• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • করোনার দিনগুলি - সপ্তম কিস্তি

    ঐন্দ্রিল ভৌমিক লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ০৬ জুন ২০২০ | ১৮৫১ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • করোনার দিনগুলি #২৫

    ছোটো বেলায় রূপকথার গল্প বলতেন মা।

    “তারপর অনেক রাক্ষস খোক্কস রাজপুত্রকে ঘিরে ধরল। রাজপুত্র তো ভয়ে অস্থির। কি করবে, এতো ভয়ংকর শত্রুদের সাথে লড়বে কি করে? হাতে যদিও তলোয়ার একটা আছে, কিন্তু তাতে তেমন ধার নেই। হঠাৎ মনে পড়ল, বুকের কাছে চেপে ধরা যে সোনার কৌটোটা, তার মধ্যে রয়েছে রাক্ষসদের প্রাণ ভোমরা। কৌটো খুলে যেই না রাজপুত্র ভোমরা বার করেছে, রাক্ষসদের সে কি তড়পানি। ‘তোকে টুকরো টুকরো করে ফেলব। গরম তেলে ভাজব। শিগগিরি ভোমরাটাকে ছেড়ে দে।’ ভোমরার একটা ডানা ছিড়তেই তড়পানি বদলে গেল অনুনয়ে। ‘তোমাকে সাত রাজার ধন এক মানিক দেব। তোমাকে রাজকন্যা এনে বিয়ে দেব। ওটাকে ছেড়ে দাও।’ তারপর পটাং করে ভোমরার মাথা ছিড়তেই শান্তি।”

    মা চিরকালের জন্য চলে যাওয়ার সাথে সাথে রূপকথারও বিদায় নিয়েছে। প্রতিনিয়ত বাস্তবের মুখোমুখি হচ্ছি। এই করোনা মহামারীর সময়ে আরও বেশি করে। বুঝতে পারছি রূপকথার মতো অতো সহজে সবকিছুর সমাধান হয় না।

    নেতা মন্ত্রীরা বারবার আমাদের সৈনিকদের সাথে তুলনা করছেন। যদিও সৈনিক হওয়ার দক্ষতা ও ইচ্ছা আমার ধারণা অনেক চিকিৎসকেরই নেই। মানুষ মারা তো দূরের কথা, একটা ক্ষুদ্র প্রানীকে মারতে গেলেও অনেক চিকিৎসকের হাত কাঁপে।

    তাছাড়া এ আবার কীরকম সৈনিক? ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার। এমনকি রোগীর মৃত্যু হলে তার ডেথ সার্টিফিকেট টুকুও লেখার অধিকার নেই।

    ঢাল তলোয়ার ছাড়াই লড়তে গিয়ে মৃত্যু হলে আমরা নাকি শহীদের মর্যাদা পাব? তাহলে শুনবেন এক শহীদের গল্প? ডাঃ সাইমন, চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালের নিউরোসার্জেন। তিনি কোভিড আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে নিজেই কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হন এবং গত রবিবার সন্ধ্যেয় মারা যান। এইসব শহীদদের গান স্যালুটের মাধ্যমে বিদায় জানানো হয় না। পলিথিনে মুড়ে কবর দেওয়া হয়। এমনকি তাঁর কিশোর পুত্র শেষ বারের জন্যও বাবার মুখ দেখতে পায়নি।

    ডাঃ সাইমনের শেষযাত্রায় ছিলেন ডাঃ প্রদীপ, তারই এক সহকর্মী। আর ছিলেন এ্যাম্বুলেন্স চালক ও একজন পুলিশ। যে মানুষদের বাঁচাতে গিয়ে তিনি জীবন দিয়েছেন, সেই মানুষেরাই এ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ধরেন। তাঁদের দাবী ডাক্তারবাবুকে ওখানে কবর দেওয়া যাবে না। এ্যাম্বুলেন্স চালককে বেধড়ক মারধোর করা হয়। পুলিশকর্মী ও ডাঃ প্রদীপ কোনোভাবে নিজেদের রক্ষা করেন। উত্তেজিত জনতা চলে যাওয়ার পরে ডাঃ প্রদীপ দেখেন ডাক্তারবাবুর মৃতদেহ রাস্তায় গড়াচ্ছে। তিনি ওই পুলিশকর্মীর সাহায্যে মৃতদেহকে গাড়িতে তোলেন। এ্যাম্বুলেন্স চালকের দেহ তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তাঁর তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু না হলে জীবন বিপন্ন হতে পারে।

    ডাঃ প্রদীপ নিজেই ড্রাইভারের আসনে বসেন। তিনি তখনও উপস্থিত বুদ্ধি হারান নি। নিজেই এম্বুলেন্স চালিয়ে চালককে হাসপাতালে ভর্তি করেন। তারপর ডাক্তারবাবুর মৃতদেহ নিয়ে কবরস্থানে যান। কবর খোঁড়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে কোদাল দিয়ে তিনি নিজেই কবর খুঁড়তে শুরু করেন। ঐ পুলিশ কর্মীটি সারাক্ষণ তাঁর সাথে ছিলেন। তাঁর সহায়তায় ডাঃ প্রদীপ গর্ত করে নিজের সহযোদ্ধার দেহ পুঁতে ফেলেন।

    এটা শুধু দক্ষিণ ভারতের গল্প নয়। এটা ভারতের সব কটা রাজ্যের গল্প। কোথাও লকডাউনের সময়ে মাঝ রাতে শুনশান রাস্তায় সিস্টার দিদিকে বের করে দেওয়া হয়। কোথাও সাতদিন কোভিড হাসপাতালে ডিউটি করে আসা ক্লান্ত চিকিৎসককে পাড়ায় ঢুকতে দেওয়া হয়না। আবার কোথাও করোনা আক্রান্ত চিকিৎসককে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচার সভা বসে।

    আর সেসময় অসংখ্য তরুণ চিকিৎসককে উপযুক্ত প্রটেকশান ছাড়াই কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় লাগিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের শোনানো হয় এক অলৌকিক পনের মিনিটের থিয়োরি। পর পর সহকর্মীরা কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পরও বাকিরা কাজ করে যান।

    এইসব মৃত্যুভয়হীন প্রত্যেক চিকিৎসকই একেক জন অগ্নীশ্বর। আর অগ্নীশ্বরদের একটাই দূর্বলতা, অসুস্থ রোগী দেখলে তাঁরা অতীতের কথা মনে রাখেন না।

    তবে আমরা যারা অগ্নীশ্বর নই তাদের সব কিছু মনে থাকবে। সব কিছু। থালা বাজানো থেকে ডাঃ প্রদীপের চোখের জলে ভেজা নোটটুকুও।
    সব কিছু মনে রাখব...
    প্রতিটি স্বাস্থ্য কর্মীর প্রতি ফোঁটা চোখের জল...
    যদি বেঁচে থাকি, ভুলব না...
    ~~~~

    করোনার দিনগুলি #২৬

    লকডাউনটাও যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। এই মহামারী নিয়ে ঘর করাটাও।

    একদম প্রথম দিকের যুদ্ধ যুদ্ধ মনোভাবটা উধাও হয়ে গেছে? কিসের যুদ্ধ? কার সাথে যুদ্ধ? শত্রু কি শুধু একটাই?

    করোনা ছাড়া আর কোনো রোগ নেই? একটা ছেলে রোজ চেম্বারে আসছে বোনের জন্য। আঠারো উনিশ বছরের মেয়েটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। রোজই জ্বর আসছে। চোখের পাতা টেনে দেখলাম কাগজের মতো সাদা। বেশ কয়েকদিন বকাঝকার পর রক্ত পরীক্ষা করিয়েছে। হিমোগ্লোবিন পাঁচের নীচে। টোটাল কাউন্ট অনেক বেশি। ছকে বাধা নিউট্রোফিল, লিম্ফোসাইট কাউন্ট দেখে সন্দেহ হচ্ছিল আদৌ বাদবাকি রিপোর্টটা অথেনটিক তো?

    অনেক ল্যাবরেটরিই বন্ধ। এক ওষুধের দোকান থেকে রিপোর্ট করিয়েছে। আরও কিছু রিপোর্ট করা উচিৎ ছিল। করাতে পারেনি। ছেলেটি একটি শপিং মলে কাজ করে। মার্চ মাস থেকেই সেটা বন্ধ। কবে খুলবে জানে না। খুললে কাজ থাকবে কিনা তাও জানেনা।

    আমি বারবার বলছিলাম, রক্ত দিতে হবে। গত পরশু বারাসাতে ভর্তি করে দু-বোতল রক্ত দিয়ে এনেছে। রক্ত দেওয়ার পর থেকেই মেয়েটির দুই পা ফুলতে শুরু করেছে। বারাসাত থেকে মেয়েটিকে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের হেমাটোলজি ডিপার্টমেন্টে রেফার করেছে। প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে এনআরএস বোনকে নিয়ে যাওয়া ওর দাদার পক্ষে অসম্ভব। আমায় বারবার বলছে তিন তারিখ অবধি বোনটাকে কোনোভাবে সুস্থ রাখতে। যেন চার তারিখ আসলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

    এমন অনেকেই চেম্বারে আসছেন যারা সরকারি হাসপাতালের উপর নির্ভর করেই এতদিন বেঁচেছিলেন। অন্যসময় তাঁদের হাতে দুটো পয়সা থাকে। কিন্তু মাস দেড়েক উপার্জন হীন হয়ে সেটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। হাসপাতালের ওষুধ ফুরানোয় আমার কাছে এসেছেন। ওষুধ লেখার সময় বারবার মনে হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধগুলির এতো দাম কেন?

    ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এক বৃদ্ধ প্রেসক্রিপশন নিয়ে কিছুক্ষণ বাদে ফেরত এলেন। বললেন, ‘ডাক্তারবাবু, আরেকটু কম দামের ওষুধ হয় না?’

    কি উত্তর দেব? আমি আমার জ্ঞান মতো সবচেয়ে কম দামের ওষুধই লিখেছি। অনেকেই দেখাতে এসে দুঃখের সাতকাহন শোনাতে চাইছেন। আমি আর শুনতে চাইছি না। বলছি, ‘কি সমস্যা বলুন?’

    এই প্রথম চিকিৎসক হওয়ার জন্য অসহায় বোধ করছি। মনে হচ্ছে অন্য কিছু হলে রোজ রোজ এতোগুলো বিপন্ন মানুষকে জবাবদিহি করতে হতো না।

    যুবক ছেলেরা ভ্যানে করে রাস্তায় রাস্তায় সব্জি বিক্রি করতে শুরু করেছে। এতো সবজি কে কিনবে? একেকজন সাময়িক সব্জি বিক্রেতার উপার্জনে কতগুলো খালিপেটে খাবার পড়বে? কত জন স্ট্রোক, হার্টের রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধ বাবা মায়ের চিকিৎসা চলবে? একজন বৃদ্ধা আসক্ত শরীরে বেল আর কাঁঠালি কলা বিক্রি করতে এসেছিলেন। এই বৃদ্ধার বাড়িতেও কি কেউ অপেক্ষা করে আছে?

    একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে নিয়ে তাঁর ছেলে বিকেলে এসেছিল। বৃদ্ধের ডানদিক তিনদিন ধরে অসাড় হয়ে গেছে। বাড়ির লোক তিনদিন ধরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সাহস পায়নি। বৃদ্ধের প্রেশার প্রায় আকাশ ছুঁয়েছে। একটা সিটি স্ক্যান করতে পারলে হতো। সাগর দত্ত বা বারাসত হাসপাতালের এমারজেন্সিতে নিয়ে যেতে পারলে হয়তো বিনা পয়সায় হতো। ছেলেটিও একই কথা বলল, ‘লকডাউনটা মিটুক। তারপর করাব। এ কটা দিন ওষুধপত্র দিয়ে কোনো ভাবে কাটিয়ে দিন।’

    প্রেশারের ওষুধ লিখে বৃদ্ধকে বিদায় করলাম। বললাম, ‘কাউকে দিয়ে একটু ফিজিওথেরাপি করাতে পারলে ভালো হয়।’ ওনার ছেলে বলল, ‘আপনি ব্যায়াম দেখিয়ে দিন। আমিই যেটুকু পারি করাব।’

    তবে মহামারীর মধ্যেও ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি ফেরত আসছে। পাড়ার বন্ধুরা আবার একজোট হয়েছে। সেই ছোটবেলার মত। সকলে চাঁদা তুলে চাল, ডাল, তেল কিনে বেছে বেছে পৌঁছে দিচ্ছে হতদরিদ্র মানুষগুলির হাতে। এই বন্ধু গুলোর জন্যই এই অকালেও বেঁচে থাকতে ভালো লাগে।

    ঘোলা বাসস্ট্যান্ডে এক জায়গায় চেম্বার করতাম। আজ তার ঠিক পাশেই একজনের করোনা ধরা পড়েছে। আজ থেকে সেই চেম্বার বন্ধ। করোনা মহামারী আস্তে আস্তে চারদিক থেকে ঘিরে ধরছে। পরপর বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আমার ভাইয়েদের, বোনেদের করোনাতে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে। আমার দ্বিতীয় বাড়ি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অবস্থা তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। করোনা আক্রান্ত চিকিৎসক ও সিস্টারের সংখ্যা রোজই সেখানে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ডাঃ বিপ্লব কান্তি দাশগুপ্ত নামে একজন চিকিৎসক আজ মারা গেছেন। পশ্চিমবঙ্গের করোনা যুদ্ধের প্রথম চিকিৎসক শহীদ। আমাদের এতটাই দুর্ভাগ্য, যে মানুষটি অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করলেন, রিপোর্ট পজিটিভ আসা সত্ত্বেও তিনি কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর স্বীকৃতি পেলেন না। বিশেষজ্ঞ কমিটি এখন তাঁর মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখবেন। খতিয়ে দেখা হবে তাঁর অন্য কোনো শারীরিক অসুবিধা ছিল কিনা।

    করোনাকে আর আমার বিশেষ ভয় লাগছে না। বরঞ্চ আমি ভয় পাচ্ছি ক্রমশ নিজের পরিবর্তন দেখে। এতো দারিদ্র, এতো অসহায়তা দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে আমার অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। মনখারাপের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য শামুখের মতো খোলসে গুটিয়ে যাচ্ছি। নচিকেতার ‘ও ডাক্তার’ গানের এতো প্রতিবাদ হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা সেই কসাই’ই হয়ে যাব নাতো?
    ~~~~

    করোনার দিনগুলি #২৭

    লক ডাউন হয়তো আরও বাড়তে চলেছে। কিন্তু সেই একই প্রশ্ন প্রথম থেকে মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু লকডাউন করেই কি এই আমরা এই মহামারীকে ঠেকিয়ে দিতে পারব। আমাদের মতো একটা গরীব দেশে অনির্দিষ্টকাল ধরে কি লকডাউন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব?

    এতে কোনও সন্দেহ নেই, লক ডাউনের ফলে কোভিড-১৯ ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার গতিবেগ অনেকটা কমে গেছে। কিন্তু পুরোপুরি আটকায়নি। যে ধীর গতিতে ছড়াচ্ছে তাতেই আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কঙ্কাল বে আব্রু হয়ে গেছে। সেটা হওয়ারই ছিল। আমাদের দেশের সবচেয়ে অবহেলিত দুটি বিষয় হল, স্বাস্থ্য আর শিক্ষা। কমতে কমতে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ১% এ নেমেছে। এই দুটি ক্ষেত্রে কোনও সরকারই কোনদিন নজর দেয়নি। বরঞ্চ বেসরকারি হাতে মানুষের মৌলিক চাহিদা দুটি তুলে দিয়ে নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলতে চেয়েছে।

    একটি স্কুল চালাতে সরকারের যা খরচ হয়, সেই টাকায় অনেক গুলি ক্লাব কে অনুদান দেওয়া যায়। অনেক মানুষকে সামান্য কিছু টাকা পাইয়ে দিয়ে ভোটে জেতা নিশ্চিত করা যায়। একটি সরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রেও এই কথাটা সত্যি।

    মাঝে মাঝে যখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দোষ ত্রুটি গুলো সকলের চোখের পড়েছে, তখন চিকিৎসককে বা অন্য কোনও স্বাস্থ্য কর্মীকে ভিলেন বানিয়ে মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি শাসক দলের নেতারাও জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের জন্য চিকিৎসকদের নিগ্রহ করেছেন।

    আমি তখন মেডিক্যাল কলেজে মাস্টার ডিগ্রি করছি। এক রাতে ডিউটি করছি। হঠাৎ একজন স্বঘোষিত নেতা তার অনেক সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ওয়ার্ডে ঢুকে গেল। এবং আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করল।

    বুঝলাম, একটু আগে একজন সাপে কাটা রোগী ভর্তি হয়েছে। সেই রোগীকে কেন মেঝেতে জায়গা দেওয়া হয়েছে, এতেই ওই নেতার রাগ।

    আমি বলতে গেলাম, বেড থাকলে তো দেব। অ্যাকুউট ওয়ার্ডে পঞ্চাশটি বেডে পঁচাত্তর জন রোগী ভর্তি আছে। স্বভাবতই সকল রোগীকে বেড দেওয়া সম্ভব নয়।

    তাতে সেই নেতা তেড়ে আমাকে মারতে এলো। ইন্টার্ন ভাই আর সিস্টার দিদি কোনও রকমে তাকে আটকালেন।

    মত্ত নেতা অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় বলতে থাকল, আগে ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক দল ছিল, আমি সেই দলের দালাল। ওদের দলের নাম খারাপ করার জন্য গরীব মানুষের রক্ত চুষছি। আমাদের মতো চিকিৎসককে অবিলম্বে লাথি মেরে সরকারি চাকরি থেকে বের করে দেওয়া উচিৎ।

    তার সাঙ্গোপাঙ্গরা একধাপ উপরে। চিৎকার করেছে, পারমিশন পেলে তারা আমার হাত পা খুলে নেবে।

    মাতালদের সাথে তর্ক করা বোকামি ও বিপদজনক। তারা বেশ কিছুক্ষণ চিৎকার করে ওয়ার্ড থেকে বিদায় নিলো। পুরো সময়টাতেই একজন পুলিশ নির্বাক দর্শক হয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল।

    এবং পুরো ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর আমরা অত্যন্ত শান্ত ভাবে সেই সাপে কাঁটা রোগীটিকেই প্রতিষেধক চালালাম। সিস্টার দিদি চারঘন্টা অন্তর তার রক্ত পরীক্ষা করলেন। পুরো ঘটনায় ওয়ার্ডের কোনও রোগী এবং রোগীর বাড়ির লোক কোনও প্রতিবাদ করেনি। নেতারা চলে যাওয়ার পর দুচার জন বাড়ির লোক সমবেদনা জানাতে এসেছিলেন। বললাম, একটু আগে ওদের সামনে সবাই মিলে প্রতিবাদ করলেন না কেন?

    তাদের একটাই উত্তর, গরীব মানুষ বাবু। যদি ওনারা কোনও ক্ষতি করে দেন।

    মুশকিল হল, যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আমরা কম বেশি এরকম ব্যবহারই পাব। আর গরীব মানুষেরাও চিরকাল গরীবই থাকবে। যারা ক্ষমতার শীর্ষে আছেন, তাঁরা সেটাই চান। গরীব মানুষের অনেক ভয়। সে প্রতিবাদ করার আগে হাজার বার ভাবে।

    পরের দিন লিখিত ভাবে মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধানকে ও স্থানীয় থানায় অভিযোগ জানাল হল। অভিযোগ পত্রটি লিখে মনের অশান্তি একটু কমা ছাড়া আর কিছুই কাজের কাজ হল না। সাপে কাটা রোগীটি সুস্থ হয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় তিনি আর তাঁর মা দুঃখ প্রকাশ করে বার বার ক্ষমা চাইছিলেন। কিন্তু তাতে ক্ষতে প্রলেপ পরার বদলে ক্ষত আরও বাড়ছিল।

    সব চিকিৎসকেরই এরকম বা এর চেয়েও খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। দিনের পর দিন এই সব ঘটনার সম্মুখীন হতে হতে অনেকেই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংগঠনের ছাতার তলায় গিয়ে কোনও রকমে পিঠ বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করেন। বাকিদের অবস্থা কহতব্য নয়। সারা জীবনের সুনাম একটি ঘটনাতেই ধুয়ে মুছে যায়। সংবাদ পত্রে সহকর্মীদের নাম হেডিং হতে দেখি। ফেসবুকে একদল গরীব(!!!) মানুষ তাঁর ট্রায়াল শুরু করেন। এই ট্রায়ালে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও উপায় নেই।

    চিকিৎসকদের ওষুধের কোম্পানি, ল্যাবরেটরির থেকে কমিশন পাওয়া ও তার বিনিময়ে অনৈতিক ওষুধ ও টেস্ট লেখা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, চিকিৎসকদের মধ্যে বেশ কিছু ব্লাকশিপ আছে। কিন্তু শুধু চিৎকার চ্যাঁচামেচি না করে সরকার চাইলে অনেক আগেই এগুলো বন্ধ করতে পারত। দরকার হলে সেই সব ব্লাকশিপের বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নিতে পারত। জেনেরিক নামে ওষুধ লেখার যে আইন হয়েছিল, তা মানা হচ্ছে কিনা এবং উন্নত জেনেরিক ওষুধ কমদামে আদৌ পাওয়া যাচ্ছে কিনা দেখার দায়িত্ব সরকারেরই ছিল।

    করোনার আবহে চিকিৎসকদের বেশ একটা হিরো ইমেজ তৈরি করা হয়েছে। এবং বলতে নেই সেটা রাজনৈতিক স্বার্থেই। চিকিৎসকরা কেউই ভগবানও হতে চায়না, কেউ শয়তানও হতে চায় না। তারাও আপনার মতো স্ত্রী, পুত্র, কন্যাকে নিয়ে শান্তিতে জীবন কাটাতে চায়। তারা চায়, সকলের জন্য স্বাস্থ্যের অধিকার। রোগী অর্থের অভাবে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন, এই ঘটনা কোনও চিকিৎসককেই খুব একটা খুশি করে না।

    জানিনা করোনার মহামারী আর কতদিন চলবে। জানিনা লকডাউন তোলার সাথে সাথে আবার মহামারী নতুন করে ফিরে আসবে কিনা। জানিনা আর কতজন স্বাস্থ্য কর্মীকে ইচ্ছের বিরুদ্ধেও শহীদ হতে হবে।

    তবে প্রতিদিনই রোগী দেখতে দেখতে বুঝতে পারছি, অনেক মানুষই অর্থনৈতিক ভাবে এবং মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন। পরবর্তী কালে আমাদের হয়তো অন্য আরেক মহামারীর সম্মুখীন হতে হবে।
    ~~~~

    করোনার দিনগুলি #২৮

    গুজবে কান দিন

    গুজব কানে শোনার জিনিস। কানের সোনার জিনিসের মতই আকর্ষণীয়। গুজব ছড়িয়ে পড়লে মহামারী হয়, আবার মহামারী ছড়িয়ে পড়লে গুজব হয়। গুজবের মহামারী এবং মহামারীর গুজব দুটোই এই তুচ্ছ জীবনে দেখে ফেলেছি।

    যেখানে আমার সরকারি চাকরির প্রথম পোস্টিং, সেই খড়গ্রাম ছিল গুজবের আঁতুড় ঘর। সাড়ে তিন বছরে তেত্রিশটা গুজবের মহামারী দেখেছি।

    তার মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত ও অশ্লীল গুজব ছিল 'কোরো'। বারো থেকে বিরাশি বছরের পুরুষেরা দলে দলে হাসপাতালে আসছেন। তাঁদের বদ্ধমূল ধারণা গোপনাঙ্গটি আস্তে আস্তে দেহের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষই আসছেন আপত্তিকর অবস্থায়। লুঙ্গি বা পাজামার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে অঙ্গটি চেপে ধরে আছেন। যেন ছাড়লেই সেটা ফট করে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।

    ধর্ম-টর্মের বর্ম ভেঙে পড়েছে। হিন্দু- মুসলমান কপালে, বুকে চুন লেপে পঁচা ডোবার কোমর জলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গল্প করছেন।

    'বুঝলে ঘোষদাদা, সবে শাদী-শুদা করেছি। এখন যদি যন্ত্রপাতিতে গণ্ডগোল হয়ে যায়, তাহলে বাড়িতে আগুন জ্বলবে। কিন্তু দাদা, তুমি তো দুই ছাওয়ালের বাপ, তুমি পানিতে কেন?

    ঘোষ রেগে বলছেন, 'ওরে বেয়াদপ, অন্যেরটার দিকে না তাকিয়ে নিজের যন্ত্রের দিকে নজর দে। একমনে আয়াতুল কুরসি পড়।'

    সেই খড়গ্রামের পাট কবেই চুকে বুকে গেছে। ধেড়ধেড়ে গ্রাম থেকে উত্তমগ্রামের পরিবর্তে মধ্যমগ্রামে ফিরে এসেছি। সরকারি চাকরির পাটও চুকেছে। সারাদিন খুপরিতে ঘুরে ঘুরে রোগী দেখে সংসার চালাই।

    দিব্যি চলছিল। কিন্তু হঠাৎ হাজির হল আমাদের মতো দিন আনা দিন খাওয়া ডাক্তারদের চিন্তার কারণ 'করোনা মহামারী', চীন তার কারণ।

    যে দেশই কারণ হোক, করোনা মহামারী কোনো দেশকেই ছাড় দিচ্ছে না। একমাত্র রঙ্গে ভরা বঙ্গদেশেই একটু যা দিশেহারা। বেশ কিছু মানুষকে মারতে সক্ষম হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রেনাল ফেলিওর, ইশ্চেমিক হার্ট ডিজিজ, সিভিয়ার ডায়াবেটিস (এটা কি বস্তু জানিনা) কৃতিত্ব নিয়ে যাচ্ছে।

    আমাদের মতো খুপরি জীবি চিকিৎসকদের অবস্থা শাঁখের করাত। রোগী দেখলেও মরব, না দেখলেও মরব। মরতে যখন হবেই, শহীদের মৃত্যুই ভালো। বোতল থেকে, ইয়ে... স্যানিটাইজারের বোতল থেকে সাহস সঞ্চয় করে রোগী দেখতে থাকলাম। এবং রোগীর সাথে সাথে গুজবও দেখতে থাকলাম।

    প্রথম জনতা কারফিউ এর দিন শুনলাম দুপুর রোদে ছাদে দাঁড়াতে হবে। এরোপ্লেন থেকে এন্টিভাইরাস ছড়ানো হবে। তারপর শুনলাম, থালা বাজানোর ভায়েব্রেশনে ভাইরাস ধ্বংস হয়ে যায়। এও শুনলাম প্রতি ঘন্টায় গরম জলে চুমুক লাগালে করোনার জলাঞ্জলি হয়।

    ওষুধ নিয়ে তো নিত্যনতুন গুজব। তার ঠেলায় হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন বাজার থেকেই উধাও হয়ে গেছে। এজিথ্রোমাইসনও একই পথ অনুসরণ করত। কিন্তু বহুল পরিচিত ওষুধ এবং প্রায় সব কোম্পানিই তৈরি করে বলে এখনো বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ইদানীং আবার গরীবের এন্টাসিড ফ্যামোটিডিনের দিকে সকলের নজর পড়েছে।

    আজ আমার খুপরিতে পেটে ব্যথা নিয়ে একজন মাঝ বয়সী বউ এসেছিলেন। পেট টিপে টুপে মনে হল সাধারণ বদহজম। বললাম, 'উল্টোপাল্টা খেয়েছিলেন নাকি?'

    উনি রীতিমতো ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, 'উল্টোপাল্টা কি খাব? খাচ্ছি তো রেশনের চাল, ডাল আর আলু সেদ্ধ। কোনদিন ভাগ্যে থাকলে ডিমের ঝোল। বর সোনার কাজ করতো। দেড় মাস কাজকর্ম নাই।'

    বললাম, 'তাহলে পেটে ব্যাথা হল কেন?’

    'সেটা জানলে আপনার কাছে আসবো কেন? এই অকালে খামোখা আপনাকে ভিজিট দেবো কেন? নিজের চিকিৎসা নিজেই করতুম।'

    আমি এবার পেটটা বাজিয়ে দেখবো বলে হাত বাড়াচ্ছি, হঠাৎ উনি চিৎকার করলেন, 'রসুন।'

    আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে হাত সরালাম। উনি আমাকে থামতে বলছেন কেন? পেট টিপে বুঝিনি বলেই তো বাজাতে চাইছিলাম। কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম, 'ইয়ে... আমাকে থামতে বলছেন?'

    রোগিনী একগাল হেসে বললেন, 'না না, সকালে খালি পেটে দুইখানা কাঁচা রসুন চিবিয়ে খেয়েছিলুম। তারপর থেকেই পেটে ব্যথা।'

    'রসুন?'

    'হ্যাঁ, ওই যে রসুন খেলে ভেতর থেকে কি একটা বেড়ে যায় না, যেটা করোনার সাথে লড়ালড়ি করে....'

    'ইমিউনিটি?’

    'হ্যাঁ, হ্যাঁ... ঐটে বাড়ানোর জন্যই খেয়েছিলাম কাঁচা রসুন।'

    আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, 'আর শুতে হবে না, এবার উঠে বসুন।'
    ~~~~

    করোনার দিনগুলি #২৯

    দোকান খুলে গেছে

    লকডাউনে ফাঁকা সোদপুর রোড প্রায় বাপের রাস্তা হয়ে গেছিল। আজ সেই বাপের রাস্তায় বাপ বাপ বলে চোখে সর্ষেফুল দেখলাম। বাপের রাস্তায় বাপকে কেন স্মরণ করতে হলো জানতে হলে খুপরিজীবি চিকিৎসকের আজকের অভিজ্ঞতা পড়তে হবে।

    সাত সকালে সোদপুরের খুপরিতে রোগী দেখতে যাচ্ছিলাম। আকাশে জম্পেশ মেঘ রোদ্দুরের খেলা চলছে। অনেকটা কোলাইটিসের ব্যাথার মত। এই পেট টেট কামড়ে বেগ আসছে, আবার পর মুহূর্তেই পরিষ্কার।

    দিব্যি স্কুটার চালাচ্ছিলাম। হুঁ হা ফাঁকা রাস্তা। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, উল্টো দিক থেকে একটা বাইক মাতালের মত টাল খেয়ে ঘাড়ে এসে পড়ল।

    স্কুটার সমেত ভূমি শয্যা নিলাম। অন্য সময় হলে লোকজন ছুটে আসতো। জল ঢেলে চুপচুপে করে দিত। করোনার কল্যাণে দুটো কুকুর ছাড়া কেউ এগিয়ে এল না। কুকুর হয়তো গায়ে জল দেয় না, কিন্তু জলাতঙ্ক দেয়।

    অতএব উঠে পড়লাম। বাঁ পাটা মচকেছে। বাঁ হাঁটুর কাছে জ্বালা করছে। বাঁ হাত একটু ছুলেছে।

    বাইকের আরোহীও উঠে দাঁড়িয়েছে। পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের ছোকরা। বললাম, 'এটা কি হল?'

    'ইয়ে দাদা, হিক... অত্যন্ত ছোট ঘটনা। হিক... ভুলে যাও। ডান-বাম গুলিয়ে গেছিল। আসলে অনেকদিন পর পেটে পড়েছে তো। হিক.... এই দেখো আমারও কেটে গেছে। শোধবোধ।'

    বললাম, 'বড় কিছুও তো হতে পারতো। এই অবস্থায় কেউ বাইক চালায়?'

    'দাদা গো, বাইক চালাচ্ছিলাম কে বলল। আমি তো হেলিকপ্টারে উড়ছিলুম। আর ওই ওড়াটুকুর জন্যই তো কালকে চার ঘন্টা লাইন দিয়েছিলুম। তোমার পায়ে লেগেছে? কেটে গেছে? দাঁড়াও, একটু রাম ঢেলে দি।'

    বললাম, 'থাক থাক, পায়ে আর রাম ঢালতে হবে না। এমনিতেই পাপী তাপী মানুষ, পাপ আর বাড়িও না।'

    ছেলেটি অবাক ভাবে বলল, 'পায়ে কেন রাম ঢালব?পায়ে কেউ রাম ঢালে? ছি ছি... মুখ হাঁ কর, গলায় ঢেলে দি।'

    বললাম, 'রাম আমি খাই না।'

    'বাঁচালে, তাহলে নষ্ট করে লাভ নেই। আমিই খাই।'

    সে জামার ভিতর থেকে একটা প্লাস্টিকের বোতল বার করল। তার মধ্যের কালো তরল দু ঢোঁক খেল। বোতল আবার জামার মধ্যে ঢুকিয়ে আমার স্কুটার ধরে টানাটানি শুরু করল।

    বললাম, 'এটা আমার স্কুটার। তোমারটা ওখানে উল্টে আছে।'

    'ওহ সরি, ভেরি মাচ সরি, এক্সট্রিমলি সরি।'

    আমি স্কুটার সোজা করে স্টার্ট দিলাম। এবার থেকে খুব সতর্ক হয়ে চালাতে হবে। গতকাল থেকে লক ডাউন উঠে গেছে। ভুল বলে ফেললাম! লক ডাউন ওঠেনি, মদের দোকান খুলে গেছে।
    ~~~~

    করোনার দিনগুলি #৩০

    মিথ্যে

    বাড়িতে রোগী দেখছিলাম। হঠাৎ একজন মাঝ বয়সী মহিলা দরজা ফাঁক করে মুখ বাড়ালেন। বললেন, ‘ডাক্তারবাবু, আমার মেয়েটাকে যদি আগে দেখে দেন। অবস্থা খুবই খারাপ।’

    আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট সঞ্জয়দা ভেঙে যাওয়া ওজন মাপার যন্ত্রটা ঠিক করার চেষ্টা করছিল। খ্যাঁক খ্যাঁক করে তেড়ে গেল, ‘একি, আপনি এভাবে লাইন ভেঙে দরজায় উঁকি দিচ্ছেন কেন? আপনার মাস্ক কোথায়? মাস্ক পরে আসেননি কেন? বাইরে চলুন।’

    মহিলা কাঁচুমাচু মুখ করে বললেন, ‘যদি একটু আগে দেখে দেন? কেমন নেতায়ে পড়েছে?’

    সঞ্জয়দা বলল, ‘এখানে যে কজন আছে সকলেরই এমারজেন্সি। লক ডাউনের সময় এমারজেন্সি ছাড়া কেউ দেখাতে আসে না। আপনি আগে বাইরে চলুন।’

    খানিকক্ষণ বাদে সঞ্জয়দাই এসে বলল, ‘দাদা, ওনার কেসটাই আগে দেখে দিন। আমার খুব একটা ভাল লাগছে না।’

    মহিলা একটি বছর পনেরোর মেয়েকে ধরে ঘরে ঢুকলেন। বাচ্চা মেয়েটি প্রতিটি পা ফেলার সময় যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে ফেলছে। বললাম, ‘কি হয়েছে?’

    ‘আজ্ঞে ডাক্তারবাবু, কটাদিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। ভেবেছিলাম সেরে যাবে। কিন্তু অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে।’

    ‘কতদিন জ্বর?’

    ‘তা মাস খানেক হবে।’

    ‘আশ্চর্য, মাসখানেক ধরে জ্বর। আর আপনি বাড়িতে চুপ চাপ বসে রয়েছেন?’

    ‘কি করব ডাক্তারবাবু? এর বাবা দিল্লীতে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। মার্চ মাস থেকে টাকা পাঠাতে পারেনি। বাড়িতে অসুস্থ শাশুড়ি আছেন। তাঁরও এখন তখন অবস্থা। তাছাড়া এর একটা ছোটো ভাইও আছে। মধ্যমগ্রাম হাসপাতালে গেছিলাম। বলল বেলেঘাটায় গিয়ে করোনার জন্য পরীক্ষা করাতে।’

    বাচ্চা মেয়েটিকে ভালো করে দেখলাম। চোখের পাতা টেনে দেখলাম কাগজের মতো সাদা। শরীরে রক্ত নেই। মেয়েটির সারা শরীরে ব্যথা। বুকের মধ্যিখানে আলতো করে চাপ দিলাম। তাতেই ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল।

    মেয়েটির গলায় ও বগলে অনেকগুলি লিম্ফগ্লান্ড ফুলেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এগুলো কদিন ধরে দেখছেন?’

    মহিলা উত্তর দিলেন, ‘তাও সপ্তাহ দুয়েক হবে। মাঝে মধ্যে ওর মাড়ি দিয়েও রক্তও পড়ছে।’

    বললাম, ‘রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। আর্জেন্ট।’

    ‘ডাক্তারবাবু, খুব খরচ হবে কি?’

    এবার মাথা গরম হল। বললাম, ‘দেখুন, আপনার মেয়ে যখন তখন কিছু দায়িত্ব তো আপনাকে নিতেই হবে। ওর যা অবস্থা, পরীক্ষা অনেক করা উচিৎ। আপাতত এটুকুই করুন। দেড়শ টাকার মধ্যে হয়ে যাবে।’

    পরেরদিন ওই ভদ্রমহিলা রিপোর্ট নিয়ে এলেন। হিমোগ্লোবিন ৪.৫ গ্রাম/ডেসিলি। টোটাল কাউন্ট অনেক বেশি। ব্লাস্ট সেলে ভর্তি। রক্তে প্লেটিলেটও খুব কম। রিপোর্ট দেখতে দেখতে মনটা খারাপ হচ্ছিল।

    মহিলা আমার দিকে হাঁ করে চেয়ে আছেন। রিপোর্ট থেকে চোখ সরাতেই বললেন, ‘কেমন দেখলেন ডাক্তারবাবু?’

    বললাম, ‘রিপোর্ট ভালো নয়। আমার করার কিছু নেই? ইমিডিয়েট বড় জায়গায় দেখাতে হবে।’

    ‘আমি একা মেয়ে মানুষ। কোথায় নিয়ে যাব? আপনি একবার চেষ্টা করে দেখেন।’

    দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘আমার চেষ্টার বাইরে চলে গেছে। ওর সম্ভবত লিউকেমিয়া হয়েছে। লিউকেমিয়া বোঝেন? ব্লাড ক্যানসার।’

    বলামাত্রই মহিলাটি ঝপ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। সঞ্জয়দা এবং একজন মহিলা রোগিণীর সাহায্যে ওনাকে শোয়ালাম। পা উপরে করে কিছুক্ষণ ধরে থাকতেই জ্ঞান ফিরে এল। ভালো করে কাউন্সিলিং করলাম। বললাম, ‘এই ধরণের লিউকেমিয়ার চিকিৎসা আছে। এনআরএস হাসপাতালের হেমাটোলজি ডিপার্টমেন্ট খুব ভালো। ওখানে নিয়ে গেলে আপনার মেয়ে নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে যাবে।’

    কিছুটা হয়ত বাড়তি আশ্বাসই দিলাম। মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘সবই আমার কপাল ডাক্তারবাবু। ওদের বাবা দিল্লীতে আটকে আছে। জানিনা ওখানে কি খাচ্ছে, কোথায় থাকছে। ও মেয়েটাকে খুব ভালবাসত। হাতে টাকা পয়সা নেই। আমি যে কি করব?’

    এই লকডাউনের সময় এরকম বিলাপ এত শুনছি, যে আলাদা ভাবে আর মনে রেখাপাত করে না। আমার সুক্ষ অনুভূতি অনেকদিন ধরেই ভোঁতা হতে শুরু করেছে। সংবেদনশীল কারো পক্ষে এসময় নিয়মিত রোগী দেখা অসম্ভব। সারাদিন মানুষের অসহায়তা নিজের চোখে দেখার পর কোনো রাত্রেই সে ঘুমাতে পারবে না। চারিদিকে বর্ম পরে থাকা স্বত্বেও আমার ভেতরটা একটু কেঁপে গেল। কি করব? আমিও যে দুটো ছোটো মেয়ের বাবা।

    পরের দিন মহিলা আবার এসে হাজির। একটা ব্যবস্থা হয়েছে। ওনার স্বামীর এক বন্ধুর অটো আছে। তিনি ওনাকে মেয়ে সহ এনআরএস হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। আমাকে প্রেসক্রিপশন প্যাডে লিখে দিতে হবে, মেয়েটিকে এনআরএস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরী দরকার। রাস্তায় পুলিশে আটকালে কাজে লাগবে।

    মহিলা বললেন, ‘আরেকটা উপকার করবেন ডাক্তারবাবু? ওর বাবা মেয়ের শরীর খারাপ শুনে পাগলামো করছে। বলছে যে করেই হোক বাড়ি আসবে। দরকার হলে দিল্লী থেকে হেঁটে ফিরবে। আমার কোনও কথা শুনতে চাইছে না। আপনি ওর সাথে একবার কথা বলবেন? আপনি ভয়ের কিছু নেই বললে ও বিশ্বাস করবে।’

    মহিলা স্বামীকে ফোন করে আমাকে ধরিয়ে দিলেন। ওপাশ থেকে কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। ‘আমার মেয়ের কি হয়েছে ডাক্তারবাবু? ওকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে কেন?’

    অকম্পিত স্বরে বললাম, ‘চিন্তা করার কিছু নেই। সাধারণ নিউমোনিয়া হয়েছে। কয়েকদিনেই সুস্থ হয়ে যাবে।’

    মহিলা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এত শান্ত ভাবে ভয়ঙ্কর মিথ্যে বলতে সম্ভবত তিনি আগে শোনেননি। ফোনটা ফেরত দিলাম।

    চিকিৎসকরা প্রচুর মিথ্যে বলতে পারেন। সম্ভবত নেতা, মন্ত্রীদের চেয়েও বেশি। আমি জানি না, ঐ মেয়েটির বাবা বাড়ি ফিরে নিজের মেয়েকে আর দেখতে পাবেন কিনা? না পেলে আমাকেই সবচেয়ে বেশি অভিশাপ দেবেন। তবু আমরা হামেশাই মিথ্যে কথা বলি। লিভার ক্যান্সারের রোগিকে বলি, ‘কিচ্ছু হয়নি আপনার। লিভারে সামান্য সমস্যা।’ ডায়ালেটেড কার্ডিও মায়োপ্যাথির রোগীকে বলি, ‘কোনও চিন্তা করবেন না। শুধু একটু সাবধানে থাকবেন। ওষুধ পত্র ঠিক ঠাক চালাবেন। সুস্থ হয়ে যাবেন।’ এবং শেষ পর্যন্ত মিথ্যাটা মিথ্যাই থেকে যায়। বারবার বিপদে পরি। কিন্তু এছাড়া কিই বা করার আছে আমাদের।

  • বিভাগ : আলোচনা | ০৬ জুন ২০২০ | ১৮৫১ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | 14.139.196.11 | ০৬ জুন ২০২০ ২৩:৩৬94060
  • এই সিরিজটার জন্যে বসে থাকি। ধন্যবাদ ঐন্দ্রিল।
  • aranya | 162.115.44.102 | ০৭ জুন ২০২০ ০৭:২৮94069
  • আমিও অপেক্ষায় থাকি। ঐন্দ্রিল-কে কি আর বলব, keep up the good work। এই দুর্দিনে আপনার মত মানুষই ভরসা
  • একলহমা | ০৯ জুন ২০২০ ০৪:১২94143
  • কোন কিছু বলার মত যোগ্যতা নেই আমার।

  • বিপ্লব রহমান | ১০ জুন ২০২০ ২৩:৫৪94212
  • এমন লেখার জন্যই গুরুতে আসি। 

    সেল্যুট করোনা শহীদ  ডাক্তার সাইমন 

  • সনাতন মন্ডল | 45.9.250.68 | ১১ জুন ২০২০ ০০:৩৩94213
  • জয় মা মঙ্গলচন্ডী 
    রক্ষা কোরো সবাইকে মা 

  • avi | 2409:4061:9c:e499:7f76:cebd:e08e:47d | ১১ জুন ২০২০ ০১:০৯94215
  • টেরিফিক।

  • Du | 47.184.21.53 | ১১ জুন ২০২০ ০৫:৪৩94216
  • ভগবান। ঃ((
  • ঐন্দ্রিল | 2409:4060:9f:246f::2f3:50a0 | ১৩ জুন ২০২০ ২১:২৫94274
  • ধন্যবাদ সকলকে

  • শঙ্খ | 103.242.189.100 | ২৮ জুন ২০২০ ২৩:৫২94694
  • সব লেখাগুলিই একত্রে পড়ে ফেললাম, অসম্ভব ভালো প্রসাদগুণ, একটানে তরতরিয়ে পড়ে ফেলা যায়, আর তারপর বুকের মধ্যে একটা মোচড় লাগে। কি অসহায় আমরা, সত্যিই! এগুলো এই সময়ের একেকটা দলিল। আপনাদের মত যাঁরা এই সময়ে সবরকমের বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়েও অসহায় মানুষগুলির পাশে দাঁড়িয়ে লড়ে যাচ্ছেন, অপ্রতুল পরিকাঠামো নিয়েই, সুমন সেই কবেই লিখেছিলেন, যে যেখানে লড়ে যায়, আমাদেরই লড়া।

    স্যালুট!
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত