• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  সমাজ

  • আমার অ্যামেরিকা আবিষ্কার: নর্মা

    সম্বিৎ লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | সমাজ | ১৮ এপ্রিল ২০২১ | ৩০৩ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • নর্মা যে কবে থেকে আমাদের বাড়িতে কাজ করতে শুরু করেছে ভাল মনে নেই। বছর আঠেরো-কুড়ি হবে। আমদের কর্তা-গিন্নির ফুল-টাইম কাজ করে বাড়ির কাজে যে পরিমাণ গাফিলতি হচ্ছিল, সেই গাফিলতি ঢাকতে বিবেকের তাড়নায় মঞ্চে নর্মার প্রবেশ। নর্মা মেক্সিকান। আমাদেরই বয়েসী। ভাঙা ভাঙা ইংরিজি জানে। অসম্ভব কর্মঠ। আসত বোনকে নিয়ে প্রতি দু-হপ্তা একবার। বদলি শনিবার। রান্নাঘরের সিংক, কাউন্টার টপ, ওভেন টপ, মাইক্রোওয়েভ, টোস্টার ইত্যাদি, ওভেনের ওপরের এক্সহস্টের হুড পরিস্কার করত। বেকিং ওভেনের বাইরেটা পরিস্কার করত। ফ্রিজের বাইরে-ভেতর। করত  রান্নাঘরের মেঝে মপিং। বাথ্রুমের বাথটব আর শাওয়ার, সঙ্গে কাঁচের দরজা, টয়লেট, সিংক, বাথ্রুমের মেঝে। সারা বাড়ির মেঝে পরিস্কার - কার্পেট হলে ভ্যাকুয়াম, হার্ডউড হলে মপিং। সঙ্গে ফার্নিচারের ধুলো ঝাড়া। লিখতে গিয়ে ঠাহর হচ্ছে, কতটা কাজ করত। সময় লাগত ঘন্টা দুয়েক। নিত, যদি খুব ভুল না করি, পঁয়ষট্টি ডলার। মানে ঘন্টায় ষোল ডলার। তখন বোধহয় ক্যালিফোর্নিয়ার ন্যুনতম মজুরি ছিল ঘন্টায় সাড়ে ছ'টাকা মতন। কিন্তু এখন যেমন, তখনও তেমন - এই স্যান ফ্র্যান্সিসকো অঞ্চলে ন্যুনতম মজুরি কেন তার তিনগুণ মজুরিতেও সংসার চালান প্রায় অসম্ভব। নর্মা যে কী করে চালাত, কে জানে। অথচ আমাদের কাছে বেশি চায়নি কখনও। পারমিতা আমাদের অনেক বন্ধুদের কাছে নর্মাকে রেকমেন্ড করেছে। তারা নর্মাকে বহাল করেছে। তাদের কাছে, শুনেছি আমাদের থেকে বেশি নিয়েছে, পরিস্কার করার জায়গা তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও। কেউ হয়ত অভিযোগ করেছে, তুমি পারমিতার থেকে কম নাও। নর্মা জবাব দিয়েছে, পারমিতা আমার পুরনো কাস্টোমার।
     
    যে শনিবার নর্মা আসত তার আগের সন্ধ্যেবেলা আমাদের থরহরিকম্প - কাল নর্মা আসবে। নর্মা আসবে বলে বাড়ি পরিস্কার করতে হবে। শুনতে আশ্চর্য লাগবে যে যে বাড়ি পরিস্কার করতে আসবে তার জন্যে বাড়ি পরিস্কার করতে হবে (অনেকটা, "মনে রবে কিনা রবে আমারে - সে আমার মনে নাই"-এর মতন অবস্থা)। কিন্তু মেয়ে তখন ছোট। সারা সপ্তাহ ধরে সে তার ঘরে খেলা করতে গিয়ে মনের আনন্দে সব খেলনা ছড়িয়েছে, ছড়ানো কাগজে আঁকিবুঁকি কাটা, জিগস পাজলের টুকরো মেঝেতে ছড়ানো। সঙ্গে স্টিকার, প্লেডো - কী নেই! তার ওপর প্রায় প্রতি শুক্কুর সন্ধ্যেয় বন্ধুসমাগম হত বাড়িতে। তাদের মেয়েরাও আমার মেয়ের বয়েসী। কাজেই নিজেদের ঘরে তোলঘড়িমাত। গভীর রাতে, বন্ধুরা চলে যাবার পরে, রান্নাঘরে জিনিসপত্র তুলে, থালাবাসন - কিছু মেজে, বাকি ডিশওয়াশারে লোড করে - কর্তা গিন্নি মেয়ের ঘরে গিয়ে খেলনা পরিস্কার করে তবে শুতে যেতে পারতাম। মেয়ে তখন গভীর ঘুমে। এ জিনিস জীবনে এমন সাইকোলজিকাল স্কার রেখে গেছে যে এখনও মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখি আমি আর পারমিতা মেয়ের ঘরে হামাগুড়ি দিয়ে জিগস পাজলের টুকরো কুড়োচ্ছি। 
     
    এরপরে ২০১০ সালে দেশে চলে গেলাম। নর্মার পাট উঠল। যে জিনিস এখান থেকে নিয়ে যেতে পারব না, তার থেকে পছন্দমতন জিনিস নর্মাকে নিয়ে যেতে বলেছিল পারমিতা। অল্পই কিছু নিয়েছিল। ২০১৩ সালে আবার ওয়াপাস ফিরে এলাম অ্যামেরিকায়। পুরনো ঘর, ঘুরনো ঘাড়, কুড়নো জঞ্জাল। আবার নর্মা বহাল হল। ততদিনে নর্মার ছোটমেয়েও বড় হয়েছে। সেও চলে আসত মার সঙ্গে মাঝেমাঝে, আমার মেয়েদের সঙ্গে খেলতে। ততদিনে, নর্মার ব্যবসা বেড়েছে। অধিকাংশ দিনই নর্মা নিজে আর আসেনা। আসে তার বর আর, হয় বোন নয় কর্মচারী। তাদের কাজ মাঝেমাঝে পারমিতার পছন্দ হয়না। সে নর্মাকে ফোনে অভিযোগ জানায়। পরেরদিন নর্মা নিজেই আসে। এইভাবেই চলছে। ইতিমধ্যে আমরা বাড়ি বদল করি। নতুন বাড়িতেও নর্মাই বহাল। এতদিনে নর্মার মজুরি বেড়েছে। আজকাল সে আর তার বর আসে কাজ করতে। অভিযোগের কোন কারণই ঘটতে দেয়না।
     
    এই করতে করতে হইহই করে এসে পড়ে কোভিড। সারা দেশ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে লকডাউনে ঢুকে যায়। অন্ততঃ যাদের সেন্স আর সেন্সিবিলিটি ট্রাম্পে আচ্ছন্ন হয়ে যায়নি। আমাদের বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বারণ করতে হয় নর্মাকে আসতে। শুধু আমরাই নয়, তার সব ক্লায়েন্টই লকডাউনে চলে যায়। রুজিতে টান পড়ে। আমাদের আর ক্ষমতা কত, তাও স্থির করি কাজ করলে যে মজুরি সে পেত, তা আমরা চালিয়ে যাব। নর্মা আসে প্রতি মাসে। মজুরি নিয়ে যায়। আর এই সময়ে তাকে নতুন করে আবিষ্কার করি আমরা। তার ওয়ার্ক এথিক্সকে। নর্মা নিয়ে আসে তার মেয়েকে। বাড়িতে ঢোকা বারণ, তাই সে মেয়ে নিয়ে পেছনের উঠোন, সামনের দাওয়া ঝাড়ু দেয়। বাড়ির চারদিকের একতলার জানলা সব বাইরে থেকে ঘষে ঘষে পরিস্কার করে। কেউ তাকে করতে বলেনি। কিন্তু কাজ না করে পয়সা নিতে তার এথিক্সে বেঁধেছে। সে, সরকারি ভাষায় যাকে বলে, আনস্কিলড ইমিগ্র্যান্ট। হয়ত কাগজপত্র ঠিক ছিলনা একসময়ে। কিন্তু তার এথিক্স দেখে শ্রদ্ধা জাগতে বাধ্য। আর মনে পড়ে, এই কাজ করে সে মেয়েদের বড় করছে। বড় মেয়ে স্যান হোজে স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ছোটমেয়ে হাইস্কুলে যাবে। আর, এর বিপ্রতীপে মনে করতে বাধ্য হই, এদের মতন সৎ, কর্মঠ, খেটেখাওয়া, দেশ-গড়া ইমিগ্যান্টদের প্রতি ট্রাম্পকুলের মিথ্যে, তাচ্ছিল্য আর ঘৃণা।
     
    দু হপ্তা আগে, আমাদের ভ্যাক্সিন শুরু হয়ে যাবার পরে আবার নর্মা বাড়ির ভেতরে আসছে। বলল, তার আর বরেরও একটা ডোজ ভ্যাক্সিন হয়ে গেছে। তার অন্যসব ক্লায়েন্টও আবার দরজা খুলে দিয়েছে তার জন্যে। থিংস আরে গুড, অলমোস্ট ব্যাক টু নর্মাল। আমি নর্মাকে দিয়ে আরেক অ্যামেরিকা চিনি।

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৮ এপ্রিল ২০২১ | ৩০৩ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
আয়না - ন্যাড়া
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Kakali | 50.106.16.190 | ১৮ এপ্রিল ২০২১ ০৪:১০104836
  • প্রায় এক ই অভিজ্ঞতা এবং এক রকম নিষ্ঠা দেখি। বাড়িতে কোনোকিছু খারাপ হলে প্রথম ধাক্কাটা হাভিয়ের ই সামলে দেয় যদিও সেটা ওর কাজের লিস্ট এর মধ্যে পড়েনা।  লেখক কে ধন্যবাদ এই বিষয়ে লেখার জন্য। আমেরিকার ইমিগ্র্যান্ট পপুলেশন এর এই দিকটা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। 

  • kk | 97.91.195.43 | ১৮ এপ্রিল ২০২১ ০৭:০৫104838
  • ভালো লাগলো। সবথেকে সহজ রিয়্যালিটি গুলোই মানুষের চোখে পড়েনা। আমরা অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি, ছায়ার মধ্যে সত্যি খুঁজি।

  • Ranjan Roy | ১৮ এপ্রিল ২০২১ ১০:০৭104858
  • একই অভিজ্ঞতা ভারতের গুরগাঁওয়ে। নদিয়া থেকে আসা কাজের মেয়ে সর্জিনা,  নামের মানে জানিনা। পড়াশোনায় ভালো বড়মেেয়়েকে দাাার্জিলিঙের কোন ক্রিশ্চান স্কুলের  হোস্টেলে রেখে পড়়াত,  সে এবার কলেজে।  নগদ টাকার দরকার। বেশ কটি ঘরে কাজ করে।  কেউ খুুঁত  ধরতে পারেেনা। অসম্ভব আত্মমর্যাদা  জ্ঞান।

  • Abhyu | 47.39.151.164 | ১৮ এপ্রিল ২০২১ ১৮:২৬104880
  • জানি না উপরের কাকলি আমার পরিচিত সেতারবাদিকা কিনা। হাভিয়ের নামটা চেনা লাগল তবে এটা তো বড্ড কমন নাম। আমার নিজের কখনো গৃহসহায়ক রাখার ক্ষমতা ছিল না কিন্তু এই রকম গল্প আমিও শুনেছি। আট্লান্টায় একটা সরস্বতী পুজোর সব হাঙ্গাম এক ইমিগ্রান্ট ভদ্রমহিলা একা হাতে সামলান। ন্যাড়াদাকে ধন্যবাদ এই সুন্দর লেখাটার জন্যে।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন