• হরিদাস পাল  ব্লগ

    Share
  • গ্রিটিংস কার্ড

    Zarifah Zahan লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৫ জানুয়ারি ২০১৮ | ১১৩ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • স্কুলবেলা থেকেই নতুন বছরের জন্য অপেক্ষা করতাম আমি। শুধু আমি কেন, 'আমরা' বলাই ভাল, আমরা : ক্লাসের ছেলেমেয়ে সবাই। সেসময় নভেম্বরের কুঁড়িতে ডিসেম্বরের নরম দুপুরফুল ফোটার গন্ধে রোদ্দুর আলসেমি খেলে, বইপত্তর ছড়াতে হত না মাদুরের বেলাভূমিতে। পরীক্ষাপাতির চক্কর ছিল আরও মাস তিনেক পর। ২৫ শে ডিসেম্বরের পর থেকেই শুরু হত সে মাধুকরী অপেক্ষা, কবে আসবে বছরের প্রথম দিন। স্কুল খুললেই গ্রিটিংস কার্ডের ঝাঁপি নিয়ে বসব। কত রঙের সেসব কার্ড, কোথাও ফুল, কোথাও একটা ছোট্ট ঘর , আকাশে দু'তিনটে পাখি, একটা নারকেল গাছ আর নীল নদী - আঁকার ক্লাসে সব বাচ্চারাই যা আঁকে আর কি; 'সিনারি' বললেই যে ছবি চোখের সামনে হাজির হয় সনাতন অভ্যেসে। কার্ডগুলোর দাম হত তিন টাকা, পাঁচ টাকা। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে সেসব কেনা। ফিরতি পথগুলো তখন যেন মোহময়ী: এত রং, নকশা, কারুকার্য প্রতিটা দোকানে। সে দু'সপ্তাহ যেন সম্মিলিত জিহ্বা, স্বাদকোরকের মোহে বিন্দু বিন্দু মিশেল, মোক্ষের সমাহার। আরও ছিল দশ টাকার কার্ড। সেগুলো ফোল্ডিং কার্ড, বেশ ঢাউস হত বাকিগুলোর তুলনায়, একটার পর একটা পরতে থাকত চমক আর সব শেষে থাকত থ্রি ডি ছবি। তখন এমন 'থ্রি ডি' নকশা বলতাম না, কার্ডের ওপর যে ছবি সেটাই আবার খুললে পরে তেড়ে ফুঁড়ে হাত পা ছড়িয়ে দিব্যি সত্যি সত্যি ছবি হয়ে যায় তাই ওগুলো ছিল 'সত্যি ছবিওয়ালা কার্ড'। আমরা, ক্লাসের সবাই মিলে পয়সা জমিয়ে কোন কোন বার 'সত্যি ছবিওয়ালা কার্ড' ম্যাডামদের দিতাম। আর পয়সা না জমলে, নিজেরাই হাতে এঁকে বানাতাম। অপটু মোম রং সেখানে নৈমিত্তিক।

    হাই স্কুলে তখন। প্রথম রেডিওয় শুনলাম 'ভালবাসা মানে আর্চিস গ্যালারি'। মফস্বল - কানে সেটাই ছিল সদ্যজাত নাম। আর্চিসের দোকান দেখেছি তারও অনেক পর। একটা শুধু ছবি, কেমন প্রাণহীন, যেন বহু অযত্নে পড়ে থাকা দেওয়ালে টুকরো আঁচড়, তার দামই পঞ্চাশ টাকা! আমরা তো তিন টাকার কার্ডেও কত চকচকে স্পার্কেল দেখতাম : সরু মিহি টানা.. ছবির একেকটা বর্ডারের গায়ে। কিন্তু এই আর্চিসে 'সত্যি ছবিওয়ালা কার্ড' কিনতে বহু বছরের টিফিনের পয়সা বাঁচাতে হবে। আর কেউ নতুন বছরে কার্ড নিয়ে মাথাই ঘামায় না, সবাই সবাইকে কার্ড দেয়না এমনি এমনিই। কেউ বলেনা "ও তোকে স্পার্কেল ওয়ালা ছবি দিয়েছে? তাহলে আমি হাতে এঁকে বানিয়ে দেব - বল এবারে আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড না, ও?" এখন কার্ড দিতে বিশেষ উপলক্ষ চাই, বিশেষ সম্পর্ক। ভালবাসার মানুষের জন্য বরাদ্দ একটা দিন, পরিচিতের জন্মদিনের জন্য , মা-বাবার জন্যও আলাদা আলাদা দিন। অথচ এসব উপলক্ষের মোড়কে দিনগুলো যেন একা, পতঝরি গাছ। সমস্ত প্রাণের স্ফুরণ ওই কঠিন মিতায়ু হাওয়ায় গুমোট, দমবন্ধ, সঙ্গীহীন, মুহূর্তবন্দীর খসা পলেস্তারার গায়ে অশান্ত।

    এখন রাস্তার ধারে কোন রঙিন ছবি থাকেনা, স্বপ্ন নাওয়ে। বছরভর কার্ডের দোকান, উপলক্ষে সেই খুচরো ছেলেমানুষি ভাল লাগাও নেই আর। না পাওয়ার সমারোহে যতটুকু আহ্লাদী মিশেল যুগপৎ পাক খেয়ে চলে, মাথা কোটে বেমিশাল, তারা সব দিগভ্রান্ত ... যেন জীবন হারিয়ে ফেলেছে চৌরাস্তার ভুল সিগন্যালে। চেয়ারের নিচে, টেবিলের কোণ... আঁতিপাতি খুঁজেও সে ছন্নছাড়া, সময় নামে শেষ বাসের জানলায়, পড়ন্ত বিকেল .... শুধু মাই জানে সেসব জীবন আমরা ছুঁড়ে ফেলেছি সেই কবে, সহস্র সারল্যে।
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৫ জানুয়ারি ২০১৮ | ১১৩ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আরও পড়ুন
তোষণ - Zarifah Zahan
আরও পড়ুন
ফড়িং - Zarifah Zahan
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত