• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্বাস্থ্য  শনিবারবেলা

  • করোনার দিনগুলি - সপ্তদশ কিস্তি

    ঐন্দ্রিল ভৌমিক
    ধারাবাহিক | স্বাস্থ্য | ২৯ আগস্ট ২০২০ | ১১৩৩ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • করোনার দিনগুলি #৫৬

    বড়লোক


    টাকা থাকলেই বড়লোক হওয়া যায় না। বড়লোক হওয়ার জন্য বড়ো হৃদয়ও দরকার। এমনকি টাকা পয়সার অভাব থাকা স্বত্বেও শুধু হৃদয়ের জোড়েও বড়লোক কম দেখলাম না, এই অতিমারির সময়ে।

    যদিও আমার দেখার দুনিয়াটা খুব ছোট্ট। আমি একজন খুপরিজীবী চিকিৎসক। সাত সকাল থেকে রাত দুপুর অবধি স্কুটারে চড়ে খুপরিতে খুপরিতে ঘুরে ঘুরে রোগী দেখে বেড়াই।

    প্রাকৃতিক শোভা, গাছ পালা, পশু পাখি এসব আর দেখা হয়ে ওঠেনা। সারাদিন ধরে মানুষ দেখি। সুস্থ মানুষও নয়। অসুস্থ মানুষ। রোগের কারণে যাদের বেশিরভাগেরই মন মেজাজ খারাপ। তবু তার মধ্যেই কতো গল্প জন্ম নেয়। সময়ের অভাবে সেসব লেখা হয়ে ওঠেনা। কতো গল্প হারিয়ে যায় চিরকালের মতো।

    আজ যেমন, বাড়ির চেম্বারে শেষ রোগী দেখে মাস্কের আড়ালে বড়ো একটা শ্বাস ফেললাম। বাড়িতে সংগ্রাম শেষ। বারান্দায় বেরিয়ে দেখি, এক স্বামী- স্ত্রী তাদের ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে বসে আছে।

    বললাম, এতো দেরী করে এসেছেন কেন? কটা বাজে? এর পরেও আমার একটা চেম্বার আছে। সেখানে পৌঁছাতে দেরী হয়ে যাবে। তাছাড়া এটুকু বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন কেন? এখানে রোজ গাদা গাদা জ্বরের রোগী আসছে।

    স্বামীটি বলল, ডাক্তাররবাবু, আমরা দেখাতে আসিনি। আপনাকে ভিজিট দিতে এসেছি?

    আমি অবাক হয়ে বললাম, মানে? না দেখিয়েই শুধুশুধু ভিজিট দেবেন কেন?

    স্বামীটি বলল, লকডাউনের মধ্যে বউয়ের ভীষণ পেটে ব্যথা হয়েছিল। আমি জোগাড়ের কাজ করি। সেসময় কাজ ছিলনা। আপনাকে দেখিয়েছিলাম। কিন্তু টাকা দিতে পারিনি। আজ সাতদিনের টাকা একসাথে পেয়েছি। প্রথমেই আপনার কাছে এসেছি। এরপর বাজারে গিয়ে মাছ কিনব, তেল কিনব। আর ছেলেকে বেলুন কিনে দেব।

    আমি নিতে চাইনা, ওরা জোরাজুরি করে। আমি অবাক হয়ে ওদের চোখে খুশি দেখি। কে বলেছে ওরা গরীব? এই দীর্ঘ লকডাউন, এই অতিমারি ওদের মারতে পারেনি, এমনকি ওদের জীবনের ছোটোছোটো খুশি গুলোও কাড়তে পারেনি। পারবেও না।

    একটি পনেরো বছরের ছেলেকে দেখছিলাম। জ্বর, সর্দি, কাশি। ওষুধপত্র লিখে রোগীর বাবাকে বললাম, কালকেই করোনার জন্য পরীক্ষা করিয়ে নিন। সরকারি হাসপাতালে এখনতো বিনা পয়সায় পরীক্ষা হচ্ছে।

    ছেলেটির বাবা বলল, কাল ওর জন্মদিন। কি যে সময় এলো। জন্মদিনের সকাল হাসপাতালে লাইন দিয়ে কাটবে। তারপর একটা পাঁচশ টাকার নোট বার করে আমাকে দিল।

    আমি ভিজিট রেখে বাকি টাকা ফেরত দিচ্ছিলাম, ছেলেটির বাবা বলল, ডাক্তারবাবু, দয়া করে টাকাটা রেখে দিন। সবার তো দেওয়ার ক্ষমতা নেই। আমার ছোট্ট একটা মুদির দোকান আছে। লকডাউনে লোকজনের অবস্থা নিজের চোখে দেখেছি। তেমন কয়েকজনকে যদি পয়সা না নিয়ে দেখে দেন। ক্ষমতা থাকলে আরও দিতাম।

    আমি কিছুতেই নেব না। আর ছেলেটির বাবা দুহাত জোর করে দাঁড়িয়ে আছে। বলছে, আমি গরীব ডাক্তারবাবু, কিন্তু আমারও তো কিছু করতে ইচ্ছে করে।

    গরীব? কে গরীব? যে তার সীমিত সাধ্য নিয়েও এই অকালে অন্যের পাশে দাঁড়াতে চাইছে? নাকি গরীব তারা, যারা এই মহামারীর সময়েও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়াচ্ছে?

    আমরা যখন কয়েকজন বন্ধু মিলে টাকা তুলে লকডাউনের সময় ক্লাবের পক্ষ থেকে একটা রিলিফ ফান্ড শুরু করেছিলাম, তখন ভাবতেও পারিনি এতো মানুষ পাশে এসে দাঁড়াবে। শুধু অর্থ নয়; চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি দিয়েও আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে চেনা অচেনা বহু মানুষ। মেডিক্যাল ক্যাম্পগুলির জন্য না চাইতেই অর্থ সাহায্য পেয়েছি। কেউ আমাদের কাছে হিসেব দেখতে চায়নি। আমাদের বিশ্বাস করে দিয়েছে।

    আর এই বিশ্বাসটুকুই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠবে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে আমরা জিতবই শুধু নয়, আমরা ইতিমধ্যেই অনেকটা লড়াই জিতে গেছি।

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৯ আগস্ট ২০২০ | ১১৩৩ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • শিবাংশু | ২৯ আগস্ট ২০২০ ১০:৫৮96741
  • নিরাশা হয়ে পড়লে এই মানুষদের গল্পই আমি লিখতে চাই ...
  • মৌমিতা | 2409:4061:12:63e3:f3eb:8b8d:d264:6584 | ২৯ আগস্ট ২০২০ ১৭:৫০96760
  • চোখ এ জল এলো

  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২৯ আগস্ট ২০২০ ২০:২৫96765
  • আপনারা তো জানেন আমি আশার ভলান্টিয়ার। এটা USবেসড সংস্থা, ডলারে ডোনেশন নেয়। আম্পানের পরে আমি এই মেলটা পেয়েছিল্লাম। কোভিড চলছে, লোকের চাকরি নেই।

    The donation amount was provided by mistake as I am from India and I had no idea it was written in dollar as I was donating from India and the amount written was 500. I realized this only after payment as even there was no OTP as it's from India. Please try to understand my situation. My monthly income is 15000 INR and the amount was all the savings I had with me. I will not survive even for a day now. I have lost everything. Please refund my amount excluding 500 INR as I won't be able to survive in these difficult times.

    সেই মুজতবা আলি একবার লিখেছিলেন না, মাথা কর নত?
  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২৯ আগস্ট ২০২০ ২০:৪৯96766
  • আর হ্যাঁ উনি ব্যাঙ্গালোর থেকে লিখেছিলেন। বাকিটা বুঝে নিন। ডাক্তারবাবু ঠিকই লিখেছেন শুধু হৃদয়ের জোরেও বড়লোক কম দেখলাম না।

    "আমার মতে জগৎটাতে ভালোটারই প্রাধান্য--
    মন্দ যদি তিন-চল্লিশ, ভালোর সংখ্যা সাতান্ন।"
  • | ২৯ আগস্ট ২০২০ ২১:২২96767
  • অন্য কারেন্সি ট্র্যান্স্ফারের ক্ষেত্রে ওটিপি চায় না, রেজিস্টার্ড কার্ড থেকে সোজা কেটে নেয়। আমি আমাজন ডট কম বা আমাজন ডট কো ডট ইউকে থেকে কেনাকাটি করতে গিয়ে দেখেছি।
  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২৯ আগস্ট ২০২০ ২২:৩৩96769
  • দমুদি, ভদ্রমহিলা পাঁচশ টাকার বদলে ভুল করে পাঁচশ ডলার ডোনেট করে ফেলেছিলেন। উনি পরে ইমেলে লিখেছিলেন যে ওনার মাসিক আয় পনের হাজার ভারতীয় টাকা (তাও ব্যাঙ্গালোরে বসে)। যে পরিস্থিতিতে ডোনেট করেছিলেন তখন ওনার নিজের আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ ছিল। ঐন্দ্রিলবাবু যেমন লিখেছিলেন সেই রকম আর কি।
  • | ২৯ আগস্ট ২০২০ ২২:৪০96770
  • হ্যাঁ অভ্যু সেটা পড়লাম তো। উনি ওটিপি পান নি লিখেছেন সেই প্রসঙ্গে বললাম। ওটিপিটা একটা বড় সেফগার্ড তো। এক্ষেত্রে বোঝার আগেই ট্র্য্যানসফার হয়ে গেছে।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত