• হরিদাস পাল  ব্লগ

    Share
  • সাম্মানিক

    Zarifah Zahan লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ১১০ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • বেশ কিছুদিন এই :লেখালিখি'র কচকচানিতে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়া হয়নি। নেওয়া হয়নি বলতে ইচ্ছে ছিল ষোল'র জায়গায় আঠারো আনা, এমনকি, যখন আমাদের জুমলাবাবু 'কচি' হতে হতে তেল-পয়সা সবাইকেই ডুগডুগি বাজিয়ে বুলেট ট্রেনে ওঠাচ্ছেন তখনও আমি 'ঝালিয়ে নেওয়া'র সুযোগকে কাঁচকলা দেখিয়ে ভেবেছি, 'কী যায় আসে! একদিন তো মরেই যাব!' তবে, আমরা হলাম গিয়ে হুজুগে বাঙালি, জুতো সেলাই মায় চণ্ডীপাঠ : স্পিরিটে-ইন্টেলেক্টে তিতলি। অগত্যা যেই মুহূর্তে জুমলাবাবুর চ্যালাচামুন্ডাগণ সদর্পে জানান দিয়েছেন 'গুরু পূজ্যতে' ব্যাপারটাকে কাটিয়ে দিলে 'জিও আর জিও না রবে' সেই হল আমার খুচরো ছিঁচকাঁদুনি - ফোকটে আঁতলামি ফেরানোর মাহেন্দ্রক্ষণ।

    যাগ্গে, এসব অহেতুক ভূমিকাপর্ব ছেড়ে আজ একটা অভিজ্ঞতার কথা জানাই। মহরমের দিনের ঘটনা (তবে হ্যাঁ, এসব উৎসবের নামে ছুরি-কাটাকাটি-মারামারি সবেতেই আমার সমূহ আপত্তি এবং দয়া করে এই আপত্তির গায়ে শিয়া-সুন্নি এসব নালার জল ঢেলে টেলে আর এনার্জি ফুরোবেন না, বরং সলতে ঠিক থাকলে ওই এক ফোঁটা এনার্জিতে তিতলিময় হালের দুনিয়াদারিতে প্যান্ডেলে ঠেলাঠেলি করতে পারেন)। আমার বাড়ির এলাকায়, মানে বারাসাত কাজীপাড়ায়, খুব ছোটবেলায় দরগাবাড়ির(পুরোনো মাজার একটা) ছোট মাঠে তাজিয়া নিয়ে আট-দশটা পাড়া হাজির হত। আমার কাজ ছিল শুধু আব্বুর কাঁধে চেপে ভিড় ডিঙিয়ে বাতাসা আর শরবত খাওয়া। বড় হয়ে নতুন পাড়ায় এসে থেকে দেখি মহরমের দিন দশ আগে থেকে খুব জোরে ড্রাম পেটায় হঠাৎ হঠাৎ, মিনিট পাঁচ-ছয়েকের জন্য, মহড়া নাকি আর মহরমের দিন একটাই পাড়ার দল যেত সেজেগুজে,বাড়ির সামনে দিয়ে, তাজিয়া নিয়ে। আমি সেটার জন্য ছাদে দৌড় লাগাতাম, কারণ ওদের মিছিলে একটা সুন্দর কালো ঘোড়া থাকত ('দুলদুল' এর প্রোটোটাইপ আরকি!)। বছর গড়ায় আর দেখি সাদা-মাঠা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে লাফানো ছেলেপুলেদের 'উন্নয়ন' ঘটেছে : হাতে দু'টো টিউবলাইট, কপালে ফেট্টি, খালি গায়ে প্রথমে কাঁচ ফাটিয়ে তারপর বড় বড় কাটারি নিয়ে হাওয়ায় ঘুরিয়ে, আকাশ-বাতাস কাঁপানো 'বীরত্বের' হুঙ্কার "হায় হাসান!হায় হুসেন"। তাদের উন্নয়ন জোরদার হতে হতে 'বড় পাড়া' তকমা/ পুলিশের ঘেরাটোপে রেটোরিক আস্ফালন : আমার বিরক্তিপর্বের অম্লানবদন।
    দু'বছর হল রাজারহাটে ঘাঁটি গেড়েছি। গত বছর দেখেছিলাম রাস্তা জুড়ে বাজারের সামনে করা 'অনুপ্রেণিত' মঞ্চ। সেখানে রাত ৯ টাতেও 'কমেন্ট্রি' হয়, 'খেলা'র। কার বাঁশ কতটা ঘুরল, কার টিউবের কত জোর তার ভিত্তিতে 'পুরস্কার প্রদান' হয়। রাস্তা জুড়ে আলোকসজ্জা- ধর্ম বিকোয়, শিক্ষা 'প্রদীপের তলার অন্ধকার' থাকলে 'অনুপ্রেনিত' বাঁশ নিজেদেরই আরও 'অনুপ্রেরণা' জুগিয়ে দীর্ঘায়িত হয়, সে অবশ্য বুঝতে গেলে অন্ধকারে মাঝেমধ্যে একটা-দু'টো তারাখসার অভিজ্ঞতা থাকা দরকার। তো এ বছরও সে নিয়মের পুনরাবৃত্তি। দোকানে যাব বলে বেরিয়েছি। দেখলাম কুড়ি হাত আগে থেকেই লাইটিং-মাইক-খাবারের স্টলে হৈ হৈ রৈ রৈ কান্ড। একটু এগোতেই একটা স্টল, তবারক ( অনুষ্ঠানের পর যে খাবার মূলত মিষ্টি স্বাদের সবার মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়) বিলি করার। সামনে বেশ ভিড় আর বিরিয়ানির গন্ধে তখন স্টলের চারপাশ এতই ভরপুর যে দু'মিনিট দাঁড়িয়েই গেলাম। সবাই শালপাতার বাটিতে খাচ্ছে, খিচুড়ি অথচ বিরিয়ানি কায়দায় রাঁধা তবারক : চাল-ছোলার ডাল আর সাথে একটা বড় আলু। অগত্যা মিনিট দুয়েক মাথা চুলকে আমিও ব্যোমকে গেলাম: যদি কিছু জোটে। খানিকক্ষণ বাদে যেই না 'থাক, খুব হল' ভেবে দু'পা বাড়িয়েছি, ওমনি শুনলাম "এই যে দিদি, নিয়ে যান এটা"
    আরে!!!!! এ তো এক ব্যাগ ভর্তি তবারক! আমি তো শালপাতার অপেক্ষা করছিলাম। ব্যাগভর্তি এত খাবার নিয়ে কী করব? এতে তো গোটা পাঁচেক লোকের পেট পুরে খাওয়া হয়ে যাবে এক বেলার!
    -"আরে ভাই, এত কেন? রাখ, আরও লোকজন এলে অনেকে পাবে খেতে। আমি খামোখা এরকম নিতে পারব না"
    -"আরে না না, দিদি। রাখেন না। এটা আপনার জন্যই তুললাম হাঁড়ি থেকে। আর কেউ আসবে না, আসলে সে আমরা দেখে নেব'খন।"
    আরও বার দু'য়েক আপত্তি জানানোর চেষ্টা করেও লাভ হল না। অগত্যা বাড়ি নিয়ে এলাম বমালসমেত।

    এখন ব্যাপারটা হল, আমাকে এরকম আদিখ্যেতা দেখানোর কারণ? আমায় চেনে? - পারতপক্ষে না। বাজারের দোকানদাররা ছাড়া এলাকার কেউ চেনার কথা নয় কারণ আমি এখানে বহিরাগত। তাহলে অন্য কারও থেকে 'খতিরদারি'র সুপারিশ পেয়েছে? - তাও না। তবে? এ হল আমাদের ভেতর ছোট থেকে ঢুকিয়ে দেওয়া 'সামাজিক বোধ'। ঠিক যেভাবে এ ছেলে আর ও মেয়ে, তাই ছেলেকে 'মেয়েদের মত কাঁদা বারণ' আর মেয়েকে 'ছেলেদের মত দস্যিপনা করতে মানা' মগজে ইনফিউজ করা হয় ঠিক একইভাবে বড়লোক-গরীবলোক/অপারক্লাস-লোয়ারক্লাস/হিন্দু-মুসলমান সবকিছুর ডু'জ এন্ড ডোন্ট'জ গেঁথে যায়, নিজেদের অজান্তেই। সোশ্যালি অপ্রেসড লোকজন সামনে একটু সাজানো-গোছানো লোক দেখলেই সেই প্রিভিলেজড শ্রেণীকে 'সম্মান' দেখায়, যেন কৃতার্থ হল ওঁরা। বরং উল্টোদিকের মানুষগুলো কেন ওঁদের চেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত, সেই সুবিধার অধিকারী হয়েও তারা ওঁদের অসুবিধায় ঠিক কী কী সাহায্য করেছে, কেন অযথা ওইসব রঙিন মানুষজন বেশি 'সম্মান'এর অধিকারী : সেসব চিন্তাই মানুষগুলোর মাথায় আসেনা, ওঁরা জানে শুধু বিপরীতদিকের লোকগুলো 'ভদ্রলোক', ওরা 'গরীবলোক' ( বা বলা ভাল, ওইসব 'ভদ্রলোকে'দের ভাষায় 'ছোটলোক') তাই 'অকারণ/অতিরিক্তি সম্মান' তাই প্রাপ্য। অথচ কী আশ্চর্য, আমরা যারা 'ভদ্রলোক', 'শিক্ষিত' , বিশাল জ্ঞানের বাটি ধুয়ে জল খাই, তারাও কোন উচ্চবাচ্য করিনা কখনও। আমরা দেখি, সরকারি হসপিটালে ওপিডির বাইরে লম্বা লাইন, দূর থেকে আসা বহু মানুষের ভিড়ে হঠাৎ দামী জামাকাপড়ের একজন দাঁড়ালে সবাই ব্যস্ত হয়ে বলে যে লাইন কেউ একজন দেখবে, দাঁড়ানো 'দামী' মানুষটা কোথাও গিয়ে ততক্ষণ বসুক। সেই দামী মানুষেরা, আমরা ভাবি, 'যাক বাঁচলাম'। হ্যাপা না পোহানোর আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ভুলেও ভাবিনা আমাদের ঠিক পেছনে দাঁড়ানো বৃদ্ধাটির কথা বা সামনে দাঁড়ানো মেয়েটার কথা, জর হয়তো দু'দিন জার্নির পর এখানে এসছে অপারেশনের পর পেটের সেলাই কাটতে - ভাবিইনা যে সবেমাত্র গাড়ির এসি থেকে নামা আমার চেয়ে দীর্ঘক্ষণ রোদ-ঝড় সওয়া বাকিদের বিশ্রামের বেশি দরকার। আসলে আমরা চিরকালই সুবিধাবাদী, নিজেদের প্রাপ্যের চেয়ে অতিরিক্ত পেতে রাজি তবে দিতে নই, ইতস্তত ভাবি তুচ্ছ ব্যাপারেও। আমরা কখনও 'উদারতা'র কয়েকটা নমুনা যদি কালেভদ্রে দেখিয়েও ফেলি তাহলে তার ছবি-ভিডিও শেয়ার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় 'মহানুভবতা'র আর্কিটাইপ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা আমাদের একমাত্র কর্তব্য হয়ে যায়। অতএব 'আমরা-ওরা' করতে করতে, আমরা তুমুল তর্ক-বিতর্ক চালাই (অবশ্যই এখানে আলগা ডিস্কেলেমার দিয়ে রাখার ট্যাসিট এগ্রিমেন্ট হয়, তর্ককারী 'আমি' কোনভাবেই সেই 'আমরা-ওরা'র গোত্রের অন্তর্ভুক্ত নই। তাই কথাগুলো বাকিদের উদ্দেশ্যে বলা ভেবে আরামসে ঢেঁকুর তোলাই যায়), সামাজিক দায়িত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। আমাদের এই যুগের পর যুগ চলে আসা মানুষের মন থেকে চোরা 'ভয়' সরানোর কোন দায় নেই কারণ আমরা আদতে চেনা গন্ডিতে সুবিধাবাদী সংখ্যাগুরু : লঘুত্বের ধ্বজাধারীকে ওপরে টেনে তুললেই দাঁড়িপাল্লাটা সমান হয়, হিসেবের তখন কীই বা লাভ কীই বা ক্ষতি।

  • বিভাগ : ব্লগ | ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ১১০ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আরও পড়ুন
তোষণ - Zarifah Zahan
আরও পড়ুন
ফড়িং - Zarifah Zahan
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত