• হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • দক্ষিণের কড়চা

    Parthasarathi Giri লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১৫ জানুয়ারি ২০১৮ | ১৯৫ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • গাঙ ফিরবেন বাবু?

    ওরা দুজনেই চোখ তুলে বাম দিকে তাকাল। একটি ছোট ডিঙি নৌকা। নৌকার লোকটি কী বলল তাদের ঠিক ঠাহর হয়নি। বাতাসে জলের সরসর শব্দ। পিছনের গেঁওয়া গাছের মাথায় বড় বাতাসের ঝাঁকুনি।

    গাঙ ফিরবেন লাকি গো?

    ওরা বুঝল এ গাঙফিরানি ডিঙি। ওপারে মিঠালি বাদি। যে-ঘাটে ওরা দাঁড়িয়ে আছে সেটি পটুয়াখালি ঘাট। মধ্যে বিদ্যাধরী ছলাৎছল।

    সূর্য মধ্যগগনে। মেয়েটির কপালে উড়োচুল। শালের পাড়ের আলপনায় মুখটি বেশ দেখায় যেন। যেন এইমাত্র ধুয়ে সাফা করে ক্রিম ট্রিম মেখেছে। মেয়েটির শরীরে অনেক প্রকার গন্ধের মাখামাখি।

    বছর ছাব্বিশের যুবকটির চাহনি ঈষৎ চোরা-টাইপ। এক ঝলকে মনে হবে ভেতরে কিছু মতলব, যা সহজগণ্য নয়। পরণের ফুলপ্যান্টের হিপ পকেটে একটি চিরুনির বাঁট দেখা যাচ্ছে। গায়ে একটি হাফ সোয়েটার যদিও রয়েছে, ওতে জলের পাড়ের হিম হাওয়ার রেয়াত করার কথা নয়।

    গাঙফিরানি পাড়ে নেমে এল। যুবকটি একপাশে মিনিট দেড়েক নিচু স্বরে কিছু কথা বার্তা বলছিল। এই সময় মেয়েটি ভুসসস ভুসসস করে হেঁচকি তুলে শেষে সশব্দে কেঁদে ফেলল এবং ঘাটের গাছের গুঁড়িতে ধপ করে বসে পড়ল।

    গাঙফিরানি মেয়েটির কাছে এসে গায়ে মাথায় হাত বোলাচ্ছে। কাঁধের কাছে আঙুলগুলো একটু বেশি চেপে গেল নরম মাংসে। যুবকটি ইতিউতি চেয়ে কেবল বলল, আর ফিরে আসব না। চল।

    বেশ খানিকটা দূরে একটি জনা দশেকের দলের পিকনিক চলছে। মাইকে 'ইয়ে গলিয়া ইয়ে চৌবারা' বাজছে। দুয়েকটি মেয়ে হাতের চুড়ি বাজাবার ভঙ্গিতে দুলে দুলে নাচছে। এতদূর থেকে পাঁঠার সেদ্ধ হওয়ার ঘ্রাণ আসার কথা নয়।

    এইখানে নৌকা ছাড়বে এবার। তিনটি মানুষের দেহে তিনপ্রকার তরঙ্গ এবং স্রোতসা বিদ্যাধরী।

    আমরা এখানেই দাঁড়াব। এখন ভরা পৌষের নদীর শান্ত শয়ন। পাতা উড়ে উড়ে পড়ছে জলে। দুয়েকজন মেয়েমানুষ লোহার শিক গেঁথে গেঁথে কাঁকড়া ধরছে, জলে ডুবতে আসা গাছের শেকড়ের খোঁদলে। আমরা এইসব দৃশ্যে অসংকুলান হয়ত, তবু এ আমার তোমার ভ্রাম্যমানতা।

    মেয়েটি একবার ভাবল ফিরে যায়। সে চোখ বুজলে কেবল একটা গনগনে ধোঁয়া ওঠা ধানসেদ্ধর বিশ সেরি কড়াই দেখতে পায়। একটা আয়না আর একটা নীল রঙের মিহি নাইলনের মশারিও দেখতে পায়, আর পায় বলে এই ঘাট অবধি সে হেঁটে এসেছে।

    এইখানে তিনজনের নিচুস্বরের আরো কিছু কথোপকথন।

    -- কেউ টের পায়নি কইছি তোমারে। বাখরাহাটে দোকান দিছি। তুমি দেখলে বিশ্বাস করব।
    -- তা তুমার বাপ মা রাজি নয় কেন মেয়ে?
    -- বাপ না সোয়ামি।
    --আঃ তুমি চুপ কর না শিবানী!( যুবক আলতো জিভ কাটল নামটা বলে ফেলে।)
    -- পুরা এক হাজার লিছি বটে, ঝক্কি হলে বেশি লাগবে।
    -- আচ্ছা এবার লৌকা ছাড় গাঙনি।
    -- না আগে কথা কয়ে নিলি, পরে বইলবেনি।

    এখানে নদী মায়াবিহ্বলা। দুপাড়ে সবুজ গেঁথে গেছে। অঙ্গে অঙ্গে জল রঙ মেখে মেখে মাটি খেয়ে খেয়ে চলে গেছে মোহনায়। এই জোয়ার ভাটির কাটাকুটি খেলায় ভূমি কেবল নুনে হেসেছে। যেন অফুরান নুনভাতের বারোমাস। আসলে তো তা নয়। যে-কোনো ঝোপের পাশে একটি ইঁদুর একটি সাপের গর্ত থাকেই। আর তাই মৃগয়া কখনও ফুরোয় না। ঝোপের পাশে কেউ শিকার কেউ শিকারি।

    ইঁহা আনা না দোবারা অব হাম...মিলিয়ে গেছে দূরে। এখন ডিঙি বিদ্যাধরীর ভরা বুকের খাঁজে। পটুয়াখালি ঘাট এখান থেকে দু চারটে খড়ের টুকরোর মতো দৃশ্যমান। মিঠালি বাদি এখান থেকে দেখা যায় না।

    তবে? তবে এ কি অপার্থিব? এই আনখশিহরিত নদীর শরীরে এ কি অন্য কোনো ফাঁক? এই জল ভেদ করে চতুর্থ মাত্রায় চলে যেতে পারে ডিঙি? তিনটি মানুষের তরঙ্গ ফাঁকে আটকে গেছে?

    পুরুষের হিসহিসে সুখের শব্দ। গইলের মধ্যে মেয়েটি নিঃশব্দ উলঙ্গ শায়িত। দুই উরুর ফাঁকে গেঁথে গেছে যুবক। ধুড় ধুড় শব্দ হচ্ছে পাটাতনে। কথা মতো সব হচ্ছে। যুবক হাঁসফাঁস করে শেষবার শরীরের রস ঢেলেই, তারপর। মেয়েটি যুবকের লাবডুবে কান পেতে আছে, ...তারপর। এবং একটি তারপর।

    সব কথা মতো হচ্ছে। হয় কি কখনও? গাঙফিরানি এতক্ষণ গইলের সমূহ শব্দ শিৎকার দৃশ্য গিলছিল। এবার মরিয়া হয়ে নৌকার হাল ছেড়ে দিল। লুঙ্গি তুলে কঠিন লিঙ্গ বার করে দিয়েছে কুকরির মতো। এবার তরঙ্গ ক্রসবর্ডার ইনট্রুডারস্। কে কাকে শিকার করছে?

    --আঃ আঃ মার অরুণ। মার, ভিতা ফাটাই দে। ছাড়বিনি। আমি তারপর।
    অরুণ যেন ঢুকে গেছে মেয়েটির হাড়ে পাঁজরে। আঃ আঃ শিবানী।

    অরুণ যা জানে, তা জানে না। শিবানী যা জানে, তা ভোলেনি। গাঙফিরানির নিজলিঙ্গমর্দন শিবানীকে এক পলকে ঘেঁটে দিল শুধু। কে কোন পক্ষে?

    সে এক হাজার টাকা দিয়েছে গাঙফিরানি বাদলকে, অরুণকে মেরে মাঝনদীতে ফেলে দিতে। তবে কি অরুণও দিয়েছে যা শিবানী জানে না? কেন? অরুণ শিবানীকে গত ছ মাস ধরে হুমকি দিয়ে টাকা নিয়েছে। শিবানীর প্রবাসী সোয়ামী অজান্তে টাকা জুগিয়ে গেছে। সুরাটে তার দ্বিতীয় সংসার। আর নয়, কেউ নয়। এবার পরিণাম চাই।

    অরুণ জানে শিবানী ঘরছাড়ার সময় সব গয়না ব্যাগে ভরেছে। জলে ঠেলে দিলেই খেল খতম। শুধু লিঙ্গ ঠাটিয়ে যাওয়ায় গইলে শিবানীকে আছড়ে ফেলেছে।

    গাঙফিরানি যা জানে, তা জানে। সে কিছু ভোলেনি। অরুণ শিবানীকে মারবে। তার আগে শিবানীর শরীর একবার সে খাবে। কিন্তু লুঙ্গির নিচে আগ্নেয়গিরি। এমন মাঝজলে নগ্ন নারীশরীরের পাশে স্বমেহন, এ তার অপ্রত্যাশিত। আর এই অপ্রত্যাশিতর নদীর জলে অন্য টান। পাল্লা ঘুরে গেছে।

    এই সেই সন্ধিক্ষণ। এখন জল নিজশরীরে স্থিত। এখন সে মোহনা জানে না, ভূমি জানে না। এখন অদৃশ্য চাঁদের বুক খালি। একটি মাত্র লগন, যা অচিন। কারোর নয়। জোয়ারের খেলার পর ভাটির খেলার আগে চাঁদ বিবাগী, শূন্যমন, উদাসীন।

    শিবানী চুলের ক্লিপের ভাঁজ থেকে একটি জং ধরা ছোট ছুরি বার করে আমূল বিঁধিয়ে দিল অরুণের ডানচোখে। মুহূর্তে বার করে ফের ডানচোখে। অরুণ রিফ্লেক্সে ডান মুঠির একটা ঘুঁষি শিবানীর মুখ লক্ষ করে চালাল বটে, শিবানী একপাশে মাথা কাত করে এড়াল। কাটামুন্ড শুকরের মতো অরুণ গোঙাচ্ছে।

    আপ্রাণ ঘর্ষণে গাঙফিরানির লিঙ্গের মুখে এখন সমূহ রেত। বহির্গমনের মুহূর্ত। এই সেই পল, যা মৃত্যু নস্যাৎ করে। এই সেই স্খলনের অতিন্দ্রিয় ছায়া, যা জীবন অস্বীকার করে। এই সেই প্রমোদকল্প, যা ভয় বিস্মৃত করে।

    গাঙফিরানির ডানহাতে যখন পূর্ণ রেতধারা মথিত হল, তখন বিদীর্ণ বাতাসে উত্থিত একটি নগ্নিকা, তীক্ষ্ণ চেলাকাঠের এক অমোঘ ঘায়ে তার করোটি ফাটিয়ে দ্বিখন্ডিত করে দিল।

    দুই দিকে দুই স্খলিত মৃত শরীরের পুরুষ। যা অনুতাপ আনে না, যা বিরহ শেখায় না, যা নিশ্চিন্তি পরিত্যাজ্য করে, সেই কয়েক আউন্স রসে রক্তে ঘিলুতে, চটকানো ভিট্রেয়াস বডিতে মাখামাখি।

    ছলাৎছল ছলাৎছল। নৌকার হালে ভর রেখে উড়ন্তকেশ একটি সুতোবিহীন নারীর রক্তমাখা অলঙ্ঘ্য অবাধ দেহবল্লরী। অনেক অনেক দূর থেকে তুমি দেখ পাঠক, তার চোখে পাঁচ হাজার বছরের শুকনো পোড়া নুন। স্তনের চূড়োয় অনাহুত আগ্রাসন পাথুরে শ্যাওলার রক্তের মতো, আর নরম তুলতুলে মাংসের বিভাজিকায় অনন্ত বিদ্যাধরী। ত্রিকোণ যোনিভূমে ভূমে অমেয় ব-দ্বীপমালা।

    ভাসতে ভাসতে টলতে টলতে চলেছে নারী ও নদী।
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৫ জানুয়ারি ২০১৮ | ১৯৫ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dd | 59.205.217.247 (*) | ১৬ জানুয়ারি ২০১৮ ০৩:০১64620
  • অসাধারন স্টাইল।
  • বিপ্লব রহমান | 113.231.160.188 (*) | ২২ জানুয়ারি ২০১৮ ০৬:০১64621
  • অপূর্ব লেখনি।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন