• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • কলকাতার নাচ সমকালীন নগরনৃত্য - পাঠ প্রতিক্রিয়া

    স্বাতী রায়
    বিভাগ : ব্লগ | ২৭ জানুয়ারি ২০১৯ | ১১৩ বার পঠিত
  • নাচ নিয়ে নাচানাচি করার বয়স বহু আগে পেরিয়ে গেছে। করতেও হত না, যদি বইখানা হাতে না আসত। ঐশিকা চক্রবর্তীর “কলকাতার নাচ সমকালীন নগরনৃত্য”। নামেই চমক। ডিহি কলকাতার তিনশ বছরের সাংস্কৃতিক জগতের টানাপোড়েনের হিসেবে, তার সংস্কৃতিগত উঁচু-নিচু ভেদাভেদের জগতে, কোন নাচকে বলব নগরনৃত্য? ইউরোপীয় ভুখন্ডে যেমন নাগরিক নৃত্যের একটি বিশেষ সর্বজনগ্রাহ্য ধারা রয়েছে, তেমনটি যে এদেশে তেমন ভাবে গড়ে ওঠে নি সেটা সবারই জানা। গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারার কথা হচ্ছে না, বাংলার মহানাগরিক জীবনে নাচের জায়গাটা ঠিক কোথায় ছিল সেটা বোঝা যায় ‘নচ’ গার্ল কথাটির বহুল-প্রচলনে, বিপরীতে ‘নচ’ বয় কথাটি আর তৈরি হল কই? এর থেকেই খানিকটা অনুমান করা যায় পুরোন কলকাতার মানসিকতায় নাচের জায়গাটা। এই পরিপ্রেক্ষিতে সমকালীন নগরনৃত্য কথাটা কৌতূহল জাগায়। সেই কৌতুহলের টানেই বইটি হাতে তুলে নেওয়া।

    প্রত্যাশিতভাবেই কলকাতার শুরুর পর্বের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঢেঊ উঠে এসেছে ঐশিকার লেখায়। সেই ঝুমুর, খেমটা, বাই-নাচের ইতিহাস ছুঁয়ে লেখিকা গিয়ে দাঁড়িয়েছেন রবীন্দ্রনাথের পায়ের কাছে। বাংলার মঞ্চ-সংস্কৃতিকে ভিক্টোরিয়ান পিওরিটির সম্মার্জনী চালিয়ে তাকে মেকলে সাহেবের মানস-সন্তানদের অঙ্গনে এনে দিলেন ঠাকুরবাড়ির ছেলে-মেয়েরা। বিশ শতক শুরু হতে তখনো বছর কুড়ি বাকী। সেই শুরু। তবে রবীন্দ্রনৃত্যের নিজস্ব ধারা তৈরি হতে লাগল আরো কিছু বছর।

    বইএর প্রথমেই “রবীন্দ্রনাথের নাচঃ সেকাল থেকে একাল” পর্ব। চলিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের থেকে তেরচা অবস্থানে দাঁড়ানো রবীন্দ্রনাথের শিল্পী-সত্ত্বা এবং তার ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গীকে ছোট্ট পরিসরে তুলে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে সমকালীন বিরোধিতাকেও। শুধু এই বিষয়টি নিয়েই স্বয়ং-সম্পুর্ণ বই হয়। ভবিষ্যতে এই নিয়ে আরো বিশ্লেষণ-ধর্মী লেখার আশায় থাকা। তবে রবীন্দ্রনাথের নাচের প্রসঙ্গে যে সাক্ষাৎকার-গুলি প্রকাশ পেয়েছে, গোটা বই-এর মানের নিরিখে সেগুলি একটু প্রক্ষিপ্ত লেগেছে। তবে হয়তো সে এই শিল্পমাধ্যমের সম্বন্ধে নিজের জ্ঞানের খামতির কারণে।

    দেশের মাটিতে যদি এই নতুন নাচের ধারাকে জনপ্রিয় করার ভার নিয়ে থাকেন রবীন্দ্রনাথ, বিদেশে সে ভার নিলেন উদয়শঙ্কর। ইউরোপের মাটিতে বেড়ে ওঠা ওরিয়েন্টালিজমের রোমান্টিসিজমকে উদয়শঙ্কর মিশ্রিত রীতির নাচের উজ্জ্বল মঞ্চায়নের সাহায্যে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিলেন। সেই উদয়শঙ্করের বিভিন্ন কাজ আর তাঁর অসামান্য সৃজনশীলতার বিশ্লেষণী স্কেচ নিয়ে রয়েছে একটি পর্ব। এই পর্বের একটা বড় লাভ, অমলাশঙ্করের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা অমলার কথা। একজন কিশোরী বালিকার ধীরে ধীরে ঊদয়শঙ্করের পার্শ্বচারিণী হয়ে ওঠার রূপকথা শুনি আমরা। ঊদয়শঙ্করের দলের অন্যতমা পলি গুহর স্মৃতিচারণও এক বিশেষ আলো ফেলে উদয়শঙ্করের বহুমুখী প্রতিভা, বিশেষতঃ তাঁর ষ্টেজ-ক্র্যাফটের উদ্ভাবনী ক্ষমতার উপর।

    তবে এই বই-এর স্থায়ী আর অন্তরা যদি রবীন্দ্রনাথ, উদয়শঙ্করের পর্বদুটি হয়, তাহলে সঞ্চারী আর আভোগ হল মঞ্জুশ্রী আর রঞ্জাবতী । ঐশিকা নিজে মঞ্জুশ্রীর ছাত্রী, নামী নৃত্যশিল্পী- তাঁর নৃত্য-নির্মাণভাবনাকে ধারণ করে মঞ্জুশ্রীর হাতে গড়া সংস্থা ‘ডান্সার্স গিল্ড’। তার স্কুলের পড়ার হাত ধরে ধরে চলেছে মঞ্জুশ্রীর কাছে নাচের চর্চা, একসময় সেই নাচ হয়ে উঠেছে তার জীবনের অঙ্গ। কখন যেন মঞ্জুশ্রীর নবনৃত্যের শৈল্পিক, সংযত অথচ স্পর্ধিত উচ্চারণ হয়ে উঠেছে তার জীবনের মন্ত্র। তাই পাতার হিসেবে এ বইএর সিংহভাগ জুড়েই তাঁদের দাপুটে উপস্থিতি। তাঁদের মাতা-পুত্রীর সৃজনশীলতার স-বিশ্লেষণ বিবরণ। কিভাবে উপনিবেশ-উত্তর যুগে এক দেশ-হারানো নারীর বৌদ্ধিক বিচারের মাপকাঠিতে হাজার বছরের পুরোন ক্ল্যাসিক্যাল নাচ গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে, ধীরে ধীরে সেই অতৃপ্ততা থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন নাচের ভাষা, বিদেশী নাচের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে তার শরীরি ভাষা – নাচ হয়ে উঠেছে কেবল ‘নারীর ললিত লোভন লীলার ‘ পরিবর্তে এক মুক্ত বিহঙ্গের দৃপ্ত আত্ম-ঘোষনা, সে কথা ঐশিকা অনেক শ্রদ্ধা আর ভালবাসা মিশিয়ে লিখেছেন। এই বই-এর সবচেয়ে মুল্যবান পর্ব হল মঞ্জুশ্রীর হাতে তোমারি মাটির কন্যা আর তাসের দেশের বিনির্মাণের পিছনের নিজস্ব জীবন-ভাবনার রসে জারানো নতুন নাচের ভাষার খোঁজ। সেই সন্ধানের একটা বড় পর্বের সঙ্গী ছিলেন লেখিকা। তাই বড় অনন্য দলিল এই অংশগুলি। আর অনবদ্য ‘রঞ্জাবতী রেপার্টরি’ – রঞ্জাবতীর কাজগুলির পরিচিতি পড়লে মনে হয় কি অমিত সম্ভাবনা ছিল এই নারীর।

    তবে শেষের পর্বে নবনৃত্যের এক টেকনিক্যাল আলোচনা পড়তে গিয়ে অবশ্য মনে হল বড় তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হল। মঞ্জুশ্রী –রঞ্জাবতীর কাজের আলোচনার প্রেক্ষিতে বোধহয় আরো একটু বিশদ আলোচনার প্রয়োজন ছিল ভারতের পশ্চিম বা দক্ষিণ প্রান্তেও সমসময়ে কিভাবে বদলে যাচ্ছিল নাচের ভাষা। ’৯০ এর কলকাতা তো আর নিজের মধ্যেই আটকে নেই। দেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে নিরপেক্ষভাবে তার জায়গা নির্ধারণ করতে সেই সর্ব-ভারতীয় নৃত্যভাষার বদলের আলোচনা জরুরী। ভবিষ্যতে কলকাতার নাচের জগতে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের অনুপাত নিয়ে একটি গভীর আলোচনাও দাবী করি। মনে হয় তাতে সমকালীন সংস্কৃতির কিছু গোপন সত্য উদ্ঘাটন হবে। সমকালীন নগরনৃত্যের কথা বলতে গেলে শুধু তো তথাকথিত উচ্চ-সংস্কৃতির কথা বললে সমকালীনতার দাবী শেষ হয় না, সেই যাকে বলে ‘বাজারি নাচ’ তার কথাও কোথাও আসা উচিত। সব মিলিয়ে এই বইএর আরেকটি খন্ডের প্রত্যাশা রয়ে গেল।

    বইটি নিয়ে যা না বললেই নয়, তা হল এর পিছনে রয়েছে বহু দিনের সিরিয়াস গবেষণা। নৃত্যশিল্পী যখন স্টেজে নাচতে শুরু করেন, তখন তার অনায়াস পদচারণায় ধরা পড়ে না সেই কঠিন পায়ের ছন্দটি আয়ত্তে আনতে তার কত ঘাম ঝরেছে। ঐশিকা সেই শিল্পীর সাধনা দিয়ে এই বইটির গা থেকে গবেষণার শ্রমের ছাপটুকু মুছে দিতে পেরেছেন। সেই প্রসংশা তাঁর শিল্পীসত্তার অবশ্য-প্রাপ্য। এই বইটির জন্য সংগৃহীত তথ্যাদি দিয়ে অজস্র এক্যাডেমিক পেপার তৈরি হতে পারত, ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশ পেয়ে তারা অধ্যাপিকা, বর্তমানে যাদবপুরের উইমেন্স স্টাডিসের ডিরেক্টর, লেখিকার মুকুটে নতুন নতুন পালক জুড়ত। তবু সেই প্রলোভন ছাড়িয়ে ঐশিকা যে এই বইটি বাংলায় আমজনতার জন্য লিখেছেন, সেজন্যও ধন্যবাদ প্রাপ্য।

    বইটি গাঙচিলের হাত ধরে সদ্য-ভূমিষ্ঠ হয়েছে। অল্প কিছু মুদ্রণপ্রমাদ রয়ে গেছে – আশা করব সেগুলি পরের প্রকাশে সংশোধিত হবে। তবে সে সব সামান্য বিচ্যুতি বাদ দিলে, যে কোন নাচে উৎসাহী সাধারণ মানুষেরই বইটি পড়তে ভাল লাগার কথা।
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৭ জানুয়ারি ২০১৯ | ১১৩ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • ন্যাড়া | 89900.152.677812.115 (*) | ২৭ জানুয়ারি ২০১৯ ০৪:২৫50595
  • বাহ। পড়ে ফেললি?
  • স্বাতী রায় | 781212.194.1278.251 (*) | ২৭ জানুয়ারি ২০১৯ ০৯:১৬50596
  • কলকাতায় থাকার সুবিধা :D
  • Biplob Rahman | 340112.231.126712.75 (*) | ২৭ জানুয়ারি ২০১৯ ১১:৫০50597
  • কলকাতা নাচ! ইন্টারেষ্টিং।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত