• হরিদাস পাল  ব্লগ

  •  জাল কোভিড টিকার কারবার মনে করাচ্ছে ব্রিটিশ নাট্যকার বেন জনসনকে 

    Dipankar Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৮ জুন ২০২১ | ৯২৮ বার পঠিত

  • -- আরে রোসো। আগে উপোস করতে হবে। তারপর নাকে দিতে হবে তিন ফোঁটা করে ভিনিগার। মুখে দু-ফোঁটা। দু-চোখে এক ফোঁটা করে। তারপর আঙুলের সব ডগা আর চোখ ধুয়ে তিন বার গুনগুন করে মন্ত্র পড়তে হবে। ব্যাস। তাহলেই কেল্লা ফতে!

    ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলা যাক। সপ্তদশ শতকের লন্ডনে প্লেগের দাপটে বিত্তবান লোকেরা শহর ছেড়ে গ্রামের নিরাপদ আশ্রয়ে পালাচ্ছে। এমনই এক ধনী লাভউইট তাঁর ভৃত্য ফেসের জিম্মায় বাড়ি রেখে শহর ছেড়েছেন। মনিব তাকে বিশ্বাস করলে হবে কী, ফেস পয়লা নম্বরের ধড়িবাজ। গৃহস্বামীর অনুপস্থিতির মওকায় সাটল নামে একটা ঠগ আর চতুর এবং ডল নামে এক বেশ্যার সঙ্গে সাঁট করে ফেস ওই ফাঁকা বাড়িতে রাতারাতি লোক ঠকানোর এক মস্ত কারবার ফেঁদে বসল। সাটল ভেক ধরল অ্যালকেমিস্টের, যে তামা-লোহা-পিতলকে একটু সবুর করলে সোনা বানিয়ে দিতে পারে। শুধু তাই নয়, তুকতাক করে যে 'ভুয়ো ডাক্তার' প্লেগের মতো নানা জটিল রোগ সারাতেও ওস্তাদ। আর ডলকে সাজানো হল পবিত্রতার প্রতিমূর্তি 'ফেয়ারি কুইন' হিসেবে, কাজ হাসিল করতে 'অলৌকিকতা' যার বড় ফন্দি। সমাজে লোভী আছে বলেই না ঠগের রমরমা। তাই ওদের খপ্পরে প্রথম 'মুরগি' হিসেবে উদয় হল আইনের কেরানি ড্যাপার। তাস-পাশা আর জুয়ার আড্ডায় ‘পরী’র প্রভাবে নিজের জিত নিশ্চিত করে এক লহমায় বড়লোক হবার খোয়াবে যে মশগুল। ওই ভিনিগারের বুজরুকি দিয়ে ড্যাপারকে ভজিয়ে ফেলেছিল সাটলই। বিনিময়ে লাভের মোটা বখরা দিতে ড্যাপারও রাজি। ফেসের কাজটা ছিল নিত্যনতুন 'মুরগি' ধরা আর ডলকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে সাটলের কাজ ছিল চতুর ভাবে বেমালুম ঢপ দিয়ে খদ্দের পটানো। শুধু ড্যাপার কেন, তামাক-ব্যবসায়ী ড্রাগারকে বোঝানো হল,দক্ষিণ-দুয়ারি দোকান হলে আর চৌকাঠে একটা চুম্বক রাখলে তার ব্যবসা উঠবে ফুলে ফেঁপে। বিরল নক্ষত্রের প্রভাবে তার জন্ম। তাই তার বরাতে নাচছে পরশপাথর। যা ছোঁয়ালে সব সোনা। আর পরশপাথর ধোয়া জল খেলে অনন্ত যৌবন। তা এইসব ফন্দি-ফিকির করে প্রতারণা-চক্র ভালোই চলছিল। সংসারি সাধারণ মানুষই শুধু নয়, ধর্মীয় যাজক-টাজকও লোভের টানে এসে হাজির। এরই মধ্যে আবার এক খদ্দেরের ধূর্ত স্যাঙাত সার্লি ঠগদের জোচ্চুরি ধরে ফেলে আর কি! সে যাত্রা বাঁচলেও হঠাৎ একদিন খোদ বাড়ির মালিক ফিরে এসে সব কান্ডকারখানা দেখে বমাল ধরে ফেললেন দুষ্টচক্রকে। সে এক কেলেঙ্কারি কান্ড। সমাজের এই সীমাহীন লোভ, ধর্মীয় ভণ্ডামি আর ঠগদের মুখোশ খুলে দিতে তীব্র স্যাটায়ার-ধর্মী নাটক, 'দ্য অ্যালকেমিস্ট' লিখেছিলেন শেক্সপিয়ারের সমসাময়িক বেন জনসন।

    জনসন যখন 'দ্য অ্যালকেমিস্ট' বা তার আগে ও পরে 'ভলপোনে' ও 'বার্থোলোমিউ ফেয়ার' নামে আরও দুটি কমেডি রচনা করেন সেই সময়ে সামাজিক পট পরিবর্তন ঘটে চলছিল খুব দ্রুত। লন্ডন হয়ে উঠছিল সমগ্র ইউরোপের বাণিজ্যিক রাজধানী। বিপুল বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক উদ্যোগের জোয়ারে আর মওকা বুঝে জলদি লাভের তাড়নায় ফাটকার প্রাবল্যে কেউ রাতারাতি হয়ে উঠছিল ধনকুবের আর কেউ সর্বস্ব বাজি রাখতে গিয়ে পথের ভিখিরি। সেই প্রথম 'ভেঞ্চার' শব্দটা হয়ে উঠল খুব গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্যে পৌঁছোবার জন্যে প্রয়োজনীয় পথকে পাশ কাটিয়ে স্রেফ শর্টকাটে কী করে মুনাফা হাসিল করা যায় ব্যঙ্গার্থে তারই যেন প্রতিশব্দ হিসেবে পরিচিতি পেল 'ভেঞ্চার'। বুঝতে অসুবিধে নেই, ব্যবসায়িক উদ্যোগের সবটাই যে সৎ পথে হচ্ছিল তা মোটেই নয়। যাবতীয় নীতিবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে বিলেতের মানুষ তখন নিত্যনতুন সম্ভাবনার হাতছানিতে ছুটতে শুরু করেছে ভোগের পিছনে। সুতরাং অর্থের ঝনঝনানির সঙ্গেই অবধারিত ভাবে রমরমিয়ে বেড়ে চলছিল ক্ষমতার লিপ্সা আর যৌনতার লালসা। সমাজ আর মনুষ্য-চরিত্রের সেই সব দুর্নীতি, লোভ, লালসাকে নির্মম ভাবে ক্যারিকেচার করা হয়েছে এই তিনটি নাটকে। মঞ্চের দর্শক আর নাটকের পাঠক সমাজের বিচ্যুতির এমন রূপায়ণ দেখে হেসেছেন, আমোদিত হয়েছেন। আবার নাটকের প্রতিটি দৃশ্য ও সংলাপ থেকে ছলকে পড়া হাস্যরস ভাবনার গভীর খোরাকও জুগিয়েছে। 'ভলপোনে' নাটকে ভেনিসের দুর্নীতিগ্রস্ত আদালত ঠগ এবং যারা দুর্নীতির শিকার উভয়কেই একেবারে বর্বর সাজা দিয়েছিল। আবার 'বার্থোলোমিউ ফেয়ার' নাটকে 'বিচক্ষণ' বিচারক অ্যাডাম ওভারডু তো প্রতারক ও প্রতারিত উভয়কেই নিজের বাড়িতে এক ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। নিজে নিজে ছদ্মবেশে সকলের আচার-আচরণের ওপর নজর রাখছিলেন। উদ্দেশ্যটা ছিল চরিত্রের দৃঢ়তা ও দুর্বলতা নির্বিশেষে মানবতার উদযাপন। তবে 'দ্য অ্যালকেমিস্ট' নাটকে যে মুন্সিয়ানায় লোভকে কাঁটাছেঁড়া করে দেখানো হয়েছে তার জুড়ি মেলা ভার। যে সত্যটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই সেই অনিবার্য বার্তাটি বলা হয়েছে একদম সরল ভাষায় -- সকলেই যদি ঠগ হয় তাহলে আখেরে ঠকতে হবে প্রত্যেককেই।

    আমাদের দেশে এখনকার ভোগবাদ-তাড়িত মূল্যবোধহীন সমাজের সঙ্গে তখনকার ইউরোপীয় সমাজের বেজায় মিল। আজ এই করোনা অতিমারীর সময় জাল কোভিড ভ্যাকসিন, জাল স্যানিটাইজার, ইমিউনিটি বাড়ানোর বুজরুকি -- এসব যত দেখছি তত মনে পড়ে যাচ্ছে বেন জনসনের কথা। ১৬১০ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হওয়া যাঁর এই নাটকটির প্রাসঙ্গিকতা আজ চারশ বছর পরেও বড় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটা সময় কলকাতার রঙ্গমঞ্চে সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিচ্যুতিকে কষাঘাত করে মঞ্চস্থ হয়েছে কত বলিষ্ঠ নাটক। সামাজিক ও রাজনৈতিক ভণ্ডামি, ধর্মীয় প্রহসন, মানুষের লোভ, লালসা, দুর্নীতি, প্রতারণা, সমাজের অসঙ্গতিগুলি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার জন্যে আমাদের এই বঙ্গেও তো ছিলেন হুতোম, টেকচাঁদ ঠাকুর, রূপচাঁদপক্ষী, পরে সজনীকান্ত দাস, 'অচলপত্রে'র দীপ্তেন সান্যাল, রূপদর্শী/গৌড়ানন্দ কবি। আর এই করোনার আবহে চিকিৎসা, অক্সিজেন সঙ্কট, জীবনদায়ী ওষুধ নিয়ে কালোবাজারি, কোটরগত মানুষের অসামাজিকতা, অসহায়তা আর টিকা নিয়ে ঠগবাজি, জীবিকা-খোয়ানোর মতো বিষয়গুলি নিয়ে কালজয়ী সাহিত্য বা চলচ্চিত্র কি সৃষ্টি হবে না?

     

  • বিভাগ : ব্লগ | ২৮ জুন ২০২১ | ৯২৮ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন