেনা-অচেনা যার সাথেই দেখা হোক না কেন, পুরুষ হলে তাকে বলতে হবে গূড মর্ণিং স্যর, আর মহিলা হলে গূড মর্ণিং ম্যাডাম। মজাই পায় ছেলেমেয়েরা, কখনো বলতে ভোলে না, আর ভারি খুশি হয় উত্তর পেলে, বড়োরাও যদি তাদের বলে গূড মর্ণিং। ঠিক আটটার সময় একটা ঘন্টা পড়ে, আর তখন শুরু হয় সমবেত গান। বাচ্চারা শুরু করে জলধরের শেখানো ধারমু উদুঃক্‌ আকাৎ লেকা দিয়ে, তারপর পরপর তারা গায় গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ, আমরা নূতন যৌবনেরই দূত আর মেঘের কোলে রোদ উঠেছে। সবাইকে জানাবার মতো নতুন যদি কিছু থাকে উৎপল তা ঘোষণা করে। এই অ্যাসেমব্লি। এ এখন রোজকার নিয়ম। অ্যাসেমব্লির পর আবার লাইন করে ছেলেমেয়েরা ঢুকে যায় নিজের নিজের ক্লাসে।

    এ অঞ্চলে বর্ষা কম। তবে, গরমটা খানিকটা কমেছে। গেস্ট হাউজ ফাঁকা, তেমন কিছু কাজ নেই। স্কুলের মাঠে বিকেলে খানিকটা দৌড়োদৌড়ি করছে ছেলেমেয়েরা, গেটের বাইরের রাস্তাটায় পায়চারি করছেন প্রতুল বাবু। একটা বড়ো গাড়ি এমন সময় এসে দাঁড়ালো, ভেতরে আট-দশজন প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন প্রতুলবাবুকে, খুশিঝোরা এটাই তো?

    হ্যাঁ, বলেন প্রতুলবাবু, আপনারা?

    আমরা কলকাতা থেকে আসছি। এখানে এখন থাকা যাবে তো?

    আসুন, ভেতরে আসুন। গেটটা খুলে দেন প্রতুলবাবু, গাড়ি ভেতরে ঢুকে যায়।




    'কনেক্ট বাংলা'র প্রোগ্রামে জয়িকে দেখেছেন এই প্রৌঢ়-প্রৌঢ়ার দল। এঁরা সবাই ভালো চাকরি-বাকরি করতেন, এখন রিটায়ার করেছেন, যাদবপুর অঞ্চলে মোটামুটি একই পাড়ায় থাকেন সবাই, জয়িকে ঐ প্রোগ্রামে দেখে মুগ্ধ, যদি কোন সাহায্য করতে পারেন ওর কাজে ! ওঁরা সঙ্গে এনেছেন নতুন পুরোনো মিলিয়ে প্রচুর জামাকাপড়, শ দুয়েক সন্দেশ গিরিশ চন্দ্র দে-র দোকান থেকে, এবং বেশ কিছু রং-পেনসিল-খাতা-কলম। দিন দুয়েক থাকার ইচ্ছে।

    দুরকম গেস্ট হাউজের কথা শুনে অপেক্ষাকৃত সস্তারটা পছন্দ করলেন ওঁরা, দুটো ঘরে পুরুষরা আর দুটো ঘরে মহিলারা। জয়ি বললো, আজ রাত্তিরে খাওয়ার একটু অসুবিধে হবে আপনাদের, আগের থেকে জানা থাকলে কিছু ব্যবস্থা করে রাখা যেতো, এখন ভাত ডাল আর আমাদের এখানে ফলানো কিছু সব্জি।

    আপনাদের চাষের? তারপর আর কথা কী?

    সন্দেশগুলো স্কুলের বাচ্চাদের জন্যে এনেছেন ওঁরা। বাকি জিনিসগুলোও ওদেরই জন্যে, তবে আপনারা রেখে দিন, প্রয়োজন মতো দেবেন ওদের।

    সকাল ছটায় স্কুলের বাসটা বেরিয়ে যায় বাচ্চাদের আনতে। জয়ির সাথে কথা বলে এই গ্রূপের মুখপাত্র সুনির্মল রায় এবং আর এক জন সেই বাসে গেলেন।

    সাতঘুরুং ছাড়িয়ে আরও খানিকটা যাওয়ার পর পাহাড়ি রাস্তার শুরু। পাহাড়কে বেড় করে রাস্তাটা পেঁচিয়ে ওঠে, তার দুধারে জঙ্গল। বড়ো বড়ো গাছ, শাল মহুয়া শিমুল কেন্দু। মাঝে মাঝে জঙ্গল এতো ঘন, সামনের সবুজটায় আটকিয়ে যায় চোখ, তার ওপারে কী আছে জানা যায় না। বাস চালায় যে ছেলেটি সে বলে এই জঙ্গলে হাতি আছে। প্রথমে বলে আছে, তারপর নিজেই নিজেকে শুধরে নেয়, বলে, আছে বলে ভুল করলাম, বলা উচিত আসে। ওরা যে কোথায় থাকে, কোথায় যে ওদের আস্তানা বোঝা যায় না। মাইলের পর মাইল পেরিয়ে যায় মুহূর্তেই এক একটা হাতির দল। এ জঙ্গলের শেষ নেই, এই যে চললো, চললোই; একটার পর একটা পাহাড় ঝর্ণা নদী পেরিয়ে কতো দেশের মধ্যে দিয়ে চলেছে জঙ্গলটা কেউ তা জানে না। বলতে বলতে হঠাৎ একটা পাক ঘোরে বাসটা, দেখা যায় তিনটে পুচকে, একটা মেয়ে আর দুটো ছেলে, একটা ছেলের পায়ে জুতো বাকি দুজনের খালি পা, পিঠে ব্যাগ, প্রাণপণে নাড়ছে ছোট ছোট হাত। ড্রাইভার বিশু হর্ণ বাজিয়ে জানান দেয়, দেখেছি, দেখেছি তোদের। তারপর ওদের কাছাকাছি যে পর্যন্ত বাস যেতে পারে সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। বাচ্চা তিনটে দৌড়োতে দৌড়োতে আসে, লাফ দিয়ে উঠে পড়ে বাসে, একটা সীটেই বসে তিনজন, এক গাল হাসি। তারপর সুনির্মল আর তার সাথীকে দেখে – যেন ভুলে গিয়েছিলো শুধরিয়ে নিচ্ছে – বলে ওঠে, গূড মর্ণিং স্যর। সুনির্মলরা জবাব দেন, গূড মর্ণিং। লাজুক হাসে বাচ্চারা। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে গুটিকয়েক মাটির কুটীর দেখা যায়, সুনির্মলরা বোঝেন একটা গ্রাম পেরিয়ে গেলেন তাঁরা।

    ছাড়া ছাড়া গ্রাম। এরকম আরও খানিকটা যাওয়ার পর দেখা যায় আর একটা গ্রাম, তার পরেও খানিকটা গেলে আর একটা। কোন গ্রাম থেকে আসে দুটো বাচ্চা, কোনটা থেকে একটাই, বাসে বসে বসেই দেখা যায় দূরের পাহাড়ি পথ দিয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে নেমে আসছে পিঠে ছোট-ব্যাগ কোন শিশু। এইভাবে মোট উনিশটা ছেলেমেয়েকে এই দূরের গ্রামগুলো থেকে তুলে ফেরৎ আসবে বাসটা। ফেরার মুখে পাহাড়ি রাস্তা থেকে সাতঘুরুং নদীর পাশে সমতলে পৌঁছোয় বাসটা যখন, তখন দেখা যায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে, সঙ্গে বড়োরাও কেউ কেউ। এই বাচ্চারা ওঠার পর বোঝাই হয়ে যায় বাস, সোজা ফেরে খুশিঝোরার গেটের সামনে। বাচ্চারা নেমে যায়, নেমে যান সুনির্মলরাও। খালি বাসটা এবার যাবে উল্টোদিকে, ডাংলাজোড়া আর পাতাপাড়া থেকে বাচ্চাদের নিয়ে আসবে স্কুলে।

    গতকাল রাতে খাওয়ার সময় বোঝা গিয়েছিলো সুনির্মলদের দলের সবায়েরই পরের দিন স্কুলে পড়াবার সখ। জয়ি বলে, যে দুদিন আপনারা আছেন, আপনাদের হাতেই ছেড়ে দেবো স্কুল। কিন্তু দুদিনই বা কেন, আসুন না আপনাদের কেউ কেউ, এখানে থেকে যান না, আপনারা তো রিটায়ার করেছেন।

    আজ সকালে বাচ্চাদের নিয়ে ফিরে আসার পর সুনির্মল বলেন জয়িকে, আপনার প্রস্তাবটা, মানে কাল যেটা দিচ্ছিলেন রাতে খাওয়ার সময়, যদি মেনে নিতে পারতাম তাহলে সত্যিই খুশি হতাম। আমাদের, মধ্যবিত্তদের, মুশকিল কী জানেন তো, আমরা চাকরি থেকে রিটায়ার করে নতুন চাকরিতে ঢুকে যাই ফ্যামিলিতে। কমিটমেন্টের আর শেষ নেই। কিন্তু আপনার কাজ দেখে লজ্জা করছে আমার। সব কিছু এতো অল্প বয়েসে ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে, অমন প্রমিজিং কেরিয়ারের কথা ভুলে গিয়ে আপনি যে কী কাজ করছেন নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। দূর দূর গ্রাম থেকে একটি একটি আদিবাসী বাচ্চাকে এতো কষ্ট কোরে বাসে কোরে নিয়ে এসে আপনি যেভাবে শিক্ষিত করার চেষ্টা করছেন সে তো ভাবাই যায় না। আমি জানি না, আপনার আগে কেউ এ কাজ করেছে কিনা !

    অ্যাসেমব্লি দেখতে গিয়েছিলো ওরা সবাই। দেখে, মুগ্ধ একেবারে। এমন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলো আদিবাসী ছেলেমেয়েরা !
    ভাবা যায় ! সাঁওতালি গান শুনে ওরা বললো, গান তো দারুণ ভালো, মানে কী ! ক্লাস ফাইভের দুটি ছাত্র কী চমৎকার বুঝিয়ে দিলো গানের মানে ! লাইন ধরে ধরে !

    দুপুরে খাওয়ার সময় সুনির্মল তাঁর আর একটি পরিচয় দিলেন। কলকাতার নাম-করা এক ইংরিজি দৈনিকে চাকরি করতেন তিনি। এই খবরের কাগজ প্রতি বছর বিভিন্ন স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে উৎসব করে একটা, উৎসবটা জুলাই-আগস্টেই হয়। এই উৎসবে নানারকমের প্রতিযোগিতা হয় বিভিন্ন স্কুলের মধ্যে। এ বছরের উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্যে আবেদন করার শেষ তারিখ পেরিয়ে গেছে অনেকদিন। কিন্তু উনি চান খুশিঝোরার স্কুলের ছেলেমেয়েরা ওদের এই চারখানা গান নিয়ে যোগ দিক প্রতিযোগিতায়। জয়িরা কী রাজি? উনি তাহলে টেলিফোনে একবার ওঁর পুরোনো সহকর্মীদের সাথে কথা বলে দেখতে পারেন কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা।

    জয়ি বলে, বেশ তো, কথা একবার বলেই দেখুন না কী বলেন ওঁরা।

    খুশিঝোরার ফোন থেকেই কথা বলেন সুনির্মল। তারপর জয়িকে বলেন, আপনি দশজনের একটা টীম তৈরি করুন। ওদের নাম দিয়ে একটা সাদা কাগজে – না না, আপনাদের লেটারহেড আছে তো? লেটারহেডে – একটা অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে দিন, আমি জমা করে দেবো। হয়ে যাবে। প্রোগ্রামের ডিটেল ওরা আপনাদের জানিয়ে দেবে।

    তারপর হঠাৎ মনে পড়ায় সুনির্মল বলেন, একটা কথা বলি, কিছু মনে করবেন না। দেখেশুনে মনে হলো আপনাদের স্কুলে ছেলেমেয়েদের কোন য়্যুনিফর্ম নেই, জুতোও নেই বোধ হয়। এইসব প্রোগ্রামে প্রপারলি ড্রেস্‌ড্‌ হয়ে যাওয়াই ভালো। সব এলিট স্কুলের ছেলেমেয়েরা আসবে, আমি চাই না খুশিঝোরার ছেলেমেয়েদের মনে কোন ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স হোক। আমাদের এমনিতেই কিছু ডোনেট করে যাবার প্ল্যান ছিলো। য়্যুনিফর্মটা আমরা ডোনেট করলে মাইণ্ড করবেন আপনি?

    মাইণ্ড করবো? কেন? আমরা তো আপনাদের মতো বন্ধুদের সাহায্যেই সব কিছু চালাচ্ছি।

    সব ছেলেমেয়েদের য়্যুনিফর্ম তৈরি করতে সময় লাগবে। আচ্ছা, কাছাকাছি বড়োসড়ো কোন মার্কেট আছে?

    আছে, জয়ি বলে, বান্দোয়ান। ওখানে সব কিছু পাওয়া যায়, এখান থেকে মাইল আট-দশ হবে। আর আমাদের টীচার আছেন, জলধর। সকালে অ্যাসেম্বলির সময় আপনি দেখেননি, উনি একটু দেরিতে আসেন। সাঁওতালি গানটা ছেলেমেয়েদের উনিই শিখিয়েছেন, উনি নিজেও সাঁওতাল। এতক্ষণে এসে গেছেন নিশ্চয়ই। আমি দেখছি, জলধর সঙ্গে থাকলে আপনাদের কোন অসুবিধেই হবে না।

    জলধর মোটর-সাইকেলটা রেখে যায় স্কুলে, সুনির্মলদের গাড়িতে ওঠে। যাওয়ার আগে হিসেব করা হয়, স্কুলের একশো উনিশ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সত্তর জন ছেলে, উনপঞ্চাশ জন মেয়ে। সুনির্মল বলেন, ছেলেদের জন্যে শার্ট আর হাফ-প্যান্ট, মেয়েদের শার্ট আর স্কার্ট। রং-টং জলধরবাবুর পছন্দ অনুযায়ীই হোক্‌, কী বলেন ম্যাডাম?

    হোক্‌।

    সবায়ের একসাথে হলো না, কিন্তু শার্ট প্যান্ট স্কার্টের কাপড় কেনা হলো সবায়েরই। নাগবাবুদের দোকানেই পাওয়া গেলো, ওঁরা বললেন মাপ নিতে স্কুলে পাঠিয়ে দেবেন ওঁদের লোককে। জুতোর দোকানের সাথেও কথা হলো, একশো উনিশ জোড়াই একসাথে দিতে পারবে না ওরা, তবে দশ জোড়া এখনই দিয়ে দেবে, বাকিগুলো একটু সময় নিয়ে আনিয়ে দিতে হবে।

    নির্দিষ্ট দিনে কলকাতার নজরুল মঞ্চে অগণিত দর্শককে মাতিয়ে দিলো দশটি ছোট ছোট আদিবাসী ছেলেমেয়ে। কলকাতার নাম করা এক মিশনারি স্কুলের ছেলেমেয়েদের সাথে ভাগ কোরে নিলো খুশিঝোরা স্কুলের ছেলেমেয়েরা প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার। পুরস্কার বিতরণ হয়ে যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুরোধে জয়মালিকা সেন উঠলেন মঞ্চে। সমবেত করতালির শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেলো জয়মালিকার কণ্ঠস্বর: আজ জঙ্গলমহলের এই আদিবাসী শিশুরা প্রথম জানলো এ দেশের জল বাতাস শিক্ষা খাদ্য আনন্দ বিষাদ এবং গণতন্ত্রে ধনী শিক্ষিত পিতামাতার সন্তান এবং তাদের সমান অধিকার। জয়মালিকা সেনের চোখের জলে ভেসে গেলো তাঁর শাড়ির আঁচল।


    (ক্রমশঃ)

    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ৩১ জুলাই ২০২১ | ৪৭৭ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • jolly | 103.50.83.151 | ০৩ আগস্ট ২০২১ ১৫:১৪496364
  • দারুন। তারপর 

  • moulik majumder | ০৩ আগস্ট ২০২১ ২৩:৩৬496381
  • এই পর্ব অপূর্ব

  • চৈতালি | 2402:3a80:1f0b:5b51:415:5ffe:7aad:2aeb | ০৫ আগস্ট ২০২১ ১৬:৩০496462
  • অপূর্ব 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন