• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • রাগ দরবারী (৮ম পর্ব)

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ৭২৩ বার পঠিত
  • স্বভাবে উনি পরোপকারী বটেন। এখন পরোপকার হল একটা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী রোগ, আর এ নিয়ে সবার আলাদা আলাদা মত। কেউ পিঁপড়েকে আটা খাওয়ায়, অন্য কেউ অবিবাহিত বয়স্ক মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক করার লক্ষ্যে নিজের চেহারায় ‘প্রেম করতে এক পায়ে খাড়া’ গোছের প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কাউকে যেন খোলাখুলি ঘুষ চাইতে না হয়, তাই এক পরোপকারী যত ঘুষ দেনেওয়ালা তাদের সঙ্গে দিনরাত দরদাম করে মধ্যস্থতার কাজ করে বেড়ায়। এসব হল পরোপকার কাকে বলে তা’ নিয়ে কিছু ব্যক্তিগত ধারণা মাত্র। দূরবীন সিংয়েরও পরোপকার কাকে বলে তা’ নিয়ে নিজস্ব ধারণা ছিল। উনি দুর্বলের রক্ষার জন্যে সদাই আতুর হতেন। এই জন্যে কোথাও মারপিট হচ্ছে শুনতে পেলেই উনি বিনা নেমন্তনে পৌঁছে যেতেন এবং সবসময় দুর্বলের পক্ষ নিয়ে লাঠি ভাঁজতেন। সেসব শান্তিপূর্ণ দিনে এ’সব ব্যাপারের জন্যে রেট বাঁধা থাকত। সবাই জানত যে বাবু জয়রামপ্রসাদ উকিল যেমন মারপিটের কেসে আদালতে দাঁড়াতে প্রত্যেকবার পঞ্চাশ টাকা নিতেন তেমনই দূরবীন সিং ও মামলাটা আদালতে গড়ানোর আগে প্রথম যে দরকারি মারপিটটা হত তার জন্যে পঞ্চাশ টাকা করে নিতেন। বড়সড় পেটাপেটির সময়, মানে যখন বেশ কিছু লোক জমায়েতের দরকার, তখন মাথাপিছু হিসেবে রেট ঠিক হত, টাকাটা বেড়ে যেত। কিন্তু তারও রেট আগে থেকে ঠিক করা থাকত, ফলে কেউ ধোঁকা খেত না। ওনার লোকজনকে মদ ও মাংস খাওয়াতে হত। কিন্তু উনি নিজে সেই পরিস্থিতিতে মদ বা মাংস কিছুই ছুঁতেন না। ফলে ওঁর পেট হালকা এবং মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকত যা যুদ্ধের ময়দানে বড়ই দরকারি। ‘মাংস’ ও ‘মদিরা’ দেখেও যে সোজা ‘না’ বলতে পারে তাকে সদাচারী সাত্ত্বিক মানুষ ধরা হয়, তাই ওনাকেও সাত্ত্বিক বলতে কোন বাধা নেই।

    দূরবীন সিংযের একটি বৈশিষ্ট্য হল উনি কখনও কারও ঘরে সিঁদ দিতেন না, সোজা পাঁচিল টপকে ঢুকতেন। উনি সুযোগ পেলে যেকোন রাজ্যে পোলভল্ট চ্যাম্পিয়ন হতে পারতেন। গোড়ার দিকে টাকাপয়সার টানাটানি হলে কালেভদ্রে পাঁচিল টপকাতে যেতেন। পরের দিকে এ’ধরণের কাজকম্মো কখনো সখনো শুধু নতুন চ্যালাদের প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং দেবার জন্যে করতেন। সে যুগে চোর শুধু চোরই হত, আর ডাকাতেরা ডাকাত। চোরেরা শুধু চুরি করতেই ঢুকত আর একটা পাঁচ বছরের বাচ্চাও যদি হাত-পা নাড়ত তাহলে যে পথে সিঁদ কেটে ঢুকেছিল সে পথেই ভদ্রভাবে বেরিয়ে যেত। ডাকাতের দল মালপত্তর লুঠে নেয়ার চাইতে মারপিট করতে বেশি উৎসাহী হত। এই ট্র্যাডিশনে দূরবীন সিং যোগ করলেন চুরি করার সময় যে জেগে উঠবে তাকে ঠ্যাঙাও। এই দাওয়াইটি সমসাময়িক চোরদের মধ্যে ভারি লোকপ্রিয় হল। এভাবে দূরবীন সিং চোর এবং ডাকাতের মধ্যের ফারাকটা প্রায় মিটিয়ে দিলেন এবং চুরির মেথডলজিতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এলেন।

    কিন্তু কালের কুটিল গতি!

    শিবপালগঞ্জে যা কিছু কালধর্মের সঙ্গে বেখাপ্পা, তাই ‘কালের কুটিল গতি’ হয়ে যায়। অমন যে ঠাকুর দূরবীন সিং , তিনিও বুড়োবয়েসে একবার নেশাড়ু ভাইপোর এক তামাচা খেয়ে কুয়োর পাড় থেকে গড়িয়ে পড়লেন। শিরদাঁড়ার হাড় ভেঙে গেল। কিছু দিন ঘরের কোণায় দাঁড় করিয়ে রাখা লাঠিগাছটির দিকে তাকিয়ে ওটা ওই ভাইপোর মুখে ঠুঁসে দেবার কল্পনা করে দিন কাটাতে লাগলেন। শেষে একদিন লাঠি এবং ভাইপোর মুখশ্রীকে যেমন ছিল তেমনই রেখে উনি শিবপালগঞ্জের ধরাকে বীরশূন্য করে বীরগতি প্রাপ্ত হলেন; অর্থাৎ টেঁসে গেলেন।

    শনিচর এবার দূরবীন সিংকে নিয়ে ওর নিজস্ব স্মৃতিচারণে ডুবে গেলঃ

    “ভাইয়া রঙ্গনাথ, এক কৃষ্ণপক্ষের রাতে আমি ভোলুপুরের তিওয়ারিদের বাগানের ভেতর দিয়ে আসছিলাম।তখন আমারও ছেলেমানুষির সীমা ছিল না, বাঘ ও ছাগলকে সমদৃষ্টিতে দেখতাম। শরীরে এমণ তেজ যে হাওয়ায় লাঠি ঘোরাই এবং শুকনো পাতায় একটু খরখরানি টের পেলেই তক্ষুণি মা তুলে গাল দিই। তো, এক নিকষকালো রাতে আমি একটা ডান্ডা হাতে নিয়ে সটাসট চলে আসছি। তক্ষুণি গাছের আড়াল থেকে কে যেন হাঁক পাড়ল—খবরদার!

    ভাবলাম নিশ্চয়ই কোন ভূত প্রেত, কিন্তু ওদের তো এই ডান্ডায় কিছু হবে না। আমি তাই লাল ল্যাঙ্গোটধারীর ধ্যান করলাম, তবে তাঁর ধ্যান কখন কাজে দেয়? যদি ভূত-প্রেত-মামদো এসে ধরে তবে না? কিন্তু গাছের আড়াল থেকে এগিয়ে এল এক কেলেকুষ্টি হাট্টাকাট্টা সাজোয়ান। বলল, যা কিছু আছে চুপচাপ বের করে দাও। ধুতি-পিরেন সব খুলে নামিয়ে রাখো!

    মারার জন্যে লাঠি তুলতেই দেখি চারদিক দিয়ে পাঁচ-ছ’জন আমাকে ঘিরে ফেলেছে। সবার হাতে বড় বড় লাঠি ও ভল্ল। আমি ভাবলাম—নাও শনিচর, আজ তোমার জমাখরচ হিসেব-নিকেশ সব হল বলে । উঁচিয়ে ধরা ডান্ডা হাতেই রয়ে গেল, চালানোর হিম্মত হলনা।

    একজন বলল, লাঠি তুলেছিলে, চালালে না কেন? যদি এক বাপের ব্যাটা হোস, তো চালা লাঠি!

    বড্ড রাগ হল। কিন্তু ভাই, যেই রাগের চোটে মুখ খুললাম কান্না পেয়ে গেল। আমার মুখ দিয়ে বেরোল — 'জান নিও না, মাল নিয়ে যাও’।

    আরেকজন বলল-শালার আট আনার জান, তার জন্যে শেয়ালের মত ফেউ ফেউ করছে। এ’ব্যাটা তো মাল ছেড়ে দেবে বলছে, ঠিক আছে। দিয়ে দে সব মাল।‘

    ব্যস ভাইয়া, একটা ঝোলা। তার মধ্যে খানিকটা ছাতু ছিল, আর একটা চমৎকার মোরাদাবাদী লোটা।মামাবাড়ি থেকে পাওয়া। ফাস্ট কিলাস সুতোর বুনুনি। সে কী লোটা, বালতি বললেই হয়। কুয়ো থেকে দুই সের জল তোলা যেত।আসল ঘিয়ে ভাজা একতাড়া পুরি। তখন শালার ডালডা বনস্পতির চল ছিলনা। ব্যাটারা সব গুনে গুনে নিয়ে নিল। তারপর ধুতি খুলতে বলল, গেঁজেতে একটা টাকা ছিল, তাও ছাড়েনি। যখন খালি ল্যাঙোট পরে কুর্তা গায়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম, এক ব্যাটা বলল, ‘এবার মুখে কুলুপ এঁটে সোজা বাড়ির দিকে হাঁটা দাও। চুঁ-চাঁ করেছ কি এই বাগানে পুঁতে রেখে দেব’।

    আমি রওনা দিচ্ছি তো একজন হেঁকে উঠল, ’বাড়ি কোথায়’?

    বললাম -- আমি একজন গঞ্জহা (শিবপালগঞ্জ নিবাসী)।

    তারপর ভাই, কি আর বলব, সবক’টা লুটেরে এ ওর মুখের দিকে তাকায়। কেউ আমাকে শুধোয় - শিবপালগঞ্জের মুখিয়ার নাম বল।

    আরেকজন আমার পরিবারের কর্তার নাম জানতে চায়। তিননম্বর বলে - দুরবীন সিং? ওনাকে চেন?

    আমি বললাম, ’সেবার দূরবীন সিং এর দলের হয়ে লাঠিও চালিয়েছি।ওই যখন রঙপুরে দু’পক্ষেই বড় জমায়েত হয়েছিল। সকালে সূয্যি না উঠলে ওখানে অন্ততঃ হাজার লোকের লাশ পড়ত।উনি আমার গ্রামসম্পর্কে কাকা’।

    ওরে ব্বাবা! রাম-রাম সীতারাম! যেন কালো মানুষের ভিড়ে কোন গোরা মিলিটারি সাহাব ঢুকে পড়েছে। হুটোপুটি শুরু হয়ে গেল। কেউ আমার ধুতি ফিরিয়ে দিচ্ছে, তো কেউ জামাজুতো। একজন ঝোলা ফেরত দিয়ে গেল। আর একজন হাত জোড় করল, "তোমার দুটো পুরি খেয়ে ফেলেছি, এর পয়সা নিয়ে নাও। কিন্তু দূরবীন সিং যেন জানতে না পারেন যে আমরা তোমাকে ঘেরাও করেছিলাম। চাইলে আরও ক’টা টাকা নাও। বল তো পেট চিরে পুরি বের করে দিচ্ছি। আমরা কি জানতাম যে তুমি একজন ‘গঞ্জহা’?"

    তারপর ওরা আমাকে আমাদের গাঁয়ের পুকুরপাড় অব্দি এগিয়ে দিল। অনেক কাকুতি-মিনতি করল। আমিও ওদের বুঝিয়ে সুজিয়ে চোখের জল মুছিয়ে বললাম - আরে তুমি হলে আমার ঘরের লোক। দুটো পুরি খেয়েছ তো কী হয়েছে? আরও দুটো খাও।

    লোকটা পালিয়ে গেল। বলে গেল, ’ঢের হয়েছে দাদা! আর না। কী করে জানব যে তুমি ‘গঞ্জহা’? ব্যস, দাদা! দূরবীন সিং যেন জানতে না পারেন’।

    আমি বললাম — বাড়ি চলো। জল-টল খাবে। খিদে পেলে দুটি ডাল-ভাত খেয়ে নেবে। কিন্তু ও শুনল না। বলল, "দাদা, এবার ভাইকে যেতে দাও। তুমিও বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়, আর কাল সকাল নাগাদ সব ভুলে যেও, কেমন? তবে কাউকে কিছু বোলনা যেন।"

    তো ভাইয়া, আমি ঘরে গিয়ে বিছানায় লম্বা হলাম। ভোরের আলো ফুটতেই দূরবীন সিংয়ের বাড়ি গিয়ে ওনার পা’ জড়িয়ে ধরলাম। কাকা, কাল রাত্তিরে তোমার নাম নেওয়ায় লাল-ল্যাঙোটধারী দেবতার আশীর্বাদ পেয়েছিলাম। তোমার নাম নিয়েই প্রাণে বেঁচে ফিরেছি।

    উনি পা’ সরিয়ে নিয়ে বললেন - ‘যা ব্যাটা শনিচরা! কোন চিন্তা করিসনা। যতদিন আমি আছি, আলো-অন্ধকারে দিন-রাত্তিরে যেখানে ইচ্ছে ঘুরে বেড়াস, কোন কিছুতেই ভয় পাস না। সাপ-বিচ্ছু তো তুই সামলে নিবি, বাকিদের সামলানো আমার উপর ছেড়ে দিস’।

    এবার শনিচর একটা বড় করে শ্বাস টানল, তারপর চুপ মেরে গেল। রঙ্গনাথ বুঝল যে শনিচর এখন বটতলা-মার্কা নভেলের লেখকদের মত আসল কথায় আসার আগে সাসপেন্স তৈরি করছে। ও ভালোমানুষের মত বলল, ’তাহলে তো যতদিন দূরবীন সিং বেঁচে ছিলেন ততদিন ‘গঞ্জহা’ লোকজনের খুব পায়াভারি’?

    রূপ্পনবাবু মুখ খুললেন এবং রঙ্গনাথের সামনে প্রথমবার কোন সাহিত্যিক পংক্তি ঝাড়লেন। উনি শ্বাস টেনে গম্ভীর হয়ে আওড়ালেনঃ

    “কি পুরুষ বলী নহিঁ হোত হ্যায়, কি সময় হোত বলবান।
    কি ভিল্লন লুটী গোপিকা, কি ওহি অর্জুন ওহি বাণ”।।



    ‘পুরুষকার নয়, পাল্লাতে মহাকাল পড়ে যায় ভারী,
    অর্জুনের হাতে সেই গাণ্ডীব, তবু লুঠ হয়ে যায় গোপীনারী”।।

    রঙ্গনাথ ফুট কাটে, 'কী হোল রূপ্পনবাবু, শিবপালগঞ্জ থেকে তোমার গোপিকা কেউ হরণ করেছে নাকি'?

    রূপ্পনবাবুর হুকুমঃ ‘শনিচর, তোমার অন্য গল্পটাও শুনিয়ে দাও’।

    শনিচরের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হল।

    “ভাইয়া, লেঠেলের কাজ তো এসেম্বলীর মত হতে পারেনা। এসেম্বলীতে তুমি যত বুড়ো হবে, যত তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি যত লোপ পাবে — ততই তুমি উপরে উঠতে থাকবে। এই এমএলএ হরমন সিংকে দেখ।উঠে দাঁড়ালে ভয় হয় - মুখ থুবড়ে পড়লো বুঝি! কিন্তু না, রাজনীতিতে দিনের পর দিন ওনার ওজন বাড়ছে। কিন্তু লেঠেলদের ব্যাপারটা সেরেফ কলজের জোরের ব্যাপার। যতদিন চলছে ততদিন ঠিক। যেদিন চলবে না, সেদিন সোজা হালাল হয়ে যাবে।

    এই পাঁচ-ছ’বছর আগের কথা। কার্তিক-স্নানের জন্যে গঙ্গার ঘাটে গেছলাম। ফেরার সময় ভোলুপুরের কাছে রাত হয়ে গেল।ফুটফুটে চাঁদনী রাত। বাগানের মধ্যে দিয়ে আসার সময় গুনগুনিয়ে একটা চৌপদী গাইতে শুরু করেছি কি পেছন থেকে পিঠের ডানদিকে একটা লাঠির বাড়ি পড়ল। কোন কথাবার্তা নয়, কোন রাম-রাম নমস্কার-চমৎকার নয়, সোজা লাঠির বাড়ি! ভাইয়া, চৌপদী যে কোথায় পালাল কে জানে, কিন্তু আমার কাঁধের ঝোলাটি ছিটকে পড়ল বিশ হাত দূরে। হাতের লাঠিও পড়ে গেছে। চেঁচাতে গেছি তো তিনটে লোক আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। একজন মুখটা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল, ’চুপ সালে! ঘাড় মটকে দেব’। ভাবলাম লাফিয়ে উঠি, কিন্তু ভাব যদি কেউ পেছন থেকে লাঠি মারে তো স্বয়ং গামা পালোয়ানও কাত হবেন, আমি কোন ছার! খানিকক্ষণ মুখ বুঁজে পড়ে থেকে হাতে পায়ে ধরে মিনতি করলাম-মুখ খুলে দাও, চেঁচাব না কথা দিচ্ছি। তখন মুখের কাপড় খুলে দিয়ে একজন বলল- টাকাকড়ি কোথায় রেখেছ?

    আমি বললাম, ‘বাপু, যা কিছু আছে সব এই ঝোলায়’।

    ঝোলায় দেড় টাকা খুচরো ছিল। এক ডাকাত সেগুলো হাতে ঠুন ঠুন করে বলল — ল্যাঙ্গোট খুলে দেখাও।

    বললাম, ‘ওটা খুলিও না। ওর নীচে কিস্যু নেই। একেবারে ন্যাংটো হয়ে যাব’।

    আর যায় কোথা! ব্যাটাদের মেজাজ বিগড়ে গেল। ভাবল আমি বোধহয় ঠাট্টা করছি । তারপর তো শরীরের সবকিছু খুলিয়ে এমন তল্লাসি চালাল যে গাঁজা-ভাঙের খোঁজে পুলিশের তল্লাসিও হার মানবে। যখন কিছুই পেল না তখন এক ব্যাটা আমার পেছনে এক লাথি মেরে বলল — চুপচাপ মুখ বন্ধ রেখে নাক বরাবর চলে যা, গিয়ে সোজা নিজের খোঁয়াড়ে ঢুকে পড়।

    ততক্ষণে আমার জিভের সাড় ফিরে এসেছে। বললাম, ”দেখ বাপু, তোমরা যে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ, ভাল করেছ। মালপত্তর নিয়ে নিলে, তাও কিছু বলব না। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখ, তোমরা কিন্তু নুন থেকে নুন কেড়ে খাচ্ছ। তোমরা যদি সরকারের, তো আমিও দরবারের লোক”।

    ওরা এবার আমার কাছ ঘেঁষে এসে নানান প্রশ্ন করতে লাগল। যেমন, আমি কে বটি? কোথায় থাকি? কার শাকরেদ এই সব।

    আমি বুক ফুলিয়ে বললাম — আমি একজন গঞ্জহা, ঠাকুর দূরবীন সিংয়ের চ্যালা।

    আর বোল না রঙ্গনাথ ভাই। শোনা মাত্র ওরা খ্যাক-খ্যাক করে হেসে উঠল। একজন আমার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান মারল। আমি খালি ভাবছিলাম যে এবার কী হবে, তো ব্যাটা আমাকে ল্যাং মেরে চিৎ করে ফেলল।

    আমি শরীরের ধূলো ঝেড়ে টেরে দাঁড়ালাম। এক ব্যাটা কমবয়েসি সাজোয়ান ডাকাত বলে কি—এই দূরবীন সিং আবার কোথাকার কে?

    অমনি সবাই খি-খি করতে লাগল।

    এবার আমার পালা।

    “সেকী, দূরবীন সিং কে জাননা? বাইরে থেকে এসেছ বুঝি? এদিকে দশ কোশের আশেপাশে কেউ গঞ্জহাদের সঙ্গে লাগতে আসেনা। দূরবীন সিং এর গাঁয়ের লোকজনকে সবাই সমঝে চলে। কিন্তু বাপু, তুমি যখন ওনার নামই শোননি, তো কী আর বলব, নিয়ে যাও আমার ঝোলা”।

    “ ডাকাতগুলো ফের খিক-খিক শুরু করল। তবে একজন বলল যে নাম শুনেছে।কিন্তু এখন আর দূরবীন সিংয়ের সেদিন নেই। বুড়োগুলো সব একটু-আধটু লাঠিবাজি দেখিয়ে ্নিজেদের ভারি ওস্তাদ মনে করত।এদের ওই দূরবীন সিংও লাঠি চালিয়ে দু’চারটে বাড়ির পাঁচিল টপকে মস্ত বাহাদূর হয়ে গেছল। এখন গেঁড়িতে চড়ে দেয়াল টপকানো তো বাচ্চারা স্কুলেই শিখে নেয়।

    এক ডাকাত বলল, লাঠি চালানোর বিদ্যেটাও আজকাল স্কুলেই শেখা যায়। আমিও ওভাবেই শিখেছি।

    আগের নওজোয়ান বলল,’তো ওই দূরবীন সিং হলেন তোমাদের গুরুঠাকুর? শালার কাছে একটা দেশি পিস্তলও নেই, এদিকে এলাকা আগলে রাখার শখ’!

    এক ব্যাটার হাতে ছিল চোরবাতি(টর্চ)। ও পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে বলল,” দেখে নে ব্যাটা। এই হল ছ’ঘরা। দেশি পিস্তল নয়, আসল বিলায়তি মাল’। বলতে বলতে ও পিস্তলের নল আমার বুকে ঠেকিয়ে দিল। তারপর বলল,’যা, গিয়ে তোর বাপকে বল গে’--অন্ধের দেশে কাণা রাজা হওয়ার দিন শেষ। এখন ওর খাটিয়ায় পড়ে থেকে কাঁদার দিন। যদি দিনে রাতে কখনও চোখে পড়ে তো মাথার খুলি উড়ে যাবে। বুঝলি ব্যাটা ফকীরেদাস’?

    এরপর ভাইয়া,আমার শরীরে এমন তেজ এসে গেল যে নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। হাতের লাঠি ওখানেই ফেলে হরিণের বেগে ছুট লাগালাম। পেছনে ওদের হাসির খ্যা খ্যা আওয়াজ আমায় যেন তাড়া করছিল। একজন বলল,’মার শালার দূরবীন সিংকে।এই, দাঁড়া বলছি, দেখ তোকে যদি মেরে মেরে দূরবীন না বানাই’।

    কিন্তু ভাই, এ তল্লাটে কেউ আমায় দৌড়ে হারাতে পারেনি। আজকাল স্কুল-কলেজের ছেলে-ছোকরাদের সিটি বাজিয়ে বাজিয়ে দৌড়ুতে শেখায়। আমি কোথাও না শিখেই এমন দৌড় লাগাই যে খরগোশ বেচারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোয়। ভাই, ওরা খুব খারাপ খারাপ গাল পাড়ল , কিন্তু দৌড়ে আমার নাগাল পেলনা। কোনরকমে ঘরে পৌঁছলাম। দূরবীন সিংযের তখন সত্যিই দিন শেষ। পুলিসও ভেতরে ভেতরে ওঁনার বিরুদ্ধে চলে গেছল। পরের দিন আমার পেট গুড়গুড় করল, কিন্তু আমি ওই ঘটনাটি আর ওনাকে জানাইনি। বললে হয়ত দূরবীন কাকা শক লেগে তক্ষুনি টেঁসে যেত’।

    রূপ্পনবাবু এতক্ষণ ওনার দুঃখী দূঃখী চেহারাটা একটা ভারি ঝোলার মতন শরীরে টাঙিয়ে রেখেছিলেন। একটা বড় নিঃশ্বাস টেনে বললেন—হলে ভালই হত। তখনই টেঁসে গেলে পরে আর ভাইপোর হাতে মরতে হতনা।

    (চলবে)
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ৭২৩ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • স্বাতী রায় | 117.194.41.227 | ১৮ এপ্রিল ২০২১ ০১:৫০104835
  • এতদিন বলা হয় নি, পড়ছি কিন্তু। আর বলাই বাহুল্য যে ভালো লাগছে।

  • Ranjan Roy | ১৮ এপ্রিল ২০২১ ০৮:৪২104842
  • শিওর। :))

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন