এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • হস্টেলের মেয়েরা - ৪

    Anuradha Kunda লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ২২ জুলাই ২০২২ | ৫২৪ বার পঠিত
  • ( অ্যান্ড্রয়েড ফোনের হাজার গুণ। তার দয়াতে এই লেখা বন্ধুদের কাছে পৌঁছায়। আড্ডা হয়। বহু জরুরি কাজ হয়। আবার যে কোনো জায়গায়, এমনকি আড্ডাতে বা বন্ধুসমাগমে, কাজের জায়গায় ফোন খুঁটতে থেকে পাশের মানুষকে জানান দেওয়া যায় যে ভাই, আমি  আরও দরকারি কিছুতে ভীষণ ব্যস্ত। কী ভালো না? ভাইরে, ফোন খোঁটা আমার জরুরি কাজ, তুমি বোরিং, এটা না বলেও বোঝানো? বাপু তাহলে ফোনটা নিয়ে নিজের ঘরে বসে থাকো না!জরুরি কাজ আপন মনে নিজের কোণে করতে হয়। ভাগ্যিস আমরা চারপাশকে দেখার সময়, মন, চোখ পেয়েছিলাম! যে বন্ধুরা অনেক কাজের মধ্যেও এই অকামের লেখা পড়ছেন তাঁদের অনেক ভালোবাসা।)

    অনেকেই বাড়িতে থাকাকালীন হস্টেল সম্পর্কে যে বিভীষিকা তৈরি করেন, জে ইউ এল এইচে তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। ফ্যান থাকবে না, খেতে দেবে না, সিনিয়ররা সর্বদা rag করবে এইসব উটকো মিথ তখন বাইরে বেশ প্রচলিত ছিল।মোটেই সেইসব পাইনি। ঘরে দিব্য ফ্যান ছিল। ঘর মোছা আর লন্ড্রির লোক ছিল। সিনিয়ররা একদিন সিনিয়রিটি ফলাবার পরে আর আমাদের নিয়ে মাথাই ঘামাতো না। আমরাও তাদের নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। কেউ জোর করে সিগারেট, গাঁজা, মদ খাওয়াতে আসেনি। অফারও করেনি।

    তখন এল এইচে জায়গা পাওয়াই বেশ কঠিন ছিল। গেস্ট হয়ে বেশি টাকা দিয়েও থাকতে হত অনেককে। বেড পেতে একবছর সময় লেগে যেত।

    যেটা নতুন হল বাড়ি থেকে গিয়ে সেটা হল সকালে ওঠা। ছ' টার সময় ঘরে নক করে কিচেনের লোক বলে যেত জঅঅল। চাআআ। আমরা ফ্লাস্ক রাতে ঘুমানোর আগে দরজার বাইরে রেখে দিতাম। সকালে ঘরে গরম জল  দিয়ে যেত। তারপর ডাইনিং হলে চা বিস্কুট পাওয়া যেত আটটা থেকে।

    ডাইনিং হলটা মস্ত বড়। ছোটখাট ফুটবল মাঠ। মোট ছ' টা বিশাল টেবল ছিল। চেয়ার না। বেঞ্চ। এখনো মনে আছে টেবিলের হলদেটে ফরমাইকার টপ। ওপরে নুন রাখা থাকত। পাশেই কিচেন। খাবার আসতো কিচেন কাউন্টারে।

    অনেক সময়ই বেল পড়লে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হত, এত ভিড় থাকতো ডাইনিং এ। তখন আমরা পাশের ছোট্ট একফালি বাগানে ঘুরতাম আর জানলা দিয়ে দেখতাম টেবল ফাঁকা হল কীনা।
    আমাদের খাবার পরিবেশন করতেন বিমলদা, কমলদা আর লক্ষ্মীকান্তদা। এদের মধ্যে কমলদা ছিল হাসিমুখ। বিমলদার একটি চোখ অসুস্থ। ভীষণ খিটখিটে মানুষ। মানে একস্ট্রা আলুভাজা চাইলেও তার অসুবিধে হত। চাল বেশ মোটা। প্রায় রোজ টোম্যাটোর আভাস দেওয়া মুসুর ডালের জল, মানে তাকে ডাল না বলে জল বলাই শ্রেয়, একটা তরকারি আর মাছ। রাতে ইটার্নাল ডিম।ভেন্ডি ভাজা নয় মিষ্টি কুমড়োর ছেঁচকি।ছেঁচকিটা ভালো করতো।

    আমাদের হস্টেল চলতো মেসিং সিস্টেমে। এতে মেয়েদের বাজার করার অভিজ্ঞতাও হত। মেস ম্যানেজার দুজন করে নির্বাচিত হত প্রতি মাসে। মেট্রন শোভাদি প্রতি রাতে তাদের নিয়ে বসতেন পরের দিনের মেনু ঠিক করার জন্য। তিনিই খাবারদাবারের খোঁজ রাখতেন।সুপারকে কখনো ডাইনিং হলে দেখেছি বলে মনে পড়েনা। শোভাদির কথা আলাদা লিখব।

    মেয়েরা মেনু ঠিক করে বাজারে যেত নোটবুক আর টাকা নিয়ে। জিনিসপত্র বিমলদা, কমলদারা বহন করতেন। যে যেভাবে চালাতো সেইরকম টাকা লাগতো।কখনো কখনো পাবদা, ইলিশও থাকতো দুপুরে।

    কোনোদিন মনে আছে দশটা কুড়ির ক্লাসে খেয়ে যেতে পারিনি। সেদিন ইলিশ ছিল। মাঝারি পেটির টুকরো। ছোট গাদা। ইলিশের গাদাতে মোটে ভক্তি নেই আমার। রিসেসে আমি আর সোমা খেতে এলাম কিচেনের পিছনের দরজা দিয়ে। ডাইনিং তখন বন্ধ। কমলদা, বিমলদা , ঠাকুর সবাই স্নানে গেছেন। রান্নাঘরে ঢুকে দেখি একটা বিশাল ঝুড়ি উপুর করে রাখা। আমরা প্লেটে ভাত, ডাল নিয়ে ঝুড়ি তুলে দেখি বাটি ভর্তি ইয়া বড়া বড়া ইলিশের পেটির সর্ষেবাটা! সব বড় টুকরো গুলো তারা নিজেদের জন্য তুলে রাখতেন! আমরা কুউউল দুটো বাটি তুলে নিয়ে খেতে বসে গেলাম।

    ব্যাপারটা জানা হয়ে গেল। এরপরেও এমন কান্ড ঘটেছে। দুপুরে খেতে এলে বড় ভালো মাছের টুকরো পাওয়া যেত। তবে সাধারণত কাতলা মাছই থাকত। ঝোলের টেস্ট পাঁচবছরে একদিনও পাল্টালো না! এক পিস মাছ, দু টুকরো আলু !

    আমি আর সোমা যখন মেস ম্যানেজার ছিলাম, যাদবপুর বাজারে গিয়ে দেখি মালিনীদিও মাছ কিনছেন। উনি দিব্যি আমাদের দেখে হাসলেন। কিন্ত আমরা এত ভ্যাবলা  হাসলাম যে বলার না! আসলে ঐ ছোট বয়সে বিখ্যাত অধ্যাপকদের নিয়ে কেমন রোমাঞ্চকর মানসিকতা ছিল। মালিনীদি শুধু ওয়র্ডসওয়র্থ আর শেলি পড়াবেন। তিনি আবার মাছও কেনেন!!! প্রথমদিন ক্লাসে এসে দিদি লেক ডিস্ট্রিক্টের ম্যাপ এঁকেছিলেন। অনেকরই হয়তো মনে আছে। আমাদের পেঙ্গুইনের একটা অ্যানথোলজি ছিল। বেশ দুষ্প্রাপ্য। আমরা লুসি পোয়েমসগুলো হাতে লিখে নিয়েছিলাম। পরে কলেজ স্ট্রিট ঘেঁটে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড পেয়েছিলাম।  ঐ বই আমিও আমার ক্লাসে পড়িয়েছি।টিনটার্ণ অ্যাবি আর ইম্মরটালিটি ওড। ঐ টেক্সটার পাতাগুলো আমার চেনা। পড়াতে সুবিধে হত। এখন আমি আর ওয়র্ডসওয়ার্থ পড়াই না।

    দিন কয়েকের ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল হতে হতে ভাবছিলাম একটু বৃষ্টি পেলে কেমন আহ্লাদে গলে জল হয়ে যাই আমরা। মন ভালো হয়।শরীর ঝরঝরে লাগে, বেশ নতুন নতুন গপ্পো তৈরি হয়... গুনগুন করে গান... কিন্তু তেমন করে বৃষ্টিতে ভেজা হয় না আর। ক্লাস থেকে হস্টেলে ফিরতে যেমন চুপড়ি হয়ে ভিজে আসতাম...। ক্যাম্পাসের মধ্যেই তো হস্টেল... কি হবে ছাতা নিয়ে! তাই বৃষ্টিতে অপলক ভেজা... দীঘির পাশের রাস্তা, যেটাকে আমরা বলতাম সিলসিলার রাস্তা... তেমনি দুধারে লম্বা গাছেদের সারি। ভিজে রাস্তা। যেন এই মাত্র মেঘমন্দ্রিত কণ্ঠে কেউ গেয়ে উঠবেন। নীলা আসমান খো গয়া!! তিন চারজন বই খাতার ব্যাগ পিঠে বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছে। ঘরে ফিরে বাথরুমে হাপুসহুপুস স্নান। হিটারে জল ফুটছে... গরম গরম কফি তৈরি হবে...আর চটজলদি ম্যাগি! সোমা জল বসালে। অনুরাধা কফি ঘুঁটছে। রিতা টম্যাটো পেঁয়াজ কুটছে ম্যাগিতে এক্সট্রা আনন্দ আনার জন্য। রত্নামালার জন্য নিরিমিষ ম্যাগি। এরকম কত বর্ষা বিধৌত বিকেল দিয়ে একেকটা জমকালো কাঁথা কাজের শাড়ির মত নিখাঁদ বন্ধুত্বর বুনোট। আহা, সেই হস্টেল যেমন দলবেঁধে কজনে মিলে ম্যাগিরন্ধন শিখিয়েছিল, তেমনি শিখিয়েছিল দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে যেতে। সারাটা দিন তাদের এক সঙ্গে ... হস্টেল-তরুণীরা দলবেঁধে গান গায়, পড়তে বসে। ছবি। ফোটোগ্রাফি ক্লাব। কনভোকেশনে। ছবি তোলার পালা আসে যায়...। রবীন্দ্রজয়ন্তীতে মেনু হয় পোলাও – মাংস, হস্টেল জীবন না থাকলে এমন চিকেনময় রবিজন্মোৎসব হত কি? না না, বেলের পানা,ঠান্ডা মিষ্টি। তালশাঁষের শিষ্ট আপ্যায়ণ হস্টেলের দুরন্ত তরুণীদের জন্য না। তোর-আমার জন্মদিনে মাংস-পোলাও। রবি ঠাকুরের জন্মদিনে নয় কেন? তিনি তো আমাদেরি লোক!

    তা বলে কি একলা চলা নেই? রত্নার সেমেস্টার হয়ে গেছে, বৃষ্টি মাথায় করে সে চলে গেল দুর্গাপুরে তার বাড়ি। রিতা চললো দিল্লি তার বাবা-মায়ের কাছে। তৃতীয় জনের সেমেস্টার নেই। বছর শেষে পরীক্ষা। সে করে কি? দিনের শেষে ফাঁকা ঘর যেন হাঁ করে গিলতে আসে! পাশের বিছানা দুটো খালি,গতরাত্তিরেও তিন বন্ধুতে কত জমজমাট আড্ডা। রত্নার নিরিমিষ ম্যাগিতে পেঁয়াজ পড়ে গেছে বলে চেঁচামেচি। রাত দুটো পর্যন্ত গভীর আড্ডা। নিরবচ্ছিন্ন...আজ কোথায় তারা? ফাঁকা দেয়ালে তাদের জামা কাপড় শুকুচ্ছে। টেবিল শূন্য। মনখারাপ করে পড়ে আছে বাটার স্যান্ডাল। হাউস কোট ঝুলছে, হাওয়ায় দুলছে তিনবন্ধুর একটি ক্যালেন্ডার! মনে পড়ছে মায়ের কথা। বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে! গুটি গুটি পায়ে পাশের ঘরে যাই। সুমিতা জেগে।মৈত্রেয়ীও। পাঞ্চালী বাড়ি গেছে। একটা বিছানা ফাঁকা এঘরে। গপ্পো শুরু হলে মনখারাপের তিস্তার স্রোত ব্যাহত হয়...। সেখানেই ঘুমে চোখ বুঁজে আসে। পরের দিন ও তাই। তার পরের দিন ও ঘরে যাবার আগে বই বগলে স্বাগতা চলে আসে ... তোর ঘরে দুটো বেড ফাঁকা রে? আমি শোবো? আমার রুমমেট গুলো বাড়ি গেছে! ফার্স্টইয়ারের এই পার্মুটেশন–কম্বিনেশন চলতেই থাকে...। রত্না-রিতা-অনুরাধা বা সোমা-অনুরাধা-স্বাগতা বা উর্মি-অনুরাধা...। গ্রীষ্ম-বর্ষা পার হয়ে যায়। আমরা বড় হই। তখন আর সেমেস্টার শেষে ফাঁকা ঘরে একা ঘুমাতে মনখারাপ করে না। আড্ডা হয় না, পড়া হয়। বন্ধু কাল সকালেই আসবে। তার জন্য ম্যাগি এনে রাখি ঘরে। বন্ধুবিচ্ছেদে আর কাতর না কেউ। বড় হবার পাঠ দিয়েছে হস্টেলের একলা থাকার দিন রাত। বৃষ্টির অঝোর ধারা ঝরেছে সারা সন্ধ্যে, একা একা ম্যাগি করে খেতে গলার কাছে ব্যথা করার কৈশোর, বাড়ির জন্য হঠাৎ মন মুচড়ে ওঠা গোধুলিবেলা হারিয়ে গেছে সপ্রতিভ হয়ে ওঠার অদম্য বাসনায়... সেই বন্ধুদের অনেকের সঙ্গে যোগ আছে। অনেকে হারিয়ে গেছে জুঁইফুলের গন্ধের মতো। ম্যাগি ও হারিয়ে গেল।

    ‘শোন, তোর হলুদ চুড়িদার সেট টা আজ আমি পড়ছি, তুই আমার ব্লু শার্ট টা পড়বি?’ জনা বারো সদ্য উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করা মেয়ে একইসঙ্গে দু-দশ দিনের তফাতে সেই হস্টেলে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে কারো বাড়ি দুর্গাপুর, কেউ এসেছে দিল্লি থেকে, কারু বা বাড়ি গৌহাটি, কেউ জামশেদপুরের, আবার কেউ মালদা থেকে গেছে তো কেউ গেছে নাগপুর থেকে। কেউ কাউকে চেনে না,সব্বাই মা-বাবাকে ছেড়ে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়চত্বরে ঢুকে পড়েছে...। ঠাঁই হয়েছে মেয়ে হস্টেলের একতলার ঘরগুলোতে। প্রত্যেকের বরাদ্দ একটি করে তক্তপোষ, একটি চেয়ার, দেরাজয়ালা টেবিল, একটি দেওয়াল আলমারি, আর টেবল-ল্যাম্প। তক্তপোষের নীচে স্যুটকেস-ব্যাগের অধিষ্ঠান। কিন্তু হপ্তা-খানেকের মধ্যেই দেখা গেল সুমিতার সাদা ওড়না রুমার গায়ে, উর্মির র সবুজ কুর্তা সুহানার এত পছন্দ যে সাত দিন ও ওটা পড়েই ক্লাসে গেল আর সুমিতা পরল রিতার চেক শার্ট। একা একা বড় হয়েছি। হস্টেলে গিয়ে নিমেষে সব নিজের হয়ে গেল। তক্তপোষে নতুন তোষকের ওপর নতুন চাদর, ঝকঝকে টেবল-ক্লথ, তার ওপর ফুলদানি, পাশে নতুন বইয়ের ভীড়। দেওয়ালে সুন্দর পোস্টার। ছবি, জানলায় হরলিক্স। কমপ্ল্যান। মাগে সাবান, টুথপেস্ট, ব্রাশ... আলনায় তিনজনের পোষাক-আশাক, মেয়ে হসটেলের রূপ খুলে যায় বাসিন্দাদের গুণে। সামনে করিডোরে সবেধন নীলমণি কালো টেলিফোন...। যার ফোন আসে সেই ভাগ্যবানের নাম ধরে চিৎকার করার জন্য একজন অ্যাটেডেণ্ট আছেন...। রুম নাম্বার তেইশ...অদিতি ঘোষ। ফোন আছে...। অদিতি দুরদুর করে দৌড়ে এল। বাবা-মা ফোন করে নিশ্চিন্তি...মেয়ে ভাল আছে। তা বলে কি বাবা-মা-মাসি-পিসি ছাড়া ইস্পেশাল ফোন আসতনা কারু কারু? এতো মোবাইল ফোন না যে তথ্য গোপনীয় থাকবে! ল্যান্ডফোনে সবই ওপনীয়!!! ছ–নম্বর ঘরে সান্ধ্যকালীন আড্ডা হচ্ছে। সুমিতা ক্লাস শেষে কেলান্ত, পায়ের ওপর চাদর ফেলে শুয়ে। ওর পায়ের কাছে হেলান দিয়ে পাঞ্চালী যাকে পাঁচ বছর পাঁচু বলেই ডাকলাম, কাকলির সেমেস্টার সামনে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। তাও আড্ডার গন্ধে চলে এসেছে বোর্ডে ফার্স্ট হওয়া মেয়ে। রিতা তার লম্বা চুল আঁচড়াচ্ছে। টেপে পঙ্কজ উদাস মন উ্দাস করা গান গাইছেন। রত্নামালা র্যা কেট বাজিয়ে তাল দিচ্ছে। মৈত্রেয়ী বকবক করতে করতে স্যুটকেস গোছাছ্ছে..। বাইরে ঘোষণা হল। রুম নাম্বার  আঠাশ....নীপা চ্যাটার্জি...। ফোন!

    আমরা চুপ হয়ে গেলাম। সবাই জানি এ ফোন যে সে ফোন নয়... বিশেষ ফোন। নীপা আমাদের সিনিয়ার। ইকনমিক্স পড়ে।মিলিটারি ব্যাকগ্রাউন্ড। প্রচন্ড স্পীডে, জোরে কথা বলে। ওর প্রেমটাও খোলামেলা। রোজ চেঁচামেচি করে ঘন্টাখানেক বিএফ এর সঙ্গে ফোনালাপ করে..। তারপর একহয় পড়তে বসে নাহয় ঘুরতে যায়। মিলিটারি স্মার্ট মেয়ে। আমরা সতর্ক। ফোনে কথা হইতেছে... আমরা শুধু এপারের কথা শুনিতেছি।
    নীপাঃ ‘আজ আর যাচ্ছি না’
    এই ঘর থেকে পাঁচু জোরে জোরে বলল ‘কাল ঠিক যাবো’
    নীপা ফোনেঃ হাউ সুইট!!! কি মিষ্টি!!!
    রুমা আওয়াজ তুললো - দুলালের তালমিছরি! ভীমনাগের সন্দেশ, গাঙ্গুরামের রসগুল্লা...
    নীপা ফোনেঃ ডোন্ট বি সিলি!
    সুমিতা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চেঁচালো, বললোঃ সিলি, ইডিয়ট, রাস্কাল, জোকার, ডাইনোসোরাস...
    এত জোরে যে ফোনের অইপ্রান্তেও বোধহয় শোনা গেল... প্রেমিকযুগল এবার বিরক্ত হয়ে ক্ষান্ত দিল, আমরা ডিনার বেল পড়েছে। খেতে চ...। বলে নাচতে নাচতে ডাইনিং হলে চল্লাম! সেখানে আর এক প্রস্থ কিছু হবে! সেইসব সুগন্ধ একদিনের জন্যও একলা হতে দেয়নি, দেয়ও না।
    সেই এক বিঘত জমি যা তারার মত জ্বলে...। পাখির পালক হয়ে সারাজীবন উষ্ণতায় মুড়ে রাখে।

    হস্টেলদিন আর আড্ডার প্রকারভেদ

    টুপটাপ জল পড়ছে মাথার ওপর বিশাল গাছটা থেকে, দুটো ক্লাস অফ, বৃষ্টি ধরেছে কিন্তু টুপ্টুপানি থামে নি। সোমা আর অনুরাধা হস্টেলের রাস্তা দিয়ে ফিরছে... হঠাত সোমা বললো। চল, বাবলুদা’র কাছে যাবি? তিনি আবার কিনি? সোমার বাড়ির অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে...। সোমার দিদি দোলাদি।। অসম্ভব সুন্দরী। সাধারণ বাঙ্গালী ঘরে অমন সুন্দরী দেখা যায় না। মোম পালিশ গাত্রবর্ণ। লম্বা ৫’৫, দেখেই সবাই ফ্ল্যাট। সমস্বরে বললাম... তোর দিদির পাশে দাঁড়াব না, আমাদের কাজের লোক মনে হবে। তাকে চিনি। আরতিদি এসেছেন মুম্বাই থেকে।তাঁকে গিয়ে বলে এসেছি... আপনি লতা-আশাকে চেনেন? দেখেছেন? আর মিছরির মতো ধমক খেয়েছি।।‘ছি ছি।।বলো লতাজি-আশাজি...ওঁরা কি তোমাদের ক্লাসমেট যে লতা-আশা বলছো?’ আরতিদির ঠিক পরের বোন এবং তাঁর বর মাঝে মাঝে হস্টেলে আসতেন ওঁদের গাড়ি নিয়ে আর আমাদের গুটি কয়েকজনকে নিয়ে বেড়াতে যেতেন, প্রভূত ভালো ভালো খাওয়াতেন মোকাম্বো, ওয়ার্লডর্ফ, জিমি’স কিচেন এমনকি গঙ্গার ধারে গে-তেও। দিদি আর দিলীপদাকে ও তো চিনি। বাবলুদাটি আবার কে? সোমা হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল। কোথায় যাচ্ছিস? সোজা লিফটে নিয়ে তুলল আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের চারতলায়। এইচ ও ডি। সমরেশ মুখোপাধ্যায়...। সোমার বাবলুদা এবং আমদেরও। আড্ডা খুব জমে গেল কারন বাবলুদার মতো রসিক পণ্ডিত সংসারে বিরল, অরণ্যেও।

    আড্ডা আমার মতে বেশ কয়েক প্রকার। এক হোলো অলস আড্ডা। গান চলবে। শুনব কিন্তু শুনব না। কথা হবে কিন্তু হবে না, প্রচুর বাজে বকা হবে, অবান্তর আলাপ-প্রলাপ হবে.. এ হল নার্ভ ঠান্ডা করার আড্ডা। নার্ভ চাঙ্গা করার জন্য চাই বৈঠকি আড্ডা, তাকে মজলিশি আড্ডাও বলা যায়। সেখানে মূল উপজীব্য হল গান। এছাড়া আছে ডেস্ট্রাকটিভ আড্ডা... চূড়ান্ত পিএনপিসি, মানুষজনকে ছারখার করে দেওয়া আড্ডা। আছে আরো। তাকে কেউ কেউ ইন্টেলেকচুয়াল আড্ডা বলে বটে কিন্তু আমি বলি কন্সট্রাকটিভ আড্ডা। এটা হল প্রাণদায়িণী আড্ডা... কত নতুন নতুন চিন্তাভাবনা! এরও পর আছে ডি-কন্সট্রাকটিভ আড্ডা। বাবলুদা আমাদের সেই আড্ডার অংশীদার হলেন... গান্ধী থেকে মার্ক্সবাদী, নারীবাদ থেকে সাম্যবাদ, সবক্ষেত্রে অবাধ বিচরণ। আমরা সদ্য কামু-কাফকা-সার্ত্র-সিমোন পড়ুয়ারা তর্ক করার দুরন্ত প্ল্যাটফর্ম পেলাম। সাহিত্য, গান, নাচ, ফিলিম, নাটক... বাবলুদা, ছোটখাট মানুষটি বিধ্বংসী কথা বলে লড়িয়ে দিতেন। অচিরেই তাঁর বাড়িতে নেমন্তন্ন পেলাম। ভবানীপুরে ইন্দিরা সিনেমাহলের পাশের গলিতে ছোট্টো বাড়িতে থাকতেন বাবলুদা আর সুমিতাবৌদি। সুমিতাবৌদি নীলতরতন সরকারের নাতনী, ঈশান স্কলার, পেশায় সার্জন, চমতকার গানের গলা। ইন্দিরা তে ছবি দেখা মানেই ওদের বাড়িতে আড্ডা আর ভোজন। বাবলুদা ইউনিভার্সিটিতে দুটো ক্লাস নিয়ে বাড়ি ফিরে পায়ের ওপর পা তুলে গপ্পো করছেন, আর সুমিতা বৌদি অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে রেশন তুলে, আমাদের জন্য ফুলকপির সিঙ্গারা ভাজছেন...। সঙ্গে চা,কফি। তারপর টিকিট কেটে আমাদের হলে বসিয়ে আসাও তাঁরই কাজ, বাবলুদার বক্তব্য ওরা ডিনার করে যাবে... বৌদি ফুলকপি দিয়ে পাব্দা মাছে ঝোল রেঁধে রেডি! সেই অতি ছোট বাড়িটির, সত্যি একচিলতে বারান্দার মতো সরু, সুসজ্জিত বসার ঘরটিতে কত গল্প আর গানের স্রোত বয়েছে! একবার তো কয়েকজন থেকেই গেলাম রাতে। ফোন করে বাড়িতে, হস্টেলে জানাবার দায়িত্ব ওঁদের। ঢালা বিছানা হল মাটিতে। সারা রাত গপ্পো। সকালে লুচি-কালোজিরে দেওয়া আলুর ছেঁচকি খাইয়ে বৌদি ছাড়লেন। ইদানীং যে সব বিষয় নিয়ে দেওয়াল লিখন, ভিডিও পাঠ হয়, আমরা সেসব নিয়ে তখনো আলোচনা করতাম। কোনো অসুবিধে হয়নি। শুধু মা শুনে ফোনে বলেছিলেন ‘তোরা পড়িস কখন?’

    বাবলুদা প্রবল প্যাট্রিয়ার্ক। বাড়ির কোনো কাজ করেন না। আমরা সদ্য অর্থ, পরমা ,অঙ্কুশ দেখার দল বিস্তর ঝগড়া করি। বৌদি অসীম দক্ষতায় মেডিকাল কলেজ, রোগী, সংসার, ছেলেমেয়ে সামলান। বাবলুদা বেতের চেয়ারে বসে সব নস্যাৎ করেন। এরকম অনেক দিনের গপ্পো জমা হয়ে আছে...। ভবানীপুরের সেই অসম্ভব ছোটো বাড়ির একচিলতে খাবার ঘরের।

    অনেকদিন পর, তখন মালদায় চাকরি করছি... সংসারটিতে বিচ্ছেদের খবর পেলাম। মন খারাপ না। অনেক ছবি যেন ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে গেল। প্রখর, তীব্র কোনো তরবারি টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে নরম পালক...একটা ছবি রয়ে গেছে। বসার ঘরে প্রবল গল্প করছি আমরা। বৌদি মাঝে মাঝে খাদ্য সরবরাহ করে চলেছেন। ওঁদের মেয়ে ডোনা আসছে যাচ্ছে। ছেলে ঋজু অর্ধেক বইতে, অর্ধেক আমাদের গল্পে। সে তখনো হাফ-প্যান্ট। আসার সময় হাত নাড়ছে সবাই... বাবলুদা, বৌদি, ডোনা, ঋজু...। খুব সাধারণ একটা তাঁতের শাড়ি পরা বৌদি বলছেন ‘বাসে তুলে দেব?’
    সেসব ছবি মোছে না কখোনো।
    ভালো কথা...। ঋজু  ‘চতুষ্কোণ’, ' রাজকাহিনী' , ' অটোগ্রাফ ' এবং আরো অনেক ছবি বানিয়েছে।

  • ধারাবাহিক | ২২ জুলাই ২০২২ | ৫২৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Dola | 2a00:23c5:7701:c501:b08f:11a:f8be:712e | ২৩ জুলাই ২০২২ ১২:২৭510182
  • সুমিতা দি আএনআটমি টিচার ছিলেন আমাদের  ন্যাশনাল মেডিকেলে , তাই অপারেশন থিয়েটার টা ভুল। লেখা ভালো হয়েছে . 
  • Ranjan Roy | ২৩ জুলাই ২০২২ ২০:৫৭510202
  • " ল্যান্ডফোনে সবই ওপনীয়!!!"
    --এই লাইনটার ফিদা হয়ে গেলাম।
     কোলরিজ পড়ান কি?
     
    আমার ওয়ার্ডসওয়ার্থকে বরাবর 'ড্যাডি ওয়ার্ডসওয়ার্থ' লাগত।
    অবশ্য পসন্দ আপনি আপনি।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন