• বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়।
    বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে।
  • ফাদার অফ পাবলিক হেলথ - ১

    ঐন্দ্রিল ভৌমিক
    বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৫ জুন ২০১৯ | ৩৮ বার পঠিত
  • মধ্য রাতের পথিক

    (বিধিবদ্ধ সতর্কীকরনঃ এটি ভূতের গল্প নয়)

    ১৮৫৪ সাল। লন্ডনের এক শীতল ও ভূতুড়ে রাত্রি।

    রাস্তায় কুকুর বেড়ালও দেখা যাচ্ছে না। টিম টিম করে কয়েকটা গ্যাসের আলো জ্বলছে। সেগুলোর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না, সকাল অবধি সেগুলো জ্বলবে।

    সারা শহরটাই কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা। এই কুয়াশা নেমে এসেছে লন্ডনের মানুষদের জীবনেও। গত দশদিনে কলেরা মহামারির মত ছড়িয়ে পড়েছে শহরের আনাচে কানাচে। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে শয়ে শয়ে লোক।

    সন্ধ্যে হতেই লোকজন যে যার বাড়িতে ঢুকে দরজা জানলা বন্ধ করে গৃহবন্দী হয়ে থাকছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছে না কেউ। বাতাসে যে বিষ মিশে আছে। বিষ-বাষ্প।

    বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা বলেছেন, কলেরা রোগ ছড়ায় বাতাসের মাধ্যমে। লন্ডন শহরে পয়ঃপ্রণালী বলে কিছু নেই। সারা শহরের মানুষ এবং অন্যান্য জীবজন্তুর মলের দুর্গন্ধ, পচা জঞ্জালের দুর্গন্ধ কলেরার বিষ-বাষ্প তত্ত্বকে আরও বেশী যুক্তিগ্রাহ্য করেছে।

    পাথরের রাস্তায় একটা জুতোর শব্দ শোনা গেল। ঠক... ঠক... ঠক...। কে এই সাহসী পুরুষ। তাঁর পরনে ওভারকোট। টুপিতে চোখ ঢাকা পরেছে। মুখে রেশমি রুমাল বাঁধা। হয়ত বিষ-বাস্প থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই। তাতে আরেকটা সুবিধাও হয়েছে। ব্যক্তিটিকে চেনা যাচ্ছে না।

    তিনি নিজেও চান না তাঁর পরিচয় প্রকাশ পাক। আজ যে কাজ তিনি করতে চলেছেন, সেটি সরকারের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। ধরা পড়লে তাঁর কঠিন শাস্তি হবে। কিন্তু কাজটা তাঁকে করতেই হবে। না হলে বাকি জীবন তিনি আয়নায় মুখ দেখতে পারবেন না।

    এই ব্যক্তির নাম জন স্নো। তিনি লন্ডন শহরের একজন নাম করা অজ্ঞান করার চিকিৎসক। কিন্তু দশদিন ধরে অপারেশন থিয়েটারের বদলে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন কলেরা আক্রান্ত শহরের অলিতে গলিতে। নিজের হাতে এঁকেছেন একটি মানচিত্র।

    সেই মানচিত্রে আছে শহরের তেরটি জলাধার এবং ৫৭৮ জন কলেরায় মৃত ব্যক্তির ঠিকানা।

    এই মানচিত্র আঁকার সময় তিনি একটি অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করেন। লন্ডনের জল সরবরাহ তখন নির্ভরশীল ছিল মূলত তেরটি অগভীর জলাশয়ের উপর। সেখান থেকে হাতে চাপা পাম্পের সাহায্যে সাধারণ মানুষ জল সংগ্রহ করতো। জন স্নো লক্ষ্য করেন ব্রড স্ট্রীটের(বর্তমানে ব্রডউইক) জলের পাম্প ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশী মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

    কিন্তু তা কি করে সম্ভব। সকল চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন বাতাসের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। সেখানে একটা জলাধারের কি ভূমিকা থাকতে পারে? তাহলে কি রোগটা বাতাসের মাধ্যমে নয়, ছড়ায় পানীয় জলের মাধ্যমে।

    কেউ তাঁর কথা মানেননি। তিনি লন্ডন শহরের প্রশাসনকেও জানিয়েছেন। প্রশাসনের কর্তারা হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ডাঃ জন স্নো কি করে নিজের পর্যবেক্ষণকে অগ্রাহ্য করবেন। সত্য তো সবসময় সত্যই। সমস্ত পৃথিবী যদি অন্য দিকেও থাকে তার চাপে কি করে তিনি সত্যকে অস্বীকার করবেন।

    তাই এই মাঝরাতে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন। তাঁর ওভার কোর্টের পকেটে আছে একটা বড় রেঞ্জ। যা হয় হোক। তিনি তার কর্তব্য পালন করবেন। মনে মনে আরেকবার হিপোক্রেটিসের শপথ আউড়ে নিলেন। “প্রাণভয়ে ভীত হয়ে আমি যেন রোগীর চিকিৎসায় গাফিলতি না করি। আমার অর্জিত জ্ঞানকে প্রতিকুল পরিস্থিতিতেও আমি যেন রোগীকে সুস্থ করার কাজে ব্যবহার করতে পারি।”

    তিনি অনুভব করতে পারছিলেন হৃদপিণ্ডের গতি ক্রমশ বাড়ছে। তিনি কি পারবেন তার কার্যে অবিচল থাকতে। ডাঃ জন স্নো বিশ্বাস করেন ঈশ্বর সকলকেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে। আজ তাঁর ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করার দিন।

    ব্রড স্ট্রীটের হস্ত চালিত জলের পাম্পের সামনে এসে তিনি থামলেন। এদিক ওদিক দেখলেন। কেউ কোথাও নেই। নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের কাজ শুরু করলেন।

    চারদিক ভয়ংকর শান্ত। দিনের বেলায় এখানে জল নেওয়ার জন্য গরীব শ্রমিকদের লাইন পরে। কোলাহলে রাস্তাটা গম গম করে। আর এই মাঝ রাতে শুধু শোনা যাচ্ছে ইস্পাতে ইস্পাতে ঠোকাঠুকির ধাতব শব্দ। এই শীতেও ডাক্তারবাবুর কপালে ঘাম জমছে।

    শেষ পর্যন্ত তিনি পারলেন। খুলে ফেললেন জলের পাম্পের হ্যান্ডেল।

    পরেরদিন সকালে হই চই পরে গেল। কে যেন পাম্পের হ্যান্ডেল খুলে ফেলেছে। পুরো নলকূপটাই অকেজো। কে জানে সারাতে কতদিন লাগবে। লন্ডনে কর্পোরেশনের আঠারো মাসে বছর। সে কদিন দূর থেকে জল আনতে হবে। একে ঘাড়ের উপর কলেরার মৃত্যু খাঁড়া। তার সাথে ঘরের পাশের নলকূপটাও খারাপ। কর্পোরেশনকে গালা গালি দিতে দিতে তারা চলল অন্য জায়গায় জলের সন্ধানে।

    কিন্ত কি আশ্চর্য। নাটকীয়ভাবে কলেরার মহামারী থমকে গেল তারপরেই। ডাঃ স্নো তখন জনসমক্ষে আনলেন ঘটনাটিকে। বললেন, কলেরা বায়ুবাহিত নয়, এটি আসলে জলবাহিত রোগ।

    কিন্ত এর পরেও বৈজ্ঞানিকরা বিশ্বাস করেননি ডাঃ জন স্নো- এর মতবাদ। বিখ্যাত জার্মান বৈজ্ঞানিক ম্যাক্স ভন পেটেনকন এর বিরোধিতা করে বলেছিলেন, কলেরা একটি বায়ুবাহিত রোগ যার উৎপত্তির কারণ জীবাণু, স্থানীয় ও জলবায়ুর অবস্থান এবং এই ধরণের রোগীদের রোগ সংক্রমণের ব্যাপারে অন্তর্নিহিত কোনও দুর্বলতা থাকে।

    যদিও পরে ফিলিপো পসিনি, রবার্ট কখ প্রমুখ বিজ্ঞানীরা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেন কলেরা বায়ু বাহিত নয়, বরঞ্চ জল বাহিত রোগ।

    ডাঃ জন স্নোর সেই কলেরা রোগীদের অবস্থান দেখিয়ে লন্ডনের বিখ্যাত মানচিত্রটি epidemiological Society of London – এ রাখা আছে।


    অন্যান্য পর্ব »

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৫ জুন ২০১৯ | ৩৮ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • Jaya Kundu | 561212.187.2367.235 (*) | ০৫ জুন ২০১৯ ০৩:১৪78742
  • চমৎকার শুরু হল।
  • dc | 127812.49.896712.134 (*) | ০৫ জুন ২০১৯ ০৩:৩৪78743
  • দারুন ভাল্লাগলো, নতুন জিনিষও জানতে পারলাম।
  • সুব্রত দেববর্মা | 785612.51.90023.157 (*) | ০৫ জুন ২০১৯ ০৫:০৩78741
  • জন স্নো
  • b | 4512.139.6790012.11 (*) | ০৫ জুন ২০১৯ ০৫:০৯78744
  • ১। " যার উৎপত্তির কারণ জীবাণু, স্থানীয় ও জলবায়ুর অবস্থান "
    এর মানে কি?
    ২। রেঞ্জ নয়, রেঞ্চ।
    ৩। ডাক্তারবাবু মনে মনে কি ভাবছিলেন সেটা জানা গেলো কি ভাবে? ফিকশন হলে অবশ্য আলাদা কথা।
  • b | 4512.139.6790012.11 (*) | ০৬ জুন ২০১৯ ০৪:১৩78745
  • উপরের কমেন্টগুলো সামান্য নিটপিকিং মাত্র, লেখাটি ভালো লেগেছে।ডাক্তারবাবু সম্পাদনা একটু ভালো করে করলে লেখাটির গুণগত মান আরো ভালো হত।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • গুরুর মোবাইল অ্যাপ চান? খুব সহজ, অ্যাপ ডাউনলোড/ইনস্টল কিস্যু করার দরকার নেই । ফোনের ব্রাউজারে সাইট খুলুন, Add to Home Screen করুন, ইন্সট্রাকশন ফলো করুন, অ্যাপ-এর আইকন তৈরী হবে । খেয়াল রাখবেন, গুরুর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে গুরুতে লগইন করা বাঞ্ছনীয়।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত