• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • প্রাচীনতম হিন্দু মন্দিরের খোঁজে - পর্ব ১

    Sudipto Pal
    ভ্রমণ | ০৪ এপ্রিল ২০২০ | ৫৩৭ বার পঠিত

  • একটা দেশের ইতিহাস জানার জন্য তার প্রযুক্তির ইতিহাস এবং সংস্কৃতির ইতিহাস জানা প্রয়োজন। আর জানার জন্য প্রয়োজন জিজ্ঞাসা। সেই জিজ্ঞাসার টানে ভ্রমণ। এই ভ্রমণযাত্রা শুধু স্থানান্তরে নয়, কালান্তরেও। আসুন বসুন আমার টাইম মেশিনে, চলুন প্রাচীনতম হিন্দু মন্দিরের খোঁজে।

    প্রথম প্রশ্ন: প্রাচীনতম হিন্দু মন্দির যা এখনও মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় আছে, কোথায় দেখতে পাবেন? উত্তর সহজ নয়। তাছাড়া আমরা হিন্দু বলতে কী বোঝাই আর মন্দির বলতে কী বোঝাই সেটাও ভেবে দেখতে হবে। সে প্রশ্নের উত্তর ধীরে সুস্থে খোঁজা যাবে। বরং আমরা তার আগে আমাদের যাত্রাটা একটু এগিয়ে রাখি। এই যাত্রায় সবার প্রথমে গিয়ে ঠেকবো কর্ণাটকের আইহোলেতে। বাঙালিরা আইহোলে কে ভুল করে আইহোল বলেন। আইহোলেকে হিন্দু মন্দির তৈরীর ওয়ার্কশপ বলা হয়। পাথরের তৈরি কাঠামোভিত্তিক মন্দির (structural temple), এত বড় আকারের, এত সংখ্যায়, এরকম আস্ত অবস্থায়- তার আগে বিশেষ দেখা যায় না। অথচ আইহোলে তো অনেক পরবর্তী যুগের- ষষ্ঠ শতাব্দীর- চালুক্য রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরী। তার আগে কী ছিল?

    উত্তর আছে আইহোলেতেই। আইহোলের প্রাচীনতম মন্দির বলে অনুমান করা হয় লাড়খান মন্দিরকে। এই মন্দির ভালো করে দেখলে বুঝতে পারবেন এই পাথরের মন্দিরটি কাঠের মন্দিরের আদলে তৈরি। কারণ তার আগের যুগে মন্দির কাঠ দিয়েই বেশি তৈরি হতো। সেগুলো আজ অবধি আস্ত থাকার কথা নয়। যাই হোক লাড়খান মন্দির কাঠ ও পাথরের সন্ধিক্ষণকে সূচিত করে- পাথরের মন্দিরের যুগ শুরু হয়েছে, কিন্তু কাঠের স্টাইল শিল্পীরা ধরে রেখেছে।



    লাড়খান মন্দির, আইহোলে.

    এছাড়াও আরেকটা উত্তর লুকিয়ে আছে আইহোলেতে। রাবণফাঁড়ি। এটি গুহামন্দির। অর্থাৎ কাঠের মন্দিরের পাশাপাশি ছিল গুহামন্দির। রাবণফাঁড়ির থেকে পুরোনো গুহামন্দির কোথায় ছিল? চলুন, আরেক শতক আগে। অজন্তা- পঞ্চম শতক- বকাটক রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি। তবে অজন্তার গুহারা হিন্দু মন্দির নয়। এরা বৌদ্ধ স্থাপত্য। মনে রাখতে হবে, গুপ্ত-পূর্ব যুগে হিন্দু শিল্পের থেকে বৌদ্ধ শিল্পেই বেশি বিনিয়োগ হত। সাতবাহনরা হিন্দু হলেও বৌদ্ধ শিল্পেরই বেশি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, হিন্দু শুঙ্গ রাজাদের যুগেও বৌদ্ধ স্থাপত্যেই বেশী বিনিয়োগ হত, এবং গুপ্তরা হিন্দু হলেও দুটি ধর্মের শিল্পকে একই গুরুত্ব দিয়েছেন- যা সেই যুগের ভারতবর্ষের সেকুলারিজমের পরিচয় দেয়। সম্ভবতঃ চালুক্যরাই প্রথম বড় রাজবংশ যারা বৌদ্ধ ধর্মের থেকে হিন্দু ধর্মের শিল্পে বেশি বিনিয়োগ করেন। তবে অজন্তার সমসাময়িক আরেকটি গুহাসমূহ ছিল। উদয়গিরি- মধ্যপ্রদেশের বিদিশায়।

    গুহামন্দিরকে মন্দির হিসাবে ধরলে উদয়গিরি অবশ্যই আমাদের প্রশ্নের সাম্ভাব্য উত্তরগুলির একটি। আইহোলের আগে ভারতে কাঠামোভিত্তিক স্থাপত্য কম, গুহা বা টিলা কেটে স্থাপত্যই বেশি তৈরি হত- এতে পাথর স্থানান্তরিত করার ঝামেলা কম। উদয়গিরি পঞ্চম শতকে গুপ্তরাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরী। উদয়গিরি বিখ্যাত সুবিশাল শিলাকর্তিত বরাহ মূর্তির জন্য- যিনি নিজের নাকের ডগা দিয়ে জলনিমজ্জিতা পৃথিবী বা ভূদেবীকে মহাপ্লাবনের জল থেকে টেনে তুলেছেন। এই নাটকীয় দৃশ্যের রূপায়ণ একটা সুন্দর শিল্পবোধের পরিচয় দেয়। আর আছে শিবের মুখলিঙ্গ। আর আমরা আজ যে রূপে অনন্তশায়ী বিষ্ণুকে দেখি আর দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গাকে দেখি প্রায় সেই রূপই আমরা আজ থেকে ১৬০০ বছর আগে উদয়গিরিতে দেখি। অর্থাৎ এর পরবর্তী ১৬০০ বছরে হিন্দু আইকোনোগ্ৰাফির খুব নাটকীয় পরিবর্তন হয়নি- সংযোজন অবশ্যই হয়েছে। অর্থাৎ উদয়গিরি বেশ পরিণত আইকোনোগ্ৰাফির ইঙ্গিত দেয়। একটা পরিণত আইকোনোগ্ৰাফি দেখলে প্রশ্ন জাগে তার পূর্বসুরীরা কোথায় লুকিয়ে আছে? এর উত্তর আমার জানা নেই।(এখানে আমি শিল্পকলার ম্যাচিওরিটির কথা বলছি না, আইকোনোগ্ৰাফির ম্যাচিওরিটির কথা বলছি। ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্প তার ৬০০ বছর আগেও দারুণ পরিণত ছিল, যার প্রমাণ সাঁচী, ভরহুত সহ বিভিন্ন বৌদ্ধ শিল্প।)

    এই প্রসঙ্গে বলি উদয়গিরি এবং তার পরের শতকে বাদামীর দুর্গাকে মহিষাসুরমর্দিনী না বলে মহিষমর্দিনী বলা ভাল, যেখানে মহিষটি anthropomorphic নয়। দুই শতক পরে আমরা মহাবলীপুরমে anthropomorphic মহিষাসুর দেখতে পাই, এবং ওখানে গুহাটিকে মহিষাসুরমর্দিনী কেভ নাম দেয়া হয়েছে।

    নিচের ছবিগুলোতে রাবণফাঁড়ি আর উদয়গিরির ব্যাপারে কিছু ধারণা পাবেন।



    রাবণফাঁড়ি, আইহোলে.





    উদয়গিরি, বিদিশা.

    এ তো গেল গুহা মন্দির, কিন্তু কাঠামোভিত্তিক মন্দির কি আইহোলের থেকে পুরোনো নেই? আছে। এই বিদিশাতেই আছে। সাঁচী স্তূপের পাশে গুপ্তযুগের “গুপ্ত টেম্পল ১৭”। ছোট্ট সাদামাটা মন্দির। মন্দিরের গায়ে যেমন অনেক অনেক মূর্তি থাকার কথা তেমন নেই। খালি থামের মাথায় কিছু সিংহ। লক্ষ্য করুন, থামের মাথায় উল্টোনো পদ্মফুলের আবরণ, যেটি বৌদ্ধ শিল্পরীতিতে দেখা যায়। মনে করুন অশোক স্তম্ভের কথা, যার একাংশ হল ভারতের জাতীয় প্রতীক। অশোক স্তম্ভের মাথায়ও আছে উল্টোনো পদ্মফুল, আর তার মাথায় চারটি সিংহ- এখানেও তাই- খালি পার্থক্য হল অশোক স্তম্ভ অনেক বেশি কারুকার্য মণ্ডিত ও সিংহগুলো দাঁড়ানো।



    “গুপ্ত টেম্পল ১৭”, সাঁচী.

    বেশি কিছু না থাকলেও টেম্পল ১৭র ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। কারণ এটি প্রাচীনতম প্রাপ্ত কাঠামোভিত্তিক হিন্দু মন্দিরের একটি। এর সমসাময়িক একই শৈলীর হিন্দু মন্দির- গুপ্তরাজাদেরই তৈরী- মধ্যভারতে অল্প কয়েকটি আছে (যেমন কঙ্কালী দেবী মন্দির– মধ্যপ্রদেশের তিগাওয়াতে)। গুপ্তযুগেই কিন্তু বরাহমিহির রচনা করেন বৃহৎ সংহিতা- মন্দির শিল্প ও আরও অন্যান্য শিল্পের গাইডলাইন। এটি প্রাচীনতর বিভিন্ন শাস্ত্রের সংকলন- অর্থাৎ এই শৈলীগুলি আগেও ছিল, উনি সংকলন করেন। অর্থাৎ গুপ্তযুগ থেকে মন্দির শিল্পের স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন শুরু হয়।



    কঙ্কালী দেবী মন্দির, তিগাওয়া, মধ্যপ্রদেশ. These two photos are from Wikipedia.

    চালুক্য আর গুপ্তযুগ তো দেখলাম। এবার প্রশ্ন আসে, গুপ্ত যুগের মন্দিরগুলোর থেকে পুরোনো কি কিছুই পাওয়া যায় নি? মজার ব্যাপার যে উত্তরটা এই বিদিশাতেই আছে! তার জন্য পরবর্তী পর্বের অপেক্ষা করুন।

    (চলবে)
    ©SUDIPTO PAL, Jan, 2020
  • বিভাগ : ভ্রমণ | ০৪ এপ্রিল ২০২০ | ৫৩৭ বার পঠিত
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • | 162.158.50.219 | ০৪ এপ্রিল ২০২০ ১৩:৪০92008
  • খুব ইন্টারেস্টিঙ। চলুক দৌড়াক।
  • Ramit Chatterjee | 172.68.146.217 | ০৪ এপ্রিল ২০২০ ১৫:৩৭92009
  • আচ্ছা আর্যদের সবচেয়ে প্রাচীন হিন্দু মন্দির কোনটা ? আগে মানে বৈদিক যুগে তো আর্যরা মূর্তিপূজা তেমন ভাবে তো করত না। কখন থেকে মন্দির বানানো, মূর্তিপূজা ব্যাপার গুলো মেইনস্ট্রিম আর্য ধর্মে ঢুকলো। দক্ষিণে, মধ্য ভারতে দ্রাবিড় দের মধ্যে , পূর্বে অনার্যদের মধ্যে মূর্তিপূজা অনেকদিন ধরেই ছিল, লিঙ্গ পূজা বা শাক্ত মাতৃপুজা । কিন্তু মেইনস্ট্রিম আর্য ধর্মে মন্দির বা মূর্তিপূজার সূচনাটা নিয়ে জানার ইচ্ছে আছে।
  • Sudipto Pal | 162.158.50.247 | ০৪ এপ্রিল ২০২০ ২০:৫১92020
  • রমিতবাবু , আমি পরের পরবে এই বিষয়ে আলোকপাত করব । সমস্ত প্রশ্নের উত্তর হয়তো নেই , তবে যেটুকুন পাওয়া গেছে সেটা কভার করব
  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত