ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • কাদামাটির হাফলাইফ

    ইমানুল হক
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ০৮ এপ্রিল ২০২০ | ৪৪৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • আরে, কাদা না থাকলে মানুষ তো বেঁচেই থাকতে পারতো না। শস্য সব্জি কিছুই কি তেমন মিলত? ফুল ফল অনেক কিছুই? কাদা আর বালির মিশেলেই তো জীবনের যত মার প্যাঁচ।

    পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের গ্রামজীবনের স্মৃতিচিত্রণ।
    পর্ব ৭

    পুঁইশাক নিয়ে বিভূতিভূষণের অসাধারণ গল্পের পর পুঁইশাক নিয়ে কিছু বলা লেখা কঠিন। তবু অসাধারণরা বললে কী আর সাধারণরা বলবেন না। বলি। পুঁইশাক খেতে বারণ করা হয় পেট রোগা আমাশায় ভোগা মানুষদের। তা আমাকেও। কিন্তু খোঁড়ার পা খানায় পড়বেই। আমি বাজার গেলেই কুমড়ো আর পুঁইশাক যুগলবন্দি করে ডাকে। আয় আয়। যাই। আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা কি ভালো! কুমড়ো পুঁইশাকের সঙ্গে ইলিশ মাছের মাথা হলে তো কথাই নেই। কাতলা রুইও চলতে পারে। আর ছ্যাঁচড়ার মত তরকারি তো আমি ভূভারতে খুঁজে পাই নি। এর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে একমাত্র সিঁদল শুঁটকি। তাও আসামবাসী বাঙালির রান্না করা সিঁদল চাটনি হলে।
    দাঁড়ান খেয়ে আসি। তারপর।
    #
    পুঁইশাক প্রীতির পিছনে একটি গূঢ় কারণ আছে। খিদে। খিদের চেয়ে বড় সুস্বাদ ও যন্ত্রণা খুব কম আছে।
    আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। দাদা বাড়ি এসেছে। দার্জিলিং বেড়াতে যাবে। তার আগে। সঙ্গে একটি সুন্দর ত্বক রঙা হাত ব্যাগ। আমার তো চির কল্পনা মন। ভাবলাম যদি দুর্ঘটনা ঘটে। কী হবে। নাম
    জানবে কী করে? দিলাম দাদার নাম লিখে।
    আর তারপর দাদা দেখে তো খোঁজ আমার। আমি পালিয়ে গিয়ে সাঁওতাল পাড়ার মাঠে। আম গাছ টাছ চড়ে ঘুরে প্রচণ্ড খিদের চোটে বাড়ি ফিরেছি। সবাই যখন এদিক সেদিক আমি হেঁসেল ঘরে।
    দেখি লাল পুঁইশাকের ডাল আর ভাত সামনে। আধ হাঁড়ি ভাত খেয়েছিলাম বোধহয়।
    সঙ্গী ছিল লাল রঙের পুঁইশাক।
    এখন আর লাল পুঁইশাক দেখি না।
    কচি নরম ডাঁটা দিয়ে মুসুর ডাল আর হালকা পাতলা ফালি করে কচু। রসুন ফোড়ন সহযোগে।

    অমৃত।
    ৮-১০-২০২০

    ----

    পর্ব ৮

    আমার যেটুকু প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা তাতে আমার বেশ কিছু শিক্ষক মহাশয়ের অবদান আছে। তাঁদের অন্যতম পরেশনাথ চক্রবর্তী। অর্থনীতির শিক্ষক। কিন্তু পড়াতেন সব বিষয়। ইংরেজি ও অঙ্কে তুখোড়।
    আমার দাদা তাঁর কাছে পড়েছেন। ভাই এবং বোনও।
    পরেশবাবুর টিউশনির খুব নাম। বাছাই করে ছাত্র নেন।
    গ্রামে জুনিয়র হাইস্কুলে পড়েছি। সে অর্থে টিউশন ছিল না। গ্রামের স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন খুব ভালো মানুষ। কিন্তু অঙ্কে দুর্বল। ছাত্রটিও ততোধিক। পাটিগণিত সব পারি। বীজগণিতে মাইনাস প্লাস ভুল করে চলে যাই। যদিও উত্তর মিলে যায়।
    কিন্তু মাঝে কোন জায়গায় চিহ্ন ভুল করে এসেছি।
    সেহারাবাজার স্কুল এলাকায় তখন সেরা। অসাধারণ প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় তখন এলাকায় কিংবদন্তী।
    তাঁর নাম আমাদের বাড়িতে অবশ্য উচ্চারিত।
    আমার মামার শিক্ষক। দাদারও।
    কালীসাধক এই মানুষ আমার দাদাকে মামার সঙ্গে দেখে নাকি দত্তক নিতে চেয়েছিলেন।

    তা সেহারা স্কুলে আমরা আটজন সহপাঠী গেলাম।
    এই প্রথম আমাদের গ্রাম থেকে এতজন নবম শ্রেণিতে পড়তে যাচ্ছে সেহারায়। নিখিল, আজম, রবিয়েল, নজরুল, কালাম, আমি।
    আমাদের কারো বাবা মা কোনদিন ভর্তি করাতে যান নি।

    আমরা নিজেরাই ভর্তির আবেদনপত্র পূরণ করেছি।
    আর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ছাত্র রাজনীতি করার সুবাদে ভয় ডর কম।
    কিন্তু ভর্তির সাক্ষাৎকারের দিন বেশ বুক দুরদুর করতে লাগল।
    পাশের আরও অনেক জুনিয়র হাইস্কুল আছে।
    সেখান থেকে ছেলেরা এসেছে।
    পাশে বালিকা বিদ্যালয়। ঝকঝকে চেহারার বুদ্ধিদীপ্ত মেয়েরা আছে। কিন্তু তাঁদের সরাসরি ভর্তি। মৌখিক পরীক্ষা নাই।
    তা পরীক্ষা দিয়ে উতরে গেলাম।
    প্রথম হয়ে।
    ছোটবেলা থেকে আমি কখনও বিদ্যালয় কামাই করতাম না।
    জানুয়ারি মাস। রোজ আটজন যাই।
    বাকি কাউকে দেখি না।
    মাঠে রোদে বসে নাম ডেকে ছেড়ে দেন একজন স্যার।
    এবং আমাদের নিয়ে বহু বাঁকা বাঁকা মন্তব্য করেন।
    আমাদের গ্রাম তুলে।
    মোদ্দা বক্তব্য, আমাদের জন্য বাঁকা কলম ঠিক আছে পড়াশোনার কলম আবার কেন?
    গোরু চড়ানোই ভালো মানায় ইত্যাদি।
    বাঁকা কলম, বোঝেন নি, লাঙ্গল।

    কিছুই পড়ান না।
    আমি তো তখন প্রচুর বই পড়ি।
    আর বই পড়ে পড়ে আমার তখন ধারণা হয়েছে, চোখে চশমা পড়লে বুদ্ধিমান দেখায়।
    আর একটূ দাড়ি থাকলে নকশাল নকশাল মনে হবে। লুকিয়ে ব্লেড দিয়ে চাঁচলেও দাড়ি তো আর গজায় না। তা মাকে পটিয়ে হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে চশমা নেওয়ার ইচ্ছেয় হাসপাতালে গেলুম। হাতে ছিল 'আরণ্যক'। ভাবার চেষ্টা করলুম, পড়তে পারছি না।
    আসলে যাওয়ার আগে রেড়ির তেল চোখে লাগিয়েছিলুম।
    শুনেছিলাম, এতে নাকি চোখ নষ্ট হয়।
    এত চশমার ঝোঁক।

    তা হাসপাতালে বিরাট লাইন।
    লম্বা অপেক্ষার পর ডাক এল।
    ডাক্তারবাবু রায় দিলেন, এই পড়ো সেই পড়ো করে, বুকে শেল বিঁধে, চোখ একদম ঠিক আছে।

    এখন তো চশমা ছাড়া দেখতে পড়তে পারি না, বুঝি চশমা কত্ত খারাপ।
    তা সেদিন বিদ্যালয় কামাই হল।
    ছিলাম রাতে বর্ধমান শহরে। এই প্রথম শহরে কোন বাড়িতে রাত্রি বাস।
    আনন্দ হল।
    কিন্তু বিদ্যালয় পৌঁছে আনন্দ মাটি।
    গিয়ে দেখি মাঠ থেকে ঘরে ঢুকেছে ক্লাস।
    এবং শুনি পড়া শুরু হয়েছে। হোম টাস্ক।
    কী?
    কেউ বলে না।
    আমাদের গ্রামের কেউ আগের দিন যায় নি। আমরা তো দারুণ একতাবদ্ধ ছিলাম। সব একসাথে করতাম।
    ক্লাসে একজন মনিটর শুনলাম। সে তো পাত্তাই দিল না গাঁইয়াকে। পরে ভৌমিক দারুণ বন্ধু হয়ে যায়।
    আরেকজন, সেও আসতো অন্য গ্রাম থেকে, আমাদের সঙ্গে, দয়া করে বলল, মাই স্কুল।
    ইংরেজি প্যারাগ্রাফ।
    কতটা বলল না।
    আমার স্মৃতি শক্তি ভালোই ছিল।
    একবার পড়লে মুখস্থ হয়ে যেত।
    গ্রামের স্কুলে তো কোনদিন পুরো প্যারাগ্রাফ দিত না। অর্ধেক।
    আমিও অর্ধেক মুখস্থ করে ফার্স্ট বেঞ্চে বসলাম।
    পুরাতন অভ্যাসে।
    সেই বাঁকা কলম স্যার। ফর্সা টুকটুকে চেহারা ব্রাহ্মণ সন্তান। পাঞ্জাবি ভেদ করে পৈতে দেখা যেত।
    ক্লাসে ঢুকেই আমাকে বললেন, পড়া দাও।
    আমি অর্ধেকটা বলে চুপ।
    বাকিটা?
    আমি চুপ।
    গর্জে উঠলেন, পড়া পারে না আবার ফার্স্ট বেঞ্চে বসার ঝোঁক।
    থার্ড বেঞ্চে পাঠালেন।
    তারপর আমি আর কোথাও কোনদিন ফার্স্ট বেঞ্চে বসি নি।
    চূড়ান্ত অপমান।
    যেদিন থেকে, পড়া করছি, মানে তৃতীয় শ্রেণি থেকে, পড়া পারি নি হয় নি।
    চোখে জল এসে গেল।
    ফেরার সময় বন্ধুরা মিলে ঠিক হল, ব্যাটাকে জব্দ করতে হবে।
    নানা পরিকল্পনা হল।
    কিন্তু সেসব কার্যকর হল না। তিনিও ক্লাস টিচার রইলেন না।
    ষাণ্মাসিক পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর তিনি ঘোষণা করলেন, আমার ক্লাসের মনিটর ইমানুল।
    আমি ততদিনে তাঁর প্রিয়তম ছাত্র হয়ে গেছি।
    কার কাছে টিউশন পড়া যায়?
    টিউশন না নিলে পুরাতন বিদ্যালয়ের বিদ্যেয় কুলোচ্ছে না।
    বিশেষ করে অঙ্ক ইংরেজি।
    গ্রামে কেউ দেখিয়ে দেওয়ার নেই।
    জাহ্নবীবাবুর কাছে ভর্তি হলাম।
    ভালো পড়াতেন।
    কিন্তু দুষ্টু ছেলে ছিল প্রচুর।
    এত চেঁচামেচি করত। অসুবিধা হতো।
    প্রচুর ছেলে।
    বেশি ঝামেলা হলে, স্যার নরম মানুষ, বলতেন, ঝাঁকু পাঁকুর মা, দেখতো।
    মাসীমার মুখ দেখা গেলেই সবাই চুপ।
    আমি দ্বিতীয় হলাম। প্রথম সীতেশ। অঙ্কে ১০০-য় ৯৭।
    আমি ৪৫।
    যদিও মূল ব্যবধান ১৩।
    অন্য বিষয়ে আমি সেরা। কিন্তু অঙ্কে একাই মাত করে দিয়েছে বরাবর প্রথম হয়ে আসা সীতেশ।
    পরেশবাবুর নাম জানি। পড়লে ভালো হতো। নেবেন কি?
    দাদা পড়েছেন।
    উনি আমাদের ক্লাস নিতেন না।
    রাশভারি মানুষ।
    ইংরেজির খাতা সেবার উনিই দেখেছিলেন।
    তা একদিন শিক্ষকদের ঘরে গেছি, সমাজসেবা আর রেডক্রসের বিষয়ে শিশির বাবুর সঙ্গে দেখা করতে।
    পরেশবাবু সামনে।
    বললেন, তোর নাম ইমানুল?
    ততোদিনে স্কুলে রটেছে এর আগে পরেশবাবু কাউকে ইংরেজিতে এতো নম্বর কাউকে দেন নি। কড়া শিক্ষক।

    অমুকের ভাই?
    একটু প্রশ্রয় পেয়েছি গলায়।
    আমি প্রণাম করে বললুম, স্যার আমাকে পড়াবেন?
    আয় তবে।
    সকাল সাড়ে ছটায়।
    পারব স্যার।

    আমি তখন রাজনীতি নিয়ে খুব মেতে।
    উনি আমার ধাত বুঝেছিলেন।
    দশম শ্রেণিতে আমি প্রথম।
    মাসখানেক পর দিলেন, পড়ানোর দায়িত্ব।
    ইংরেজি ও অঙ্কের টেস্ট পেপার সলভ করাতে হবে অন্যদের।
    অঙ্ক ইংরেজিতে তুখোড় ছেলেমেয়েরা রয়েছে।
    জয়েন্ট বিডিওর মেয়ে পড়ে আমাদের সঙ্গে।
    আর উনি, তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, দে তো ওঁর মুখে ঝামা ঘসে। বড্ড গুমোর।

    আমি একটু আটকে গেলেই, এক্সট্রাতে, কাবেরী আর নন্দার মুখে মিচকে হাসি ফুটতো।
    সেই অপমান এড়াতে আমাকে পড়তেই হতো।

    প্রতি মাসে আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করাতেন, এ মাস থেকে আমি রাজনীতি ছেড়ে শুধুমাত্র ক্লাসের পড়া পড়ব।

    সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হতো নিয়ম করে।

    মাধ্যমিক পরীক্ষা হল।
    ফল বেরোল।
    স্কুলে প্রথম।
    একটু গুমোর।
    গেছি, স্যারের সঙ্গে দেখা করতে।
    স্যার জুতো নিয়ে তেড়ে এলেন।
    'এটা তোমার কাছে আশা করি নি।
    কোথায় স্ট্যান্ড করবে, তা নয় রাজনীতি।
    বেরো বেরো বের আমার ঘর থেকে। পরীক্ষার একদিন আগে গায়ে ম্যালেরিয়া নিয়ে সারারাত শ্যামসুন্দর কলেজে সিনেমা দেখা।
    দূর হ সামনে থেকে।'
    আমার পেছন পেছন দৌড়ে এলেন অন্তত ৪০০ মিটার।
    বাজারের লোক দেখছে, গম্ভীর রাশভারি পরেশ চক্রবর্তী দৌড়াচ্ছেন হাতে জুতো হাতে।

    সামনে সেই ছেলেটি যে নাকি এবার মাধ্যমিকে স্কুলে প্রথম হয়েছে।

    #

    এরকম অসাধারণ স্যার আর পাবো না।
    আজ চলে গেলেন।
    মাঝে মাঝে স্যারের সঙ্গে বিকেলে ফিরতাম, রেল লাইন ধরে, সাইকেলে। বলতেন, আমি বিধবার ছেলে। মা মুড়ি ভেজে মানুষ করেছে।
    পেটের দায়ে স্কুলে সাত তাড়াতাড়ি চাকরি করছি।
    তোরা আই এ এস পরীক্ষা দিবি বাবা।
    চুম্বক যত ভালো হবে তত আকর্ষণ ক্ষমতা বেশি হবে।
    ডি এম হলে অনেক বেশি লোকের উপকার করা যায়, নেতা হওয়ার থেকে।

    বলতেন, তোদের বাপের মড়াইগুলো কেড়ে না নিলে তোদের কিছু হবে না। খেতে পাস তো দুবেলা।
    জেদ আসবে না ভালো কিছু করার।
    ওদের দেখে শেখ।

    'ওঁরা' কারা বুঝতাম না।

    এখন বুঝি।
    উদ্বাস্তুদের লড়াই করার ইচ্ছে আগ্রহ অনেক বেশি।
    উদ্বাস্তুরা কোনো দেশের বোঝা নয়, সম্পদ। এটা বলেছিলেন ব্লুমসবেরি প্রকাশনের স্বত্ত্বাধিকারী 'স্যাটানিক ভার্সেস' এর প্রকাশক রিচার্ড চারকিন। ঢাকা ক্লাবে । খেতে খেতে। এক আড্ডায়। আন্তর্জাতিক এক আলোচনা সভা বসেছিল ঢাকায়। প্রকাশনা নিয়ে। দুদিনের। সেখানেই আলাপ ও বন্ধুত্ব।

    উদ্বাস্তুরা গতানুগতিকতা ভাঙ্গেন।

    প্রণামের সাহস নেই । আজও।

    আগুন তাঁকে গ্রাস করে নিল।
    এই অসময়ে।

    ভালো থাকবেন স্যার
    ৮.৪.২০২০

    -----

    পর্ব ৯

    শ্রদ্ধেয় পবিত্র সরকার আগের লেখাটি পড়ে লিখেছেন, আরও লিখতে। সাহস বেড়ে গেল।
    প্রথম কিস্তি লিখেছিলাম, ২০১৫ তে।
    শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন, ছেড়ে দিও না । লিখে যাও।

    কিন্তু লেখা হয় নি। অন্যায় করেছি।
    এবার লিখতেই হবে।
    কবে করোনা করুণা করবে!!

    পরেশনাথ চক্রবর্তী ছাড়াও আরও কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন, যাঁদের প্রভাব পড়েছে জীবনে। ভবানীপ্রসাদ রক্ষিত। বাংলা পড়াতেন। ধনীর সন্তান। তিন তিনটে লাক্সারি বাস চলতো তাঁদের পরিবারের। বর্ধমানে দামোদর নদীর দক্ষিণ দিকে আমাদের বাস। নদী থেকে ১৫ কিমি দূরে সেহারাবাজার।
    বাঁকুড়া থেকে রায়না বিডিআর নামে রেল চলতো। বিডিআর, বাঁকুড়া দামোদর রিভার রেলওয়ে বোধহয়। লোকে বলতেন, বড় দুঃখের রেলওয়ে। ধিকি ধিকি চলতো। থামার আগে চলন্ত গাড়ি থেকে নামা যেতো। গার্ডের কামরার হাতল ধরে সাইকেল চেপে প্যাডল না করে গেছি। মোরাম বিছানো রেল লাইনের পাশে ছিল সাইকেল রাস্তা। এই রেল নিয়ে অমর মিত্রের উপন্যাস আছে।
    এই রেল নিয়ে একটা আলাদা লেখার ইচ্ছে।
    পরে।

    সেহারাবাজার ছিল বিডিআরের জংশন স্টেশন।
    বাঁকুড়া সোনামুখী ইন্দাস থেকে অনেকেই এখানে নেমে বাসে চেপে বর্ধমান যেতেন।
    সেখান থেকে কেউ কেউ কলকাতা।
    এই কারণে সেহারাবাজারের আলাদা অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল।
    সেহারাবাজারে বাস এবং মিল মালিকরাই বড়লোক। কিছু ব্যবসায়ীও ছিলেন। সিমেন্ট, লোহা, মুদির দোকানের।
    ভবানীবাবুদের লাক্সারি বাস।
    আরতি ভারতী শাশ্বতী সম্ভবত।
    লঝঝড়ে নয়। সুন্দর। লাক্সারি বাস তখন খুব কম। এক্সপ্রেস হিসেবে চলে।
    ধনী বাড়ির ছেলে। কিন্তু তার কোন প্রকাশ নেই।
    পড়তেন, সাদা কালোপেড়ে ধুতি। কালো চামড়ার কুয়োভাদিস ধরনের চটি। আর সাদা পাঞ্জাবি।
    সারা জীবন এক পোশাক।
    শিশিরবাবু আর দু একজন ছাড়া তখন সব স্যার ধুতি পাঞ্জাবি পড়তেন।
    তাহলে স্বাতন্ত্র্য কোথায়?
    ধুতির পাড়ে আর চটিতে।
    অন্যদের পাড়ের রঙ বদলায়, চটি বদলায় ভবানীবাবু আমৃত্যু এক।
    আর উনি বাংলা ছাড়া কোন শব্দ উচ্চারণ করতেন না। সেলাই করা নয় তাঁর ভাষা। একটিও ইংরেজি শব্দ বলতেন না।
    পোশাক আসাক ও কথায় আমার জীবনে তাঁর প্রভাব সমধিক।

    প্রিয়নাথ নন্দীকে নিয়ে মজা করত আড়ালে ছেলেরা। কারণ উনি খুব উচ্চারণে ভুল ধরতেন। এবং ডিসিপ্লিনে খুব জোর দিতেন। বারবার বলতেন, ডিসিপ্লিন খুব জরুরি। ছেলেরা নাম দিল, ডিসিপ্লিন স্যার।
    রাশিয়া নয় রাশা, আমেরিকা নয় মেরিকা-- এই সব বলতেন ইতিহাসের ক্লাসে। নাম হয়ে গেল রাশা নন্দী। কংগ্রেস সমর্থক ছাত্ররা বলত, মেরিকা নন্দী। বিচিত্র সব নাম। আড়ালে। কিন্তু তাতে মজা ছিল ব্যঙ্গ ছিল না। ক্লাসে ঢুকলেই নিস্তব্ধ।

    তিনি একবার আমার প্রাণ বাঁচান।
    নতুন স্কুলে এসেছি।
    আমাদের গ্রামের জুনিয়র হাইস্কুলে মোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা পঞ্চম থেকে অষ্টম মিলে ৬৭ জন। অনুমোদন বজায় রাখার জন্য মাস্টারমশাইরা ৩২০--৪০০ দেখাতেন ।
    অনেক মিথ্যা সই করানো হতো ছাত্রদের দিয়ে।

    কারণ প্রায়ই ঝড়ে বৃষ্টিতে একটি ঘর, ষষ্ঠ শ্রেণির, ভেঙে পড়ত।
    গ্রামে বিদ্যুৎ ১৯৭৯ পর্যন্ত ছিল না। পাখার তো প্রশ্নই নেই।

    সেহারাবাজার চন্দ্রকুমার ইনস্টিটিউশনে এক একটি ক্লাসে ১৫০ র বেশি ছাত্র। তিনটি করে বিভাগ। এ বি সি। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি-- ২২০০ থেকে ২৩০০ ছাত্র। শিক্ষকদের থাকার ঘর।
    ছাত্রদের একটা ছোট আবাস।
    সেই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি নবম শ্রেণিতে। পড়ার বেশ চাপ। দাদা বলতেন, বাঁশ বনে শেয়াল রাজা। গ্রামে প্রথম হওয়া নিয়ে।
    নতুন বিদ্যালয়ে অনেকেই ক্লাসের পড়াশোনায় ভালো।
    বাইরের বই, তখনকার ভাষায়, আউট বইয়ে আমার যদিও দখল বেশি, কিন্তু অঙ্কে ইংরেজি ও বিজ্ঞানে ওঁরা এগিয়ে। প্রথম সীতেশ দ্বিতীয় নবকুমার তৃতীয় শ্রীচরণ পড়াশোনা অন্ত প্রাণ।
    হেরে যাব ভাবলেই একটা জেদ আমার মধ্যে চেপে বসতো।
    বিশেষ করে প্রশান্তবাবুর বাঁকা কলম ঠেলার অপমান চাগিয়ে রাখতো।
    তা আমি ঠিক করলাম, এখানে রাজনীতি কম। পড়াশোনা বেশি।
    কিন্তু খোঁড়ার পা খানায় পড়ে।
    ভর্তি হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই আসামে বাঙালি নির্যাতনের প্রতিবাদে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের ডাকে বন্ধ। ১৯৮০ । বন্ধ ভাঙতে বামফ্রন্ট মরিয়া। শত শত মানুষ লাঠি টাঙি নিয়ে রেললাইনে ভিড় করে আছে।
    তাতে কী? সেহারাবাজার ছিল কংগ্রেসিদের ঘাঁটি। ওঁ গোষ্ঠী বলে একটা ক্লাবের ব্যাপক দাপট।
    খেলাধুলা বা দাদাগিরি-- সবেতেই তারা এগিয়ে।
    ওঁ গোষ্ঠী কংগ্রেসি ক্লাব।
    সেই ক্লাবের কংগ্রেস সমর্থক ছেলেরা এসেছে বন্ধ করতে।
    আমি তখন ক্লাস কামাই কোনদিন করবো না পথের সমর্থক। তার ওপর এস এফ আইয়ের ছোটখাটো নেতা। লোকাল কমিটির সদস্য হয়ে গেছি ১২ বছরেই।
    তো আমি আমার সাইকেল নিয়ে এগোচ্ছি। একটা ছুরি উঁচিয়ে উঠল একজন।
    হঠাৎ দেখি একটা লম্বা হাত এসে খপ করে ধরে ফেললেন, সেই ছুরি
    তো আমি স্বভাবতই সেই হাতের মালিকের ভক্ত হয়ে গেলাম। তিনি গোপীনাথ নন্দী।
    নবম শ্রেণিতে ষাণ্মাসিক পরীক্ষার ফল বের হয়েছে। ইতিহাসে প্রচুর নম্বর পেয়েছি। আগেও পেতাম।‌১৫ তে ১৪ নম্বর আমি চতুর্থ শ্রেণি থেকেই পাই।
    এরপর খাতা দেখানোর পালা।
    প্রিয়নাথ নন্দী স্যার খাতা দেখাচ্ছেন।
    উনি বললেন, এই শোন, ইতিহাস আর সাহিত্য এক নয়। নম্বর পেয়েছিস বটে, আমি হলে এত নম্বর দিতাম না।
    সাহিত্য আর ইতিহাস এক হয়ে গেলে উচ্ছ্বাস এসে যায়।
    উছ্বাস ইতিহাসের ধর্ম নয়।
    মন দমে গেল।

    কিন্তু কথাটা মনে রয়ে গেল।
    বঙ্কিমি ধাঁচের অনুপ্রাস কন্টকিত বাংলা সেই থেকে কমল। আমি আগে যাত্রাগন্ধী অনুপ্রাস নির্ভর লেখা লিখতাম ভাষায় মারপ্যাঁচ দিয়ে।

    প্রিয়নাথবাবুর নাম দিয়েছিল, আমার এক বন্ধু, বাটি পোস্ত।
    কারণ স্যার তখনকার দিনে এক কেজি পোস্ত কিনতেন।
    আর বাটা পোস্ত খেতেন এক বাটি।

    বাটি পোস্তের কথা ক্লাসেও দুয়েকবার শুনেছি। সব্জি আর পোস্ত দুই খাওয়াতে জোর দিতেন।

    তো প্রিয়নাথ নন্দীর স্বভাব ছিল, নবম দশম শ্রেণিতে প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থকে তাঁর বাড়ি নিয়ে গিয়ে পড়ানো। আমি ষাণ্মাসিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছি। ১৩ নম্বরের তফাতে। এবার লক্ষ্য অঙ্কে ৩০ নম্বর বাড়ানো। পারলেই প্রথমের থেকে এগিয়ে যাবো।
    পড়ানো নামেই, যে বিষয়ে যে ভালো সে বিষয়ে অন্যদের পড়াবে।
    উনি আটকে গেলে আছেন।
    বিদ্যালয় বাড়ি থেকে ক্যানেল পাড় দিয়ে গেলে ছ কিমি তারপর আরও আড়াই কিলোমিটার দূরে স্যারের বাড়ি। যেতে অনীহা।
    খালি গায়ে সব্জি খেতে কাজ করছেন, আর জিজ্ঞেস কী করছিস এখন? ইংরেজি গ্রামার কর বা অঙ্ক।
    গল্পগাছার সুযোগ ছিল না।
    বিনা পয়সায় পড়ানো।
    তবু যাওয়া বন্ধ করতেই হল।
    অত্যাচারে।
    স্যারের খাওয়ানোর অত্যাচারে।
    নিজের হাতে সকালে জাল ফেলে চারাপোনা ধরতেন পুকুর থেকে। সেটি দুটি করে বরাদ্দ।
    এরসঙ্গে কাঁচা পোস্ত বাটা।
    এবং টাটকা তোলা সবজির স্টু।
    স্টু শব্দ গল্প উপন্যাসে পড়া ছিল, বাস্তবে সেটি ভয়াবহ হয়ে উঠল।
    অন্য সময় না থাক, স্যার খাওয়ার সময় হাজির। সব খেতে হবে।
    সঠিক পুষ্টি ছাড়া আবার পড়াশোনা হয় নাকি?

    এবং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দুইয়ে আনা টাটকা গোরুর এক গ্লাস কুসুম কুসুম গরম দুধ।
    কাঁসার গ্লাসে।

    আমরা প্রিয়নাথ নন্দীর বাড়ি যাওয়া ছেড়েছিলাম খাওয়ার ভয়ে।

    সেই থেকে শিখেছি, ছাত্র খেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করা।

    অন্ন ছাড়া বিদ্যা হয় না, এটা যদি সব শিক্ষকরা বুঝতেন!

    ৮ এপ্রিল ২০২০
  • | রেটিং ৫ (২ জন) | বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৮ এপ্রিল ২০২০ | ৪৪৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • touhid hossain | ০৪ এপ্রিল ২০২২ ১৯:৪০505991
  • আমিও খাওয়ার কথা জিগ্গেস করি মাঝে মাঝে। তবে সবসময় হয় না। 
    স্যার, স্যারের স্যার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে প্রতিক্রিয়া দিন