• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • বিদ্যুন্মালা ও রান্নাঘর

    স্বাতী রায়
    বিভাগ : আলোচনা | ০২ মে ২০২০ | ৩৭১ বার পঠিত
  • "আজ কি মাছ পেলে গো? " বলতে বলতে মাছের থলেটা উপুড় করে দেন মালিনী। "আরে আস্তে, আস্তে!" বলতে বলতেই কইমাছ গুলো খলবল করে ওঠে। মালিনীর মুখটা চকচক করে ওঠে। তাড়াতাড়ি মাঝারি গামলায় জল ঢেলে মাছগুলো এক এক করে মেঝে থেকে কুড়িয়ে ছেড়ে দেন তাতে। তারপর হাঁক পাড়েন, "জুঁই, জামাকাপড় সাবানে ভিজিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে আয়। বাবা কই মাছ এনেছে, আজ তোকে কই মাছ কুটতে শিখিয়ে দিই।" ফ্রকের ঘেরে হাত মুছতে মুছতে দুই বিনুনি দুলিয়ে রান্নাঘরে আসে জুঁই। শোবার ঘরের বিছানায় মুখ উল্টে পড়ে থাকা শরদিন্দু রচনাবলীর খন্ডটার জন্য একবার মন খারাপ হয়। সাবান ভেজাতে আসার আগে সবে অর্জুন বর্মা জলে ঝাঁপ দিয়েছিল। বিদ্যুন্মালার কি যে হল! দুপুরের আগে আর নিয়ে বসা হবে না। মায়ের কথামত তাকের উপর থেকে পেড়ে আনে হরলিকসের কৌটোয় রাখা ছাই। উনোন ছেড়ে গ্যাসে রান্না করা শুরু হতেই যে বস্তুটি দুর্লভ হয়ে গেছে বাঙালির সংসারে। কাজের বৌকে দিয়ে আনিয়ে অসীম যত্নে তুলে রাখতে হয়। আঁশবটি পেড়ে নিয়ে বসে জুঁই। ক্লাস এইট। সংসারের কাজ এখন না শিখলে আর কখন শিখবে?
    ***
    এই পর্যন্ত লেখা হতেই ডাক পড়ে জুঁই-এর। "জুঁই, জুঁই" বলে ডাকতে ডাকতে হাওয়াই চটি ফটফটিয়ে ঘরেই চলে আসে শেখর। "ওহ স্যরি তুমি লিখতে বসেছিলে। আচ্ছা, লেখো, লেখো। বলছি কফি খাবে? বানাব তাহলে।" ঘড়ির দিকে চোখ পড়ে জুঁই এর। ছুটির দিনের জলখাবার আর তারপর দুপুরের খাওয়ার পর বাসনপত্র মেজে রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে এসে বসতে বসতে বেলা তিনটে। কদিন ধরে ওর স্মৃতিকথা লেখার শখ হয়েছে, আজ ও ঘরে এসে তাই নিয়ে বসেছিল। এর মধ্যেই সাড়ে চারটে বেজে গেল। চা কফির বেলা হয়ে গেছে। কর্তাগিন্নির কফি চললেও বাকীদের চলবে না। শ্বশুরমশাইয়ের ফলের রস, শাশুড়ীর দুধ ছাড়া চা এগুলোর জন্য তাকে উঠতেই হবে। বিকেলের জল খাবারও বানাতে হবে। তাই কলমের ঢাকনি এঁটে উঠতে উঠতে শেখরকে বলে, "কফি আমিই করছি। তুমি বরং একটু বারান্দা থেকে কাচা পর্দাগুলো তুলে এনে আলমারিতে তুলে রেখো। " পাশের ঘরে ছেলে পড়ছিল। যেতে যেতে তাকে ডেকে যায়, " বাবুই রান্নাঘরে আয়, আজ বিকেলে মশলা ব্রেড বানাব। শিখে নিবি আয়। " জানে, ছেলে রান্না করতে ভালোবাসে না একদম। তাই আর ওর মুখের দিকে তাকায় না।
    তবে বাবুই বাধ্য ছেলে। মায়ের কথা অমান্য করে না।
    লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলে মায়ের আগেই রান্নাঘরে পৌঁছে যায়। হাত বাড়িয়ে মাথার উপরের তাক থেকে পেরে আনে ইস্টের কৌটো। বাবুই এর গড়নটা অনেকটা ওরই মতন। মুখের আদলও। আর এক পা তুলে তেরচে উপর থেকে কিছু পাড়ার ভঙ্গিটাও অবিকল জুঁই এর মতোই। জুঁই এর মাথায় একটু চক্কর লাগে। সদ্য লিখে ফেলা স্মৃতি কথা মনে পড়ে যায়। সেই কই মাছ কাটা শেখা বিশেষ কাজে লাগে নি। এ বাড়িতে রুই, কাতলা, ভেটকি, চিংড়ি ছাড়া তেমন মাছ খাবার চল নেই। পরম যত্নে মা ঠাকুমার হাতে ধরে শেখানো লাউ, চালকুমড়া কোটা, থোর কুচানো কোনদিনই কাজে আসে নি। ওসব সবজি এরা তেমন পছন্দ করে না। এক আধ দিন শখ করে রাঁধলে কোনরকমে সামান্য মুখে তোলে। অগত্যা। বিয়ের পরে এ বাড়ির পছন্দ বুঝে জুঁইই বরং শিখে নিয়েছে এদের পছন্দসই রান্না। অবশ্য শুধু রান্না কেন, জুঁইএর শেখা সেলাই ফোড়াই-ই বা কোন কাজে লাগল! বিয়ের পরের অনেকগুলো দুপুর না ঘুমিয়ে ফ্রেঞ্চ নটের গোলাপফুলে সাজিয়ে তোলা বিছানার চাদর বিছিয়ে সবাইকে চমকে দিতে চেয়েছিল একবার। শুনেছিল, "ভালোই, তবে এ ঘরের মিনিম্যালিস্ট ডেকরের সঙ্গে যাচ্ছে না।" উলের কাঁটা, কুরুশের সুতোর গুলি এরপর আর বাক্স থেকেই বেরোয় নি।
    বাবুই এর ঈষৎ অনিচ্ছুক মুখটার দিকে তাকায় জুঁই। ভাবে, আমি ওকে যা শেখাব, সেগুলো ওর ও কি কোনদিনই কাজে লাগবে? কেন ওর আজকের সময়টা নষ্ট করব? দায়ে পড়লে নিজেরটুকু নিজে চালিয়ে নিতে পারবে সে তো জানি। তারপরে নিজের ইচ্ছে হলে বাকীটা তখন শিখে নিতে পারবে না?
    বাবুইএর হাত থেকে ইস্টের কৌটোটা নিয়ে জুঁই বলে, "আচ্ছা তুই রাখ। আমিই করে নিচ্ছি। তুই যা, বিকেল বেলা আর পড়তে বসবি না। যা খুশি করগে যা।"
    " শিওর ম্মাম্মা? কোন হেল্প লাগবে না তোমার? "
    "না রে শুধু মেখে নিয়ে বেক করতে বসিয়ে দেব তো। চা র জলটা বসিয়ে দিয়ে করে নিচ্ছি।"
    "গ্রেট, তাহলে আমি একটু বোলিং প্র্যাকটিস করে নিই আজ। "
    গালে একটা চকাশ করে চুমো খেয়ে বাবুই কাল্পনিক বল ছুঁড়তে ছুঁড়তে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ছেলের চলে যাওয়া লম্বা শরীরটার দিকে তাকিয়ে জুঁই এর হঠাৎ সেদিন বিদ্যুন্মালার গল্প পড়তে দেরী হওয়ার জন্য নতুন করে দুঃখ উথলে উঠল।
  • বিভাগ : আলোচনা | ০২ মে ২০২০ | ৩৭১ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • গবু | 162.158.166.164 | ০২ মে ২০২০ ১৩:১৯92912
  • বেশ লাগলো। বেশ ঝোড়ো বিকেলে টিপটিপ বৃষ্টিতে মাথা ভিজিয়ে বাড়ি ফিরে চান করার পর যেরকম লাগে, সেরকম।

    আমার মাও বলতেন, ডিম সিদ্ধ, ডাল সিদ্ধ, আলু সিদ্ধ আর ভাজা - ৪-৫ রকম তো জানিস, বাকিটা নিজে করে নিতে পারবি না?

    করতে হয়েছিল এক সময়, প্রথমদিকে চোখটা কুটকুট করতো, কেন কে জানে।

    ভালো থাকবেন।

  • | 172.69.218.139 | ০২ মে ২০২০ ১৬:৪৩92919
  • স্বাতো,  জুঁই সেলাই-ফোঁড়াই জানে। আনাজ-পাতি কুটতে জানে। আবার গল্প লিখতে গিয়েও কৈ মাছ কোটে?  

  • | 162.158.50.254 | ০২ মে ২০২০ ১৬:৫৫92920
  • উপরের এই দ আমি নই। 

    সাইবারক্রাইম সেলের জন্য স্ক্রিনশট নিয়ে নিচ্ছি

  • ঝর্না বিশ্বাস | 162.158.50.241 | ০২ মে ২০২০ ২২:৫৪92932
  • দারুন গল্প...এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্ম...ভালোলাগল খুব... 

  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত