এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    মায়া-হরিণের টানে - স্বাতী রায় | ছবি: রমিত ১। রাজেশের রাজত্ব-বিস্তার১৯৮২ সালের ব্যাঙ্গালোর। যশবন্তরাই মেহতার দুই পুত্র প্রশান্ত ও রাজেশ ১২০০ টাকা ধার নিয়ে এক রূপোর গয়নার ব্যবসা খুললেন। ব্যবসার মডেলটি কিঞ্চিৎ অভিনব। চেন্নাই, রাজকোট, হায়দ্রাবাদ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে এক জায়গার জিনিস অন্যত্র অভিনবত্বের কারণে চড়া দামে বিনিময় করতেন। ফল দ্রুত নিজ মূলধন বৃদ্ধি।তবে দুই ভাইয়ের চোখে স্বপ্ন বিশাল। সামান্য রূপোর গয়নায় আটকে থাকলে তাঁদের চলবে কেন? ১৯৮৯ সালে ব্যাঙ্গালোরের আর টি নগরে ১০ জন কারিগরকে নিয়ে শুরু হল এক সোনার গয়নার রপ্তানির ব্যবসা। (১) ১৯৯৫ সালে “রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেড” কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হল আর সেই বছরই তারা স্টক মার্কেটে নাম তালিকাভুক্ত করল। আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে ১০ কোটি টাকা তুলল, উদ্দেশ্য রপ্তানি ব্যবসা আরও বড় করা। এরপর থেকে এই লেখায় এই কোম্পানিকে REL বলে উল্লেখ করব, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। ১৯৯০ এর দশক ফ্যামিলি-বিজনেসের স্বর্ণযুগ। রাজেশের ব্যবসারও পালে হাওয়া লেগেছিল। ২০০১-০২ সালে REL ব্যাঙ্গালোরে শুরু করল ২৫০ টনের এক সম্পূর্ণ অটোমেটেড অলঙ্কার উৎপাদন কেন্দ্র। সেই সময় ভারতের সোনার গয়নার ৯০% কারিগরদের হাতে তৈরি হত। ১৯৯০ এর আশেপাশে মেসিন চেনের জনপ্রিয়তা বাড়লেও দেশে তার বাজার ছিল খুবই সীমিত। রপ্তানিকারকরা কিছু কিছু টুকরো কাজ মেসিনে করতেন মাত্র। সেখানে রাজেশ গয়না উৎপাদনের প্রতিটি ধাপকে ভেঙ্গে আগাগোড়া যন্ত্রের মাধ্যমে গয়না তৈরির পদ্ধতি চালু করলেন। ফল, উৎপাদনের সময় হ্রাস, গয়নার ওজন কমানো, আরও ভালভাবে সোনার গুণমান রক্ষা ও সোনা নষ্ট কমানো। কারিগরি হস্তশিল্প থেকে একটা বিশাল স্কেলের অটোমেটেড ফ্যাক্টরি পাইপলাইন তৈরির কৃতিত্বের খানিকটা রাজেশের প্রাপ্য। ২০০৩ সালে ভারতের মোট বার্ষিক সোনার চাহিদা ছিল ৬৫০-৭০০ টন। রাজেশের উৎপাদন কেন্দ্র একাই তার ৩৫ শতাংশ সরবরাহ করতে পারত। তবে তখনও রাজেশের মূল চোখ কেবলমাত্র বিজনেস টু বিজনেস রপ্তানির দিকেই। ২০০৭-০৮ সালে কোচির SEZ এ খুলল দ্বিতীয় ১০০ টনের উৎপাদন কেন্দ্র। সমসময়েই তিনি দেশের খুচরো বাজারেও নজর দিলেন। ২০০৬ সালের মার্চে Oyzterbay র রিটেইল নেটওয়ার্ককে কিনে নিলেন। (২) ২০০৬-০৭ সালে শহুরে ক্রেতার জন্য খোলা হল লাভ ব্র্যান্ডের গয়নার দোকান। (৩) ইতিমধ্যে ২০০৭ সালে সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জের মারফত FCCB ইস্যুর মাধ্যমে REL প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা তোলে। সেই টাকা বিনিয়োগ করে ২০০৭-০৮ সালে REL নিয়ে এল আরেকটি ব্র্যান্ড – শুভ। (৪)কেরালা, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ জুড়ে স্থানীয় জুয়েলার্সদের নিজস্ব গয়নার সম্ভার অধিগ্রহণ করে ফ্রানচইজি মডেলে এই ব্যান্ড শুরু হয়। (৫) কিন্তু রাজেশ মেহতার স্বপ্ন ছিল "mines to consumers" গোটা ব্যবসা নিজের দখলে আনার। ২০১১ সালে তিনি সিঙ্গাপুরে REL এর সাবসিডিয়ারি সংস্থা REL Singapore Pte Ltd নিবন্ধন করলেন। ২০১৩ সালে REL উত্তরাখন্ডে খুলল বছরে ৪০০ টন সোনা পরিশুদ্ধ করার কেন্দ্র। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি REL Singapore এর মাধ্যমে REL ইউরোপিয়ান গোল্ড রিফাইনারিজ হোল্ডিং এস এ (EGR) কে অধিগ্রহণ করে। তাতে হাতে চলে আসে ইউরোপের বৃহত্তম রিফাইনারি ভ্যালক্যাম্বি এসএ (বার্ষিক ২০০০ টন ক্ষমতা)। (৬) পরে অবশ্য গ্লোবাল গোল্ড রিফাইনারিজ এজি (GCR) বলে একটি কাগুজে হোল্ডিং সংস্থা তৈরি করা হয় ও EGR GCR এর মধ্যে মিশে যায়। REL হয় পৃথিবীর বৃহত্তম সোনা পরিশোধনকারী। সোনার দৌলতেই REL-এর নাম ফরচুন গ্লোবাল ৫০০ এ উঠেছে, তবু সোনাতেই কি আটকে থাকবেন? ২০২০ সালে খোলেন এলেস্ট – লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরির কোম্পানি। ২০২২ সালে সরকারের PLI ACC স্কিমে বিড করে 5 GWh ব্যাটারির কোটা জিতে নেন। (৭)ফলে সংস্থা বিপুল সরকারি ভর্তুকি পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হল। ২০২২ সালের জুলাইয়ে নিবন্ধিত হয় ১০০% মালিকানাধীন "ACC Energy Storage"। সোনার রাজত্ব বিকশিত হয় সরকারি নবোদ্যোগে।২। সুখের পথের কাঁটাগুলি তবে রাজেশের উত্থানের এই আকাশমুখী রেখাচিত্রটি শুধুই কর্মস্পৃহা আর উদ্যমের গল্প নয়। বিতর্ক রাজেশ মেহতার পিছু ছাড়ে না কিছুতেই। ১৯৯৫ সালের আইপিও নিয়ে সেবি অভিযোগ তোলে যে আইপিওর সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরে ইস্যু করা ব্যাকডেটেড এপ্লিকেশনের ভিত্তিতে শেয়ার দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে, Viswapriya Group / associates র সঙ্গে হাত মিলিয়ে শেয়ারের কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা ও আইপিওর টাকা থেকে Viswapriya Group কে ২.৩৭ কোটি টাকা ঘুরপথে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও জানায় সেবি। ২০০৩ সালের ২৭ শে জানুয়ারি সেবি সেই সময়ের REL এর সব ডিরেক্টর দের তিন বছরের জন্য ক্যাপিট্যাল মার্কেট থেকে দূরে থাকার ও কোনরকম শেয়ার কেনা বেচায় অংশ নিতে নিষেধ করে নির্দেশ দেন। (৮)২০০৪ সালের DRI র বিরুদ্ধে মামলা: ২০০২-০৭ সালের এক্সইম (EXIM) পলিসিতে সরকার বছরে ২৫%-এর বেশি রপ্তানি বৃদ্ধি করলে বৃদ্ধির ১০% মূল্যের পণ্য নিঃশুল্ক আমদানি করতে পারবে বলে ঘোষণা করে। কিন্তু ২০০৪ সালের শুরুতে ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (DRI) দেখে, আদানি এক্সপোর্টস, কনক এক্সপোর্টস এবং রাজেশ এক্সপোর্টস-এর মতো বড় বড় সংস্থারা দুবাইতে নিজেদেরই কিছু কাগুজে বেনামি কোম্পানি বানিয়ে সেখানে সোনা পাঠাচ্ছে। দুবাইতে পৌঁছানোর পর আমদানির ট্যাক্স বাঁচাতে সেইসংক্রান্ত কাগজ বদলে ওগুলোকে 'সোনার স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি' বলে দেখানো হচ্ছে, আর সেই সোনা আবার ঘুরে ভারতে চলে আসছে। একই সোনা বারংবার গোল গোল করে ঘুরিয়ে এই কোম্পানিগুলো নিজেদের রপ্তানি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখাচ্ছে আর সরকারের থেকে কোটি কোটি টাকার শুল্কমুক্ত আমদানির ইনসেন্টিভ হাতিয়ে নিচ্ছে। জালিয়াতি ধরতে পেরে সরকার তখন তড়িঘড়ি নোটিফিকেশন জারি করে সোনা, হিরে ও গয়নাকে এই স্কিম থেকে বাদ দিয়ে দেয়। সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই কোম্পানিগুলো আদালতের দ্বারস্থ হয়। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ে ফলাফল মিশ্র হলেও, এই ঐতিহাসিক মামলার মাধ্যমে ভারতীয় কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি জালিয়াতির পন্থা লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। (৯) এই সময় আদানি এক্সপোর্টের সহযোগী সংস্থা হিসেবে রাজেশ এক্সপোর্ট কাজ করছিল। ২০১৩ সালের চোরাচালান কাণ্ডঃ কোচিনের SEZ থেকে একজন REL কর্মী কাগজ ছাড়া ৯০০ গ্রাম সোনা নিয়ে ট্রেনে উঠতে গিয়ে ধরা পড়েন। তদন্তে দেখা যায়, তিন বছর ধরে SEZ এ পূর্ণ-রপ্তানির উদ্দেশ্যে আমদানি করা নিঃশুল্ক সোনা ব্যাঙ্গালোরে এনে রিটেইল বাজারে বেচে অন্তত ৯০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। (১০) DRI যখন কোচিনের SEZ র কারখানায় হানা দেয়, তখন তারা সেখানে শুধুমাত্র একজন দারোয়ান ও একটা মাত্র ছোট মেসিন পান। গয়না উৎপাদন ও রপ্তানির কোন প্রমাণ তাঁরা পাননি। (১১) কোথায় সেই ১০০ টনের গয়না তৈরির কারখানা! তবু REL মিডিয়ায় খুবই সমাদৃত ছিল। ২০০৯ সালেই খবর হয়েছিল যে REL আদতে একটি বিশিষ্ট মিডিয়া হাউজের Private Treaties এর অন্তর্গত। (১২) হয়ত এত ভাল ভাল খবর বেরোন সেই কারণেই। ৩। সেবির সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী আদেশREL এর অস্বচ্ছ ম্যানেজমেন্ট ও আইনকে কাঁচকলা দেখানো বিভিন্ন সমস্যাজনক কাজকর্ম নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীমহল যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে একজন শেয়ারহোল্ডারের অভিযোগের ভিত্তিতে সেবি তদন্তে নামে। সেবির তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর ছবি। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত পাঁচ বছরে মোট ১৫,১৫,৩৮৫ কোটি টাকা বেশি আয় দেখানো হয়েছে। হিসেবমত REL এর আয়ের ৯৭-৯৯ শতাংশ আসে বিদেশি সাবসিডিয়ারি থেকে। অথচ সেই সব সাবসিডিয়ারির নিরীক্ষিত রিপোর্ট তারা কখনো প্রকাশই করেনি। বিনিয়োগকারীরা অন্ধকারেই ছিলেন। এমনকি এমনই একটি সাবশিডিয়ারি ভ্যালক্যাম্বি এস এর নিরিক্ষিত হিসেবের সঙ্গে তার হোল্ডিং কোম্পানির নিরিক্ষিত হিসেবের কোন সাযুজ্যই নেই, অথচ সেই অনিরিক্ষিত ডেটাই ব্যবহার করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা জনিত অর্থের বদল ( ২০২১-২৪ তিন বছরে ৮৬৬.৬ কোটি টাকা) বা মিউচুয়াল ফান্ডের ডিভিডেন্ডকে ( ওই একই সময়কালে ২০৪ কোটি টাকা) ব্যবসায়িক আয় বলে দেখিয়ে আয়কে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার উপর বাড়ানো হয়েছে। নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে করা শেয়ার বাজারের ডেরিভেটিভ ট্রেডিংও এসে ঢুকেছে কোম্পানির খাতায় ব্যবসার আয় হিসেবে! ২০২১-২৪ তিনবছরে বেশি দেখানো হয়েছে ১১,৪৮৭ কোটি টাকা, ভারতীয় সংস্থার এই তিন বছরের আয়ের ৬৬%। কোম্পানির টাকা বোর্ডের অনুমতি ছাড়াই ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে নেওয়া, নথি পত্র ছাড়াই এর ধার তাকে মেটানো, ইন্ট্রা-গ্রুপ ইনভেস্টমেন্টের সঠিক হিসাব লুকানো, আফ্রিকায় সোনার খনিতে বিনিয়োগ করেছেন জানিয়েও নথি দেখাতে না পারা—পাতায় পাতায় গলদ। সেই সঙ্গে সেবির তদন্তকারীদের তথ্য না দিয়ে অসহযোগিতা করার অভিযোগ তো আছেই। বস্তুত সেবির এই ১০৯ পাতার অন্তর্বর্তী আদেশ যেন এক রহস্য রোমাঞ্চ গল্প। (১৩) ৩ রা জুন ২০২৬ এ বের হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে সেবি REL ও রাজেশ মেহতাকে তিরিশ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট দিতে বলেছে, এছাড়াও রাজেশ মেহতাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে REL এর শেয়ার কেনা-বেচা-হস্তান্তর না করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং REL কে সেবির বিধি মেনে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সংশ্লিষ্ট সকল তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের হিসাব ও অন্যান্য সব কিছু প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে। সেবির তদন্তে আরও বেরোয় যে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি, REL ও Elest উভয়েই ACC তে টাকা দেয়। এর ফলে ACC-তে REL-এর মালিকানা ১০০% থেকে কমে ৫১.০৫% হয়। একই দিনে রাউন্ড ট্রিপিং হয়ে Elest থেকে ACC Energy-তে যায় ১৪৭ কোটি টাকা আর ACC Energy থেকে Elest-এ ফেরত যায় ১১২ কোটি টাকা। সেবির নির্দেশের পরে REL এর প্রকৃত আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। ভারি শিল্প মন্ত্রক নড়েচড়ে বসে। এমনিতেও এসিসি স্রেফ একটা দেওয়াল তোলা আর একটা শেড বানানো ছাড়া আর কিছুই এতদিনে করেনি। (১৪) বর্তমানে মন্ত্রক রাজেশ এক্সপোর্টকে চিরকালের মতন লিস্ট থেকে সরানোর কথা ভাবছে। (১৫) একটাই আনন্দের বিষয় যে অন্তত REL কে কোন ইনসেন্টিভের টাকা দেওয়া হয়নি। রাজেশ এরপর সেবিকে জানিয়েছেন যে আয়ের হিসেব একদম সঠিক দেখানো আছে। এবং এই পুরো ব্যাপারটাই নাকি সেবির সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি। আপাতত আগামীতে এই ঘটনা কোনদিকে গড়ায় সেটাই দেখার জন্য আমজনতার অপেক্ষা।৪। এল আই সি - REL এর গাঁটছড়া এলআইসির REL এর শেয়ারে বিনিয়োগের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত এলআইসির বিনিয়োগ খুব সীমিত ছিল। কিন্তু ২০১৭-১৮ সালে এলআইসির অংশীদারিত্ব এক লাফে ১.৯৯% থেকে বেড়ে হয় ৫.২৮%। তারপর থেকে ধাপে ধাপে বাড়তে বাড়তে ২০২১-২২ সালে তা পৌঁছায় ১০.৮%। টেবিল ১ – এল আই সির বছরওয়াড়ি শেয়ারের মালিকানা বৃদ্ধিপ্রশ্ন হলো – কেন? ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে যেসব খারাপ খবর পৌঁছাচ্ছিল, এলআইসি কি সেসব পায়নি? এটা প্রায় অসম্ভব। তাহলে? মনে রাখতে হবে কোন মিউচুয়াল ফান্ড কিন্তু এই শেয়ারের বড় সংখ্যায় শেয়ার কখনোই কেনেনি। একা এলআইসি-ই ফাঁসেনি। কানারা ব্যাংক বিদেশ থেকে সোনা আমদানির জন্য হয়ে REL এর হয়ে এলসি( লেটার অফ ক্রেডিট) ইস্যু করত। সেই টাকা পেত ভ্যালক্যাম্বি এস এ। ২০২০ তে ব্যাংক ভ্যালক্যাম্বিকে টাকা দিয়ে দিলেও REL ব্যাংককে টাকা দিতে পারেনা। কানাড়া ব্যাংকের ৫০৯.৩৯ কোটি ঋণটি এখন "Stressed Loan Exposure" -এ পরিণত হয়েছে। তারা সম্প্রতি একটি বিড নোটিসে সেই ঋণ অন্য কোনো ব্যাংক বা এনবিএফসি-র কাছে খোলা নিলামে বিক্রির জন্য ডাক দিয়েছে। (১৬) অথচ সেবি প্রমাণ করেছে, বিপুল পরিমাণ টাকা কোম্পানি থেকে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে নেওয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, কানারা ব্যাংকের এই ঋণটি দীর্ঘমেয়াদী টার্ম লোন নয়, তাই REL এখনও বুক ফুলিয়ে নিজেদের ঋণমুক্ত কোম্পানি দাবি করছে।বিরোধী দলগুলোর প্রশ্ন, ED, SFIO, CBI-এর মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি এত বড় অনিয়মের বিরুদ্ধে এতদিন নীরব কেন? LIC-র বিনিয়োগ কি 'ruling ecosystem'-এর নির্দেশে হয়েছিল? (১৭) (১৮) সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে যে তবে কি কোন রাজনৈতিক যোগসাজশ ছিল, নাহলে যার ট্র্যাক রেকর্ড এত জঘন্য, তাকে কীভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা সংস্থা বছরের পর বছর ধরে অক্সিজেন দিয়ে গেল? এটাই এখন ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় কর্পোরেট-পলিটিক্যাল স্ক্যান্ডাল।৫। সাফল্যের আড়ালে দীর্ঘ ধূসর ছায়া তথ্য-প্রমাণ যা বলছে, শুরু থেকেই রাজেশ মেহতার অবস্থান ধূসর এলাকায়। তার বার্ষিক আয়ের হিসেব শুরু থেকেই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ১৯৮২ সালে ১২০০ টাকা মূলধন নিয়ে শুরু করে ১৯৯২ সালে ২ কোটি, ১৯৯৫ সালে ৩৫ কোটি, ১৯৯৮ সালে ১২০ কোটি এবং ২০০২ সালে ১০০০ কোটি টাকায় পৌঁছে যাওয়া — এই অবিশ্বাস্য উল্লম্ফন দেখলে কেমন “কাকেশ্বর কুচকুচের অঙ্ক” বলে মনে হয় না? সে আমলে সোনার ব্যবসায় শুধু সার্কুলার ট্রেডিং বা চোরাচালান নয়, আরও বিভিন্নপথে জালিয়াতি হত। বিপিন সেহগাল মামলায় যেমন দেখা যায়, গয়না রপ্তানির অছিলায় সোনা আমদানি করে রপ্তানি করা হতো রূপোর ওপর সোনার জল দেওয়া গয়না – আর আসল সোনা কালোবাজারে বেচে লাভ-হি-লাভ। (১৯)রাজেশের কোম্পানি যে অ্যাকাউন্টিংয়ের সাধারণ নিয়ম মানে না সেটা বোঝা যায় ২০১৫ সালে ভ্যালক্যাম্বি অধিগ্রহণের সময় তাদের মন্তব্যেই। “For the last three years, on average per year, Valcambi generated revenues in excess of $38 billion and earnings before interest, tax, depreciation and amortization (Ebitda) of $33 million by refining and selling 945 tonnes of gold and 325 tonnes of silver per year,” (২০) ভ্যালক্যাম্বি টোল-রিফাইনার, তৃতীয় পক্ষের সোনা পরিশোধন করে — সোনাটা তার নিজের নয়। তাহলে তার ৩৩ মিলিয়ন ডলার EBITDA র সঙ্গে REL-এর হিসেবমত এত বিপুল অঙ্কের আয়ের আদৌ কি যথেষ্ট সাযুজ্য আছে? আপনি যদি কোন দোকানে এক লাখ টাকার সোনা পরিশোধন করতে দেন, আর সেই দোকান যদি পরিশোধনের জন্য ১০০ টাকা নেয়, তাহলে তো সেই দোকানের ব্যবসার আয় ১০০ টাকাই হবে, ১০০০০০ টাকা তো হতে পারে না, তাই না? অধিগ্রহণের পর ২০১৫-১৬ সালে REL-এর আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১,৬৫,২১১ কোটি টাকা – আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। একমাত্র ভ্যালক্যাম্বির বার্ষিক আয় ৩৮ বিলিয়ন ডলার ধরলেই এই বৃদ্ধি ব্যাখ্যা করা যায় – কিন্তু সেটা কি ঠিক ঠিক একাউন্টিং হল? সেই প্রশ্নই আজ ফিরে এসেছে। বর্তমানের তদন্তে সেবি ২০২০-২০২৪ সালের ডেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে: ভ্যালক্যাম্বির আয়ের চেয়ে তার হোল্ডিং কোম্পানি CGR-র আয় কেন বহুগুণ বেশি, CGR-র যখন নিজস্ব কোনো ব্যবসায়িক আয় নেই? REL এর বক্তব্য যে ভ্যালকাম্বি এসএ শুধুমাত্র প্রসেসিং আয় দেখিয়েছে। অন্যদিকে, GGR সোনার লেনদেনের সম্পূর্ণ মূল্য (গ্রস ভ্যালু) প্রসেসিং চার্জের সঙ্গে একসঙ্গে দেখিয়েছে। অথচ GGR এর এই হিসাব পদ্ধতির স্বপক্ষে REL কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত, মালিকানা রেকর্ড, ঝুঁকি বণ্টনের নথি বা গ্রুপের ভেতরের চুক্তিপত্র কিছুই দেখাতে পারেনি। ৬। লোভের ফাঁদ ও সিস্টেমের দুর্বলতাকিন্তু কেন আয় ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো? কারণ বিশাল আয় মানেই সরকারি সুবিধার ভান্ডার ‘খুল-যা-সিম-সিম’। ১৯৯৫ সালে স্টার ট্রেডিং হাউসের তকমা পেলেই মিলত হস্তান্তরযোগ্য আমদানি পারমিট, শুল্ক ছাড়, ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়া আমদানি এবং গ্রিন চ্যানেলের সুবিধা সহ হরেক রকম সুযোগ। অথচ সেই তকমা পেতে গেলে বছরে গড়ে ৩৭৫ কোটি টাকার রপ্তানি দেখাতে হতো। সোনার ব্যবসায়ীদের জন্য এই লক্ষ্য ছিল দ্বিগুণ। প্রাক-ইন্টারনেট যুগে জালিয়াতি ধরাও ছিল অনেক কঠিন। তাই লোভী মানুষ সহজেই সে পথে গড়িয়ে পড়তেন।যে স্কিম ব্যবসায়ীদের রপ্তানিতে উৎসাহ দিতে তৈরি হয়েছিল, সেই স্কিমই লোভীদের জালিয়াতিতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ২০২১-২২ সালের PLI স্কিমেও একই ছবি — ১৫০০ কোটির বেশি নেট ওয়ার্থ বা প্রতি GWh-এ ২২৫ কোটি টাকা নেট ওয়ার্থ দেখাতে পারলে তবেই ১৮,০০০ কোটি টাকার ইনসেনটিভের অংশ আসবে হাতের মুঠোয়।তাছাড়া কাগজে-কলমে কোম্পানিকে মহাশক্তিশালী দেখালেই ব্যাংক ঋণ পাওয়া সহজ হয়ে যায়। শেয়ার মার্কেটে দাম বাড়ে চরচরিয়ে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা ঢালতে থাকে। এরপর সেইসব অর্থের কিছু অংশ যদি বহুস্তরীয় অফশোর লেনদেনের জালে হারিয়েও যায়, তাহলে সেই টাকার হদিশ পাওয়া কি এতই সহজ?কখনও কখনও তীরে এসে তরী ডোবে, এই যা দুঃখ।৭। বিনিয়োগকারীর বাস্তবতা৩ রা জুন, যেদিন সেবির অর্ডার বেরোল, সেদিন রাজেশ এক্সপোর্টের শেয়ারের দাম ছিল ১০৯.৩৮ টাকা আর ৯ই জুন সেটা দাঁড়িয়েছে ৮৯.১১ টাকায়। অর্থাৎ এই কদিনে বাজার থেকে এই একটি মাত্র শেয়ারের দরুণ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা মুছে গেছে। ১০.৮% শেয়ারের মালিক এলআইসির বড় ক্ষতি হল। দেশি খুচরো বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল ১৫% মতন শেয়ার। তাদেরও ক্ষতি যথেষ্ট। কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক আয় দেখানো রাজেশ এক্সপোর্টসের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬৩১ কোটি টাকায়। অবশ্য এখনও শেয়ার কেনাবেচা চলছে – হয়ত বা বড় দাঁও মারার আশায়। এই ধরণের ঘটনা ভারতে এই প্রথম না। সত্যম কেলেংকারিতে রামলিঙ্গ রাজু ঠিক এই ভাবে ভুয়ো তথ্য দিয়ে ব্যবসার আয় ফাঁপিয়ে তুলেছিল। DHFL রাশি রাশি শেল কোম্পানির মধ্যে দিয়ে টাকা ঘুরিয়ে গোলক ধাঁধা বানিয়েছিল। রাজেশের আইপিও কেলেঙ্কারিরর ছায়া দেখা যায় ২০০১ সালের কেতন পারেখের কীর্তিতে। তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীর ভবিষ্যৎ কি কেবল স্ক্যামড হওয়ার অপেক্ষায় থাকা? সেবির কি কিছুই করার নেই? এই সংস্কারগুলি নিতান্তই জরুরি -১) ভারতীয় লিস্টেড কোম্পানির বিদেশি সাবসিডিয়ারিগুলির আয় গ্রুপের মোট আয়ের নির্দিষ্ট শতাংশের বেশি হলেই বাধ্যতামূলকভাবে ভারতীয় শীর্ষ অডিট ফার্ম দিয়ে সেই সাবসিডিয়ারিসমূহের পিয়ার রিভিউ অডিট করানো বাধ্যতামূলক করা হোক।২) অনিরীক্ষিত ডেটা ভারতের কনসোলিডেটেড ব্যালেন্স শিটে যোগ করা সম্পূর্ণ বন্ধ হোক। ৩) কোনো অডিটর বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম অবহেলা বা জালিয়াতির সাথে আপস করলে, তবে শুধু তাদের লাইসেন্স বাতিল নয়, বরং তাদের ওপর এমন বিপুল অংকের আর্থিক জরিমানা করা হোক যা কোম্পানির জালিয়াতির পরিমাণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ৪) অস্বাভাবিক অনুপাতের Receivables, বেসিক compliance লঙ্ঘন বা financial statement-এ বড় অসঙ্গতি দেখা দিলে সিস্টেমের থেকে রিয়েলটাইম "রেড ফ্ল্যাগ" জারি করার ব্যবস্থা হোক।২০০৯ সালের সত্যম স্ক্যামের পরে, বিগত বছরগুলোতে ভারতীয় বাজার অনেক বেশি পোক্ত হয়েছে। আজকের দিনে সাধারণ বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো "তথ্য এবং সতর্কতা"। তাই নিয়মটি খুব সহজ: যে কোম্পানির ব্যবসা আপনি নিজের চোখে বা সহজ বুদ্ধিতে বুঝতে পারছেন না, যার ব্যালেন্স শিটের বেশিটা আপনি দেখতেই পাচ্ছেন না, তা যতই লোভনীয় হোক, সেই শেয়ার থেকে দূরে থাকাই আত্মরক্ষার সব চেয়ে বড় উপায়।রেফারেন্সগুলি:১) https://www.forbesindia.com/article/lists/india-rich-list-2016/the-gold-rush-how-rajesh-mehtas-out-of-the-box-ideas-helped-him-build-his-jewellery-empire/45105/1২) https://archives.digitaltoday.in/businesstoday/20061231/current2.html৩) https://www.oneindia.com/2007/01/16/rajesh-exports-unveils-chain-of-laabh-retail-outlets-1168940503.html৪) https://economictimes.indiatimes.com/industry/cons-products/fashion-/-cosmetics-/-jewellery/rajesh-exports-all-set-to-launch-shubh-jewellers/articleshow/2563257.cms?from=mdr৫) https://economictimes.indiatimes.com/industry/cons-products/fashion-/-cosmetics-/-jewellery/rajesh-exports-buying-out-jewellers-in-south/articleshow/2357059.cms?from=mdr৬) https://www.livemint.com/Companies/xvkie5JEakKk0kscCJad9J/Rajesh-Exports-acquires-European-precious-metals-refiner-for.html৭) https://www.pib.gov.in/PressReleasePage.aspx?PRID=1809037®=48&lang=2৮) https://www.sebi.gov.in/enforcement/orders/jan-2003/order-against-rajesh-mehta_16514.html৯) https://indiankanoon.org/doc/185919182/১০) https://www.business-standard.com/article/companies/rajesh-exports-under-dri-scanner-113051400355_1.html১১) https://www.newindianexpress.com/cities/kochi/2013/May/22/gold-firm-involved-in-dubious-deals-dri-479600.html১২) https://fraudsofindia.blogspot.com/search?q=Rajesh+Exports১৩) https://www.sebi.gov.in/enforcement/orders/jun-2026/interim-order-in-the-matter-of-rajesh-exports-limited_101820.html১৪) https://www.casansaar.com/news-SEBI/rajesh-exports-under-government-lens-as-sebi-order-triggers-fresh-concerns/14426.html১৫) https://auto.economictimes.indiatimes.com/news/auto-components/sebi-allegations-rock-rajesh-exports-as-pmo-reviews-battery-pli-scheme/13158179১৬) https://www.canarabank.bank.in/documents/20120/0/CB_REL+-+Trf+of+Loan+Exp+-+BPD+-+04.05.2026+Final.pdf/50e1c2ca-d5a5-abe8-cd04-fe6ccfb452d1?version=1.0&t=1777895212391&download=true&objectDefinitionExternalReferenceCode=44600fa6-ade9-4413-6e1d-ae968cf3c663&objectEntryExternalReferenceCode=2c9f9a3c-b917-4943-0431-5e9838afd5b4১৭) https://www.thehindu.com/business/why-did-ed-cbi-fail-to-raise-red-flags-over-alleged-irregularities-of-rajesh-exports-asks-congress/article71066742.ece১৮) https://economictimes.indiatimes.com/news/politics-and-nation/congress-questions-lics-10-8-stake-in-sebi-probed-rajesh-exports/articleshow/131500949.cms?from=mdr১৯) https://indiankanoon.org/doc/36385212/২০) https://www.livemint.com/Companies/xvkie5JEakKk0kscCJad9J/Rajesh-Exports-acquires-European-precious-metals-refiner-for.html
    আশির আউনিবাউনি - স্মৃতি ভদ্র | ছবি: রমিতএকটা প্রকান্ড বরইগাছের তলায় দাঁড়ানো দোতলা টিনের ঘর। বহুদিনের রোদজলে টিনগুলোতে জং ধরা সময় এমনভাবে গেঁড়েগুড়ে বসে থাকতো যে তাকাতেই বহুবছরি জীবনের গল্প একদম রাখঢাক না করেই বলে দিতো বিনাদ্বিধায়। পিচঢালা পথ ছেড়ে কম করে হলে শ’কদম। মাটির, ছায়াঢাকা পথ। সে পথের দু’পাশে দেবদারু গাছের সবুজ প্রহরা। একটু কসরত করলেই ডানেবামে সেই নিছিদ্র প্রহরা অতিক্রম করে চোখ চলে যায় তাঁতঘরে। তবে সেসব তাঁতঘরে মাকুর আওয়াজ কমতে শুরু করে দিয়েছিলো ততদিনে। হাতে টানা তাঁতমাকুর নিরবচ্ছিন্ন ‘খটাস খটাস’ শব্দ বুজে আসা শুরু হলেও ভেতর বাড়ির উঠোনে তখনও অবশিষ্ট বনেদিয়ানা বিদ্যমান। উঠোনের রোদে তিল তিসির যুগলবন্ধন, ঢেঁকিপাড়ে তুলসীমালা চালের গুঁড়ো গুঁড়ো সময় আর কারণে অকারণে উনুনে পরবের পদ—সবই আসলে পুরোনোকে বহাল রাখার যথাযোগ্য চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে সময়ের গতি তো একমুখী। তাই পুরোনো যতই ধুয়েমুছে যত্ন করে রাখো না কেন নতুনের আছড়ে পড়া ঢেউকেও যে আপন করে নিতে হয়, এটা মনে হয় জীবনের স্বত:সিদ্ধ বোঝাপড়া। তাই উঠোনের অন্যপাশে প্রাচীন কতগুলো সারাবছরি আম গাছের বিসর্জন কালেই বাজনা বেজে উঠেছিলো ইমারত বোধনের। দিনক্ষণ দেখে সাহাপাড়ার গোবিন্দ মন্দিরের পুরোহিত তেল সিঁদুর মাখানো নারায়ণ শিলা যেদিন তুলসীতলায় রাখলো ঠিক সেদিনই উলুযোগারের আওয়াজে স্পষ্ট হয়েছিলো বাড়িতে লক্ষ্মীবরণের প্রস্তুতিও চলছে। তিনখানা সিমেন্টের ঘর। হালকা হলুদ রঙের দেওয়াল। নতুন আসবাব। শ্রাবণের মেঘে উড়ে এসেছিলো বারতা। বাঘকাকুর বিয়ে। পাশের পাড়ার সুতনূ কিশোরী আমার ছোট বৌমা হয়ে আসছে। সময়টা আশির প্রথমভাগ। দাদুর রেডিও তখনও কাঠের টেবিলে নিত্য পরিসেবারত। তবে ওই যে যুগের হাওয়া, যার টোকায় একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যাবার নামই তো জীবন!ছোট বৌমা বাড়িতে এলো শ্রাবণের এক সন্ধ্যায়। আর তাকে বৌভাতের দিনে স্বয়ং বাঘকাকু উপহার দিলো নতুন এক অবাক বাকশো। সে বাকশো বাড়িতে ঢুকতেই সকলের ভেতর অস্ফুট শোরগোল। দত্ত স্টুডিও থেকে সাটার টানা ক্যামেরাও বাড়িতে এলো সময়কে কালো রিলে বন্দি করবে বলে। ঝলমলে ছোটবৌমা গা ভর্তি গহনা পড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সেই অবাক বাকশোর পাশে। ক্লিক…ক্লিক…ক্লিক…রিলে টানা সময়ের চালচিত্রে শুরু হলো বাড়ির উঠোনের এক নতুন গল্প।যদিও গল্পের মধ্যমণি যথারীতি সেই অবাক বাকশো। বিশ ইঞ্চির এক বড়সড় বাকশো। সামনে কাঁচ লাগানো আর কতগুলো রুপালী রঙের নব। সেসব নব ঘুরালে প্রথমে কাঁচের দেয়ালে সাদাকালো ঝিরঝির। এরপর উঠোনে বাঁশের মাথায় লাগানো এন্টেনার মাথা এদিক ওদিক ঘোরালে আস্তে আস্তে স্পষ্ট ছবি। সে ছবি হাসে, কাঁদে, গল্প বলে। আমাদের একান্ন উঠোনকে মাঝখানে রেখে চারপাশের ঘরগুলোর মধ্যে বড়ঘরই ছিল আমাদের অঘোষিত বৈঠকখানা। কেতাবিয়ানা ছিল না তাতে মোটেও। ঘরের মেঝেয় নেহাতই পাটি পেতে সকাল-সন্ধ্যায় চা মুড়ি খাওয়া অথবা জরুরি কোনো আলোচনার আটপৌরে আয়োজনে সে ঘরই ছিল আমাদের অব্যর্থ গন্তব্য। একখানা কালো রঙের নকশি কাঠের খাট, খুব সাধারণ একখানা টেবিলক্লথে ঢাকা টেবিল আর মাত্র একটা চেয়ার। সেই চেয়ার অবশ্য বাড়ির যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একমাত্র দাদুর দখলে থাকতো দায়িত্বশীলতার একমাত্র বাহক হয়ে। আর ছিল বারো ব্যান্ডের রেডিওখানা। যে সন্ধ্যা থেকে কুনকুন সুরে কখনো গাইতো কখনো গুরুগম্ভীর হয়ে পড়ে যেতো সন্ধ্যা সাতটার সংবাদ। তবুও বৈঠকখানার সাধারণ সংজ্ঞা হয়ে বড়ঘরই ছিল আমাদের সকল বিনোদনের একমাত্র অনুষঙ্গ। কিন্তু সেই অবাক বাকশো আমাদের বাড়িতে আসতে না আসতেই বদলে গেলো সন্ধ্যার সকল চিরচেনা হিসেবনিকেশ। একান্ন উঠোনের পশ্চিমপাশে তখন একহারা তিনটা ইটের ঘর। সদ্য মাথা তোলা সেই ঘরগুলোর একটিতে মহাসমারোহে স্থাপিত হয়েছিলো সেই বাকশো। বিকেল হতেই বাড়ির উনুন নিভে যেতো। মা বৌমারা গা ধুয়ে মাড় দেওয়া কড়কড়ে শাড়ি পড়ে যখন কপালে সিঁদুর আঁকতে বসতো তখন মনিপিসি ঘড়ি দেখে ঠিক পাঁচটায় পৌঁছে যেতো অদ্ভুত সেই বাকশের সামনে।নব ঘুরিয়ে এন্টেনা এদিকওদিক নাড়িয়ে নানা কসরতে যখন বাকশোতে ছবি স্পষ্ট করতো তখন সেখানে নেহাতই কোনো এক গুরুগম্ভীর আলোচনা কিংবা হাটেমাঠে কৃষি নিয়ে জরুরী কোনো বার্তালাপ। তবে এসবের মাঝেও মন খুশি হয়ে উঠতো যখন নিটোল মুখের অঞ্জলি মোস্তফা ঘোষণা করতো 'বি জে এন্ড দ্যা বিয়ার' উপস্থাপনার, তখন বেশ গেঁড়েগুড়ে বসতাম আমি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার আশেপাশে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তো। মা কাকিদের কেউ কেউ সন্ধ্যার চায়ের পালা শেষ করেই এসে বসতো সেই অবাক বাকশের সামনে। তবে সপ্তাহের কোনো একদিন যখন রাত ন'টার পর সকাল-সন্ধ্যা নাটকের প্রারম্ভিক সুর বেজে উঠতো তখন বলতে গেলে সারা পাড়া হয়ে উঠতো আমাদের কুটুম। ঘর ছাড়িয়ে বারান্দা উঠোন থেকেও তখন একনিষ্ঠ নিবদ্ধ অসংখ্য চোখ সেই অবাক বাকশে। এরপর রাত পোহালেও সপ্তাহজুড়ে মা কাকিদের গল্পে থেকে যেতো সেই শিমু ভাবি কিংবা বুবলি। গল্প বদলে যায় বাড়ির। বদলে যায় বাড়ির সন্ধ্যা। মাটির কোলে, যদি কিছু মনে না করেন, এইসব দিনরাত্রি, ছায়াছন্দ, পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি, দ্যা বিল কসবি শো, মাটি ও মানুষ---আমরা বড়ঘরকে পেছনে ফেলে একটু একটু করে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম সেই অবাক সাদাকালো বাকশে। বড়ঘরের লালমেঝেয় পাতা পাটিকে একলা করে আমাদের চায়ের আড্ডা সীমিত হয়ে আসছিলো ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই।সাদাকালো অবাক বাকশো বদলে দিচ্ছিলো আমাদের বাড়ির একান্ন সময়ের গল্প। তবে সেই অবাক বাকশের সকল আকর্ষণ উপেক্ষা করে কাঠের টেবিলে কুনকুন করে বেজে চলা রেডিও তখনও দাদুর সামনে একাই বলিষ্ঠ হয়ে বলে চলতো,সন্ধ্যা সাতটা, আপনারা শুনছেন ভয়েস অফ আমেরিকা…দাদু ঘাড় গুঁজে মনোযোগ দিয়ে সেই রেডিওর সামনে বসে থাকতো রাত অবধি। কখনো ভাবগম্ভীর চেহারা কখনও উচ্ছল। আর কখনও গুনগুন সুর,চারিপাশে মোর উড়িছে কেবলশুকনো পাতা মলিন ফুল-দলবৃথাই কেন হায় তব আঁখিজলছিটাও অবিরল দিবস-যামীহারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে…আশির আউনিবাউনি তাই সেই শোলোক যা আওড়াতে আওড়াতে আমরা শুধু বড়ই হই না, বদলেও যাই একান্ন উঠোনের এক্কাদোক্কা সময়কে পাশ কাটিয়ে। আর সেই বদলই আমাদের হাত ধরে নিয়ে যায় কোনো এক একলা দিনের গান শোনাতে। চলবে...
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3পুরুলিয়া, বীরভূম, বাঁকুড়া এই জেলাগুলি বহু ভাবে আমাকে ঋদ্ধ করেছে। শাল পিয়ালের ছায়াঘেরা পথে হাঁটতে হাঁটতে একবার খোঁজ পেয়েছিলাম এক ধনভাণ্ডারের - শালতোড়ার জঙ্গল পেরিয়ে, দ্বারকেশ্বর নদের কোলে শুশুনিয়া পাহাড়ের আড়ালে এক আশ্চর্য ইস্কুল, যেখানে আমের মুকুলের ছাতার তলায় ছোট ছোট কুঁড়ির মনে অ আ ক খ, বর্ণপরিচয় আর সহজ পাঠের স্বপ্ন বোনা হয়। বাঁকুড়ার ঝন্টিপাহাড়ী গ্রামে ছাঁচনপুর এলাকায় লক্ষ্মী মুর্মু স্মৃতি শিশু বিদ্যালয় - ব্লক ছাতনা। ছাঁচনপুর, পাকা রাস্তার নাগালের বাইরে, গুগল বাবাও যার খোঁজ পায়না: যেখানে জেদ আর ভালোবাসা হাত ধরাধরি করে চলে। দুই নারী লক্ষ্মী মুর্মু আর রেবা মুর্মু - তাঁদের অদম্য লড়াই দেখে চমকে উঠেছিলাম। জন্ম থেকেই অকুতোভয় লক্ষ্মী - গ্রামের আর পাঁচটা মেয়ের পথে না চলে গ্রাম থেকে দূরে হাই ইস্কুলে পড়তে গেলেন। পাড়ার মোড়লেরা সেটা ভালো ভাবে নিতে পারেননি। তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী - তখন কৈশোর, ইস্কুলের হোস্টেল থেকে ছুটিতে বাড়ি এলেন, আর পাঁচটা শহরে বা গ্রামে ছেলে মেয়েরা যেমন আসে। কিন্তু লক্ষ্মীর গাঁয়ে ব্যাপারটা সহজ হলনা। একদিন সেই লক্ষ্মী মেয়ে ভিডিও শো দেখে ঘরে ফিরছিল দুই বন্ধুর সঙ্গে। কিন্তু নাঃ সুস্থ দেহে ফেরা আর হলনা। উদ্ধার হল সংজ্ঞাহীন দেহ - কি ভাগ্যি প্রাণটুকু কীভাবে যেন টিঁকে গিয়েছিল খাঁচার ভেতর। তবে পরের ঘটনাপ্রবাহও বাঁধা গতে চললোনা। লাগলো অবশ্য বেশ কয়েক বছর - হাল ছেড়ে দেবার জন্য সময়টা যথেষ্ট লম্বা। কিন্তু হাল ছেড়ে দেবার পাত্রী আমাদের লক্ষ্মী মেয়ে ছিলেননা। শেষ পর্যন্ত ষোলো জন অভিযুক্তের দুজন ছিল ফেরার, আর বাকি চোদ্দ জনের বারো বছর জেল হল। তবে এই ফলাফলের মাঝখানে ভয় দেখানো, বাড়ি ছাড়া করা, কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া, একঘরে করা সব চলেছে। শুধু দমানো যায়নি লক্ষ্মী মেয়েকে। পাশে ছিল এক জুনিয়র বান্ধবী রেবা। লক্ষ্মী চলে গেছেন ক্যানসারে। রেবা রয়েছেন তাঁর সব কাজের ভার কাঁধে নিয়ে। দুজনে মিলে তৈরি করেছেন গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী। গ্রামে মাদকের ঠেক বন্ধ করেছেন। গড়ে তুলেছেন ‘ছাচনপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি’, মায়েদের বাচ্চা রাখার ক্রেশ। এলাকার লোকেদের বুঝিয়ে তাদের বাচ্ছাদের নিয়ে শুরু করেছেন ইস্কুল। লক্ষ্মীকে চোখে দেখার সৌভাগ্য হলনা। শার্ট প্যান্ট পরা আটপৌরে রেবা মুর্মুকে দেখে আমি তো বাকরুদ্ধ। ছোট খাটো চেহারাটি - অতি সাধারণ সুতীর শার্ট প্যান্টের আড়ালে পেশির শক্তি বোঝা যায়। একেবারে ছোট করে ছাঁটা চুল, মুখের রেখায় জীবনের বহু ঝড় ঝাপটা পেরোনোর মানচিত্র। কিন্তু দু চোখের দৃষ্টিতে যেন করুণার ফল্গুধারা, আর মুখের হাসিতে এক আকাশ সারল্য। অল্প বয়স থেকে মানুষ চরিয়ে খাই। এই রুক্ষ প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন অদম্য প্রাণশক্তির দেখা পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি। গিয়ে দেখলাম গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে রোদ্দুরের ঝিলিমিলি। আর সেই পরিবেশে আলাদা আলাদা ইঁটের গাঁথুনির শ্রেণীঘর, যেন এক একটি কুটীর - কাছে গিয়ে দেখি শুধু পিলার আর মেঝে পাকা, মাথায় করোগেটেড ছাউনি, দেয়াল হয়নি পয়সার অভাবে, হয়তো হবে ভবিষ্যতে। কিন্তু সেই পিলারের গায়ে গায়ে বাংলার মনীষীদের ছবি আঁকা। মেঝেতে কচিকাঁচার দল হাসিতে উচ্ছল। নামতা, সহজ পাঠ সব একেবারে ঠোটস্থ। একবার সুইচ টিপে দিলেই ব্যাস - সুর করে তারস্বরে শেষ অবধি তারা বলবেই। ঘন্টা পড়তেই, নিজের নিজের থালা ধুয়ে এনে খেতে বসল সব। খাবার পর আবার নিজের থালা মেজে আনলো। দিকে দিকে বাচ্চারা আর শিক্ষকেরা মিলে নানারকম চাষ আবাদ করেছেন দেখলাম। মাঠে দোলনাও আছে। ইসকুলে লাইব্রেরিও আছে। ছবি দেখলাম, কখনও বন মহোৎসব হচ্ছে, কখনও সাপে কামড়ানোর ব্যাপারে সাবধানতা শেখানো হচ্ছে, হাতের কাজ শিখছে বাচ্চারা। পড়াশোনার সঙ্গে চলেছে জীবন গড়ার পাঠ। সমস্যা হল ২০১৫ থেকে শত চেষ্টা করেও এখনও সরকারি খাতায় ইস্কুলের নাম ওঠেনি। কেউ কখনও খবর পেয়ে সেখানে যান, কিছু সাহায্য দিয়ে আসেন, বই-খাতা, স্কুল ব্যাগ, পেনসিল, কলম, রং তুলি। এভাবেই চলছে। তবে এখানকার বাচ্চাদের মৌলিক চাহিদা হল পোশাক, ব্যাগ ও জুতো, এবং অবশ্যই দুপুরের নিশ্চিত খাবার। ছোটদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য চাই গ্রন্থাগারের জন্য নতুন বই ও নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা। এর সঙ্গে দরকার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিঃস্বার্থ সময় ও মমতা। পুরুষ মহিলা মিলে চারজন শিক্ষককে দেখলাম। নামমাত্র সাম্মানিকে কাছে পিঠের গ্রাম থেকে ভালোবাসার টানে আসেন। ইশকুলটা সরকারি হয়ে গেলে শিক্ষকদের মাইনের চাপটা কমে, কিন্তু অন্য আর একটা বিপদও আছে। বাইরে থেকে চাকরির জন্য চাকরির মানসিকতা নিয়ে এখানে লোক এলে মান ধরে রাখা মুশকিল হবে। আজ এখানে তেমন কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ নেই, আছে কেবল মানুষ গড়ার সংকল্প। তাত্ত্বিক ভূগোলের আলোয় ছাঁচন পুরের এই ইশকুলকে যদি বিচার করি, তবে দেখি এ এক অদ্ভুত বিকল্প ক্ষমতার সমীকরণ। লক্ষ্মী আর রেবা - এঁদেরকে যদি আমি ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী ভাবি, তাহলে বলব এঁরা দুজনেই ‘স্পেস’ (Space) বা স্থান এবং ‘পাওয়ার’ (Power) বা ক্ষমতার সমীকরণ যে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। একটু বুঝিয়ে বলি আমার ভাবনা। আসলে প্রথাগত গ্রামীণ সমাজে ‘স্পেস’ বা স্থান ভাগ করা থাকে। বাড়ির ভেতরটা নারীর, আর বাইরের জগৎ, পঞ্চায়েত, মোড়লতন্ত্র বা হাইস্কুলের পথটি পুরুষের—এই হল অলিখিত নিয়ম। লক্ষ্মী মুর্মু যখন গ্রামের সীমানা পেরিয়ে দূরের হাইস্কুলে পড়তে গেলেন, তখন তিনি আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তৈরি সেই ‘স্থানিক সীমানা’ (Spatial Boundary) লঙ্ঘন করেছিলেন। মোড়লদের ক্ষোভ কেবল শিক্ষার বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল একজন আদিবাসী মেয়ের এই স্থানিক স্বাধীনতা বা 'Spatial Mobility'-র বিরুদ্ধে। সামাজিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করলে বিশ্ব জুড়ে এই যে নৃশংস অত্যাচারের প্র্যাকটিস, তা আসলে নারীর শরীরকে একটি ‘রণক্ষেত্র’ (war -territory) বানিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের পুরুষতান্ত্রিক অপচেষ্টা অথবা বলা যেতে পারে একধরণের ফিয়ারস্কেপ তৈরি করা। যখন গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটল, তখন চারপাশের চেনা ভূগোলটাই (যেমন- হাইস্কুলের রাস্তা, জঙ্গল, বিকেলের নির্জন পথ) আদিবাসী মেয়েদের জন্য একটি 'ভীতিপ্রদ স্থান' বা Fearscape-এ পরিণত হলো। ভূগোলবিদ জিল ভ্যালেন্টাইন (Gill Valentine) রেচেল পেইন (Rachel Pain) বা গিলিয়ান রোজের মতো নারীবাদী ভূগোলবিদরা এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন - ভূগোলের এই শাখাটির নাম দেওয়া হয়েছে জিওগ্রাফি অফ ফিয়ার। মোড়লতন্ত্র আসলে এই ভয়ের ভূগোলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল যাতে অন্য কোনো মেয়ে আর গ্রামের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার সাহস না পায়। সমাজে এই পরিস্থিতিতে ভয় কেবল একটা মানসিক অনুভূতি থাকেনা, ভৌগোলিক ভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একঘরে করা, কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া—এগুলো সবই হলো সামাজিক ও ভৌগোলিক স্পেস থেকে একজন মানুষকে উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়া। এতে একজন মানুষকে ইনসাইডার থেকে জোর করে আউটসাইডার বানিয়ে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু সাজা ঘোষণা এবং ঘরে বাইরে দুরন্ত লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে লক্ষ্মী ও রেবা সেই ভয়ের ভূগোলকে ‘প্রতিরোধের ভূগোল’ (Geography of Resistance)-এ রূপান্তরিত করেছেন। এই আখ্যানের সবচেয়ে জাদুকরী এবং ঐতিহাসিক দিকটি এখানেই। লক্ষ্মী দেবী এবং রেবা দেবী কেবল ভয়ের শিকার হয়ে বেঁচে থাকেননি; তাঁরা সেই ফেনোমেনোলজিক্যাল ট্রমা বা ব্যক্তিগত ভয়ের অভিজ্ঞতাকে একটি সমষ্টিগত সামাজিক স্পেসে (Spatial Resistance) রূপান্তরিত করেছেন। লক্ষ্মী দেবী নিজের শরীরের এবং ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সেই গভীর ক্ষত ও ভয়কে এক অদ্ভুত দার্শনিক উত্তরণের মাধ্যমে সবার প্রতি ‘সহমর্মিতা’ বা Empathy-তে রূপান্তর করলেন যা সবাই পারেনা। রেবা দেবীকে সাথে নিয়ে তিনি যখন গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও সেই দেয়ালহীন স্কুলটি গড়লেন, তখন তাঁরা আসলে সেই পুরনো ‘ভয়ের ভূগোল’ বা Fearscape-টিকে মুছে দিলেন। যে পথ দিয়ে হাঁটতে মেয়েরা ভয় পেত, আজ সেই পথ দিয়েই শিশুরা সুর করে নামতা বলতে বলতে স্কুলে যায়। এটাকেই বলে স্থানের পুনর্নির্মাণ বা ‘পাবলিক’ আর ‘প্রাইভেট’ স্পেসকে মিলিয়ে দেওয়া। নারীবাদী ভূগোলের অন্যতম উদ্দেশ্য হল এই দুটো স্পেসের বিভাজন রেখা মুছে ফেলা। রেবা ও লক্ষ্মী যখন গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করলেন এবং ‘ছাঁচনপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি’র মাধ্যমে একটি ক্রেশ বা মায়েদের বাচ্চা রাখার জায়গা গড়লেন তখন যে মায়েরা ঘরের কাজের জন্য বাইরে বেরোতে পারতেন না, তাঁরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ‘পাবলিক স্পেস’-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন। গৃহস্থালির শ্রমের বোঝা ভাগ করে নিয়ে তাঁরাও কিছুটা স্থানিক ক্ষমতা (Spatial Empowerment) অর্জন করলেন।নারীবাদী ভূগোলে বডি স্পেস বা ‘শরীর’ নিজেই একটি ক্ষুদ্রতম ভৌগোলিক স্কেল - সাইট। রেবাকে যেমন দেখলাম - সেই সুতীর আটপৌরে শার্ট-প্যান্ট, ছাঁটা চুল, পোশাকের আড়ালে পেশির শক্তি—তা প্রথাগত ‘নারীসুলভ’ শরীরের ভৌগোলিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। রুক্ষ প্রাকৃতিক পরিবেশের আর প্রতিকূল সমাজের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তাঁর শরীর নিজেই একটি প্রতিরোধের প্রতীক বা ‘Site of Resistance’ হয়ে উঠেছে। হিউম্যানিস্টিক বা মানবিক ভূগোলের সবচেয়ে মৌলিক তত্ত্ব হলো শূন্য স্থান বা ‘Space’ কীভাবে মানুষের আবেগ দিয়ে একটি চেনা জায়গা বা ‘Place’-এ পরিণত হয়। গুগল ম্যাপে কিন্তু ছাঁচনপুরের ওই বিন্দুর কোনো অস্তিত্ব নেই। সেটি গুগল বাবার কাছে একটি নামহীন, অবহেলিত ‘Space’। কিন্তু লক্ষ্মী ও রেবা মুর্মু তাঁদের ভালোবাসা, শ্রম এবং শিশুদের কলকাকলি দিয়ে সেই শূন্যস্থানকে একটি ‘Place’ (স্থান)-এ রূপান্তরিত করেছেন। যে স্বচক্ষে ইশকুলটা দেখেছে তার কাছে জায়গাটা আর শুধু অক্ষাংশ - দ্রাঘিমাংশের হিসেবে আটকে নেই; এটি এখন প্রান্তিক শিশুদের স্বপ্ন, আবেগ আর ভরসার এক ভৌগোলিক ঠিকানা। দার্শনিক ই-ফু-তুয়ানের ভাষা ধার করে বলা যায় ছাঁচনপুরের ইশকুল হল ঐ এলাকার শিশুদের জন্য এক পারফেক্ট টোপোফিলিয়া। ই-ফু তুয়ান বলেছিলেন, মানুষের জন্মের সময় মানচিত্রে কোনো একটি জায়গা কেবলই একটা শূন্য স্থান বা জ্যামিতিক বিন্দু থাকে, যাকে আমরা বলি ‘Space’। কিন্তু মানুষ যখন সেখানে বাস করতে শুরু করে, তার স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, আনন্দ এবং কান্নাকে সেই জায়গার সাথে জড়িয়ে ফেলে, তখন সেই জড় ‘Space’ রূপান্তরিত হয় একটি জীবন্ত ‘Place’ বা ‘স্থান’-এ।এই ‘Place’-এর প্রতি মানুষের মনের ভেতর যে ভালোবাসার ফল্গুধারা বইতে থাকে, তা-ই হলো টোপোফিলিয়া। মানবিক ভূগোলে বলা হয়, টোপোফিলিয়া মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শিশুরা নিজেরা শিক্ষকদের সাথে মিলে চাষআবাদ করছে, মাঠের দোলনায় খেলছে, সাপের কামড় থেকে বাঁচার বাস্তব পাঠ নিচ্ছে। এর ফলে ওই রুক্ষ প্রকৃতির রুক্ষতাটুকু চলে গিয়ে শিশুদের মনে ওই মাটির প্রতি, ওই বিদ্যালয়-ক্ষেত্রের প্রতি এক গভীর আত্মিক টান বা টোপোফিলিয়া তৈরি হচ্ছে। মানুষ যখন তার চারপাশের পরিবেশকে ভালোবাসতে শেখে (টোপোফিলিয়া), তখন তার মধ্যে এক ধরণের ‘Belongingness’ বা ‘আমি এই জায়গারই একজন’—এই বোধটা জাগে। এই বোধটাই মানুষকে ছদ্ম-হীনম্মন্যতা থেকে বাঁচায়। আমরা সেই জিনিসটাকেই রক্ষা করি, যাকে আমরা ভালোবাসি। ছাঁচনপুরের শিশুরা আজ যেভাবে ওই মাটির টানে, রেবা মুর্মুর স্নেহের টানে সেখানে পড়াশোনা আর জীবন গড়ার পাঠ নিচ্ছে — আশা করা যায় বড় হয়ে তারা ওই অঞ্চলের পরিবেশ ও সমাজকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবে। চাকরি জীবনের প্রথম দিকে আমি দেখেছি এমন ছাত্রকে যে সব সময়ে লাস্ট বেঞ্চে মাথা লুকিয়ে বসে থাকতো, কাছে ডাকলেও আসতোনা। কিন্তু মুর্শিদাবাদে ফিল্ডে গিয়ে সে হোটেলের খাটের ছত্রি ধরে ঝুলে ছত্রি ভেঙে ফেলল। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম, সাত চড়ে রা নেই, কিছুতে কোন মতামত নেই - ও খাট ভাঙল? এখন আমি বুঝেছি, সাধারণ স্কুলে ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার বলে একটা শিশুর যে অবহেলা জোটে, তা তার আত্ম-মূল্যায়নকে ধ্বংস করে দেয়। সে নিজে নিজেই নিজেকে আউটসাইডার ভেবে নেয়। স্কুল পেরিয়ে কলেজে এই অবদমন আরও বাড়ে, হয়তো সব পড়া আলোচনা বুঝতেও পারেনা, জিজ্ঞেস করতে পারেনা। শ্রেণীকক্ষের চারটে দেওয়ালে এক ধরণের টোপোফোবিয়া তৈরি হয়। এই অবদমন ভেতরে ভেতরে এক জমাটবদ্ধ ক্ষোভ বা 'Aggression'-এ রূপ নেয়। যখনই তারা প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির বাইরে কোনো মুক্ত বা বিশৃঙ্খল পরিবেশ পায়, তখন সেই অবদমিত শক্তি কোনো ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব জাহির করে। এ হল অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের এক বিকৃত বহিঃপ্রকাশ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাওয়া আত্মবিশ্বাস মানুষকে কেবল চাকরি পাওয়ার যোগ্য করে না; সেই প্রত্যয় মানুষকে নিজের জীবনের বা সমাজের অন্ধকার অধ্যায়গুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসিমুখে লড়াই করার এবং বিজয়ী হওয়ার দার্শনিক অস্ত্র দেয়। সাধারণ ইশকুল কলেজে সেই অস্ত্র ছাত্রছাত্রীর হাতে তুলে দেওয়া সব সময়ে সম্ভব হয়না। শুশুনিয়ার সেই লালমাটির রুক্ষতা, শাল-পিয়ালের জঙ্গল আর তার মাঝখান থেকে উঠে আসা লক্ষ্মী মুর্মু ও রেবা মুর্মুর এই যে রূপকথা-সম লড়াই—তা কেবল একটা স্কুলের গল্প নয়, তা আসলে মানুষের অপরাজেয় চেতনার এক জীবন্ত দলিল। গুগল ম্যাপে যে ছাঁচনপুরকে খুঁজে পাওয়া যায়না, সেই প্রত্যন্ত কোণে বসে এই দুই নারী যা তৈরি করেছেন, তা শুধু ইঁটের দেয়ালহীন কিছু শ্রেণীকক্ষ নয়; তাঁরা আসলে প্রান্তিক শিশুদের জন্য তৈরি করেছেন এক "আত্মবিশ্বাসের অভয়ারণ্য"। চলবে...
  • হরিদাস পালেরা...
    হিমাচলের ইতি উতি - ৮ - দ | মণিকরণ মণিকরণ আমি এসেছিলাম ১৯৮৯ সালে। মা ভাই আর আমি সেবার সেজমামা, সেজমাইমা আর মামাতো বোনের সাথে কুলু মানালি বেড়াতে এসেছিলাম। মানালি থেকেই HRTCর বাসে মণিকরণ এসে ঘুরেফিরে ঘন্টাখানেক বাদে সেই বাসেই ফেরত। তখন আমরা গাড়ি ভাড়া করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না। ফরিদাবাদ থেকে এসেছিলাম বাসে বাসেই। হরিয়ানা রোডওয়েজের বাসে দিল্লি ISBT গিয়ে সেখান থেকে HRTCর বাসে কুলু। একরাত থেকে আবার বাস ধরে মানালি। তখন কাসোলের নামও জানতাম না। বাস সম্ভবত কাসোল পেরিয়েই এসেছিল। মনে আছে দুপাশে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, যত এগোই তত শিরশিরে ঠান্ডা থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ঘিরে ধরে। ঘন জঙ্গল, অজানা পাখিদের ডাক, অসম্ভব নীল আকাশ আর একপাশে নদীর গর্জন। নদী যে পার্বতী সেও তখন জানতাম না। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম এ বিপাশাই হবে, মানালি থেকেই সঙ্গে সঙ্গে এসেছে। স্বচ্ছতোয়া পার্বতীমণিকরণে পৌঁছে উষ্ণ প্রস্রবণের পাশে কিছুক্ষণ কাটিয়ে গুরুদ্বোয়ারায় মোটা মোটা ঘি চপচপে পুরি আর ঘি গড়ানো সুজির হালুয়া খেয়ে ফেরত। ওখানে তখন একখানাও মন্দির দেখি নি। এখন নতুন ব্রিজ পেরিয়ে গুরুদ্বোয়ারার দিকে যেতে গেলে তিন তিনখানা মন্দির পেরোতে হয়। এর মধ্যে শিবমন্দির আর রামমন্দির বেশ নতুন, তবে নয়না ভগবতী মন্দির বেশ পুরোন। সম্ভবত পুরোন ব্রিজ পেরিয়ে যাওয়া আসায় এবং এই মন্দিরের কথা জানা না থাকায় সেই সময় আমরা আর এপাশে এসে এই মন্দিরটা দেখি নি।মণিকরণ এত্ত ঘিঞ্জি হয়ে গেছে এহ! তা সেই চালাল থেকে হোস্টেলে ফিরে ঘন্টাখানেক জিরিয়ে আবার বেরোলাম। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে গিয়ে মনিকরণ সাহিবের একটা গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম বিকেল সোয়া চারটে নাগাদ। সারথী কুণাল ছেত্রী। বেশ গোপ্পে ছেলে। কথায় কথায় জানাল দার্জিলিঙের কোন এক গ্রামে বাড়ি, ১৬-১৭ বছর বয়সে কাজের খোঁজে হিমাচলে এসে মানালিতে কিছুদিন এক এজেন্সির গাড়ি চালিয়ে শেষে কাসোলে এসে থেকে যায়। এখন রীতিমত নিজেই একটা কার রেন্টাল এজেন্সির মালিক। তিন চার বছর পরে একবার করে গ্রামে যায়, বাবা মা দাদু ঠাকুমা সবাই সেখানেই থাকে কিনা। রামমন্দিরের সিঁড়ির খিলান ও সিলিঙে কাঠের কাজ মণিকরণ পৌঁছাতে সময় লাগে কুড়ি পঁচিশ মিনিট। নতুন ব্রীজের পাশেই মস্ত পার্কিং লট। সূর্য বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে, আলো তার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে। ব্রীজ পেরিয়ে প্রথমেই রামমন্দির। কাঠের কাজ তবে বিশেষ পুরোন নয় সে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কয়েক পা এগিয়েই নয়না ভগবতী মন্দির। কাঠের অপূর্ব কুনিকাজ করা দেওয়াল খিলান ছাদ। পৌরাণিক গল্প অনুযায়ী নদীতে স্নান করতে নেমে দেবী পার্বতীর কর্ণাভরণ থেকে একটা মণি খুলে জলে পড়ে হারিয়ে যায়। নয়না ভগবতী মন্দিরমণিটি জলে পড়ামাত্র তার ঔজ্জ্বল্যে মুগ্ধ হয়ে সর্পরাজ শেষনাগ সেটি হস্তগত করে পাতালে ডুব দেন। এদিকে মণি হারিয়ে পার্বতী অতি বিচলিত, দু:খিত, খুঁজে দিতে না পেরে বিরক্ত ক্রুদ্ধ শিবের তৃতীয় নয়ন খুলে যায়, সেই নয়ন থেকেই সৃষ্টি হয় নয়না ভগবতী দেবীর। তিনি শেষনাগকে বাধ্য করেন মণিটা ফেরত দিতে। মণি পেয়ে পার্বতী খুশী, কাজেই শিবও খুশী। জায়গার নাম হয় মণিকরণ আর শিবঠাকুরের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড নয়না ভগবতীদেবীর পুজোও শুরু হয় ওই জায়গায়। মন্দিরের দালানের সিলিং। ছবিটা Nittu Trippyর থেকে পাওয়া। এর পরে বেশ খানিকটা এগিয়ে ঠিক বাজার শুরু হবার আগে একটা শিবের মন্দির। এইটাও নতুন। ১৯৮৯ এ এই এলাকাটা আমরা ঘুরেছিলাম, তখন বাজার বা মন্দির কিছুই ছিল না। অল্প দুএকজন কাঁধে পিঠে বোঁচকা নিয়ে মাফলার শাল ইত্যাদি বিক্রির জন্য ঘুরছিলেন। পরে ভাই বলল ওখানে একটা বড় গাছের নীচে পাথরের সামনে দুটো ছোট ছোট ষাঁড়ের মূর্তি (নন্দী ভৃঙ্গী?) ছিল, সেইটাই এখন আস্ত শিবমন্দির হয়ে গেছে। জুতো খোলার চক্করে অবশ্য কোন মন্দিরেই ঢুকি নি। শিবমন্দির মণিকরণ বাজারের ভিতর দিয়ে গিয়ে উষ্ণকুন্ড আর তার পাশেই গুরুদ্বোয়ারা। আগেরবার দেখেছিলাম কিছু লোক কাপড়ে পুঁটলি করে চাল আলু বেঁধে উষ্ণকুন্ডে ডুবিয়ে সেদ্ধ করে নিচ্ছে। এবারে আর সেসব নেই, সবাই নামছে ভক্তিভরে জল মাথায় ঠেকাচ্ছে কপালে মাখছে তারপর উঠে আসছে। লাদাখে পানামিকের শান্ত নির্জন উষ্ণকুন্ডের কথা মনে পড়ল। কতক্ষণ হাত ডুবিয়ে বসেছিলাম ওখানে। এত ভীড়ে আর নামতে ইচ্ছে হল না। এখানকার আমসত্ত্ব বেশ ভাল খেতে। আম দিয়েই বানানো, কুমড়ো দিয়ে নয়। বাজার থেকে খানিকটা আমসত্ত্ব কিনে ফেরার পথ ধরি। সকালেই ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে শুনেছিলাম ধ্বস নামার জন্য তোশ, টুলগা পুলগার রাস্তা বন্ধ আছে, আগামীকাল খুলতে পারে। কুণাল বলে ওকে সকালে ফোন করলেই ও গাড়ি নিয়ে হোস্টেলে হাজির হয়ে যাবে। কাল এই জায়গাগুলোতে নিয়ে পরশু অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে। তারপর ১৩ তারিখে একেবারে দিল্লি পৌঁছে দেবে। ও না গেলেও ওর এজেন্সির গাড়ি দিয়ে দেবে। বেশ ভাল কথা। কাসোল সন্ধ্যে নামার আগে (বাঁদিকে মুস্কিল আসান ট্যাক্সি ইউনিয়ানের অফিস) সারাদিনের হাঁটাহাঁটি ঘোরাঘুরিতে বেজায় ক্লান্ত থাকলেও ওই গাঁজার গন্ধওলা ক্যান্টিনে যেতে ইচ্ছে হল না। কাজেই রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বেরোলাম নৈশাহারের সব্ধানে। ওডিন হোস্টেল থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে পঞ্চাশ মিটার মত হাঁটলে মূল সড়কের উপরেই ‘লিটল ইটালি ইন’। একতলায় বেকারি, দোতলায় রেস্টুরেন্ট, আর তার উপরে দেড় কি দুইতলায় থাকার ব্যবস্থা। রেস্টুরেন্টে পৌঁছে দেখি আমি একাই খদ্দের। এদের ইজরায়েলি খাবার দাবারের মোটামুটি সুনাম আছে। বেছেবুছে অর্ডার দেওয়া গেল Chicken Schnitzel with Pita Bread. খাবারের স্বাদ বেশ ভাল। দিব্বি খাসা খেতে। খেয়েদেয়ে ফাঁকা রাস্তায় খানিক হাঁটাহাঁটি করে ডর্মে ফিরে ঘুমোতে গিয়ে দেখি বেদম ঠান্ডা লাগছে। এখানে নেটওয়ার্কের কোন সমস্যা নেই, তাই ওয়েদার অ্যাপ অন করে তো চক্ষু চড়কগাছ। তাপমাত্রা -১২ ফিলস লাইক -১৫। বলে কি রে! নভেম্বরের প্রায় মাঝামাঝি কাসোলে এত ঠান্ডা কী করে হতে পারে? নির্ঘাৎ কোথাও কিছু ভুলভাল দেখছি। এদিকে চোখ খুলে রাখা আর সম্ভব হচ্ছেই না। অগত্যা গ্লাভস জ্যাকেট ইত্যাদি সব পরে টরেই কম্বলের তলায় ঢুকলাম। অ্যাঁ!! সকালে উঠে তৈরী হয়ে আবার ওয়েদার অ্যাপ খুলে দেখি তাপমাত্রা আরো নেমে গেছে। সকাল পোনে নটায় -১৯ তবে রোদ্দুর উঠে গেছে বলে ফিলস লাইক -১৪। কিরে বাবা দিব্বি তো স্নান টান করলাম। ভাল করে খেয়াল করে দেখি জায়গার নাম দেখাচ্ছে সোজান। টেনেটুনে কাসোল করলে তখন তাপমাত্রা -২ ফিলস লাইক ১ডিগ্রি। হ্যাঁ এইটা ঠিক আছে। ফিরে এসে ম্যাপে দেখতে হবে সোজান জায়গাটা কোথায়। আজ বেরিয়ে অন্য একটা ক্যাফেতে কফি আর বাটার টোস্ট নিয়ে বসি। ভ্যাট! ভুলভাল। খেতে খেতেই কুণালের ফোন আসে। আজ তোশের রাস্তা খুলেছে, ও মানালি বেরিয়ে গেছে অন্য গাড়ি পাঠাবে। তোশ, কালগা পুলগা দেখিয়ে কাল সেই গাড়িই আমাকে নাগগর আর মানালি নিয়ে যাবে। যাব্বাবা খামোখা মানালি যাবো কী করতে? আর নাগগর এদিক থেকে এতটা উজিয়ে যাবো কেন? ও তো নানা জায়গায় যেতে আসতে মানালি থামা হয়, সেখান থেকেই টুক করে ঘুরে আসা যায়। কুণাল বলে তাহলে কাল ওদিকে যাবে না? নাহ বিলকুল না, কাল আমি গ্রাহাণ যাবো। বলে ঠিক আছে তুমি ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে ফোন করো। ক্যাফে থেকে বেরিয়ে ফোন করতে ছেত্রীমশাইয়ের গলায় অন্য সুর। নাহ আবার পাথর পড়ছে আজ তোশ যাওয়া যাবে না, আজ তুমি লোকালেই ঘোরো কাল রাস্তা খুললে কাল তোশের গাড়ি পাঠাবো। বুঝলাম ওই লম্বা জার্নিটায় রাজী না হওয়ায় এ এই ছোট ছোট জার্নিগুলো যেতে চাইছে না। গুটি গুটি পায়ে ট্যাক্সি ইউনিয়ানের অফিস। যা ভেবেছি, তোশের রাস্তা দিব্বি খোলা, গাড়িও যাচ্ছে। এখানে ট্যাক্সিদের সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী পর পর যাত্রীদের বরাদ্দ করে। সারথী নরেশ ঠাকুর তাঁর আল্টো নিয়ে এলেন আমার জন্য। রাস্তার যে অংশে ধ্বস নামার জন্য গত দুদিন গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল সেখানে এখনো থেকে থেকেই বড় ছোট আলগা পাথর গড়িয়ে পড়ছে। রাস্তা আটকে একটা আর্থ মুভার পাথর সরাচ্ছিল। মিনিট দশেক বাদে ছাড়ল। ছোট একটা মাটি পাথরের ফালি, রাস্তা প্রায় নেইই। আমাদের গাড়ির সামনে আর একটা ছোট গাড়ি ছিল, স্যুইফট। সে আর কিছুতেই পেরোতে পারে না। তার চাকা একপাক ঘোরে তো তিরিশ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। বোঝাই যাচ্ছে সে গাড়ির চালক সাহস পাচ্ছেন না। মহা মুশকিল, ঝটপট না পেরোলে আবার পাথর পড়া শুরু হতে পারে যে কোন মুহূর্তে। এখানে হর্ন দেবার চল নেই, সব গাড়ি পর পর অপেক্ষা করছে। নরেশজি নেমে গিয়ে সাহায্য করতে চাইছিলেন, কিন্তু উপস্থিত সেনাবাহিনীর সেপাইরা মানা করলেন। শুনলাম এত বড় বড় পাথর পড়েছিল যে তা সরাতে সেনাবাহিনীকে ডাকতে হয়েছে। প্রায় আড়াই মিনিটের চেষ্টায় সামনের জন ওই কুড়ি মিটার পেরোলেন। সামনের গাড়ি বেরিয়ে যেতেই নরেশজি বোঁ বোঁ করে ওই বিপজ্জনক ফালিটা পেরিয়ে একটু এগিয়ে সাইড করলেন। এখানে রাস্তা আর পাহাড়ের মাঝে বেশ খানিকটা এবড়ো খেবড়ো জমি, সম্ভবত ধ্বস পরিস্কার করা হয়েছে তাই ফাঁকা। সেখানেই সেই আগের গাড়িটা সাইড করে চালক বাইরে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে বোতল থেকে জল নিয়ে ঘাড়ে মাথায় দিচ্ছেন। আর একজন ভদ্রমহিলা বনেট ধরে মাথা নীচু করে দাঁড়িতে আছেন। নরেশজি গিয়ে কথা বলে পিঠ চাপড়ে দিয়ে এলেন। শুনলাম এঁরা রোহতকের বাসিন্দা। পাহাড়ে গাড়ি চালানোর অল্পস্বল্প অভিজ্ঞতা আছে তবে এত সরু নড়বড়ে রাস্তায় এই প্রথম। আমরা চলেছি, ডানপাশে অনেকটা নীচে পার্বতী চলেছে ঝমর ঝাঁপর করে নাচতে নাচতে। HRTCর বাস আসে কুলু থেকে বারসৈনি পর্যন্ত। বারসৈনী থেকেই ক্ষীরগঙ্গা ট্রেক শুরু হয়। বাসে এলে বারসৈনী নেমে ঘন্টাখানেক হাঁটলে তোশ গ্রাম। তোশ, কালগা, পুলগা, টুলগা এই গ্রামগুলো সবকটাই পার্বতীর ডানদিকের পারে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। এই গ্রামগুলোর কোনোটাতেই সরাসরি গাড়ি যায় না। গাড়ি চলার রাস্তা মূলত পার্বতীর বাঁ পারে। তোশ যদি নাই পৌঁছাতে পারি এঁকে দেখেই তো চোখ ফেরে না তবে পার্বতী বাঁধের কাছে ডানদিকের তীরে অল্প কিছুটা কালগা আর পুলগা গ্রামের পাশে গাড়ি চলার পাকা রাস্তা আছে। সেখানেও গাড়ি রেখে পাথরে ধাপকাটা এবড়ো খেবড়ো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গ্রামে পৌঁছাতে হয়। কাসোল থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ৭৯০০ ফিট উচ্চতায় তোশ এক অপূর্ব সুন্দর শান্ত পাহাড়ি গ্রাম। চারিদিকে বরফে মোড়া পর্বতশৃঙ্গ আর অনেকটা নীচে কলস্বনা পার্বতী, গাড়ি না চলায় অসম্ভব পরিস্কার রৌদ্রকরোজ্জ্বল আকাশ, টাটকা বাতাস আর কনকনে ঠান্ডা সবমিলিয়ে তোশ যেন পরিশ্রান্ত স্নায়ুতন্ত্রের উপরে আলতো আদরের হাত বুলিয়ে দেয়। ওইই দেখা যায় তোশএক জায়গায় গাড়ি সাইড করে নরেশজি বলেন গাড়ি আর যাবে না, এখান থেকে হেঁটে গিয়ে কাঠের পুল পাবে। ওইটে পেরিয়ে তোশে ঢুকে ঘুরে ফিরে ঘন্টাখানেকের মধ্যে ফেরত এসো। ধারে নানা সাইজের গাড়ি টেম্পো ট্রাভেলার, ছোটা হাতি ইত্যাদি পরপর দাঁড়িয়ে আছে। খানিক এগিয়ে আরো কটা গাড়ি আর বাইকের পরে সামনে একটা ইয়াম্মোটা লোহার পাইপ বেঁকিয়ে আড়াআড়ি রাস্তা জুড়ে রাখা যাতে গাড়ি বা বাইক আর এগোতে না পারে। কিন্তু কাঠের পুল কৈ? কাঠের পুল খুঁজতে গিয়ে ক্যামেরা এখানেই আটকে গেছেপাইপ টপকে এগিয়ে দেখি মাটি আর বালি মেশানো রাস্তাগোছের কিছু একটা নদীগর্ভের দিকে নেমে গেছে। লোকজন ঘাড়ে পিঠে বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে সেদিকে নেমে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যাচ্চলে! এটা তো সিলেবাসে ছিল না! বাঁপাশে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা বেশ উঁচু মাটিলেপা চওড়া ধাপ, বাঁশের খুঁটি মাথায় টিনের চাল। ভেতরে একটা পাথরের বেঞ্চমতও আছে। বোধহয় চায়ের দোকান ছিল বা এমনিই বিশ্রামস্থল, আপাতত পরিত্যক্ত। সেখানে উঠে দেখি ওই নদীগর্ভের দিকে নেমে যাওয়া রাস্তাগোছের ব্যপারটা আসলে মানুষের পায়ের চাপে তৈরী হওয়া একটা সাময়িক পথ। বেশ খানিকটা নেমে আবার বাঁ দিকে উঠেছে তারপর আরো খানিকটা সরু ফালিমত পথ গিয়ে তোশের পাকা রাস্তায় উঠেছে। মানুষের পায়ে পায়েই ধাপে ধাপে সিঁড়ির মত তৈরী হয়েছে। কয়েকজন স্থানীয় মহিলা, কারো পিঠে কাঠকুটোর মস্ত বোঝা, কেউ বা পিঠের ঝুড়িতে মুদী দোকানের সামগ্রি নিয়ে যাচ্ছিলেন। দিব্বি তরতরিয়ে নেমে যাচ্ছেন। ভাঙাপথের যাত্রীরা (ভিডিওতে যেটা ক্ষীরগঙ্গা গ্লেসিয়ার বলেছি ওটা ভুল।) ওঁদের থামিয়ে কাঠের ব্রিজের কথা জিজ্ঞাসা করায় জানলাম সেপ্টেম্বরের বন্যার সময় ব্রিজ ভেঙে ভেসে গেছে। এখনো নতুন ব্রিজ তৈরী হয় নি, এইভাবেই নেমে উঠে যেতে হবে। বোঝো কান্ড! ভাল করে দেখে বুঝলাম একখানা হাইকিং স্টিকের ভরসায় আমি এখান দিয়ে নামতে পারবো না। দুখানা স্টিক থাকলে মাটিতে গেঁথে গেঁথে নেমে যেতে পারতাম। কিন্তু কোনোভাবে নামতে পারলে ওইদিকে উঠতে পারবো আর এদিকেও ফেরার সময় উঠে আসতে পারবো। খানিকক্ষণ ছবি ভিডিও তুলে এগোলাম। এর মধ্যে কিছু মানুষজন রীতিমত বড়সড় ব্যাগ স্যুটকেস নিয়েও ওইখান দিয়ে নেমে যাচ্ছেন। এঁরা তোশে থাকবেন একদিন বা দুদিন। কাউকে কাউকে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার বারসৈনী থেকে হিচ হাইক করে এসেছেন। কাসোলকে মিনি ইজরায়েল বলা হয় বটে তবে তোশও কিছু পিছিয়ে নেই। অজস্র ইজরায়েলি মানুষজন তোশ, গ্রাহাণ, মালানা অঞ্চলেও আসেন। কাসোল যথেস্ট দামী জায়গা হওয়ায় দীর্ঘদিন থাকার জন্য তোশ অনেক পর্যটকেরই বেশী প্রিয়।একটু দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালেই কেউ না কেউ ধরে নামিয়ে দিতেন ঠিকই কিন্তু আমি ভাবলাম দেখিই না একেবারে একা একা যেতে পারি কিনা। চোখের জন্মগত ত্রুটির (নিস্ট্যাগমাস) জন্য এসব ক্ষেত্রে আমি দূরত্ব বা উচ্চতা ঠিকঠাক বুঝতে পারি না। চোখের ফোকাল লেংথ ফিক্সড হয় না বলে আমি দেখেশুনে যেখানে পা ফেলি সেটা আসলে ঠিক জায়গার থেকে কয়েক মিলিমিটার এদিক ওদিক। ফলে ভারসাম্য নষ্ট হয়, পড়ে যাবার সম্ভাবনাও খুব বেশী। দুহাতে দুটো স্টিক থাকলে ওরাই চোখের বদলে ঠিক জায়গা বুঝিয়ে দেয়। পা ফস্কে গড়ালেই সোওজা ওইখানেতো একহাতের স্টিক দিয়ে চেষ্টা করে বুঝলাম হবে না, ব্যালান্স হারিয়ে গড়িয়ে যাবার চান্স খুব বেশী। কাজেই ওই রাস্তা বা সিঁড়ি বা হোয়াটেভার, ওটার ধারে থ্যাপাস করে থেবড়ে বসে পড়লাম। তারপর বসে বসে ঘষে ঘষে মিনিট তিনেকের চেষ্টায় নেমে গেলাম। প্যান্টের সাড়ে দেড়টা বাজল বটে তবে কাদা বা নোংরা নেই, স্রেফ ধুলোমাটি। ও ভাল করে ঝেড়েমুছে নিলেই চলবে। নেমে এমন ফুর্তি হল যে দিব্বি গটগটিয়ে ওপাশ দিয়ে উঠে হনহনিয়ে হেঁটে একেবারে তোশ গ্রামের ভেতরে ঢুকে একটা ক্যাফের সামনে গিয়ে থামলাম।শান্ত সুন্দর তোশভারতের অন্যত্র থেকে প্রায় মুছে যাওয়া হিপি কালচার এই অঞ্চলে এখনো রমরমিয়ে চলছে। যেখানে সেখানে মেয়ে পুরুষ গাঁজায় (বা অন্য কিছুতে) দম দিয়ে ঝিম হয়ে বসে আছে। অথবা একসাথে গিটার নিয়ে বসে গান গাইছে। তবে এইসব ক্যালোরব্যালোর সত্ত্বেও জায়গাটা অদ্ভুত শান্ত সুন্দর। ধওলাধর আর পিরপাঞ্জাল রেঞ্জের শৃঙ্গগুলো কে জানে কতশো বছরের বরফ মাথায় নিয়ে সূর্য্যের আলোয় সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে। নদীর ওইদিকে অনেক উপরে একটা হিমালয়ান গ্রিফন চক্কর কাটছে।হোয়াইট সেইল, পাপাসুর, দেওচান, কুটলা আর আংডুরি এই কটা শৃঙ্গ একদম কাছে মনে হয় যেন একটু দৌড়ালেই পাঁচটার মধ্যে যে কোন একটার নীচে পৌঁছানো যাবে। তোশগ্রামের ঠিক উল্টোদিকের পর্বতশৃঙ্গের উপরের হিমবাহ দেখিয়ে নরেশজি বলেছিলেন ক্ষীরগঙ্গা হিমবাহ। গ্রামের মধ্যের মামুষজন কিন্তু জানালেন না ক্ষীরগঙ্গা হিমবাহ তোশ থেকে সরাসরি দেখা যায় না। ওঁরাই ওই শৃঙ্গগুলোর নাম বলে ভেতরে আরেকটু গিয়ে একটা চড়াই চড়তে বললেন। সেখান থেকে তোশ হিমবাহ ও নীচে তোশ - নাল্লা উপত্যকার অপূর্ব ভিউ পাওয়া যায়। একঘন্টা প্রায় হয়ে এলো, ওদিকে কালগা আর পুলগাতেও যেতে হবে। তাই আর চড়াই চড়ার চেষ্টা না করে ফেরার পথ ধরলাম। ক্ষীরগঙ্গা ট্রেকে যদি আসতে পারি তাহলে তোশে এসে দু একদিন থেকে যাবো। ততদিনে কাঠের ব্রিজটা তৈরী হয়ে যাবে আশা করি। আবার সেই নেমে উঠে ফেরা, তবে এবার তেমন সমস্যা হল না। দিব্বি হাঁচোর পাঁচোর করে উঠে এলাম। নরেশজি বলেন চল প্রথমে পুলগা যাই, ওখানে প্রায় সমতল। বেশ তাই যাই তাহলে। (চলবে) * তোশের এন্ট্রি পয়েন্টের যাতায়াতটা বিস্তারিত লিখে রাখলাম নিজের জন্য। আমার জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাঠক এত অনর্থক ডিটেলসে বিরক্ত হতে পারেন। সেক্ষেত্রে ওইটুকু স্কিপ করে যাবেন।
    অত: কুক্কুট - ডিম্ব সংবাদ। - Somnath mukhopadhyay | অত: কুক্কুট ডিম্ব সংবাদ। দিন কয়েক হলো বাজারে ডিমের দাম ভয়ানক বেড়ে গেছে। অবশ্য কেবল ডিমের ওপরে উষ্মা প্রকাশ করা কেন? বাজারে সবকিছুই এখন অগ্নিমূল্য। ডিমের দাম এমন উর্দ্ধমুখী কেন? - একথা পাড়ার দোকানী শঙ্করকে জিজ্ঞেস করতেই, সে আমার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে একগাল হেসে জবাব দিলো – কেন, মাস্টারমশাই আপনি জানেন না? এখন তো বাতিল ন্যাতাদের,পাবলিক ডিম ছুঁড়েই বরণ করছে। আমিও কিছু বাড়তি মাল এজন্য তুলে রেখেছি। বলা যায়না,কখন তেমন কাস্টমার এসে হাজির হয়!” মুখে কিছু না বললেও মনে মনে বলি – ভগবান, এই সংস্কৃতি যত দ্রুত বাতিল হয় তত মঙ্গল। ডিম নিয়ে এমন বিস্মৃতির আড়ালে লুকিয়ে পড়া এক সুখস্মৃতির কথা বরং বলি। সেই কবেকার কথা! যে সময়ের কথা বলবো বলে বসেছি সেই সময় পেরিয়ে গেছে কত কত বছরের পার। আমরা তখন নাবালক। বাড়িতে ডিম এলেও একালের মতো ডজন ডজন মুরগির ডিম আসার চল ছিলোনা। তাই বাজার থেকে হাঁসের ডিম আনা হতো প্রয়োজন মতো। এখানেই কিন্তু গপ্পো শেষ নয়। এরপরেই তা শুরু হবে। মা ডিম সেদ্ধ করে হয়তো বলেছেন – “এগুলোর খোসা ছাড়িয়ে রাখ।” যেমন বলা তেমন‌ই কাজ শুরু। মেঝেতে ডিমগুলোকে একটু ঠুকে নিয়ে কচি কচি আঙ্গুল দিয়ে তার খোসা ছাড়িয়ে নেবার কাজে লেগে পড়ি ঝটপট। আমাকে ওভাবে এনগেজড হতে দেখে আমার সব্ববিদ্যা পটিয়সী ভগিনীও গুটিগুটি পায়ে অকুস্থলে এসে হাজির। ডিমের পাত্রে একবার নজর বুলিয়েই তাঁর প্রশ্ন – “হ্যাঁরে দাদা! আমরা খাইয়ে হলাম পাঁচ জন, অথচ মা ডিম সেদ্ধ করেছে মাত্র তিনটে! কেনরে ? বাড়িতে আর ডিম নেই?” এতক্ষণে তাঁর গোবদ্ধন দাদার হুঁশ হয়েছে। “ সত্যিই তো খাইয়ে হলাম আমরা পাঁচ জন, অথচ মাত্র তিনটি ডিম সেদ্ধ করেছে মা! কেন?” অংকে আমি বরাবরই কাঁচা রয়ে গেলাম। ডিমের খোসা ছাড়ানো হয়ে গেছে। এবার মা কে খবর দেওয়া। হাতের টুকটাক কাজ সেরে মা এলেন রান্নাঘরে। পিঁড়িতে বেশ জুৎ করে বসে হাত বাড়ালেন মিটশেফের দিকে।সেখানে পেরেকের সঙ্গে টাঙিয়ে রাখা একটা ফিনফিনে সুতো। সেই সুতোর একটা দিক পায়ের আঙুলে পেঁচিয়ে নিয়ে, অন্য মাথাটা বাঁ হাতের আঙ্গুলের সঙ্গে জড়িয়ে বেশ টানটান করে নিলেন - যেন এক ইমপ্রোভাইজড করাত।এবারে ডানহাতে একটা করে ডিম তুলে নিয়ে সেই সুতো করাতের ওপর আলতো করে চেপে ধরতেই ডিমগুলো ডিডিং ফাঁক - দু টুকরো। এই দৃশ্য দেখে আমরা যুগপৎ বিস্মিত ও মর্মাহত।  একালের -সানডে ইয়া মানডে / রোজ খাও আনডে বিজ্ঞাপন মুখরিত সময়ে, সেইসব অন্তরঙ্গ যাপনের মুহুর্তগুলোকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, খোঁজ করেও লাভ নেই। আধখানা ডিমের কাহিনি আমরা নাবালক কায়া ছেড়ে সাবালক হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের ধূসর মলাটের নিচে সেই কবে চাপা পড়ে গেছে! সেই সময়টা ছিল ভাগ করে নেবার সময়।এখন সময় কেড়ে নেবার। ভাগ করে খাবার মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক সহ যাপন,সম যাপনের শিক্ষা। সেই শিক্ষার মর্মবাণী আজ‌ও হৃদয়ে বয়ে নিয়ে চলেছি সঙ্গোপনে। কার পাতের ডিম ছোট আর কারবা পাতে বড়ো ডিম পড়েছে তাই নিয়ে আর মন কষাকষি হয়না। মা যেদিন খাবার থালায় একটা গোটা ডিম তুলে দিলেন সেদিন বুঝেছিলাম আমরা সাবালক হয়ে উঠলাম। আধখানা ডিমকে নিয়ে মনে যে টানাপোড়েন চলতো তার অবসান ঘটলো। তবে তা বলে বিবাদ বিসম্বাদ নেই,সব উবে গিয়েছে তেমন‌ও যে নয়। এই তো ডিম কিনতে গিয়ে দোকানে যেতেই দেখা হয়ে যায় নির্মল দার সঙ্গে। নির্মল দা আমার প্রতিবেশী, একটু গোলগাল চেহারা, নির্বিরোধী মানুষ। দোকানে যেতেই দেখি তাঁর সঙ্গে দোকানী শঙ্করের বেশ চড়া সুরে বাগবিতণ্ডা চলছে। নির্মল দা সুর চড়িয়ে শঙ্করকে প্রায় শাসাচ্ছেন যেন – “এতো চড়া দামে ডিম বিক্রি করছো, অথচ তাদের সাইজ দেখেছো? আমি তোমাকে মুরগির ডিম দিতে বলেছিলাম, আর তুমি আমাকে টিকটিকির ডিম ধরিয়ে দিয়েছো! কি তাদের সাইজ! আজ যেন বড়ো বড়ো ডিম হয়। নাহলে….! “--আমাকে দেখে নির্মল দা ওই তুঙ্গ অবস্থা থেকে যেন একটু ব্রেক কষে থমকে গেলেন – “আরে মাস্টারমশাই! আপনিই এর বিচার করে দিন তো! এই ছোট্ট ছোট্ট টিকটিকির ডিমের মতো ডিম! সে কথা বলতেই বলে – এই গরমে ডিম সাইজে ছোট‌ই হবে। এটা কোনো যুক্তির কথা হলো। আপনি এর একটা বিহিত করে দিন।” ক্রেতা হিসেবে দোকানে এসে, শেষে বিচারক হতে হবে বলে তো কখনও মনে হয় নি। যাইহোক ভার যখন পেয়েছি, তখন আর পিছিয়ে যাওয়া চলেনা। আমি দুপক্ষের মধ্যে একটা মান্য যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করি। “গরমকালে ডিম সাইজে একটু ছোট হয়ে যায় – একথা আমরা সবাই সেই কবে থেকে শুনে আসছি। তবে এ জন্য যদি হাঁস মুরগির ডিম ছোট হয়ে টিকটিকির ডিম হয়ে যায়, তাহলে সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। আমরা সবাই জানি যে এই মুহূর্তে পৃথিবী উষ্ণায়নের কবলে ত্রস্ত হয়ে আছে। এই পরিবর্তনের ফলে হাঁস - মুরগির ডিম আকারেই যে শুধু ছোট হয়ে গেছে তা নয়, ডিমের খোলগুলো‌ও বেশ নরম, দুর্বল হয়ে পড়েছে।” আমার এই কথা মনপসন্দ না হ‌ওয়ায় নির্মল দা আমার দিকে কটমট করে তাকাতেই আমি আমার কথা আবার চালু করে দিই। “ পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষদের মতে ডিম পাড়া মুরগিরা ১৯ -২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবথেকে বড়োসড়ো মাপের ডিম পাড়ে। তাপমাত্রা এর থেকে যত বাড়তে থাকে তত ডিমের সাইজ কমতে থাকে। আসলে গরম বেড়ে যাওয়ায় পাখিরা এক ধরনের স্ট্রেস বা মনোদৈহিক চাপ অনুভব করে। ঠিক আমাদের মতো। এরফলে তাদের স্বাভাবিক ফিজিওলজিক্যাল কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয় এবং ডিম পাড়ার সামর্থ্য কমে আসে।” – এই ব‌্যাখ্যা নির্মল দা আর শঙ্কর দুজনের‌ই বেশ পছন্দ হয়। বেশ বুঝদারের মতো দুজনেই পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়। আমার সালিশি ঠিক পথেই চলছে দেখে আমি বাকি কথা বলে ফেলার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠি। “আসলে মুরগিরা আমাদের মতো ঘাম ঝরাতে পারেনা। পারলে সহজেই নিজেদের শরীরকে ঠাণ্ডা করে নিতে পারতো, তাহলেই স্ট্রেস দিব্যি কমে যেত। সেক্ষেত্রে ওরা কী করে? খানিকটা সময় ধরে দৌড়াদৌড়ি করলে আমরা যেমন হাঁপিয়ে গিয়ে ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে থাকি এই খামারে থাকা লেয়ার মুরগিরা ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে শরীর ঠাণ্ডা করে। তবে যখন টানা গরমের দাপট চলে, যেমন এখন চলছে,এই কায়দাটা তেমন কাজে আসে না। এই কারণে মুরগিদের স্বাস্থ্য খারাপ হয় এবং খুব ভালো মানের ডিম উৎপাদনে ভাটা পড়ে।” অনেক গুরুগম্ভীর কথা বলে বেশ হাঁপিয়ে উঠি। দুই বুড়ো আর এক আধ বুড়োর আলাপচারিতা শুনতে আমাদের ঘিরে একটা ছোটোখাটো ভিড় জমে উঠেছে। সকলের মনে এক‌ই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে – “কি এমন হলো যে সাতসকালেই এমন তিন্নাথের আসর বসাতে হলো?” শঙ্করের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তার গিন্নি অন্নপূর্ণা এসে দোকানের হাল সামলাতে শুরু করেছে। সে তো জানে কেবল কথায় চিড়ে ভিজবে না। কারবারটাও যে ঠিকঠাক সামলাতে হবে।  আজ আর সামান্য কয়েকটা কথা বলে এই তত্ত্বকথায় ইতি টানবো। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে অতিরিক্ত গরমের সময় মুরগিদের মানসিক সহন মাত্রায় পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে ডিমের আকার, ডিমের ওজন, ভিমের খোসার কাঠিন্য সবার ওপরে ডিমের উৎপাদন বেশ কমে যায়। এর একটা বড় কারণ হলো গরম বাড়ার সঙ্গে তালমিলিয়ে মুরগির শরীরে ক্যালসিয়াম মেটাবোলিজম কমে যাওয়া। ডিমের খোসা তৈরি হয় ক্যালসিয়াম কার্বনেট দিয়ে যা ডিম তৈরির সময় প্রায় ২০ ঘন্টা ধরে জমা হয়।গরম খুব বেশি হলে মুরগিরা বাধ্য হয় খুব দ্রুত শ্বাস নিতে।এর ফলে শরীরে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। মুরগির শরীরের এই বিশেষ অবস্থাকে বলা হয় respiratory alkalosis বা শ্বাসযন্ত্রের এ্যালকালোসিস যা শরীরের রক্তের রাসায়নিক গঠনের পরিবর্তন আনে। রক্তের pH ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে।এই কারণেই ক্যালসিয়ামের জোগানে টান পড়ায় ডিমের খোসা খুব শক্তপোক্ত হতে পারে না। খোসা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটা পাতলা হয় এবং সামান্য নাড়াচাড়াতেই ভেঙে যায়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে অতিরিক্ত গরমের দিনে ডিম পাড়ার সময় পিছিয়ে যায়। তাছাড়া ডিমের আকারেও কিছুটা পরিবর্তন ঘটতে পারে।” আমার কথকতা শেষ হতে না হতেই নির্মল দার পকেটে রাখা মোবাইল ফোনটা হঠাৎ জেগে ওঠে। সুইচটা অন করে কানের কাছে নিতেই ওপার থেকে সুতীব্র বামা কন্ঠ ভেসে আসে – “বলি ভিম আনতে গিয়ে কি ভিরমি খেলে না ডিমে…. দিতে বসেছো? অন্যের দাম্পত্য জীবনের একান্ত কথোপকথনে কান দিতে নেই, তাতে ফিরতি মারের ঝুঁকি আছে। আমি সেসবে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখিয়ে ডিম আর পাউরুটি নিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াই। গিন্নি আজ ব্রেকফাস্টে ফ্রেঞ্চ টোস্ট বানাবেন।  **গুরুচন্ডালির শ্রদ্ধেয় লেখক শ্রী রঞ্জন রায়কে এই লেখাটি উৎসর্গ করা হলো। ভালো থাকবেন দাদা।    সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জুন ১৩.২০২৬.
    অমৃতকাল - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | মোট ১০ টা বিধানসভা কেন্দ্রের ৪০০০ ইভিএম পুড়ে গেল আলিপুরে। গুণে-গেঁথে ঠিক ৪০০০টাই ছিল কীকরে জানা গেল? জানা নেই। তবে নবনিযুক্ত দমকল মন্ত্রী কৌশিক চক্রবর্তী বলেছেন, ৩ এবং ৪ তলায় আগুন লাগে। সেখানে ইভিএম ছিলনা। তারপর সেই আগুন লাফিয়ে চলে যায়, ৭ এবং ৮ তলায়। সেখানেই ছিল ইভিএম। মাঝের কোনো তলায় কোনো আগুনের চিহ্ন নেই। আগুন কীকরে হনুমানের মতো লাফাল জানা নেই। কিন্তু সব ইভিএমই পুড়ে গেছে এটা জানা গেছে। মন্ত্রী বলেছেন। মন্ত্রী আরও বলেছেন, ব্যাপারটা খুব রহস্যজনক। কিন্তু খুব গরম হওয়ায় ফরেনসিক এখনও ঢুকতে পারেনি, তাই কিছু বলতে পারবেন না। আমাদেরও কারও কারো আপাতদৃষ্টিতে তাইই মনে হচ্ছে। কারণ ভোটের পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন, গণনাকেন্দ্রে গা-জোয়ারি এবং জালিয়াতি হয়েছে বলে। মামলা করবেনও বলেছিলেন। তারপর তো তাঁর পার্টিই লুঠ হয়ে গেল। মামলা করলে কিছু হত কিনা কেউ জানেনা, কিন্তু করার আগেই ৪০০০ ইভিএম পুড়ে গেল। আগুন যখন লাফাচ্ছিল, তখন নতুন প্রশাসনের দমকল কী করছিল জানা নেই। ঘটনাচক্রে নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন মাথাই এখন মুখ্যসচিব। ওদিকে বাংলার সুবিখ্যাত সংবাদমাধ্যম, যারা তিল দেখতে না পেলেও তালগাছ বানিয়ে ফেলে থাকে, এই ভয়ানক ঘটনার বিবরণ, তাদের পাতায় বা পর্দায় খুঁজতে গেলে মাইক্রোস্কোপ, টেলিস্কোপ দুইই লাগবে। এবং কদিন বাদে হয়তো জানা যেতে পারে, গণনার ফুটেজও আইন মেনে মুছে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বেশ সন্দেহজনক লাগলেও, মনে রাখবেন, নতুন জমানা এসে গেছে। তাই পুরোটাই নিছকই দুর্ঘটনা, আর নেহাৎই কাকতালীয়ই হবে। এরকম কাকতালীয় ঘটনা অবশ্য একটা না। ঘটেই চলেছে। মীনাক্ষী নটরাজন এই দিনকতক আগে কংগ্রেসের হয়ে রাজ্যসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়েছিলেন মধ্যপ্রদেশে। মনোনয়ন গেল বাতিল হয়ে। বিজেপির দিক থেকে অভিযোগ ছিল, হলফনামায় তিনি তাঁর সম্পর্কে একটা এফআইআর বা কেস নাকি উল্লেখ করেননি। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ওটা কোনো ক্রিমিনাল কেস ছিলনা, কেবলই একটা আইনী নোটিস পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু রিটার্নিং অফিসার সে কথায় কান দেননি। মীনাক্ষী সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিলেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, এসব নির্বাচন কমিশনের আওতায়, তাদের এক্তিয়ারে না। সব মিলিয়ে বিজেপি তিনটি রাজ্যসভা আসনই জিতে নিয়েছে ওই রাজ্য থেকে। একটা, সংখ্যার হিসেবে তাদের জেতার কথা ছিলনা। ঘোড়া কেনাবেচা হতে পারে, এই আশঙ্কায় কংগ্রেস বিধায়কদের বেঙ্গালুরুতে নিয়ে গিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল, তাতে বিজেপিকে আটকানো যায়না। এই যে, ঠিক সময়েই মীনাক্ষীর "ভুল" হল, মনোনয়ন বাতিল হল, এ সবই কাকতালীয় ঘটনা।এরও আগে সংসদে রাঘব চাড্ডা, অশোক মিত্তাল পাঞ্জাবে আআপ সাংসদরা সদলবলে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে। আপএর দুই-তৃতীয়াংশ নিয়েই যোগদান হয়েছিল, সম্পূর্ণ আইনসঙ্গতভাবে। এবং তার আগে অশোক মিত্তালের সম্পত্তিতে ইডি হানা হয়েছিল। সেটাও সম্পূর্ণ কাকতালীয়। তারপর, একদম সাম্প্রতিককালে তৃণমূলের অনেকেই নাকি বিদ্রোহী হয়েছেন শোনা যাচ্ছে। তাঁরা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন কিনা জানা নেই। এর আগে ট্রাইবুনালে ৩৫ লক্ষ নামকে ঝুলিয়ে রেখে পশ্চিমবঙ্গে অবাধ নির্বাচন হয়েছে, তাতে বিজেপি জিতেছে। তারপর তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ অভিযোগ করেছেন, পুরোনো সাংসদদের চাপ দেওয়া হয়েছে নানাভাবে। এই সবই কাকতালীয়। এই সব কাকতালীয় ঘটনা যোগ করলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি নির্বাচনে সংখালঘু থাকলেও নির্বাচনোত্তরপর্বে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। একবার হয়ে গেলে ডিলিমিটেশন সহ যা যা পাশ করাতে চায়, সবই টপাটপ পাশ করিয়ে ফেলতে পারবে। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক। কিন্তু আসলে তা নয়। আসল কথা হল, আচ্ছে-দিন টপকে এখন অমৃতকাল এসে গেছে। এইসব সময়ে এইসব কাকতালীয় ঘটনা ঘটে থাকে। নইলে তো সন্ধ্যেবেলার ঘন্টাখানেক মাছের বাজারে চুলচেরা বিশ্লেষণ দেখতে পেতেন, নাকি?
  • জনতার খেরোর খাতা...
    কিছুক্ষণের ব্যাপার - श्रीमल्लार | আমি ছিলেম তোমার খেলার সাথীতুমি ছিলে দহন অনুভাবকঘুড়ির মতোই এখন আকাশ কাটিসবাই বলে এসব আমার নাটকআমি ছিলেম তোমার খেলার সাথীতুমি ছিলে অন্ধ অনুভাবকআমায় তুমি করতে পারো বাতিলআমরা তবু এই সময়ের চাকর
    দেয়াল - श्रीमल्लार | ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। যখন খুব দুষ্টুমি করতাম, ঠাম্মি তখন গুড়ের নাড়ু বের ক’রে আনতো প্রাচীনবয়স্ক সে কোন এক কৌটো থেকে।মা থাকতো দূরে। দূরে মানে কলেজে৷ মা’কে সেভাবে কাছে পাইনি। বাবা তখন আরও ভাল চাকরির নেশায়,আরও ভাল প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই বাবাকেও পাইনি, কাছে। মা কলেজ ছাড়াও নিজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সে কী এক ভীষণ ব্যস্ততায় রাখত নিজেকে...! যেমন রাখে, আজও। মায়ের যে নিজের একটা ছেলে আছে, সে কথামা ভুলেই যেত...! হয়তো, হয়তো কেন? আজও ভুলেই থাকে।এতসবের পরে, মা’বাবা যখন ঠোঁটে ঠোঁট রেখেচুমু খায়—আমি তখন আমার রাতের খাবার ফেলে রেখে,চোখ নামিয়ে নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ ক’রে, আলো নিভিয়ে দিই। আমার ঘরের। মা’বাবা সেদিকে তাকিয়েও দ্যাখে না।  
    শিক্ষার বিনির্মাণ - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | নতুন সরকারের মন্ত্রীসভার মাননীয় উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার শুনলাম টিভি নাইনে। অনেক ভালো-ভালো নতুন কথা বললেন। যে কথাটা প্রথমেই আমার কানে আলাদা করে লাগল, সেটা হল ওঁরা নাকি এখন ডিকনস্ট্রাশন করছেন। এরপর কনস্ট্রাকশন হবে। এটা বলছিলেন বাংলার সমস্ত কলেজের গভর্নিং বডি ভেঙে দেবার প্রসঙ্গে। বাংলায়ও বললেন, বিনির্মাণ। এবার, আমার কানে খট করে লাগল, কারণ বিনির্মাণ একটা চালু শব্দ। মহামতি দেরিদা ফরাসিতে কিছু একটা লিখেছিলেন, তার ইংরিজি হল ডিকনস্ট্রাকশন, আর বাংলা বিনির্মাণ। শব্দটার অর্থ আদৌ ভেঙে-চুরে-খান-খান-করে-দেব, এরকম না। ওটা স্রেফ একটা পড়ার কায়দা। আপনি যদি ডিম ছুঁড়ে তৃণমূল ভেঙে ফেলেন, আর বলেন, আমি তৃণমূলের বিনির্মাণ করলাম, তাহলে সেটা হাসির খোরাক ছাড়া আর কিছু হবে না। কিন্তু অনেক বাঙালি আঁতেলই একদা নিজেকে পণ্ডিত প্রমাণের জন্য ধ্বংস বা অন্তর্ঘাতের প্রতিশব্দ হিসেবে হরবখৎ বিনির্মাণ ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। আমার মনে আছে, দীপেশ চক্রবর্তী, বোধহয় হতাশ হয়েই, একদা আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় পাতায় ১০০০-১২০০ শব্দে জিনিসটা প্রাঞ্জল করে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি মাস্টারমশাই হিসেবে চূড়ান্ত ব্যর্থ, বোঝাই যাচ্ছে। কারণ, স্বয়ং উচ্চশিক্ষামন্ত্রী এখন বলছেন, প্রথমে ডিকনস্ট্রাকশন, পরে কনস্ট্রাকশন। ফলে, যেমন এলাহাবাদ এখন প্রয়াগরাজ, বিনির্মাণ মানে ধ্বংস, আর অতি অবশ্যই উচ্চশিক্ষা মানে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি।কিন্তু এখানেই শেষ না। উনি খুব কড়া ভাষায় সকলেরই নিন্দা করছেন দেখলাম। চতুর্দিকে পুরোনো সব একদম "ডিকনস্ট্রাক্ট" করে দেবেন্, এরকম হাবভাব। সেই জরুরি অবস্থার সময় এক মন্ত্রী যেমন সব "সেন্সাস" করে দেবেন বলতেন বলে গল্প আছে, সেই রকম। তা, উনি খুব জোর দিয়ে বললেন, "পুষ্পা এখন ফুষ্পা হয়ে হাপ্প্যান্ট পরে হাঁটছেন, দেখেছেন তো?" তারপর আরও স্পষ্ট করে বললেন, "জাহাঙ্গীরকে তবু একটা পোলো টিশার্ট পরে ঘোরানো হয়েছে. কিন্তু এই ধরণের ছেলে, যারা শিক্ষা বেচতে ক্যাম্পাসে পৌঁছবে, তাদের চাড্ডিতে খালি গায়েই ঘোরানো হবে"। এইটা শুনে, আমি একটু ফাঁপরে পড়েছিলাম। কারণ দুদিন আগেই কাগজে পড়েছি, যে, কোর্ট বলেছে, এইভাবে চাড্ডি পরিয়ে ঘোরানো মোটেই ভালো জিনিস না। তাহলে কি উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ভুল বলছেন? সেটা কীকরে সম্ভব? কিন্তু পরের কথাটা শুনেই ভুল ভেঙে গেল। শুধু চাড্ডি পরিয়ে ঘোরানো না, উনি খুব স্পষ্ট করে বললেন, একদম "স্যাটা গরম করে দেওয়া হবে"। মানে, ব্যাপার খুব সোজা। আইন আইনের পথে চলবে, উচ্চশিক্ষা উচ্চশিক্ষার পথে। আর বাংলায় "শিক্ষা দিতে হবে" কথাটার মানে কি? "স্যাটা গরম করে দিতে হবে" ছাড়া আর কিছু না। ফলে ওটা অতি অবশ্যই উচ্চশিক্ষার আন্ডারেই পড়ে। যদিও পুরোটা এইভাবে ভাবতে একটু সময় লাগল। কিন্তু তা লাগুক, এইভাবেই ওই ৩১ মিনিটের সাক্ষাৎকার শুনে আমার চোখ খুলে গেল। জগৎ সংসার এবং উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে। আশা করা যায় শিক্ষা উপদেষ্টা অর্জুন সিং এরও একটা সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে এর পরে। আরও ভালো ভালো জিনিস জানতে পারব।
  • ভাট...
    comment. | ফুটবল ফিকশন?!
    comment:|: | তবে যাই বলুন এমন থ্রিলার চলছে যে ফিকশনে মন বসছে না।
    comment. | যাগ্গে আজ নেদারল্যান্ড ও জাপানের খেলা মোটামুটি লাগল। ২ঃ১ চলছে। শেষটুকু দেখার ধৈর্য্য নেই, ঘুম পাচ্ছে।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত