• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • করোনাকালীন দ্বিতীয় খন্ড

    Anuradha Kunda লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ০৫ অক্টোবর ২০২০ | ২৯০ বার পঠিত
  • ৫/৫ (৩ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • #করোনাকালীন (দুই)

    একত্রিশ

    অদিতি ঘুম ভেঙে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল ।এমনিতেই ও ঘুম ভাঙার পরে খুব কথা বলে না।আসেই না কথা। পাশের ঘরে বার্বি অনেকসময় রেওয়াজ করে।চুপচাপ শোনে।ওদের এই নিরিবিলি পাড়া, নিচে বাগানে হয়তো অচ্যুত তখন কাজ করছেন একমনে, গানের সুর সবমিলিয়ে একটা ভালোলাগা থাকে, যেটাকে ও শব্দ দিয়ে ভাঙতে চায় না।ফোনটা ফ্লাইট মোডে রাখে ইচ্ছে করেই।এই প্রাতঃকালীন নৈঃশব্দ্য খুব পছন্দ ওর। আজ ঘুম থেকে উঠেই মায়ের জন্য ভীষণ মন কেমন করছে। কতদিন মা নেই বাড়িতে।সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে।বার্বি মায়ের ডিরেকশনে, প্রায় মুমতাজের মতোই নিপুণ দক্ষতায় সংসার চালাচ্ছে।ওর ওপর একটু বেশি খাটনি পড়ে যাচ্ছে।ভোরে এখন আর রেওয়াজ করছে না সুনি। সকালবেলাতেই চড়া রোদ। একটা ভ্রমর গুনগুন করতে করতে ঘরে ঢুকছে আর বেরোচ্ছে।কেমন একটা বাজিং সাউন্ডে গোটা সকালটা ভরে আছে। মাত্র' সাতটা বাজে। দেবরূপ এখনো ঘুমাচ্ছে নিশ্চয়ই ।কোভিড অ্যাটাক হবার পর থেকে ও একটু বেলা করে ঘুমায়।ঘুমাক। রিকভারির জন্য ঘুম এসেনশিয়াল ।এখন অনেক নর্মাল হয়েছে। খাওয়া দাওয়া করছে।গুমঠো ভাবটাও কেটে গেছে।মাঝে যা ছেলেমানুষি শুরু করেছিল! ল্যাবের কাজ , অনলাইন ক্লাসও শুরু করেছে। আবার খানিকটা পুরোনো ছন্দে ফিরেছে ওদের লাইফস্টাইল । মানে লকডাউনে যতটুকু হয়।

    পাশের ওয়াশরুমে ফ্লাশের শব্দ। সুনি উঠে গেছে তার মানে। একদম স্নান সেরে নিচে নেমে যাবে।ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করবে।বড্ড মেটিকুলাস মেয়েটা। ঘড়ি ধরে সব কাজ করে। সুনি আছে বলে মুমতাজ বাড়ির ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। অচ্যুতের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। অদিতি এইসব অত পারে না।ওর কাজের ঝোঁক বাইরে। গতরাতে প্রায় দুটো পর্যন্ত রাশেজ দেখেছে।চোখটা টনটন করছে এখন। ড্রপ দিল বিছানাতে বসেই। 

    নিজের পায়ের পাতা দুটো দেখল। একটু চওড়া, বাদামি পাতা। লম্বাটে নখ। মুমতাজের পা গোলাপি।ছোট্ট।সুনির পা মুমতাজের মত। বহুদিন পেডাকিওর' করানো হয়নি। পায়ের চামড়া খসখস করছে।রাতে শোবার আগে ক্রিম লাগাতে ভুলেও যায় ও। নেলপলিশবিহীন পা।একটু ধূসর ।বিবাগী।

    মা কী উঠে পড়েছে? তাহলে মা কে একটা ফোন করা যেতে পারে। খুব ইচ্ছে করছে মায়ের গায়ের গন্ধ পেতে। মায়ের কোলে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। এমনিতে ও মোটেই আহ্লাদি টাইপ না।সুনিও না।কিন্তু একেকদিন এরকম হয়।মা মা করতে থাকে ভেতরটা। কিছু না করে শুধু মা কে জড়িয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে।মায়ের গায়ে একটা গন্ধ থাকে।সেটা অনেকক্ষণ নিলে মনটা কেমন একটা নরম আদরে ভরে যায় ।অদিতি বাইরে থেকে খুব টাফ মেয়ে ।এবং জীবন সংক্রান্ত ধ্যান ধারণা খুব পরিষ্কার ওর।কিন্তু ডীপ ডাউন কোথাও ও বিশ্বাস করে যে সব মানুষের একটা আদর বিলাস থাকা দরকার।দ্যাট ইজ দ্য পিলার অব স্ট্রেংগথ। মুমতাজের মধ্যে এত স্থিতধী একটা শক্তি আছে যে সেটা অদিতিকে খুব এনার্জি দেয়। সুনি যতই টিপটপ করে কাজ করুক না কেন , কী একটা যেন বিশাল ফাঁক।

    আর কতদিন লকডাউন? অদিতি ফোন খুলল। নিয়মিত'যন্ত্রসংগীত বেজে গেল ফোন খোলার ইঙ্গিত দিয়ে । নিচে বাগানে অচ্যুত নেমে পড়েছেন কাজে। 

    অভ্যেসমত হোয়াটস অ্যাপ আগে খুলল অদিতি। মুমতাজ ছবি পাঠিয়েছেন। একসঙ্গে তিনি ও মালবিকা। মন দিয়ে ছবিটা দেখল অদিতি। দেবরূপের মা। শি লুকস কোয়ায়েট সিকলি। চোখের নিচে কালি। শুনেছে ও।দেবরূপের দিদা কোভিডে মারা গেছেন।তারপর মালবিকা একটা ট্রমাতে চলে গেছেন। ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন। ব্যাকগ্রাউন্ডটা খুঁটিয়ে দেখল অদিতি।একটা পেইন্টিং আছে দূরে। কার বোঝা গেল না। মালবিকা একটা কাফতান পরে আছেন। পরের ছবিটা মুমতাজ আর নাজমার ।নাজমাআন্টি লুকস ভেরি হ্যাপি অ্যাজ ইউজুয়াল। ভেরি জলি।এনার্জেটিক।মুমতাজের যথারীতি খুব সুন্দর লাগছে সী গ্রিন শাড়িতে। মুমতাজ পার্ক স্ট্রিটের কিছু ছবি পাঠিয়েছেন। সব ফাঁকা। কতিপয় পথচারী ছাড়া।

    গুরবাণী মেসেজ করেছে। ও কিছু ছবি মেইল করেছে লিখেছে।মেইল পরে চেক করবে অদিতি।

    পরের মেসেজটা অতুল কুলকার্নির ।অতুল খুব একটা মেসেজ করে না। অদিতি টাচ করল মেসেজ বক্স।

    " নিশান্ত ইন ভেন্টিলেশন।"

    আর কিছু নেই লেখা। 

    হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে অদিতির। চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কাঁপছে থরথর করে। কীরকম আর্তস্বরে ডেকে উঠল , মা, মম! তারপর চিৎকার করে উঠল ।

    ভারতবর্ষে কোভিড ছড়াচ্ছে ।থিকথিক করে ছড়াচ্ছে ভাইরাস। লকডাউন ও ভিড় সমানতালে চলছে।মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না অতিমারী কী অতিমারী কেন। কোথায় ডেথ রেট? ফেটাল তো নয়।কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না নিজের না হলে। প্যারামিটার বোঝে না। হাজার হাজার শ্রমিক ফিরছে পায়ে হেঁটে।ট্রেনে ।বাসে ।সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং কে বুঝবে? কেমন করে বুঝবে? সচেতনতা কাকে বলে? কেমন করে মেইনটেইন করি? সবজি কিনে নুন জলে ধুচ্ছে। জুতো ধুচ্ছে ডেটল জলে। রাস্তায় অর্ধেক মানুষের মাস্ক থুৎনির নিচে।পেটে ভাত নেই।রুটি নেই।কাজ নেই।

    গত দিনপাঁচেক অদিতি , দেবরূপ দুজনেই নিজের নিজের কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিল। অদিতি বাড়িতে একটু বেশি সময় দিয়েছে।বাকি সময় নিজের কাজ।দেবরূপ । নিশান্তকে কল করা হয়নি।

    দিন পাঁচেক আগে কী নিশান্ত ফোন করে খবর নিয়েছে দেবরূপের। ইজ এভরিথিং ফাইন? হোপ দেয়ার ইজ নো প্রবলেম! 

    অসুখ কোভিভ ঘটিত খিটিমিটি, অভিমান কেটে যাবার পর অদিতি আর দেবরূপ কী নিজেদের নিয়ে বড় বেশি ডুবে ছিল? আবার কাজ। আবার সেই নিরলস ল্যাপটপে বা ডেস্কটপে মনোনিবেশ। আবার খুনসুটি আর ভালোবাসাবাসি।নিশান্ত শেষ কবে ফোন করেছে দেবরূপকে। জানতে হবে।এখনি জানতে হবে ।

    কী হল পাঁচ দিনে? প্রাণপণে অতুলের নম্বর খুঁজছে অদিতি।সুনি দৌড়ে এসেছে। হোয়াট হ্যাপেন্ড দি? 

    অদিতি যেন খাবি খাচ্ছে। হিস্টেরিক অনেকটাই।কেমন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে চোখ ।ক্রমাগত মা মা করে কেঁদে যাচ্ছে অদিতি।এত জোরে চিৎকার করেছে, বাগান থেকে দৌড়ে এসেছেন অচ্যুত ।সুনি ওর হাত পা ডলে দিচ্ছে সমানে। কিছুতেই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না অদিতি।ডুকরে কেঁদে চলেছে।

    এরপরেও ভ্রমরের বাজিং শব্দটি চলেছিল। রোদের রঙের সঙ্গে মিশে যাওয়া একটি মৃত্যুগন্ধী শব্দ। অদিতি অচ্যুতকে শক্ত করে ধরে বলল, আমাকে একটু হসপিটালে নিয়ে যাবে ড্যাড? 

    অচ্যুত শিবরামণ ।দুঁদে আইনজীবী । অসহায় বোধ করছেন মেয়েকে নিয়ে ।কোথায় যাবেন? বাবল্স। বাবল্স বেটা বি স্ট্রং। হি উইল বি ফাইন। এই দ্যাখো। কাম ।সি। নিউজ দ্যাখো। পিপল আর গেটিং ওয়েল।বিস্ফারিত দৃষ্টিতে বাবল্স তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। সুনি জল নিয়ে এসেছে। ওয়েট টিস্যু বের করে মুছিয়ে দিচ্ছে বাবল্সের মুখ।

    অচ্যুত সামনে বসে।

    লুক বাবল্স।অমিতাভ বচ্চন ইজ কোভিড পজিটিভ । অ্যাডমিটেড টু নানাবতী হসপিটাল! ক্যান ইউ ইম্যাজিন? ইভন অভিষেক অ্যান্ড ঐশ্বর্য আর অ্যাডমিটেড টু নানাবতী । তো কী হল? এরা সবাই ভালো হয়ে যাবেন।নিশান্ত উইল অলসো গেট ওয়েল বেটা।

    সুনিধি খুব ধীর স্থির।বুদ্ধিমতী। কোনো আবেগ 

    ওর কাছে বেশি পাত্তা পায় না।হয়তো নিজে অত ভোগে বলে। 

    জলে মিছরি ভেজাচ্ছে সুনি। ওর টিকোলো নাকের ওপর সোনালি চশমাতে ওর মায়ের খানদানি রূপ ঝলসায়।

    ড্যাড।বি প্র্যাকটিক্যাল ।অমিতাভ বচ্চন অ্যান্ড ফ্যামিলি গেটিং কোভিড পজিটিভ অ্যান্ড বিংগ অ্যাডমিটেড টু নানাবতী ইজ সিম্পল গট আপ কেস। নানাবতীর আগেন্স্টে প্রচুর চার্জেস ছিল। অল ফলস কেসেস অব কোভিড অ্যান্ড দে চার্জিং ল্যাখস ফর ইট।মেনি ফ্রড কেসেস। যেমন কলকাতায় হয়েছে। দ্যাটস হোয়াই বচ্চনস গট দেমসেল্ভস অ্যাডমিটেড টু প্রুভ দ্যাট এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন দ্য হসপিটাল। বচ্চন ইজ ফাউন্ডার মেম্বার, না? আদার ওয়াইজ হোয়াই শুড হি গো টু নানাবতী? ওর দুটো বাড়িতে দুটো আইসি ইউ আছে। অ্যান্ড টু ডকটরস। টোয়েন্টি ফোর ইনটু সেভেন। সব হোক্স। ডোন্ট বিলিভ দেম। 

    আশ্চর্য শান্ত ভাবে কথাগুলো বলে মিছরিজলটা নিয়ে এল সুনি। 

    মুমতাজ দেন এটা গরমের সময় ।মৌরি দিয়ে ।অচ্যুত অবাক হয়ে ছোট মেয়েকে দেখছিলেন। এরা কত অ্যাডভান্সড!অদিতির কানে কিছু ঢুকছিল না।

    কেবল একটা রৌদ্রালোকিত সকাল।বাজিং সাউন্ড 

    ডক্টর নিশান্ত ঠাকরে। বয়স আটাশ।উচ্চতা ছয় দুই। ওজন বাহাত্তর কেজি। বাবা মার একটি সন্তান। সহ্যাদ্রি হসপিটালের ডাক্তার। এই সকালের চারদিন পরে কোভিড আক্রান্ত নিশান্ত মারা যায় । (চলছে)

    # করোনাকালীন (দুই)

    বত্রিশ

    দেবরূপ খুব ভোরে উঠছে দুদিন হল।পুনের ভোর বড় সুন্দর। আকাশ দূষণমুক্ত বলেই হয়তো একটা অপূর্ব নীল রঙ আকাশে।ঘুম ভেঙে খানিকক্ষণ বিছানাতে এপাশ ওপাশ। গায়ে একটা সাদার ওপর কালো জিওমেট্রিক ডিজাইনের চাদর ছিল। চাদর ফেলে, এসি বন্ধ করে সব জানালা খুলে দিল ও। ব্যালকনিতে বসল এক গ্লাস গরম জল নিয়ে।

    বুকের ভেতরটা অসম্ভব ফাঁকা।হাল্কা। কিছু যেন নেই কোথাও ।নির্মাল্য'নেই। নিশান্ত নেই।দিদুন নেই। মা। মা কতদূরে। অদিতি? অদিতি আছে। কিন্তু আছে থেকে নেই হয়ে যেতে সময় লাগছে না। করোনাকাল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।সে নিজেও নেই হয়ে যেতে পারতো।অদিতি আর নিশান্ত।অতুল, বিবেক । কী অসম্ভব রিস্ক নিয়ে সুস্থ করেছে তাকে।জয় গোস্বামীর একটা কবিতা মালবিকা পড়ে শুনিয়েছিলেন একবার।কোনো

    একটা পুজোর ছুটিতে। " ছিল, নেই।মাত্র এই।" পুনের এই শান্ত নীলাভ ভোর রাতে , ব্যালকনিতে বসে দেবরূপের দু চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে।দুদিন বাদে। মা খুব একা ফিল করে।ভীষণ লোনলি।

    নিশান্তের খবরটা অতুল দিয়েছিল। অতুল এখনো স্ট্রে ফিডিং করে যাচ্ছে।রেগুলার ।হি ইজ স্ট্রংগ।

    দেবরূপ কোনো রিঅ্যাক্ট করেনি শুনে। যেমন নির্মাল্য ।যেমন মকরন্দ যোশীর বাবা প্রফেসর যোশী।ভাইরাস।বা ভাইরাস ঘটিত কারণ। অবিশ্বাস্য হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীটা।যে কেউ যে কোনো মুহূর্তে চলে যেতে পারে। 

    সাচ ইজ দ্য' আনপ্রেডিক্টিবিলিটি অব ডেথ। সেটাকে মেনে নিয়ে এই ভোররাতটুকু বড় সাররিয়াল। সবকিছু বড় অবিশ্বাস্য অথচ যা ঘটে যাচ্ছে, যা ঘটছে তাকে বিশ্বাস করতেই হবে। বিশ্বাস না করে উপায় নেই যে নিশান্ত দুবেলা আসতো, বেশি লম্বা বলে একটু ঝুঁকে হাঁটত, মোড়াটা টেনে নিয়ে বসতো মাথার কাছে, ওর শরীর থেকে আসতো লেবুর সুগন্ধ কারণ একটি লেবুগন্ধী অ দ্য কোলন ব্যবহার করতো নিশান্ত , সে নেই। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে দেবরূপ। দেবরূপের বুকে স্টেথো বসাত রোজ। এই হাত রোজ ধরতো নিশান্ত।পালস দেখতো। নিশান্তের বাঁ হাতের কবজিতে বাঁধা স্টিলের রিস্টওয়াচটা দেখতো দেবরূপ রোজ। এখন কী সেই রিস্টওয়াচটা একা একা পড়ে আছে নিশান্তের বেডসাইড টেবলে? সময় দিয়ে যাচ্ছে ঠিকমতো? ওর লেবুগন্ধী সুঘ্রাণ অপেক্ষা করে আছে স্নানের পর নিয়মিত স্পর্শের জন্য? বড্ড কম কথা বলতো নিশান্ত। শালিনীর সঙ্গে ডিভোর্সের পর যেন আরো কম কথা। কোনোদিন কোনো নিন্দা করেনি শালিনীর।কোনো অভিযোগ নয়। একবারই শুধু একটা বিষন্ন হাসি হেসে বলেছিল, বাস, অ্যাডজাস্টমেন্ট নহি হো রহা।উই ডিসাইডেড টু সেপারেট। একটি বিচ্ছেদ হলেই দুজনের একজন ভিলেইন বা আন্ডারডগ হয়ে যায় না। যেমন নিশান্ত।যেমন শালিনী।আলাদা আলাদা করে দেখলে ওরা কেউই খুব খারাপ মানুষ নয়। ওরা প্রেমও করেছিল বছর তিনেক। তখন তো নিশ্চয়ই ভালো লেগেছিল দুজনের দুজনকে।

    তবু অ্যাডজাস্টমেন্ট হল না।

    শালিনী এখনো শকে রয়েছে। ভীষণ নিয়মনিষ্ঠ মানুষ ছিল নিশান্ত।কোভিড শুরু হয়েছে পর থেকে বাড়ি যেত না।বাড়িতে বয়স্ক বাবা, মা, ঠাকুমা।কো মরবিডিটির ভয়। ওর বাবা মা দুজনেই হার্ট পেশেন্ট।হসপিটাল চেম্বারে থেকে যেত।শালিনী চলে যাবার পরে বোধহয় আরো একা থাকতে চাইত।প্রফেশনে মগ্ন। ঈষৎ বিষন্ন। ছিপছিপে।দীর্ঘদেহী একটি তরুণ। দেবরূপ যেখানে বসে আছে, সেখানে বসেই তো দেখতো, নিচে বাইক পার্ক করছে নিশান্ত।হেলমেট খুলে ডান হাতে নিচ্ছে। তারপর উঠে যাচ্ছে ওপরের দিকে।ওপরে।আরো ওপরে।

    দেবরূপ কনশাসলি কখনো ঈশ্বরের কথা ভাবেনি। লাইক মেনি আদার পিপল, হি ইজ সামহোয়ার বিটুইন আ বিলিভার অ্যান্ড আ নন বিলিভার। এই বিষন্ন ভোরবেলা ওকে তীব্রভাবে বেদনার্ত করে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল যেন।অপরিচিত ঈশ্বরকে কী যখন তখন ডাকা যায়?ও কেবল কাঁদতে লাগল ।যে কান্নাটা অদিতির সামনেও কাঁদতে পারেনি। 

    অলৌকিক হয়তো একেই বলে। বা ঈশ্বর। ঈশ্বরপ্রেরিত।

    ফোনটা এল ।তখনি। কত যুগ বাদে এই নম্বর থেকে ফোন এলো যেন। যেন এই মুহূর্তে এই ফোনটা ওর লাইফলাইন ।

    - কখন থেকে জেগে আছিস বাবু?

    মা। মা ফোন করছে। দিদুন চলে যাবার পর এই প্রথম। শুনেছে সব ও। ডিপ্রেশন । ঈশান মজুমদার মালবিকার ঘুমন্ত পর্যায়।

    - তুমি এখন ফোন করছো মা? 

    মালবিকা ছেলেকে ফোন করতেন সকাল ন'টায়। দেবরূপ লেট রাইজার।

    - দেখলাম তোমার নেট অন।সবুজ আলো জ্বলছে। তাই ভাবলাম জেগে আছো।

    ইউটিউবে লেকচার শুনছিল রাতে।মোবাইল ডেটা অন।অফফ করা হয়নি। ফোন বন্ধও করেনি।

    - তুমি এত ভোরে উঠেছো মা? তুমি তো দেরিতে ওঠো?

    - আজ ঘুম ভেঙে গেছে। লেসন প্ল্যান বানাবো। আমি আবার অনলাইন ক্লাস শুরু করছি বাবু।তোর গলাটা ধরা ধরা কেন?

    - সকাল তো। একটু বেলা হলে ঠিক হয়ে যাবে মা। 

    - কিছু লুকাচ্ছিস বাবা? 

    - না মা। এই যে তুমি ফোন করলে কতদিন বাদে, তাই গলা ধরে এলো।

    - তুই কতদিন আমার ফোন ধরিসনি বাবু। আমি ফোন করেই যেতাম।করেই যেতাম। দুশ্চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যেত আমার।বাবু! 

    - আমার খুব জ্বর হয়েছিল মা। 

    - হোয়াট! 

    - বাবা জানে। টুপুর জানে। তুমি দিদুনকে নিয়ে ভীষণ ডিপ্রেশনে ছিলে মা। নিতে পারতে না । আই ওয়জ করোনা পজিটিভ ।

    মালবিকা কাঁপছেন আবার। 

    - বাবু! কী বলছিস?

    - আমি এখন ভালো আছি মা। একদম সুস্থ। একদম। ভিডিও কল করি? তুমি দেখবে তোমার বাবুকে? চলো।রাখো। ভিডিও কল করছি।

    প্রযুক্তি মানুষকে যা কিছু দিয়েছে তার অনেকটাই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফোনের পর্দাতে মালবিকা আর দেবরূপ । দুজনে দুজনকে দেখছেন আর জলভেজা চোখে হাসছেন। আর কোনো কথা বলার দরকার নেই বিশেষ।

    ফোন রাখার আগে মেইল আর হোয়াটস অ্যাপ চেক করে নিল ও।একটা হোয়াটস অ্যাপ পড়ে বসে থাকল থম ধরে। আবার। অনেকক্ষণ । অনিল আংকল ।ফ্রম চেঙ্গালা।

    দেবরূপ । আই হ্যাভ দ্যাট স্পট অন ভাই লাংগস। ইউ রিমেমবার। পলি অ্যান্ড আই হ্যাভ ডিসাইডেড টু গো টু মুম্বাই। কোকিলাবেন। ক্যান ইউ জয়েন আস? ইফ দেয়ারজ নো প্রবলেম, প্লিজ রিপ্লাই।

    ফাইব্রোসিস হতে যাচ্ছে কিনা ইত্যাদি রিপোর্ট নিয়ে ও কাজ করেছিল তখন। ও ই তো জানিয়েছিল , দেয়ারজ স্পট অন লাংগস। সব ভুলে গেছিল। দুনিয়াতে কে বা কার কথা মনে রাখে! হু কেয়ারস?

    একটা চেঞ্জ দরকার। সবকিছুতে। পারা যাচ্ছে না আর । অদিতির সঙ্গে কথা বলতে হবে শুধু একবার।সাফোকেশন আসছে স্তরে স্তরে।

    ও রিপ্লাই করলো।

    মর্ণিং আংকল। উইল জয়েন উইদ ইউ ইন মুম্বাই ।

    কেরালার সবুজ বড় মনোরম। চেঙ্গালা থেকে কুরিসিমালা বুঝি একেবারে আঁকা ছবি। পরতে পরতে বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন টেক্শচারের সবুজ। এত মনোরম যে কোনো ফুলের দরকার নেই শোভা বৃদ্ধির জন্য। এই লং ড্রাইভে পলি বারবার দেখছিলেন অনিলের কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা। অনিল এখন ব্রিদিং ট্রাবল মুক্ত।কোনো ভারি পরিশ্রমের কথাই ওঠে না। গাড়িতে প্রায় রিল্যাক্স করে শুয়েই এসেছেন।লিকুইড ছাড়া তেমন কিছু খাননি। ফ্রান্সিস আচার্য ওঁদের জন্য একটি গেস্ট কটেজ প্রস্তুত' রেখেছিলেন।পলির কেবলি মনে হচ্ছিল এত শান্তি, এত সবুজ ছেড়ে এরপরে মুম্বাইতে কোন পরিবেশে গিয়ে পড়তে হবে কে জানে, তিনি কী সেই অজানা পরিস্থিতিতে এতটা শান্ত, শক্ত থাকতে পারবেন? মুম্বাই শহর এমনিতেও পলির একেবারে পছন্দ না। চেঙ্গালাতে এত নিবিড় সবুজ আর নির্জনতার' মধ্যে থেকে থেকে আরো অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে।অনিলের পার্টনার হীরালাল মান্ডেকার ওঁদের জন্য একটি গেস্টহাউস ঠিক করে দিয়েছেন কোকিলাবেনের কাছেই। দুটি রুম।কাজেই দেবরূপের কোনো অসুবিধে হবে না। কুরিসিমালাতে এসেই ফাদার ফ্রান্সিসকে সবটুকু বলেছেন পলি। এতদিন এতো টেনশন, এতো অ্যাংজাইটির পরে শুরু হতে যাচ্ছে তাঁদের নতুন যুদ্ধ।

    সারাদিনের ক্লান্তি, জার্নি।সবমিলিয়ে সেদিন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।পরদিন ঘুম ভেঙে গেল অনেক ভোরে ।অত'সকালে এখানে কুয়াশা থাকে। 

    ভোর চারটের প্রার্থনাসভাতে যোগ দেবার জন্য হালকা একটা চাদর মাথায় গায়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন অনিল আর পলি।

    আধোঅন্ধকার প্রকৃতির মধ্যে একটু একটু করে দৃশ্যমান হচ্ছে সবুজ চরাচর ।দুব্বো ঘাসের ওপর শিশির পড়ে আছে।পায়ে চটি থাকা সত্ত্বেও সেই ভেজা ভাব জড়িয়ে যাচ্ছে।ছোটছোট চেরি আপেলের গাছে, পাহাড়ের ধাপে ধাপে চা বাগানে, রাবার গাছের ভেলভেটসুলভ পাতায়, মূল উপাসনাঘরের তোরণদ্বারের গাঢ় গোলাপ গুচ্ছে, সর্বত্র প্রার্থনা ধ্বনিত হচ্ছে।

    হ্যাভ মার্সি অন মাই সোওল।ও লর্ড।

    এখানে ভাইরাস এখনো দাঁত বসাতে পারেনি। এখানে বোঝা যাচ্ছে না বাকি পৃথিবীর মৃত্যুমিছিল, কর্মছাঁটাই, বেকারত্ব ।গোটা উপত্যকাটি একটি প্রার্থনারত ফুল হয়ে ফুটে আছে বিশ্বজনীন মঙ্গলকামনায়।

    পলির ফোনে কোকিলা বেন থেকে মেইল ঢুকল ।ওঁরা তারিখ দিয়েছেন চেকআপের। ড.রমেশ চতুর্বেদীর ডেট পাওয়া গেছে।এই মুহুর্তে পলির কাছে এটিই সবচেয়ে জরুরি খবর।( চলছে)

    #করোনাকালীন (দুই)

    তেত্রিশ 

    পলি একটা সাদা শাড়ি পরেছেন।পাড় আর আঁচলে কালো আর লাল সুতোর' কাজ করা ডোঙ্গরিয়া শাড়ি।ভেতরে ছোট ছোট ফুল তোলা লাল কালোতে। চুলটা খুলে রেখেছেন।গায়ে একটা হালকা সবুজ খাদির চাদর। কারিসুমালার সবুজের সঙ্গে ভারি সুন্দর মানিয়ে গেছে তাঁর প্রাতঃকালীন সাজসজ্জাটুকু।অনিলের পরনে টি শার্ট আর ট্রাউজার।তার ওপরে একটা কালো চাদর।সকালবেলা বেশ ঠান্ডা থাকে ছটা সাড়ে ছটা পর্যন্ত ।ভোর চারটের প্রার্থনা সেরে অনিল আর পলি হাঁটতে বেরিয়েছেন সহ্যার পর্বত কন্দরে।যেমন লেখা আছে আশ্রম প্রবেশের মুখে " এন্টার ইনটু সাইলেন্স" সত্যি যেন তাই। বাতাসের শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। একটু পরে দুধ দোয়ানো শুরু হলে গরুদের গলার ঘন্টার শব্দটুকু কানে আসবে শুধু।এই অনৈসর্গিক সৌন্দর্যর কাছে এলে মৃত্যুভয় স্তিমিত হয়ে যায়। পলি ও অনিল অনেকক্ষণ একটা বড় গাছের নিচে বসে থাকলেন। অনিল বললেন, কী গাছ বলো তো এটা? পলির সারাক্ষণ গাছ নিয়ে কারবার। তাঁর নিজের নার্সারির সবটুকু তত্ত্বাবধান তাঁর নিজের হাতে। হাসলে এখনো গালের টোল স্পষ্ট। বললেন, আরিয়াল। এরিয়াল হল পিপুল গাছ । সামনে একটা বড় খাদ। তার ওপারে হালকা নীল পাহাড়ের রেঞ্জ ঢেউয়ের মত বয়ে যাচ্ছে।অনিল খুব হাল্কাভাবেই বললেন, পলি, ধরো আমার যদি ক্যানসার ডায়াগনোজড হয়, তাহলে কী করবো আমরা? বা তুমি? ইফ আই অ্যাম হসপিটালাইজড, ইউ উইল বি লেফট অ্যালোন। দেবরূপ হয়তো একসপ্তাহ থাকতে পারবে।তার বেশি ওকে রিকোয়েস্ট করা যায় না।হোয়াট উইল হ্যাপেন আফটার দ্যাট? তুমি কী করে ট্যাকল করবে সব কিছু? ভেবেছো?

    পলি কিছুটা অন্যমনস্ক । মাথার ওপর থেকে চাদরটা সরালেন।কী যেন ভাবছেন অথচ সেটা বলছেন না বা যা বলছেন সেটা ভাবছেন না। গত দুমাসে অনিলের ওজন কমেছে প্রায় সাড়ে তিন কেজি। স্বাভাবিক স্বাস্থ্য অবশ্য' ঠিক আছে।অনেকটা হাঁটাহাটি করলে হাঁপ ধরছে।সেটা তো যেকোনো চল্লিশোর্ধ মানুষের হতেই পারে।এইসব ভাবতে ভাবতে পলি সম্পূর্ণ অন্য কথা বলে বসলেন।

    বললেন,

    - অনিল।জানো।এইবার আশ্রমে এসে মনে হচ্ছে যেন লেডি চ্যাটার্লিজ লাভারের সেই টেভারসল গ্রামে এসে পড়েছি। এই বনের দিকটায় এসে একদম ঐরকম একটা ফিলিং হচ্ছে।চ্যাটার্লিদের সেই ফরেস্ট ।হাওয়ায় গাছ দুলছে।এত ফুল।এত রঙ।ঐ দ্যাখো লিলিফুলগুলো কেমন মাথা দোলাচ্ছে। ভায়োলেটস গুলো।তোমার মনে হচ্ছে না যে আমাদের মধ্যে ঐ প্রাণপ্রবাহ সঞ্চারিত হচ্ছে?আমার মনে হচ্ছে একটু ফরেস্টের ভেতরে গেলেই চৌকিদারের সেই কটেজটা দেখা যাবে।কনি আর মেলর্সকে পেয়ে যাব।ওখানে জঙ্গলের মধ্যে বড় বড় বাওবাব, সারকাশিয়ান, কোরাল উড গাছ।মোটা মোটা কান্ড বেয়ে ঘন মসের রাজত্ব।রেড বিড।স্টোন অ্যাপল।উড অ্যাপল।অনেক ভেপ্পু বা নিম গাছ আছে জঙ্গলে। হাওয়া ভালো।

    কেমন যেন ঘোরের মধ্যে কথা বলছেন পলি।

    মানুষ যা কিছু খারাপ নিয়ে আসে।বন কেটে ফেলে।জঙ্গল কেটে ফেলে।তো জানোয়ারেরা কোথায় যাবে? কোথায় যাবে ভাইরাস! মানুষের বড্ড লোভ।

    অনিল লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার পড়েননি। কে কনি, কে মেলর্স, কে চ্যাটার্লি এ নিয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই।তবু তিনি উৎসুকভাবে পলির দিকে তাকালেন।পলি প্রচুর'বই পড়েন।সেইসব বইয়ের চরিত্রের কথা তিনি মাঝেমাঝেই বলেন। অনিল চেষ্টা করেন পলি কী বলছেন সেসব বুঝতে কিন্তু আজ তিনি কিছুই ধরতে পারলেন না ।

    একটা দুটো কাঠবেড়ালি কাছাকাছি ঘুরঘুর করছে। বাদাম থাকলে দেওয়া যেত। আপাতত ওঁদের সঙ্গে কিছুই নেই।কাঠবেড়ালিরা ঘাসের মধ্যে থেকে নিজেদের খাদ্য'সঞ্চয় করে নিচ্ছে।হালকা রোদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দূরে চলে যাচ্ছে কুয়াশা। অনিল বললেন,

    - পলি , মুম্বাইতে যাবার আগে আমি তোমাকে প্রপার্টি সংক্রান্ত সব খোঁজখবর দিয়ে যেতে চাই। সমস্ত সেভিংস,ফিক্সড ডিপোজিট, শেয়ার ।নার্সারির পেপার্সগুলো দেখে নিতে হবে ঠিকঠাক করে।মেডিক্যাল ইনস্যুওরান্স। আমি এখান থেকেই গ্ল্যাডিলকে মেসেজ করছি।হি উইল কাম অ্যান্ড ক্ল্যারিফাই এভরিথিং টু ইউ। তুমি কিছুই খোঁজ রাখো না। কিন্তু এখন যা সিচুয়েশন সব প্রপার্টি আর ক্যাশ ডিটেইলস বুঝে নেওয়া দরকার।

    গ্ল্যাডিল থমসন ওদের ফ্যামিলি সলিসিটর।অনিল টমাসের বেশ কিছু পৈত্রিক সম্পত্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চেঙ্গালাতে এবং কোচিতে। অনিল ভাবছেন কী করে ব্যাপারগুলো গুটিয়ে আনা যায় যাতে পলি হ্যান্ডল করতে পারেন।তাছাড়া যদি ক্যানসার হয়, ইনস্যুরেনস ক্লেইম করতে হবে। গ্ল্যাডিল অবশ্য সেসব সামলে দেবেন।কিন্তু পলি শুড নো এভরিথিং ।হাতে কত ক্যাশ রাখবেন সেই নিয়েও আলাপ আলোচনা দরকার ।বাড়িতে বাচ্চাদের এবং পলির মায়ের জন্য ঠিকঠাক সব ব্যবস্থা রাখতে হবে।সব মিলিয়ে এখন তাঁর মাথা খুব ভারাক্রান্ত ।

    পলি আবারো একটা ঘোর' লাগা গলায় কথা বললেন।

    চলো না ঐ জঙ্গলের মধ্যে থেকে একটু ঘুরে আসি। আবার কবে আসা হবে কে জানে।দ্যাখো।অন্ধকার সরে যাচ্ছে ।গাছের পাতার মধ্যে দিয়ে একটু একটু আলো ঢুকছে ফরেস্টে।ফার্ণগুলো কী অসম্ভব সবুজ আর সতেজ লাগছে।তেমনি রাবার প্ল্যানটেশনের দিকটা।কিন্তু ওদিকে না।চলো আমরা ফরেস্টের ভেতরে যাই।ওখানে খরগোশ দেখতে পেলে বাচ্চাদের ভিডিও করে পাঠাবো।

    অনিলের হাত ধরে টানতে লাগলেন পলি।

    অনিল ভাবছেন, পলির কী হল! যেসব গুরুত্বপূর্ণ কথা নিয়ে এখন আলোচনা করা দরকার, পলি সেসব গ্রাহ্যি করছেন না! পলির মাথা ঠিকঠাক কাজ করছে তো!

    এখন গরুদের গলার ঘন্টার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আশ্রমের ব্রেড ওয়ার্ক অর্থাৎ নিজেদের খাদ্যার্জনের সময় ।কৃষিকাজ শুরু হবে।তারপর ব্রেকফাস্ট ।এখানকার গাছের মধু।দুধ।রুটি।ডেয়ারির মাখন।ফল।

    করোনাগ্রস্ত পৃথিবী এখান থেকে অনেক অনেক দূরে ।দুদিনের মধ্যে এই স্বর্গরাজ্য থেকে বেরিয়ে যাবেন তাঁরা । 

    অনেক দূরে নাগপুর শহরে তখন কোভিড নাইন্টিন আরো ছড়িয়ে পড়ছে। সুখনলাল মিস্ত্রির রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।সে ছাড়া পেয়েছে ক্যাম্প থেকে।নাগপুরে তিনজন মিডিয়া পার্সন কোভিড আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাতচল্লিশ হাজার।কংগ্রেস লেজিসলেটর বিকাশ ঠাকরে ডেপুটি সি এম অজিত পাওয়ারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যাতে সমস্ত'কোভিড রোগী বিনা মূল্যে চিকিৎসা পায়।বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত রোগীই চিকিৎসার জন্য তিন বা চার লাখ টাকার ইনস্যুরেনসের ওপর নির্ভর করে থাকেন। সে টাকা পেতেও অনেকটা দেরি হয়। তাই এই আবেদন।

    জালাল সুখনকে বলল, এ তো আম আদমির বহোত' সুবিধা হয়ে গেল রে। কোভিড হো তো হাসপাতাল চলে যাও ।ফিরি দাওয়া। ফিরি টিরিটমেন্ট। খানা ফিরি। পহনা ফিরি! ক্যা বাত! 

    সুখনলালদের সমস্ত চিকিৎসা বিনামূল্যে হয়েছে। তার যন্ত্রণাবিদ্ধ ফাটা পা এখন সেরে এসেছে অনেকটাই।সে ঝট করে আর পয়দল ঘরে ফেরার কথা ভাবছে না। সুমিরণের হাসি লেগে আছে ছুরির মত। ঠিকমত খাদ্য' পেয়ে শরীর এখন অনেক ভালো।

    জালাল আরেকটা খবর দিয়েছে । সরকার নাকি এক দেশ এক রেশন কার্ড বলে একটা পলিসি আনবে।সেটা হয়ে গেলে শ্রমিকদের সুবিধা হবে খুব।ফিরে যাবার তাগিদ কমে আসছে সুখনলালের। শুনতে পাচ্ছে, খবর আসছে ।ফিরে গিয়েও শ্রমিকদের হাল ভালো নাই। কাজ মিলবে না। আম্ফানের পর নাকী কাজের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেছে। তাহলে ফিরে কী করবে সুখন? ভাববে ঘরে ফেরার কথা আদৌ? নাগপুর জায়গাটা খারাপ না।সুখন নানারকম খোঁজ নিয়েছে ক্যাম্পে থাকাকালীন।প্রায় ছয় হাজার বাঙালি শ্রমিক কাজ করে এখানে। কামারের কাজ।লোহারের কাজ। সরকার তিনলাখ কোটি টাকা লোন দিয়েছে।কোলেটারাল ফ্রি লোন। রেড জোনগুলি বাদ দিয়ে নাকী বারোশো ইউনিট কাজ শুরু হবে।পঁচিশ হাজার লেবার কাজ পাবে। এখানে দৈনিক টাকাও বেশি।সুখন ভাবে আর ভাবে।ঘরে ফেরা কী জরুরি? শ্যামার কাছে?( চলছে)

    বনি মুন্সী নাগ আমার বন্ধু ছিলেন । ফেবুতে আলাপ। কিন্তু মধুর। করোনাকালীন পড়ে ইনবক্সে ভালোলাগা জানাতেন। শিল্পী অন্নদা মুন্সীর কন্যা বনি অসাধারণ ব্যক্তিত্বময়ী। রুচিশীলা। চলে গেলেন করোনাতে। এই পর্ব বনির জন্য।

    # করোনাকালীন (দুই)

    চৌত্রিশ

    টুপুর ফিরে দেখল মা ডেস্কটপ খুলে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে।

    মালবিকা একটা আকাশি নীল তাঁতের শাড়ি পরেছেন।লকডাউন শুরু হয়েছে পর থেকে শাড়ি পরা কমে গেছিল।বাইরে বেরোনো নেই।ম্যাক্সি আর কাফ্তানে কাজ চলে যায় ।তারপর কে যে কী পরিয়ে রাখতো খেয়াল করতেন না।শ্যামা টুপুরকে তাড়া দিয়ে লন্ড্রি থেকে শাড়ি আনিয়েছে কিছু।বাইরেই আছে।ওয়ার্ড্রোবে তোলা হয়নি। তার থেকেই একটা টেনে বের করেছেন আজ নিজেই।ঘন নীল কাঁথার কাজ করা ব্লাউজ।এটা কী সোনাঝুরি থেকে কিনেছিলেন? না কেউ দিয়েছিল? মনে পড়ছে না। 

    অনলাইন ক্লাসেও বাচ্চারা দুষ্টুমি করেই থাকে।বিশেষত দুটো ক্লাসের মধ্যে ফাঁক পেলে। দেখা সাক্ষাৎ না হওয়ার ফলে তারা এখন আরো বেশি চঞ্চল ।আরো উত্তপ্ত আরো অধৈর্য। সবাই তো বাড়িবন্দী। বেশির ভাগের ভাইবোন নেই। বাবা মা ভীষণ ব্যস্ত।লকডাউনে সবার কাজের চাপ অনেক বেশি।যাদের ভাইবোন আছে তারা একটা ল্যাপটপ নিয়ে টানাটানি করছে। দুটো ল্যাপটপ আর কজনের বাড়িতে আছে! একটা বাচ্চা ফোনে ক্লাস করলে আরেকটা ল্যাপি পায়।মালবিকা আজ ক্লাস সিক্স এ ।ওরা ভীষণ ভালোবাসে মালবিকাকে। কতদিন বাদে দেখছেন মুখগুলো। এতদিন যে ঘুমে তলিয়েছিলেন তাতে এইসব মুখের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।কীসের মধ্যে ছিলেন, কোন ঘোরে , এখনো মাঝে মাঝে হচ্ছে নিজেই জানেন না মালবিকা।শরীরে একটা তীব্র আলস্যবোধ কাজ করছে ।ঈশান বলেছেন এটা ওষুধের জন্য হচ্ছে। ট্র্যাংকুলাইজার বেশ কড়া। ঈশান ডোজ কমাতে চেষ্টা করছেন ।অন্য নার্ভের ওষুধও চলছে।

    নার্ভের ওষুধগুলোর সমস্যা এই যে ওষুধ খাবার কিছু পরে বেশ ভালো লাগে। যতক্ষণ ইফেক্ট থাকে ওষুধের ততক্ষণ খুব ভালো। তারপর ভয়ানক অস্থিরতা শরীরে এবং মনে।তখন এত অবসন্ন এত রিক্ত এত খিটখিটে লাগে যে মনে হয় ওষুধ খেয়ে ঘুমানো ভালো।

    ঈশান বললেন, তাহলে বুঝতে পারছেন তো, ওষুধের ইফেক্ট কী সাংঘাতিক ।আপনাকে আস্তে আস্তে ওষুধ ছাড়তে হবে।এগুলো লং টার্মে ইউজ করা একেবারেই ভালো নয়। এবং ছাড়াটা আপনার নিজের ওপর ডিপেন্ড করবে মালবিকা। ইউ ক্যান ডু ইট। সেল্ফ কনফিডেন্স ফিরে পেতেই হবে আপনাকে।

    ডাক্তারের চশমার কাঁচে পেছনদিকের ঘড়িটা প্রতিফলিত হচ্ছে।মালবিকা ভাবছেন, আদৌ কোনোদিন সেল্ফ কনফিডেন্স ছিল কী তাঁর, যে ফিরে পাবেন?

    মন্ডল পরিবার বিত্তশালী। মালবিকার বাবা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাতে কার্পণ্য করেননি।মালবিকা নাচ শিখতে চেয়েছিলেন।উচ্চমাধ্যমিকের পরেই বিশ্বভারতী। বাবা মা নিশ্চিন্ত। পড়াশোনাও হবে।নাচ ও হবে।যাকে বলে গুডি গুডি গার্ল ।মালবিকা, শ্যামলী, অনুপর্ণা সবাই তো তাই ছিলেন। কিন্তু সেটা সেল্ফ কনফিডেন্স নয়।আত্মবিশ্বাসী হতে হলে অ্যাডভেন্চারাস হতে হয়।নিয়ম ভাঙতে হয়।দুরন্ত হতে হয়। মালবিকা এসব কিছুই ছিলেন না। নিয়মমাফিক পড়াশোনা। ছকে বাঁধা পড়াশোনা করেছেন।ছকে বাঁধা নেচেছেন।প্রেমে পড়েছেন ছকে। বিয়েও তাই। শুধু বাদ সেধেছিল মন্ডল আর সেনগুপ্তর বৈবাহিক গোলযোগ।ত্রিদিব তখন পাহাড়ের মত অটল।আত্মীয়স্বজন কেউ পাত্তা পায়নি।মালবিকা চাকরি জয়েন করেছেন।ছেলে মেয়ে বড় করেছেন।এর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের কথা আসছে কোত্থেকে? 

    ডাক্তারের চেম্বারে ম্যারিন অ্যাকুয়ারিয়ামে অদ্ভূত সব প্রাণী।মালবিকার নিজের অ্যাকুয়ারিয়ামে চেনা রেড ফিশ।গোল্ড ফিশ।সোর্ড টেইল।গাপ্পি। এন্জেল।টাইগার বার্ব। চেনা জলে কনফিডেন্স বাড়ে না।কনফি বাড়াতে চাই অচেনা জল। অচেনা জলে সাঁতার না দিলে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে না মালবিকা। ঈশান যেন চোখ দিয়ে কথা বলে ।

    আপনি আপনার কাজটা খুব মন দিয়ে করুন।মানে করতে হবে।তাই করছেন, এরকম না।উইদ প্যাশন।

    মিস, মিস , গুঞ্জন ডাজন্ট নো দ্য বেংগলি টার্ম অব সাসপিশাস। ক্রিয়েটিভ রাইটিং ক্লাস। এটা বাচ্চারা খুব পছন্দ করে।মালবিকাও। তন্ময় হয়ে ক্লাস নিচ্ছেন।

    টুপুর ঝোলাটা নামিয়ে থপ করে রকিং চেয়ারটাতে বসে পড়ল।শ্যামা জল দিয়ে গেল। ওকে এইসব বলতে হয় না। জল খাচ্ছে টুপুর। দুলছে । মালবিকাকে দেখছে।এখনো অনেক চুল মালবিকার। একটা আলগা হাতখোঁপাতে জড়ানো।মা বেশ একটা বড় লোকের স্কুলে পড়ায়। ওখানে বাচ্চারা ফোন, ল্যাপটপ পেয়েই যাবে। পিডিএফ আপলোড করতেও শিখে গেছে ছবি তুলে।রুমা যে স্কুলে পড়ায় সেখানকার ছেলেমেয়েদের কী হবে।জল নিয়ে মুখের মধ্যে গোল করে রাখে টুপুর। তারপর আস্তে আস্তে গেলে।ছোটবেলা থেকে এইরকম। রুমা বিশ্বাস ক্যানিং এর মোহান্তিপুর গ্রামের জুনিয়র হাই স্কুল টিচার। তিনটে ক্লাসরুম ওর বিল্ডিংয়ের মূলধন। একটা বাঁশের বেড়ার বাথরুম।লকডাউনে স্কুল তো বন্ধ ছিলই আম্ফানের পর লোক ঢুকেছে। সরকারী চাল , ডাল দিতে মাসের প্রথমে স্কুলে যায় রুমা। ক্লাস? পড়ানো? রুমার মুখে ক্লান্ত হাসি। কাকে পড়াবো। আমাদের বাচ্চারা এমনিতেই খেতে পায় না। একদিন যা চাল , ডাল পায় তাতে চারপাঁচদিন যাবে খুব জোর।তারপর ওরা ইঁদুর মেরে খাবে । এর মধ্যে অনলাইন কেলাসটা কী? খায় না মাথায়

    মাখে?

    রুমা মোহান্তিপুরে থাকে না। ওর বাড়ি লখাইতে। যেটা লোকমুখে নকাই। দু' বার বাস বদল করে অটো ।তারপর ভ্যান। এই ওর'স্কুল যাত্রা । দিদিমণি , ছাত্রছাত্রী কারু কাছেই অনলাইন পৌঁছায় না। 

    টুপুরের পায়ে আজও অনেকটা কাদা লেগেছে। আগে হলে মালবিকা দেখেই চেঁচামেচি শুরু করতেন । এখন তাকানই না।

    জল খেয়ে টুপুর লাফ দিয়ে বেসিনের পাশের বাথরুমে ঢুকে পড়লো ।দরজা বন্ধ হবার শব্দে মালবিকা তাকালেন।চোখে প্রশ্নচিহ্ন। শ্যামা বলল, দিদি এলো।

    মালবিকা ঘড়ি দেখলেন না । আগে হলে দেখতেন।জেরা পর্ব চলতো। আবার ল্যাপটপ । 

    দেবরূপ জানিয়েছে সে মুম্বাই যাচ্ছে। অনিল টমাসের কিছু চেক আপ দরকার । অনিল আর পলি চেঙ্গালা থেকে আসবেন । দেবরূপ সঙ্গে থাকলে একটু সুবিধে হয় ।

    সবে কোভিড থেকে উঠেছে ছেলেটা। হয়তো এখনো দুর্বল । একা একা কী খাওয়া দাওয়া করে কে জানে! তার মধ্যে আবার মুম্বাইতে যাবে! 

    মালবিকা নিষেধ করেননি। ঈশানকে বলেছেন। ঈশান বলেছেন, যাক না। আপনার'ছেলে আপাতত পাঁচ মাস কাউকে কোভিড ইনফেক্টেড করতে পারবে না। ওর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে। আর দুর্বলতা টুর্বলতা ও' সব কিছু না। আপনারা মায়েরা বড় বেশি ভাবেন। টেনশন করেন। ছেড়ে দিন।একটু ছেড়ে দিন।দেখবেন সব ঠিক আছে। সবসময় রাশ ধরে রাখতে চাইবেন না।

    তারও ক্ষতি, আপনার আরো ক্ষতি । আপনার নিজের কাজ আছে মালবিকা। কাজে ডুবে যান। রিনিউ ইওর' ডান্স প্র্যাকটিস । 

    তাই কী? কী জানি। হয়তো তাই।অঙ্কিতা চেঁচাচ্ছে, মিস আই হ্যাভ ফিনিশড আপলোডিং। মালবিকা ড্রাইভ খুলে অঙ্কিতার লেখা চেক করতে শুরু করলেন।

    রীণার জ্বর কমতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগল। খুব ভয়ে ভয়ে এই এক সপ্তাহ সে কাটিয়েছে।নিচে যে মেয়েদুটি থাকে তারা খুব সাহায্য করেছে। দুবেলা রান্না করে পাঠিয়ে দিয়েছে। ফোন করেছে বারবার। কোভিড নাইন্টিন টেস্ট নেগেটিভ এসেছে। মেয়েদুটি যাদের মধ্যে একজন ব্যাংকে চাকরি করে তার নাম স্মিতা। সেই কোভিড টেস্টের ব্যবস্থা করেছিল। শিন্জিণী নামে মেয়েটি কলেজে পড়ায়। ওরা ববিকে নিয়ে গেছে নিজেদের কাছে। 

    ববি খুব মেচুওর'ব্যবহার করেছে এইসময়টা। এমনিতেই ও একটু শান্ত । মায়ের' জ্বর ওকে আরেকটু বড় করে দিয়েছে। ও রীণাকে জিজ্ঞেস করেছে, হোয়াই আর ইউ স্কেয়ার্ড মম? হোয়াট ইজ দিস কোভিড নাইন্টিন? 

    ওকে কী বলবে রীণা। নিজে তখন ভয়ে কাঁটা হয়েছিল। যদি কোভিড ধরা পড়ে, যদি হসপিটালাইজড হতে হয়! ববি কোথায় যাবে?

    ত্রিদিবের ওপর একটুও রাগ করেনি রীণা। এরকমই তো হবার কথা। এটাই হবার ছিল। ত্রিদিব কীই বা করতেন। যেদিন ত্রিদিব দরজা থেকে এসে ফিরে গেলেন, সেই দিনটা একটা থকথকে মন খারাপ কাদার মতো মনকে নোংরা করে রেখেছিল। রীণা ব্ল্যাংক হয়ে গেছিল পুরো। অনেকক্ষণ গুম হয়েছিল। ববিকে কমপ্ল্যান খাইয়ে টলতে টলতে সিঁড়ি ধরে দোতলাতে গিয়ে দরজায় বেল দিয়েছিল।

    আই হ্যাভ ফিভার। হান্ড্রেড টু। ক্যান ইউ হেল্প? আই হ্যাভ নোবডি অ্যারাউন্ড।

    স্মিতা ডাক্তার কল করে। এইসময় কোনো ডাক্তার আসেন না।স্মিতার বন্ধু ড.অরুন্ধতী সান্যাল এসেছিলেন । 

    পরে রীণা অনেক ভেবেছে। এই ব্যাপারে । আই হ্যাভ নোবডি অ্যারাউন্ড ।

    আমার কেউ নেই। এই বেসিক ফ্যাক্টটা মাথাতে রাখতে হবে। নো এক্সপেকটেশন। নো ডিম্যান্ড । তুমি ছাড়া এ জগতে মোর কেহ নাই, কিছু নাই গো। রীণা অবশ্য ঠাকুরদেবতা বা ঈশ্বর নিয়ে মাথা ঘামায় না।কিন্তু অসুখের সময় সে বারবার ঈশ্বরকে ডেকেছে। তুমি ছাড়া কেউ নেই। কেউ নেই।ছেলেটার কী হবে? ছেলেটা কোথায় যাবে? 

    শিন্জিণী এসে মৌসাম্বীর রস খাইয়ে গেছে মা ছেলে দুজনকেই।

    ত্রিদিব ফোন করেছেন। বারবার। 

    প্রথমে ফোন তোলেনি রীণা।কথা বলার মত অবস্থায় ছিল না । ছ' দিনের মাথায় ফোন তুলেছে ।

    - ভালো আছি তিরুদা। তুমি একদম ভেবো না। পরে কথা হবে। । এখন রাখি? 

    রীণা ভেবেছে কোনো অভিযোগ রাখবে না। ত্রিদিবকে ডেকে সেই ভুল করেছে। সে মানুষটার কী প্রাণের ভয় নেই।সংসারী লোক তোরে বাবা! লুকিয়ে আসে রীণার কাছে।তার কাছ থেকে কীই বা আশা করা যায় । 

    জ্বর সেরে গেলেও মুখ তেতো। স্মিতা কোথ্থেকে গন্ধভাদালি পাতা যোগাড় করে বড়া ভেজে টিফিন বক্স করে পাঠিয়েছে। ভাত খেতে মুখে রুচি নেই।ঐ বড়া দুটো খেয়ে ডালের জলটা চুমুক দিয়েছে রীণা।বেশ মেয়েদুটো। কোনো ঝুটঝামেলা নেই।কী ফ্রি ওরা! তার জীবনটা কেন এত ঘেঁটে গেল। দোতলা থেকে গান ভেসে আসছে

    যদি আরো কারে ভালোবাসো, যদি আরো কাছে নাহি আসো....

    দুর্বল শরীরে তাড়াতাড়ি চোখে জল আসে। ধর্মানন্দ কী রীণা কে ভালোবেসেছিল? বা রীণা ধর্মানন্দকে? না দুজনেই সুযোগ খুঁজছিল একটা পছন্দমত জীবন কাটানোর?

    সামনেই খবরের কাগজ খোলা। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ব্যুরোক্রাট দেবদত্তা রায় করোনাতে মারা গেলেন। আটত্রিশ বছর বয়সের ঝকঝকে ডাব্লিউ বি সি এস অফিসার মেয়েটি। কী ধারালো মিষ্টি চেহারা। সুন্দর স্বাস্থ্য । পরিযায়ী শ্রমিকদের দায়িত্বে ছিলেন।

    কোভিড পজিটিভ আসার পর হোম কোয়ারেন্টাইন । তিন বছরের ছেলে আছে দেবদত্তার।রীণার চোখ ফেটে জল আসছে।ভাগ্যিস সে বেঁচে গেছে! ভাগ্যিস!এর থেকে বড় আর কিছু নেই।

    ববি! ববি! বাবা এখানে আয়!ববি অবাক হয়ে মা' কে দেখছে। মা তো কাঁদে না। আজ মা কাঁদছে কেন? ববিকে বুকে টেনে নিয়েছে রীণা।ভাগ্যিস সেথা বেঁচে গেছে! বেঁচে আছে! কারুর ওপর আর একটুও রাগ নেই তার। ধর্মানন্দ, প্রভাবতী যোশী, তার নিজের মা, ত্রিদিব। কারুর ওপর রাগ নেই! সে বেঁচে আছে তো! দোতলা থেকে গান ভেসে আসছে" আমার চোখে তো সকলি শোভন, সকলি নবীন, সকলি বিমল।" 

    নটা পর্যন্ত ক্লাস নিয়ে নিজের ঘরে গেলেন মালবিকা । টানা তিনটে ক্লাস। চোখ ব্যথা। গা হাতা পা ম্যাজম্যাজ করছে।জানালা খুলে পর্দা সরিয়ে দিলেন।এখন ঘুম পায়নি। আলো জ্বালালেন না।বাইরের আলো একটু পড়েছে ঘরে।বাচ্চা গুলো এত খুশি হয়েছে তাঁকে অনলাইনে দেখে! ভীষণ ভালো লাগছে তাঁর। তাঁকে দেখেও কেউ খুশি হয় তাহলে। আনন্দ পায়! 

    তিনি ঘরে আসামাত্র হলে টিভির শব্দ ।শ্যামা চালিয়েছে নিশ্চয়ই! গান হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের গান। আজকাল সিরিয়ালে নামী শিল্পীদের গান ব্যবহার করে এত! পারমিশন নেয় কিনা কে জানে!

    মালবিকার শরীরে মনে আজ ভারবোধ কম। অনেক হালকা লাগছে ।অনেক কম বিষণ্ণতা । কোমরে আঁচল খুঁজেছেন মালবিকা।হাতটা ঘুরিয়ে নিচ্ছেন নিচ থেকে।পায়ে তাল।

    ফুল সে হাসিতে হাসিতে ঝরে , জোছনা হাসিয়া মিলায়ে যায়, হাসিতে হাসিতে আলোকসাগরে আকাশের তারা তেয়াগে কায়।

    তাঁর মা অমন টুপ করে হাসতে হাসতে মিশে গেছেন হয়তো কোন আলোকসাগরে। কীসের এত দুঃখ মালবিকা! আপনি পারবেন! কনফিডেন্স ফিরে পেতে।

    বন্ধ ঘরে সামান্য আলো।মালবিকা বিভোর হয়ে নেচে চলেছেন।সব দুঃখ, সব অভিযোগ যাদের শৃঙ্খলের মত পরিধান করে রেখেছিলেন , সেসব খুলে যাচ্ছে। খুলেই যাচ্ছে! কী আলোকময় চারিদিক!(চলছে)

    # করোনাকালীন (দুই) 

    পঁয়ত্রিশ 

    দেবদত্তা রায়ের মৃত্যু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সামাজিক মহলে বেশ হৈচৈ ফেলে দিল। তিনি ডানকুনি স্টেশনে পরিযায়ী শ্রমিকদের দায়িত্বে ছিলেন।সেখান থেকেই সংক্রামিত হয়েছিলেন নিশ্চয়ই ।কোভিড পজিটিভ নির্ণয় হবার পরে তিনি বাড়িতেই ছিলেন।হঠাৎ করে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবার ফলে তাঁকে হুগলি পরিযায়ী শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি মারা যান।ছোট্ট ছেলেটি থাকল মা হারা হয়ে।

    ভারি ঝকঝকে একটা চেহারা।বুদ্ধিদীপ্ত।প্রাণবন্ত।লাবণ্যে ভরপুর।টুপুর মন দিয়ে খবরটা পড়ে দেবদত্তার ছবিটা দেখছিল।মাত্র আটত্রিশ।এই বয়সে কারু কখনো মরে যেতে ইচ্ছে করে না।টুপুরের থেকে মাত্র বারো বছরের সিনিয়র । প্রথমে শোনা যাচ্ছিল কোভিড নাইন্টিন শুধুমাত্র বয়স্ক মানুষদের আক্রান্ত করছে।কো মরবিডিটি থাকলে ফেটাল হচ্ছে কেসগুলো।বাচ্চাদের কোভিড হচ্ছে না।পশুদের হচ্ছে না।এইসব আপ্তবাক্যকে কাঁচকলা দেখিয়ে ছ' মাসের বাচ্চার কোভিড হল। এখন তো দেখা যাচ্ছে বয়স কোনো ফ্যাক্টর না। যে কোনো বয়সের লোককে এফেক্ট করছে। দুজন বেশ অল্প বয়সী ডাক্তার মারা গেছেন। নার্সিং স্টাফ। 

    টুপুর যেন আবার সেই বাদুড়ের গুহাটাতে ঢুকে যাচ্ছে ক্রমশ। সেই অদ্ভূত গাছগুলো। লম্বা লম্বা ঝুলের মত পাতা।প্রাণহীন।নিস্পন্দ। ফ্যাকাশে অন্ধকারে একটা ততোধিক ফ্যাকাশে চাঁদ।ক্ষয়ে যেতে যেতে এতটুকু অবশিষ্ট ।ময়লা অন্ধকারে একরাশ দুর্গন্ধ ।পরিযায়ী শ্রমিক মরে যাচ্ছে।না খেতে পেয়ে আত্মহত্যা করেছে স্বামী, স্ত্রী , শিশুসহ পরিবার।টুপুর পূর্ববৎ।চিৎ হয়ে শুয়ে আছে বিছানায় ।ভেঙে চুরে ফেলতে ইচ্ছে করছে সবকিছু বাদুড় উড়ে যাচ্ছে কানের পাশ দিয়ে ।মুখের ওপর ঝাপটা মারছে ডানার। কী যেন বলছে তীক্ষ্ম, কর্কশ গলাতে।

    - কী ব্যাপার? আজকাল ফোনে পাওয়া যায় না তোকে।ফ্লাইট মোড করে রাখছিস? হোয়াটস রং?

    - নাথিং।ব্যস্ত থাকছি। তাই।

    - ফালতু বকিস না।তোর কী হয়েছে বলতো টুপুর? কিছু একটা হয়েছে।তুই আমাকে অ্যাভয়েড করছিস ।আই ডু ফিল ইট।

    - বাপরে।তুই তা হলে ফিল টিল করিস? মাইরি বলছি ।জানতাম না।

    রক্তিমের চোয়াল শক্ত হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে।ফোনের ওপাশ থেকে উত্তপ্ত তরঙ্গ টের পাওয়া যায় ।

    - আজ যাচ্ছি আমি। বাড়িতে থাকবি আশাকরি।

    - থাকব না রক্তিম। আসিস না।

    - আমি বলছি যাব, অ্যান্ড ইউ আর অ্যাস্কিং মি নট টু গো! হাউ ডেয়ার ইউ! ইউ আর সাপোসেড টু গেট ম্যারেড টু মি! 

    - সাপোজেড। নট ইয়েট ম্যারেড। আর বিয়ে করলেও আমার নিজের সময় আমার নিজের থাকত।

    - থাকত মানে? 

    কে যেন ভেতর থেকে ধাক্কা দিচ্ছে।বলে ফেলো।বলে ফেলো।

    - মানে বিয়েটা হচ্ছে না।

    বলে ফেলার পর বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল টুপুরের। ও জানে ।জানে বিশাল ঝামেলা পাকবে।

    ঝড় আসছে।আম্ফান ।

    - আর ইউ জোকিং?

    - নো। আই অ্যাম সিরিয়াস। তোকে আমি বিয়ে করতে পারব না রক্তিম।আমি পারব না ।তোর সঙ্গে হবে না আমার।

    - কী হবে না?

    - কিচ্ছু হবে না।প্রেম হবে না।ভালোবাসা হবে না। সংসার হবে না।

    বিশাল ভয়াল ময়াল চুপ করে থাকল। হিস হিস করে উঠল তারপরে।

    - তোর'বাড়িতে জানে?

    - জানবে।ডিসিশন ইজ মাইন।

    - উই আর ওফিশিয়ালি এনগেজড। 

    - বাট নট ম্যারেড। এনগেজমেন্ট ক্যান বি ব্রোকন। ইভন ম্যারেজেস ক্যান বি।

    - ইউ ফাকিং বিচ।

    হা হা করে হেসে উঠল টুপুর। বারমুডা পরা পা নেচে উঠল। ড্রাগনের চোখের পাতা কাঁপল হাতের ওপর।

    - শোন রক্তিম ।ঠিক এই জন্যে আই ক্যাননট ম্যারি ইউ। তোর'ভেতরটা পাঁক। আর শোন।বিচ একটা শব্দ। আ ওয়র্ড। ওটা বলে তুই আমার কিস্যু করতে পারবি না। ইউ আর নট ওয়র্দি ইনাফ টু ম্যারি মি। 

    - তোর কী এটাই প্র্যাকটিস? এনগেজমেন্ট করে, শুয়ে তারপর ডিচ করা? ডার্টি হোর! 

    - তুই যদি সেটা ভেবে খুশি থাকিস তাহলে তাই ভাব। বাট আই উইল নট ম্যারি ইউ।

    ও বুঝতে পারছে রক্তিম হেরে যাবার ভয় পাচ্ছে। 

    সাপটা নেতিয়ে যাচ্ছে।

    - শোন টুপুর। পাগলামি করিস না। তুই নিশ্চয়ই ইয়ার্কি করছিস। তিনশো লোক খাইয়ে এনগেজমেন্ট হয়েছে আমাদের।

    - তোর কাছে ঐ তিনশো লোক বড় ব্যাপার।আমার কাছে ভালো থাকা ইজ মোর ইমপরট্যান্ট।

    - বাট হোয়াই? আমরা ভালো থাকব না তোকে কে বলেছে? নেক্সট ইয়ার আয়াম প্ল্যানিং টু লিফ্ট টু ফ্রাঙ্কফুর্ট । ইউ ক্যান ম্যানেজ আ জব দেয়ার। 

    - প্লিজ স্টপ রক্তিম। এগুলো শুনে শুনে আমি হেজে গেছি। ডোন্ট ট্রাই টু ডমিনেট মি।

    - ডমিনেট করছি কে বলল? বিয়ে শুধু তোর আর আমার ব্যাপার তো না। আমাদের ফ্যামিলি? আওয়ার ফ্যামিলিজ আর ইনভল্ভড! 

    বিষণ্ণতা এসে পড়ল ঝপ করে। যেমন করে শীতের বিমর্ষ সন্ধেবেলা কুয়াশা নামে। কাউন্ট ড্রাকুলা চোখ মেলে তাকালেন। এবার শ্বাদন্ত নির্গত হবে। কুয়াশার রঙ বিষবৎ নীল। টপ টপ করে ঝরে পড়ছে মুখে , চোখে, নাকে।

    - ফ্যামিলি পরে। আগে যারা বিয়ে করবে তারা। তোর সঙ্গে আমি যদি ভালো না থাকি, ফ্যামিলি কী করবে? 

    - এতদিন বাদে তোর এইসব কথা মনে হচ্ছে কেন? 

    - এতদিন তোর সঙ্গে মিশে টের পেলাম দ্যাট উই আর নট মেইড ফর ইচ আদার।

    - শোন টুপুর। মেইড ফর ইচ আদার বলে কোনো কিছু হয়নি। দ্যাটস আ মিথ।বিয়ে একটা অ্যাডজাস্টমেন্ট । অ্যান্ড অফ কোর্স কনট্র্যাক্ট।

    খুব ক্লান্ত লাগছে ওর।এই অনর্থক তর্কাতর্কি । বচসা। বিষ নির্গত হচ্ছে ফেনার মত।আগল খুলে গেছে।

    - শোন টুপুর।আমি কিন্তু ছেড়ে দেব না। তোর'না থাক , আমার ফ্যামিলির একটা প্রেস্টিজ আছে।

    - আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে এতদিন। ক' বার খোঁজ নিয়েছিস রক্তিম? ক' বার দেখতে এসেছিস? 

    - কাকিমা ডিপ্রেসড।খোঁজ নিয়ে কী হবে।শি উইল বি অলরাইট ইন টাইম।

    ও হাসছিল। বিদ্রূপ ও বেদনা একসঙ্গে মিশিয়ে ।ওর'মুখ বেঁকে যাচ্ছে।

    - তোর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না রক্তিম।

    - নিজে তো মা' কে খিস্তি করিস। এখন দরদ দেখাচ্ছিস। খুলে বল। ঐ মুসলমান ছেলেটার সঙ্গে প্রেম ফ্রেম করছিস নাকী? শুচ্ছিস? 

    মাথার ভেতর একটা তার টং করে বেজে উঠল।খুব উঁচুতে । ও লাফ দিয়ে উঠে বসল। জানালা থেকে উঁকি মেরে দেখল টিকটিকি ।

    - হ্যাঁ । ইয়েস।আয়াম ইন লাভ উইদ জাহির। প্রেম করছি। অ্যান্ড হি ইজ হান্ড্রেড টাইমস বেটার দ্যান ইউ ইন বেড। আ থরো জেন্টলম্যান। 

    - শাটাপ ইউ হোর! 

    চিৎকার করতে করতে ফোন কাটল রক্তিম।

    বিষাদ ঘন হয়ে বসছে। ও জানে রক্তিম মোটেই এত'সহজে মেনে নেবে না। গ্রাহ্যই করবে না কোনো কথা।বাবা, মা সবাইকে নিয়ে অনেক চাল চালবে। চেঁচাবে। কাঁদুনি গাইবে। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল চালাবে ডায়মন্ডহারবার বা দিঘার কথা তুলে। কেন? হোয়াই ডিড আই গো? 

    টিকটিকি বলল, না গেলে জানতে পারতে না রক্তিম ঠিক কেমন মানুষ। বন্যকে বনে দেখলে তবে চেনা যায় । 

    ওহ্ ইয়েস। আমি জানি। কী স্টুপিড! বোকাটা জাহিরকে নিয়ে সন্দেহ করছে! ভাগ্যিস ! 

    ঈশান মজুমদারের নাম ও উজ্জ্বল মুখটি টুপুর আগলে রেখে দিল। যাতে কিছুতেই রক্তিম এখন কিচ্ছু না জানতে পারে! কিচ্ছু না। 

    কিন্তু তার আগে মা' কে জানানো দরকার । ভীষণ জরুরি। রক্তিমের পরের স্টেপের আগেই নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে হবে।

    গভীরে চলে যাচ্ছেন ঘুমে মালবিকা।আবছা কার গলা কানে আসছে! মা ডাকছেন কী? মা, কী বলছো মা? 

    টুপুর কিছু বলার আগে ফোন বেজে উঠলো। মালবিকা ঘুমের অতল থেকে উঠে ফোন ধরেছেন। 

    - কে ? 

    - আমি মুমতাজ আহমেদ বলছি। অদিতির মা।আপনি কেমন আছেন মালবিকা?

    টুপুর দেখল ফোনটা নিয়ে বিছানাতে উঠে বসছে মা। জল খাচ্ছে বোতল থেকে।

    - ভালো আছি মুমতাজ। আপনি আসুন একদিন আবার। সেদিন কিছু মুখে না দিয়ে চলে গেছেন।

    টুপুর দেখছে মা কথা বলছে ফোনে। চোখে ঘুম। শরীরে অবসাদ। এই সময়েই আসতে হল ফোনটা!

    ইরফান কাঁধে হাত রাখলেন পেছন থেকে।টুপুর চমকে ফিরে তাকালো।

    ইরফান চোখ টিপলেন।বললেন

    বাতা দো আজ।যো হোগা দেখা যায়েগা।( চলছে)

    করোনাকালীন (দুই)

    ছত্রিশ

    একটা চাদরে মুখ , গা, হাত পা ঢেকে শুয়েছিল টুপুর ।আপাতত ও'কাউকে দেখতে চায় না।টিকটিকি ওকে দেখতে পাচ্ছে না।ও এখন টিকটিকিকে দেখতে চাইছে না।মুখ ঢেকে শুয়ে থাকলে দিদুন খুব রাগ করতো। মরা মানুষের মুখ ঢাকা থাকে।দিদুন যখন চলে গেল , তখন কী দিদুনের মুখ ঢাকা ছিল? ও শুনেছে কোভিডে মৃত রোগীদের পলিথিন প্যাকেটে মুড়ে ধাপায় ফেলা হচ্ছে। দিদুন ভীষণ পিটপিটে। সারাজীবন দিদুনকে নিয়ে ওরা মজা করেছে। সাতবার হাত ধো।পা ধো।বিছানায় পা না ধুয়ে উঠবি না।পা ধোয়া নিয়ে তো মামাবাড়িতে রীতিমত ছুঁচিবাই। ওরা যেমন তেমন করে পায়ে জল দিয়ে বিছানায় যাতে উঠে না পড়ে, সেইজন্য খেলে ফিরলেই দিদুন নিজে এসে বাথরুমের দরজাতে দাঁড়িয়ে থাকত। 

    গোড়ালিতে জল দ্যাও। মনা, গোড়ালিতে জল দ্যাও। শুধু আঙুলটুক ধুইয়া হইব না। গোড়ালি ধও। কচলাও ভালো কইরা।

    পান জর্দার মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে দিদুনের মুখ থেকে। মেয়ের ঘরের নাতি নাতনি আসার জন্য বিকেল ভর নারকেলের নাড়ু পাকিয়েছেন। তার মিঠে গন্ধ ।হাতে একটা তেলতেলে ভাব। সাদা নরম শাড়িতে মুখ গুঁজে কী সুখ! ওরা হাসতো। দিদুনের আদরের ডাক। সবাই মনা। টুপুর মনা।দেবরূপ মনা। মামার ছেলেরা মনা।পাশের বাড়ির বাচ্চারা , যাদের সঙ্গে ছোটবেলাতে ওরা ছাত, মাঠ দাপিয়ে খেলত, তারা সবাই মনা।ওরা বলতো দিদুনের বড় মনা, ছোট মনা, মেজ মনা, সেজ মনা।অল মনাজ।

    আসলে দিদুন নাম মনে রাখতে পারতো না। এখন বোঝে। একটু একটু আর্লি ডেমেনশিয়া এসেছিল। কোভিড হাসপাতালে কী দিদুন তার মনাদের খুঁজেছিল?

    চাদরের অন্ধকারে মুখ ঢেকে মাতৃজঠরে তরলের মধ্যে ভাসমান অবস্থায় ফিরে যেতে চেষ্টা করছে যেন।কোনো কিছু দরকার নেই।শুধু মাতৃজঠরের নিরাপত্তা। কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। রক্তিমের অশালীন অশ্লীল খিস্তি ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে যাবে। ও বলেছে।ও জানে ওগুলো শব্দ মাত্র। যেগুলো সারা পৃথিবীতে মেয়েদের অপমান করার জন্য ব্যবহার করা হয়। বিচ। হোর। ফাকিং বিচ। রেন্ডী। মেয়েরাই শুধু বহুগামীতার অপরাধে দন্ডিত।তারাই শুধু বেশ্যা হয়।বিচ হয়। মুখে রক্তিমকে ঠেঁটিয়ে জবাব দিয়েছে। কিন্তু কোথাও একটা ও ওর উচ্চমধ্যবিত্ত টিপিক্যাল রক্ষণশীলতার ট্র্যাপে পড়ে আছে। কেন ঐ শব্দগুলো যন্ত্রণা দেবে ওকে? ও তো জানে দোজ আর ওয়ার্ডস ওনলি।কিন্তু শব্দের অনেক ক্ষমতা । জন্মাবধি যে শব্দগুলোর কনোটেশন ডিরোগেটরি, তাদের ছাড়িয়ে যাওয়া, ছাপিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। চাদরের নিচে অন্ধকার শুধু ঢেকে রাখে।মাতৃগর্ভের মত নিরাপদ উষ্ণতা দিতে পারে না। ওর ফুলে ফেঁপে ওঠা কান্না ও কাউকে দেখাতে চায় না।রক্তিম ওর প্রথম পুরুষ। যাকে ও ভেবেছিল উজ্জ্বল ।উদ্ধার ভাবেনি। রক্তিম নিজে অহংকার করে ওকে বলেছে ব্যাংগালোরে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ডের হৈ হৈ কাহিনী।জার্মানিতে লিন্ডার সঙ্গে দেড় বছরের সম্পর্ক । টুপুর এত বোকা কেন! কেন ও তখনি বোঝেনি যে রক্তিম মেয়েদের শরীর আর মনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করাকেই পৌরুষ ভাবে? কেন তখনি টার্ন ডাউন করেনি ছেলেটার অ্যারোগ্যান্স! হোয়াই হ্যাড আই বিন সো স্টুপিড? বন্ধুদের বয়ফ্রেন্ড আছে, ওরা চাকরি পেয়েই সেটল করবে, সো আই শুভ অলসো হ্যাভ আ বিএফ, এই চক্করে ফেঁসে ও রক্তিমকে হ্যাঁ বলে দিল ! হাউ স্টুপিড! রক্তিম মানে বাড়ি থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত ঘোরাঘুরি। রক্তিম মানে জর্মানি। বা ইউ এস। রক্তিম মানে পিতৃতন্ত্রের বংশানুক্রমিক নিরাপদ ছত্রছায়ায় থেকে এন আর আই কার্ড। চাকরি। ট্র্যাভেল। সেক্স। ছেলেমেয়ে ।এই ভেবেছিল? চার বছর ধরে এই ভাবল! কিছুতেই নিজের চেনা টুপুরকে রক্তিমের সঙ্গে এনগেজমেন্ট হওয়া টুপুরকে মেলাতে পারছে না ।ও।প্রথমে কিছু ভাবেনইনি অত।ভেবেছে এইরকমই হয়। সব পুরুষরাই হয়তো এইরকম। কবে থেকে বিতৃষ্ণা ঢুকলো কীটের মত ফুলের অন্তঃকোষে?ও হাত বাড়াচ্ছে কিন্তু জলের মধ্যে কোনো অবলম্বন পাচ্ছে না।মালবিকা সুস্থ থাকলে কী তাঁর কাছে যাওয়া যেত? শি ইজ টিপিক্যাল অ্যান্ড ট্র্যাডিশনাল ।হয়তো বুঝতেই চাইত না।বলতো, টুপুর'এটা কোনো ব্যাপার না। ইউ শুভ নো হাউ টু প্লিজ রক্তিম। 

    বমি আসছে ওর।পেটে ভীষণ যন্ত্রণা ।যথার্থই গর্ভে ভাসমান ভ্রূণের মত ওর হাঁটু জড়ো করা আছে পেটের কাছে। পি এম এস এক দুর্দমনীয় কষ্ট। প্রি মেন্স্ট্রুয়াল সিনড্রোমে হরমোনের ডিসব্যালান্স খুব বেশি থাকে। নাহলে রক্তিমের ছুঁড়ে দেওয়া সামান্য কটা শব্দে ওর হয়তো কিছু হত না। কিন্তু এখন ওর স্পিরিট কিছুটা হলেও শারীরবৃত্তীয় হরমোনাল ওঠা পড়ার কাছে পরাজিত।

    শরীরে বিশ্রী ভারবোধ ও পেটে যন্ত্রণা ওকে কুঁকড়ে দিচ্ছে এবং যত যন্ত্রণা হচ্ছে ও ততটাই সজোরে রক্তিমকে রিফিউজ করছে।শি ওয়ান্টস টু কিক হিম আউট।

    তুই পারিস না।ইউ ক্যান নট অ্যারাউজ মি লাইক লিন্ডা। শি ওয়জ আ ট্রু উওম্যান। ব্যাংগালোর গার্লস। এক্সপার্ট । তুই এখনো গার্লিশ টুপুর। ইউ ক্যান নট প্লিজ মি।

    লাথি মেরে চাদর ফেলে দিল ও। 

    কেন রে শালা? হারামি? কেন আমাকেই শুধু প্লিজ করতে হবে তোকে? ইভন ইউ ক্যান নট প্লিজ মি! তুই একটা অপদার্থ । ইউ ডোন্ট নো মাই মাইন্ড। হাউ ক্যান ইউ নো মাই বডি? আমার একার দায়িত্ব তোকে প্লিজ করার ? কেন রে ? বিয়ে করে ভাত কাপড় দিবি? গো টু হেল উইদ ইওর রিচুয়ালস অ্যান্ড ইওর ফ্যামিলি প্রেস্টিজ। আই ডোন্ট কেয়ার। ইফ আই অ্যাম আ হোর , ইউ আর আ ড্যাম ব্যাড জিগোলো হু ডাজনট নো হাউ টু প্লিজ আ উম্যান। তুই যে বলিস আমি তোকে প্লিজ করতে পারিনা, সেটা আসলে নিজের ইনকমপিটেন্সি ঢাকার জন্য বলিস।দ্যাটস ইউ।নিজের অক্ষমতা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে ব্লেমগেম খেলার পলিটিকস করিস। সব জানি। আই রিফিউজ টু ম্যারি ইউ অন দ্য গ্রাউন্ড অব ইনকমপিটেন্সি অ্যান্ড ভার্বাল অ্যাবিউজ ।গান্ডু।

    ফোনটা নামিয়ে রাখল এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে। যা শালা।যা করবি কর। টুপুরের বাপ মা যদি তাড়িয়েও দেয় বাড়ি থেকে, স্কলারশিপের টাকায় ওর চলে যাবে। যদিও লকডাউনে সেটা বন্ধ। শি ক্যান ম্যানেজ । জাহির আছে।মেধা আছে।খুব দরকার হলে দাদার কাছে ধার নেবে।শোধ করে দেবে টাকা পরে। 

    ঈশান বলেছে রাগ হলে যার ওপর রাগ হচ্ছে তার কাছ থেকে দূরে চলে যেতে। সে এখন কী করবে।ঐ শব্দগুলো সারা শরীরে কিলবিল করে বেড়াচ্ছে ।খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসছে কামতাড়িত শেয়ালের মত।শি ইজ নট গোইং টু প্লিজ রক্তিম লাইক হার মম ট্রাইজ টু প্লিজ ত্রিদিব সেনগুপ্ত। 

    ইয়েস। ওর ঘেন্না করে। ঐ রীণা যোশীর সঙ্গে বাবার অ্যাফেয়ার আছে মা জানে। মা কী বোঝে না বাবা কখন দেখা করতে যায় মহিলার সঙ্গে? স্ত্রী হয়ে বোঝা উচিত । মা তখন সাল্কি হয়ে থাকে। মুখ গোমড়া। অ্যাজ ইফ ত্রিদিব সেনগুপ্ত উইল কেয়ার।তারপর মা লেডিজ ক্লাবের মালগুলোর সঙ্গে নেকু নেকু খেলা খেলে।বাবা ফিরে পুরো ম্যানিপুলেশন চালায়।

    - তোমার হাতের গ্রিলড পমফ্রেট কতদিন খাইনি!

    ব্যস।মহিলা সব কাজ ছেড়ে রাঁধতে বসে গেল।টেবল সাজাবে থরে থরে।গ্রিলড মাছ খাওয়ার পর যেন ত্রিদিব সেনগুপ্ত আর রীণা যোশীর কলিং বেল বাজাবে না। ফাকিং ফুলস! মা টুপুরকে কিচ্ছু দিতে পারবে না।

    - জাহির? তোর' জ্বর সেরেছে রে? শোন ।এক হয় তুই আমাদের বাড়িতে আয়।নাহলে আমি যাচ্ছি। খুব দরকারি কথা আছে। 

    - আমাদের পাড়া কনটেইনমেন্ট জোন টুপুর। এখন আসতে পারবি না।আমিও বেরোতে পারব না।ফোনে বল।আমি এখনো খুব দুর্বল ।

    এই একজন আছে।একজন বন্ধু ।যাকে সে সব বলতে পারে। পি এম এসের কষ্ট শেয়ার করতে পারে। রক্তিম কত সহজে বলল, শুয়েছিস ওর সঙ্গে? শোয়ার বাইরে কিছু মাথাতে নেই ওর।একটাই জিনিস বোঝে মেয়ে পুরুষ সম্পর্কে । ভিকি।জাহির।বন্ধু । যাকে সব বলা যায়। এমনকী ঈশানের কথাও বলা যায়।হ্যাঁ ।জাহিরের পাশে শুয়েও থাকা যায় । ইন ফ্যাক্ট শুয়েওছে ক্যাম্পে গিয়ে । ট্রেকিং এ। তাঁবুতে কষ্টমষ্ট করে চারজন পাশাপাশি।সারারাত গল্প। রক্তিম ।উল্লুটা জানে না শোয়া মানে যৌনতা না।সেটা ডিপেন্ড করে সম্পর্কের ওপর। জাহির একটা অসম্ভব পিওর ছেলে।পিওর অর্থ সিনসিয়ার ।হি ডেডিকেটেডলি লাভস হিবা। তাই টুপুরের পাশে শুয়ে আড্ডা মারতে ওর অসুবিধা হয়না। শরীর অন্য কথা বলে না।বন্ধু মানে বন্ধু।মা বুঝবে না।রক্তিমের মত।আনপড়।

    ও সাবান দিয়ে নিজের শরীর আঁচড়াচ্ছিল যেন।লুফাটা ছিঁড়ে যাবে। ডায়মন্ডহারবার বা দিঘা বা মুকুটমণিপুর যেন নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে ঘষে ঘষে।প্রতিটি চুম্বন, প্রতিটি আশ্লেষ যেন ও ঘষে ঘষে তুলে ফেলবে কারণ সব ভুল ছিল। অথচ পারছে না। ক্লান্ত।মাথা থেকে টপ টপ করে পড়ছে জল। কেঁদে ও স্নান করে চোখ টকটকে লাল। স্কাই ব্লু বাথরোব গায়ে জড়ানো।ঘরে ঢুকে চমকে গেল ও।

    খদ্দরের অফফ হোয়াইট পর্দার ওপর ছোট লাল ;ফুল।টেক্সচার এত ভালো যে চোখ ডুবে যায় পর্দার সামনে ছায়ামূর্তির মত।মা।

    মালবিকা বহুদিন বাদে ঢুকলেন,এ ঘরটা কেমন অগোছালো হয়ে আছে। টুপুর বাথরুম থেকে বেরিয়ে মাথা মুচছে।

    মালবিকা অবাক চোখে মেয়েকে দেখলেন।

    - মিনু ফোন করেছিল।পাগলের মত কী বলেছিস নাকি রক্তিমকে? বিয়ে করবি না বলেছিস?

    করোনাকালীন (দুই)

    সাঁইত্রিশ 

    প্রথমে বাজারে এন নাইন্টিফাইভ মাস্ক পাওয়া যাচ্ছিল না। সকলে বলছিল, এন নাইন্টিফাইভ হচ্ছে আসল মাস্ক যা ভাইরাস আটকাতে পারে।বাকি সব মাস্ক ফালতু।কোনো কম্মের না।সবাই ওষুধের দোকানে এন নাইন্টিফাইভ মাস্কের অর্ডার দিয়ে রাখছিল।

    এখন যখন তিন নম্বর লকডাউন চলছে তখন শোনা গেল যে এন নাইন্টিফাইভ অতি খারাপ মাস্ক।ওতে খুব ক্ষতি হয়।ও জিনিস কখনোই ব্যবহার করা ঠিক নয়।

    হরপ্রীত অবশ্য প্রথম থেকেই কাপড়ের মাস্ক বানিয়ে চলেছে এবং এই জিনিসের কাটতি খুব ভালো। দশটাকা।বিশ টাকা।আর ডিজাইনার হলে চল্লিশ । হরপ্রীতের ডিজাইনার মাস্ক মানে ব্লাউজপিস থেকে কেটে কলমকারি বা ইক্কতের মাস্ক।কোনটিতে আবার শ্যামা একটু ছুঁচের কাজ করে দেয়। মেয়েমহলে এইসব মাস্কের চাহিদা খুব বেশি।দশটাকিয়া বিশটাকিয়া সার্জিক্যাল মাস্ক ইউজ অ্যান্ড থ্রো করে ব্যবহার করার মানসিকতা ও নেই সামর্থও নেই।তার ওপর একবার ধোয়ার পরেই সার্জিক্যাল মাস্কে রোঁয়া উঠে নাকে মুখে কুটকুট করে।তারচেয়ে প্লেন কাপড়ের মাস্ক ঢের ভালো।না পরলেই পুলিশ পেটাচ্ছে।কাজেই পুলিশের প দেখলেই থুৎনি বা কপালে জড়ানো মাস্ক যথাস্থানে চলে যায় । হরপ্রীতের ফুটপাথের দোকান দিব্যি চলছে।শ্যামা অবসর সময়ে কলমকারির থ্রি লেয়ারড মাস্ক বানাচ্ছে।মালবিকার সেলাই মেশিন পরেই থাকে।এখন মাস্ক বানাতে কাজে লাগছে। দুপুরে সন্ধ্যায় খটখট শব্দ করে সেলাই মেশিন চলে। দেবরূপ , টুপুর যখন ছোট ছিল তখন মালবিকার শাশুড়ি এই মেশিনে ওদের বাড়িতে পরার জামা, নিজের পেটিকোট, ব্লাউজ সেলাই করতেন।মালবিকাও করেছেন।শাশুড়ির মৃত্যুর পরে আর সেলাই মেশিনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না।স্টোররুমের এককোণে পড়ে ছিল।

    - একটু তেল দিস মেশিনটাতে। তাহলে ভালো চলবে ।

    মালবিকা একমনে মাস্ক তৈরি করা দেখছিলেন ।

    শ্যামা মুখ তুলে বলল, ক'টা ডিজাইন দাও না বউদি। বা একটা লাইন বলো কবিতার। সব লেখা আঁকা মাস্ক চায়।তা হলে আরেকটু দাম বাড়ানো যাবে।

    দাম বাড়াতে হবে মাস্কের।পেঁয়াজ সত্তরটাকা কিলো। আলু পঁয়ত্রিশ চল্লিশ। পটলে হাত দেওয়া যায় না।নেহাত এ বাড়িতে আছে বলে চলে যাচ্ছে শ্যামার ।না হলে কী হত সে ভাবতেও পারে না।টাকা জমাতে হবে।পড়ে যাওয়া ঘর তুলতে হবে।কতদিনে যে কী করবে শ্যামা বুঝতেই পারছে না। ওদিকে আবার আধার কার্ডের ঝামেলা আছে।

    মালবিকা এমনিই ঢুকেছিলেন টুপুরের ঘরে।বহুদিন আসেন না।ও পছন্দ করে না।স্মোক করে।নিজের পছন্দমত থাকে।বেশি ঘাঁটান না মালবিকা।অসুস্থ হবার পরে তো আসেনইনি।ভয় করে।প্রতিটি কথার পরে কী জাতীয় প্রত্যুত্তর আসবে সেটা তিনি জানেন। পূর্বজ্ঞাত বিপদ ভীষণ বিবমিষা তৈরি করে।মালবিকা সেই অপরিসীম বিবমিষার অন্ধকার ঠেলতে ঠেলতে চলেছেন।এমনকি ত্রিদিবের সঙ্গেও।কোন কথার পরে ত্রিদিব ক্রুদ্ধ হবেন, তারপর কীভাবে মালবিকাকে ইমোশন্যালি ম্যানিপুলেট করে বিছানায় নিয়ে যাবেন এবং তারপর আবারো আবারো রীণা যোশি...এই নক্কারজনক পুনরাবৃত্তি! কী বিশ্রী। 

    [ ] ঘরে ঢুকে দেখছিলেন । শ্রীহীনতা কোনোদিন পছন্দ না।মালবিকার দু চোখের বিষ।সেইজন্য মেয়ে যেন আরো বেশি করে অগোছালো রাখে সব।নোংরা ।কুঁচকানো বিছানার চাদর।পর্দা।মালবিকা সুস্থ থাকলে চাদর, পর্দা সব ফটফট করে। টেবিলের ওপর কী নেই। শার্টটা পর্যন্ত খুলে টেবলে ফেলে রেখেছে।বইপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা।ল্যাপটপ খোলা। গুচ্ছের সিগারেটের প্যাকেট।অ্যাশট্রে বিছানাতে।চেয়ারে ডাঁই করা কাপড়জামা।ব্যাগ। মালবিকার কাছে এই দৃশ্য অতি মর্মান্তিক । তাঁর মেয়ে কী করে এত শ্রীহীন হয় তিনি ভেবে কূল পান না। যতদিন ছোট ছিল এত বাড়াবাড়ি ছিল না।যেই রেজাল্ট ভালো করতে শুরু করলো, কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেল।তাঁর বন্ধু বা কলিগদের মেয়েরা কেউ এরকম নয়।মায়েদের সঙ্গে মেয়েদের চমৎকার বন্ধুত্ব আছে।তারা একসঙ্গে শপিং করে।ফিল্ম দেখে। নিন্দাচর্চা করে।।তাঁর মেয়েটা একেবারে আলাদা। মালবিকা নিজে যখন হস্টেলে থেকেছেন, তখনো নিজের পরিপাটি বিছানা। সরু বোতলে একটা মানিপ্ল্যান্ট, গ্লাসে দুটো ফুল রাখতেন।জামাকাপড় পাট চুকিয়ে করে ভাঁজ করতেন তোশকের তলায় রেখে। ধূপ জ্বলতো। সাজগোজের জিনিস সুন্দর করে রাখা থাকত আয়নার সামনে।এই মেয়ে ঘরে কোনো ড্রেসিং টেবল ঢোকাতে দেয়নি।ওয়ার্ড্রোবে একটা ফুল লেংগথ আয়না আছে।তাতেই ওর নাকী হয়ে যায় । ব্রাউন লিপস্টিক আর কাজল ছাড়াআয কিছু ব্যবহার করতেও দেখেন না। মালবিকার গয়নাগুলো পড়ে আছে।

    এত এলোমেলো। বিছানা ভর্তি বই। হেডফোন।একটা মানুষের কটা হেড ফোন লাগে! স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট খোলা পড়ে আছে বিছানাতে। এসব জিনিস মালবিকারা কত গোপনে লুকিয়ে রাখতেন, যাতে কারু চোখে না পড়ে।এমনকী নিজের কাছেও লুকিয়ে রাখতেন পারলে। 

    তবে প্যাকেটটা দেখে একটু শান্তি পেলেন মালবিকা ।এই আরেক টেনশন। রক্তিমের সঙ্গে যেভাবে মেলামেশা করে মেয়ে তাতে তিনি চিন্তায় থাকেন। হোক না এনগেজমেন্ট।বিয়ে তো হয়নি! রক্তিম এসে এই ঘরে দরজা বন্ধ করে দেয়।দু তিন ঘন্টা দরজা বন্ধ ।ভীষণ অস্বস্তি বোধ করেন মালবিকা ।অথচ কিছু বলতে পারেন না। ভাবি জামাই। শুধু বিড়বিড় করেন।ওরা বাইরেও যায়।এনগেজমেন্টের পর খুল্লাম খুল্লা। মালবিকা এখনো ভেতরে ভেতরে তত পোস্টমডার্ন হয়ে উঠতে পারেননি, যতটা লেডিজ ক্লাবে নিজেকে দেখান।তাঁর শালীনতার সংজ্ঞা অন্যরকম। 

    টুপুরের কাছে এসব এক্সপেক্ট করাই যায় না।দেবরূপ অনেক গোছানো। অনেক সংযত। 

    এই মেয়ে আবার রক্তিমকে কী বলেছে, মণি মানে মালবিকার বান্ধবী, রক্তিমের মা ব্যস্ত হয়ে ফোন করেছেন।

    মেয়েকে বেশি খোঁচাবার মত শারীরিক বা মানসিক জোর এখনো মালবিকা অর্জন করে উঠতে পারেননি।হয়তো দুজনে ঝগড়া হয়েছে।টুপুরের যা মেজাজ! রেগে কিছু বলেছে।বলেছে বিয়ে করবে না।ছেলেমানুষি যতসব।কী যে বলবেন মেয়েকে মালবিকা বুঝতেই পারছেন না।শরীর এখন বেশি ধকল নিতে পারবে না।চেঁচামেচি করার ন্যূনতম শক্তিও নেই।কোনোমতে উঠছেন, চলছেন।ডাক্তার বলেছেন কাজে ইনভল্ভড থাকতে।যে কোনো ধরনের কাজ।ক্লাস নিতে শুরু করেছেন তাই। ভালো লাগছে বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করতে।হোক ভার্চুয়াল, তবু মুখগুলো দেখা যাচ্ছে তো! শালিনী মিশ্র ।ক্লাস সিক্স।আজ তাঁকে জিজ্ঞেস করেছে, মিস , হোয়াট ইজ রঙ উইদ ইউ? কী হয়েছে? হোয়াই ডু ইউ লুক সিক?

    কাল থেকে হালকা মেক আপ করে বসবেন। 

    টুপুর স্নান করছে মনে হয়।যখন তখন স্নান করে মেয়ে ।কিন্তু খুব হার্ডি।জিমটিম করে।ঝট করে ভোগে না।

    কী বলবেন মেয়েকে ভেবে চলেছেন মালবিকা।বেশি স্ট্রেইন নিচ্ছেন না মাথাতে।অতিরিক্ত ভাবলে ওষুধের ইফেক্টে মাথা ঝিমঝিম করে। মেয়েকে নিয়ে কী করবেন?একে তো কোভিডের মধ্যে যত্র তত্র বাইরে যাচ্ছে। আম্ফানের পরে সুন্দরবন যাচ্ছে রেগুলার ।ত্রিদিব কিছুই বলেন না মেয়েকে।কোনো শাসন নেই।তারপর এখন সে নিজের স্কলারশিপের টাকায় চলে।কাউকে তোয়াক্কা করে না। কিন্তু রক্তিমের সঙ্গে এখন থেকেই ঝগড়া ঝাটি? মালবিকা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।

    শ্যামা এসে দরজা ঠেলে ঢুকল।চাদর পাল্টে দেব বউদি?

    মেয়ে বাথরুম থেকে বেরনোর আগেই কাজ হয়ে যাওয়া ভালো। মাথা নাড়লেন মালবিকা ।শ্যামা নোংরা চাদরগুলো তুলে দিল। দুজনে দুদিক ধরে পরিষ্কার একটা বেডকাভার পাতছেন।খুব দেখেশুনে বেডকাভার কেনেন মালবিকা ।কোনো চকরাবকরা ডিজাইন চলবে না।হ্যান্ডলুম।কিন্তু বেশি ভারি হবে না।যাতে বাড়িতে ওয়াশিং মেশিনে কেচে ফেলা যায় ।মালবিকা একটা মেয়েদের এন জি ও থেকে এই একরঙা উজ্জ্বল হ্যান্ডলুম, বেডকাভারগুলো কেনেন। মাথার কাছে চাদরটা টানটান করে গুঁজতে গুঁজতে শ্যামা বলল,

    - জানো বউদি? সুশান্ত সিং রাজপুত আত্মহত্যা করেনি।ওর গার্লফ্রেন্ড নেশা করিয়ে মেরেছে ।

    মালবিকা অত্যন্ত বিরক্ত বোধ করলেন।তাঁর শরীর বা মন কিছুই ঠিক নেই।মেয়ে একটার পর একটা ঝামেলা করছে।ত্রিদিবকে কিছু বলতে পারছেন না। লাভ নেই। তারপর শ্যামা এইসব ! 

    বেডকাভার পাল্টালে ঘরের রূপরঙ পাল্টায়।উজ্জ্বল ইয়েলো অকার ঘরটাকে নরম আলোতে ভরিয়ে দিয়েছে। কাল পর্দাগুলোকে চেঞ্জ করবেন।

    শ্যামাকে বকতে গিয়েও বকলেন না মালবিকা।কী দরকার ওর মুড বিগড়ে।সংসারটা টেনে দিচ্ছে তো ঠিকঠাক।

    বালিশের ওয়াড় পাল্টাতে পাল্টাতে বললেন, খালি খুন আর আত্মহত্যা! ভালো কিছু বল না শ্যামা! যাতে মন ভালো হয়।

    বাড়িঘর নেই হয়ে গেছে আম্ফানে। জিনিস পত্র কোনোমতে কার বাসার এককোণে রেখে এসেছে। শাশুড়ি মরেছে।বরের খোঁজ নেই।নিজে কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে কাটিয়ে এসেছে অতগুলো দিন।

    খিলখিল করে হাসল শ্যামাসুন্দরী।

    - ভালো খবর আছে গো! জানো না? অনুষ্কার বাচ্চা হবে। করিনা কাপুরেরও। তৈমুরের মতোই দেখতে হবে ।বলো?

    রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেললেন মালবিকা । এ মেয়েটাকে কী বলবেন তিনি?

    - যা নোংরা চাদর গুলো সরিয়ে রাখ।

    শ্যামা চাদরের বান্ডিল নিয়ে দৌড় দিল।ঠিক তখন।ঠিক তখনই রাঙা চোখ । বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছিল টুপুর।

    আগাম সংঘাত ও তার থেকে উপজাত বিমর্ষতার পূর্ব জ্ঞান তখন মালবিকাকে আচ্ছন্ন করেছে। আবার। (চলছে)

    করোনাকালীন (দুই)

    আটত্রিশ 

    অনিল টমাস এবং পলি নিশ্চিন্তে আছেন যে দেবরূপ মুম্বাইতে থাকছে। একজন অসুস্থ বা সদ্য কোভিড উত্তীর্ণ মানুষকে নিয়ে পলি নাহলে খুব অসুবিধাতে পড়তেন, বিশেষ করে মুম্বাইতে, যেখানে কোভিড সংক্রমণ কমে যাবার কোনো লক্ষণ নেই। বরং ক্রমবর্ধমান । বিশেষ করে ধারাভি সংক্রমণের পরে মুম্বাই আরো বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।

    অনিলকে ঝোঁকের মাথায় কনফার্ম করে দিয়ে দেবরূপ বিপদে পড়ল। তার শরীর এখনো বেশ দুর্বল। যাওয়া নিয়ে মালবিকা তেমন কিছু বলেন নি কিন্তু বোঝা যাচ্ছে তিনি খুশি নন।সামথিংগ ইজ বদারিং হার।অদিতিও দোনোমোনো করছে। দেবরূপের মাথাটা এখনো ভার হয়ে থাকছে মাঝেমাঝেই ।কিন্তু এগুলো খুব বড় সমস্যা নয়।সে এইসব ব্যাপার ট্যাকল করে নিতে পারবে সে নিজেও জানে।

    সমস্যা তার ইনস্টিটিউশনের। লকডাউনের ডে ওয়ান থেকে সিমবায়োসিস তার স্টাফদের জানিয়ে দেয় যে সিকিউরিটি পলিসি মান্য করে কাউকে ইউনিভার্সিটি যেতে হবে না, ওয়ার্ক ফ্রম হোম শুরু হবে এবং যেটা ইম্পরট্যান্ট সেটা হল কেউ স্টেশন লিভ করতে পারবে না। সেই নির্দেশ অমান্য' করে প্রফেসর জাগৃতি বালান ব্যাংগালোরে তাঁর বাড়িতে চলে গেছেন প্রথমেই। এরপরে আরো কয়েকজন অধ্যাপক ও রিসার্চ ওয়ার্কার বাড়িতে চলে গেছে এই গ্রাউন্ডে যে বাড়িতে থেকেই ওয়ার্ক ফ্রম হোম ফলো করে তাঁরা ক্লাস নেবেন , পরীক্ষাও নেবেন।ইউনিভার্সিটি রুল ভায়োলেট করার জন্য মে মাস থেকে তাঁদের স্যালারি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ।বিদ্যা ইয়ারাভেদেকার এখন প্রিন্সিপাল ডিরেক্টর ।তিনি একটি ইনকোয়ারি কমিটি তৈরি করেছেন, যাতে যে সমস্ত স্টাফ স্টেশন লিভ করেছেন তাঁরা পরিস্কার ভেবে নিজেদের কাজ ক্ল্যারিফাই করেন। এই ইন্টারনাল ডিসিপ্লিনারি ম্যাটার সিমবায়োসিসে মারাত্মক শক্তিশালী। বিদ্যাজি ইজ ভেরি স্ট্রিক্ট।ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে যাওয়া মানে পেইড লিভ ভাবলে হবে না।

    সো হোয়াট উইল দেবরূপ ডু? অন্তত একসপ্তাহ ধরে রাখতেই হবে। তারপর যদি রিপোর্ট গন্ডগোলের হয় , তাহলে আরো কিছুদিন ।প্রফেসর র্যাঙ্কিংয়ের লোকেদের স্যালারি আটকে দিয়েছে।তো রিসার্চারদের মুন্ডু কেটে নেবে এটাই স্বাভাবিক আর এই পরিস্থিতিতে সেটা একদম কাঙ্ক্ষিত নয়।এদিকে অনিলকে " না" বলে দেওয়া উইল বি মোস্ট ইনহিউম্যান।একে তো অসুখের সময় ক্লাস নিতে পারেনি।এখন কোনো গ্রাউন্ডে মুম্বাইতে যাওয়া দেখাবে সেটা ভেবে পাচ্ছে না দেবরূপ। ইটস আ রিয়েল ডিলেম্মা।

    ডিপার্টমেন্টাল হেডের সঙ্গে কথাও বলেছে। ড. পভনজিৎ মানে স্রেফ না করেছেন।সিমবায়োসিস ইজ নট অ্যালাউংন্গ এনি কাইন্ড অব ট্র্যাভেল টু দি এমপ্লয়িজ । এরমধ্যে স্যালারি আটকে দেবার জন্য জয়দীপ গুপ্তা , ঋষভ নাথানে এবং আরো কয়েকজন অনেক ঝামেলা করে পুণেতে ফিরে এসেছেন। ইনকোয়ারি কমিটি তাদের জয়েন করতে দেয়নি।এমনকি ইনকোয়ারি ফেস করতেও দেয়নি। আগে চোদ্দদিন কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনে থাকতে হবে। তারপর ইনকোয়ারি হবে।

    অচ্যুত শিবরামণের সঙ্গেও কথা বলেছে এই নিয়ে।দেয়ারজ নো ওয়ে আউট।কিছু করার নেই। 

    অনেকদিন পর স্ট্রে ফিডিং করতে বেরিয়েছে দেবরূপ ।কেমন খা খা করা শহর।ভারতবর্ষের ফিনানশিয়াল ক্যাপিটল। জনশূন্য ।নিষ্প্রাণ। শুধু কুকুরগুলো ওকে চিনতে পেরেছে।এতদিন বাদেও। এসে গায়ে লাফাচ্ছে। শুঁকছে। যেন হারানো মাণিক ফিরে পেয়েছে। অদিতিও এসেছে।দেবরূপ এত দুর্বল এখনো, ওকে একা ছাড়তে চায়না অদিতি।

     লকডাউনের প্রথমদিন থেকেই পুণের প্রায় সমস্ত আইটি সেক্টর ওয়ার্ক ফ্রম হোম অ্যানাউন্স করেছিল। ইন ফ্যাক্ট পুণের আই টি সেক্টরে ওয়ার্ক ফ্রম হোম কোনো নতুন কনসেপ্ট নয়।আমেরিকান ওয়ার্ক পলিসি ফলো করে অনেক কোম্পানি টেকনোলজিক্যালি এফিশিয়েন্ট লোকজনকে ওয়ার্ক ফ্রম হোম অ্যালাউ করে।অবশ্যই কাজের স্ট্যান্ডার্ড আউটস্ট্যান্ডিং হতে হবে।

     রাজন সাক্সেনা দেবরূপের বন্ধু । কুলদীপ মেহতা। এরা সবাই আই টিতে আছে।পুণে গ্রিন জোন না হওয়া পর্যন্ত সবাই ওয়ার্ক ফ্রম হোম।নো স্টেশন লীভ।রাজন ইনফোসিসে আছে।ওরা লকডাউনের প্রথম থেকে পনেরো পার্সেন্ট অফিস যাচ্ছিল।এখন তেত্রিশ পার্সেন্ট যাচ্ছে।বাকিরা বাড়িতে থেকে কাজ করছে।রাজন বলল, আসলে অনেক ক্লায়েন্ট অফিস এনভিরনমেন্ট না পেলে খুশি হয় না।তাই কম্প্যানি কয়েকজনকে ক্যাম্পাস অ্যাকোমোডেশন দিয়ে দিয়েছে।থাকার জায়গা প্লাস ক্যাফেটেরিয়া।ওয়ার্ক মাস্ট গো অন ।

     অদিতি ছেলেমানুষের মত কুকুরদের সঙ্গে দৌড়ে খেলছে।ভালো লাগছে ওকে এতটা ফ্রি দেখে। ঝরঝর করে হাসছে।পশুদের সঙ্গে হাসতে পারলে খুব নির্ভার থাকা যায় ।ওদের চাহিদা ভীষণ কম। 

    রাজন বাসে অফিস যাচ্ছে।আইটি সেক্টরে সব প্রাইভেট ভেহিকল বন্ধ করে দিয়েছে।ইনফোসিসের পলল্ভ শাহ প্রায় চারশো কর্মচারীকে আইটি পার্কে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।পেট্রল ফেসিলিটি ।সঙ্গে এমপ্লয়ি কার্ড।কোনোমতেই কোম্পানি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।এখানে প্রশাসন ভীষণ সাপোর্টিভ। পুনের সমস্ত পার্ক বন্ধ।নো জগিং।নো ওয়াকিং।ইনডিভিজুয়াল এক্সারসাইজ অ্যালাউড । যেমন ছ' জনের টিমের স্ট্রে ফিডিং ।কমিশনার শ্রবণ হার্দিকার সিনিয়র সিটিজেনদের বেরোনো একদম অ্যালাউ করছেন না।

    কুলদীপ ভোদাফোনে কাজ করে।ওদের অফিস ইওন ফ্রি জোনে।প্রায় পঁয়তাল্লিশ একর জমির ওপর আই টি হাবটা। ইটারিগুলো ভীষণ ভালো।এত রকমের খাবার পাওয়া যায়! অদিতির ফেভারিট! কবে যে সবকিছু স্বাভাবিক হবে আবার! 

    হাওয়া দিচ্ছে ঠান্ডা ঠান্ডা ।অদিতি পাশে এসে বসলো। অতুল দাঁড়িয়ে দেখছে কুকুরদের খাওয়া ।

     অদিতি হাঁপাচ্ছে।মাস্ক নামালো মুখ থেকে।

     - ফিডিং ইজ সো হ্যাপি এক্সপেরিয়েন্স ।শোন।একটা কুকুর পুষি?

    হাসল দেবরূপ ।কখন যে মাথায় কী চাপে এ মেয়ের।

     - তুই তো বাড়িতে থাকিস না অর্ধেক সময় ।কে দেখবে? আন্টি , আংকল, সুনি। সবাই বাইরে কাজ করে ।হু উইল টেক কেয়ার অব হিম? 

     অদিতি চিন্তায় পড়লো। 

     - ওকে ।উই শ্যাল কিপ আ ডগ হোয়েন উই গেট ম্যারেড। উই শ্যাল হ্যাভ আ বেবি। বেবির আয়া বেবিকেও দেখবে।ডগিকেও দেখবে।ওকে?

    বোঝো ঠেলা। রাম না জন্মাতে রামায়ণ। বিয়ের কথা শুনলে সাফোকেটিং লাগে দেবরূপের ।তারপর আবার বেবি। তারসঙ্গে ডগি।

    - শোন।আমার কিন্তু পেইড লিভ হবে না।কী করে যাব মুম্বাই ।কী বলবো অনিল আংকলকে?

    এই রাত। ঠান্ডা হাওয়া ।সারমেয়দের চিৎকার । গাছের গন্ধ ।সবকিছু মেখে নিচ্ছে অদিতি মাস্ক খুলে।

     - বলবো? তোকে যেতে হবে না। অনিল অ্যান্ড পলি নিড সাম ওয়ান টু অ্যসিস্ট দেম। তাই তো? সামবডি এফিশিয়েন্ট । শোন।আমি এইসব ব্যাপারে তোর থেকে অনেক অনেক বেশি এফিশিয়েন্ট ।আমি মুম্বাই চলে যাচ্ছি। আমার তো ছুটির ঝামেলা নেই। আইল বি উইদ দেম।তুই পলিকে আমার সঙ্গে ইনট্রো করিয়ে দে।আমার নানাও আছে।মামুজান আছে।  কোনো প্রবলেম হবে না।

     কোনো প্রবলেম হবে না।

    কে বলেছিল?

     ডানদিকে বসেছে অদিতি। একটি ফ্লাওয়ারি প্রিন্টের লং স্কার্ট পরণে। ঠিক এইভাবে কে যেন বলেছিল , কোনো প্রবলেম হবে না? কে, কবে, কোথায়?মনে পড়ছে অথচ পড়ছে না। ফাঁকা রাস্তায় পাঁচ ছ'জন মানুষ।কিছু কুকুর।খাদ্য।অন্ধকার ঝুপসি গাছ। মাথার ওপর নক্ষত্রখচিত আকাশ। কে যেন কবে কোথায় এই কথা বলেছিল?

     বিদ্যুতের চমকের মত মনে পড়ল। নির্মাল্য।

     - তুই অ্যালার্ম দিয়ে শুয়ে পড়।আমি সকালে বেরিয়ে যাব।কোন প্রবলেম হবে না।( চলছে। আবার একেবারে একাদশী থেকে)

    করোনাকালীন দুই

    ঊনচল্লিশ 

    অনলাইন ক্লাস এখন পুরোদমে নিচ্ছে দেবরূপ। অসুখের সময় যা বাকি পড়েছে সব শেষ করতে হবে সেমিস্টারের আগে।বেশ পরিশ্রম যাচ্ছে।তারপর নিজের কাজ তো আছেই।কোভিড এবং লকডাউন কিছুটা হলেও একটা বদ অভ্যাস করে দিয়েছে।বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না।

    গ্যাসে চাল ধুয়ে বসিয়েছে। কিছু চিকেন বলস অদিতি আগেই বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল।ওগুলো বাইরে রেখে ঠান্ডা ছাড়াচ্ছে।পেঁয়াজ কুঁচি, রসুন কুঁচি , লঙ্কা, আদাবাটা সব রেডি।ভাত হাফ ডান হলে প্যানে নিয়ে কষলেই খাবার রেডি।আজ এটা দিয়েই লাঞ্চ সেরে নেবে দু'জনে। তারপর আবার যে যার কাজে ডুবে যাবে।কিন্তু ইদানীং এই একটা সমস্যায় পড়েছে চোখ খুব ব্যথা করে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকতে।আর একা থাকলেই নিশান্ত হন্ট করে।কিংবা নির্মাল্য। নিশান্তের ঘরে ঢোকা থেকে শুরু করে চলে যাওয়া, শান্ত উজ্জ্বল দুটো চোখ, ওর'লম্বা হাতটা। সব কিছু।নির্মাল্যর পাশে শুয়ে থাকা। ওর সেকেলে ধাঁচের চশমা।তখন ফ্ল্যাটে থাকা ভয়ানক সাফোকেটিং হয়ে যাচ্ছে ওর পক্ষে ।মনে হচ্ছে তখনি বাইরে যায় চব্বিশ ঘন্টা একটা ফ্ল্যাটে একা বা দু'জন কাটানোটা অসম্ভব নয়।তবে এইরকম পরিস্থিতিতে কখনো কখনো ভীষণ ট্রমা তৈরি করছে।

    দেবরূপ এইজন্য আরো মুম্বাই যেতে চাইছে। হি ব্যাডলি নিডস আ চেঞ্জ ।

    খুব পছন্দের এই ফ্ল্যাট । ঝকঝকে ।সমস্ত আধুনিক ফেসিলিটি রয়েছে।তবু একটা ভাইরাস, ঘরবন্দিত্ব, অসুখের আগে আর পরে দুটো তরতাজা কাছের মানুষ চলে যাওয়া এক ধরণের ট্রমা তৈরি করেছে। দেবরূপ বুঝতে পারছে ক্রমাগত মেশিন ও টেকনোলজিসঙ্গ ওকে আরো বিষণ্ণ করে তুলছে।মানুষ চাই।মানুষ। কম্যুনিকেশন ।মুম্বাইতে গেলে অনিলকে নিয়ে অন্য একটা পরিবেশে ব্যস্ত থাকা যাবে।এই মুহূর্তে সেটাই সবচেয়ে হেল্পফুল ওর পক্ষে ।

    যখন সবকিছু নর্মাল ছিল, ওরা ছ' সাত বন্ধু রাতের দিকে বাইক নিয়ে চষে ফেলত মূলা মুথার পূর্বপাড়। পুণের আইটি পার্কগুলো। ইনফোসিস, উইপ্রো, টেকমাহিন্দ্রা, কেপজেমিনি ।হিনজেওয়াদি ফেজ পুরো ঘুরে বেড়াত ওরা। সবখানেই বন্ধু বান্ধব আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে । দু' হাজার আঠারো থেকে পুণে ভারতবর্ষের সবচেয়ে ভালো বাসযোগ্য শহর। দেবরূপ ছ' বছরের অভিজ্ঞতাতে একটা ভীষণ উন্নত শহরকে পেয়েছে।ওয়র্কস্পেস এবং সোশ্যাল হাব।দুদিক থেকেই বিশ্বমানের ফেসিলিটিজ। কখনো কখনো একেবারে এয়ারপোর্টের কাছে ওয়েকফিল্ড আইটি সিটিতে চলে যেত ওরা। নয়না কাজ করে ওখানে পিটিসি তে। নবীন চাওলা আছে হোয়ার্লপুলে ।সবাই রিসেসে বেরিয়ে হৈচৈ করে পাস্তা, গ্রীণ টি নিয়ে বসে পড়ত। কিংবা গিগা স্পেসে গিয়ে উইন্ডো শপিং। হয়তো অদিতি ওর জন্য দুটো টি কিনেই ফেলতো। দেবরূপ কী অদিতিকে কিছু কিনে দিয়েছে কখনো? মনে পড়ে না।প্রথম প্রথম দিত। বই মেইনলি। জামাকাপড় গিফ্ট করেনি কখনো।একবার শুধু জিন্স কিনে দিয়েছে একটা।

    কীরকম অতীত হয়ে গেছে সেসব দিন।মনে হয় গতজন্মের ঘটনা সব।এখন নিথর। ঐ দিকে যাওয়া যাবে না। দেশে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মহারাষ্ট্রের।ওয়র্সট অ্যাফেক্টেড স্টেট।এক পুণেতেই তেরো হাজার পজিটিভ কেসেস।পুণে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন সমস্ত পাবলিক প্লেস, বাগান, পার্ক বন্ধ করে দিয়েছে।মাস্ক পরছেন না অনেক মানুষ।কিছু বলার উপায় নেই।বললে শিক্ষিত মানুষরাও ফুঁসে ওঠেন।জানো, ইউ কে তে অ্যান্টি মাস্ক মুভমেন্ট হচ্ছে? ওরা বলে দিয়েছে মাস্ক পরবে না।

    ভাতটা হাফ ডান করে নামিয়ে নিল দেবরূপ। প্যানটা বসালো । নন স্টিক প্যান সব বাতিল।নতুন এনেছে। তেল দিল।কুকিং ইজ রিফ্রেশিং।পেঁয়াজ, আদা দিল। 

    হিনজেওয়াদি ইনডাসট্রিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার্সরা একটা নতুন ইনিশিয়েটিভ নিতে যাচ্ছেন।প্রায় আড়াই লক্ষ আই টি এবং আই টি ই স্টাফ আছে ওদের।লকডাউন উঠলেও ওরা একটা কম খরচ এবং বেশি লাভের প্ল্যান নিচ্ছেন।লকডাউন উঠে গেলে প্রায় থার্টি পার্সেন্ট স্টাফ ওয়ার্ক ফ্রম হোম করবে ।দেবরূপ পার্সোনালি সমীর গ্যাডগিলকে চেনে। উনি এইচ আরের গ্লোবাল হেড।উইপ্রোতে।উনি এবং সতীশ পাই দুজনেই এই ডিসিশন নিয়েছেন।সতীশ এইচ আই এ' র প্রেসিডেন্ট।টেক মহীন্দ্রার ভাইস প্রেসিডেন্টও।ওরা এটা করেই ছাড়বেন। এতে কিছু মানুষের কাজ যাবেও।ইনেভিটেবল।

    কোভিড নতুন ওয়ার্ক স্ট্রাটেজি আনবে।আনবেই।এতে কতটা ভালো হবে দেবরূপ জানে না।কিন্তু এটা জানে যে মানুষ আরো যান্ত্রিক হবে।আরো পার্ফেক্ট।পার্ফেকশনের পথ বড় দুর্গম । মানুষ আরো একা হবে। আরো নিঃসঙ্গ । 

    পেঁয়াজ ব্রাউন হয়ে এলে যে আশ্চর্য সুগন্ধ ছাড়ে দেবরূপ এখন সেটা পরিপূর্ণ ভাবে নিচ্ছে।অসুখের সময় কোনো স্মেলিং সেন্স ছিল না।চিকেন বলগুলো আগে থেকেই আদা রসুন নুন দিয়ে মাখা আছে।দেবরূপ এখন একটু লেবুর রস দিল।

    অদিতি এসে যাবে এখনি। রান্না নামতে আরো দশ মিনিট তো লাগবেই। 

    অদিতি এলো ঘেমেচুমে।হাতে গুচ্ছের ফাইল। আজকাল কেউ এত'পেপারফাইল ব্যবহার করে না।কিন্তু অদিতি পেপার ওয়ার্ক করে।

    ইভন ও এখনো চিঠি লেখে।অদ্ভুত মেয়ে ।জিদ্দি। জন্মদিনে দেবরূপকে হাতে করে কিছু দেয় না।গিফ্ট আসে ক্যুরিয়ারে। একটা শার্ট।বা পাঞ্জাবি ।বই।পার্স।যদি ছিঁড়ে যায় ।ঠিক খেয়াল রাখে। অথচ ওর বাইরের এক্সপ্রেশন খুব কম। অনেকটাই যেন নির্লিপ্ত।মুখ দেখে বোঝাও যায় না ঠিক কী ভাবছে।একটু স্টোনি ফেস।

    ফস করে বলে বসল যে ও যাবে মুম্বাইতে । সিরিয়াসলি বলেছে ভাবেইনি দেবরূপ ।

    ছোট টেবলটাকে সুন্দর সাজিয়েছে অদিতি। ওর ধাঁচটাই এমন। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে থাকলে সেখানেও ঝেড়ে পুঁছে একটু সাজিয়ে নেবে। মনে আছে দেবরূপের। ওরা একটা ট্রিপে সিমলা যাচ্ছিল ।কালকাতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল অনেকক্ষণ ।ওরা বাইরে গেছিল খাবার কিনতে ।অদিতি লাগেজ পাহারা দিচ্ছিল।ফিরে এসে দেখে দিব্যি স্টেশনের এক ঝাড়ুদারণীকে ধরে জায়গাটা পরিস্কার করিয়ে সুটকেসগুলো দিয়ে বসার জায়গা বানিয়েছে।স্টেশনের একছড়া বুগনভোলিয়া ছিঁড়ে জলের বোতলে রাখা।খুব হেসেছিল ওরা।স্টেশনের ঘরসংসার।অদিতি যেখানে যায়, এইরকমই ।আবার কখনো হয়তো কিছুই করলো না।ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়লো।মগ্ন হয়ে ফুটেজ দেখছে। মুখোমুখি বসে খাচ্ছে দুজন। 

    - সুন্দর বানিয়েছেন স্যর।

    - অ্যাজ ইউজুয়াল। 

    দেবরূপ সত্যি ভালো রান্না করে। ইটস প্যাশন।

    - শোন।আমি কিন্তু সিরিয়াসলি বলেছি মুম্বাইতে যাবার কথা।

    - আমি আরেকবার বিদ্যাজিকে বলে দেখি।আই ক্যান টক টু শ্রীধরণ অলসো।হি উইল টেক মাই ক্লাসেস।হোয়েন আই গেট ব্যাক আই উইল টেক সাম একস্ট্রা ক্লাসেস।

    অদিতি কাঁটাতে গেঁথে একটা চিকেন বল ওঠাল।দেখছিল খুব মন দিয়ে ।যতটা মন দিয়ে ফুটেজ দেখে ও।

    - দেবে না লিভ। সিনিয়র প্রফেসরদের আটকে দিচ্ছে। ইন ইওর কেস দে উইল সিম্পলি টার্ণ ইউ ডাউন।শোন।মুম্বাই ইজ নোন টু মি।আই মিন , আয়াম কমফর্টেবল ইন মুম্বাই । অনিল আংকল যদি হসপিটালাইজড হন, পলি উইল ফিল সেফ উইদ মি। আমার রাশেজ দেখার কাজও হয়ে যাবে।গুরমিত ইজ দেয়ার।জুলি আছে। লট মোর ফ্রেন্ডস। আই উইল বি গুড কম্পানি ফর পলি।বেটার দ্যান ইউ।ভেবে দ্যাখ।

    জল খেল একঢোক।সত্যি।দেবরূপ ভাবছে।দিস ইজ ট্রু ।

    অদিতির ছুটি নেবার ঝামেলা নেই।ডকু ছবি নিয়ে হামেশাই ওর মুম্বাইতে কাজ থাকে।প্রচুর চেনাজানা।মামাবাড়িতেও ওর যাতায়াত আছে। তাছাড়া সত্যি যদি অনিল হসপিটালাইজড হন, তাহলে সে নিজে পলিকে খুব কিছু সামলাতে পারবে না। একেবারেই পারবে না আসলে।অদিতি অনেক বেটার কম্পানি হবে পলির জন্য।দৌড়োদৌড়ি, ডাক্তারদের সঙ্গে ডিল করাও অদিতির সহজাত। ফার বেটার দ্যান হিমসেল্ফ।

    তবু।

    - আমার কোভিড ইনফেকশন হয়ে গেছে। আর হবে না।আমার যাওয়া বেশি সেফ না?

    খাওয়া শেষ।অদিতি খেয়েই জল খায় না।পরে খায়।উঠে পড়ল প্লেট হাতে নিয়ে ।

    একগাল হাসল।টোল ফেলে।

    মি. মাইক্রোবায়োলজিস্ট! কোভিড নাইন্টিনের অ্যান্টিবডির কোনো ডেট নেই।ইউ নো দ্যাট বেটার দ্যান মি!তিনমাস থাকতে পারে অ্যান্টিবডি আবার তিনদিনও। নোবডি ইজ সেফ। অ্যান্ড আয়াম স্ট্রংগার দ্যান ইউ। 

    মাথা ঝাঁকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলল দেবরূপ।তারপর উঠে পড়ল প্লেট নিয়ে ।এই মেয়ে বড্ড লজিক্যাল কথা বলে।একে নিজের পয়েন্ট থেকে সরানো খুব মুশকিল। কিন্তু এই ফ্ল্যাটে একা একা থাকতে তার আর ভালো লাগছে না।নির্মাল্য এবং নিশান্ত। দুটি পরপর মৃত্যু এবং ইন বিটুইন কোভিড ডেজ তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। 

    অদিতি বোধহয় সেটা আন্দাজ করতে পেরেছে।

    - তুই প্রথমে আমাকে পলি, অনিলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দে গুগল মিটে। তারপর একটা টেস্ট করিয়ে নে।নেগেটিভ তো হবেই।দেন ইউ গো অ্যান্ড স্টে অ্যাট মাই প্লেস ফর আ উইক অর টু। বাবা, সুনি উইল বি হ্যাপি টু হ্যাভ ইউ।ইউ ব্যাডলি নিড আ চেঞ্জ অব প্লেস।

    দেবরূপ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালো।অদিতি কেমন করে এত সুন্দর বুঝে যায় সবকিছু? ( চলছে)


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৫ অক্টোবর ২০২০ | ২৯০ বার পঠিত
  • ৫/৫ (৩ জন)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন