এটি ইতিহাসের অন্যতম একটি বড় বৈপরীত্য—যুদ্ধে জিতেও ব্রিটেন তার সাম্রাজ্য হারিয়েছিল। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনী জয়লাভ করলেও, এই যুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল।
যুদ্ধ জয়ের জন্য ব্রিটেনকে তার সমস্ত সম্পদ বাজি রাখতে হয়েছিল। ১৯৪৫ সাল নাগাদ ব্রিটেনের অর্থনীতি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধের খরচ চালাতে ব্রিটেন আমেরিকার কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ (Lend-Lease act) নিয়েছিল, যা তাদের ঋণের সাগরে ডুবিয়ে দেয়।
সাগরের ওপারে বিশাল সাম্রাজ্য এবং সেনাবাহিনী টিকিয়ে রাখার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য ব্রিটেনের আর ছিল না। নিজেদের দেশ পুনর্গঠন করাই তখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
যুদ্ধের পর বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু লন্ডন থেকে সরে যায়। ব্রিটেন আর বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি ছিল না। পৃথিবীতে নতুন দুটি পরাশক্তির (Superpower) উদয় হয়—আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন।
এই দুটি দেশের কেউই পুরোনো ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার পক্ষে ছিল না। বিশেষ করে আমেরিকা অর্থনৈতিক সাহায্যের বিনিময়ে ব্রিটেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল যেন তারা তাদের উপনিবেশগুলোকে স্বাধীনতা দিয়ে দেয় এবং উন্মুক্ত বাণিজ্যের পথ তৈরি করে।
যুদ্ধের সময় থেকেই ভারতসহ বিভিন্ন উপনিবেশে স্বাধীনতার দাবি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় রত্ন ছিল ভারত। ১৯৪২ সালের 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের তৎপরতা ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে ভারতকে আর বেশিদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা বাকি উপনিবেশগুলোর জন্যও পথ খুলে দেয়।
দীর্ঘ ছয় বছর যুদ্ধ করার পর ব্রিটিশ সেনারা ক্লান্ত ছিল। দূরবর্তী কোনো দেশে গিয়ে সেখানকার বিদ্রোহ দমন করার মতো মানসিক বা শারীরিক শক্তি তাদের ছিল না।
১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে যুদ্ধজয়ী প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল (যিনি সাম্রাজ্য ধরে রাখার পক্ষে ছিলেন) পরাজিত হন।
ক্ষমতায় আসে ক্লিমেন্ট অ্যাটলির নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি।
লেবার পার্টির মূল ফোকাস ছিল ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, যেমন—বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা (NHS) চালু করা এবং নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারা উপনিবেশ ধরে রাখার পেছনে অর্থ অপচয় করার চেয়ে যত দ্রুত সম্ভব সম্মানজনকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করাকে শ্রেয় মনে করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটেনকে বিজয়ী করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের এতটাই দুর্বল করে দিয়েছিল যে নিজের বিশাল সাম্রাজ্যের বোঝা বইবার ক্ষমতা তাদের আর ছিল না।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।