এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বেড়াতে বেড়াতে পলাশী দিবসের দুটো অনুষ্ঠানে 

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ জুন ২০২৬ | ৩৫ বার পঠিত
  • ২৩শে জুন পলাশীর যুদ্ধের দিন। ওইদিন বেরিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য ইতিহাসে খোঁজাখুঁজি। প্রথমে পলাশী যুদ্ধের আম বাগানে ইংরেজের তৈরি করা জয়স্তম্ভের কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম পলাশী দিবস উদযাপিত হচ্ছে ভারত বাংলাদেশ পিপলস ফোরামের উদ্যোগে। কাছেই পিডব্লুডি গেস্ট হাউস, সেখানে আয়োজকদের দিনের বিশ্রাম আর মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজন চলছে। ইংরেজ ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকরা পলাশীর জয়কে বিপ্লব মনে করে। সে নিয়ে তাদের লেখাপত্র আছে। ব্যাপারটা আমাদের ভালো লাগার কথা নয়। ওই জয়স্তম্ভটা সেই মতলবে বানানো। এখনও দিব্বি আছে। তার চারপাশে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। যার গেটের ঠিক বাইরে আয়োজক সংগঠনের উদ্যোগে নবাব সিরাজ উদ দৌলার একটা আবক্ষ মূর্তি, পাশেই মোহনলাল আর মীরমদনের নামে একটা শহীদ স্মৃতি ফলক লাগানো। বেশ কিছুটা দূরে মীর মদন, নৌবে সিং হাজারি আর বাহাদুর খান এই তিন শহীদ সেনাপতির স্মৃতিসৌধ আছে। সেখানে যাইনি তাই কে বসিয়েছে জানি না। এই হলো পলাশী প্রাঙ্গণে যুদ্ধ সংক্রান্ত যাবতীয় সৌধ স্মারক ইত্যাদির বিবরণ। সেদিন অনুষ্ঠানে স্কুলের বাচ্চাদের নানা অনুষ্ঠান হচ্ছিল। আয়োজকদের মধ্য কয়েকজন স্থানীয় মানুষও রয়েছেন দেখলাম। ওনারা সারা বছরই ইতিহাস চেতনা বিষয়ক নানা কর্মকাণ্ড করেন বলে শুনলাম। চারপাশে বেশ কিছু পুলিশ আর সিভিক পুলিশ রয়েছেন তাতে বোঝা যায় একধরণের প্রশাসনিক গুরুত্ব আছে ওই অনুষ্ঠানের। কিন্তু আমাদের বড় মিডিয়া হাউস কই তো কোন খবর টবর করে না এ বিষয়ে ! পলাশীর পর থেকে ঘটমান বর্তমানের চাপে বাঙালির মাথা ব্যতিব্যস্ত, কে আর কবর খুঁড়ে সিরাজ জাগাতে চায় !
    আমিও এই অনুষ্ঠানের কথা কস্মিনকালেও শুনিনি তবে লালবাগ সেমিনার হলে নবাব সিরাজ উদ দৌলা স্মৃতি সুরক্ষা ট্রাস্টের ২৭০ তম পলাশী দিবস উদযাপনের খবর পাই। খানিকটা ওই সান্ধ্য অনুষ্ঠানে যাওয়া আর এই তালে মুর্শিদাবাদ বেড়ানোর তালে ২৩শে সক্কাল সক্কাল সপরিবারে ও সবান্ধবে বেরিয়ে পড়ি। পলাশীর প্রাঙ্গণ ঘুরে আমাদের গাড়ি সোজা লালবাগ ইয়ুথ হস্টেলে গিয়ে থামে। উল্টো দিকে হাজারদুয়ারি আর ইমামবাড়ার পেল্লায় স্থাপত্য দেখা যাচ্ছে। মুর্শিদাবাদে ওই দুটো দেখতেই লোকে আসে। তবে দুটোর সঙ্গেই মুর্শিদকুলি -সুজাউদ্দিন-সরফরাজ খান বা আলিবর্দি -সিরাজের কোনো মতো স্বাধীন নবাবদের নিদেন মির কাশিমের মতো মির জাফরগুষ্টির মধ্যে ব্ল্যাক শিপ স্বাধীনচেতা, লড়ুয়ে নবাবের দূরতর কোনো সম্পর্ক নেই। হাজারদুয়ারি প্যালেস একটা ব্রিটিশ স্থাপত্য। সেটার নির্মাতা কর্নেল ডানকান ম্যাকলিওড নামের একজন স্কটিশ স্থপতির আর ব্রিটিশের চামচা নবাব নাজিম হুমায়ন জাহর সময়ে এটা বানানো হয়।তবে সেই নিও ক্যাসিকাল ইটালিও ডিজাইনের একটা নবাবি চাল আছে বটে এটুকুই বলাযায়। আর নিজামত ইমামবাড়া প্রথমে সিরাজ বানান ১৭৪০ এ যাতে দুবার আগুন লেগে নষ্ট হলে এক পুতুল নবাব মন্সুর আলি খান ১৮৪৭ এ সাদেক আলি খান নামের বাস্তুকারকে দিয়ে নাকি এগারো মাসের মধ্যে এংলো মোঘল ধাঁচের নতুন পেল্লায় ইমামবাড়া বানাচ্ছেন। সিরাজের তৈরি পুরনো ইমামবাড়া পুড়ল কেন কে জানে ! দুটো বা ড়িই ব্রিটিশ আধিপত্যের চোখ ধাঁধানো নজির আর যত লোকের ভিড় ওই দুই বাড়ি ঘিরে।ইংরেজরা সেখানে একটা মিউজিয়ামও বানিয়েছে যেখানে সিরাজের উপস্থিতি প্রায় চোখেই পড়ে না বলা যায়। তখন মহরমের সময় তাই হাজারদুয়ারি কমপ্লেক্সে আলোর মেলা আর রাত অবধি লোকের ভিড় গিজগিজ করছে।

    সেদিন বিকেলবেলা সিরাজ উদ দৌলা স্মৃতি সুরক্ষা ট্রাস্টের ২৭০ তম পলাশী দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে গেলাম লালবাগ সেমিনার হলে। এই ট্রাস্ট বানিয়েছেন কলকাতার মেয়ে সমর্পিতা দত্ত। তিনি দুহাজার আঠেরো থেকে একেবারে মাটি কামড়ে পড়ে আছেন মুর্শিদাবাদে আর সেখানকার সিরাজের মকবরা খোশবাগে।তিনি প্রায় রোজই সেখানে যান আর সিরাজের কবরে ফুল সাজিয়ে, বসে থাকেন সেখানে। তাঁকে ঘিরে লুৎফুন্নিসার মিথ তৈরি হয় আর দত্ত নাম ঘুচে তিনি হয়ে যান সমর্পিতা সিরাজ। মনে পড়ে সোসিও -কালচারাল এক্টিভিস্টদের এরূপ রূপান্তর আমি শক্তিনাথ ঝায়ের মধ্যে দেখেছি! খোশবাগ হলো যেদিকে হাজারদুয়ারি ঠিক তার বিপরীতে ভাগীরথীর অপর পারে রাঢ় অঞ্চলে। ওখানে আলিবর্দি, ঘসেটি বেগম আর সিরাজের পরিবারের অনেকের সমাধি আছে। তবে আলিবর্দি আর সিরাজ ছাড়া কোনো কবরেই ফলক নেই তাই বোঝা মুশকিল কোনটা কার।
    লালবাগের বিপরীতে খোশবাগ অজপাড়া গাঁ। ওখানে আরো আছে সিরাজের প্রাসাদ ভাগিরথীতে ক্রমশ তলিয়ে যাওয়া হীরাঝিলের ধ্বংসাবশেষ আর মুর্শিদকুলির জামাই নবাব সুজা উদ দিনের মকবরা।সমর্পিতা শুধু খোশবাগে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে হীরাঝিলের হৃত গৌরব ফিরিয়ে দেবার দাবিতে এক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন মানস বাংলা নামের ডিজিটাল চ্যানেলের মানসবাবুর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে।এলাকার নানা সাংষ্কৃতিক সংগঠন ও বিশিষ্ট মানুষের সহযোগে কয়েক বছর ধরেই রীতিমতো রাস্তায় মিটিং মিছিল চলছে যা হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলন নামে সবাই জানে। এই আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন মিরজাফর পরিবারের বর্তমান প্রতিনিধি লালবাগের তথা মুর্শিদাবাদের সকলের প্রিয় ছোটে নবাব রেজা আলি মির্জা সাহেবও। হীরাঝিল অঞ্চলের বিশিষ্ট নাগরিক উজ্জ্বল বিশ্বাস তিন শতক জমি দান করেছেন সিরাজের স্মৃতি সৌধ বানানোর জন্য। সমর্পিতা -মানসবাবুরা শুধু রাস্তার আন্দোলনে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি, তাঁরা বিকাশ ভট্টাচার্যের সাহায্যে হাই কোর্টে মামলা দায়ের করে হীরাঝিল সংলগ্ন অঞ্চল যাতে সরকার অধিগ্রহণ করে সে কাজে অনেকদূর এগিয়েছেন। এইসব করতে গিয়ে সমর্পিতা বিবাহবিচ্ছিন্না হয়ে লালবাগের এক সজ্জন মানুষের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করেছেন তাঁর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে।আমরা গিয়ে দেখলাম সেদিন সেই মেয়েটিও পোডিয়ামে থেকে চোস্ত ইংরিজিতে সহ-ঘোষিকার কাজ করছিল। সমর্পিতারা সিরাজ ট্রাস্টের মাধ্যমে ধন্যাকুমারী মহাবিদ্যালয় সহ আরো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জোট বেঁধে হীরাঝিল লালবাগ সহ গোটা মুর্শিদাবাদের সম্প্রীতির ঐতিহ্যের প্রেক্ষিতে এক দীর্ঘস্থায়ী উজ্জীবন আন্দোলন গড়ে তুলতে দাবি পত্র পেশ করলেন সেদিন। ওই দাবি পত্রে শুধু এলিট প্রজেক্ট নয় লালবাগের টাঙ্গাওলাদের দাবিও অন্তৰ্ভূক্ত।স্কুলের ছেলে পিলেদের দিয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনার সারকথা শপথের আকারে পাঠ করানো হলো শুনলাম এই পাঠের কাজ, অতি জরুরি কাজ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বছরভোর চলছে । হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলনের ওপর তৈরি একটা ডকু ফিল্ম দেখে আমি যখন চলে আসি তখনো আস্তে আস্তে ভরে ওঠা হলে নানা অনুষ্ঠান চলছে।
    আমাদের বেড়ানো চলে আরো দুদিন। দেখতে গেলাম মুর্শিকুলির মকবরা যেখানে আছে সেই মোঘল -বাংলা স্থাপত্যের অনুপম নিদর্শন কাটরা মসজিদ, জগৎ শেঠদের বর্তমান বাড়ি আরো অনেক কিছু তবু গোটা ভ্রমণের কেন্দ্রে পলাশী দিবসের দুটো অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকার অভিজ্ঞতা দেখছি অমলিন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন