• বুলবুলভাজা  ভ্রমণ  যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে  খাই দাই ঘুরি ফিরি

  • ডেভিড লিভিংস্টোনের খোঁজে

    হেনরি মর্টন স্ট্যানলে
    ভ্রমণ | যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে | ১৮ মার্চ ২০২১ | ৯১০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ডেভিড লিভিংস্টোনআফ্রিকায় বেপাত্তা। কিংবদন্তি মানুষটির খোঁজে আফ্রিকা পৌঁছেছেন মার্কিন সাংবাদিক হেনরি মর্টন স্ট্যানলেজাঞ্জিবার থেকে শুরু হল আফ্রিকার গভীরে অভিযান। প্রথম লক্ষ্য বাগামোয়ো শহরে পৌঁছে পাক্কা দেড় মাস ধরে সেখান থেকে একে একে রওনা হলো অভিযানের মোট পাঁচটি কাফেলা। চলছে অভিযানের মূল কাহিনি। স্ট্যানলের সেই বিখ্যাত সফরনামা ‘হাও আই ফাউন্ড লিভিংস্টোন’। এই প্রথম বাংলায়। এ কিস্তিতে উঙ্গেরেঙ্গেরি নদী পার হয়ে সিম্বামওয়েন্নি পৌঁছোনোর কথা। তরজমায় স্বাতী রায়


    চতুর্থ অধ্যায়: উকড়ে, উকামি ও উদয়ের মধ্যে দিয়ে উসেগুহহা-র উদ্দেশে যাত্রা (পূর্বপ্রকাশিত অংশের পর)


    আমরা আধুনিক মানচিত্রের সাহায্যে কিছুটা আন্দাজ করার চেষ্টা করছি হেনরি মর্টান স্ট্যানলে-র যাত্রাপথ। নইলে পাঠকের পক্ষে বোঝাই মুশকিল এইসব কাণ্ড ঘটছে কোথায়। কাজটা কঠিন। কারণ, এই পথে এমন অনেক জায়গার নাম রয়েছে যার আজ কোনো অস্তিত্বই নেই। যেমন বহু খুঁজেও পাওয়া গেল না কিঙ্গারু গ্রাম। আবার কয়েকটি জায়গা নিশ্চিত ভাবে চিহ্নিত করা গেছে। সেগুলির নীচে লাল দাগ দেওয়া হল, যেমন বাগামোয়ো বা মিকেসে (স্ট্যানলে লিখেছেন মিকেসেহে)। বাগামোয়ো থেকে ‘উসেগুহহা’-র রাজধানী সিম্বামওয়েন্নিতে পৌঁছোনোর লক্ষ্যে চলেছে স্ট্যানলের কাফেলা। উসেগুহহা বলে কোনো স্থান বা প্রদেশ আজ আর নেই। এমনকি বোঝাও মুশকিল সেই অঞ্চলের বিস্তৃতি ঠিক কী ছিল। তবে সিম্বামওয়েন্নি নামে একটি ক্যাম্প-সাইট এখনও রয়েছে তানজানিয়ার মোরোগোরো শহরের কাছে। আন্দাজ করা যেতে পারে এই সিম্বামওয়েন্নি-র কথাই স্ট্যানলে বলছেন। কাজেই এখানে বর্ণিত যা-কিছু ঘটছে সবই মানচিত্রে নীল বুটি দেওয়া পথের আশেপাশেই।—সম্পাদক

    উঙ্গেরেঙ্গেরির উপত্যকাপূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। সেই উপত্যকা বরাবর হেঁটে, পরের দিন সকালে দু-ঘণ্টার মধ্যেই ইউসেগুহহার রাজধানী সিম্বামওয়েনির প্রাচীরের কাছে পৌঁছালাম। উরুগুরু পাহাড়ের পশ্চিম ঢালের পায়ের কাছে শহরটা। ভারী সুন্দর উপত্যকা। মেঘচুম্বী পাহাড়ের থেকে নেমে আসা দুটি নদীর জলধারায় পুষ্ট। সঙ্গে আছে বেশ কয়েকটি ঝোরার শিশির-ধোয়া জলস্রোত। আর প্রথম দর্শনেই ভারী চমকদার। এমনটা পূর্ব আফ্রিকাতে দেখব বলে ভাবিনি। পারস্যের মাজান্দেরানে এমনটা দেখলে অবাক হতাম না, কিন্তু এখানে এই দৃশ্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। শহরে হাজারটা বাড়ি, সব মিলিয়ে প্রায় হাজার তিনেক লোকের থাকার ব্যবস্থা। তবে এমন লোক গিজগিজ করছে যে মনে হয় সম্ভবত ৫০০০-এর কাছাকাছি লোকসংখ্যা ধরলেই বেশি ঠিক হবে। বাড়িগুলো আফ্রিকান ধাঁচের, তবে খুব যত্নে বানানো। দুর্গটি আরব্য-পারসিক ধাঁচের—পারসিক পরিকল্পনার সঙ্গে আরবি পারিপট্যের মিশেলে তৈরি। পারস্য দেশের ভিতর দিয়ে ৯৫০ মাইল যাত্রা করেছি, তাও বড়ো শহরগুলো বাদ দিলে, অন্য শহরগুলোতেও কখনও সিম্বামওয়েন্নির মতো দারুণ দুর্গ দেখিনি। পারস্য দেশের দুর্গগুলি কাদামাটির, এমনকি ক্যাসভিন, তেহেরান, ইস্পাহান এবং শিরাজের দুর্গও মাটির; সিম্বামওয়েন্নির দুর্গ পাথরের, বন্দুক চালানোর জন্য তার প্রাচীরে দু-সারি গর্ত করা। শহরটা চৌকো মতন, আয়তন প্রায় আধা বর্গ মাইল। চার কোণে চারটে পাথরের শক্তপোক্ত গম্বুজ শহরকে পাহারা দিচ্ছে; শহরের প্রধান প্রধান এলাকার মুখোমুখি চারটে ফটক, দুটো করে গম্বুজের মাঝামাঝি জায়গায় বসানো। বাসিন্দাদের যাওয়া-আসা এই চারটে ফটকের মধ্য দিয়েই। আফ্রিকান সেগুনের তৈরি শক্ত চৌকো পাল্লা দিয়ে সে দরজা বন্ধ হয়। অতীব সূক্ষ্ম, জটিল আরবি যন্ত্র দিয়ে খোদাই করা, সেটা দেখেই সন্দেহ হয়েছিল যে দরজাগুলি হয়ত জাঞ্জিবার বা উপকূল অঞ্চলে তৈরি করা আর তারপরে তক্তা ধরে ধরে এখানে নিয়ে আসা। অবশ্য বাগামোয়ো ও সিম্বামওয়েন্নির মধ্যে খুবই ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা। আর বড়ো বড়ো বাড়িগুলোতে, ততটা সূক্ষ্ম না হলেও, একই ভাবে খোদাই করা বেশ কয়েকটি দরজা চোখে পড়ল। তাই এই অলংকরণের কাজ স্থানীয় কারিগরদের হাতের হওয়াও খুবই সম্ভব। সুলতানের প্রাসাদে দীর্ঘ ঢালু ছাদ, প্রশস্ত ছাঁচতলা আর বাড়ির সামনে বারান্দা—উপকূল অঞ্চলের প্রথা মেনে বানানো।



    বর্তমান সুলতানা স্বনামধন্য কিসাবেঙ্গোর বড়ো মেয়ে। উদো, উকামি, উকওয়েরে, কিংগারু, উকওয়েন্নি এবং কিরঙ্গা-ওয়ান্না প্রভৃতি প্রতিবেশী দেশ জুড়ে পরাস্বপহরণ প্রবণতার জন্য কিসাবেঙ্গো কুখ্যাত। ছোটো স্কেলে, কিসাবেঙ্গো হল আর-একটি ছোটোখাটো থিওডোর। খুব সামান্য অবস্থা থেকে উঠে এসে, সে তার ব্যক্তিগত শক্তি, বাতেলাবাজি এবং মজাদার, বহুমুখী বক্তৃতার জন্য লোকের নজর কেড়েছিল। এই সব গুণের জন্যই পলাতক দাসদের উপর তার অসীম প্রভাব—সে তাদের নেতা হয়ে উঠেছিল। জাঞ্জিবারের সুলতানের দেওয়া শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে, সে উকামিতে এসে পৌঁছেছিল। সেই সময় সে জায়গাটা উকয়েরে থেকে উসাগারা অবধি ছড়ানো। তারপর সে রাজ্যবিস্তার করতে শুরু করে। যার ফলে ওয়াকামির এক বিস্তীর্ণ উর্বর অঞ্চল উঙ্গেরেঙ্গেরির উপত্যকার অংশ হয়ে যায়। তার মধ্যে সবথেকে পছন্দসই জায়গায় সে নিজের রাজধানী স্থাপন করে। সেখানে প্রাকারের কাছ দিয়েই নদী বয়ে যায়। রাজধানীর নাম হল সিম্বামওয়েন্নি, যার মানে ‘সিংহ বা সবচেয়ে শক্তিশালী শহর’। কিসাবেঙ্গো নামের এমনই কুখ্যাতি রটেছিল যে বুড়ো বয়সে সেই দুর্ধর্ষ ডাকাত ও অপহরণকারী নিজের নাম কিসাবেঙ্গো থেকে বদলে শহরের নামে সিম্বামওয়েন্নি করে নেয়। মারা যাওয়ার আগে সে তার বড়ো মেয়েকে নিজের উত্তরসূরি ঘোষণা করে আর তাকেও সিম্বামওয়েন্নি নামে অভিষিক্ত করে। সেই নামটিই সুলতানা ব্যবহার করে, সে নামেই সে পরিচিত।

    আগেই বলেছি প্রাচীরের কাছেই একটা নদী আছে। আমরা যখন সেই স্রোতস্বিনী পার হচ্ছি, সেই সময় সিম্বামওয়েন্নির বাসিন্দারা ‘গ্রেট মুসুঙ্গু’ দেখার কৌতূহল মেটানোর জন্য ভালো সুযোগ পেয়েছিল। মুসুঙ্গুর বেশ কয়েকটি কাফেলা আগেই এসেছিল। অনুমতির তোয়াক্কা না করেই তারা তাদের মুসুঙ্গুর প্রভূত সম্পদ ও শক্তির বাবদে খবর ছড়িয়েছিল। ক্ষমাহীন কাজ! তার ফলে সবার নজর ছিল আমার দিকে। একটা সময় নদীর পাড়ে এক হাজারেরও বেশি লোকের ভিড় জমেছিল, হরেকরকম ভাবে তারা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, কেউ প্রভুত্বব্যঞ্জকভাবে, কেউ ব্যঙ্গের দৃষ্টিতে, কেউ উদ্ধতভাবে, কেউ চতুরভাবে, কেউ লাজুকভাবে, কেউ বা উদ্দেশ্যহীনভাবে। এক হাতে হয় বর্শা, ধনুক আর তিরের গোছ ধরে অথবা গাদাবন্দুক পাকড়ে সুলতানার যোদ্ধারা অন্য হাতে নিজ নিজ বন্ধুদের জড়িয়ে ধরেছিল, ঠিক যেন নিসাস ও ইউরিয়ালাস, থিসিয়াস ও পিরিথাস, দামন ও পাইথিয়াস, বা অ্যাকিলিস ও প্যাট্রোক্লাসের মডেল, এঁদের সঙ্গে তারা গোপনে আমার পোশাক এবং রঙের বিষয়ে তাদের বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করছিল। হ্যামলিনের ইঁদুরদের কাছে বাঁশিওয়ালার সুরের যে টান ছিল, ‘মুসুঙ্গু কুবা’ শব্দটির টানও এই লোকদের জন্য ততটাই—সেই টানেই জনতার এক বিপুল অংশ প্রাচীরের বাইরে এসে নদীর পাড়ে জমা হয়েছিল; আমি যখন চার মাইল দূরের উঙ্গেরেঙ্গেরির দিকে চলতে থাকলাম, ভয় হল যে তাদের হাত থেকে আমি ছাড়া পাওয়ার আগে হ্যামলিন বিপর্যয়ের আবার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তবে সৌভাগ্যক্রমে, শেষপর্যন্ত রোদের তীব্রতা আর সেখান থেকে আমাদের শিবিরের দুরত্বের কাছে তারা হার মেনে ফিরে গেল। আমিও মানসিক শান্তি ফিরে পেলাম।



    গাধার জিনগুলি মেরামত করতে হবে । সেই সঙ্গে কয়েকটি প্রাণীর পিঠে এই ক-দিন মাল বয়ে বয়ে ঘা হয়ে গেছে, তাদের চিকিৎসা দরকার, তাই সব মালপত্র নামাতে হবে। অতএব এখানে দু-দিন বিশ্রামের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সিম্বামওয়েন্নিতে জিনিসপত্রের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও জিনিসের কমতি নেই।

    মাকান্দার উদ্দেশ্যে বাঁধা বোঁচকাগুলো খোলার সময়, চিন্তায় ছিলাম। এখন তো পুরো দস্তুর বর্ষা শুরু হয়ে গেছে। পথে যেমন বার বার বস্তাগুলো ভিজে চুপ্পুস হয়েছে, ভেবেছিলাম খুবই খারাপ দশা হবে। দেখলাম আমরা যেমন ভেবেছিলাম তার থেকে জিনিসগুলো অনেকটাই ভালো অবস্থায় আছে। তবে গোলাবারুদ, বন্দুকের বাক্স এবং চা-এর মতো কয়েকটা দামি জিনিস নষ্ট হয়েছিল। সেটা, আমার ধারণা, শ’র না ভেবেচিন্তে কাজ করার ফল। সে গাধাগুলোকে নালার বুকজলের মধ্যে দিয়ে খেদিয়ে এনেছে। সাধারণ বিচারবুদ্ধি বলে এসব সময়ে আগে বোঝা পিঠের থেকে নামিয়ে নিতে হয়। সেসব কিছুই সে করেনি। শ-কে ক্ষতির মাত্রা বোঝানোর জন্য আমার তাঁবুতে ডাকলাম। সে তাই শুনে রেগেমেগে অস্থির! নালিশ করল, আমি নাকি তাকে খাটিয়ে মারছি। আমি খুঁতখুঁতে, আমাকে খুশি করা শিবেরও অসাধ্য। একই সুরে আরও অনেক কিছু বলে গেল। শেষে বলল, সে আমার কাজ ছেড়ে দেবে আর এর পরে প্রথম যে কাফেলার দেখা মিলবে, সেটা ধরেই সে ফিরে যাবে। প্রত্যুত্তরে আমি তাকে বললাম যে, সে অদক্ষ আর অসাবধানী তা তো প্রমাণিত। কাজের চেয়ে আরামই তার বেশি প্রিয়। সে চলে যেতে চাইলে আমি আটকাব না। চাইলে তখনই চলে যেতে পারে। তবে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ছাড়াই তাকে যেতে হবে, জঞ্জিবারে তাকে যে অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল, তার পরিবর্তে আমি তার জিনিসপত্র রেখে দেব। এই ঘোষণা শুনে শ আবার সম্বিত ফিরে পেল। ইতিমধ্যে তার রাগও কিছুটা পড়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আবার কাজে মন দিল। শান্তি ফিরে এল।

    দ্বিতীয় দিন প্রথমবার বুঝলাম যে আরকানসাসের কম্পজ্বর-বৃদ্ধিকারী জলাভূমির সঙ্গে আমি সইয়ে নিতে পারলে কী হবে, পূর্ব আফ্রিকার মুকুনগুরুর আক্রমণের সামনে আমার সে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা নেহাতই তুচ্ছ। সকাল দশটা নাগাদ আফ্রিকান অসুখটির প্রাথমিক লক্ষণগুলি আমার শরীরে দেখা দিল। প্রথমত, এমনি ক্লান্তি অনুভব করছিলাম, একটু ঝিমোনো ভাব। তারপর শুরু হল শিরদাঁড়ার ব্যথা। কোমর থেকে শুরু করে, পিঠ বেয়ে ওঠা, আর পাঁজরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়া, যতক্ষণ না ব্যথাটা কাঁধে পৌঁছায়। সেখানে এই ক্লান্তিকর ব্যথার ঘাঁটি গেঁড়ে বসা। তৃতীয়ত খুব ঠান্ডা লাগতে শুরু করা, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মাথা ভার, চোখ ছলছল, কপালের শিরার দপদপানি শুরু। সেইসঙ্গে এল কম্পজ্বরের ঘোর। যা কিছুর উপরেই চোখ পড়ে, সব কিছুই যেন কেমন বিকৃত আর বদলে যাওয়া। পরের দিন সকাল দশটা পর্যন্ত এইরকম চলল। আমার সব শক্তি নিংড়ে বের করে নিয়ে মুকুনগুরু আমাকে ছেড়ে গেল।

    অসুখ বাধালে পরপর তিনদিন ওসুধ খেতে হবে। আমার আরকানসাসের অভিজ্ঞতার থেকে যেমনটা শিখেছিলাম। এর সবচেয়ে শক্তিশালী দাওয়াই পনেরো গ্রেন কুইনিন—পাঁচ গ্রেন করে তিনবার। ভোর থেকে সুর্য মাথার উপরে ওঠা পর্যন্ত প্রতি দু-ঘণ্টা অন্তর খেতে হবে—আগের রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় পেট-সাফ করার যে ওষুধ খাওয়া হয়েছিল, তার ফল প্রথম ফলার ঠিক পরেই ওষুধের প্রথম মাত্রা খেতে হবে। এটুকু বলতে পারি যে আমার নিজের আর আমার শিবিরের বাকি যাদের এ ব্যামো হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে চিকিত্সা পুরো সফল। মুকুনগুরু একবার হলে, এই চিকিত্সার পরে, আবার অসুখে পড়ার ভয় নেই, অন্তত আগামী কিছুদিনের জন্য নিশ্চিন্তি।

    সিম্বামওয়েন্নি মাননীয়া সুলতানার দূতেরা তৃতীয় দিন আমার শিবিরে এল। সুলতানার প্রতিনিধি হিসেবে সম্মানী আদায় করতে। সুলতানা সম্মানী দাবি করার জন্য নিজেকে যথেষ্ট শক্তিশালী বলে মনে করেন। তবে তাদের, আর সেই সঙ্গে ম্যাডাম সিম্বামওয়েন্নিকেও, জানানো হল যে আমরা জানি যে কাফেলা মালিকদের থেকে সম্মানী আদায় করা তাদের রীতি, তবে কিনা সেটা একবারই করার কথা। আর যেহেতু মুসুঙ্গু (ফারুকহর) তা ইতিমধ্যেই দিয়েছে, তাই আবার আমাকে দিতে হলে তা ঠিক হবে না। দূতমশাই বলল, ‘এনজেমা’ (খুব ভালো)। আমার উত্তরটি তাদের মালিকের কাছে গিয়ে জানাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিল। যদিও ব্যাপারটা আদৌ ভালো হল না, কারণ পরের অধ্যায়ে দেখা যাবে যে ম্যাডাম সিম্বামওয়েন্নি প্রতিকূল অবস্থার সুযোগ নিয়ে কেমনভাবে আমার থেকে তোলা আদায় করেছিলেন। এই অবধি বলে উপকূল অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময়ের অভিজ্ঞতার অধ্যায়টি শেষ করি।


    --

    (এখানেই চতুর্থ অধ্যায় সমাপ্ত। পরবর্তী কিস্তি থেকে শুরু হবে পঞ্চম অধ্যায়)


    ১) থিওডোর—সঠিক না বোঝা গেলেও অনুমান খুব সম্ভবত এখানে ইথিওপিয়ার সম্রাট থিওডোরোস বা দ্বিতীয় তেওদ্রোসের (১৮১৮ -১৮৬৮) কথা বলা হয়েছে। ইনিও খুব সাধারণ অবস্থার থেকে রাজা হয়েছিলেন।
    ২) নিসাস ও ইউরিয়ালাস— ভারজিলের এনিড মহাকাব্যের দুই চরিত্র। দুই প্রাণের বন্ধু। ট্রয় রাজ্যের বাসিন্দা। নিসাস ইউরিয়ালাসকে এতই ভালোবাসতেন যে তার জন্য যে-কোনো কিছু এমনকি ছলনা করতেও তার বাধত না। ট্রয়ের পতনের পরে বীর এনিয়াসকে অনুসরণ করে দেশ ছেড়ে পালান। তারা ইটালিতে এসে পৌঁছালে তারা শত্রুপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এক রাতে তারা দুজনে অতর্কিতে শত্রুশিবিরে হানা দিয়ে যোদ্ধাকে মেরে ফেলেন। লুঠের মাল নিয়ে দুজনে যখন পালাচ্ছেন, তখন শত্রুরা তাড়া করে। নিসাস পালাতে পারলেও ইউরিয়ালাস বিপক্ষের হাতে ধরা পড়েন। নিসাস তাকে বাঁচাতে ফিরে আসেন এবং দেখেন ইউরিয়ালাসকে মেরে ফেলা হচ্ছে। নিসাস সেই দেখে প্রবল বিক্রমে বন্ধুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং সেখানেই মারা যান।
    ৩) থিসিয়াস ও পিরিথাস- গ্রিক পুরাণের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। থিসিয়াস পাতালের রানি, হেডিসের বউ পারসেফনিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে দুই বন্ধু পাতালে গেলে সেখানে তাদের আটকে রাখা হয়। পরে হারকিউলিস যখন পাতালে যান, তিনি থিসিয়াসকে উদ্ধার করতে পারলেও মহাপাপী পিরিথাসকে অবশ্য উদ্ধার করতে পারেন না।
    ৪) দামন ও পাইথিয়াস- গ্রিক পণ্ডিত পাইথাগোরাসের দুই শিষ্য। এঁরা নিজের দেশ ছেড়ে সাইরাকাসে গিয়ে বসবাস করতেন। পাইথিয়াস সেখানকার রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ধরা পরেন। তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়। তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে রাজা তাঁকে সাময়িক মুক্তি দেন। শর্ত ছিল পাইথিয়াস নির্দিষ্ট সময়ে না ফিরলে তাঁর বন্ধু দামনের মৃত্যু হবে। দস্যুর আক্রমণ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিকূলতা পেরিয়েও পাইথিয়াস ফিরে আসেন। বন্ধুর প্রতি পাইথিয়াসের টান দেখে মুগ্ধ হয়ে রাজা দুজনকেই মুক্তি দেন।
    ৫) অ্যাকিলিস ও পেট্রোক্লাস—অ্যাকিলিস ছিলেন গ্রিক মহাকাব্যের মহাবীর। ট্রয়ের যুদ্ধের অন্যতম সেনাপতি। পেট্রোক্লাস ছিলেন আকিলিসের বন্ধু। ট্রয়ের যুদ্ধে আগামেমননের সঙ্গে মনান্তর হয়ে অ্যাকিলিস যখন আর যুদ্ধ করবেন না বলে মনস্থ করেছিলেন, তখন পেট্রোক্লাস অ্যাকিলিসের হয়ে যুদ্ধে যান ও নিহত হন। তাঁর মৃত্যুতে অ্যাকিলিসের প্রবল দুঃখ পান, নিজেকেই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন আর আবার যুদ্ধে যোগ দেন। বেশির ভাগ চিরাচরিত গ্রিক পুরাণ এদের প্রেমিকযুগল বলেই ধরে।

    কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন


    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।

     

  • বিভাগ : ভ্রমণ | ১৮ মার্চ ২০২১ | ৯১০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হীরেন সিংহরায় | ২০ মার্চ ২০২১ ১১:২৬103894
    • ভাল লিখছেন। পড়তে গিয়ে দেখছি সট্যানলি নিজের ইছছে মত সোয়াহিলির অনুবাদ করে চলেছেন। কোন ইংরেজি পাঠক আর তা নিয়ে তরক করবে?  সিমবা মানে সিংহ কিনতু সিম্বামওয়েন্নি মানে সিংহের শহর! যেমন সিংগাপুর ! কিসাবেনগো নামের অরথ ভয় পেও না । তাই এ নামে অসুবিধে হবার কারন কি? 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন