• হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • লকডাউনের ছাদ

    Simool Sen লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ০৯ এপ্রিল ২০২০ | ৪৯১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ৯ এপ্রিল ২০২০



    দুপুরের ঘুমটা ভাল হল না। এমন সময়ে ঘুম না হওয়া মানে একটা আস্ত বিকেল হাতের মুঠোয়। ও দিকে, রাতেও ঘুম হয়েছে ভালই।

    অতএব, বিকেলটা সামান্য ছাদেই কাটানো যেতে পারে।



    ওহ্, প্রাইভেসি বলে আর কিছু রইল না দেখছি! পেছনবাড়ির ভুঁড়িবাগীশ প্রৌঢ় নিয়মমাফিক পায়চারি করতে করতে গাছে জল দিচ্ছেন। অতঃপর, নিজের মনে যে কিয়ৎক্ষণ পায়চারি করব, সে' আশ্বাসটুকুও নেই!

    পর মুহূর্তেই মনে হল, আচ্ছা, দেখলে দেখুগ্গে। নিজের মত হাঁটিই না! আফটার অল ওঁরও কাজকম্মো আছে।



    কানে অসহ্য নয়েজ ঠেকছিল। ছাদ থেকে ঝুঁকে দেখলাম, একটা মাত্র বাইক, সামান্য হর্ন দিয়ে গেল। তার এত প্রতিক্রিয়া!

    লকডাউনের ঠেলা যে কদ্দূর, এ বার টের পেলাম। যে পাড়ায় নিত্য গাড়ি যাতায়াত করত সশব্দে, সে' তল্লাটে করোনার জেরে গাড়িই চলছে না, তা প্রায় দু' হপ্তারও ওপর হয়ে গেল৷ না কি আরও বেশি? দিনক্ষণের কোনও হিসেব আর রাখছি না।

    ভয় একটাই: লকডাউন তো এক দিন উঠবেই। তখন প্রথম প্রথম গাড়ির যাতায়াতে নিশ্চয়ই কান অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে!



    আচ্ছা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সভ্যতার এ' রকম বিপর্যয় কি ইতিহাসে আগে হয়েছে? না বলেই মনে হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চোটে জীবনযাত্রা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল ঠিক কথা। বুদ্ধদেব বসুর মেমোয়ারে পড়েছি, ট্রাম বাদে কোনও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট যেত না তখন, সন্ধে নামলে এক কাঠি ওপরে বিদ্যুৎ অফ– মাঝেমধ্যে জনশূন্য রাসবিহারীর মোড়ে ট্রামের ইতস্তত ধাতব মর্মর, আর পূর্ণিমার চাঁদ গলে গলে ট্রামলাইনে পড়ছে।

    দৃশ্য! ভাবতেই কেমন লাগে! কিন্তু তখনও তো যুদ্ধটুদ্ধ হত আর কী! এত অস্ত্র, সবই তো ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড, সভ্য আর্মামেন্ট ফ্যাক্টরির অবদান! আর এখন?

    বহু বছর আগে সুধীর চক্রবর্তীর একটা লেকচার পড়েছিলাম, আয়নানগর বিষয়ে৷ সুধীরবাবু তখন মফসসল-ফেরত ছাত্র। সবে কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছেন পড়াশুনোর খাতিরে৷ থাকতেন, এমজি রোড (তখন হ্যারিসন) আর কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে। রাতে ঘুমোনো যায় না, এমন সশব্দ ধাঁইধপাধপ চলছে! গাড়ি, হর্ন, শ্রমিকদের ব্যস্ত হল্লা! কিন্তু ক-দিন বাদেই আর সে' সব রেজিস্টার করা বন্ধ করে দিল। কারণ? 'সব আয়নানগরে ঢুকে গেছে, আর রিফ্লেক্টেড হয়ে ছিটকে আসে না!' অন্তঃপুরের অদ্ভুত ব্যাপারস্যাপার...



    আকাশ ছয়লাপ করে ঘুড়ি উড়ছে। কদ্দিন পর দেখলাম! একটা ঘুড়ি, দুটো ঘুড়ি... গুনে দেখলাম, আমাদের বাড়ির আকাশে মোট চার-চারটে ঘুড়ি! বিরল।

    আরও অনেক হারানো জিনিস (কিংবা আমাদের প্রায়-মিলেনিয়াল প্রজন্ম চোখেই দেখে নি সে' সব) ফেরত আসছে! ছাদে ছাদে বাচ্চাদের কলতান। আবার ছাদের মধ্যে মধ্যে মৈত্রীও গড়ে উঠেছে। এ' ছাদ ও' ছাদকে চ্যালেঞ্জ করছে, হইহল্লা করছে। করোনা যতই বাড়ন্ত হোক না কেন, এই স্পিরিটকে রোখে কে!



    একটা টিকটিকি। টবের গভীরে এঁটেল মাটির অসমতল স্তর, সেখানেই কার্যত ক্যামোফ্লাজ করে আধ শরীর ডুবিয়ে ব্যাটা লুকিয়ে রয়েছে৷ গোটা জগৎসংসারে কী যে হচ্ছে, জানার কোনও আগ্রহও নেই। স্মিতনয়নে পিটপিট করছে। বোধ হয় বলছে, 'কী দেখছিস রে শালা!'

    বললাম, 'ভাবছিলাম, করোনা নিয়ে তোর একটা প্রতিক্রিয়া-টিয়া পাওয়া গেলে... বেশ হত!'



    উরিব্বাস। আকাশ তোলপাড় করে ভাসমান আগ্নেয়গিরি। সূর্য একেবারে তেতে, গরমকালের শেষ বিকেল ছাড়া এ' জিনিস বিশেষ চোখেও পড়ে না। প্রায় সলজ্জ নববধূ গোছের শরমে মরে গিয়ে আকাশে সন্ধে নামছে! 'বিবাহের রঙে রাঙা হল সোনার গগন রে'... আহ্, রবীন্দ্রনাথ!

    গানটা ছিল পূরবী প্লাস ইমন। পূরবী: মৃত্যুসম অন্ধকার। ইমন: তাকে অতিক্রম করে প্রার্থনা ও প্রেম।

    একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম। সারে সারে কাক ওই পশ্চিম দিগন্ত মাতোয়ারা করা রঙের উৎসের দিকে ধাবমান। চাতক পাখি বিভ্রান্ত, অনেকটা এই মুহূর্তের মানুষের মত! কী যে করবে, কী না করবে, কিছুই ঠিক নেই! এলোপাথাড়ি দস্যিপনা করে চলেছে।



    গাছে জল দিলাম। অনেক দিন পর আর কী।



    কেলো। বিকেলের সমাপ্তি ঘোষণা করে চরাচরে সাত লক্ষ আজান শুরু। কোনওটাই কোনওটার সঙ্গে মিলছে না, তবু মিলে যাচ্ছে মোটামুটি। বিদায়ী গোধূলিসূর্যের প্রতি স্তব।

    আজ সবেবরাত, না? পবিত্র রাত। ভাবতেই কেমন লাগে! সভ্যতায় এমন এক একটা অলৌকিক রাত আসে। বুদ্ধপূর্ণিমা যেমন। কপিলাবাস্তুর সমস্ত জানলাপত্তর যে রাতে হাট করে খোলা থাকে। জেগে থাকে মানুষ, আর চাঁদ।

    ১০

    একটা কাক চিলছাদের ওপর থোবড়া রেখে হাঁ করে হতবিহ্বলের মত আজান শুনছে।

    আজান শেষ হল। আসন্ন সন্ধেকে রেখে। আজান মানে ডাক। আহ্বান। এই সন্ধে নামার মুখে যে মানুষ যতই বাস্তুহারা, যতই শিকড়চ্যুত হোক– তাদের সমে ফিরে আসতে হয় ওই আজানের ডাক শুনে। আসলে, আজানের ডাক শুনলে আর কেউ একা থাকতে পারে না!
  • বিভাগ : আলোচনা | ০৯ এপ্রিল ২০২০ | ৪৯১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
আরও পড়ুন
সময় - Pradip Ray
আরও পড়ুন
ভগীরথ - Vikram Pakrashi
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন