• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  সমাজ

  • দ্বিশতবর্ষে বিদ্যাসাগর - ৮

    এলেবেলে লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | সমাজ | ১৪ নভেম্বর ২০২০ | ৫৬৪ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • অষ্টম অধ্যায়

     

    বিদ্যাসাগরের মডেল স্কুলতোতাকাহিনী- অনুপ্রেরণা

     

    মালমসলা যাহা জড়ো হইতেছে তাহা প্রচুর তাহার আর সন্দেহ নাই; মানসিক অট্টালিকা নির্মাণের উপযুক্ত এত ইঁট পাটকেল পূর্বে আমাদের আয়ত্তের মধ্যে ছিল না। কিন্তু সংগ্রহ করিতে শিখিলেই যে নির্মাণ করিতে শেখা হইল ধরিয়া লওয়া হয়, সেইটেই একটা মস্ত ভুল সংগ্রহ এবং নির্মাণ যখন একই সঙ্গে অল্পে অল্পে অগ্রসর হইতে থাকে তখনই কাজটা পাকা রকমের হয়।

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিক্ষার হেরফের

     

     

    বিদ্যাসাগর য্ত দিন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষপদে আসীন ছিলেন, তত দিন তিনি খ্যাতি, প্রতিপত্তি সম্মানের শীর্ষবিন্দুতে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাঁ এই তুঙ্গ কর্মব্যস্ততার সময়েই বাংলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পর্ব শুরু হয়। বাংলার অন্যতম শিক্ষাব্রতী হিসেবে তাঁর ওপর সরকারের তরফে অর্পিত হয়, তার সুষ্ঠু রূপায়ণের গুরুদায়িত্ব সরাসরি সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু করার আগে আমরা দেখে নিতে চাই, ঠিক কী কারণে তিনি এই দায়িত্ব পেয়েছিলেন। পরে আমরা দেখব, তার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতটা সফল হয়েছিলেন তিনি

    দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমশ অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগতে থাকে, সরকারি শিক্ষার আঙিনা থেকে সম্পূর্ণ ব্রাত্য হয়ে পাঠশালার পড়ুয়ারা ক্রমেই প্রান্তিক হতে শুরু করে। ইংরেজি শিক্ষা চালু হওয়ার পরে, প্রধানত চাকরি পাওয়ার সুবিধার্থে বিত্তবান মানুষেরা সেই শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরে। শিবনাথ শাস্ত্রী জানিয়েছেন

    একদিকে ফোর্ট উইলিয়ম কালেজের সাহায্যে পরোক্ষভাবে দেশে বাঙ্গালা ভাষার চর্চা চলিতে লাগিল এবং সেই সঙ্গে বাঙ্গালা শিক্ষার জন্য পাঠশালা স্থাপিত হইতে লাগিল, অপরদিকে কলিকাতা সহরের সম্ভ্রান্ত গৃহস্থদিগের মধ্যে নিজ সন্তানদিগকে ইংরাজী শিক্ষা দিবার প্রবৃত্তি প্রবল হইতে লাগিল

    পাশাপাশি, একই সময়ে মাতৃভাষার চর্চা ক্রমশ অবহেলিত হতে থাকে। বিশেষত হিন্দু কলেজের ছাত্রদের বাংলা পড়ানোর পদ্ধতি, অভিভাবকদের শঙ্কিত করে তোলে

    হিন্দু কলেজের ছাত্র রাজনারায়ণ বসু পরবর্তীকালে বিষয়ে লিখেছেন,

    আমরা যখন কালেজে পড়িতাম, তখন বাঙ্গালা পড়ার প্রতি কাহারো নোযো ছিল না। যিনি আমাদের পণ্ডিত ছিলেন, তাঁহার সঙ্গে আমরা কেবল গল্প করে সময় কাটিয়ে দিতাম। সুতরাং যখন আমরা কালেজ থেকে বেরুলেম, তখন আমাদের বাঙ্গালা ভাষায় কিছু ব্যুৎপত্তি জন্মে নাই। সে সময়কার ছাত্রদিগের পক্ষে বাঙ্গালা ভাষা অতি ভীষণ পদার্থ ছিল।

    ১৮৪৩- ইয়ং বেঙ্গলের মুখপত্র বেঙ্গল স্পেক্টেটর পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়

    আমরা খেদপূর্বক প্রকাশ করিতেছি যে উক্ত বিদ্যালয়ের সিনিয়র ডিপার্টমেন্টের পণ্ডিত মহাশয়েরা এপর্যন্ত তত্রস্থ ছাত্রগণের বাঙ্গালা ভাষা শিক্ষার বিষয়ে মনোযোগ করেন নাই, ডিপার্টমেন্টে নিম্ন চারি শ্রেণীতে কেবল গৌড়ীয় ব্যাকরণের পাঠ অনুবাদ করণ দ্বারা বাঙ্গালা শিক্ষা হয়; ...আমরা আরও জানিতে প্রার্থনা করি যে এতদ্দেশীয়ভাষার পুস্তক সংগ্রহার্থে যে সাবকমিটী নিযুক্ত হইয়াছিলেন তাঁহারা এতাবৎ কাল পর্যন্ত কি করিলেন? এবং এক্ষণে এতদ্দেশে কৌন্সেল আব এডুকেসনের অধীনে যে সকল পাঠশালা আছে তাহাতে গৌড়ীয় ভাষা শিক্ষাদানের বিষয়ে কৌন্সেলেরই বা মত কি?

    মাতৃভাষার এই অবহেলার প্রতি ইংরেজি শিক্ষার প্রবল সমর্থক ইয়ং বেঙ্গলদের দৃষ্টি আকর্ষণের বিষয়টি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ

    মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারের জন্য, বড়লাট হার্ডিঞ্জ (কার্যকাল: জুলাই ১৮৪৪-জানুয়ারি ১৮৪৮) ১৮৪৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলা, বিহার উড়িষ্যার নানা জায়গায় মাসিক ১৮৬৫ টাকা ব্যয়ে ১০১টি পাঠশালা স্থাপন করেন তার আগে ওই বছরের ১০ অক্টোবর তিনি ঘোষণা করেন যে, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একদিকে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজিকে অগ্রাধিকারের ঘোষণা, অন্যদিকে এই পাঠশালাগুলি জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক প্রভৃতির অভাবএই যুগ্ম কারণে হার্ডিঞ্জের পাঠশালাগুলি মাত্র চার বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়।

    তারপরে সরকারি তরফে মাতৃভাষা শিক্ষায় আর কোনও উন্নতির চেষ্টা চোখে না পড়ায় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা লেখে

    গবর্ণমেন্ট হইতে পর্যন্ত বাঙ্গলা ভাষা শিক্ষার কোন উপায় হইল না সংবাদপত্র-সম্পাদকেরা যত চীৎকার করুন, আর অন্য ব্যক্তিই বা ইহার কর্তব্যতা পক্ষে যত যুক্তি প্রদান করুন, কিছুতেই তাঁহারা সচেতন হয়েন না তাঁহারা বধির হইয়া রহিয়াছেন এক্ষণে হিন্দুকালেজে বাঙ্গলা শিক্ষার নিয়ম আছে বটে কিন্তু সে নামমাত্র নিয়ম তথায় পাঠ্যের শৃঙ্খলা নাই, উপযুক্ত শিক্ষক নাই, পাঠ্য গ্রন্থও নাই এবং কেহ তদ্বিষয়ে তত্ত্বাবধারণও করে না বাঙ্গলা শিক্ষা করা আর না করা একপ্রকার ছাত্রদিগেরই স্বেচ্ছাধীন তাহারা পণ্ডিতদিগকে গ্রাহ্যই করে না; সুতরাং বিষয়ে অবহেলা করিলে তাহারদিগকে শাসন করিবারও লোক নাই। ইহাতে তাহারদের যে প্রকার ব্যুৎপত্তির সম্ভাবনা, তাহা প্রত্যক্ষই হইতেছে হিন্দু-কালেজ-সংক্রান্ত বাঙ্গলা পাঠশালাতে যে প্রকার অধ্যয়নের রীতি আছে, তাহাও অতি যৎসামান্য

    পরের বছরে একজন পত্রলেখক সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় লেখেন

    এতদ্দেশস্থ মনুষ্যগণের স্বদেশীয় বিদ্যানুশীলনে অনাদর অমনোযোগ, অনুরাগ অশ্রদ্ধা ংপূর্ণরূপে ন্মিয়াছে, যেহেতু বঙ্গভাষাতে প্রচুর র্থোপার্জন হয় না, কিন্তু ইংলণ্ডীয় ভাষাতে সুশিক্ষিত হইলেই অনায়াসে যথেষ্ট ধনার্জন করিবার ক্ষমতা হইতে পারে, তজ্জন্য এতদ্দেশীয় মনুষ্যেরা স্ব স্ব তনয়বৃন্দকে শৈশবকালাবধি অর্থলোভে লুব্ধ হইয়া অত্যন্তিক যত্নপূর্বক ইংরাজী পাঠশালাতে বিদ্যাভ্যাসার্থে প্রেরণ করেন, ইংলণ্ডীয় বিদ্যাতে সুপণ্ডিত হইলে এইক্ষণে যাবতীয় রাজকীয় কর্ম করিতে ক্ষমতাপন্ন হওয়া যায়, উচ্চপদ প্রাপ্ত দ্বারা সর্বসাধারণের সমীপে অত্যন্ত মর্যাদা সম্মান প্রশংসা লাভ করা যায়... অতএব তন্নিমিত্তে অস্মদ্দেশীয় মানব মণ্ডলী ইংরাজী বিদ্যোন্নতি করিতে আসক্ত হয়েন

    তদানীন্তন সময়ে মাতৃভাষার প্রতি অভিভাবকদের এহেন অবহেলার যথাযথ কারণ নির্দেশ করার বিষয়টি যথেষ্ট প্রশংসাজনক।  

    এর কয়েক বছর আগে, ১৮৪০-এর ২৯ এপ্রিল সরকারি আদেশক্রমে বেনারস, দিল্লি আগ্রার উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলি সমেত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যসমূহের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, বাংলা সরকারের বদলে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরিত হয়। অ্যাডাম-প্রদর্শিত পথে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে, ১৮৪৬ সালের ১৮ নভেম্বর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গভর্নর টোমাসন (J. Thomason)-এর তরফে সচিব থর্নটন (J. Thornton) নতুন ধরনের স্কুল চালু করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেন টোমাসন প্রস্তাবিত বিদ্যালয় ব্যবস্থাটি এই প্রত্যেক তহশিলে একটি করে মডেল স্কুল স্থাপন করা হবে চারিদিকে সব দেশি পাঠশালার আদর্শ হবে এই মডেল স্কুল পাঠশালার শিক্ষকরা তার মাধ্যমে পড়ানোর উন্নত শিক্ষাপ্রণালী গ্রহণ করবেন প্রত্যেক জেলায় এইসব স্কুল পরিদর্শনের জন্য একজন জেলা পরিদর্শক এবং দুটি তহশিল পিছু একজন পরগণা পরিদর্শক (Deputy Inspector) থাকবেন তাদের কাজ হবে স্কুলের শিক্ষাপ্রণালী, পাঠ্যপুস্তক, আর্থিক অবস্থা ইত্যাদি তদারক করা তাঁদের তত্ত্বাবধান করবেন একজন প্রধান পরিদর্শক হিন্দি উর্দু হবে শিক্ষার বাহন

    এই নতুন ধরনের বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের বিষয়ে বলা হয়:

    The course of instruction in this school will consist of reading and writing the vernacular languages, both Oordoo and Hindee, Accounts and the Mensuration of land according to the native system. To these will be added such instruction in Geography, History, Geometry, or other general subject, conveyed through the medium of the vernacular language, as the people may be willing to receive.

    বিদ্যালয়গুলির খরচের বিষয়ে জানানো হয় জেলা পিছু জেলা পরিদর্শকের জন্য ১৫০ টাকা, জন পরগণা পরিদর্শকের জন্য ৯০ টাকা জন শিক্ষকের জন্য ৯০ টাকা হিসেবে মোট মাসিক খরচ হবে মাত্র ৩৩০ টাকা এবং বার্ষিক পুরস্কারের জন্য ৫৪০ টাকা বরাদ্দ করে মোট বার্ষিক খরচ হবে ,৫০০ টাকা। অতঃপর পরীক্ষামূলকভাবে ১৮৫২-৫৩ সালে বেরিলি, শাহজাহানপুর, আগ্রা, মথুরা, মৈনপুরী, আলিগড়, ফারুকাবাদ এটাওয়াআটটি জেলায় এই শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়। টোমাসন প্রবর্তিত এই নতুন ধরণের স্কুলগুলির নাম দেওয়া হয়হলকাবন্দি বিদ্যালয়

    টোমাসনের স্কুলগুলি পরিদর্শন করে, ১৮৫৩- জুন শিক্ষা সংসদের সম্পাদক . মোয়াট রিপোর্ট জমা দেন তত দিনে স্কুলগুলিতে ছাত্রসংখ্যা ৩১,৮৪৩ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৬,৮৮৪ রুরকির নিকটবর্তী এক হলকাবন্দি বিদ্যালয় সম্পর্কে মোয়াট তাঁর রিপোর্টে লেখেন

    The pupils exhibited in examination a fair elementary knowledge of Arithmetic, and Geography; were able to trace the course of rivers on maps, and to indicate the most important towns situated on them. Some of them demonstrated with quickness and correctly, problems from the portions of Euclid read by them, and most of them read with ease simple prose compositions in Urdu and Hindee. They also write tolerably well and quickly. The attendance seemed on the whole to be good and the School to be popular as well as useful.১০

    বাংলা বিহারে এই শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তন করার সওয়াল করে প্রতিবেদনের উপসংহারে তিনি জানান:

    I am convinced that the scheme above referred to is not only the best adopted to leaven the ignorance of the agricultural population of the North-Western Provinces, but is also the plan best suited for the Vernacular Education of the mass of the people of Bengal and Behar.১১ [নজরটান সংযোজিত]

    যদিও আমরা দেখতে পাব বাংলার ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটবে।

    দেশে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার উন্নতির বিষয়ে অ্যাডাম স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করে লিখেছিলেন,

    ... I propose to qualify a body of vernacular teachers, to raise their character and provide for their support, and to give a gradual, a permanent, and a general establishment to a system of common schools.১২

    কিন্তু তদানীন্তন কর্তৃপক্ষ অ্যাডামের পরিকল্পনা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেনি এতদিন অ্যাডামের যে প্রতিবেদনগুলি বাংলায় অবহেলিত, অপাঙ্ক্তেয় অবস্থায় ছিল; সুদূর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাঁরই অনুসৃত পথে টোমাসনের পরিকল্পনার অপ্রত্যাশিত সাফল্যের কারণে, বাংলার শিক্ষামহল অবশেষে অ্যাডামকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়

    মোয়াটের রিপোর্ট পাওয়ার পরে, বড়লাট লর্ড ডালহৌসি (কার্যকাল: জানুয়ারি ১৮৪৮-ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬) ১৮৫৩ সালের ২৫ অক্টোবর কোর্ট অফ ডিরেক্টরদের জানান, বাংলা বিহারেও টোমাসনের শিক্ষাপ্রণালী প্রবর্তন করা উচিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তরফে বিষয়ে কোন আদেশ আসার আগেই, নভেম্বর তিনি বাংলা সরকারকে এই বিষয়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করার অনুরোধ জানান বড়লাটের নির্দেশানুযায়ী বাংলা সরকার ১৯ নভেম্বর শিক্ষা সংসদকে মাতৃভাষা (vernacular) শিক্ষা সম্পর্কেbased on the information contained in Mr. Reid’s printed Reports, and in those of Mr. Adam১৩ একটি পরিকল্পনা রচনা করার নির্দেশ দেয় ১৮৫৪- সেপ্টেম্বর, সংসদ সম্পাদক এই বিষয়ক সমস্ত সদস্যের প্রস্তাবগুলি সরকারকে পাঠিয়ে দেন এর কিছু দিন আগে, ১৮৫৩ সালে কোম্পানির সনদ নবীকরণ হয়। ওই সনদ অনুযায়ী ঠিক হয়, বাংলা হবে ভারতের প্রদেশ তার শাসনভার থাকবে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর (চলতি কথায় ছোটলাট)-এর হাতে। সেই অনুযায়ী ১৮৫৪- মে বাংলার প্রথম ছোটলাট হন হ্যালিডে (F.J. Halliday)

    মূলত হ্যালিডের উৎসাহে, ১৮৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি বিদ্যাসাগর মাতৃভাষা শিক্ষা বিষয়ে ১৯টি অনুচ্ছেদ সংবলিত একটি শিক্ষা পরিকল্পনা রচনা করেন ওই পরিকল্পনায় তিনি পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করেন মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে লিখন-পঠন-সরল অঙ্ক ছাড়াও ভূগোল, ইতিহাস, জীবনচরিত, পাটিগণিত, জ্যামিতি, পদার্থবিদ্যা, নীতিবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান শারীরবিজ্ঞান১৪ অ্যাডামসন ইটনের মতো নামকরা স্কুলের চিত্র জানিয়ে বলেছিলেন:

    … teaching consisted of writing and arithmetic…; while those in the fifth form also learnt ancient Geography, or Algebra.

    আর যারা সেখানে বেশ কিছুদিন পড়ার সুযোগ পেত, তারা এর বাইরে অতিরিক্ত শিখতpart of Euclid তবেnot till 1851 that Mathematics became a part of the regular school work১৫ সেখানে ১৮৫৪-তে বিদ্যাসাগর বাংলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইতিহাসের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে চান ভারতবর্ষ, গ্রিস, রোম ইংল্যান্ডের ইতিহাস!

    না, এত অল্পতে তাঁর মনে ভরেনি! ওই পরিকল্পনার একাদশ অনুচ্ছেদে তিনি লেখেন, যাতায়াতের ব্যয়সমেত মাসিক ১৫০ টাকা বেতনে দুজন বাঙালি পরিদর্শক একজন মেদিনীপুর হুগলির জন্য এবং অন্যজন নদীয়া বর্ধমানের জন্য রাখা প্রয়োজন। দ্বাদশ অনুচ্ছেদে তিনি জানান, সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ এই মডেল স্কুলগুলির প্রধান তত্ত্বাবধায়ক (Ex-officio Head Superintendent) মনোনীত হবেন তবে তার জন্য তাঁকে কোনও আলাদা পারিশ্রমিক দিতে হবে না, কেবল যাতায়াতের খরচ (বছরে ৩০০ টাকার বেশি হবে না) দিলেই চলে যাবে আর ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে বিদ্যাসাগর লেখেনগ্রন্থরচনা, পুস্তক শিক্ষক নির্বাচনের ভার প্রধান তত্ত্বাবধায়কের ওপর থাকবে১৬ [নজরটান সংযোজিত] ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বিদ্যাসাগরের ছাত্র হ্যালিডে ছোটলাট পদে নিযুক্ত হওয়ার আগে, শিক্ষা সংসদের অন্যতম সদস্য হিসেবে ১৮৫৪- ২৪ মার্চ তাঁর শিক্ষা পরিকল্পনা পেশ করেছিলেন। এবারে সামান্য সংসদ সদস্য থেকে এক লাফে ছোটলাট হয়ে, হ্যালিডে শুরু করেন তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শনের পালা।

    আগেই উল্লিখিত হয়েছে, ১৮৫৪- সেপ্টেম্বর সংসদ মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের বিষয়ে সমস্ত সদস্যের যে প্রস্তাবগুলি সরকারকে পাঠিয়েছিল, সেখানে হ্যালিডের প্রস্তাবটিও ছিল। ছোটলাট হওয়ার পরে, হ্যালিডে বাকি সদস্যদের প্রস্তাব বাতিল করে নিজের প্রস্তাবটিকে সর্বোৎকৃষ্ট বিবেচনা করেন এবং কেবল সেই প্রস্তাবটিই ১৮৫৪ সালের ১৬ নভেম্বর বড়লাটের কাছে পাঠান এই প্রস্তাবের পঞ্চম ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে তিনি লেখেন

    এই বিষয়ে সংস্কৃত কলেজের সুযোগ্য অধ্যক্ষ ণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অভিমত সংযুক্ত হল। সকলেই জানেন, বাংলা শিক্ষার প্রচারকার্যে বিদ্যাসাগর বহু দিন থেকেই বিশেষ উৎসাহী সংস্কৃত কলেজে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করে এবং বিদ্যালয়ের পাঠোপযোগী অনেক প্রাথমিক পাঠ্যবই রচনা করে তিনি এক্ষেত্রে যথেষ্ট কাজ করেছেন

    অধ্যক্ষের মন্তব্যের অন্তর্গত শিক্ষাপ্রণালী আমি সাধারণভাবে অনুমোদন করি। আমার ইচ্ছা, তাঁ প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকেই কাজে পরিণত করা হোক।১৭

    বিদ্যাসাগর মডেল স্কুলগুলোর প্রধান তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হবেন, শিক্ষা সংসদের অনেক সদস্যই (রামগোপাল ঘোষ, স্যার জেমস কোলভিল প্রমুখ) প্রস্তাবের সঙ্গে সহমত পোষণ করেননি। কিন্তু হ্যালিডে কার কথায় কান না দিয়ে প্রস্তাবিত স্কুলগুলি স্থাপনের জন্য, বিদ্যাসাগরকেই স্থান নির্বাচনের ভার দেন সেই অনুযায়ী সংস্কৃত কলেজের গ্রীষ্মাবকাশে বিদ্যাসাগর হুগলি জেলার কিছু গ্রাম পরিদর্শন করে ছোটলাটকে রিপোর্ট দেন ১৮৫৪- জুলাই।

    এই সময়ে, ১৮৫৪ সালের ১৯ জুলাইবোর্ড অফ কন্ট্রোল’-এর সভাপতি স্যার চার্লস উড ভারতের শিক্ষা সম্পর্কে যে ঐতিহাসিক সনদটি পাঠান, সেটিউড ডেসপ্যাচনামে পরিচিত। এই ডেসপ্যাচে প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে বলা হয়)  শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্ত কাজকর্ম পরিচালনার জন্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন করতে হবে, ) কল ধরণের বিদ্যালয়ের জন্য উপযুক্ত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং ) প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পাঠশালা অনুরূপ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলি দিকে নজর দিতে হবে। উডের ডেসপ্যাচ অনুযায়ী সরকারি শিক্ষাবিভাগে নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় কাউন্সিল অফ এডুকেশন উঠে যায়, বদলে নিযুক্ত হন প্রথম জনশিক্ষা অধিকর্তা (Director of Public Instruction) গর্ডন ইয়ং এই কারণে আবার নতুন করে মডেল স্কুল নিয়ে সমস্যা শুরু হয় সরকারি নিয়মে বিদ্যাসাগরকে মাতৃভাষা শিক্ষার তত্ত্বাবধায়কের পদে নিযুক্ত করা সম্ভব নয়, কারণ জনশিক্ষা অধিকর্তা তাঁর অধীনস্থ পরিদর্শকদের সেই দায়িত্ব নেওয়ার কথা তাই ১৮৫৫- ২৩ মার্চ হ্যালিডের তরফ থেকে ইয়ংকে অন্তত কিছু দিনের জন্য বিদ্যাসাগরকে পরিদর্শনের কাজে নিযুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হয় প্রত্যুত্তরে ইয়ং জানান, স্থায়ী ইনস্পেক্টর প্র্যাট (H. Pratt) দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদ্যাসাগর অস্থায়ীভাবে ইনস্পেক্টর অফ স্কুলস নিযুক্ত হতে পারেন

    বলা বাহুল্য, এই প্রস্তাব ছোটলাটের পছন্দ হয়নি ১৮৫৫ সালের ১১ এপ্রিল তিনি লেখেন 

    অস্থায়ীভাবে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্রকে নিযুক্ত করে কোনও লাভ নেই ... তিন মাস বা তিন সপ্তাহ পরে ইনস্পেক্টর মি. প্র্যাট যখন আসবেন তখন তাকে বিদায় নিতে হবে, রকম কোন শর্তে তাঁকে নিযুক্ত করলে তিনি কোন কাজ করতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না।১৮

    এর পরে ২০ এপ্রিল সরকারের সচিব জনশিক্ষা অধিকর্তাকে চিঠিতে লেখেন

    ... যে কোনও মুহূর্তে বিদায় করে দেওয়া যেতে পারে, ছোটলাট মনে করেন, পণ্ডিতের চরিত্র গুণ বিচার করে এমন শর্তে তাঁকে নিয়োগ করা হলে তাঁর প্রতি সরকারের অবিচার হবে।

    ছোটলাটের মত এই, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র শর্মাকে এখনই অনুমোদিত ব্যবস্থা অনুসারে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হোক ...তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে, কলকাতার নিকটবর্তী তিন-চারটি জেলা তাঁর কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হোক এতে, অন্তত এই সময়ে, কলেজের কাজে পণ্ডিতের বিশেষ অসুবিধা হবে না। ...সংস্কৃত কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে বেতন ছাড়া, পণ্ডিত এই কাজের জন্য (যাতায়াতের খরচ বাদে) মাসিক দুশো টাকা ভাতা পাবেন।১৯

    হ্যালিডে যখন দক্ষিণবঙ্গে একজন সহকারী স্কুল পরিদর্শক নিয়োগ করার বিষয়ে বিদ্যাসাগরের হয়ে এত চিঠি চালাচালি করছেন, সেই সময়ে জেমস লং দেশজ শিক্ষাব্যবস্থা পদ্ধতিকে ভিত্তি করেই এগোতে চেয়েছিলেন

    বড়লাটকে পাঠানো হ্যালিডের মিনিট থেকে জানা যায়, ১৮৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাতৃভাষা শিক্ষার বিস্তার সম্পর্কে লং তাঁর পরিকল্পনা নোটের আকারে পেশ করেছিলেন তিনি প্রধানত কম দামে ভালো পাঠ্যপুস্তকের প্রচলন এবং পাঠশালার গুরুমশাইদের স্থানীয়ভাবে নিজেদের উপযুক্ত হতে সাহায্য করার ওপর জোর দিয়েছিলেন তাঁর পাঠ্যক্রমে প্রাথমিক ভিত্তি ছিল লেখা, পড়া, অঙ্ক, ভূগোল সাধারণ জ্ঞান এমনকি বড়লাটের কাছে হ্যালিডে যেমন বিদ্যাসাগরের শিক্ষা পরিকল্পনাটি সংযুক্ত করে দিয়েছিলেন, তেমনই লঙের পরিকল্পনাটিও যুক্ত করে মন্তব্য করেছিলেন,

    Mr. Long teaches, or proposes to teach, in his Schools, History, Biography and Geography, with especial reference to Bengal and India; Arithmetic, Writing by dictation, Natural History, Grammar and Etymology. He makes use of the indigenous Schools as a foundation to work upon, and he aims at their improvement. He asks for a Grant of Rupees 25 a month, and thinks that this would enable him to double the number of his Schools. He has at present three.২০

    তবুও লং নন, মুরুব্বির জোরে এবং হ্যালিডের নির্দেশে বিদ্যাসাগরই ১৮৫৫ সালের মে এই পদে নিযুক্ত হন অথচ মাতৃভাষা শিক্ষার বিস্তার সম্পর্কে বিদ্যাসাগরের কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল না। শুধু তাই নয়, তখনও অবধি খাস ইংল্যান্ডে অপ্রচলিত এবং এখনও পর্যন্ত স্বাধীন ভারতবর্ষে প্রাথমিক স্তরে অপ্রচলিত বিষয়বস্তু ছিল তাঁর পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, এই বিষয়ে প্রচলন করতে চাওয়া এক বিশাল পাঠ্যপুস্তকের তালিকাও

    সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে ৩০০ টাকা মাসিক বেতন ছাড়াও এই কাজের জন্য অতিরিক্ত মাসিক ২০০ টাকা বেতন পেতে শুরু করেন তিনি। উপরন্তু দক্ষিণবঙ্গের বিদ্যালয়সমূহের সহকারী ইন্সপেক্টর হয়ে বিদ্যাসাগর যে চারজন সাব-ইন্সপেক্টর বেছে নেন, তার মধ্যে নির্বাচিত হন তাঁর আপন সহোদর দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন (বাকি তিনজনহরিনাথ বন্দোপাধ্যায়, মাধবচন্দ্র গোস্বামী তারাশঙ্কর ভট্টাচার্য) এঁদের প্রত্যেককে পথখরচ ব্যতীত মাসিক ১০০ টাকা বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এহ বাহ্য, ১৮৫৪- ফেব্রুয়ারি বিদ্যাসাগর যে শিক্ষা পরিকল্পনা পেশ করেছিলেন, সেখানে নিজের যাতায়াতের খরচ ছাড়া কোনও আলাদা পারিশ্রমিকের উল্লেখ করেননি একই পরিকল্পনায় চারটি জেলার জন্য তিনি মাত্র দুজন পরিদর্শকের কথা বলেছিলেন। অথচ কার্যক্ষেত্রে তিনি অতিরিক্ত বেতন প্রত্যাখ্যান করেননি, উপরন্তু পরিদর্শক বাবদ অতিরিক্ত ১০০ টাকা ব্যয়বরাদ্দের বিষয়েও কোনও আপত্তি জানাননি শুধু তাই নয়; সহকারী পরিদর্শক হিসেবে পাঠ্যপুস্তক রচনা, পুস্তক শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি পান অবাধ একচ্ছত্র ক্ষমতাও!

    দায়িত্ব পেয়ে কাজ শুরু করেন বিদ্যাসাগর। প্রথমে মডেল স্কুল স্থাপনের উপযুক্ত অঞ্চল নির্বাচনের জন্য, তিনি সাব-ইন্সপেক্টরদের মফস্সলে পাঠান এবং স্কুলগুলিতে শিক্ষক নির্বাচনের জন্য মে মাসেই সংস্কৃত কলেজে একটি পরীক্ষা নেওয়ার নোটিশ দেন ১৮৫৩ সালের সেপ্টেম্বর, কাশীর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ব্যালান্টাইনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে শিক্ষা সংসদের সম্পাদককে বিদ্যাসাগর রীতিমতো আশ্বাসের সুরে জানিয়েছিলেন

    পরিশেষে আমি সবিনয়ে জানাতে চাই, যদি আমাকে আমার নিজস্ব পদ্ধতি অনুযায়ী কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সংসদকে নিশ্চিত করতে পারি যে সংস্কৃত কলেজ যেমন বিশুদ্ধ অসামান্য সংস্কৃত শিক্ষার আদর্শ প্রতিষ্ঠান হবে, তেমনই একই সঙ্গে উন্নত দেশীয় সাহিত্যচর্চারও প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে। এখান থেকে এমন একদল ভবিষ্যতের শিক্ষক তৈরি হবে, যাঁরা দেশের জনসাধারণের মধ্যে বাংলা ভাষা সাহিত্যের প্রসারের পথ সুগম করবেন২১ [জরটান সংযোজিত]

    সেই অনুযায়ী তিনি কলেজে প্রচুর সরকারি অর্থব্যয়ে ইংরেজি বিভাগ চালু করেছিলেন তা সত্ত্বেও, শিক্ষক নির্বাচনের পরীক্ষায় ২০০ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৯২ জন উত্তীর্ণ হন। এমনকি যাঁরা উত্তীর্ণ হন, তাঁদের একজনও মডেল স্কুলে শিক্ষকতা করার যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেননি২২ সংস্কৃত কলেজের পরীক্ষার্থীরা যদি সামান্য প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করার যোগ্য না হতে পারেন, তাহলে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে বিদ্যাসাগরের ব্যর্থতা।

    ১৮৫৪- ২৪ মার্চ শিক্ষা সংসদের অন্যতম সদস্য হিসেবে হ্যালিডে যে শিক্ষা পরিকল্পনা পেশ