• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • সেইসব দিনগুলি…

    Jhuma Samadder লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ১০৩ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • সেইসব দিনগুলি…
    ঝুমা সমাদ্দার

    …...তারপর তো 'গল্পদাদুর আসর'ও ফুরিয়ে গেল। "দাঁড়ি কমা সহ 'এসেছে শরৎ' লেখা" শেষ হতে না হতেই মা জোর করে সামনে বসিয়ে টেনে টেনে চুলে বেড়াবিনুনী বেঁধে দিতে লাগলেন । মা'র শাড়িতে কেমন একটা হলুদ-তেল-বসন্তমালতী'র গন্ধ। কাজল পরাতে গেলে 'উঁ' ‘উঁ' শব্দে তীব্র প্রতিবাদ।
    "একদম চুপ করে বোসো। চোখ ডলে ডলে , দেখো , সমস্ত গালময় কালি করে ফেললে।" খেলতে পাঠিয়ে দিয়ে মা 'গা-ধুতে' যাবেন ।
    বড়দিদিদের সঙ্গে খেলতে গেলে তারা চোখ মটকে ঈশারা করে , বলে ‘দুধ-ভাত'। কক্ষনো সে 'চোর' হয় না। শুধু কালেভদ্রে তার সুযোগ আসে 'ধাপ্পা' দেওয়ার। তাকে দিদিরা নিজেদের পেছনে আড়াল করে রাখে । বেরোতেই দেয় না ।
    ওদের ছোটদের সঙ্গী কম । খেলা তেমন জমে না। ঝগড়া বেঁধে যায়।
    "তোর ভাই'কে খেলায় নেব না। টলমল করে হাঁটে , ধাক্কা লাগলে পড়ে যায় ।" খুব ইচ্ছে, এই সুযোগে তাকে 'দুধ-ভাত' বানানোর । কিন্তু, সে চলবে না। তাকে 'দুধ-ভাত' বানালে তার দিদিরা চটে যায়। ব্যাস , খেলা বন্ধ । 'জিব-ভ্যাঙানো'তেই বরাদ্দ সময় ফুরিয়ে যায় ।
    কী সুন্দর দেখতে উষা দিদিকে । ওর বোন ডেজি কেমন 'বেচারা' চোখে তাকায় ওদের দিকে। মাঝে মাঝে আসে "খেলতে নিব ?" বলে । একবার 'ডিপ' ‘ডিপ' ‘তেল' ‘তেল' খেলাতে 'কি রঙ' বলতে বলায় বলেছিল "আসমানী"। কারোর সোয়েটারে 'আসমানী' রঙ খুঁজে পায়নি ওরা ।
    সন্ধ্যে হতেই 'লোডশেডিং' । বিশ্রী গন্ধের দুধের গ্লাসখানা মুখের কাছে ধরলেই দেওয়ালে কাঁপা কাঁপা রাক্ষুসে ছায়া পড়ে। বুক দুরু দুরু । আরো কাছাকাছি , আরও ঘেঁষাঘেষি করে বসা । দাদার কেমন রঙচঙে 'ছেলেদের রামায়ণ' … 'ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি'র মাথায় ,কেন কে জানে, শিং খুঁজে বেড়াত ও । রঙিন পশু-পাখির বই ‘চিড়িয়াখানা' । পরিস্কার বুঝতে পারে, ‘ঝুঁটি বুলবুলি' ওর সঙ্গে গল্প করতে আসে রোজ।
    'সহজ পাঠে'র অদ্ভুত ছবিগুলো হ্যারিকেনের আলোয় আরো অদ্ভুত আকার ধারণ করে । ঠিক বোঝা যায় না । "উশ্রী নদীর ঝরণা’ দেখতে যাবে, মা ?” , "মা , 'চাটনি দিয়ে রুটি' খেতে কেমন লাগে ?” এসব প্রশ্নের একটাই উত্তর , ও জানে , "বানান করো, 'রেভারেণ্ড এণ্ডারসন" ।অথবা, "শ্রুতি লিখন’ লেখো , 'ভয় করতে লজ্জা করে না ?”
    করে তো । নইলে কি এসব প্রশ্ন কেউ করে ? এসব প্রশ্ন যে একান্তই নিজের । 'বাঘ শিকারে যাওয়া'র কল্পনা , 'চিঁড়ে আর বনের মধু' খাওয়া, ‘আমলকী বন কাঁপে যেন তার বুক করে দুরু দুরু'…... আচ্ছা, 'আমলকী বন' কে ? সে কী ওরই বয়সী ? ওর মতই কী তারও ভয় করে ? তা করবে না ? অন্ধকার রাতে 'বেড়াল কাঁদলে' কার না ভয় করে ? কার না চোখ বন্ধ করলেই চোখের পাতায় নীল-হলুদ আলো ঘুরে বেড়ায় ?
    বাবা অফিস থেকে ফিরলে মা স্টোভ ধরিয়ে চা বানান । স্টোভ নেভানোর বিশ্রী গন্ধেও ভয় ভয় ভাবটা কিছুটা কাটে । এইবার বাবা পাশের ঘরে গিয়ে রেডিও'তে খবর শুনবেন । না দেখেও ঠিক জানে ও , বাবার হাতে মোটা মতন একখানা ইংরিজি বই । কোনো ছবি নেই । সাদা কাগজ ঢোকানো রয়েছে তাতে । বাবা পড়তে পড়তে পেন দিয়ে দাগ দেবেন , সাদা কাগজে কি যেন লিখবেন । বাবার পেনটা কী সুন্দর ! একদিন 'ইকটুখানি' দাগ কেটেছিল কেবল । বাবা ঠিক ধরে ফেলেছিলেন । বাবার পেনে কেউ হাত দিলেই বাবা ঠিক বুঝে ফেলেন । 'উঁহ্' শব্দে বিরক্তি প্রকাশ করে পেনের নিব খুলে গরম জলে ধুয়ে 'সুলেখা কালি'র দোয়াত থেকে ড্রপারে করে কালি ভরেছিলেন বাবা ।
    ন'টা বাজলেই মা হাতের সেলাইখানা নামিয়ে রান্না ঘরে যাবেন। গরম রুটি কেমন সুন্দর ফুলে ওঠে । সুন্দর গন্ধ ।
    পুজোর আগেই রাতের দিকে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব বাতাসে । হাফ সোয়েটার থেকে টেনে টেনে উলের রোঁয়া তুলে উলের নুটি বানাতে বানাতে, রঙিন চকচকে গোলাপী লজেন্সের মতন দেখতে বোতামের উপর আঙুল ঘষে মিষ্টি লেবুর গন্ধ উঠলে শুঁকে দেখতে দেখতেই আলো চলে আসে ।
    আরও একটা মজা হয় বেশ, আলো না থাকলে । রাজ্যের পোকা আসে পড়ার ঘরে। ধরে ধরে যত্ন করে পেনসিল বক্সে ভরে রাখে । একলা একলা কি করছে ওরা ? ওরই মতন কি একলা থাকলে ওরা দুষ্টুমি করে ? ও যেমন সুযোগ পেলেই চৌবাচ্চার জল মগ ভরে তোলে , আবার ফেলে, কেমন বুড়বুড়ি কাটে জলে….ফাটা পেনসিল বক্সের ফুটোয় চোখ রাখে । একটাকেও দেখতে পায় না। খুলে দেখে সব লাফিয়ে উঠেছে পেনসিল বক্সের ঢাকনায়। খুলতেই সব লাফিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
    খাওয়া দাওয়া সেরে বাইরের বারান্দায় বেরোলেই মিষ্টি গন্ধের ঝাপটা । শীত শীত করে । ঝিরঝিরে সজনে পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদ'টা মেঘের ভেলায় চড়ে 'শুভরাত্রি' জানিয়ে যায় ওকে । আকাশেরও কী কম কাজ ? ভোর না হতেই আবার আধফোটা শিউলি গুলোকে শিশিরের ফোঁটায় তরতাজা করে রাখতে হবে । ঘাসের উপর টলটলে হীরের নাকছাবি সাজিয়ে রাখতে হবে । মাকড়সার জালের উপর হালকা রূপোর তার সাজিয়ে ঝলমল করাতে হবে ।
    সাবধানে পা ফেলে স্কুলে যেতে হয়। শিশিরের ঘুম ভাঙাতে নেই । শিউলিগুলোকে হাতে করে তুলে নিতে হয় । কক্ষনও পা দিয়ে মাড়াতে নেই ।
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ১০৩ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আরও পড়ুন
'The market...' - Jhuma Samadder
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত