• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • লকডাউন, ছাদ ও কুড়ি কুড়ি বছরের পার

    Simool Sen
    বিভাগ : আলোচনা | ০৩ এপ্রিল ২০২০ | ২৫৮ বার পঠিত
  • লকডাউনের আবহে বিশ্বায়নী দুনিয়াদারির স্মিত অন্তর্ঘাতে হঠাৎই চেগে উঠল ছাদ। একদা ছাদের ওপর পায়চারি করেছিল হারবার্ট আর বুকি, অস্পষ্ট অবুঝ চিলছাদ তার প্রণয়ের দিনগুলির সাক্ষ্য রেখে গেছে। ছাদ, বস্তুত, সংসার-সীমান্তে অথচ পাবলিক পরিসরেও নয়, এ রকম নিরালম্ব মধ্যবর্তিতায় ঝুলে-থাকা অস্তিত্ববিশেষ। ছাদ কখনও রাস্তা নয়। ছাদে সভাসমিতি হয় না। ছাদ কলঘর নয়, চিলেকোঠাও নয়৷ ছাদে আকাঙ্ক্ষার ঘেমো পৌরুষ সন্ধিসময়ে কখনও ফুটে উঠবে না। ছাদ নিভৃত নয়। কিন্তু ছাদ দ্বিরালাপের। ছাদে প্রথম কানাকানি চলবে, এট্টু বাগান করা চলবে, ঈষৎ হাত-ধরা চলতে পারে, ছাদে উপুড় হয়ে যাবে গোটা কলকাতার স্কাইলাইন, নক্ষত্রমণ্ডলী প্রায় নতজানু হয়ে অভিবাদন কুড়োবে একাকী দর্শকের। ছাদ শহরের মানচিত্রে জেগে-ওঠা একটি ধূসর সন্ধেতারার অমোঘ অঞ্চল।

    গত কুড়ি বছরে কলকাতা বিচ্ছিরি ভাবে পাল্টে গেছে৷ ছাদের পাট উঠে গেছে সমাজে, এসছে নতুনতর রাস্তা: কখনও বোকাবাক্সে, কখনও হাতের চৌকোনা ভার্চুয়াল স্ক্রিনে। পাবলিক আর ব্যক্তিগতর মাঝামাঝি ঝুলে থাকা যে গোধূলিসন্ধি ছাদের মূলধন ছিল, তা ক্রমশ মুছে গেছে বাজারের অনাদরে ও উপেক্ষায়। এখন প্রতিটি প্রণয়, প্রতিটি স্পর্শ ও নাক্ষত্র সংলাপ নির্বিশেষে পাবলিকের খোলা হাটে বিকোয়। এই আকালে, কে-ই বা জাগাবে ছাদ: ঘুড়ি উড়োনোর ছাদ, প্রথম খেলতে শেখার ছাদ, অবোধ বোগেনভিলিয়ার ছাদ?

    সহজপাঠে একটা চমৎকার দৃশ্যকল্প ছিল রবীন্দ্রনাথের। প্রথম ভাগের শিশুটি এখন বড়, তার সঙ্গে বাইরের দুনিয়ার একটা মধ্যস্থতা তৈরি হচ্ছে, তখন ছাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ‘আমি যখন শহরে যাই/ তমিজ মিয়াঁর গরুর গাড়ি চড়ে।’ আবার, ‘সাড়ে চারটে বেজে ওঠে/ ছেলেরা সব বাসায় ছোটে/ উড়িয়ে দিয়ে রাঙা পথের ধুলো।’ ধু-ধু মহানগরীতে ছুটির ক্ষরণ হয়, মুক্তির আশ্বাসে বিকেল নামে। ছাদ বললেই, কে জানে কেন, এই কবিতাটার কথা মনে হয়। সন্ধে নামার বর্ণনা তো আরও হরেক ভাবেই হাজিরা দিয়েছে সহজপাঠের পাতায় পাতায়। সন্ধের শহর মানেই এক্ষুনি তল্পিতল্পা নিয়ে ভূতেরা নেমে আসবে সময়ের চৌকোণা থেকে, প্ল্যানচেটের জন্যও তো রাত্রি প্রথম প্রহর প্রশস্ত তিথি। সাহেবসুবোর কলকাতায় কারা যেন ভূত নামায় তেপায়া টেবলে, আসলে ও যে ভূত নয়, আর্তিবিশেষ: ফিরে এসো, সমগ্র চরাচর ছাপিয়ে। কে ফিরবে, সন্ধের কলকাতা জানে। সন্ধে তো দিনের নিভৃততম প্রদেশ। শহর যেখানে উপকণ্ঠের গলি পেরোলেই হত সান্ধ্য শহরতলি, সেখানেও আজ সরগরম, ভরভরন্ত মেট্রো সিটি। এমন একাকী যুগমুহূর্তে ছাদও তেপায়া টেবল নিয়ে বসে।

    সন্ধের সুর তো অনস্বীকার্য ইমন, আর ইমনের রাগ নাকিসুর, চন্দ্রবিন্দুময়। হুতোমি আমলের ধুতিপরা, বেলফুলওলা বাবু ঘুরঘুর করে, কেউ থিয়েটারগামী, কেউ বা বেশ্যাপাড়া। আবার, নক্ষত্রের উদ্ভাসমুহূর্ত সন্ধে, বিশ্বচরাচরের সঙ্গে যোগস্থাপনেরও সন্ধে। হইহুল্লোড় আর কলতানে যে আদিম সন্ধে নিজেকে এখনও সংরক্ষিত রেখেছে অকৃত্রিম অক্ষত কৌটোয়, তার স্পন্দন শুনতে পাওয়ার সন্ধে। চরাচর জুড়ে ইমন ভাসে, এমন সময়েই তো লৌকিকতার আগল ডিঙিয়ে আশ্চর্য কসমিক স্বয়ংপ্রভা ভাসিয়ে দেয় নক্ষত্ররাজি, ধূমকেতু বা নীহারিকা। এমন সময়ই তো প্রার্থনার সময়, আত্মাকে সেই অতিলৌকিক দ্যুতির সামনে প্রগাঢ় বিলিয়ে দেওয়ার সময়, শান্তি মঞ্জুর করার সময়। ধূপের গন্ধে, কান্নার শব্দে, মন্দিরের কাঁসরবাদ্যে, ইমনে ইমনে ছয়লাপ কোবাল্ট নীলরঙা আকাশ থেকে বিস্মৃত সন্ধেগুলি অবোধ্য অক্ষরে ঝরে পড়ে।

    ছাদে বসে সেই চঞ্চল ঐশী রেণুর স্পন্দন দিব্যি টের পাওয়া যায়। যতই উড়োজাহাজের গতায়াত ঢেকে রাখুক গ্রহমণ্ডল, সমস্ত আশঙ্কা উদ্বেগ ও হন্তারক ব্যাধির পরেও সামান্য শুশ্রূষার পরত নামে মহাশূন্য থেকে, শান্তির চেয়ে বড় সত্য যে কিছু নেই তা মনে করিয়ে দেয়। স্তিমিত স্তবের উচ্চারে, সন্ধের প্রথম ফুল কিংবা নয়নতারার মত ঝলমলে সান্ধ্য নক্ষত্রের প্রতিশ্রুতিতে।

    কুড়ি বছর আগেই পাবলিক আর নির্জনের খড়ির গণ্ডি মুছে গেছে। রাস্তা নেই, মধ্যবিত্ত চরাচরে আকুল বিনা কাজের ডাক যখন, লকডাউন-মথিত সন্ধের ছুটিটা না-হয় ছাদেই কাটানো যায়। গরমের সন্ধে, একটু হাওয়াও থাকবে, বেশ না?
  • বিভাগ : আলোচনা | ০৩ এপ্রিল ২০২০ | ২৫৮ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • একলহমা | 108.162.237.165 | ০৩ এপ্রিল ২০২০ ০৯:১৯91980
  • হারিয়ে যাওয়া ছাদ ফেরত এলে সেইটা একটা প্রাপ্তি, ঠিক।
    লেখার উপাদেয়, ভালো লাগল।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • গুরুর মোবাইল অ্যাপ চান? খুব সহজ, অ্যাপ ডাউনলোড/ইনস্টল কিস্যু করার দরকার নেই । ফোনের ব্রাউজারে সাইট খুলুন, Add to Home Screen করুন, ইন্সট্রাকশন ফলো করুন, অ্যাপ-এর আইকন তৈরী হবে । খেয়াল রাখবেন, গুরুর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে গুরুতে লগইন করা বাঞ্ছনীয়।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত