• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • আমার রবিশংকর-পর্যটন

    Simool Sen
    আলোচনা : বিবিধ | ০৮ এপ্রিল ২০২০ | ৪৪২ বার পঠিত

  • পণ্ডিত রবিশংকর কে, এমন প্রশ্ন যদি তাঁর শতবর্ষে নিক্ষিপ্ত হয়, আমার উত্তর হবে: এক সেতার-বাজিয়ে প্রেমিক পুরুষ৷ নারীবাদীরা হয়তো অভিধার দ্বিতীয় শব্দটিতে কিঞ্চিৎ গোলমাল খুঁজে পাবেন, কিন্তু পৌরুষ ছাড়া রবিশংকরের বাজনাকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। সেই পৌরুষ, আশ্চর্যজনক ভাবে, উদগ্র ম্যাসকিউলিনতার কোনও ইস্তেহার নয়, বরঞ্চ প্রতি পলে ভারতীয় পৌরুষের ধারণাকে সে ভেঙেছে, গুঁড়ো করেছে, সাজিয়ে নিয়েছে নতুনতর কোনও ক্যালাইডোস্কোপে।

    এ' বছর পণ্ডিত রবিশংকরের শতবর্ষ হল। ৭ এপ্রিল ফুরিয়ে গেল খানিক আগে, এই তিথিতেই, আজি হতে শতবর্ষ আগে এই দুনিয়ায় তাঁর মহরত। করোনা-দাপটে ত্রস্ত তাঁর স্মরণোৎসবগুলি পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তেই কার্যত ভণ্ডুল। অতএব, এই নিতান্ত ব্লগচারণায় তাঁকে মনে করা যেতে পারে, এবং কাটাছেঁড়া চলতে পারে তিনি-প্রবর্তিত পৌরুষের ঐতিহাসিক ব্যঞ্জনা নিয়ে।

    পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও পৌরুষ, এই মিসিং লিংকটাকে ধরতে চাইলে প্রথমেই মগজে খেলে যায় যে রবিশংকরের বাজনা ছিল প্রধানত নৃত্যময়। ভারতীয় সংগীত এবং যৌনতা কোনও কথার গোলামি করে না, সে কেবল স্তব্ধতার গানটুকু নিংড়ে নেয়। একুশ শতকের দুনিয়া, তার প্রেমের ভাষা ও আবেগের ব্যাকরণ বড় বেশি কথাপ্রবণ। সংগীতের যে অঞ্চল ধূসর ও বিমূর্ত, বোধভাষ্যির জগতে প্রশিক্ষণ-ব্যতীত যার নিপাট উপস্থাপনা অসম্ভব, রবিশংকরের বাজনায় তা দৃশ্যত শরীরী ও ছন্দোময় হয়ে ওঠে থেকে থেকে। তাঁর বাজনার মূল লক্ষণ নাচ, যেন একটি মেয়ে স-শরীর নাচতে নাচতে চলেছে তাঁর সেতারের অন্তর্লীন ছন্দের স্পন্দনে৷ এবং, ওই মেয়েটি চপল ও খিলখিলে– কুহকী অপরিচিতার ছায়া শ্রোতাকে জাপটে ধরে, প্রেমের অমোঘ সর্বনাশা ডা-জেইন মুহূর্তের দিকে নিয়ে যায়– স্তব্ধ হয়ে পড়ে যাবতীয় সরলরৈখিক সময়ঘড়ি। উদয়শংকরের ট্রুপের নৃত্যময়তার সঙ্গে ছেলেবেলা থেকেই সহবাস করার অভিজ্ঞতা পণ্ডিত রবিশংকরকে কতখানি জারিত করেছিল, তা বিশিষ্ট আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। আপাতত আমি যে কথাটা পেড়ে ফেলতে চাইছি, তা হল, আমাদের সংস্কৃতি ও আমাদের ইতিহাসের লম্বা সড়কের এক কোণে রবিশংকরের অবস্থানটা ঠিক কী, এবং তাঁর নাচপ্রবণতার প্রেক্ষিতটা কোথায় লুকিয়ে আদতে।

    একাধিক উত্তর হতে পারে এর। কিন্তু প্রথমেই বলে রাখা ভাল, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের আগে লেজুড় হিসেবে লেপ্টে থাকা উত্তমপুরুষ বহুবচনের যে 'আমরা' সংশয়ের উদ্রেক ঘটায়, সেখানেই রবিশংকরের বাজনার ঐতিহাসিক আয়রনি নিহিত। প্রস্তাব মোটামুটি এই রকম: নাচ এবং শরীরমাধ্যম আমাদের সংস্কৃতির কতটুকু অধিকার করে আছে? লব্ধ পড়াশুনো যদি সাক্ষ্য হত, তা হলে বলা যেত– অনেকটাই। এই 'আমাদের' সংস্কৃতিময় দিগবসনা শ্যামাঙ্গী রমণীর রণরঙ্গিনী পদক্ষেপ, তাতে আমাদের কালচারবাবুরা আবার কিঞ্চিৎ বিধ্বস্তও বটেন৷ আমাদের দৃশ্যমাধ্যম ছেয়ে খাজুরাহো বা কোনারকের বিপুল উপস্থিতি। আবার, কী আশ্চর্য, এই খাজুরাহো বা কোনারক নিয়েই আমাদের ন্যাশনালিজম বড় কুণ্ঠিত, এমন কী, বিশ শতকের জাতীয়তাবাদী কুলগুরু গাঁধীকেও বিব্রত বলতে শুনি, তেমন হলে তিনি নিজেই এ-সব ভাস্কর্য, রগরগে মৈথুনদৃশ্য ইত্যাদি প্লাস্টার করে মুছে দেবেন– যে মতবাদের সঙ্গে, হালে জনগ্রাহ্য হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাষ্যের বিশেষ অমিল পাওয়া যায় না। জাতি হিসেবে ভারতের দীর্ঘ ও গভীর নির্জ্ঞানে নাচের সুতোগুলি যতই আকীর্ণ থাক-না কেন, ঔপনিবেশিক মানসপ্রসূত আমাদের জাতীয়তাবাদ কিন্তু তাকে সজোরে পরিত্যাগই করেছে। ব্রীড়াবনত নারীর অবগুণ্ঠিত মেয়েলি জবান হিসেবে নাচকে আমরা সাজিয়ে নিয়েছি, এবং ওইটুকুই। নারীত্ব ভারতীয় পুরুষের কাছে পরিহার্য, 'মেয়েলি' মর্মে অভিযুক্ত বাঙালি বাবুই তো ব্রিটিশের গুঁতো খেয়ে আত্মসংশোধনের নির্মম প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে, সশস্ত্র জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যান জুড়েই যার চরণধ্বনি। ও' প্রান্তে শরীর, সে আমার গোপন কথা-র ইশারাময় কানাকানি। ভিক্টোরীয় শুচিবাইপনা, যৌনতা প্রসঙ্গে ছুঁৎমার্গ, শরীর নিয়ে অত্যধিক পিটপিটেমো– কারণ যা-ই হোক না কেন, জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যানে শরীর তেমন ঠাঁই পেল না, নাচও কখনও তেমন কল্কে পায় নি, কেবল নান্দনিক শাঁসটুকুর জাবনা সংরক্ষিত জাতীয়তাবাদের ঢাকনার তলায়। ব্যত্যয় কি হয় না? নিশ্চয়ই হয়। নিমিত্তবিশেষে বাঘা প্রতিষ্ঠান-নির্ধারিত উচ্চাবচ সমাজক্ষমতার খোলস দুমড়ে যায়, শিথিল ও অসচেতন কার্নিভালেস্ক মৌতাতে জনপরিসর ছয়লাপ করে দেয় নাচ– ঠিক যেমন দুর্গাপুজোর ভাসানে হুল্লোড়-মচানো নাচ চলে।

    নাচের উল্টো দিকে যদি মিউজিকের ঔপনিবেশিক ইতিহাসটা নিয়ে কিঞ্চিৎ নাড়াঘাঁটা করা যায়? সন্দেহ নেই, জাতীয়তাবাদ যে যে শিল্পমাধ্যমগুলির ওপর দখল কায়েম করতে চেয়েছে, তার উজ্জ্বলতম নিদর্শন সংগীত। একে তো কোনও লিখিত টেক্সটের বুনোটে তা ধৃত নেই, অতএব গুরুশিষ্য পরম্পরার মই বেয়ে নিশ্চয়ই পৌঁছোনো যায় পুরাণ-পোষিত সেই অলীক বিভাময় বৈদিক অতীতে। আধুনিকতার পেশাদারিত্ব ও ব্যক্তিনামার সই এই নিগূঢ় কুলুজিকে বুঝতে পারবে না। উপরন্তু, সাম্রাজ্যের আগে আমাদের সংগীতে দুটো মোটা বিভাজিকা ছিল– এক প্রান্তে মার্গসংগীত, যে মার্গ পৌঁছে দেয় মহাজনের ঈপ্সীত গন্তব্যে, আর উল্টো পিঠে দিশি গান, আমাদের আউল-বাউলপনার বৃহত্তর খোলস। এই দুনিয়া লোকসমাজের দুনিয়া, দরবারি কানুন এখানে চলে না, ডাকনামেই তা 'প্রাকৃত'– তার জন্য অতিরিক্ত পরিশীলন নিষ্প্রয়োজন, অতএব তা প্রকৃতিসিদ্ধ ও প্রকৃতিনিষ্পন্ন। মার্গসংগীতের ইংরিজি, স্বভাবতই কূট প্রশ্ন মনে খেলে যায়, কি কখনও ক্ল্যাসিকাল হতে পারে? এই ক্লাসিক, সন্দেহাতীত ভাবে, তিন টুকরোর ইতিহাসবোধের সেই ক্লাসিক– যে ইতিহাস আলোকময় আধুনিকতার পিচ্ছিল ও বন্ধুর রাস্তায় ধাবমান, কিন্তু এক দিন বৃত্ত সমে পড়বেই, তা ফিরে আসবে শাশ্বত ক্ল্যাসিকের আদিতম স্বয়ংপ্রভায়। কোম্পানি আমলের গোড়ার দিককার এই জ্ঞানতত্ত্বের জোরের জায়গাটা যত-না ইতিহাসের গরু-খোঁজায় ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল মিথের দুনিয়ায়– ক্ষয়শীল, পচনশীল বাস্তবতার ও পারের অজর ও অব্যয় ভাববাদী ভবিষ্যৎই তার গন্তব্য। কাজেই, ইতিহাসের শর্ত ততটা রক্ষিত হয় নি। হেগেল তদ্দিনে রাষ্ট্রবাদী বিশ্ব-ইতিহাসের নিশান উড়িয়ে দর্শনচিন্তায় অভিষিক্ত, অতএব কোম্পানির কুশীলবরাও ভারতের ইতিহাসকে রাষ্ট্রীয় তুলাদণ্ডেই মোটমাট জরিপ করে নিয়েছিলেন। স্বভাবতই, প্রাকৃত গানের তুলনায় ঝোঁক পড়ল মার্গের দিকে, মার্গের শখের ডাকনাম হল ক্লাসিক, এবং সেই ক্লাসিকের আওতায় এল ধ্রুপদের মত বুড়োহাবড়া শিল্পমাধ্যম থেকে, কিঞ্চিৎ অনৈতিহাসিকতার সূত্রেই, খেয়ালের মত হালের সংগীতকাঠামো-ও। ধর্মের পৃথকীকরণ আর সম্ভব হল না, ওরিয়েন্টালিজমের বয়ানে এই সংগীতের নতুনতর পদবি জুটল: শাস্ত্রীয় সংগীত। নির্দিষ্ট ব্যাকরণের কাঠামোয় তার বসত, হেস্টিংস আমলের বাই যে রকম ছিল আর কী: অতীত-ঐতিহ্যের খড়কুটোপ্রতিম নিরালম্ব দাঁড়িয়ে রইল শাস্ত্রীয় উত্তরাধিকার।
    এ' যদি হয় উহাদের অনুবাদ, তবে আমাদের অনুলিখনও ছিল। তার এক দিকে এই ক্লাসিককে পুনর্নবীকৃত করার প্রয়াস– প্রাতিষ্ঠানিকতা, বাঁধা স্বরলিপি, প্রশিক্ষণ, মান্য নন্দনরুচি মায় পোশাকআশাকের বিধিও প্রবর্তিত হল উনিশ শতক জুড়ে। যন্ত্রের কারিগরি মধ্যস্থতায় ছাপাখানাময় সংগীত নিয়ে বিপুল দস্তাবেজ গজাতে থাকল, তা নিয়ে বাদী-বিবাদীর প্রতর্কসম্ভার, ভাতখণ্ডের মত ক্লাসিকের ব্যাপারী, আবার আধুনিকতার সেরা প্রস্তাবক রবীন্দ্রনাথও এই গোছের বিতর্কে বহু বার পাকেচক্রে জড়িয়েছেন, দিলীপকুমার রায় বিতর্ক তো বিশেষ ভাবে স্মর্তব্য। আর, এই ক্লাসিকের সমান্তরালেই আধুনিক গানের প্রকল্প– কাঠামোর ভূতটিকে বজায় রেখেই তাকে পুনর্নবীকরণের উত্তরোত্তর প্রয়াস।

    প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এই দুই জানলার সংলাপও কি কম পড়িয়াছে? প্রথম আলোয় পড়েছিলাম, দুঁদে ভারততত্ত্ববিদ ভট্ট মোক্ষমুলর পিয়ানোয় দ্বারকানাথের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের কিসিম শুনে খেপে লাল হয়ে উঠছেন। তার শতাব্দীকয় পর, দ্বারকানাথের নাতি উনিশশো বিশের দশকের শেষ ভাগে জার্মানি পরিভ্রমণরত, সমকালের অন্যতম জাঁদরেল মস্তিষ্ককে বলবেন, ভারতীয় সংগীত যেন রেখা, মেলোডি তার নিষ্কর্ষ। আর আইনস্টাইনদের মিউজিক? তা রং– হারমোনির বর্ণালিতে দিগন্ত মাতিয়ে দেয়। বিশ শতকের খানিক বাদে থেকেই মহাসাগরের সব পারে লগ্নিপুঁজির বাড়াবাড়ি রমরমা, প্রচারমাধ্যমের প্রবল প্রতাপ, কমার্শিয়াল ও পপুলারের প্রথম জন্ম– ভারতীয় সংগীতের কিসিম মিশে যায় আমেরিকার পপ গানে। অতিজাতীয় এই লেনদেনে গড়ে উঠতে থাকে কসমোপলিটান এক মহাবিশ্ব।

    সবই তো না-হয় হল, কিন্তু এই বড় ক্যানভাসে রবিশঙ্করের অবস্থান ঠিক কোথায়? খটকা জাগে, ভোগবাদী ক্ষয়ের বিপ্রতীপে আধ্যাত্মিক শুশ্রূষার প্রয়োজনেই কি রবিশংকরের মধ্যস্থতায় শাস্ত্রীয় সংগীতের কাছাকাছি আসে বিট বা হিপি প্রজন্মের বাউন্ডুলেপনা, ঠিক যেমন ইউরোপের বিদ্বৎমণ্ডলীর একাংশ যুদ্ধতাড়িত বাস্তবতার প্রতিষেধক হিসেবে এসকেপ রুট খুঁজেছিলেন গীতাঞ্জলিতে? না কি, রবিশংকরের সৃষ্টি জুড়ে যে শরীরগন্ধ, তা-ই পশ্চিমা সংস্কৃতি-সৌধের এত কাল ধরে সযত্নলালিত আধুনিকতা-উপ্ত দ্যোতনাকে খানখান করে দেয়, সংস্কৃতির পরিশীলত, চর্যাপ্রসূত নির্মাণের বিকল্পে এনে হাজির করে প্রতি-সংস্কৃতির ধারণা? খটকা জাগে, এলএসডি বা চরসগাঁজায় কী ভাবে মাখামাখি হয়ে যেতে পারে ভারতাত্মার আবহমানের সেই 'পূত', 'বিশুদ্ধ', ও 'নিঃশ্রেয়' সংগীত-মাধ্যম? এর কোনওটারই উত্তর আমি জানি না। কিন্তু, পুঁজির সূত্র ধরে মহাদেশে মহাদেশে তমসা-ঘোচানোর যে আধুনিক ভাবাদর্শ প্রতিটি জ্ঞানকাণ্ডেই আলতো ছুঁইয়ে গেছে ক্ষমতাস্পর্শ, তার নিক্তিতে দেখলে, রবিশংকর– যেমনটা বলছিলাম– এক বড় ঐতিহাসিক আয়রনি। সে' তিনি যতই বিরাশির এশিয়াডে ব্যক্তিগত ভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার পৃষ্ঠপোষণায় কলাবতী রাগে দেবভাষায় সুর বোলান, তাঁর ইতিহাসবোধ ভিন্ন মাত্রার। নশ্বর আধুনিকতার মরজগতের ও' পিঠে শাশ্বত ক্লাসিকের যে সন্ধান প্রাচ্যবাদী ব্যাখ্যানে উঠে এসেছিল, যার মধ্যে নিহিত ছিল অধ্যাত্মিক ক্রমমুক্তির গন্তব্যঠিকানা– তাকে রবিশংকর সাগরপারে পৌঁছে দিয়েছেন, যুদ্ধতাড়িত ধসে পড়া আধুনিকতার সাতমহলা স্থাপত্যে আমদানি করেছেন দ্বিকোটিক বিভাজনে 'মেয়েলি' হয়ে পড়া প্রাচ্যের বাতাস। এই প্রতিস্পর্ধাকে কি রিভার্স ওরিয়েন্টাজিলম বলা চলে জানি না, কিন্তু এর অন্তঃসলিল 'গেজ' এক আশ্চর্য ঘটনা তো বটেই। এই মেয়েলি কথাবিহীন সুরগন্ধী সভ্যতা ধ্রুব ভারতাত্মা-সহ তার শরীরী নাচ নিয়ে আসে– এখানেই তার আবেদন। পশ্চিম যাকে অনাধুনিক, বর্বর ও পশ্চাদপদ বলে মনে করেছে প্রগতির নিক্তিতে, আমরাও জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠার আধুনিকতর মন্ত্রণায় যে ইতিহাসকে দূরে ঠেলে রেখেছি, তা আচমকা দখল করে বসে দীর্ণ, ন্যুব্জ ঔপনিবেশিক সভ্যতার মনোভূমি– সঙ্গতে, সেতারে রবিশংকর, তবলায় আল্লারাখা, উডস্টকে পারফরমেন্স-শেষে হাততালির তুমুল ঝড়– এমন রকপ্রতিম পারফরমেন্সও তো দ্যাখে নি মার্গসংগীতের সভ্যতা, পশ্চিমও দ্যাখে নি বেপাড়ায় গিয়ে এমন সাংস্কৃতিক উলটপুরাণ!
    ***
    এই লেখার সমালোচক আমি নিজে। এই কেজো ধরতাইয়ে সুর যায় খেই হারিয়ে। সংগীতের ক্ষরণে আমাদের স্নায়ুকোষে যে উথালপাথাল জৈব-রাসায়নিক বিদ্যুৎপ্রভা হানা দেয় চকিতে, অনির্বচনীয় রসের যে ইশারা তন্ত্রীতে যে ডাক পাঠায় গহন অবচেতনে, সাক্ষর সংস্কৃতির নীচে জমাট-বাঁধা হাজার হাজার বছরের শিলাস্তরে, তার ঠিকানা কি দিতে সক্ষম এমন ব্যর্থ ও কেজো সমাজতাত্ত্বিক অ্যানালিসিস?

    না। নয়। রবিশংকর বললেই, তাই, আমার সামনে বাকি সব ফিকে হয়ে আসে, কথার অতীত ওই খ্যাপা প্রেমিক পুরুষটি জেগে থাকেন, যার প্রেম ছায়ার মত নেচে বেড়ায় অবিরত, যার জন্য মাছ সেজে জলের অনেকটা নীচে নেমে যাই। জানি, ও প্রান্তে বাতিঘর, জানি এ' রাত ফুরোবে কখনও না কখনও, তবু জলস্পর্শ ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হয় না, জলকে অনন্ত বলে মনে হয়। সময়ের উজবুক ঘড়িগুলো গুবলেট হয়ে যায়। মধুযামিনীর সর্বস্ব-আকুল করা সোহাগ সেই প্রেমিকের সমস্ত কাঙালপনা আদায় করে ছাড়ে। যাকে রবিশংকরে পেয়েছে, সে জানে রাতের পর রাত এই বিপজ্জনক উপকূলে কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব, যার জিয়নকাঠি ওই ডোবা-য়, বারংবার নাছোড় ও নির্বিকল্প ডোবা-য়। আজ রবিশংকরের একশো, এই লেখা লিখছি যখন, আকাশে সুপারমুনের অলৌকিক বিভা। প্রেমিক পুরুষটি ঠিক করেছে, অতঃপর আজ সারা রাত জল ছেড়ে সে নড়ছে না!
  • বিভাগ : আলোচনা | ০৮ এপ্রিল ২০২০ | ৪৪২ বার পঠিত
আরও পড়ুন
#আমি - Jinat Rehena Islam
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • করোনা

  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত