• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  সমাজ

  • দ্বিশতবর্ষে বিদ্যাসাগর - ১১

    এলেবেলে লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | সমাজ | ০৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৬৭৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • একাদশ অধ্যায়

     

    জনশিক্ষা বিদ্যাসাগরব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত

     

    গোড়ায় যাঁরা দেশে তাঁদের রাজতক্তের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার পত্তন করেছিলেন, দেখতে পাই, তাঁদেরও উত্তরাধিকারীরা বাইরের আসবাব এবং ইঁট-কাঠ-চুন-সুরকির প্যাটার্ন দেখিয়ে আমাদের এবং নিজেদেরকে ভোলাতে আনন্দ বোধ করে ...আমাদের নালিশ এই যে, তলোয়ারটা যেখানে তালপাতার চেয়ে বেশি দামি করা অর্থাভাববশত অসম্ভব বলে সংবাদ পাই সেখানে তার খাপটাকে ইস্পাত দিয়ে বাঁধিয়ে দিলে আসল কাজ এগোয় না। তার চেয়ে ইস্পাতটাকে গলিয়ে একটা চলনসই গোছের ছুরি বানিয়ে দিলেও কতকটা সান্ত্বনার আশা থাকে।

     রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ

     

     

    বাংলায় বহু ব্যয়ে মডেল স্কুলগুলি প্রতিষ্ঠা করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের পাশাপাশি দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মানোন্নয়ন। সেই বিষয়ে যে স্কুলগুলি ব্যর্থ হয়, তা শিক্ষাসম্পর্কীয় সরকারি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। এই পরিস্থিতিতে দেশজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষাপদ্ধতির উন্নতির জন্য, পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্যালয় পরিদর্শক উড্রো বাংলায় টোমাসন প্রবর্তিত হলকাবন্দি ব্যবস্থা চালু করতে চান। তাঁর পরিকল্পনাকে সমর্থন করে ১৮৫৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কোম্পানির পরিচালকবর্গ জানান:

    We approve Mr. Woodrow’s desire to make the utmost possible use of existing means of education, and to avoid as much as possible the supersession of the former teachers of indigenous schools, which seem, notwithstanding the small amount of instruction which they afford, to have naturally a considerable hold on the minds of the people. …we agree with you in thinking the scheme well deserving of a trial on an enlarged scale, and accordingly approve the sanction given to the recommendation of the Bengal Government.

    অ্যাডাম তাঁর তৃতীয় প্রতিবেদনের শেষে মডেল স্কুলের বিরোধিতা করে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন,

    Government should do nothing to supersede the exertions of the people for their own benefit, but should rather endeavour to supply what is deficient in the native systems, to improve what is imperfect, and to extend to all what is at present confined to a few. [নজরটান সংযোজিত]

    তাঁর প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রায় কুড়ি বছর পরে, সরকার তাঁর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করে!

    উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে চালু হওয়া হলকাবন্দি বিদ্যালয়গুলির ক্ষেত্রে অপরিহার্য শর্ত ছিলএই বিদ্যালয়গুলির খরচের অর্ধেক বহন করার জন্য স্থানীয় জমির মালিকরা তাঁদের প্রদত্ত রাজস্বের শতকরা এক ভাগ সরকারকে অতিরিক্ত দেবেন, বাকি অর্ধেক খরচ দেবে সরকার; তবে ব্যাপারে মালিকদের ওপর কোনও জোর খাটানো হবে না উড্রোর পরিকল্পনা ছিল, স্থানীয় পাঠশালাগুলিকে হলকাবন্দি ব্যবস্থার কাজে লাগানো হবে এই কাজ রূপায়নের জন্য চার-পাঁচটি মণ্ডলী (Circle) তৈরি করা হবে প্রত্যেক মণ্ডলীতে থাকবেন সরকারি বেতনভুক যোগ্য শিক্ষক তাঁরা এই পাঠশালাগুলির গুরুমশাইদের উন্নততর পাঠদানের বিষয়ে শেখাবেন, সঙ্গে এগিয়ে থাকা পড়ুয়াদের উচ্চতর বিষয়গুলি পড়াবেন। উড্রোর পরিকল্পনাকে সমর্থন করে ১৮৫৯ সালে ভারত সরকারের সচিব (ততদিনে শিক্ষাবিভাগ কোম্পানির আওতা থেকে মুক্ত হয়ে রানির প্রত্যক্ষ তদারকির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে) বেইলি (Mr. Bayley) জমির ওপর এক শতাংশ শিক্ষা কর (Education cess) বসানোর প্রস্তাব দিয়ে লেখেন

    [উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের] অনুরূপভাবে মাতৃভাষা শিক্ষার জন্য যদি বাংলার জমিদাররাও নিজেদের করের আওতায় নিয়ে আসেন, তাহলে বড়লাট খুশি হবেন। সেক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট শর্তে অঙ্গীকার না করে সরকারও সময়ে সময়ে স্বেচ্ছায় এই ধরনের আর্থিক সহায়তা দেবেন।

    তবে [বাংলার জমিদারদের পক্ষে] যদি জাতীয় কোনও স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অসম্ভব হয়, তাহলে বড়লাটের মতে প্রয়োজনীয় পরিমাণে স্থানীয় শুল্ক আরোপের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে আইন প্রয়োগ করা যেতে পারে।

    বেইলির প্রস্তাবে বাংলার জমিদার শ্রেণির প্রতিভূদের চরম বিরোধিতা শুরু হয়ে যায়। সে প্রসঙ্গ আলোচনা করার আগে আমাদের দেখে নেওয়া প্রয়োজন, এই পরিকল্পনা সম্পর্কে বিদ্যাসাগরের মনোভাব কেমন ছিল

    জনসাধারণের জন্য অল্প খরচায় বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা এবং সাধারণভাবে মাতৃভাষা শিক্ষার বিস্তার উন্নতিসাধনের উপায় হিসেবে এই হলকাবন্দি প্রণালী বাংলায় কতদূর কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়ে ভারত সরকার বাংলার ছোটলাট গ্র্যান্ট সাহেবের মতামত জানতে চায় নিজের মত প্রকাশ করার আগে, ছোটলাট শিক্ষাবিভাগের কর্মচারীরা ছাড়াও এই ধরণের বিদ্যালয় সম্পর্কে যাঁদের অভিজ্ঞতা আছে, এমন কয়েকজন ইউরোপীয় ভারতীয় ব্যক্তির বক্তব্য জানতে চেয়ে বিজ্ঞপ্তি পত্র (circular letter) পাঠান সরকারের তরফে ১৮৫৯-এর ১৭ জুন এই চিঠি পাওয়ার প্রায় তিন মাস পরে, ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলা সরকারের কনিষ্ঠ সচিব (Junior Secretary) টমসন (River Thomson)-কে বিদ্যাসাগর পাঁচটি অনুচ্ছেদ সংবলিত এক দীর্ঘ উত্তর দেন চিঠির শুরুতেই বিষয়ে তাঁর মত জানিয়ে বলেন

    সরকার যে ভেবেছেন বিদ্যালয় পিছু মাসিক পাঁচ-সাত টাকা মাত্র ব্যয় করে কোনও শিক্ষাপদ্ধতির প্রবর্তন করবেন, আমার মতে দেশের বর্তমান অবস্থায় তা কার্যকর হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই লেখা-পড়া-অঙ্ক শেখানোর মতো যোগ্য লোক, যাঁদের নিজ নিজ গ্রামের প্রতি যত আকর্ষণই থাক, এমন যৎসামান্য বেতনে তাঁদেরকে পাওয়া যাবে না

    যদিও তিনি জানতেন না, এমনকি ১৮৫৪-তেও হলকাবন্দি বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের মাসিক বেতন আদৌ পাঁচ-সাত টাকা ছিল না, ছিল ১৫ টাকা।

    হলকাবন্দি বিদ্যালয় সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা না থাকা সত্ত্বেও চিঠিটির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে তিনি এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেন

    উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হলকাবন্দি বিদ্যালয়গুলিতে যে প্রণালী অনুসৃত হয়েছে তার সঠিক খবর আমি জানি না যদি ধরে নেওয়া হয় যে বিহারের বিদ্যালয়গুলিতে ওই একই প্রণালী গ্রহণ করা হয়েছে, তবে আমার মনে হয় অনেক দিক থেকেই তা বাংলার পাঠশালাগুলির মতো। যতটা বুঝেছি, বিহারের বিদ্যালয়গুলিতে চিঠি লেখা, জমিদারি হিসেব দোকানের খাতাপত্রের হিসেব রাখার মধ্যেই শেখানোর বিষয় সীমাবদ্ধ তফাতের মধ্যে বিহারে উন্নত ধরনের কয়েকটি ছাপা বই নামমাত্র ব্যবহার করা হয় বাংলায় এই শিক্ষাপদ্ধতির প্রচলন যদি সরকারের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে গুরুমশাইদের অল্প মাসমাইনের ব্যবস্থা, তাঁদের পাঠশালাগুলিতে খানকয়েক ছাপা বই চালু করা এবং সেগুলিকে সরকারি পরিদর্শনের আওতায় আনলে সহজেই সরকারের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে [নজরটান সংযোজিত]

    বিদ্যাসাগর নিজেই জানাচ্ছেন তিনি হলকাবন্দি বিদ্যালয় বিষয়ে জানেন না, অথচধরে নেওয়া’- ভিত্তিতে তিনি বিহারের পাঠ্যক্রম সম্পর্কে মত দিচ্ছেন! অথচ অষ্টম অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, হলকাবন্দি বিদ্যালয়ে লেখা, পড়া অঙ্ক ছাড়াও পাঠ্যবিষয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল:

    … Geography, History, Geometry, or other general subject, conveyed through the medium of the vernacular language, as the people may be willing to receive.

    এই ভ্রান্ত ধারণা নিয়েই তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেন,

    কিন্তু আমি বলতে বাধ্য, এই ধরণের শিক্ষা নিতান্ত তুচ্ছ (insignificant) হবে এবং তা কখনও জনসাধারণের কাছেযদি জনসাধারণ বলতে শ্রমিক শ্রেণিকে বোঝানো হয়পৌঁছবে না কারণ এখনও পর্যন্ত বিহারে বাংলায় এই শ্রেণি থেকে পাঠশালায় খুবই কম ছাত্র আসে

    বিদ্যাসাগর নিজে পাঠশালার ছাত্র ছিলেন তাছাড়া অ্যাডামের তৃতীয় প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর জানা ছিল যে, পাঠশালার অধিকাংশ ছাত্রই ছিল দরিদ্র নিম্নশ্রেণির পরিবারের সন্তানসন্ততি যেখানে সরকার এই সন্তানদের শিক্ষার আঙিনায় নিয়ে আসতে আগ্রহী, সেখানে তাঁর ধরণের মন্তব্য আমাদের অবাক করে

    তৃতীয় অনুচ্ছেদে পাঠশালায় কম ছাত্র আসার কারণ ব্যাখ্যা করে বিদ্যাসাগর বলেন

    শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা সাধারণত এতটাই নিচু স্তরে যে, সন্তানদের শিক্ষার জন্য খরচ করা তাঁদের সাধ্যে কুলায় না তাঁদের ছেলেরা একটু বড় হলে যখন যে কোনও ধরণের কাজ করে যৎসামান্য উপার্জন করার উপযুক্ত হয়, তখন তাঁরা আর তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেন না তাঁরা ভাবেন সম্ভবত ভাবনা যথার্থ যে ছেলেদের সামান্য কিছু লেখাপড়া শেখালেই তাঁদের অবস্থার উন্নতি হবে না, তাই ছেলেদের পাঠশালায় পাঠাতে তাঁদের প্রবৃত্তি থাকে না এই অবস্থায় এমন প্রত্যাশা করা খুবই বেশি যে কেবল জ্ঞানার্জনের জন্য তাঁরা তাঁদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখাবেন যেখানে এমনকি উচ্চতর শ্রেণিগুলি এখনও পর্যন্ত শিক্ষার সুফল ঠিকমতো বোঝে না।

    অথচ পঞ্চম অধ্যায়ে দেশজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আলোচনায় আমরা দেখেছি, এই ধরণের পাঠশালাগুলিতে কৃষিজীবী, কারিগর, দোকানদার, জমিদারি সেরেস্তার কর্মচারী ইত্যাদি সাধারণ শ্রেণির মানুষের সন্তানরাই শিক্ষা লাভ করত এবং পাঠশালার গুরুমশাইরা ছিলেন পুরোপুরি পড়ুয়াদের দেওয়া বেতন সিধের ওপর নির্ভরশীল ফলেসন্তানদের শিক্ষার জন্য খরচ করা তাঁদের সাধ্যে কুলায় নাজাতীয় যে কথা বিদ্যাসাগর চিঠিতে জানান, তা আদৌ প্রকৃত তথ্য ছিল না। সর্বোপরি ১৮৫১ সালে ইংল্যান্ডের পড়ুয়ারা সরকারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বাধিক দু-বছর পড়লেও বাংলার পাঠশালাগুলিতে পড়ুয়াদের দু-তিন বছর পড়ার পরেই পাঠশালা পরিত্যাগ করার চল ছিল না। আসলে কোন শ্রেণির স্বার্থরক্ষার জন্য বিদ্যাসাগর এই অজুহাত দিচ্ছেন, তা আমরা পরবর্তী আলোচনাতে দেখতে পাব

    পাঠশালায় কম ছাত্র আসার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছন:

    এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকশ্রেণিগুলির শিক্ষার চেষ্টা নিষ্প্রয়োজন সরকার যদি জনশিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখার কথা ভাবে, তাহলে সরকারকে অবৈতনিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, কিছু লোক এই ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, যদিও তার ফল সন্তোষজনক হয়নি১০ [নজরটান সংযোজিত]

    বিদ্যাসাগর তাঁর মডেল স্কুলে বেতন চালু করেছিলেন, তাঁর আমলে প্রতিষ্ঠিত একাধিক বালিকা বিদ্যালয়েও বেতন ব্যবস্থা চালু ছিল। অথচ কেবল এই শিক্ষাব্যবস্থায় অবৈতনিক প্রথার কথা বলেন তিনি, যদিও জমিদারদের ওপর শিক্ষা কর আরোপ করার প্রসঙ্গটি সুকৌশলে এড়িয়ে যান!

    পরের অনুচ্ছেদে ইংল্যান্ডের সঙ্গে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা করে তিনি জানান

    ইংল্যান্ডে আমাদের দেশে এমন একটি ধারণা জন্মেছে যে উচ্চশ্রেণির শিক্ষার জন্য যথেষ্ট করা হয়েছে, এখন জনসাধারণের শিক্ষার জন্য কিছু করা দরকার স্পষ্ট বোঝা যায়, শিক্ষাসংক্রান্ত নানা প্রতিবেদন কার্যবিবরণে এই মতের অত্যন্ত অনুকূল চরিত্রের ফলেই এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বিষয়ে অনুসন্ধান করলে ভিন্ন অবস্থা দেখা যাবে।১১

    যখন ইংল্যান্ডে ইটনের মতো স্কুলে প্রাথমিক স্তরে কেবল লেখা আর সামান্য হিসেবপত্র শেখানো হচ্ছে; ১৮৫১ সালের আগে যেখানে অঙ্ককে স্কুলের বাধ্যতামূলক পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না; সেখানে প্রায় একই সময়ে ইংল্যান্ডের প্রাথমিক স্কুলের কথা চিন্তা না করে বিদ্যাসাগর তাঁর মডেল স্কুলে পাঠ্য করছেন মাতৃভাষার মাধ্যমে লেখা-পড়া-অঙ্ক ছাড়াও ভূগোল, ইতিহাস, জীবনচরিত, পাটিগণিত, জ্যামিতি, পদার্থবিদ্যা, নীতিবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান শারীরবিজ্ঞান অথচ জনশিক্ষার প্রসঙ্গে হঠাৎই তাঁর ইংল্যান্ডের সঙ্গে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা করার সাধ জাগে! তাই সরকার যাতে কোনও ভাবেই জনশিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রসর না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করতেও তিনি চেষ্টার ত্রুটি রাখেন না!!

    চিঠিটির শেষ অনুচ্ছেদে তিনি এ বিষয়ে তাঁর মনের গোপন বাসনাটি ব্যক্ত করে বলেন

    আমার বিনীত মতে, একমাত্র কার্যকর উপায় না হলেও বাংলায় শিক্ষাবিস্তারের শ্রেষ্ঠ উপায়, উচ্চশ্রেণির মধ্যে বিস্তৃত মাত্রায় শিক্ষা দেওয়ার মধ্যেই সরকারের নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত একশো জন ছেলেকে শুধু পড়তে, লিখতে কিছু অঙ্ক শেখানোর চেয়ে একটিমাত্র ছেলেকে যথাযথভাবে শিক্ষিত করে তুলতে পারলে, সরকার প্রকৃত জনশিক্ষার অভিমুখে অধিকতর সহায়তা করবেন সমগ্র জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা নিশ্চয়ই বাঞ্ছনীয়, কিন্তু কোনও সরকার সে কাজ গ্রহণ বা পূরণ করতে পারে কি না সন্দেহ এও বলা যেতে পারে যে, ইংল্যান্ডে সভ্যতার উন্নত অবস্থা সত্ত্বেও শিক্ষা বিষয়ে সেখানকার জনসাধারণও তাদের এ দেশের ভাইদের চেয়ে কোনও অংশে ভালো নেই১২ [নজরটান সংযোজিত]

    সোজা কথায়যেহেতু দেশেরসমগ্র জনগণকেশিক্ষিত করে তোলাবাঞ্ছনীয়হলেও সে বাঞ্ছিত কাজটি কবে সম্পূর্ণ হতে পারে তার নিশ্চয়তা নেই, সেহেতু তত দিন পর্যন্ত সরকার উচ্চবর্ণ সম্পন্নশ্রেণির ছেলেদের জন্য শিক্ষাখাতে বরাদ্দ পুরো টাকাটাই ব্যয় করুক, তাহলেই কালক্রমে জনশিক্ষার কাজটি সম্পূর্ণ হবে!

    বিদ্যাসাগরের এই মতকে তীব্র আক্রমণ করে পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ লিখবেন,

    শিক্ষার অভিসেচনক্রিয়া সমাজের উপরের স্তরকেই দুই-এক ইঞ্চি মাত্র ভিজিয়ে দেবে আর নীচের স্তরপরম্পরা নিত্যনীরস কাঠিন্যে সুদূরপ্রসারিত মরুময়তাকে ক্ষীণ আবরণে ঢাকা দিয়ে রাখবে, এমন চিত্তঘাতী সুগভীর মূর্খতাকে কোনো সভ্য সমাজ অলসভাবে মেনে নেয় নি। ভারতবর্ষকে মানতে বাধ্য করেছে আমাদের যে নির্মম ভাগ্য তাকে শতবার ধিক্কার দিই১৩

    মডেল স্কুল শুরু হওয়ার তিন বছর পরে, স্কুলগুলি সম্পর্কে ১৮৫৭-৫৮ সালের একটি রিপোর্টে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন:

    আমরা এই কাজ আরম্ভ করার সময়ে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে, মফস্সলের লোকেরা মডেল স্কুলের মর্ম বুঝতে পারবে না কিন্তু স্কুলগুলির সাফল্য সেই সন্দেহ দূর করেছে যে সব গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই সব গ্রামের তার আশপাশের গ্রামবাসীরা স্কুলগুলিকে আশীর্বাদ বলে মনে করেন এবং তার জন্য তাঁরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ স্কুলগুলির যে যথেষ্ট সমাদর হয়েছে, ছাত্রসংখ্যা দেখলে তা পরিষ্কার বোঝা যায়১৪

    বিদ্যাসাগরের নিজের রিপোর্ট থেকেই বোঝা যায়, বাংলায় জনশিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ একেবারে ব্যর্থ হওয়ার মতো বিষয় ছিল না অথচ সরকার যখন নিম্নশ্রেণিভুক্ত জনগণের শিক্ষাখাতে ব্যয় করতে প্রস্তুত, তখন তিনি সুস্পষ্টভাবে তার বিরোধিতা করেন

    শিক্ষার সাঙ্গীকরণ প্রবন্ধটি লেখার অনেক আগে ১৯০৫ সালে (১৩১২ বঙ্গাব্দ) রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন

    ...যে-চাষা তাহার ছেলেকে প্রাইমারি স্কুলে পাঠায়, তাহার একটিমাত্র উদ্দেশ্য এই যে, তাহার ছেলে নিতান্ত চাষা না থাকিয়া কিঞ্চিৎপরিমাণে ভদ্রসমাজ-ঘেঁষা হইবার যোগ্য হয়; চিঠিটা পত্রটা লিখিতে পারে, পড়িতেও পারে, জমিদারের কাছারিতে দাঁড়াইয়া কতকটা ভদ্রছাঁদে মোক্তারি করিতে পারে, গ্রামের মোড়লি করিবার যোগ্য হয়, ভদ্রলোকের মুখে শুনিতে পায় যে, তাইতো রে, তোর ছেলেটা তো বলিতে-কহিতে বেশ”!

    চাষা একটু সম্পন্ন অবস্থার হইলেই ভদ্রসমাজের সীমানার দিকে অগ্রসর হইয়া বসিতে তাহার স্বভাবতই ইচ্ছা হয়। এমন-কি, তাহার ছেলে একদিন হাল-লাঙল ছাড়িয়া দিয়া বাবুর চালে চলিবে সাধও তাহার মনে উদয় হইতে থাকে। এইজন্য সময় নষ্ট করিয়াও, নিজের ক্ষতি করিয়াও ছেলেকে সে পাঠশালায় পাঠায় অথবা নিজের আঙিনায় পাঠশালার পত্তন করে।

    কিন্তু চাষাকে যদি বলা হয়, তোর ছেলেকে তুই চাষার পাঠশালায় পাঠাইবি, ভদ্রের পাঠশালায় নয়, তবে তাহার উৎসাহের কারণ কিছুই থাকিবে না। এরূপ স্থলে ছেলেকে পাঠশালায় পাঠাইবার উদ্দেশ্যই তাহার পক্ষে ব্যর্থ হইবে।

    শুধু তাই নয়। পল্লীর মধ্যে চাষার পাঠশালাটা চাষার পক্ষে একটা লজ্জার বিষয় হইয়া দাঁড়াইবে। কালক্রমে ভাগ্যক্রমে যে-চাষাত্ব হইতে তাহারা উপরে উঠিবার আশা রাখে, সেইটাকে বিধিমতো উপায়ে স্থায়ী করিবার আয়োজনে, আর যেই হউক, চাষা খুশি হইবে না।১৫

    বিদ্যাসাগর কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে এই বিভাজনের পক্ষেই সওয়াল করেন। ১৮৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি শিক্ষাসংক্রান্ত প্রস্তাবের প্রথম অনুচ্ছেদেই তিনি লেখেন:

    সুবিস্তৃ সুব্যবস্থিত মাতৃভাষা শিক্ষা একান্ত বাঞ্ছনীয়; কারণ কেবল তার সাহায্যেই জনসাধারণের উন্নতি সম্ভব।১৬ [নজরটান সংযোজিত]

    অথচ তার মাত্র সাড়ে পাঁচ বছরের ব্যবধানে তিনি বলেন,

    বাংলায় শিক্ষাবিস্তারের শ্রেষ্ঠ উপায়, উচ্চশ্রেণির মধ্যে বিস্তৃত মাত্রায় শিক্ষা দেওয়ার মধ্যেই সরকারের নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা১৭

    তবে বিদ্যাসাগরের পূর্বোদ্ধৃত প্রস্তাবে জনসাধারণের উন্নতি কথাগুলি কী অর্থ বহন করে? আসলে তিনি কাদের হয়ে এই ওকালতি করেন, তা স্পষ্ট হয়ে যায় পরবর্তী বছরগুলিতেই।

    সরকার জনশিক্ষার বিষয়ে বিদ্যাসাগরের পরামর্শকে অগ্রাহ্য করে ওই বছরে অর্থাৎ ১৮৫৯ সালে, ভারত সরকারের সচিব স্ট্যালি (Staley) প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করার জন্য স্থানীয় স্তরে কর আদায় করার নির্দেশ জারি করেন। অবশেষে ১৮৬৪ থেকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে কর আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৮৬৬-৬৭ নাগাদ দেখা যায়, ভারতবর্ষের সমস্ত প্রদেশের মধ্যে বাংলাতেই শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। এই বিষয়ে সরকারি প্রতিবেদনে লেখা হয়

    On the one hand we find a comparatively small number of students being instructed, mainly at Government expense, in the languages and the philosophy of the West and engaged in the pursuit of University distinctions; side by side are schools for the masses, receiving no aid from Government, where the pupils are taught to scratch letters in the dust….১৮

    এই বৈষম্যের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, দেশজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির জন্য বাংলায় যেখানে খরচ হয় মাত্র .০৩ লক্ষ টাকা; সেখানে বোম্বে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশসমূহ পাঞ্জাবে খরচ হয় যথাক্রমে .৯৩, .৩৭ .৬৭ লক্ষ টাকা।

    ১৮৬৭- ২৪ অগস্ট, রেভারেন্ড লং বড়লাট জন লরেন্স (কার্যকাল: জানুয়ারি ১৮৬৪-জানুয়ারি ১৮৬৯)-এর কাছে লেখা চিঠিতে শিক্ষাসংক্রান্ত নানা প্রস্তাব পাঠান। তিনি লেখেন, দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রসারের ব্যবস্থা না করা হলে বৃহৎ সংখ্যক কৃষক শ্রমজীবী মানুষ চিরদিনই অজ্ঞানের অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবেন বাংলার জমিদার শিক্ষিত ব্যক্তিরা যে কৃষক শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে শিক্ষাপ্রসারের চিরবিরোধী, তা লক্ষ করে তিনি বলেন:

    After a quarter of a century’s residence in Bengal, I have known but rare cases where either Zemindars or educated natives would do anything to raise the Bengal ryot to the status of a ‘man and a brother’.১৯

    এই অবস্থা থেকে সাধারণ মানুষকে উদ্ধার রা জন্য তিনি সরকারকে জনশিক্ষা আর অর্থ ব্যয় রার এবং জমিদারদের ওপ প্রয়োজনমতো শিক্ষা কর বসিয়ে অর্থসংগ্রহের অনুরোধ করেন২০ যদিও উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাম্মানিক সম্পাদক যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখ জমিদার শিক্ষিত ব্যক্তি লঙের প্রস্তাবের চূড়ান্ত বিরোধিতা করেন প্রসঙ্গত জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বহুবিবাহপ্রথা সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য নিযুক্ত তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য, যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুইটি ফান্ডের অন্যতম ট্রাস্টি ছিলেন এবং রাজেন্দ্রলাল মিত্র ছিলেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা- অন্যতম গ্রন্থাধ্যক্ষ এই ব্যক্তিদের পরিচয় থেকে কথা স্পষ্ট বোঝা যায়, বিদ্যাসাগর আসলে কোন শ্রেণির স্বার্থরক্ষার জন্য জনশিক্ষার বিরোধিতা করেন।

    ১৮৬৮ সালের ২৮ এপ্রিল ভারত সরকারের সচিব বেইলি লেখেন, ১৮৬৬-৬৭-তে বাংলায় যেখানে জনসংখ্যা চার কোটির বেশি সেখানে সরকারি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বুনিয়াদি স্তরের বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ৩৯,১০৪টি; অথচ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এই সংখ্যা ,২৫,৯৩৪টি (জনসংখ্যা কোটির কম), বোম্বাইতে (জনসংখ্যা . কোটি) ৭৯,১৮৯টি এবং পাঞ্জাবে (জনসংখ্যা ৮৫ লাখ) এই ধরণের স্কুলের সংখ্যা ২২,৬০০।২১ অবশেষে রোগের কারণ হিসেবে ধরা পড়ে

    In the North-Western Provinces, in the Punjab, and in Oude, the proprietors of land pay on this account a tax amounting to one per cent, on the Government demand. They pay the same in the permanently-settled districts of the Benares Division. In the Central Provinces they pay two per cent. In Madras the rate may be as much as 3 1/8 per cent. In Bombay, assuming that one-half of the cess lately imposed is devoted to roads, the proprietors of land pay at the rate of 3 1/8 per cent. In Bengal they pay nothing, although there is no part of India in which the means of the landholders are so large, in which the construction of roads and other works of local improvement is more urgently required, or in which such works have hitherto made so little progress.২২ [নজরটান সংযোজিত]

    বাংলায় জনশিক্ষা প্রসারের বিষয়ে যুগপৎ বিদ্যাসাগর বাংলার জমিদারদের সংকীর্ণ শ্রেণিস্বার্থের দৃষ্টিভঙ্গি, এই তথ্যটি থেকে আরও একবার স্পষ্ট হয়ে যায়

    পরিস্থিতিতে ১৮৬৮- ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বেথুন সোসাইটির দ্বিতীয় অধিবেশনে, শিক্ষাক্ষেত্রে মেকলের ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন নীতিকে সমর্থন রে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, বিশেষত কিশোরীচাঁদ মিত্র ওই সভায় চ্চবর্ণের মানুষদের এই দৃষ্টিভঙ্গি মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রথম আঙুল তোলেন লালবিহারি দে তিনি মেকলীয়ওপর থেকে চুঁইয়ে পড়ানীতির বিরোধিতা করেন এবং বাধ্যতামূলক সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার দাবি জানান বিষয়ে সোমপ্রকাশ পত্রিকায় লেখা হয়

    তিনি [লালবিহারি দে] অনুমান করেন, বাঙ্গলাদেশে ৪০০০০০০০ লোকের বসতি, প্রতি ১০০০ লোকের নিমিত্ত এক একটী বিদ্যালয় আবশ্যক। নিয়মে ৪০০০০ বিদ্যালয় করা কর্তব্য। প্রত্যেক বিদ্যালয়ে মাসিক ব্যয় ১০ টাকার হিসাব ধরিলে ৪৮ লক্ষ টাকা হয়, তত্ত্বাবধানের ব্যয় লক্ষ, ৮০টি নর্মাল স্কুলে লক্ষ, ৮০টী প্রাইমারি হাই স্কুলে লক্ষ এবং গৃহ সংস্কারাদির নিমিত্ত লক্ষ সমুদায়ে ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়।২৩

    অধিবেশনে লালবিহারি দে এই ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ের বিষয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানেরও প্রস্তাব রাখেন তাঁর মতে, ছাত্রছাত্রীদের মাথা পিছু এক আনা বেতন ধরা হলে আয় হবে ১০ লক্ষ টাকা এছাড়া লবণের ওপর কর বাবদ ২২ লক্ষ টাকা জমিদারদের ওপর শিক্ষা কর ধার্য করে লক্ষ টাকা আয় হতে পারে। বাকি ২১ লক্ষ টাকা সরকারি তহবিল থেকে দিতে হবে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবর্গ, বিশেষত বাংলার জমিদাররা এই শিক্ষা কর প্রবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করেন

    শিক্ষা কর চালু করে জনশিক্ষা প্রসারের পরিবর্তে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ সরকারি টাকার সিংহভাগ কেবল ইংরেজি শিক্ষায় ব্যয় করার জন্য, ১৮৭০ সালের জুলাই কলকাতার টাউন হলে এক বিশাল সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় উপস্থিত রাজা নরেন্দ্রকৃষ্ণ বাহাদুর শিক্ষাক্ষেত্রকে উচ্চবিত্ত শ্রেণির কুক্ষিগত করার বাসনায় নিখাদ মেকলীয় সুরের অনুবৃত্তি করে বলেন:

    ...ইংরাজি শিক্ষাদানে দেশবাসী গবর্ণমেন্ট উভয়েরই মঙ্গল। এদেশীয়েরা সুশিক্ষিত হইলে শাসনকার্যে ব্যয় অনেক অল্প হইবে। যে টাকায় এদেশীয় কর্মচারীগণ কাজ করেন, সেই প্রকার গুণবিশিষ্ট ইউরোপীয় কর্মচারী আনিতে অনেক ব্যয় পড়িবে।২৪

    তাঁকে সমর্থন করে ২৪ পরগণার জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট ব্রডলি বলেন,

    উচ্চতর শিক্ষা নিবন্ধন আমরা উপযুক্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সদ্বক্তা উকিল পাইয়াছি, লাভ সামান্য নহে। বঙ্গদেশে যে মত ইংরাজীর আদর এমত কুত্রাপি নাই।২৫

    এই মতকেই সমর্থন করেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র, কিশোরীচাঁদ মিত্র, জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। উচ্চবিত্ত উচ্চবর্ণের হিন্দু বাঙালিভদ্রলোকশ্রেণির লাগাতার বিরোধিতার কারণে, বাংলায় জনশিক্ষা বিস্তারের প্রসঙ্গটি