• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • বৃত্তরৈখিক (৫৪)

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০২ অক্টোবর ২০২১ | ৪২৫ বার পঠিত
  • ~৫৪~

    পুজোর ছুটির পর আবার স্কুল খুললো। ছুটির সময়ে খুশিঝোরাতেই ছিলো সম্ভৃতা-সোমেশ্বর, বিশেষ কিছু কাজ ছিলো না। তবে কাজ না থাকলেও এমন জায়গায় সময় কাটাতে অসুবিধে হয় না। ডাইনিং হলের ওপর যেখানে নতুন গেস্ট হাউজ, তার ছাদে উঠলে যে দৃশ্য দেখা যায় তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই সময় কেটে যায়। ওদের মনে হয় নীল পাহাড় দিয়ে ঘেরা এক নতুন অচেনা মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে কোন আগ্নেয়গিরির উপর যেন অনন্তকাল বসে আছে ওরা। সূর্যাস্তে আর সূর্যোদয়ে উত্তাপহীন আগ্নেয়গিরির আশ্চর্য শীতল রঙীন আগুন মণ্ডলাকারে ছুঁয়ে যাচ্ছে নীল পাহাড়ের প্রতিটি কণাকে; মুহুর্মুহু যোগ করে চলেছে নীল পেরিয়ে রহস্যময় রঙের ফুলঝুরি, পৃথিবীর জন্ম হয়নি আজও, অনন্তকাল অপেক্ষায় আছে ওরা পৃথিবীর জন্ম হবে বলে।

    স্কুলবাড়ির দোতলার বারান্দার একটা কোণে দাঁড়ালে মখমল-সবুজের বিস্তীর্ণ ভূমিতে নিস্তরঙ্গ জলাশয়। জলাশয়কে ঘিরে বৃত্তাকারে তালগাছের সারি অতন্দ্র প্রহরায় নিশ্চিত করছে জলের নিষ্কম্প শান্তি। পেছনের নীল পাহাড়, আকাশের নীল, নীল জল, সবুজ ঘাস আর ধূসর সমান্তরাল তালদণ্ডের অব্যক্ত শাসনে পৃথিবীর শান্তি যেন শাশ্বত।

    এরই মধ্যে একদিন আসে ক্লাস এইটের সুপ্রকাশ কুম্ভকার। ও একদিন বলেছিলো ওদের পাতাপাড়ায় বাড়িতে বাড়িতে টালি আর টিনের চালের ছাদে মাটির পায়রা সাজিয়ে রাখে ওরা। সোমেশ্বররা বলেছিলো দেখতে যাবে। যাবেন নাকি স্যর আজ? আমাদের পাতাপাড়ায়? – বলে সুপ্রকাশ।

    পাতাপাড়ার শুরুটা খুশিঝোরা থেকে মাইল আড়াই-তিন। ওরা হাঁটতে হাঁটতে গেলো। এ অঞ্চলে এতো বড়ো গ্রাম নেই আর। সামনের দিকটায় যাদের বাস তারা মূলত কুম্ভকার। মাটি দিয়ে নানারকমের হাঁড়ি-কলসি ছাড়াও ওরা তৈরি করে পায়রা। শুধু মাটি। রঙ নেই, নেই কোন তুলির কাজ, তবু কী আশ্চর্য সুন্দর। আর সুন্দর এদের বাড়িগুলো। মাটির বাড়ির বাইরের দেয়ালে শুধু মাটি দিয়েই নানান নকশা। ভিজে নরম মাটিতে শুধু হাত ঘুরিয়েই নানারকমের নকশা করে ওরা। রঙ ছাড়া। মাটির ওপর মাটিই শুধু। চোখ ফেরানো যায় না। তাকিয়ে থাকতে হয়।

    এই পাড়া ছাড়ালে কায়স্থ পাড়া। মাটির বাড়ি ছাড়াও কয়েকটা পাকা বাড়ি চোখে পড়ে এখানে। আর সবশেষের পাড়াটি সাঁওতালদের। সাঁওতালদের বাড়ি দেখলেই চেনা যায়। লালচে ধূসর একরকমের রং। তার সাথে রঙীন আলপনাও কোন কোন বাড়িতে, নীল রঙই বেশি। আর প্রতিটি বাড়ির ছাদের ওপর কুম্ভকারদের তৈরি করা পায়রা। কোন বাড়িতে একটা, কোথাও একাধিক। কিন্তু পায়রা আছেই। পায়রা ভালোবাসার প্রতীক, শান্তির প্রতীক। যে বাড়িতে পায়রা থাকে সেখানে ঝগড়াঝাটি হয়না, সবাই মিলেমিশে থাকে। তাই বাড়ির সামনেই পায়রার খোপ অনেকের। সেখানে স্বাধীন গোলা পায়রা বাসা করবে। কিন্তু সে খোপ থাকুক বা না-ই থাকুক, কুম্ভকারদের তৈরি পায়রা থাকবেই বাড়ির ছাদে।

    ফেরার সময় সুপ্রকাশের বাবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করে ওদের সাথে। ছেলে পড়াশোনা করে কিনা খোঁজ নেয়। সম্ভৃতার ইচ্ছে দুটো পা‍য়রা নিয়ে যাবার। ফলতায় একটা সখের বাড়ি আছে ওদের, সেই বাড়ির গেটের দুপাশে দুটো পায়রা রাখবে সম্ভৃতা। সুপ্রকাশের বাবা বলে, তৈরি করে রেখে দেবো। যখন ইচ্ছে নিয়ে যাবেন।

    যেদিন স্কুল খুললো সেদিন হোস্টেলের ছেলেমেয়েরা বেশির ভাগই আসেনি। স্কুলের বাসে যারা আসে তারা এসেছে ঠিকই, কিন্তু বড়োরাই নেই। প্রতুলবাবু বললেন, এমনটা হয় প্রত্যেক বছরেই। যতই গরীব হোক, যতই বাড়িতে অন্নের সংস্থান না থাকুক, হোস্টেলের ছেলেমেয়েরা বাড়ি গেলে ফিরতে চায়ই না। অন্তত একদিন তো দেরি করবেই। উৎপল বললো, ফাঁকিবাজ সব ! ওদের কী পড়াশোনায় মন আছে নাকি !

    সেইদিনই সন্ধ্যের মধ্যে অবিশ্যি এসে গেলো ছেলেমেয়েরা সবাই, সন্ধ্যেবেলায় সবায়ের সাথে বসাও হলো, তবে পড়া হলো না তেমন। ছুটির অনেক গল্প জমে আছে ছেলেমেয়েদের পেটে, স্যরের সাথে আর ম্যাডামের সাথে গল্পই হলো বেশি, স্যরও পড়ার জন্যে চাপ দিলেন না খুব একটা !

    পরের দিন ছোটদের ছুটির পর যখন সাড়ে দশটায় স্কুলে গেলো সোমেশ্বর, দেখলো ক্লাস সেভেন আর এইট-এর ছেলেমেয়েরা কেউই নেই। কী ব্যাপার? প্রতুলবাবু বললেন গোয়ালটা নোংরা হয়েছে খুব ছু্টির মধ্যে, তা ছাড়া খড়ও গেছে ফুরিয়ে। আজ তাই বড়োদের এখন থেকেই ছুটি। ছেলেমেয়েরা এখন গোয়াল পরিষ্কার করবে, তারপর দুপুরের খাওয়া হয়ে গেলে আনতে যাবে খড়। আজ আর উঁচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের ক্লাস হবে না।

    সোমেশ্বর কথা বলে না। সে মনে মনে ঠিক করে আড়াইটের পর যখন ক্লাস সেভেন আর এইট-এর ছেলেমেয়েরা ফিরে আসবে না, ক্লাস সিক্সের একটা পরীক্ষা নেবে আজ, বারোটার সময় ওদের যে ক্লাস আছে সেখানেই বলে দেবে পরীক্ষার কথাটা।

    ক্লাস সিক্সে বারোটার সময় গিয়ে দেখলো রিমিল নেই। রিমিল হোস্টেলে থাকে, গতকাল সন্ধ্যেবেলা দেখা হয়েছে ওর সাথে। কী ব্যাপার, রিমিল নেই কেন? দেড়টায় দুপুরের খাওয়ার ছুটি। প্রতুলবাবুকে জিজ্ঞেস করে সোমেশ্বর, রিমিল কোথায় জানেন?

    ঠিক জানিনা, বলেন প্রতুলবাবু, তবে আন্দাজ করছি ও-ও গোয়াল পরিষ্কারের কাজে লেগে গেছে। হোস্টেলে থাকে তো, অন্যদের সাথে লেগে গেছে নিশ্চয়ই। ক্লাস ফাইভের হেমালকেও তো দেখলাম না। মনে হয় ও-ও লেগেছে। আপনি খেয়ে আসুন, আমি খবর পাঠাচ্ছি রিমিলকে।

    খাওয়ার পর স্কুলে এলো সোমেশ্বর। মাঠে ক্লাস ফাইভ-সিক্সের ছেলেমেয়েরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, ওদের হাতে হাতে নিজের নিজের অ্যালুমিনিয়মের থালা, খাওয়াও চলছে গল্পও চলছে। নীচের তলার সামনের বারান্দাটায় কয়েকটা অ্যালুমিনিয়মের থালা চাপা দেওয়া। বোঝা যায় গোয়ালে কাজ করছে যে ছেলেমেয়েরা তাদের খাবার ওগুলো। সোমেশ্বর মাঠের দিকে তাকিয়ে হেঁকে ডাকে, ক্লাস সিক্স, তাড়াতাড়ি চল্‌, একশো নম্বরের পরীক্ষা।

    মাঠের একপাশে একটা হ্যাণ্ডপাম্প। পাম্প কোরে সেখান থেকে জল নিয়ে ছেলেমেয়েরা তাদের থালা ধুয়ে রাখে খাওয়া হয়ে গেলে। সোমেশ্বরের হাঁকে তাড়াতাড়ি কোরে ছেলেমেয়েরা লাইন দিলো হ্যাণ্ডপাম্পের সামনে। এমন সময় রিমিলকে দেখা গেলো দৌড়োতে দৌড়োতে আসছে। এসেই সে ক্লাসের দিকে দৌড় লাগালো।

    সোমেশ্বর ডাকে তাকে, কোথায় ছিলি রে এতোক্ষণ?

    গোয়ালে ছিলাম স্যর।

    তুই গোয়াল পরিষ্কার করতে গেলি কেন? তোকে কেউ বলেছে গোয়াল পরিষ্কার করতে খড় আনতে? সেসব তো সেভেন-এইটের ছেলেরা করবে।

    রিমিল জবাব দেয় না, মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। এখন দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছিলি কোথায়? – সোমেশ্বর জিজ্ঞেস করে।

    ক্লাসে স্যর, বলে রিমিল, আপনি ডেকেছিলেন।

    আমি কী তোকে না খেয়ে ক্লাসে যেতে বলেছি? খেয়ে নে।



  • বারান্দায় চাপা দেওয়া যে থালাগুলো রাখা ছিলো তার থেকে একটা তুলে নেয় রিমিল। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের কোরে আনে আধখানা পাতিলেবু আর একটা কাগজের মোড়ক। উবু হয়ে বসে চাপাটা সরিয়ে থালাটা কাছে টেনে নেয় সে। থালাভর্তি ভাত, অনেকটা ভাত। মোড়কটা খোলার পর বোঝা যায় ওতে ছিলো একদলা নুন, সে-ও অনেকটা। পুরো নুনটাই সে ঢেলে দেয় ভাতের ওপর, তারপর লেবুটা চিপে বের করে নেয় শেষ ফোঁটা রসটাও। সোমেশ্বর দেখে ভাতের চূড়োর ওপর একদলা লাউয়ের তরকারি, ঐটুকুই শুধু ! খেতে শুরু করে রিমিল। দশ-বারো বছরের ছেলেটা নুন আর লেবু দিয়ে মাখা এক এক দলা ভাত পুরছে মুখে, আর তারপর ঢুকিয়ে দিচ্ছে একটি বা দুটি লাউয়ের কণা, কণাই প্রায় ! থালার দিকে তাকায় না সে, মুখটা নড়ে আস্তে আস্তে, তার দৃষ্টি দূরে নিবদ্ধ, ভাবলেশহীন।

    এই তরকারিটাই সোমেশ্বরও খেয়েছে আজ দুপুরে, তবে পরিমাণে অন্তত তিনগুণ। তার সাথে ডাল, মাছ, চাটনি।

    হঠাৎ গা গুলিয়ে ওঠে সোমেশ্বরের।

    নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না সোমেশ্বর, বেশ তো দু-আড়াই মাস হয়ে গেলো ওরা এসেছে খুশিঝোরায়, কখনো তো খোঁজ নেয়নি ছেলেমেয়েরা কী খায়। পড়াবে বলেই এখানে এসেছিলো, পড়ানো ছাড়া আর কিছু ভাবেওনি। কোন টাকাপয়সা যেমন নেয় না ওরা খুশিঝোরার থেকে, দেয়ও না কিছু, অথচ ওরা যে খায়-দায়, তারও তো খরচ আছে। খানিকটা সেই কারণেই হয়তো প্রত্যেক সপ্তাহে ওরা কিছু-না-কিছু কিনে আনে বান্দোয়ান থেকে ছেলেমেয়েদের খাওয়ার জন্যে, কিছুটা ঋণশোধের দায়ের কথা ভেবেই। কিন্তু যা আনে তা কী বাচ্চারা খায়? জানেনা তো ওরা। ছেলেমেয়েরা এখানে কারোর সামনে খায় না – সোমেশ্বর জানে না এরকমই নির্দেশ ওদের দেওয়া হয়েছে
    কিনা – নিজের নিজের থালাটি নিয়ে সাধারণত দূরে চলে যায় ওরা, খাওয়া হয়ে গেলে ধুয়েমেজে রেখে দেয় যথাস্থানে।

    বিকেলে সম্ভৃতাকে জিজ্ঞেস করে সোমেশ্বর, ছেলেমেয়েরা কী খায় এখানে লক্ষ্য করেছো কখনো?

    কই না তো, বলে সম্ভৃতা, কেন, কী হলো?

    সকাল থেকে গোয়াল পরিষ্কার করার পর রিমিলের দুপুরের খাওয়ার কথাটা সম্ভৃতাকে বলে সোমেশ্বর।

    প্রতুলবাবু তো রোজ সকালে রান্না করেন বাচ্চাদের সকালের খাবারটা, সম্ভৃতা বলে, ওঁকে জিজ্ঞেস করলেই তো জানা যায় বাচ্চারা কী খায়।

    কর্পোরেট পরিমণ্ডলে জীবনের অনেকগুলো বছর কাটিয়েছে সোমেশ্বর, ও জানে যে কোন সংগঠনেই পরিচালকদের ক্রিয়াকলাপ অন্যদের সাথে আলোচনা করাটা ঠিক নয়, এই আলোচনার পরিণাম অনেক সময়েই খারাপ হতে পারে, যা বলার সরাসরি তাঁদেরই বলা উচিত যাঁরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু তবুও ও ঠিক করে প্রতুলবাবুর সাথেই কথা বলবে। প্রতুলবাবু এই স্কুলের সাথে প্রায় গোড়া থেকেই যুক্ত, ছেলেমেয়েদের ভালোও বাসেন, কোন ব্যক্তিগত অ্যাজেণ্ডা যে তাঁর নেই এ প্রায় স্বতঃসিদ্ধ। অন্যদিকে উৎপল কখনো শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করে না স্কুলের কোন ব্যাপার, এমনকী কবে কখন কেন হঠাৎ ছুটি দিয়ে দেওয়া হবে তা-ও সে কোন শিক্ষককে কোনদিন জানায় না। তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, বলে লাভও নেই কিছু। জয়মালিকার সাথে হয়তো সরাসরি কথা বলা যায়, কিন্তু যে অভিজ্ঞতা সোমেশ্বরের হয়েছে এই ক'দিনে, তাতে সে বুঝেছে জয়মালিকার সাথে কথা বলেও লাভ হবে না। এই যে ছেলেমেয়েদের জুতো কেনার ব্যাপারটা, এতে এতো গড়িমসি কেন? টাকা হাতে এসে গেছে, তবুও কেনা আর হয়ই না ! এসবের অর্থ বুঝতে পারে না সোমেশ্বর। জয়মালিকা বলেছিলো পুজোর আগেই জুতো এসে যাবে ছেলেমেয়েদের, কলকাতার ট্রেন ধরার জন্যে বাসে উঠেও বলেছিলো এবার জুতোর অর্ডার দিয়ে আসবে ও, কিন্তু ফিরে এসে কিছুই বললো না। পুজোর আগে জয়মালিকা চলে গেলো য়্যোরোপে, কিন্তু জুতো এলো না। কালিপুজো এসে গেলো প্রায়, এখানে ভালোই ঠাণ্ডা এখন, সকাল সাতটায় খালিপায়ে স্কুলে আসে যে বাচ্চারা তারা কষ্ট পায়, পা ফেটেছে অনেকের, অথচ এ কষ্টটা তো ছেলেমেয়েরা না-ই পেতে পারতো।

    প্রতুলবাবুকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, সকালের খিচুড়িটা তো পেট-ভরা খাবার নয়, ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোর পর্যন্ত বাচ্চারা বাড়ি ফেরার ঠিক আগেই খায় ওটা, তারপর তো বাড়িতেই চলে যায়। স্কুলে মোট একশো এগারো জন বাচ্চা, মোটামুটি একশো জন আসে রোজ। প্রত্যেক রাত্তিরে ঘুমোতে যাবার আগে চাল আর ডাল বের করে রেখে দেয় উৎপল। দেরিতে ঘুমোয় তো, অতো সকালে উঠতে পারে না। যেদিন খিচুড়ি হয় না, ডালের প্রয়োজন নেই, চালটা একটু বেশি থাকে সেদিন, ফ্যান গালা হয় না। আলু এখানে বস্তা-বস্তা আসে, সাধারণত বেশ বড়ো আলু। পঁচিশটা আলুও গুনে গুনে রেখে দেয় উৎপল। সেই আলুসেদ্ধ, নুন আর লঙ্কা দিয়ে চটকিয়ে ভাগ করে দেওয়া হয় রোজ। প্রতুলবাবু আর মুজফ্‌ফর সাহেবের ব্রেকফাস্টও এখান থেকেই। ওঁদের দুজনের জন্যে আলাদা করে দুটো বাটিতে ওঁদের খাবার রেখে দেয় উঁচু ক্লাসের ছেলেমেয়েরা, তারপর বাকিটা নিয়ে চলে যায় মাঠে। মাসে দুদিন ডিমও দেওয়া হয় ওদের। কুড়িটা ডিম একশো জনের জন্যে। যেদিন ডিম থাকে, দশটা আলু কমানো হয় সেদিন, পনেরোটা আলু রাখে উৎপল। সেই ডিম আর আলু, সেদ্ধ করে একসাথে চটকিয়ে মাখা হয়।

    দুপুরের খাওয়া চল্লিশজন ছেলেমেয়ের জন্যে, ফাইফ সিক্স সেভেন আর এইট। পেট-ভরা ভাত দেওয়া হয় ওদের, সকালের মতো ফ্যানা-ভাত নয়, ফ্যান-গালা ভাত। আর মনে রাখবেন, ওদের পেট-ভরা মানে আপনাদের পেট-ভরা নয়। ভাত ওরা অনেক বেশি খায়, এবং যতটা খায় ততটাই দেওয়া হয়। আমার মনে হয় না পেট-ভরা নিয়ে কোন দুঃখ ওদের আছে। পেট ভরে। রোজই। তবে হ্যাঁ, তরকারির একটা মাপ আছে, সে মাপটা বুঝিয়ে দেওয়া আছে নিমাই আর সুনীলকে। সেটা যে যথেষ্ট নয়, তা আমরা সবাই জানি, নিমাই আর সুনীলও জানে। তাই, যেদিন পারে সেদিন লুকিয়ে-চুরিয়ে একটু বেশিই দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ওরা। আর ধরা পড়লে উৎপলের বক্তৃতা শোনে অনেকক্ষণ, ভালোবাসা দেখিয়ে ভাবছো উপকার করছো ওদের? যতোটা সারা জীবন জোটাতে পারবে ওরা, তার চেয়ে বেশি পাওয়ার অভ্যেস হলে আখেরে ওদের ভালো হবে না !

    প্রতুলবাবু বলেন, রাত্তিরেও ওদের একই খাওয়া। রুটি নয়, ভাতই। ভাতই ওরা পছন্দ করে। তবে ঐ একটাই তরকারি, দুপুরের মতোই, আর পরিমাণটাও একই রকমের। তাই দেখবেন, ওরা পকেটে করে লেবু আর নুন নিয়ে আসে। নুনটা নিমাইই দেয় ওদের, আর লেবুটা কেনে নিজেরা চাঁদা করে।

    তবে একটা কথা, এরকমটাই রোজ নয়। মাঝে মাঝে এ নিয়মের ব্যতিক্রম হয়, বলেন প্রতুলবাবু। খড়গপুরের ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের প্রফেসররা মাঝে মাঝে আসেন এখানে। এক-একবার ওঁরা আসার সময় সাথে করে রান্না-করা খাবার নিয়ে আসেন, কখনও কখনও বান্দোয়ানে গিয়ে বাজার করে নিজেরাই রান্না করেন এখানে। আর তখন দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেমেয়েদের খাওয়ান ওঁরা। সেই সময় খুবই ভালো খাওয়া হয় ওদের। ওঁদের মতো নাম-করা লোকরা যখন খাওয়াতে চান, তখন ছেলেমেয়েদের ভালোই খাওয়া হয়। যাদবপুরের ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের প্রফেসররাও ওঁদের বন্ধু। তাঁরা এলে তো মহাভোজ। একজন দিদিমণি আছেন তিনি সাথে কোরে নিয়ে আসেন অনেক পিঠে, ওঁরা কয়েকজন মিলে নাকি তৈরি করেন সেগুলো আগের দিন থেকে। তিনি এলে পোলাও রান্না কোরেও খাওয়ান ছেলেমেয়েদের। ছেলেমেয়েরা জানে। ওঁকে দেখলেই ওরা বলাবলি করে, এবার পোলাও খাওয়া হবে।

    কিন্তু নাম-করা যাঁরা নন, তাঁদের ম্যাডাম অ্যালাউ করেন না রান্না কোরে খাওয়াতে। একবার একটা ফ্যামিলির অনেকে এলো, তাদের একটা বাচ্চার জন্মদিন পালন করলো তারা এখানে। তারা এসেছিলো জলপাইগুড়ি থেকে। কেক কাটা হলো, সব বাচ্চারা গান-টান গাইলো, সাধু রামচাঁদের জন্মদিনের গানটায় সাধুর নামের বদলে যার জন্মদিন সেই বাচ্চাটা, তার নাম বাপু, তার নামটা বসিয়ে আর কামারবান্দির জায়গায় জলপাইগুড়ি বলে মজা করে গাইলো আমাদের ছেলেমেয়েরা। সবাই খুব খুশি। বাচ্চাটার মা-ঠাকুমা অনেক করে বললো তারা রান্না করে খাওয়াবে স্কুলের ছেলেমেয়েদের। ম্যাডাম রাজি হলেন না। বললেন, আমাদের নিয়ম নেই। আপনারা মেনু বলে দিন, আমাদের টাকা দিয়ে দিন, আমরাই বাজার করে রান্না করে খাইয়ে দেবো। আপনারাও থেকে যান, আপনারাও খেয়ে যাবেন। কিন্তু তারা থাকবে কী করে? তাদের তো ট্রেনের টিকিট কেনা আছে। শেষ পর্যন্ত তারা টাকা দিয়ে গেলো, কিন্তু কিছুই রান্না হলো না তাদের কথামতো। শুধু বাচ্চাদের একটা করে ল্যাংচা দেওয়া হয়েছিলো পরের দিন !

    আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, সোমেশ্বর বলে। এখানে যখন গেস্টরা আসে, গেস্টদের জন্যে তো অনেক কিছুই রান্না করা হয়। অনেক সময় দেখেছি বেশি গেস্ট থাকলে স্কুলের বাচ্চারাই খাওয়ায় তাদের। সেই খাবারের থেকে একটুও কী পায় না ওরা নিজেরা?

    পায় না সোমদা, ওরা পাবে বলে আশাও করে না। তবে একটা কথা বলি, এটা আগে কখনো দেখিনি, আপনারা আসার পর থেকেই দেখতে পাচ্ছি। আপনারা তো প্রত্যেক শনিবার বান্দোয়ান থেকে কিছু কিছু বাজার কোরে আনেন। আপনারা বাজার করলেই উৎপল ছেলেদেরও ভাগ দেয়। কেন দেয় জানিনা, কিন্তু দেয়। এই তো, পুজোর জামা যখন দেওয়া হলো তখন একটা বড়ো মাছ এনেছিলেন না আপনারা? তখন নিরামিষ খাওয়া হচ্ছিলো বলে মাছটা ফ্রিজে রাখা ছিলো। ঝাড়খণ্ডের লোকরা চলে যাবার পর সেই সন্ধ্যেতেই ঐ কবিদলের লোকদের সেই মাছ খাওয়ানো হলো। ছেলেরাই পরিবেশন কোরে খাওয়ালো, সেদিন রাত্তিরে কিন্তু বাচ্চাদেরও এক টুকরো করে মাছ দেওয়া হয়েছিলো, তরকারি ছাড়াও !

    এক টুকরো? – সোমেশ্বরের গলায় অবিশ্বাস আর আতঙ্ক !

    তা-ই বা কদিন পায় বলুন !


    (ক্রমশঃ)

    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০২ অক্টোবর ২০২১ | ৪২৫ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন