• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • বৃত্তরৈখিক (২৯)

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১০ এপ্রিল ২০২১ | ৩৪৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ~২৯~

    বেশ কিছুদিন আগের কথা, বছর কুড়ি-পঁচিশ তো নিশ্চয়ই। কলকাতা কর্পোরেশনের প্রধান কার্যালয় যে বিখ্যাত লাল বাড়িটিতে অবস্থিত তার বিপরীত দিকে মার্কেট স্কোয়ারে কলকাতার তরুণ চিত্রশিল্পীদের প্রথম ওপ্‌ন্‌-এয়ার আর্ট ফেয়ার। তরুণ চিত্রশিল্পীরাই ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত শিল্পীও যোগ দিয়েছেন, তরুণদের পাশাপাশি তাঁদের ছবিও প্রদর্শিত হচ্ছে। গণেশ পাইনের অনেকগুলি কাজ ছিলো সেই প্রদর্শনীতে। সেই ছবিগুলির মধ্যে একটি ছোট ছবি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় সেটি গণেশ পাইনের নিজের আঁকা নয়, একেবারে শেষ মুহূর্তে কলকাতার থেকে বেশ দূরের একটি স্টীল প্লান্টের শহরের থেকে এক তরুণী ছবিটি পাঠিয়েছেন। প্রদর্শনীতে এই ছবিটি দেওয়ার আর জায়গা ছিলো না, গণেশ পাইন নিজের উদ্যোগে তাঁর নিজের ছবিগুলির ফাঁকে এটি রেখে দিয়েছেন। যতদূর মনে পড়ে, ছবিটি পঁয়ত্রিশ টাকায় বিক্রী হয়ে যায়। এই ছবি আজ কার সংগ্রহে আছে এই প্রতিবেদকের তা জানা নেই।

    ছবিটির নাম ছিলো ব্লাস্ট ফার্নেস। সাধারণ কালি দিয়ে অতি সাধারণ কাগজে আঁকা। কিন্তু এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো বিস্তর। সাধারণ দর্শক-শিল্পী নির্বিশেষে সকলেরই মনে হয়েছিলো এই ছবিটি এক আশ্চর্য বার্তা বহন করে। ব্লাস্ট ফার্নেসে অন্তরীণ যেন এক অনন্ত অশুভ উঁকি মারে ছবির মধ্যে থেকে। মনে হয় ফার্নেসের পেছনেই একটা কিছু অশুভ যেন অপেক্ষা করছে, সুযোগ পেলেই লাফ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে। যে স্টীল প্লান্টের শহর থেকে ছবিটি পাঠানো হয়েছিলো সেই শহরে এই প্লান্টের প্রথম ব্লাস্ট ফার্নেসটি নিয়ে একটি কিংবদন্তি শোনা যায়। কলকাতায় খুব কম লোকই সেটি জানেন। কিন্তু স্পষ্ট করে আঁকা না হলেও এবং কিংবদন্তিটি জানা না থাকা সত্ত্বেও অশুভটি যেন দেখতে পান সবাই। ছবিটি দেখতে দেখতে নিজের চোখ এবং সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ-হারানো দর্শককে রুদ্ধশ্বাসে যেন শিল্পী অপেক্ষা করিয়ে রাখেন হঠাৎ একটা কিছু ঘটে যাবার গা-ছমছমে দোদুল্যমানতায় ! কোন্‌ যাদুবলে কিংবদন্তিটিকে তাঁর ছবির এক অদৃশ্য অংশ করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন অসাধারণ এই তরুণী চিত্রকর? কী ছিলো তাঁর ফাউন্টেন পেন-এ, যা দিয়ে তিনি এঁকেছিলেন ছবিটি?

    গত ছয় থেকে একুশে নভেম্বর পুরুলিয়া জেলার এক প্রত্যন্ত এবং আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে ষাটখানি ড্রয়িঙের এক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলো। ছবিগুলি এঁকেছেন এক মহিলা শিল্পী, নাম জয়মালিকা। এই ষাটখানি ছবির আটটির অনুলিপি কিছুদিন আগেই প্রকাশিত হয়েছে অধ্যাপক নিলীন মিত্রের সদ্যপ্রকাশিত স্বেচ্ছাজঙ্গলবাসী পাহাড়ি খাড়িয়া গ্রন্থের চিত্রিত অংশ হিসেবে। কিন্তু ষাটখানি ছবি একসাথে যাঁরা দেখলেন তাঁরা ছবির আনাচে-কানাচে উঁকি দিতে দেখলেন শিল্পীর চেয়েও অনেক স্পষ্ট এবং পরিশ্রমী এক নৃতত্ত্ববিদকে। একটি জনজাতির নানা সামাজিক ক্রিয়াকর্ম, ব্যক্তিগত অনুভূতি, জীবনসংগ্রাম এবং ক্ষয়িষ্ণুতার প্রায় পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টেশন এই ষাটখানি ছবি। জয়মালিকার এই প্রদর্শনীটি অতি নিশ্চিতভাবে শিল্পীর নিষ্ঠা এবং পরিশ্রমেরও ডকুমেন্টেশন। দু দফায় দীর্ঘদিন পাহাড়ি খাড়িয়াদের বাসভূমিতে এবং বাসস্থানে তাদের সাথে বাস করে, তাদের বিভিন্ন ক্রিয়াকর্মে যোগ দিয়ে, প্রতিটি খুঁটিনাটির উপর চোখ রেখে, এবং প্রতিটি ক্রিয়ার কারণ অনুসন্ধান করে এতগুলি চিত্রসৃষ্টি যে কী সময়, অধ্যবসায় এবং পরিশ্রমের বিনিময়ে সম্ভব হয়েছে, তা ভাবলে দর্শককে শ্রদ্ধানত হতেই হয়।

    শিল্পীর নিষ্ঠা এবং পরিশ্রমের প্রসঙ্গে এই প্রতিবেদকের আর একটি কথা মনে হয়েছে, সে কথাটি এবার নিবেদন করা যাক। সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যাঁরা গবেষণা করেন তাঁরা একটি বিশেষ ব্যাপারে সততই সতর্ক থাকেন। জীবিত বা জড়, চলমান বা স্থির, যা কিছুই তাঁদের সামাজিক বিশ্লেষণের উপাদান, সেগুলির সম্বন্ধে বিশ্লেষক হিসেবে নিজেদের ব্যক্তিগত আবেগকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয় তাঁদের। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ব্যক্তিগত আবেগ এক ধরণের প্রতিবন্ধক। সযত্নে সব ধরনের সাবজেক্টিভিটি পরিহার করে, আবেগহীন, যুক্তিপ্রযুক্ত সম্পূর্ণ অবজেক্টিভ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াই সমাজবিজ্ঞানীর শিক্ষা। কিন্তু একজন কবি বা শিল্পীর ক্ষেত্রেও কী এই পদ্ধতি প্রযোজ্য? যে সাতটি রঙের সমাহার সূর্যের বিচ্ছুরণের রংটি, তাদের প্রত্যেকের ভিন্নতা বিজ্ঞানীর বিশ্লেষণের বিষয় হতে পারে, কিন্তু একজন কবি বা শিল্পীর সৃষ্টিতেও কী আমরা সেই বিশ্লেষণ দেখতে চাই, নাকি আমাদের আশা থাকে ঐ বিচ্ছুরণ শিল্পী বা কবির মনে যে আবেগ সৃষ্টি করলো তার শরিক হওয়ার? শুধুমাত্র নীল রঙের বৈচিত্র ব্যবহার করে কোন শিল্পী যখন সূর্যাস্তের ছবি আঁকেন, আমরা কী ছবিটিকে অবাস্তব বলে সরিয়ে রাখি, না শিল্পীর ব্যক্তিগত আবেগে অনুরণিত হয়ে বারবার ফিরে যাই সেই সৃষ্টির কাছে? জয়মালিকার ষাটখানি ছবিতে আমরা পাহাড়ি খাড়িয়াদের জীবন সম্বন্ধে খানিকটা ধারণা পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু সে ধারণা বিজ্ঞানীর অবজেক্টিভ বিবরণ, তাতে শিল্পী অনুপস্থিত। খাড়িয়া-সহবাস শিল্পীর মনে যে আবেগ সৃষ্টি করলো, তার শরিক হওয়ার সুযোগ থেকে জয়মালিকা আমাদের বঞ্চিত করলেন কেন?

    প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হলো যেখানে সেই ভবনটি এবং তার আনুসঙ্গিক উদ্যান, গাছপালা, উৎসাহী আদিবাসী দর্শকবৃন্দ, এবং প্রদর্শনীকক্ষটিরই এক প্রান্তে আরও খানদশেক ছোট ছোট ছবি দর্শকের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই ছোট ছবিগুলি স্থানীয় আদিবাসী শিশুদের আঁকা, এবং দৈনন্দিন আদিবাসী জীবনই এগুলির বিষয়বস্তু। পিকাসোর বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ না করেও আমরা স্তব্ধ বিস্ময়ে ঐ দশখানি ছবিতে বারবার ফিরে আসি। শিশুমনের আবেগজড়িত অস্থির রেখায় উপস্থাপিত ছবিগুলির থেকে আমরা কিছুতেই চোখ বা মন ফিরিয়ে নিতে পারি না।

    কলকাতা থেকে এতদূরে এই আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলটি এই প্রদর্শনীর জন্য কেন নির্বাচিত হলো অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদের পুলক ও বিস্ময় জাগে। প্রদর্শনীটির আয়োজক যে সংস্থাটি তার নাম খুশিঝোরা সমিতি। বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ, এবং উদ্যানবেষ্টিত যে কক্ষসমষ্টিতে এই প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হলো সেগুলি এই সমিতির মালিকানাধীন। বিশেষ অনুসন্ধানের পর এই প্রতিবেদক জানতে পারেন যে শিল্পী জয়মালিকার নিজস্ব এই সম্পত্তিটি তিনি খুশিঝোরা সমিতিকে এই অঞ্চলের উন্নতিকল্পে দান করেছেন। মূলত বনসৃজন এবং এ অঞ্চলের জনজাতিদের শিল্প-সংস্কৃতি-শিক্ষার প্রসারই খুশিঝোরা সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য। এবং জয়মালিকার প্রদর্শনীটি সেই প্রয়াসেরই অঙ্গ। আদিবাসী শিশুদের যে দশটি ছবির কথা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, সেগুলিও এই প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে আয়োজিত স্থানীয় শিশুদের একটি অঙ্কন প্রতিযোগিতার ফসল। আদিবাসীদের বিষয়ে জয়মালিকার প্রধান আবেগটি বুঝতে এই তথ্যটি আমাদের সাহায্য করে। কোন্‌ আবেগে তিনি পাহাড়ি খাড়িয়াদের নিয়ে এই বিপুল সময় ও অর্থব্যয় করেছেন জানার পর আর একবার আমরা শ্রদ্ধায় আমাদের মস্তক অবনত করি।

    তবুও একটি আফশোস থেকেই যায়, যখন আমাদের মনে পড়ে যে এই প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখিত কলকাতার মার্কেট স্কোয়ারের আর্ট ফেয়ারে পনেরো-কুড়ি বছর আগে ব্লাস্ট ফার্নেসের ছবিটি এঁকেছিলেন যে তরুণী তিনিই আজকের পরিণত মহিলা চিত্রশিল্পী জয়মালিকা !

    দিগন্ত পত্রিকার এই চিত্র-সমালোচনাটা বারবার পড়লো জয়মালিকা। এই আলোচনায় একাধিকবার লেখক শ্রদ্ধায় অবনত হওয়ার কথা বলেছেন, কিন্তু শ্রদ্ধা কিসের জন্যে? কুড়ি-পঁচিশ বছর আগের তরুণী জয়মালিকার শিল্পী প্রতিভার তুলনায় আজকের প্রতিভা যে শ্লাঘনীয় নয়, এমনকি তুলনীয়ও নয়, এ কথা বলতে কোন দ্বিধা করেননি এই প্রতিবেদক। তাহলে শ্রদ্ধা কেন? পরিশ্রম, অধ্যবসায়, নাকি আদিবাসীদের বিষয়ে – লেখকের ধারণায় – জয়মালিকার বিশেষ আবেগের জন্যে? জয়মালিকার জন্মবৃত্তান্ত, তার পিতৃপরিচয়, এ সব কী এই প্রতিবেদকের জানা আছে? থাকলে, তাঁর এই শ্রদ্ধা কী অটুট থাকবে? খুশিঝোরার সম্পত্তিতে জয়মালিকার মালিকানার ব্যাপারেই বা কতটুকু জেনেছেন এই লেখক?

    অস্থির বোধ করে জয়মালিকা। কলকাতা শহরে তার কোম্পানীর গেস্ট হাউজে একা একা বিছানায় শুয়ে গত কয়েক বছরের নানা ঘটনার কথা মনে আসে তার। যে এগজিবিশন আজ তার এত পরিচিতি এনে দিয়েছে, কলকাতার নানা খবরের কাগজ আর পত্রিকা তাকে নিয়ে এতো আলোচনা করেছে যে এগজিবিশনের ফলে, কয়েক বছর আগে সেই এগজিবিশনেরই একটা ছোট সংস্করণ এই খোদ কলকাতা শহরেই তো অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। কেউ আসেনি সেদিন দেখতে, একটা লাইনও আলোচনা হয়নি কোথাও ! কী হলো এর মধ্যে, তফাৎটা কোথায় ! নিলীনের বই? কিন্তু, কতোটা আলোচনা হয়েছে নিলীনের বইকে নিয়ে? নিলীনের বই-ই যদি খ্যাতি এনে দিয়ে থাকে তার, তাহলে সে বই নিজে খ্যাতি পেয়েছে কতটুকু?

    নাকি খুশিঝোরা? শুভেন্দুদা বলেছিলেন এই ছবি দেখানো উচিত ট্রাইবাল মানুষদের, কলকাতায় নয়। খুশিঝোরায় যখন শুরু হলো এগজিবিশনটা, স্থানীয় মানুষরা তো উঁকিঝুঁকি দিয়েও দেখেনি প্রথম প্রথম ! তবে এ-ও ঠিক, জলধর যখন ধরে নিয়ে এলো একদল বাচ্চা ছেলেমেয়েকে, তারপর থেকেই সাঁওতাল-মুণ্ডা-ওরাওঁ আর আদিবাসী নয় এমন স্থানীয় মানুষেরও ঢল নামলো খুশিঝোরায় ! তার আগে তো শুধু কলকাতার দর্শকরাই ! কলকাতার কাগজ-টাগজে অবিশ্যি প্রথম থেকেই খবর বেরোচ্ছিলো, এগজিবিশনের কথা যতটা তার চেয়েও বেশি খুশিঝোরার কথা, আর তাইতেই বোধ হয় অপরিচিত মানুষরাও ভিড় জমাচ্ছিলো শুধু কলকাতা থেকেই নয়, এমনকি রাঁচি-জামশেদপুর-ঘাটশিলা থেকেও !

    তাহলে কী জলধর মুর্মু? সমস্তটাই জলধরের ম্যাজিক? এগজিবিশনের খবরটা পেয়েই উত্তেজনায় ভরপুর জলধর নানা পরিকল্পনা শুরু করে কীভাবে এটাকে সফল করে তোলা যায়। তার দ্বিভাষিক মাসিক পত্রিকা রঘুনাথ কয়েক মাস ধরে প্রচার চালিয়েছে প্রদর্শনীটির ব্যাপারে – এবং এই অঞ্চলের আদিবাসী ও শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে যথেষ্ট প্রচার আছে রঘুনাথ পত্রিকাটির – কিন্তু শুধুমাত্র সেটুকুই নয়; খুশিঝোরাকে প্রদর্শনীর উপযুক্ত করে তোলা, সমস্ত অঞ্চলটাকে উৎসবের সাজে সাজিয়ে তোলা, ভয় ভাঙিয়ে আদিবাসী ছেলেমেয়েদের প্রদর্শনী দেখাতে নিয়ে আসা, এবং সর্বোপরি কলকাতা থেকে আসা মানুষদের জয়ির সম্বন্ধে এবং খুশিঝোরার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবহিত করার জন্যে অনর্গল কথোপকথন – এ সমস্তই প্রদর্শনীর সাফল্য নিশ্চিত করেছে।

    জলধরের প্রতি জয়ির কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এই প্রদর্শনীর সাফল্যে, জলধরই, সুদেশের ভাষায়, ঠিক সময়ে হাজির ঠিক মানুষটি !

    কিন্তু সুদেশ? এতদিন যেখানে, যখন, যে ভাবে প্রয়োজন হয়েছে, সুদেশ ছিলো। যে কাজ জয়ির, সে কাজের জন্যে আলাদা করে সুদেশকে ডাকবার প্রয়োজন হয়নি, সে কাজ সুদেশের নিজেরও। সেই অতদিন আগে, কিশোরী – কিশোরীই তো – জয়মালিকা যখন এলিট সিনেমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, কী করা উচিত ভাবতে না পেরে, শক্তিদার সন্ধানে বেঙ্গল লেদার্সের অফিসের প্রধান ফটকে বিহারী দরওয়ানের সামনে উদ্‌ভ্রান্ত, ঠিক তখনই ছিপছিপে এই যুবকটি সুনিশ্চিত আশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে এসেছিলো তার জীবনে। তারপর থেকে সুদেশই চলমান ভরসা, সব জায়গায় সুদেশ। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও, শুধুমাত্র জয়ির ব্যক্তিগত সুরক্ষার কথা চিন্তা করে, যেখানে কখনো আসে না সেই খালাসিটোলায়, সুদেশ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলো জয়িকে, তাকে প্রায়শ্চিত্য করাতে নিয়ে গিয়েছিলো লিণ্ডসে স্ট্রীটের কেভেন্টার মিল্ক-বারে ! জয়ি যোগ দিতে চায় আর্ট ফেয়ারে, জায়গাটাও চেনে না, ভরসা সুদেশ। এক দিনের মধ্যে কালিঘাটের বাঁধাইকারকে দিয়ে ছবি বাঁধিয়ে আনা। মুক্তমেলায় পর্যুদস্ত জয়ি – আবেগের মুক্তি দেবে কে? – ঠিক সময়ে হাজির সুদেশ, তার সাথে পা মিলিয়ে সেই বেকবাগানে, জিমিজ কিচেন পর্যন্ত ! কমলদার কাছে প্রায়-ধমক- খাওয়া হতাশ জয়ি মাতাল হয়ে খালাসিটোলা থেকে বেরিয়ে কাকে নিশ্চিতভাবে পেয়ে যায় তার হাত ধরে ক্যামাক স্ট্রীটের গেস্ট হাউজ পর্যন্ত সাথে করে নিয়ে যাবার জন্যে? সেই সুদেশ ! তার ঠিক জানা আছে আজ কী মন আর শরীর নিয়ে বেরোবে জয়ি ! তার নিজের প্রয়োজন হয় না জয়ির 'ঠেক'গুলোয় যাওয়ার, খালাসিটোলায় ঢোকেই না সে, এমনকি কফি হাউজেও যায় কদাচিৎ, কিন্তু মূর্তিমান ভরসা হয়ে প্রয়োজনের দিন ঠিক জায়গায় সে থাকবেই ! জয়ির ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করবে সে, যদিও সে জানেনা এই ছবি প্রদর্শনযোগ্য কিনা ! প্রদর্শনীর ব্যর্থতায় ভেঙে-পড়া জয়ির কান্না ভিজিয়ে দেবে তার শার্ট, একটি কথাও বলবে না সে, কিন্তু হাজির থাকবে পর্বতের মতো অটল ভরসায়। কলকাতায় হলো না, বোম্বেতে প্রদর্শনীর পরামর্শ দেবে সে, বিপুল পরিশ্রমে ব্যবস্থা করবে সবকিছু ঠিকমতো নিয়ে যাওয়ার জন্যে, কখনো ভেঙে না পড়ে, কখনো প্রতিদান কিছু না চেয়ে। জয়ি সুন্দরী, জয়ির উপস্থিতি আকর্ষক, এ তো জয়ি শুনে আসছে সেই কিশোর বয়েস থেকে। সুদেশের চোখে কখনো কখনো একটু মুগ্ধতার আভাস, তার বেশি কখনো কিছু নয়। কোন শরীরী আকর্ষণের কোন ইঙ্গিত কখনো দেয়নি সুদেশ, কৃতজ্ঞতায় ভরপুর জয়ি যখন ফার্স্ট
    এ-সির নির্জনতায় নিজেকে উজার করে দিতে চেয়েছে সুদেশের কাছে, স্থিরবুদ্ধি সুদেশ সেদিনও ক্লান্ত জয়ির ঘুম নিশ্চিত করেছে !

    কিন্তু হয়তো তবুও আর সুদেশ নয়। যে বৃত্ত পর্যন্ত সুদেশ চলক্ষম সেই বৃত্ত বোধ হয় পেরিয়ে এসেছে জয়ি। সুদেশের চোখে আদর্শ শিল্পী হয়ে ওঠাই চরম প্রাপ্তি, তাই সে জয়ির কম বয়েসের প্রতিভার প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিতে চায় বারবার। শিল্পী হওয়াটা জয়ির কাছে শেষকথা নয়, শেষকথা বড়ো হয়ে ওঠা। স্টীল প্লান্টের প্রায়-বস্তি আবাসনের মেয়ে সে, তুলির সাথে অযাচিত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার আগে পর্যন্ত স্কুলে নিজের ক্লাশের ছেলেমেয়েদের সাথেও কথা বলার অধিকার ছিলো না তার, এমনকী টিফিনের সময়েও অভুক্ত থাকাই তার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো, তার যে খিদে পেতে পারে এমন কথা যদি কেউ কখনো ভেবেও থাকে, তার বহিঃপ্রকাশ ছিলো না কখনো। নিজের অবস্থান খুব ছোটবেলা থেকেই বুঝেছে সে, সে ভালো ছাত্রী ছিলো না, অন্তত ভালো ছাত্রী হয়ে ওঠার ইচ্ছে বা অধ্যবসায়, কোনটাই তার ছিলো না কখনো। ভবিষ্যতে সে কী হবে, কী করবে, কখনো ভাবেওনি সে কথা, যতদিন না তুলির সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে তার। তুলির সাথে বন্ধুত্ব আর কাকুর আর এক মেয়ে হয়ে ওঠাই তার জীবনের প্রথম মোড়। নিজের সম্বন্ধে এই তার প্রথম একটা ধারণা তৈরি হওয়া: সে-ও নজর কাড়তে পারে। তার প্রতিভা আছে ছবি আঁকার, হয়তো ছবি এঁকেই নজর কাড়তে পারবে সে। শক্তিদার সাহায্য পাওয়া যাবে বুঝতে পেরে এক মুহূর্তেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কলকাতায় চলে আসার। এই বোধ হয় তার নজর কাড়ার সুযোগ। কলকাতায় একা একা থাকতে এসে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে শেখে জয়মালিকা। তার চেহারায় চটক আছে, সে সুন্দরী, সে সহজেই ছোট-বড়ো
    খ্যাত-অখ্যাত নির্বিশেষে মিশতে পারে, সে ভালো কথা বলতে পারে, তার বাচনক্ষমতায় প্রভাবিত হয় মানুষ। এতো গুণ আছে তার ! একটা কিছু তাকে হয়ে উঠতেই হবে। ছবি এঁকেই হোক্‌ বা যেভাবেই হোক্‌ ! কীভাবে সে বোঝাবে সুদেশকে যে ছবি আঁকাই তার জীবনের শেষ কথা নয় ! সুদেশ কি বুঝবে তার কথা?

    মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে জয়ি। সুদেশ নিশ্চয়ই তাকে অনেক ভালোবেসেছে, অনেক উপকার করেছে তার। কিন্তু কী হলো তাতে? সুদেশের চাওয়া আর তার চাওয়ায় অনেক ফারাক ! আকাশের ওপারেও যে আকাশটা আছে সেখানে পৌঁছোতে হবে তাকে। পৌঁছোতেই হবে ! সে যে বাহনেই হোক। সুদেশ আকাশের দিকে তাকাতে জানে না। সে তার নিজের পৃথিবীর বাইরে দেখবে না কোনদিনই ! বিদায় সুদেশ !


    (ক্রমশঃ)

    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১০ এপ্রিল ২০২১ | ৩৪৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ১০ এপ্রিল ২০২১ ১২:২৪104591
  • হেয়ারপিন বেন্ড।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন