বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • অচিন্ত্য শিউলির সাফল্য মনে করিয়ে দেয় বাংলার বিস্মৃত পালোয়ানদের   

    Dipankar Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১২ আগস্ট ২০২২ | ২৩৭ বার পঠিত
  • আলোকনাথ বন্ধুদের আসরে বসে বর্ষার গান শুনছিল। এমন সময় শুরু হল প্রবল ঝড়বৃষ্টি। বন্ধু বিমলের মায়ের নিজে হাতে ভাজা অমৃতসম লুচির প্রলোভন ত্যাগ করে মাথায় বৃষ্টি নিয়ে তাকে ঘোর সন্ধ্যার অন্ধকারে বেরিয়ে পড়তে হল। কারণ, তার হঠাৎ মনে পড়েছে, তেতলায় পড়বার ঘরের জানালাগুলি সব খুলে রেখে এসেছে। অবিলম্বে বাড়িতে না ফিরলে এই ঝড়-জলে ঘরময় ছড়ানো মূল্যবান বইপত্র ও দরকারি কাগজপত্রের দফারফা হবে।  বিমলের দুর্ভাবনা হল, এমন জলে ভিজে আলোর যদি অসুখ করে! তখন অন্য বন্ধুরা সমস্বরে তার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়। নরেশ বলে, "ও লোহার দেহে কোন অসুখই দাঁত বসাতে পারে না।" আলোর পেটানো শরীরের রহস্য অবশ্য জানা যায় বিপিনের কথায়, "ও কি কম চেষ্টায় নিজের দেহকে গড়েছে! এখনও রোজ কুস্তি লড়ে, পাঁচশ ডন, হাজার বৈঠক দেয়, চার মণ ওজনের বারবেল তোলে!" ১৯৩৪ সালে লেখা একটি উপন্যাসের শুরুতে নায়কের ভূমিকায় 'বঙ্গ ব্যায়ামাগারে'র প্রতিষ্ঠাতা আলোকনাথ সেনের চরিত্র ঠিক এভাবেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। "পায়ের ধূলো" নামে উপন্যাসটি লিখেছিলেন "আবার যকের ধন"-খ্যাত হেমেন্দ্র কুমার রায়।
              

    শরীরচর্চা ও ব্যায়ামের অন্যতম পথিকৃৎ প্রিয়নাথ বসু। ইউরোপিয়ানদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সম্পূর্ণ বাঙালি দল নিয়ে তিনিই গড়ে তোলেন গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস।

    বার্মিংহামে সদ্য কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়ন অচিন্ত্য শিউলি, তাঁর দাদা অলোক বা আট বছর আগে গ্লাসগো কমনওয়েলথে আর এক সোনাজয়ী সুখেন দে-র রোমাঞ্চকর কাহিনীর সূত্রেই  আজ থেকে ৮৮ বছর আগে লেখা হেমেন রায়ের এই রচনার কথা মনে পড়ে যায়। উপন্যাসের নায়ক আলোকনাথের মতো চরিত্র কিন্তু মোটেও কাল্পনিক নয়। বাংলা ও বাঙালির অবক্ষয় এখন সর্বস্তরে।  তবু তারই মধ্যে কেউ কেউ নেহাত ব্যতিক্রম হিসেবে নিজের উদ্যমে সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অচিন্ত্য বা সুখেনের মতো দেশের পতাকা সবার উঁচুতে তুলে ধরে প্রচারের আলোয় উঠে আসেন। আমাদের তখন স্মরণ করা দরকার, একদা বাংলার ঘরে ঘরে দেশ বিদেশ কাঁপিয়ে দেওয়া এমন পালোয়ানের কোনও অভাব ছিল না। সাহসে, বীর্য্যে, সহ্য ক্ষমতায় ও আত্মরক্ষার শক্তিতে বাঙালি যুবকদের বাহুবলে বলীয়ান করে তুলতে পাড়ায় পাড়ায় তখন 'বঙ্গ ব্যায়ামাগারে'র মতো জিমন্যাস্টিক ও কুস্তির আখড়া গড়ে উঠেছিল। 
     
    ইংরেজ আমলের গোড়ার দিকে শৌর্য ও বাহুবলে বাঙালি ব্রিটিশদের নজর কেড়েছিল। বঙ্গভঙ্গ ঘটিয়ে কার্জনের ফিরে যাবার পর বড়লাট হয়ে যিনি আসেন সেই লর্ড মিন্টোর পিতামহ বাঙালির দেহের সৌষ্ঠবের তারিফ করে লিখেছিলেন -- "I never saw so handsome race. They are much superior to the Madras people. These are muscular, athletic figures, perfectly shaped.”  বাংলার ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, শারীরিক বলে বাঙালি কোনদিন দুর্বল ছিল না।  নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর এবং ইংরেজ শাসনক্ষমতা দখলের আগে দেওয়ানি আমলে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।  তখন আত্মরক্ষার জন্যে সাধারণ মানুষকে নিজস্ব বাহুবল সম্বল করেই বাঁচতে হয়েছে।  সেকালে বাংলার ধনবান জমিদারদের আত্মরক্ষা, নারীর সম্ভ্রম রক্ষা, ধনসম্পদ রক্ষার জন্যে একদল করে লাঠিয়াল থাকত।  দস্যুবৃত্তির জন্যেও লাঠি ছিল সম্বল।  পাইক, বরকন্দাজ ছিল জমিদারদের লেঠেল বাহিনীর বিভিন্ন পদ।  আইন আদালতের বড় তোয়াক্কা ছিল না।  বিবাদ-বিসম্বাদ মীমাংসা হত লাঠির জোরে।  পরবর্তীকালে বঙ্কিম অবশ্য লিখেছিলেন, "হায় লাঠি, তোমার দিন গিয়াছে।" তবে তার আগে জমিদারের লেঠেলদের কেউ কেউ বীরত্ব ও পারদর্শিতার জন্যে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিক্রমপুরের চাঁদরা গ্রামে রঘুরাম রায় নামে এক রাজা ছিলেন।  তাঁর সেনাপতি রাম মালিক লাঠি চালনায় এমনই দক্ষ ছিলেন যে তাঁর নামে লোকমুখে প্রচলিত গান ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে --
    "রাম মালিকের লাঠি।
    রঘু রামের মাটি।।
    উঠলে লাঠির ডাক।
    দৌড়ে পালায় বাঘ।।
    গুলি ফিরে ঝাঁকে।
    রামের লাঠির পাকে।।
    মালিক ধরে লাঠি।
    যম যেন সে খাঁটি।।" 
    জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মনমোহন বসুর উদ্যোগে গড়ে ওঠে হিন্দুমেলা। সঙ্গীতে, ভাষণে, নানা প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশাত্মবোধের ভাব প্রথম জাগিয়ে তুলেছিল হিন্দুমেলা।  এই মেলারই সম্পাদক নবগোপাল মিত্রের উৎসাহ ও চেষ্টায় তখন প্রধানত কলকাতায় ব্যায়ামশালা গড়ে তোলা ও শরীর গঠনে সাড়া পড়ে যায়। 


    কলকাতায় মার্কিন আবেল সাহেব এবং তাঁর বিখ্যাত সার্কাসের ঘোড়া। 

    সেই সময় বিভিন্ন বিদ্যালয়ে নিয়োগ করা হয়েছিল জিমন্যাস্টিকের শিক্ষক।  শরীরচর্চা ছিল বাধ্যতামূলক। এমনই একজন ছিলেন জিমন্যাস্টিক শিক্ষক অখিলচন্দ্র চন্দ্র।  পরে তিনি স্থানীয় এলাকার জিমন্যাস্টিক আখড়ার অধ্যক্ষ হন।  হিন্দু ও হেয়ার স্কুলে জিমন্যাস্টিকের শিক্ষক ছিলেন দুই বৈমাত্রেয় ভাই রাজেন্দ্রনাথ ও যোগেন্দ্রনাথ সিংহ।  শিক্ষকরা যেমন ছিলেন নিষ্ঠাবান তেমনই ছাত্ররাও হয়ে উঠতেন সেরা।  রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ ভ্রাতা জিতেন্দ্রনাথ অসাধারণ বলশালী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন যখন তিনি জাতীয় সভা প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের ছাত্র।  এই ব্যায়ামচর্চার সূচনা থেকেই আবার বাঙালির সার্কাস গঠনেরও প্রয়াস শুরু হয়েছিল। মনমোহন বসুরই কনিষ্ঠ পুত্র প্রিয়নাথ বসুর প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত 'প্রফেসর বোসের সার্কাস' ছিল হিন্দুমেলা ও জাতীয় সভার প্রভাবের ফল। কৈশোরে নরেন্দ্রনাথ দত্ত সিমুলিয়ার ওই প্রিয়নাথ বসুর আখড়াতেই ব্যায়াম করতেন।  মসজিদবাড়ির অম্বু গুহের আখড়াতেও তাঁর যাতায়াত ছিল বলে জানা যায়।  জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথ এবং অম্বু গুহ সেকালের নামজাদা পালোয়ান ছিলেন।  হীরা সিং নামে এক শিখ ব্যায়ামবীর তাঁদের দুজনেরই ওস্তাদ ছিলেন।  তলোয়ার, গৎকা, কুস্তি, জিমন্যাস্টিক সহ নানারকম শারীরিক কসরতে তিনি ছিলেন সেরা।  তাঁর মুগুরের ওজন এমনই ছিল যে অনেক হিন্দুস্থানি পালোয়ানও তা ওঠাতে পারতেন না। ঠাকুরবাড়িতে সঙ্গীতচর্চার পাশাপাশি শরীরচর্চার আয়োজনের হদিস আমরা পাই রবীন্দ্রনাথের 'জীবনস্মৃতি'তে -- "ভোরে অন্ধকার থাকিতে উঠিয়া লংটি পরিয়া প্রথমেই এক কানা পালোয়ানের সঙ্গে কুস্তি করিতে হইত।  তাহার পরে সেই মাটিমাখা শরীরের উপরে জামা পরিয়া পদার্থবিদ্যা, মেঘনাদবধকাব্য, জ্যামিতি, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল শিখিতে হইত।  স্কুল হইতে ফিরিয়া আসিলেই ড্রয়িং এবং জিমন্যাস্টিকের মাস্টার আমাদিগকে লইয়া পড়িতেন।" জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্মৃতিকথাতেও জানা যায়, সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথের কাছেই তাঁকে মুগুরভাঁজা ও ডন-বৈঠক সহ অনেকরকম ব্যায়াম অভ্যাস করতে হত। রবীন্দ্রনাথ বা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের যে নান্দনিক ছবির সঙ্গে আমরা পরিচিত তাতে কল্পনা করাও কষ্টকর যে তাঁরাই ছোটবেলায় পালোয়ানের সঙ্গে কুস্তি লড়ছেন। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নি সরলাদেবী চৌধুরানী ১৯০২ সালে তাঁর পারিবারিক বসতবাড়িতে একটি মার্শাল আর্ট অ্যাকাডেমি খুলেছিলেন।  তাঁর আত্মজীবনী থেকে যান যায়, কিংবদন্তি বাঙালি নায়ক প্রতাপাদিত্য চরিত্রকে স্মরণীয় করে রাখতে কিভাবে তিনি উৎসব আয়োজন করেছিলেন। স্বদেশী আন্দোলনে এই সব কাজের মাধ্যমে
    তিনি বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।

      
    ১৯০৩ সালের ১২ মার্চ হায়দরাবাদের নিজামের উদ্যানে আবেল সাহেবের গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাস।  সেখানে বিশেষ আকর্ষণ ছিল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের খাঁচায় প্রিয়নাথ বসুর প্রবেশ। 

    নবগোপাল মিত্রের ব্যায়ামশালা গঠনের পরে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য গৌরমোহন মুখোপাধ্যায়ের ব্যায়ামাগার।  তিনি পেশায় ছিলেন অ্যাটর্নি। বেনিয়াটোলার বটকৃষ্ণ দত্তের আখড়ায় গৌরমোহন কুস্তি ও জিমন্যাস্টিক অনুশীলন করেছিলেন।  ক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন নামি কুস্তিগীর ও লাঠি খেলোয়াড়।  বহু বড় পালোয়ানকে তিনি পরাজিত করেছিলেন।  ব্যায়ামচর্চার প্রসারে আহিরীটোলা সহ কলকাতার নানা এলাকায় এবং কলকাতার বাইরেও অনেকগুলি আখড়া গড়ে তোলেন।  সেই সময় তাঁর নামে ও তত্ত্বাবধানে এত ব্যায়ামশালা গড়ে উঠেছিল যে তার সবগুলিতে তাঁর নিজের শিক্ষকতা করা সম্ভব ছিল না।  তিনি তখন তাঁর কয়েকজন উপযুক্ত ছাত্রকে শিক্ষকতার ভার দিয়ে ব্যায়ামশালাগুলি ভাগ করে দিয়েছিলেন।  তাঁর প্রিয় ছাত্র প্রিয়নাথ বসুর ওপরেও ছিল এমন শিক্ষকতার দায়িত্ব।  জমিদার অবিনাশচন্দ্র ঘোষও একজন পালোয়ান ছিলেন।  তিনি হিন্দুমেলায় ১০ জন পাঞ্জাবি জাঠ ও পাঠান কুস্তিগীরকে পরপর কুপোকাত করে দিয়ে ১০টি মেডেল জিতেছিলেন।  আহিরীটোলার ডালপট্টিতে তাঁর পরিত্যক্ত বসতবাড়িই ছিল গৌরমোহন ও তাঁর সহযোগীদের তীর, ধনুক, লাঠিচালনার অনুশীলন কেন্দ্র।  সিমলা স্ট্রিট থেকে মধ্যে কলকাতার নেবুতলা পর্যন্ত প্রায় গোটা পঞ্চাশেক আখড়ায় প্রিয়নাথ নিজে ছাত্রদের ব্যায়াম শিক্ষা দিতেন। তাছাড়া আগরপাড়া, পানিহাটি এবং নিজের জন্মস্থান জাগুলিয়াতেও তিনি অনেকগুলি আখড়া গড়ে তুলেছিলেন। শরীরচর্চার শিক্ষার্থীদের জন্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা ছিল অত্যন্ত কড়া।  ধূমপান বা নস্যির নেশা ছিল নিষিদ্ধ। ব্যায়াম ছাড়াও এলাকায় সাফাই অভিযান সহ নানা সামাজিক দায়িত্ব পালনে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতেন প্রিয়নাথ। বাঙালিদের মধ্যে তিনিই প্রথম পিরামিড  ও জাগলিং অ্যাক্টে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।  তাছাড়া প্যারালেল ও হোরাইজন্টাল বার এবং অশ্বারোহন ইত্যাদিতেও প্রচন্ড দক্ষ ছিলেন। 


    ১৯১৫ সালে কলকাতায় মিসেস হার্মস্টোন।  [আর্টস সেন্টার মেলবোর্নের সৌজন্যে] 

    হিন্দুমেলার প্রভাবেই ওই সময় 'ন্যাশনাল' কথাটির খুব প্রচলন ঘটে।  নবগোপাল মিত্র স্থাপন করেন ন্যাশনাল জিমন্যাস্টিক ক্লাব।  অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল থিয়েটার।  কালীপ্রসন্ন দে প্রকাশ করতে শুরু করেন ন্যাশনাল ম্যাগাজিন। এরপরই সাধারণ জিমন্যাস্টিকের আখড়া থেকে প্রিয়নাথ গড়ে তোলেন বিশ্ববিখ্যাত 'বোসেস সার্কাস'। Harmston, Fietzarts ইত্যাদি উচ্চাঙ্গের ইউরোপিয়ান সার্কাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এবং সমানে সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একদিকে যেমন জাতীয়তাবোধ এবং আত্মমর্যাদার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন রেখেছেন তেমনই বিপুল অর্থও উপার্জন করেছেন। অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে লন্ডন ও প্যারিসে আধুনিক এই সব সার্কাস কোম্পানির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।  ঔপনিবেশিক আমলে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় শিল্পোন্নয়নের ঢেউ এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রসারে ইউরোপীয় সার্কাস চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে। আর বলা বাহুল্য, ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায় ইংরেজ সাহেব-মেমসাহেব এবং ভারতীয় রাজা-মহারাজা ও জমিদারদের মনোরঞ্জনের জন্যে বিখ্যাত সব সার্কাসের শো ছিল নিয়মিত ব্যাপার। তখন কলকাতায় Wilson’s Great World Circus এবং Chirany’s Circus-ও খুব জনপ্রিয় ছিল।  এই সব সার্কাসে বিভিন্ন খেলা ও কসরত প্রিয়নাথ অত্যন্ত মনযোগের সঙ্গে দেখতেন। সরকারি আর্ট স্কুলের ছাত্রাবস্থায় তাঁর ছবি আঁকার অভ্যাস ছিল। সার্কাসের খেলার বেশ কিছু অঙ্গভঙ্গি ও সরঞ্জামের ছবি তিনি এঁকে ফেলতেন।  আর তখনই সঙ্কল্প করেন, বাঙালি যে কোনও অংশে ইউরোপিয়ানদের চেয়ে কম নয়, বাঙালি যে সাহসে, বীর্যে, শারীরিক বলে বলীয়ান তা প্রমাণ করার জন্যে তিনি নিজেই সার্কাস দল গড়বেন।  অবশেষে বাবা-মায়ের যাবতীয় আপত্তি উপেক্ষা করে বাঙালিকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে তিনি এগিয়ে চললেন। পরিবারের মহিলাদের কাছ থেকে কিছু অর্থ সংগ্রহ করে তিনি ১৮৮৭ সালে প্রফেসর বোসেস গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস প্রতিষ্ঠা করেন।  তাঁর নামের আগে 'প্রফেসর' জুড়ে যাওয়ার পিছনেও এক গল্প আছে। নিজস্ব সার্কাস গড়ার বছর দুয়েক আগে প্রিয়নাথের জিমন্যাস্টিক কৌশল ও অন্যান্য শারীরিক কসরত দেখে বড়লাট লর্ড ডাফরিন চমৎকৃত হয়ে তাঁকে 'প্রফেসর' বলে স্বীকৃতি দেন। প্রিয়নাথের সার্কাসে তাঁর পিতৃবন্ধু ও প্রতিবেশী বিশিষ্ট পুস্তক ব্যবসায়ী গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ও নিয়মিত বেশ কিছু অর্থ এবং উৎসাহ জুগিয়ে সাহায্য করেছিলেন। ওই সময়ে নবগোপাল মিত্রও তাঁর ব্যায়ামশালার কয়েকজন ছাত্র এবং কয়েকটি ঘোড়া নিয়ে ন্যাশনাল সার্কাস তৈরি করেছিলেন। তিনি প্রিয়নাথের আখড়া থেকে মাঝে মধ্যেই ছাত্র চেয়ে আনতেন খেলা দেখানোর জন্যে।  ওই সময়ে শরীরচর্চা এবং সার্কাস একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠল। কুস্তি, ব্যায়াম বা জিমন্যাস্টিক, ভারোত্তোলন, সাঁতার, অশ্বারোহণ, পদব্রজে ভ্রমণ, লাঠিখেলা, অসিচালনা, মুষ্টিযুদ্ধ, সাইক্লিং, ধনুর্বিদ্যা, শিকার, সার্কাস, অসম সাহসিকতা (ডেয়ারিং ফিট), লোহার গোলা নিক্ষেপ, পেশী সঙ্কোচন, কপাটি, অ্যাথলেটিক, টাগ অব ওয়ার সহ বিবিধ কসরত ছিল সেকালে শরীরচর্চার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রিয়নাথের গুরু গৌরমোহন অবশ্য সার্কাসে অংশগ্রহণ করে ব্যায়াম অনুশীলনের বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধী ছিলেন।  সেই কারণে গুরু-শিষ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। তবে তাতে প্রিয়নাথের সার্কাসের জয়যাত্রা থেমে থাকেনি। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই নবগোপালের ঘোড়া এবং কিছু আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কিনে নিয়েছিলেন।

    এরপর থেকে 'বোসেস সার্কাস' দেশের বিভিন্ন শহরে, রাজ দরবারে এবং বিদেশে শো আয়োজনের মাধ্যমে বিপুল খ্যাতি অর্জন করে।  ১৮৮৮ সালে রংপুরে তাজহাটে দরবার উপলক্ষে খেলা দেখানোর পর রাজা গোবিন্দলাল রায় এত খুশি হয়েছিলেন যে নির্ধারিত পারিশ্রমিক ছাড়াও দলের প্রধান প্রধান ব্যক্তিকে ২৫ জোড়া শাল উপহার দিয়েছিলেন।  এছাড়া ত্রিপুরা, কাশ্মীর, কাশী, ঝালওয়ার ও ময়মনসিংহের মহারাজা সহ অনেকে প্রিয়নাথকে একাধিকবার হাতি ও বাঘ উপহার দিয়েছিলেন।  নিজের সার্কাস গঠনের আগে ইউরোপিয়ান সার্কাসে প্রিয়নাথের হাতে গড়া শিষ্য পবনচাঁদের ট্রাপিজ খেলা দেখে ব্রিটিশ Colonel Fendal Currie লিখেছিলেন, "I have never seen anything better in England than Bir Pavanchand on the High Trapeze.” বাল্য সখা প্রিয়নাথের প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক দক্ষতার প্রশংসা করে স্বামী বিবেকানন্দ পরে বলেছিলেন, “He was doing greater work than perhaps any Bengalee worker in setting an example in organisation and providing Bengalee nerve and pluck.” অসম সাহসী যুবকেরা ছাড়াও 'বোসেস সার্কাসে' ছিলেন এক বাঙালি তরুণী সুশীলাসুন্দরী। খাঁচায় ঢুকে জোড়া বাঘ নিয়ে তিনি খেলা দেখাতেন।  হিংস্র বাঘের সঙ্গে খেলায় সুশীলাসুন্দরী ছিলেন সারা দেশে প্রথম মহিলা খিলাড়ি।  এমনকি কোনও বিদেশি রমণীও তার আগে ভারতে এমন সাহসিকতাপূর্ণ খেলা দেখাননি।  ব্রিটিশ আমলে 'দ্য ইংলিশম্যান' সহ সব কাগজে 'শার্দুলসুন্দরী'র প্রশংসায় বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। বিখ্যাত মার্কিন সার্কাস খেলোয়াড় S. O. Abel ছিলেন উইলসন সার্কাসে হস্তি প্রশিক্ষক ।  তিনি এক সময় উইলসন সার্কাস ছেড়ে আরও কয়েকজন ইউরোপিয়ান খেলোয়াড়কে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় এসে থিয়েটারে থিয়েটারে বা জমিদারদের বাড়িতে গিয়ে খেলা দেখিয়ে রোজগার করতেন। ন্যাশনাল সার্কাসের নবগোপাল মিত্রের জামাতা হিন্দু স্কুলের ব্যায়াম শিক্ষক রাজেন্দ্রলাল সিংহ, হুগলি কলেজের শ্যামাচরণ ঘোষ, জাতীয় বিদ্যালয়ের দীননাথ ঘোষ এবং কাঁসারিপাড়ার ব্যায়াম শিক্ষক যোগীন্দ্রনাথ পাল প্রমুখ কয়েকজন জনগণের থেকে চাঁদা তুলে মার্কিন সাহেব আবেলকে নিজেদের দলে জুটিয়ে রাজাবাজার অঞ্চলে গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস খোলেন। চালা বেঁধে এই সার্কাস দেখানো হত।  এর কয়েকমাস পরে রাজা রামমোহন রায়ের পৌত্র হরিমোহন রায়ের সার্কাস করার শখ হল।  তিনি তখন গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস কিনে নেন এবং সার্কাস চলে আসে তাঁর আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়ি সংলগ্ন পশুশালার প্রাঙ্গনে।  সেখানে খেলা দেখিয়ে 'হরিমোহন রায়ের দল' বিশেষ প্রসিদ্ধি পায়।  তার কিছুদিন পরে আবেল সাহেব চট্টগ্রামে গিয়ে Olman নামে এক জার্মানের সঙ্গে জোট বেঁধে Abel Klaer Olman Circus চালু করেন।  সেই দল নিয়ে প্রায় সারা বিশ্বে ঘুরেছেন।  আবেলের দলে ছিলেন গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের খগেন্দ্রলাল সিংহ ও ভূতনাথ বসু সহ বেশ কয়েকজন বিখ্যাত বাঙালি খেলোয়াড়। খগেন্দ্রলাল দুর্দান্ত অশ্বারোহী ছিলেন।  অস্ট্রেলিয়ায় সার্কাস শো চলাকালীন  খগেন্দ্রলালের তরফে আবেল অশ্বারোহণ প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলীয় পারদর্শীদের আহ্বান জানান।  কিন্তু বাঙালির পক্ষে বিরাট গর্বের বিষয় হল যে খগেন্দ্রলালকে কেউ হারাতে পারেনি। হরিমোহনের দলের আর এক সাহেব খেলোয়াড় হ্যারিংটনকে নিয়ে আবেল নতুন সার্কাসের প্রস্তাবের কথা প্রথমে বলেছিলেন কৃষ্ণলাল বসাককে। সার্কাসের মাধ্যমে যাঁরা বিশ্ববাসীর কাছে বাঙালির বলিষ্ঠতা ও ব্যায়াম কৌশলের পরিচয় দিয়েছেন কৃষ্ণলাল তাঁদের অন্যতম।  তিনি ছিলেন কলকাতার প্রসিদ্ধ ধনী শোভারাম বসাকের বংশধর।  বনেদি বসাক পরিবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য বিস্তারে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল।  কৃষ্ণলাল যদুপন্ডিতের বঙ্গবিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং সেখানে জিমন্যাস্টিকের শিক্ষক হিসেবে পান নরেন্দ্রনাথ দত্তের বাল্যবন্ধু বৈষ্ণবচরণ বসাককে।  বৈষ্ণবচরণের কাছে তিনি হোরাইজন্টাল ও প্যারালেল বারের অনেক খেলা শেখেন। আবেল সাহেবের সার্কাসে কৃষ্ণলাল চট্টগ্রাম, রেঙ্গুন, পেনাং, সিঙ্গাপুর সহ বিদেশের বিভিন্ন শহরে খেলা দেখিয়ে এক বছর পরে কলকাতায় ফেরেন।  তখন গড়ের মাঠে তাঁবু খাটিয়ে এক মাস ধরে চলেছিল সার্কাস।  এরপরে আবার তিনি বিদেশে যান এবং হংকংয়ে গিয়ে দল ছেড়ে এক চলে আসেন সিঙ্গাপুরে।  সেখানে অস্ট্রেলিয়ান উডইয়ারের সার্কাসে সাড়ে তিন বছর কাটিয়ে ১৮৯২ সালে যোগ দেন হার্মস্টোন সার্কাসে। বছর ছয়েক বাদে চলে আসেন ওয়ারেন সার্কাসে।  সেখানে এক বছর খেলা দেখিয়ে ফিরে আসেন কলকাতায়।  তিন মাস পরে প্যারিস প্রদর্শনীতে যাবার আমন্ত্রণ পান।  এলাহাবাদে পন্ডিত মতিলাল নেহরুর উদ্যোগে ভারতীয় শিল্পীদের প্যারিসে পাঠানোর বন্দোবস্ত হয় এবং সেই দলের ম্যানেজার করা হয় কৃষ্ণলালকে। প্রায় ৬০-৭০ জনের দলটিতে অ্যাক্রোব্যাট, জিমন্যাস্ট, পালোয়ান, বাজিকর, জাদুকর, চিত্রকর, হালুইকর, বাঈজি, সেতারি, তবলচি সব ছিলেন। ১৯০০ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি কলকাতায় ফেরেন এবং গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাস ও তার তিন-চার বছর পরে হিপোড্রোম সার্কাস গড়ে তোলেন।  বাঙালি এক পরিচালকের নেতৃত্বে সেই সার্কাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড় যোগ দিয়েছিলেন।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে তা বন্ধ হয়ে যায়।


    ১৯o৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলকাতায় বড়লাট লর্ড মিন্টো এবং লেডি মিন্টোর সম্মানে হাৰ্মস্টোন সার্কাসের বিজ্ঞাপন।

    সার্কাসের নামী খেলোয়াড়রা সকলেই ছিলেন বাংলার ব্যায়ামাগারগুলির ফসল। বাঙালির মধ্যে এই শরীরচর্চার অন্যতম প্রচারক ছিলেন অতীন্দ্রনাথ বসু যিনি নিজে ভালো কুস্তি লড়তেন এবং বাঙালি তরুণেরা যাতে বলিষ্ঠ হয় সেজন্যে বহু অর্থ ব্যয় করতেন।  তাঁর কুস্তির গুরু ছিলেন মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা জগৎকিশোর আচার্য চৌধুরি। আবার ভীমভবানী সহ অনেক নামজাদা কুস্তিগীর ছিলেন অতীন বসুর শিষ্য।  শরীর চর্চা, লাঠি খেলার আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিমলা ব্যায়াম সমিতি তিনিই গড়ে তুলেছিলেন।  তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র অমরেন্দ্র বাংলার অদ্বিতীয় লাঠিয়াল অতুলচন্দ্র ঘোষের শ্রেষ্ঠ শিষ্য ছিলেন।  স্বদেশী আমলে অনুশীলন সমিতির কলকাতা শাখায় প্রধান লাঠি শিক্ষক ছিলেন অমরেন্দ্র। এছাড়া ব্যায়ামাচার্য ডাক্তার শ্যামসুন্দর গোস্বামী ছিলেন গোস্বামী মেথড অব ট্রেনিং অ্যান্ড ট্রিটমেন্টের প্রবর্তক এবং নিখিল ভারত মল্লসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা। ডাক্তার গোস্বামী ছিলেন অমানুষিক শক্তির অধিকারী।  বুকের ওপর ছয় টন ওজনের রোলার এবং দুটি হাতির ভার আর তার সঙ্গে গলার ওপরে ৫০ কেজি ওজনের চাপ তিনি সহ্য করতে পারতেন।  দশ জন গোরা সৈন্য তাঁর গলায় কাছি বেঁধে দুইদিক থেকে টানলেও তাঁর কিছুই হত না। তিনি একসঙ্গে তিন প্যাকেট তাস ছিঁড়তে পারতেন।  প্রফেসর গোস্বামীর অবিশ্বাস্য শক্তি ও পান্ডিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে বারাণসী হিন্দু বিদ্যালয় তাঁকে ব্যায়াম-বিদ্যা-বাচস্পতি উপাধি দিয়েছিলেন।  আবার ত্রিপুরার জজ আদালতের সেরেস্তাদার শশীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র বিক্রমপুরের বন্দ্যঘটি বংশের শ্যামাকান্ত বিখ্যাত ব্যায়ামবীর হিসেবে অসাধারণ বল সঞ্চয় করেছিলেন।  ঢাকার কুস্তির আখড়ায় শিক্ষানবিশ হিসেবেই তিনি বহু নামজাদা পালোয়ানকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। পরে ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের প্রধান দেহরক্ষীর পদে তিনি দুই বছর নিযুক্ত ছিলেন।  অবশেষে সেই কাজ ছেড়ে তিনি সার্কাসে সম্পূর্ণ খোলা হাতে বাঘের খেলা দেখিয়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।  সেকালে কুক সাহেবের সার্কাসে মাসিক দেড় হাজার টাকা বেতনে কিছুদিন খেলা দেখান।  তাঁর সাহস ও শক্তির পরিচয় পেয়ে ভাওয়ালের রাজা তাঁকে দুটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার উপহার দিয়েছিলেন।  বাঘ-সিংহের খেলা দেখানো ছাড়াও তিনি বুকে বারো-চোদ্দ মণ ওজনের পাথর ভাঙতেন। কৈশোরেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে লন্ডনের সার্কাসে এবং পরে ব্রাজিলের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে স্বদেশী আমলে বাঙালি যুবকদের রোল মডেল হয়ে উঠেছিলেন নদিয়ার সুরেশ বিশ্বাসও। 


    কলকাতায় ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন ও লেডি ডাফরিনের সম্মানে আয়োজিত উইলসন সার্কাসের বিশেষ প্রদর্শনী। ছিল কোচবিহার মহারাজার নিজস্ব ব্যান্ড।

    কলকাতার দর্জিপাড়ার গুহ বংশ পরিচিত ছিল পালোয়ানের বংশ হিসেবে।  অম্বু গুহ তো ছিলেন ভারত শ্রেষ্ঠ কুস্তিগীর, আর সেই বংশেরই যতীন্দ্রমোহন গুহ ওরফে গোবর গুহ হয়ে ওঠেন দেশের গৌরব।  তেরো বছর বয়স থেকে তিনি কুস্তির প্রশিক্ষণ নেন।  বিদ্যাসাগরের স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে তিনি উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্যে বিলেতে যান।  তিনি শুধু যে একজন বড় পালোয়ান ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন নানা শাস্ত্রে সুপন্ডিত। গোবর একাধিকবার ইউরোপ বিজয়ে বের হয়েছিলেন।  ফিল লেন, জিমি ক্যাম্বেল প্রমুখ ডাকসাইটে পালোয়ানদের হারিয়ে স্কটল্যান্ড ও ব্রিটেনের চ্যাম্পিয়ন বলে ঘোষিত হন।  ১৯১৫ সালে তিনি দেশে ফেরেন।  আবার দু'বছর পরে আমন্ত্রণ আসে আমেরিকা থেকে।  বিস্তর ঝামেলার পর ১৯২০ সালে তিনি আমেরিকা পৌঁছন।  সেখানে তাঁকে প্রথম লড়তে হয় হল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ পালোয়ান টমি ডারাকের সঙ্গে। কিন্তু প্রতিযোগিতার রেফারি অন্যায় ভাবে ডারাককে জিতিয়ে দেন।  এরপর শিকাগো শহরে অজেয় পালোয়ান জো স্কালজের সঙ্গে কুস্তি লড়ে একুশ মিনিটের মধ্যে তাঁকে ধরাশায়ী করে দেন।  গোবর আমেরিকা প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিলেন এক বছরের জন্যে কিন্তু কুস্তির কৌশল ও বাহুবলের পরিচয় দিয়ে তিনি এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে তাঁকে সেখানে একটানা থেকে যেতে হয় সাত বছর।  ওই সময়ের মধ্যে তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ পালোয়ান স্ট্র্যাংলার লুইস, রাশিয়ার স্ট্যানিলাস জিসকো ও তাঁর ভাই ওয়ালডেক, তুরস্কের বিশাল বপু মহম্মদ জো চেস্টারের সঙ্গে লড়াই করেন।  দেশে ফিরে গোবর বাঙালি যুবকদের শরীর চর্চার উন্নতিতে বিরাট ভূমিকা পালন করেন।  তাঁর প্রশিক্ষণের বৈশিষ্ট্য ছিল যে ওই পদ্ধতিতে ব্যায়াম করলে শরীরে শক্তি বাড়ে কিন্তু একই সঙ্গে দেহের কমনীয়তাও বজায় থাকে, সাধারণ জিমন্যাস্টদের মতো পেশীবহুল কাঠখোট্টা চেহারা হয় না।  তাঁর শিষ্য সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় হাজার।  এই লেখা শেষ করার আগে মধুরেণ সমাপয়েতের ঢংয়ে উল্লেখ করতে হয় ভীম ভবানীর কথা।  আসল নাম ছিল ভবানীচরণ সাহা।  অনেকে তাঁকে ডাকত বাচকানী বলে।  তাঁর বাড়ি ছিল বিডন স্ট্রিটে।  আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ছিলেন সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রতিষ্ঠাতা অতীন বসুর শিষ্য।  ভবানী যখন সবে কুস্তিতে নাম করতে শুরু করেছেন তখন তাঁর ১৯ বছর বয়স।  ওই সময় প্রফেসর রামমূর্তির সার্কাসের দল আসে কলকাতায়। তাঁর তখন দেশজোড়া নামডাক।  রোজ রাতে খেলা দেখার জন্যে সার্কাসের তাঁবুতে গোটা শহর ভেঙে পড়ে। আর সকলের মতো সেই সার্কাসের প্রতি ভীম-ভবানীও প্রচন্ড আকৃষ্ট হলেন।  অবশেষে রামমূর্তির নজরে পড়ে গিয়ে পারস্পরিক আলাপের পর তিনি ওই সার্কাসে যোগ দিয়ে রেঙ্গুনে চলে যান।  বহু দেশ ঘুরে সার্কাসের অনেক ক্রীড়া কৌশল রপ্ত করে ভীম-ভবানী সকলকে তাক লাগিয়ে দেন।  তাঁর অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কাহিনী জানলে আজও সত্যিই আশ্চর্য হতে হয়।  তিনখানা মোটর গাড়ি টেনে ধরে রাখা, দুটি হাতি বুকে তোলা বা সাড়ে চার মণ বারবেল এক ঝটকায় মাথার ওপরে তোলা ছিল তাঁর কাছে তুচ্ছ ব্যাপার।  তিনি দাঁতে চেপে ঘোড়া ও ভারি রোলার তুলে ধরতেন।  কাঁধের চাপ দিয়ে মজবুত লোহার রড বাঁকিয়ে দিতেন।  বুকের ওপর একসঙ্গে দুই টন রোলারের ভার রাখতে পারতেন।  মোটা লোহার শিকল দিয়ে বাঁধলে বাঁটুল দি গ্রেটের মতোই বুক ফুলিয়ে ফুলের মালার মতো সেই শিকল পটাপট ছিঁড়ে ফেলতেন।  এসব ছাড়াও তিনি জানতেন কুস্তির অসাধারণ প্যাঁচ।  একবার জাভা সফরের সময় চ্যালেঞ্জে সাড়া দিয়ে এক ওলন্দাজ পালোয়ানকে দুই মিনিটে হারিয়ে দেন।  আর একবার সাংহাইয়ে এক মার্কিন পালোয়ানকে মোক্ষম প্যাঁচে কাত করে সেই যুগে হাজার ডলার বাজি জেতেন।  আর সাংহাইয়ের কনসালের নতুন মিনার্ভা মোটর গাড়ি টেনে থামিয়ে দিয়ে সেই গাড়িই পুরস্কার হিসেবে পেয়ে যান। কলকাতায় এক প্রদর্শনীতে তাঁর অবিশ্বাস্য সব খেলা দেখে চমৎকৃত লাটসাহেব ও গণ্যমান্য রাজা-মহারাজা তাঁকে 'ভীম-ভবানী' উপাধি দিয়েছিলেন।


    হাৰ্মস্টোন ও ফিটজেরাল্ড সার্কাসের অত্যন্ত জনপ্রিয় জোকার ছিলেন চার্লস ওয়েদারলি ওরফে পিপো দ্য ক্লাউন।  ১৯০৫ সালে তাঁর এই ছবিটি কলকাতায় তোলা। [পাওয়ারহাউজ মিউজিয়ামের সৌজন্যে]। একবার ফিটজেরাল্ড সার্কাসে থাকার সময় তাঁর ওপর দায়িত্ব পরে বর্মা থেকে দশটি  হাতি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার।  পথে কলকাতায় পৌঁছে তিনি ২০০ টি বাঁদর কেনেন।  বিরাট গোলমাল বাঁধে জাহাযে অস্ট্রেলিয়া রওয়ানা হওয়ার পর।  একটি হাতি কী করে বাঁদরের খাঁচা খুলে ফেলে।  সেখান থেকে ১০০ টি বাঁদর বেরিয়ে জাহাজ জুড়ে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে দেয়।  

    বাংলা তার শরীরচর্চার সেই ধারাটি বজায় রাখতে পারলে এবং সেই সব ব্যায়ামাগার থাকলে হাওড়ার অষ্টম দাসকে আর মরচে ধরা সরঞ্জাম নিয়ে গাছতলায় অচিন্ত্যের মতো যুবকদের অনুশীলন করাতে হত না। আর কীর্তিমান সেই পালোয়ানদের যোগ্য উত্তরসূরিরা থাকলে এশিয়াড, কমনওয়েলথ বা অলিম্পিকসে সোনার মেডেলের ভিড়ে বাংলার সিন্দুক ভরে উঠত। সেকালের শৃঙ্খলা, নীতিবোধ, দেশপ্রেম আর সাহস থাকলে আজকের সমাজও এমন মূল্যবোধহীন দুর্নীতির পাঁকে ডুবে যেত না।   
                      

      
     
        
      

     
  • ব্লগ | ১২ আগস্ট ২০২২ | ২৩৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন