• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্বাস্থ্য  শনিবারবেলা

  • করোনার দিনগুলি - দ্বাবিংশতিতম কিস্তি

    ঐন্দ্রিল ভৌমিক
    ধারাবাহিক | স্বাস্থ্য | ১০ অক্টোবর ২০২০ | ১২২০ বার পঠিত
  • ৪.৫/৫ (২ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • করোনার দিনগুলি #৬৪
    ক্লান্তি


    রোগীর চাপে বাকি সব কিছু মাথায় উঠেছে। সকাল থেকে রাত অবধি রোগী দেখছি। তাও সামলাতে পারছি না।
    সামলানোর জন্য নাম লেখার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। তাতে রোগীরা দুই তিন দিন পরে তারিখ পাচ্ছেন। কিছু কিছু রোগীর অবস্থা খারাপ। দু-তিন দিন দেরি করলে এ জীবনে ডাক্তার দেখানোর সুযোগ আর নাও পেতে পারেন। তারা অনেকেই নাম ছাড়াই চলে আসছেন।
    এই এমার্জেন্সি রোগীদের নিয়ে ঝামেলা বাঁধছে। আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট সঞ্জয়দার গলা মাঝে মাঝেই চড়ছে। 'আপনি তো মশাই দিব্যি গটগট করে হাঁটছেন। আপনার কিসের এমার্জেন্সি?'
    'আমার কাল থেকে ঘন ঘন হাই উঠছে।'
    সঞ্জয়দা বলল, 'হাই তোলাও যদি এমার্জেন্সি হয়, তাহলে তো সবই এমার্জেন্সি। কোমরে ব্যথা, সর্দি জ্বর, পায়ে ঝিঁ ঝিঁ, ঘুম না হওয়া- কেউই আর নাম লিখবেন না।'
    ভদ্রলোকের গলা পেলাম, 'হাই কেন ওঠে জানেন? কোন আইডিয়া আছে আপনার? মাথায় অক্সিজেন কম গেলে হাই ওঠে। মাথায় অক্সিজেন কম যাওয়া এমার্জেন্সি নয়? অক্সিজেনের অভাবে আমার মস্তিষ্কের কোষের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে জানেন?’
    সঞ্জয়দা বলল, 'দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে নয়- আমার ধারণা ইতিমধ্যেই ক্ষতি হয়ে গেছে।'
    ভদ্রলোক কর্ণপাত করলেন না। বলেই চলেছেন, 'তাছাড়া গতবছর হাই তুলতে গিয়ে আমার চোয়াল লক হয়ে গেছিল। সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা।'
    সঞ্জয়দা বলল, 'আপনি আগে মাস্ক পরুন, তারপর বাকি কথা বলবেন।'
    'সে কি! আপনি জানেন না মাস্ক পরলে মাথায় অক্সিজেন কম যায়। এমনিতেই আমার অক্সিজেনের অভাব।'
    'মাস্ক ছাড়া আপনাকে ঢুকতে দেবো না।'
    বাইরে পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে চলেছে। আমি দীর্ঘশ্বাস চেপে রোগী দেখায় মন দিলাম।
    প্রায় সকলেই জ্বরের রোগী। এক পরিবারের আটজন দীঘা গেছিলেন। আটজনেরই জ্বর এসেছে। তাদের মধ্যে একটি যুবকের অবস্থা সুবিধার নয়। বুকের মধ্যে সাঁই সাঁই শব্দ হচ্ছে। কিছু খেলেই বমি করছে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন নব্বই শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
    অথচ আশ্চর্য জনক ভাবে বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য, বাহাত্তর বছরের মানুষটি সুস্থ আছেন। তাঁর সামান্য জ্বর আর গলা খুসখুস ছাড়া কিছু নেই। করোনা যে কার ক্ষেত্রে কি রূপ নেবে আগে থেকে বলা মুশকিল।
    এই মহামারীর মধ্যে দীঘা যাওয়ার জন্য ঝাড় দিলাম। যুবকটিকে কোথাও ভর্তি করতে বললাম।
    আর ভালো লাগছে না। সেই মার্চ মাস থেকে একটানা রোগী দেখে যাচ্ছি। সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা তবু ছুটি পান। আমাদের মতো খুপরিজীবী চিকিৎসকদের কোনো ছুটি নেই।
    লকডাউনের প্রথমদিকে রোগীর চাপ কম ছিলো। একটা যুদ্ধ যুদ্ধ আবহাওয়া ছিলো। খারাপ লাগছিলো না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত অবসাদে ডুবে যাচ্ছি।
    করোনার বাড়বাড়ন্ত অবসাদকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ এক মহা জ্বালা। যুদ্ধে গো হারান হেরে গেছি। তবু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। রোজই একাধিক পরিচিত চিকিৎসকের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাচ্ছি। একাধিক চিকিৎসক মারাও যাচ্ছেন।
    যে কোনো কারণেই হোক মৃত্যুহার আমাদের মত খুপরিজীবী চিকিৎসকদের মধ্যে অত্যন্ত বেশি। চিকিৎসক মৃত্যু হাফসেঞ্চুরি পেরিয়েছে। তার মধ্যে অন্তত চল্লিশ জন প্রাইভেট প্রাকটিশনার। সাধারণ মানুষের মধ্যে করোনায় মৃত্যু হার ২% এর কম, আর খুপরিজীবী চিকিৎসকদের মধ্যে ২০% এর বেশি।
    অবসাদ আরো বাড়ছে যখন দেখছি সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতারা কেউই চিকিৎসকদের কথায় পাত্তা দিচ্ছেন না। দিব্যি দল বেঁধে দীঘা- মন্দারমনি ঘুরতে যাচ্ছেন। মারামারি করে পুজোর বাজার করছেন। হইহই করে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি চলছে।
    এতদিন পুজো যতো কাছে আসতো, মনটা ততো ফুরফুরে হয়ে উঠতো। এবারে আতঙ্ক লাগছে। পুজোর পরে কি হবে জানিনা। দীর্ঘ সময় ধরে সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করতে করতে অধিকাংশ চিকিৎসকই ক্লান্ত। পুজোর পরে যে করোনার ঢেউ আসতে চলেছে, সেটা আটকানোর ক্ষমতা এই ক্লান্ত চিকিৎসক গোষ্ঠীর নেই। নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে কয়েকটা দিন বিশ্রাম দরকার। কিন্তু তা এই মুহূর্তে পাওয়া অসম্ভব।
    আবার নতুন রোগী ঢুকেছেন। ইনিও জ্বরে ভুগছেন। বললাম, 'আপনিও কি দীঘায় গেছিলেন?'
    'দীঘা...’ রোগী হাসলেন। 'ডাক্তারবাবু, একটা বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করতাম। লকডাউনের পর পরই কাজ চলে গেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে এখন ঘুরে ঘুরে মাছ বিক্রি করি। একটা কাজ জোগাড় করে দিতে পারেন। যে কোনো কাজ...’


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১০ অক্টোবর ২০২০ | ১২২০ বার পঠিত
  • ৪.৫/৫ (২ জন)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ১০ অক্টোবর ২০২০ ০৮:৪০98215
  • "এবারে আতঙ্ক লাগছে। পুজোর পরে কি হবে জানিনা। দীর্ঘ সময় ধরে সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করতে করতে অধিকাংশ চিকিৎসকই ক্লান্ত। পুজোর পরে যে করোনার ঢেউ আসতে চলেছে, সেটা আটকানোর ক্ষমতা এই ক্লান্ত চিকিৎসক গোষ্ঠীর নেই। " 

    এপারেও প্রায় একই চিত্র। খোদ প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, এই শীতে করোনার সেকেন্ড ওয়েব আসছে। এদিকে নূন্যতম স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ তো দূরের কথা, অধিকাংশের মাস্ক পর্যন্ত পরার বালাই নাই! 

    করোনা সংক্রান্ত এই একটি লেখাই নিয়মিত পড়ি। এবারের পর্বটি আকারে ছোট মনে হলো 

  • a | 220.245.195.208 | ১০ অক্টোবর ২০২০ ১৯:০৪98238
  • চিন্তিত ছিলাম ডাক্তারবাবুর লেখা না দেখে। অনেকদিন বাদে দেখে ভালো লাগল। 

  • π | ১১ অক্টোবর ২০২০ ১২:২০98269
  • "যে কোনো কারণেই হোক মৃত্যুহার আমাদের মত খুপরিজীবী চিকিৎসকদের মধ্যে অত্যন্ত বেশি। চিকিৎসক মৃত্যু হাফসেঞ্চুরি পেরিয়েছে। তার মধ্যে অন্তত চল্লিশ জন প্রাইভেট প্রাকটিশনার। সাধারণ মানুষের মধ্যে করোনায় মৃত্যু হার ২% এর কম, আর খুপরিজীবী চিকিৎসকদের মধ্যে ২০% এর বেশি।"

    এটা খুবই চিন্তার ব্যাপার!  খুপরিতে হাই আর লং এক্সপোজারের জন্য হচ্ছে নিশ্চয়।

    এবার এই কারণে বহু ডাক্তারবাবুই চেম্বারে বসছেন না, তার জন্য রুগীদের কী দশা হচ্ছে, তা নিয়ে ভুক্তভোগী। আবার না বসলে তো এই অবস্থায় কিছু বলাও যায়না। ক'জন ডাঃ ঐন্দ্রিল ভৌমিকের মত নিজের জীবনের এত রিসক নিয়েও বসবেন। আবার খুব কম ডাক্তার বসছেন বলে চেম্বারে প্রচণ্ড ভিড়, এরমধ্যে এত পজিটিভ লোকজন, সেখানে নিজেদের মধ্যেও তো সংক্রমণ ছড়ানোর ভয়! 

    এ পুরো ভিশাস সাইকেল! 

  • মৌমিতা | 2409:4061:69d:5022:af3e:a4f9:f30:445 | ১১ অক্টোবর ২০২০ ১৩:৪৩98272
  • ডাক্তারবাবু আরেকটু বড় লিখুন না। খুব ছোটো, মন ভরে না। যদিও বুঝি আপনার পরিশ্রম, ক্লান্তি। খুব ভালো লাগে আপনার লেখা পড়তে। আপনার আশে পাশের জায়গার মানুষের সৌভাগ্য।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন