• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • প্রাচীনতম হিন্দু মন্দিরের খোঁজে- পর্ব ২

    Sudipto Pal
    ভ্রমণ | ০৫ এপ্রিল ২০২০ | ৪৪৪ বার পঠিত

  • প্রথম পর্ব এখানে: https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=17326

    গুপ্ত যুগের মন্দিরগুলোর থেকে পুরোনো কি কিছুই পাওয়া যায় নি? অজন্তা, ভজা-কারলা, সাঁচী, ভরহুত- এভাবে আরো ৬০০ বছর পিছোনো যায়- কিন্তু এগুলি সবই বৌদ্ধ স্থাপত্য। তাহলে কি হিন্দু শিল্প শুধু কাঠ আর ইঁটের মন্দিরেই সীমাবদ্ধ ছিল? হয়তো তাই। কাঠ-ইঁট ভঙ্গুর। দু-আড়াই হাজার বছর পর তাদের চিহ্ন পাওয়া কঠিন। কিন্তু কিছু চিহ্ন রয়ে গেছে। যেমন ঐ বিদিশাতেই- হেলিওডোরাস পিলার। তক্ষশীলা থেকে আসা গ্ৰীক দূত ও ভাগবত হেলিওডোরাস এটি বানান বাসুদেবকে নিবেদন করে। এতে ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা সংস্কৃত ঘেঁষা প্রাকৃতে বাসুদেবের বন্দনা করা হয়েছে। বুদ্ধের মতো না হলেও, বাসুদেবের জনপ্রিয়তা যে ব্যাক্ট্রিয়ার ইন্দো গ্ৰীক রাজ্যে ভালমতই ছিল তার প্রমাণ এই পিলার। এছাড়া সমসাময়িক ব্যাক্ট্রিয়ার কিছু মুদ্রাতেও বাসুদেব অঙ্কিত আছেন। আমি বিষ্ণু বা কৃষ্ণ না বলে বাসুদেব বলছি কারণ এই নামটিই এখানে লিখিত আছে। বৈষ্ণব না বলে ভাগবত বলছি কারণ হেলিওডোরাস নিজেকে ভাগবত বলেছেন।




    হেলিওডোরাস পিলার, বিদিশা.

    এই পিলারটি আসলে একটি মন্দিরের সামনের স্তম্ভ (এখন যেমন মন্দিরের সামনে ধ্বজাস্তম্ভ বা দীপস্তম্ভ থাকে)। মূল মন্দিরটি কাঠ বা ইঁটের, তাই তার আর কোনো অবশেষ নেই। এই পিলারের আশেপাশে রাখা শিলার মধ্যে, যেগুলো সম্ভবতঃ আশপাশের থেকে খুঁড়েই পাওয়া গেছে, লক্ষ্য করলাম আসিরীয় দেবী ইশ্তারের মন্দিরের মত চাঁদ, সূর্য, তারার দৃশ্য। ভুলে গেলে চলবে না দেবী ইশ্তার নানা রূপে নানা সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছেন। তবে সাদৃশ্যটা কাকতালীয় হতে পারে।


    চাঁদ, সূর্য, তারা: হেলিওডোরাস পিলার এবং ইশ্তারের মন্দির

    আবার ফিরে যাই দক্ষিণে। তার আগে বলি তামিল সঙ্গম যুগের (৩য় পূর্বশতক থেকে ৩য় শতক) দুটি ইঁটের মন্দির তামিলনাড়ুর সালুবনকুপ্পম ও বেপত্তুরে পাওয়া গেছে। যার ইঁটের কিছু দেয়াল ও মেঝে ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। এই দুটি মন্দিরের উপরে পরবর্তীকালে পল্লব রাজারা দুটি গ্রানাইটের মন্দির বানায়। পল্লবদের মন্দিরগুলি যথাক্রমে মুরুগন ও পেরুমলের মন্দির অর্থাৎ শৈব ও বৈষ্ণব মন্দির ছিল। তবে ইঁটের মন্দিরগুলো কোন দেবতাদের ছিল সেটা আমি ঠিক জানি না। এবার চলুন অন্ধ্রে।

    অন্ধ্র প্রদেশের গুডিমল্লমের শিবলিঙ্গ- যার গায়ে খচিত আছে ব্যাধরূপী শিব- বলা হয় এই লিঙ্গটি দ্বিতীয় বা তৃতীয় পূর্বশতকের (অনেকের মতে এটি আরো শ দুয়েক বছর পরের)। যে মন্দিরে এই লিঙ্গটি আছে, সেটি অবশ্য অনেক পরবর্তীকালের। এই লিঙ্গটি না হলেও, অন্ততঃ এই স্টাইলের লিঙ্গ যে অনেক পুরোনো তার আরেকটা বড় প্রমাণ হল উজ্জ্বয়িনী থেকে পাওয়া দ্বিতীয় পূর্বশতকের কিছু মুদ্রা এবং মথুরা মিউজিয়ামে রাখা একই রকম দেখতে প্রথম শতকের একটি লিঙ্গ। তা ঐ ব্যাধরূপী শিবের দুইচোখ নাকের অগ্ৰভাগে চেয়ে আছে, যেটা পরবর্তীকালের শিবের আইকোনোগ্ৰাফিতে, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে, আমরা দেখতে পাই। আর লিঙ্গ তো আছেই। অর্থাৎ শৈব আইকোনোগ্ৰাফির সূচনাও ঐ যুগেই বা তার পূর্বেই হয়েছে।


    গুডিমল্লমের লিঙ্গ, ছবি উইকি থেকে সংগৃহীত

    এই হেলিওডোরাস পিলার এবং গুডিমল্লমের লিঙ্গ পরোক্ষভাবে সাক্ষী হয়ে আছে প্রাচীনতম কিছু হিন্দু মন্দিরের, বৈষ্ণব এবং শৈবধর্মের আদিরূপের। মন্দিরগুলি ধ্বংস হয়ে গেলেও তারা তাদের গল্প বলে চলে।

    আরেকটা মন্দিরের কথা বলি। ত্রিবিক্রম মন্দির, টের, মহারাষ্ট্র। এটি দেখলে মনে হবে যেন কার্লা বা অজন্তার একটি চৈত্যগৃহকে তার গুহার আবরণ খুলে বের করে আনা হয়েছে। পাশাপাশি একটি নমুনা চৈত্যগৃহের (ইলোরা) এবং এই মন্দিরের ছবি রাখছি। মন্দিরটি চাক্ষুষ দেখিনি, ছবি উইকি থেকে সংগৃহীত। এটি আসলে একটি বৌদ্ধ চৈত্যগৃহকে চালুক্যযুগে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করা হয়। মূল চৈত্যগৃহটি আনুমানিক প্রথম পূর্বশতকে তৈরী।




    প্রথমটি ইলোরার একটি চৈত্য। পরেরগুলি ত্রিবিক্রম মন্দির।

    বৌদ্ধ ধর্মে চৈত্য ও স্তূপের গুরুত্ব বেশি। স্তূপ free standing structure নয়, অতএব প্রযুক্তিগত ভাবে মন্দিরের দলে রাখছি না (যদিও সাংস্কৃতিকভাবে রাখা যায়, কারণ মন্দিরের অনেক কাজ- যেমন ভাস্কর্য শিল্প প্রদর্শনের কাজ, সাঁচী-ভরহুতের মত বড় স্তূপগুলো করত)। চৈত্য কিন্তু ইঁট কাঠ দিয়ে তৈরি হতো বাড়ির মতো করে, অথবা অজন্তা-ভজা-কারলার মত গুহা খুঁড়ে। চৈত্যকে প্রযুক্তিগত ভাবে মন্দির বলা যায়। রাজস্থানের বৈরাটের ইঁটের সুবিশাল বৌদ্ধ চৈত্য মন্দির তৃতীয় পূর্ব শতকে অশোকের সময়ে তৈরী। এখন এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত। ভরহুতে আর এখনকার বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মন্দিরের জায়গায়ও অশোক বৌদ্ধ মন্দির বানিয়েছিলেন। অশোক পূর্ববর্তী যুগে চৈত্যও বিশেষ পাবেন না, হয়তো সে যুগে বৌদ্ধ শিল্পেও বিশেষ বিনিয়োগ হতো না। অথবা চৈত্যর গুরুত্ব বৌদ্ধদের কাছে কম ছিল, কিংবা ইঁট কাঠের ছোট খাটো চৈত্য ধ্বংস হয়ে গেছে।

    অশোকের সময় এবং তার পরের দুই শতকে ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের একটা প্রযুক্তিগত বিপ্লব হয় যার অনেক চিহ্ন এখনও দেখতে পাই-

    – আজীবক সম্প্রদায়ের লোমশ ঋষি গুহা- প্রথম বড় গুহা শিল্প।
    – সাঁচী ও ভরহুত স্তূপ- ভরহুতের বড় বড় দেয়াল ও ভাস্কর্যগুলো কলকাতা যাদুঘরেই আছে। অশোকের তৈরী হলেও, সাঁচী ও ভরহুতে এখন যা দেখি তা মূলত ওনার পরের দুই শতকে তৈরী।
    – মৌর্য পালিশ- উদাহরণ পাটনা মিউজিয়ামের দিলদারগঞ্জ থেকে পাওয়া যক্ষী। ভরহুত ও লোমশ ঋষি গুহাও মৌর্য পালিশের উদাহরণ
    – মথুরা ভাস্কর্যসমূহ- এটি অশোকের পরের শতকে। এখানে প্রথম যুগে বৌদ্ধ আর্ট, গ্ৰীক দেবদেবী ও সেকুলার আর্ট বেশি দেখা যায়, আর কুষাণ যুগ থেকে বৈষ্ণব আর তারপর শৈব আর্ট দেখা যায়।
    বৈরাটের মতই একটি গোলাকার পরিধিবিশিষ্ট মন্দিরের রেপ্লিকা এবং মহাবোধি মন্দিরের আদিরূপের রেপ্লিকা এদের এক-দুশো বছর পর তৈরী ভরহুতে দেখা যায়, এবং কলকাতা যাদুঘরে যখন এদের ছবি তুলছিলাম, জানতামও না ভরহুতের ঐ দেয়ালগুলিতে আরও পুরোনো কিছুর প্রতিকৃতি আমার ছবিগুলোতে উঠে আসছে! দ্বিতীয় ছবিতে যে গাছ-আলা মহাবোধি মন্দির দেখতে পাচ্ছেন, লক্ষ্য করুন সেটিও বৈরাটের মতই গোলাকার (পিলারটি দ্বিমাত্রিক, তবে গোল ভাবটা curvilinear perspective ব্যবহার করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে)। তখন গোল মন্দিরের চল ছিল, পরে হিন্দু বৌদ্ধ সব মন্দিরই আয়তাকার হয়ে যায়। জমির ভাগাভাগি আয়তাকার হলেই সুবিধে, কিন্তু স্তূপকে ঘিরে পরিক্রমা করা হয়তো গোল মন্দিরেই সুবিধে। এখনকার পিরামিড আকারের মহাবোধি মন্দির গুপ্তযুগে তৈরী।



    গোলাকার পরিধিবিশিষ্ট মন্দিরের রেপ্লিকা এবং মহাবোধি মন্দিরের আদিরূপের রেপ্লিকা , ভরহুত (মধ্যপ্রদেশ)- এখনকার ঠিকানা কলকাতা যাদুঘর।

    ভরহুতের পর আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে এবার একটু সাঁচীর গল্প করি। তার আগে বলি প্রাচীনতম মন্দিরের খোঁজ করতে গিয়ে সাঁচীর গল্প করা কেন? কারণ, মন্দির মানে তো শুধু একটা বাড়ী নয়, মন্দির একটা শিল্পক্ষেত্র, সংগ্ৰহশালা। মন্দিরের ইতিহাস মানে আইকোনোগ্ৰাফির ইতিহাস। আমরা মহিষমর্দিনী দুর্গা, অনন্তশায়ী বিষ্ণু এই আইকোনোগ্ৰাফিগুলোর অদ্যাবধি প্রাপ্ত আদিতম রূপগুলোর কয়েকটি উদয়গিরিতে দেখেছি। তেমনি পাঁচমাথাআলা সাপ, শালভঞ্জিকা, সামনের পায়ে দাঁড়ানো সিংহ, থামকে সাপোর্ট দেয়া যক্ষ- যাদের আরো ২২০০ বছর ধরে হিন্দু ও বৌদ্ধ শিল্পে ব্যবহার করা হয়েছে- ভারতে, থাইল্যান্ডে, কম্বোডিয়াতে- এদের আদিরূপ দেখতে পাবেন সাঁচীর তোরণগুলিতে। সাঁচীর তোরণ শুঙ্গ রাজত্বকালে তৈরী, দ্বিতীয় পূর্বশতকে। আবার সাঁচীতে এমন অনেক আইকোনোগ্রাফি পাবেন যা পরবর্তী সময়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যেমন লাগাম দিয়ে টানা ভেড়া, ডানাওয়ালা সিংহ। এমন নয় যে এই আইকোনোগ্রাফিগুলোর শুরু এখান থেকে, তবে এদের প্রথম বড় আকারের নিদর্শন এই সাঁচী বা তার সমসাময়িক স্তূপগুলোতেই। এগুলি হয়তো তখন প্রচলিত দেশ বিদেশের বিভিন্ন লৌকিক আইকন থেকেই নেওয়া, আবার কিছু কিছু হয়তো নতুন কল্পনা।

    সাঁচী সুসজ্জিত তোরণগুলো নির্মাণের জন্য ইন্দোগ্ৰীক রাজ্যের অনেক কারিগর এসেছিল, যার ফলে গ্ৰীক, পারসিক, আসিরীয়, সুমেরীয় ইত্যাদি শিল্পের প্রভাব আশ্চর্যের নয়। ডানাওয়ালা সিংহ হয়তো এসেছে সুমের-ব্যাবিলন থেকে (গ্ৰীকদের হাত ঘুরে), পাঁচমাথাআলা সাপ হয়তো এসেছে ভারতেরই লোকাচার থেকে (সুমেরীয় সংস্কৃতিতেও সাত মাথাআলা সাপ ছিল, যদিও ঠিক সাঁচীর মতো নয়, অনেক বেশী অ্যান্থ্রোপোমর্ফিক- যাই হোক আইকোনোগ্রাফির ইতিহাসে যাচ্ছি না, কারণ সেটি বেশ জটিল বিষয়)। একাধিক মাথাআলা সাপ বিষ্ণুর পিছনেও থাকে, বুদ্ধের এবং পার্শ্বনাথের পেছনেও থাকে, আবার স্বাধীনভাবেও পূজিত হয়। সেই অর্থে সাঁচীর তোরণগুলিকে ভারতীয় আইকোনোগ্রাফির আদি সংগ্রহশালা বললে ভুল হয় না। এর থেকে পুরোনো এত বড় আকারের শিল্প ভারতে নেই, বা থাকলেও তার অবশেষ নেই।






    সাঁচীর দাঁড়ানো সিংহ, লাগাম দিয়ে টানা ভেড়া, পাঁচমাথাআলা সাপ, শালভঞ্জিকা, থামকে সাপোর্ট দেয়া যক্ষ, ডানাওয়ালা সিংহ ইত্যাদি।

    বারবার আমরা সাঁচী-বিদিশার দশ কিলোমিটার ব্যাসার্ধেই ঘুরে ফিরে চলে আসছি। চলুন এবার আরো দূরে, একটু পরবর্তীকালে। কুষাণযুগের একটি শিবের পেইন্টিং আমরা নিচে দেখব, যেটি ব্যাক্ট্রিয়া থেকে পাওয়া। এটি তৃতীয় শতকের, অতএব অজন্তার শীর্ষযুগের থেকে পুরোনো। কুষাণ রাজ্যে শিবের নাম ঐশো। ছবিটা তুলেছি নিউ ইয়র্কের মেট মিউজিয়াম থেকে। ত্রিশূল ও তৃতীয় নয়ন লক্ষ্য করবেন।




    আপনারা লক্ষ্য করছেন, যখন আমি প্রাক-গুপ্ত যুগের মন্দিরের কথা বলছি, আমি হিন্দু মন্দিরের কথা কম, বৌদ্ধ মন্দির-স্তূপ-চৈত্যর কথা বেশী বলছি, আর হিন্দু শিল্পের ছোট-বড় আর্টিফ্যাক্টের কথাই বেশি বলছি, তার কারণ এই যুগের জলজ্যান্ত হিন্দু মন্দির টিকে নেই, এই নিদর্শনগুলোই আছে।

    মৌর্যপূর্ব যুগে মন্দিরের চিহ্ন আরোই ক্ষীণ। তার কারণ একাধিক:

    ১. প্রযুক্তি: কাঠ ইঁটের স্থায়িত্ব কম। মিশর ব্যাবিলনের মত প্রযুক্তি এবং রাজকীয় বিনিয়োগ ভারতে অশোকের আগে বিশেষ ছিল না।
    ২. বিনিয়োগ: মৌর্যরা যেহেতু প্রথম ভারতীয় রাজবংশ যারা ‘সাম্রাজ্য’ গড়ে তোলে, অতএব অনেক রাজস্ব একত্রিত করে বড়সড় দীর্ঘস্থায়ী স্থাপত্য গড়ে তোলার মত আর্থিক বিনিয়োগ হয়তো তাদের আগে কেউ করেনি। অতএব তাঁদের আগে অস্থায়ী কাঠ ও ইঁটের মন্দিরের বেশি কিছু সম্ভবতঃ তৈরী হয়নি। (এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত মতামত- আর অনেক প্রাইভেট বিনিয়োগও হত, শ্রেষ্ঠীরাও প্রভাবশালী ও বিত্তবান ছিলেন)।
    ৩. প্রাসঙ্গিকতা: বৈদিক সাহিত্যে মন্দিরের প্রাসঙ্গিকতা কম, যাগযজ্ঞের গুরুত্ব বেশি। আর বৌদ্ধ ধর্মও অশোকের আগে সাদামাটা ভাবেই পালিত হত। বৈদিক আচার ও বৌদ্ধ-জৈন-আজীবক-চার্বাকদের বাইরেও নিশ্চয়ই একটা লৌকিক ধর্ম ছিল, তবে সেখানেও মন্দিরের গুরুত্ব কতটা ছিল জানা নেই। থাকলেও সাদামাটা ছোটখাটো ইঁট কাঠের মন্দির কিংবা থানই হয়তো তৈরী হত।

    অতএব অশোক পূর্ববর্তী যুগে বৌদ্ধই বলুন আর হিন্দুই বলুন, মন্দিরের অবশেষ খুঁজে পেলে আমরা আশ্চর্যই হব।

    মন্দির না পাই, তার থেকেও আশ্চর্য কিছু হয়তো পেতে পারি। অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে- হরপ্পা। আজকের শৈবধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাস্যবস্তু। না, আপনাদের হরপ্পার পশুপতি বা শিংআলা যোগীদের আবার নূতন করে দেখাবো না। চলুন হরপ্পা সভ্যতার একটি ধ্বংসাবশেষে। ভারতের গুজরাত রাজ্যের কচ্ছ জেলায় ঢোলাবিরা। তার আগে প্রশ্ন- হরপ্পা সংস্কৃতিকে কি হিন্দু সংস্কৃতির আওতায় রাখা যায়? আজকাল অনেকে জোর জবরদস্তি করে হরপ্পার নগর সভ্যতাকে বৈদিক গ্রাম ও অরণ্যকেন্দ্রিক সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করে। ঐতিহাসিকরা এই অনুমানের সপক্ষে কম, বিপক্ষেই বেশী প্রমাণ পেয়েছেন। অতএব আমরা বহুপ্রচলিত তত্ত্ব অর্থাৎ হরপ্পা ও বৈদিক সংস্কৃতি যে আলাদা সেটাকেই গ্রহণ করে চলব। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে হরপ্পা হিন্দু সংস্কৃতির সাথে যোগসূত্রহীন। হিন্দু ধর্ম তো আর বেদে সীমিত নয়। বেদ-সঙ্গম-লোকাচার, সেশ্বর বৈদিক দর্শন, নিরীশ্বর বৈদিক দর্শন, বেদের নিরাকারবাদ, লোকাচারের সাকারবাদ, চার্বাকদের বস্তুবাদ, আগম-নির্গম, আর্য-অনার্য, দ্বৈত-অদ্বৈত-বিশিষ্টাদ্বৈত সবকিছু নিয়েই হিন্দুধর্ম। আর ফারসী শব্দ হিন্দুর একটাই মানে- ভারতীয়।

    ঋগ্বেদে ‘শিশ্নদেব’ কথাটা ব্যবহৃত হয়েছে এবং শিশ্নদেবদের কটাক্ষ করা হয়েছে, কিন্তু হরপ্পার সংস্কৃতিতে লিঙ্গ-যোনির গুরুত্ব অপরিসীম, যা হরপ্পার নগর সভ্যতার অবসানের পরেও দাইমাবাদের মতো গ্রাম-সংস্কৃতির মাধ্যমে পরবর্তী যুগ অবধি চালিত হয়েছে, এবং সেই ধারা আজও অব্যাহত আছে। অতএব ঢোলাবিরাতে যে লিঙ্গের মত দেখতে দণ্ডগুলি পাওয়া গেছে, তাদের একটা বিশেষ স্থান অবশ্যই এই লেখায় থাকবে। হয়তো নিজের অজ্ঞাতসারেই ঢোলাবিরায় দেখে এসেছি আদিতম হিন্দু মন্দিরের একটি। মন্দির মানে তো শুধু ইঁট-কাঠ-পাথরের বাড়ী নয়। নিচে ঢোলাবিরার শিশ্নদণ্ড বা লিঙ্গের ছবি দিলাম- প্রথমটা আমার তোলা, দ্বিতীয়টা টোনি জোসেফের আর্লি ইন্ডিয়ান থেকে সংগৃহীত যেটি মূলত ভারতের পুরাতাত্বিক বিভাগ থেকে সংগৃহীত।




    এবার একটা ছোট্ট সারাংশ, আমরা যা দেখলাম তার-

    ০. আইহোলের লাড়খান মন্দির- পঞ্চম শতক
    ১. উদয়গিরি: প্রাচীনতম বড় আকারের হিন্দু গুহা (ইলোরার মত সুসজ্জিত মন্দির হয়তো নয়)- পঞ্চম শতক
    ২. গুপ্তযুগের বিভিন্ন ছোট পাথরের মন্দির- পঞ্চম শতক
    ৩. কুষাণযুগের শিবের প্রতিকৃতি- তৃতীয় শতক
    ৪. হেলিওডোরাস পিলার- দ্বিতীয় পূর্বশতক
    ৫. গুডিমল্লমের শিবলিঙ্গ- আনুমানিক দ্বিতীয় বা তৃতীয় পূর্বশতক
    ৬. বিভিন্ন বৌদ্ধমন্দির ও স্তূপ- তৃতীয় পূর্বশতক ও পরবর্তীযুগের
    ৭. ঢোলাবিরায় হরপ্পা সভ্যতার লিঙ্গ

    তাহলে বুঝতে পারছেন যে প্রাচীনতম হিন্দু মন্দিরের খোঁজটা আসলে কোনো বিশেষ একটি মন্দিরের খোঁজ নয়, এটি একটি শিল্পরীতির ইতিহাসের খোঁজ, এটি একটি সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অনুসন্ধান। আর সেই অনুসন্ধানের পথে সাক্ষী হিসেবে যে শিল্পকৃতিগুলো আমরা পাই, তাদেরকেই তুলে ধরেছি এই লেখায়।

    তথ্যসূত্র:
    ১. বিভিন্ন মন্দিরের এ এস আই এর সাইনবোর্ড থেকে পাওয়া তথ্যাবলী।
    ২. বিভিন্ন মিউজিয়ামের সংগ্রহের আনুষঙ্গিক লেখা।
    ৩. Ashoka- Charles Allen
    ৪. India - An Archaeological History: Paleolithic Beginnings to Early History Foundation- Chakrabarati,Dilip K

    ।।শেষ।।
  • বিভাগ : ভ্রমণ | ০৫ এপ্রিল ২০২০ | ৪৪৪ বার পঠিত
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • করোনা

  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত