বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ছেঁড়াকাঁথা  শনিবারবেলা

  • কাদামাটির হাফলাইফ

    ইমানুল হক
    ধারাবাহিক | ছেঁড়াকাঁথা | ১৩ আগস্ট ২০২২ | ৩৫৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • নামাঙ্কনঃ ইমানুল হক। ছবিঃ র২হ

    পর্ব ৯৯


    সত্তর দশকে গ্রামে ছুটকো ছাটকা চুরি প্রায় হতো। এর কাঁসার থালা চুরি, তার বাটি চুরি।
    সোনার জিনিসপত্রও হারাত। পুকুরে স্নানের সময় নাকছাবি, দুল হারানোর ঘটনা হরবখত। তো, গুণিন ডাকা হতো। হাত গুনে, বাটি চালিয়ে হারানো বা চুরির মাল উদ্ধারের চেষ্টা হতো।
    ব্যাপারটা পুরোটাই বুজরুকি। এবং কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। কিছু কিছু সময় চোর ভয় পেয়ে রেখে যেত রাতের আঁধারে। আবার পুকুরে তল্লাশি করার লোকও ভাড়া পাওয়া যেত। কানের দুল, নাকছাবি উদ্ধার করত।
    গ্রামে দুয়েকজনের নাম যে-কোনো চুরিতেই জড়াত।
    বেঁধে খুব পেটানো হতো।
    তাতে কাজের কাজ হতো না, কিছু মর্ষকামী লোকের সুখ হতো। একদলের মেরে, আরেক দলের মার খাওয়া দেখে।
    আমার খুব মায়া হতো, চোর পেটানো দেখে।
    একবার একজনকে তেঁতুল গাছের ডালে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে মারা হচ্ছিল। সেটা আবার আমাদের বাড়ির ধান চুরির ঘটনায়।
    চোর চেনা। আমাদের বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই আসত। ভালো ছবি আঁকত। তাঁকে যত মারছে, সে আর্তনাদ করে বলছে, আমাকে মেরে ফেললেও ওই বাড়িতে আমি চুরি করেছি, বলতে পারবুনি।
    আমরাও জানতাম, সে চোর নয়।
    যারা চুরি করিয়েছে, তারাই পেটাচ্ছে স্বীকারোক্তির জন্য। আসল চোরকে ঢাকতে নকল চোরের ধোলাই।
    তারমানে সে চোর নয় তা নয়, কিন্তু বড় চুরি সে করত না।
    আমাদের বাড়িতে তো নয়ই।
    দুপুর বেলায় সবাই মেরে ধরে চলে যাওয়ার পর আমার মা আমাদের মুনিষকে পাঠালেন, ওকে ছাড়িয়ে এনে ভাত খাওয়াতে।
    গায়ে লাল চাকা চাকা দাগ।
    ভাত খেতে পারছে না, হাত দিয়ে।
    সে দৃশ্য ভুলতে পারি না।
    পরে বললাম, ওরা তো জানে তুমি আমাদের বাড়িতে চুরি করতে পারো না, তবু মারলো কেন?
    --ভাই আমি তো হাঁস মুরগি ডিম এইসব নিই পেটের দায়ে। ওরা চায়, আমি ডাকাতের দলে যোগ দিই, ডাকাতি কি আমি করতে পারি বলো?
    আশ্চর্যের বিষয়, ভদ্রলোক আমাকে তুমি বলতেন।
    কবিতা লিখতেন গোপনে। কবিতা পড়তে ভালোবাসতেন। আমার কবিতা, সেগুলো কবিতা হতো কী না জানি না, খুব তারিফ করতেন।
    এখন আর বেঁচে নেই।
    কিন্তু তার নামের আগে চোর শব্দটা লোকে বলতো।
    ডাকাতদের কিন্তু কেউ কিছু বলেনি।

    ওই যে তেঁতুল গাছে বেঁধে পেটানোর ঘটনা বললাম, সে সময় বাবা গ্রামে ছিলেন না।

    আমার বাবা তখন যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দেওয়ার প্রতিবাদ করতে ১০০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে কলকাতা অভিযানে গেছেন।

    আমাদের গ্রামে ডাকাতি কম হয়েছে। আমার মামাদের বাড়িতে একবার হয়। কংগ্রেসের গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের ফসল। বড় মামাকে ডাকাতির নামে মেরে ফেলাই ছিল লক্ষ্য। সবাই জানত, কারা ডাকাতি করিয়েছে, কাদের দিয়ে, কিন্তু কিছু প্রতিকার হয়নি। বড়মামা সেদিন 'নীলরক্ত' যাত্রা শুনতে তিন কিলোমিটার দূরের বুড়ুল গ্রামে গিয়েছিলেন।
    এই ঘটনার পর মামার বাড়িতে দু নলা বন্দুক এল।
    কোনা বলে গ্রামের কংগ্রেসের এক বড় নেতা ডাকাতদের আসল সর্দার। আমাদের গ্রামের কয়েকজন ছিল আলাদা ডাকাত দলে। যে বন্দুক দিত, ডাকাতির ৫০% টাকা তার।
    পরে ডাকাতি আমাদের এলাকায় উঠে যায়। ১৯৭৭-এ বামফ্রন্ট সরকার আসার পরে।
    তার আগে ডাকাতির খুব ভয় ছিল।
    ডাকাতি ছেড়ে দেওয়া একজন মানুষ আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমিও তাকে খুব পছন্দ করতাম। অনেক ডাকাতির গল্প শুনেছি।
    কিন্তু সব লিখতে পারব না।
    ডাকাতের দলে থাকা লোকদের ছেলেমেয়েরা কষ্ট পাবে।
    পাশের গ্রাম ক্ষ্যামতায় একজন ডাকাত ছিল। দুর্ধর্ষ। লাঠি খেলায় ওস্তাদ। তার লাঠি ঘোরানোয় নাকি বন্দুকের গুলি আটকে যেত।
    পরে তাঁর লাঠি খেলা দেখেছি।
    শুধু লাঠিই দেখা যেত, মানুষটাকে নয়। এমন বনবন করে ঘোরাতেন দু হাতে দুটো লাঠি,
    প্রমথ চৌধুরীর গল্পের কথা মনে পড়ে যেত।
    একবারের একটা কথা মনে পড়ছে। বড়দির নতুন বিয়ে হয়েছে। বড়দির বাড়ি থেকে ফেরা হচ্ছে। বারবার বাবা বলে দিয়েছেন, সন্ধ্যার আগে ফিরবে সবাই। আমরা তো ছোটো। কিন্তু ফেরা হয়নি। গোরুর গাড়িতে করে ফেরা নয় দশ কিলোমিটার রাস্তা।
    সেহারাবাজার পেরিয়ে রেনিগেট বলে ডিভিসির একটা জায়গা ছিল। ওইটা নাকি ডাকাতদের আস্তানা। ওখানে সন্ধ্যার পর লোক হাঁটতো না।

    ওখানে আসতে না আসতে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার।
    গোরুর গাড়ির তলায় লন্ঠন জ্বলছে।
    আমরা ভিতরে সিঁটিয়ে বসে আছি। কথা বলা, হাঁচি কাশি বারণ।
    এক মুহুর্ত মনে হচ্ছে একেকটা ঘন্টা।
    যাক শেষ পর্যন্ত পার হয়ে এলাম।
    কোনো অঘটন ঘটেনি।

    পর্ব ১০০


    ওহ, যাত্রাওয়ালা আমি ভেবেছিলাম ভদ্রলোক। মাঝরাতে যাত্রা করে ফিরছিলেন বাবারা। এক ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করেন, কারা গো? বাবার নাম তখন রবি চৌধুরী। মুসলমানদের নাম পরিবর্তন করতে হতো যাত্রা থিয়েটার করতে গেলে। বাবাও যাত্রা দলের লোক। সম্পন্ন বাড়ির একমাত্র সন্তান। বাবাই দলের মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন। উত্তর দেন,
    আমরা যাত্রা করে ফিরছি।
    তখনই ঠিকরে এল, ওহ, যাত্রাওয়ালা আমি ভেবেছিলাম ভদ্রলোক।
    কথা ছিল, যাত্রা দেখে ফাতরা লোকে। যাত্রা নিয়ে গল্প মানেই হাসি ঠাট্টা।
    সীতার গোঁফ দেখা।
    বিড়ির সুখটান দিতে দিতে সীতার মঞ্চের দিকে সাজঘর থেকে ছুট মারা।
    বেশিরভাগ ভাগ অপেশাদার যাত্রা পার্ট ভুলে যায়।
    আর কেউ কেউ এমন মুখস্থ করতেন যে, ঘূর্ণায়মান গদা লইয়া রক্তচক্ষু ভীমের প্রবেশ পর্যন্ত বলে ফেলতেন।
    --কোথারে পামর দুর্যোধন, তোরে আজি করিব নিধন।
    ভীমের তর্জন গর্জন শুনে দুর্যোধন উঠে আসে। দুর্যোধনের চেহারা ভালো। ভীমের রোগা।
    কিন্তু ভীম বেশি চাঁদা দিয়েছে, অরিজিনাল গলায় হাত রাখা তার ন্যায্য অধিকার।
    এছাড়া তার পার্ট মুখস্থ শক্তিও দারুণ।
    রামসুখ তেওয়ারির মতোই পার্টও তার ঠোঁটের ডগায়।
    তা ভীম দুর্যোধনের গদা যুদ্ধ।
    ভীম বলে দিল, বীরবিক্রমে ভীমের আক্রমণ।
    কিন্তু দুর্যোধনের বিক্রম বেশি।
    পায়ে মারার সুযোগ আর পায় না।
    কৃষ্ণ ইশারা করতেই থাকে করতেই থাকে, বেচারা ভীমের ঊরুই থাকলে হয়।
    এমন সময়, প্রম্পটার ছাতার বাঁটের মতো একটা লাঠি দিয়ে পায়ে টান মারলেন।
    পড়ে থাকা সামগ্রী টানার প্রম্পটারের ওটি সঙ্গেই থাকতো।
    দুর্যোধন পড়েই হুঙ্কার দিল, পড়ি নাই পড়ি নাই, প্রম্পটার ফেলিয়াছে ছাতার বাঁটে রে।
    তবে রে প্রম্পটার তোরে আজি করিব সংহার।
    প্রম্পটার যাত্রার বইটই ফেলে দে দৌড় দে দৌড়।
    পিছনে দুর্যোধন। তার পশ্চাতে ভীমের অনুগমন এবং দর্শকমণ্ডলীর।

    কিন্তু এটাই তো সব নয়।
    মহানায়ক যাত্রাসম্রাট স্বপনকুমারের যাত্রা ছিল প্রসিদ্ধ। হেলিকপ্টারে করে সত্তর দশকে সুন্দরবনে যাত্রা করতে যেতেন বলে শুনেছি।
    সত্তর দশকে ১০ হাজার টাকা পার নাইট।
    নায়কের নামে নায়িকার নাম।
    স্বপ্নাকুমারী।
    অভিনয়ে উত্তম-সুচিত্রার মতো জনপ্রিয়। ছিলেন নটসম্রাট তপনকুমার।
    নটসূর্য দিলীপকুমার।
    তিনি নাকি সোনাই দিঘী' পালায় সুন্দরী সোনাইকে দেখে ভাবনা কাজীর প্রতিক্রিয়া দেখাতে সড়াৎ করে লালা ফেলে লালা টেনে নিতে পারতেন।
    সিনেমার মাদ্রাজি নায়ক রজনীকান্তের মতো তাঁকে নিয়ে প্রচুর গল্প গাছা।
    আমি নিজের চোখে দেখেছি, গৌতম সাধু খাঁ-র লালা ঝরা।
    দেখেছি, বাবার বন্ধু রাখাল সিংহের কংস বেশে চোখ ঘোরানোর খেলা।
    'মীরার বঁধুয়া' পালায় মীরাবাঈ চরিত্রে জ্যোৎস্না দত্তের গান ও সংলাপে হাপুস নয়নে সবাইকে কাঁদতে দেখেছি।
    মার্কস লেনিন সুভাষ হিটলার বিবেকানন্দ-- হুবহু চরিত্র সাজা প্রতিভাধর শান্তিগোপাল।
    নির্মলকুমার-- নির্মলকুমারী।
    'হোচিমিন' চরিত্রাভিনেতা সমীর লাহিড়ী।
    এছাড়া ছিলেন ইন্দ্র লাহিড়ী, ছন্দা চট্টোপাধ্যায়, সমীর মজুমদার, উজ্জ্বল সেনগুপ্ত, গৌতম সাধু খাঁ, অনাদি চক্রবর্তী, অরুণ দাশগুপ্ত, বীণা দাশগুপ্ত, বেলা সরকার জুটি। বেলা সরকারের প্রেমিকের নাম মনে পড়ছে না। 'মা মাটি মানুষ' পালা বেলা সরকারকে খ্যাতি দেয়। বিশিষ্ট আইনজীবী একরামুল বারি, যাত্রা ও নাটকের পোকা। অনর্গল মুখস্থ বলতে পারেন, বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপ।
    মনে করালেন, বেলা সরকার প্রথম মেয়ে বেলবটস প্যান্ট পরে অভিনয় করেন 'মা মাটি মানুষ' যাত্রায়।
    নট্ট কোম্পানি তখনকার সেরা দল।
    আরো ছিল সত্যম্বর অপেরা, ভারতী অপেরা, যাত্রালোক, গণবাণী। কয়েক শো দল।
    মোহন অপেরা বিখ্যাত ছিল পৌরাণিক পালার জন্য।
    মোহনকুমার। সেহারাবাজারে মোহন অপেরা প্রতি বছর বাঁধা শো।
    তাঁর মহিষাসুর চরিত্রে অভিনয় লোকের মুখে মুখে ফিরতো।
    পালাকার ছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ দে, ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যপ্রসাদ দত্ত এবং উৎপল দত্ত। আরো অনেকে। আরেকজন উৎপল ছিলেন। পদবী মনে পড়ছে না।

    রাইফেল, বৈশাখী মেঘ, বৈশাখী ঝড়, অরণ্যের ঘুম ভাঙছে, সাদা পোশাক-- উৎপল দত্তের বিখ্যাত যাত্রা পালা।
    'রাইফেল' পালায় রহমত চরিত্রে অভিনয় করে ছোটো ফণী'র নাম ফাটে।
    মজার বিষয়, যাত্রায় মুসলিম চরিত্র শুধু খলনায়ক হতো না, নায়ক হতো। খলনায়ক হিন্দু মুসলমান দুই একসঙ্গে হতো। নায়ক প্রতিনায়ক হিন্দু মুসলমান দুতরফেই।
    সম্প্রীতির কথা বলতো।
    দিল্লির বিরুদ্ধে বলতো।

    বৈজু বাওড়া চরিত্রে গুরুদাস দত্তের গান।
    শেখর গাঙ্গুলী একসঙ্গে তিনজনের সংলাপ বলতেন 'নামভূমিকা' পালায়।
    বিশিষ্ট আইনজীবী একরামুল বারি এটা চমৎকার নকল করে দেখাতে পারেন।
    খোকন ( বিশ্বাস?) এর বিবেক চরিত্রে খালি গলায় গান, প্রশান্ত ভট্টাচার্য বড় ও ছোটো-র সুর কানে লেগে আছে আজো।
    সিরাজউদ্দৌলা চরিত্র করে বিখ্যাত হন নির্মলেন্দু লাহিড়ী। তাঁকে দেখিনি, তবে 'সিরাজউদ্দৌলা' করে বিখ্যাত পূর্ণেন্দুশেখর চট্টোপাধ্যায়কে দেখেছি।
    তাঁর জন্য জনশ্রুতি ছিল, যখন যে পার্ট করতেন সাজঘরেও সেই আচরণ করতেন। নবাব তো নবাব, চাকর তো চাকর।
    আমাদের পাশের গ্রাম নূরপুরে দু নাইট যাত্রা হয়েছিল।
    আশেপাশে যত গ্রামে বাজারে যাত্রা শো হোক আমাদের বাড়িতে গেস্ট কার্ড ও পাশ আসতো।
    বাবার পাশ, আমাদের কার্ড। কার্ডের পয়সা দিতেন বাবা।
    গ্রামের/ এলাকার উন্নয়নে এবং নিজেদের ভালো লাগা থেকে করা হতো এই নাইটগুলো।
    যাত্রা কিন্তু ইংরেজিতে বলা হতো,
    নটসূর্য নাইট, মহানায়ক নাইট, বীণা দাশগুপ্ত নাইট, মীনা কুমারী নাইট, নটসম্রাট নাইট, উৎপল দত্ত নাইট ইত্যাদি।
    ঘোষকরাও ছিলেন অসাধারণ সব।
    আগামী .... তারিখে অমুক জায়গায় অমুক নাইট হবে। টিকিটের মূল্য চেয়ার দু টাকা, চট এক টাকা।
    সাইকেল রাখিবার ও মহিলাদের আলাদা বসিবার সুবন্দোবস্ত থাকিবে।
    আপনারা সবাই যাবে এএএএ।
    ন বাদ।

    মহিলাদের প্রসাবখানা হতো চট দিয়ে ঘিরে।
    সেকালে পুরুষ ও মহিলাদের একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা ছিল না। যাত্রার শেষে কোথায় দাঁড়াবে বলা থাকতো।
    মাঝরাতে যাত্রা দেখে সাইকেল চালিয়ে বা হেঁটে স্বামী স্ত্রী ফিরতেন, কোথাও কোনোদিন কোনো অভিযোগ শোনা যায় নি।
    তো, পূর্ণেন্দুশেখর চট্টোপাধ্যায়ের কাছে আমরা কজন গেলাম দু কিলোমিটার পথ হেঁটে গল্প করতে। অমায়িক মানুষ।
    ছ ফুটের ওপর লম্বা। টকটকে ফর্সা। সেকালের এম এ পাস।
    চাকরি না করে যাত্রার নেশা।
    ওখানেই 'আনারকলি' যাত্রায় একটা গান শুনি।
    আনারকলিকে যখন যুবরাজ সেলিমের সঙ্গে প্রেমের অপরাধে মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে, তখন একটা করুণ সুরের গান।
    এখনো কানে বাজে।
    'নাথবতী অনাথবৎ' ছাড়া কোনো নাটকের সুর আমাকে এতো দিন তাড়া করে ফেরে নি।

    ইসস্ কেন যে গাইতে জানি না!

    অমিত বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বললেন, এক সময়ে যাত্রা ছিল গ্রাম বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম। যাদের নাম করলেন, প্রায় সবাই ছিলেন যাত্রা শিল্পী। বহু দক্ষ টেকনিশিয়ান ও মিউজিশিয়ান এর রুজি রুটি ছিল এই যাত্রা ইন্ডাস্ট্রি। হ্যাঁ, যাত্রা শিল্পও ইন্ডাস্ট্রি র স্বীকৃতি পেয়েছে। সামাজিক, ঐতিহাসিক এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দের জীবনী নিয়ে তৈরি যাত্রা পালাও হিট হতো। শান্তিগোপাল তো সোভিয়েত স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন।
    সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে, এই শিল্প একটু একটু করে তার নিজস্বতা হারালো। হিমঘরে আলু রাখা আর যাত্রা দলের নায়েক হওয়ার তফাৎ টুকু মুছে যেতেই এই জনপ্রিয় শিল্পটি মুখ থুবড়ে পড়লো। চিৎপুরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠলো যাত্রা দল। নির্দিষ্ট যাত্রা শিল্পীর বদলে ভরে গেল বড়- মাঝারি- ছোট সিনেমা ও সিরিয়াল জগতের শিল্পী সমৃদ্ধ যাত্রা।
    মনে আছে, পয়লা বৈশাখ ও রথযাত্রার দিন খবরের কাগজে যাত্রার পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন ক্রোড়পত্র। এর ফলে, সিনেমা ও সিরিয়াল জগতের শিল্পীরা লাভবান হলো, কিন্তু হারালো যাত্রা র বিশেষ অভিনয় শৈলী।
    এখন আর রথযাত্রায় বড় বড় পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন দেখি না। সিনেমা সিরিয়াল এর শিল্পীদের কদর ও কমেছে। আসলে ঐ শিল্পীদের রোজ টিভিতে দেখে, ওদের দেখার ক্রেজ টাও তো আর নেই।
    তবু অনল- কাকলি জুটির জনপ্রিয়তা আছে। তাপসী রায় চৌধুরী সম্ভবত আর যাত্রা করে না। আরো কিছু যাত্রা শিল্পীদের কিছুটা জনপ্রিয়। চিৎপুর এর গরিমা কমে গেছে। নন্দকুমার, মেদিনীপুর এ যাত্রা শিল্পের গরিমা কিছুটা এখনো আছে।

    (ক্রমশঃ)
  • ধারাবাহিক | ১৩ আগস্ট ২০২২ | ৩৫৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • subhamoy bhattacharyya | ১৫ আগস্ট ২০২২ ১৫:১৬511022
  • যাত্রার নামগুলো অস্কার পাওয়ার মতো, বৌ এমএলে/ স্বামী জেলে আরেকটা মনে পরছে, অপরে শয়তান নিচে অঞ্চল প্রধান, এ নামগুলো ন য়ের দশকের খবরের কাগজে দেখতে পেতাম
  • Emanul Haque | ১৭ আগস্ট ২০২২ ১২:২৬511104
  • বাবা কেন চাকর? স্বামী কেন আসামী? শ্বশুর ভগবান বাবা শয়তান, মা শয়তানি শাশুড়ি দেবী, 
    কী দিয়ে কী পেলাম, বাংলার বাঘিনী-- এইসব মাত্রা চলে নয়ের দশকে 
  • Emanul Haque | ১৭ আগস্ট ২০২২ ১২:২৭511105
  • যাত্রা। মাত্রা নয়।
  • Indra Mukherjee | ১৭ আগস্ট ২০২২ ১৭:২১511121
  • উত্পল দত্ত ই যাত্রাকে আধুনিক করলেন ।লেখার জন্য নমস্কার জানবেন ।
  • dc | 2401:4900:2609:1d3b:4164:a403:74a3:b72c | ১৭ আগস্ট ২০২২ ১৮:০৯511122
  • সিঁথির সিঁদুর চেটে গেল ইঁদুর। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন