• হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • নব বসন্তে

    Simool Sen লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৩৭৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • পেটি বুর্জোয়ার সংসারে হাওয়া বাইরে থেকেই আসে। আজ ২৭ ফেব্রুয়ারির সকাল, দিনকয়েক বাদে রোদ উঠেছে। আলতো গরম, বসন্তের অপ্রত্যাশিত আগন্তুক অকালস্নান মুলতুবি আপাতত। অবেলার ছুটি নিয়ে বসে আছি, একান্ত।

    হাওয়া বাইরে থেকেই আসে৷ একটা হাওয়া আসছে দিল্লি থেকে৷ ত্রাস, গুমরে ওঠা, রক্তবিদীর্ণ রাস্তা, অনন্ত ধ্বংসখানা থেকে একটি-দুটি করে পৃষ্ঠা কুড়িয়ে নেওয়া বালক। অন্য একটা পরিচিত হাওয়া আসছে দক্ষিণ থেকে: মলয় আসিয়া কহে গেছে কানে– যেমন বলেছে বরাবর– 'প্রিয়তম, তুমি আসিবে'।

    এই দুটোর মধ্যে কোনটা বেশি জরুরি? ১৯৭৮ সালে ভয়ঙ্করী বন্যার পর পশ্চিমবঙ্গের শাঁসালো কাগজে একটা আলস্যপ্রসূত বিতর্ক হয়েছিল শঙ্খ ঘোষ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ে। দ্বিতীয় জনের মত: বন্যা হল ঠিক্কথা, কিন্তু তার পরেও কালীপুজো এসছে, গোটা বাংলায় আনন্দরোশনাই, লোকে বাজি কিনছে, পটকা ফাটাচ্ছে: এ সব টুকরো কোলাজ মিলেজুলে কেবলই মনে করায়, ধ্বংসাতীত এক সত্য নিয়ত জাগরূক, আর মানুষের অভ্যেসই হল সেই সত্যের পথে আনন্দময় হেঁটে যাওয়া। শঙ্খবাবুর মত ছিল ভিন্ন, তিনি মানুষকে খুঁজছেন তার পারস্পরিক আন্তর্নির্ভর সম্পর্কে, তার সহমর্মিতায়, আলতো শুশ্রূষার ক্ষরণে। অতএব এই যে এত বাজি পুড়ল বন্যার পরেও, তার মধ্যে এক ধরনের কুশ্রী বীভৎসতা মজ্জাগত, অন্তর্লীন এক উৎকট অশ্লীল আড়ম্বর, যা তারস্বর, উগ্র। কোনটাকে ঠিক ধরব?

    চতুর্দিকে লোকে খালি বলে যাচ্ছে এই করতে হবে, ওই করতে হবে। আর আমার এই না-করাটা কি সত্যি নয়? পক্ষ যখন দুটো, একটা পক্ষ থেকে সচেতন দূরত্বই কি অবধারিত অন্য পক্ষের সদস্য করে দেয় না?

    মধ্যবিত্তের এই এক ধ্রুব ঘুরপাক। বিপ্লবে সে যাবে, না কি গার্হস্থ্যে যাবে। সংসারে সে টিকতে পারবে তো? না কি, ত্যাগ, বৈরাগ্য, আশ্রম? শিবরামকে ধার করে বলা যেত, তুমি আজ যোগবলে যাবে, না বলযোগে যাবে?

    দিনকয়েক আগে বুদ্ধদেব বসুর একটা লেখায় চোখ আটকে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেখা। শহুরে ভদ্রসন্তানরা কলকাতায় জাপানি বোমাবর্ষণের অজানিত আশঙ্কায় পাল পাল ছুটছেন গ্রামে ও মফসসলে। তার পর জাপান সত্যি বোমা ফেলল এক দিন। দিনমানে চোখ খুললেই খাকি উর্দির স্তূপ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সাঁজোয়া গাড়ির কুচকাওয়াজ৷ ধূলিমলিন, ক্লেদাক্ত, রক্তত্রস্ত সেই কলকাতার ভিড়ে বুদ্ধদেব বসুর নাগরিক বীক্ষণ বেছে নেয় কয়েকটি মুহূর্ত। এক: বসন্ত এসেছে অবশেষে। সন্ধেয় উৎকট মিলিটারি মার্চের সমান্তরালে আকাশে ভরা চাঁদের জোয়ার। জানলার পাশের রাধাচূড়ায় শীতের পরিত্যক্ত রুক্ষতাকে সরিয়ে আলতো, নির্ভার ফুলের স্তবক। বেপথু এবং রোমাঞ্চকর হাওয়া স্নান করাচ্ছে দূষিত শরীরময়। দুই, বড়রাস্তার ওপর প্যান শট ফ্রিজ করে যায়, নাগরিক আলোকবৃত্তের বাইরে থাকা মুচি জুতো সারাচ্ছে, একটি মেয়ে খিলখিল হেসে বসন্তের রোদ্দুর ছুয়ে চলে গেল, ফেরিওলা রোজকার মত গন্তব্যের দিকে হাঁক পেড়ে চলেছে। বর্তমানের অস্থির নান্দীরোলের মধ্যিখানে আপাত-বিস্মরণের প্রলেপ পড়ে, তখন এই প্রাত্যহিকীকেই মনে হয় শাশ্বত– যুদ্ধ তো কেবল নিমিত্তের দুর্ঘটনামাত্র।

    দিল্লির এই বীভৎসতা দেখতে দেখতে এটাই কেবল মনে হয়। বুদ্ধদেব বসু যে প্রতিবেশকে গাল পাড়েন, তা আসলে ইতিহাস৷ এই অবিশ্রাম ইতিহাস-প্রবাহের বিপরীতে কয়েকটা মুহূর্ত কুড়িয়ে পান তিনি রাস্তাঘাট থেকে। ইতিহাস-বিদ্দ্বিষ্ট আমরা কঁকিয়ে উঠি, তখন এই খণ্ড মুহূর্তগুলোকেই মনে হয় চিরন্তন। নিয়ত-র এই আশ্চর্য প্রতিভাস জেগে ওঠে, মনে হয়, ইতিহাস কেবল নৈরাশ্যের কারখানামাত্র, যুদ্ধ দাঙ্গা হত্যা তো তাৎক্ষণিকের– তার ও প্রান্তে জীবনের এই বিপুল উপচার, এই মেঘরোদ্দুরছায়া-র চক্রবৎ আসাযাওয়া, ওখানেই ইতিহাস-উত্তর জিয়নকৌটো জেগে আছে।

    আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি, ঈষৎ গরম, ফেসবুক-টিভি খুললেই দিল্লি, দিল্লি, দিল্লি। কে-না জানে, ব্যতিক্রমটাই কেবল খবর হয়ে ওঠে৷ অতিথি-র তারাপদকে জিগ্যেস করা যেত যদি? সে বলত, দিব্যি আছে, ওই তো কেমন আলতো স্পন্দনে নদীজল কেঁপে উঠছে, মর্মভেদী হাওয়া কেবলই ঘুরেফিরে আসছে, তার মন বড্ড পালাই-পালাই এমন সকালে। গাছের পাতায় রোদ বিলি কাটছে, নদীর ও পারে ওই তো গ্রাম, দ্যাখো কী বিপুল প্রাণ পড়ে আছে চরাচর জুড়ে। আর দ্যাখো– এই তো আমার খেয়া, আলগোছ, এক্ষুনি।
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৩৭৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
আরও পড়ুন
ভগীরথ - Vikram Pakrashi
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন