এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • কালবেলার রৌদ্রছায়া  - ২৬

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৩ জুলাই ২০২৬ | ৪ বার পঠিত
  • ( ২৬ )

    বাগবাজারে শচীন মিত্র লেনে এক পরিবারে ছ'জনের মধ্যে পাঁচজনেরই মন খারাপ। গগনবাবুর বয়স আটষট্টি। দেড়হাজার টাকা করে বার্দ্ধক্যভাতা পেলে মন্দ হয় না। কিন্তু সে ব্যাপারে পরিষ্কার কোন খবর নেই। অফলাইন আর অনলাইন এই দুটো শব্দ লোকের মুখে মুখে। এই দুই লাইনের চক্করে ঘুরে মরছে গিন্নী থেকে কর্তা, ছুঁড়ি থেকে বুড়ি গাদা গাদা লোক। সে যাই হোক, এদের মনোবেদনার কারণ হল, গগনবাবু কবে কিভাবে অফ না অন কোন লাইনে ভাতা পেতে পারেন কিছুই খবর জোগাড় করতে পারছেন না।
    তাই তিনি দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন। তার ছেলের বউ এবং গিন্নীর উৎকন্ঠা অন্নপূর্ণাভান্ডার নিয়ে। এখনও ঢোকেনি। মানে অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি। আশা নিরাশার দোলায় দুলতে দুলতে তার মানসিক অবসাদ এসে যাচ্ছে। গগনবাবুর আইবুড়ো মেয়েরও একই অবস্থা। তারও এখনও টাকা ঢোকেনি। সারাদিন ধরে চেনা জানা পঁচিশ থেকে ষাটের মধ্যে সামনে যাকে পাচ্ছে ধরে জিজ্ঞেস করছে, 'তোর ঢুকেছে নাকি... তোমার ঢুকল... আপনারটা ঢুকেছে ঢুকেছে... ঢোকেনি, না ? '
    মোটামুটি হাল্কা মনে আছে গগনবাবুর ছেলে সৃজন, যদিও বউয়ের অন্নপূর্ণালাভ নিয়ে তারও কম ঝক্কি যাচ্ছে না। প্রতিদিন সৃজনের করা ফর্ম পূরণ সংক্রান্ত সম্ভাব্য ত্রুটি নিয়ে কাঁটাছেড়া করতে বসা তার স্ত্রী পিয়ালির দৈনন্দিন কাজে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে তার স্ত্রীকে বারংবার আশ্বস্ত করতে করতে নাজেহাল অবস্থা তার।
    একমাত্র গগনবাবুর সাত বছরের নাতি জুজুর মন এসব নিয়ে আলোড়নের থেকে একেবারেই মুক্ত।
    সে একটা মোবাইল ফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করে কী একটা দেখছে মন দিয়ে। খুব সম্ভত এ আই কারিগরি নির্মিত কোন আকর্ষনীয় ভিডিও রীল।

    চারটে বাড়ি পরে সোমনাথদের বাড়ি। সোমনাথ বক্সী। বাড়ি মানে ভাড়া বাড়ি। তিনতলার বাড়িটার একতলায় দুটো ঘরে সোমনাথ পরিবার নিয়ে থাকে। তার দুটো বাচ্চাও আছে। সোমনাথ যে কী করে, কী করে তার সংসার চলে পাড়ার কেউই ঠিকমতো জানে না, সোমনাথ পাড়াতে তেমনভাবে কারও সঙ্গেই মেশে না।
    অতীশের সঙ্গে তার অনেকদিনের ঘনিষ্ঠতা। সন্ধেবেলায় এসে হাজির হল। এটা নতুন কিছু না। অতীশ মাঝে মাঝেই আসে। চা বিস্কুট খায়। ঘন্টাখানেক বসে। পলিটিক্স নিয়ে উত্তেজিতভাবে নানা কথা বলে, তারপর চলে যায়। অতীশ একজন দোকানদার। বিডন স্ট্রিটে একটা ছোট মনিহারি দোকান আছে।
    চলে না তেমন। কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়। এমনিতেই আয় কম, তার ওপর তোলাবাজি আছে। মাসোয়ারা বন্দোবস্ত। কিছু আয়পয় থাকুক আর না থাকুক। এক একবার এক এক জন আসে নগদ নিতে।

    আজ চা খেতে খেতে সোমনাথ বলল, ' দেখ এবার যদি একটু কমে... ভ্রষ্টাচার পছন্দ করে না বলেই তো পাবলিক এদের সরিয়েছে ... '
    অতীশ চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ' আরে রাখ তো... পাবলিকের কথা আর বোল না। পাবলিক ভ্রষ্টাচার নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায় না। নইলে টি এমসি একচল্লিশ পারসেন্ট ভোট পেত না। ভোটারগুলো তো ওদের জেতাবার জন্যই ভোট দিয়েছে। তারা কি জানে না ওরা কী করেছে না করেছে ? সিপিএম পাঁচ পারসেন্ট মুসলিম ভোট না কাটলে তো মমতাই জেতে। জনগন নাকি খুব সচেতন। এরা নাকি মাস লিডার! এই তো মাস, তার আবার লিডার। শুধু ভাতা পেলেই হল.... ভাতা বন্ধ হলে গদি উল্টোবে। এবারে মেয়েরা ভোট ঢেলেছে তিন হাজারের লোভে, সোজা কথা। দুর্নীতি টুর্নীতি কোন ব্যাপার না। গরীব মানুষ হল ক্রীতদাস বা অবল এবং অবোল কোন মানবেতর প্রাণী। তাদের গিনিপিগের মতো ব্যবহার করা হয়। যেই ক্ষমতায় আসে সেই করে। আর জি করের ফয়সালা তো ক্ষমতায় আসার পর সাত দিনের মধ্যে হওয়ার কথা ছিল। কী হল... '
    সোমনাথ ভাবল, এই শুরু হল অতীশের রাজনীতির কচকচানি। বলল, ' এই তো সবে এল। দেখ একটু... '
    ----- ' হ্যাঁ, দেখি দেখি... '
    অতীশ চায়ে বিস্কুট চোবাতে চোবাতে বলে, 'ব্যাপার হচ্ছে যে এইভাবে তো আর চলছে না... '
    ------ ' কী ? '
    ----- ' না মানে, ইনকামটা বাড়ানোর দরকার। এভাবে আর চালানো যাচ্ছে না। তুমি তো নানা লাইনে ঘোর। দেখ তো একটু। এখনও তো অনেকদিন বাঁচতে হবে... বুঝতেই তো পারছ... '
    ----- ' অ... হ্যাঁ, তা ঠিক... '
    তারপর একদমই সময় নিল না সোমনাথ বক্সী। যেন তৈরিই ছিল। চটপট উত্তর দিল।
    ----- ' চল আমরা মন্দিরের ব্যবসা করি... ঠিকমতো করতে পারলে লাল হয়ে যাবে ... '
    ---- ' মন্দিরের ব্যবসা মানে ? '
    ----- ' মন্দির মানে মন্দির। মূর্তি, বিগ্রহ, সেবায়েত, যজমান, পুজো আচ্চা, হোম যজ্ঞ, পালা পার্বন, ভজন কীর্তন আর ওই ইয়ে.... '
    অতীশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, ' কী... কী ? '
    ---- ' পাবলিকের, মানে ওই ভক্তদের মনস্কামনা টামনা পূরণের ব্যবস্থা করা। নইলে তারা মন্দিরমুখো হবে কেন আর খোলামনে উপুড়হস্ত হবেই বা কেন ? দু একটা কেস ঠিক ঠিক খাইয়ে দিতে পারলে এ ব্যবসায় মার নেই। আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাবে... '
    অতীশ সরকার হতবুদ্ধি হয়ে সোমনাথের দিকে তাকিয়ে রইল। কী বলবে ভেবে পেল না। এসব কাজ কারবারের ব্যাপারে সে যে একেবারে অজ্ঞ তা না কিন্তু এতসব কান্ড যে তার মতো একজন মামুলি দোকানদারের পক্ষে ঘটানো সম্ভব এটা তার বিশ্বাস তার নেই। সে যাই হোক, তার মনে একটা আশার দীপ উজ্জ্বল আভা বিকিরণ করে জ্বলে উঠল। তার চোখ যেন কিসের আশায় চকচক করতে লাগল।
    এদিকে সোমনাথ বক্সী বলে চলেছে, ' ব্যবসা অবশ্য আরও আছে। যেমন কঙ্কালের ব্যবসা। ওটাতে বেশ ঝামেলা আছে অবশ্য। তার চেয়ে ঠাকুরের ব্যবসা অনেক ভাল। তবে হ্যাঁ, ওসব শনিমন্দির শেতলা মন্দির টন্দির করে কিছু হবে না। একটা আশ্রম স্ট্রাকচারের কিছু চাই যাতে মোটা ধরনের প্রণামী পড়ে। গোল্ড টোল্ড আসতে পারে। ট্রাস্টি থাকবে, ভজন কীর্তনের ব্যবস্থা থাকবে... '
    ----- ' মানে ওই রামমন্দির বা জগন্নাথধাম গোছের
    ব্যাপার... ' অতীশ বলে ফেলল।
    সোমনাথ ঘাড় কাৎ করে জিভ কেটে চোখ বুজে একগাল হেসে বলল, ' ওই হ্যাঃ... বোল না বোল না.... যা বলেছ যা বলেছ... আমরা ছোটখাটো... আপাতত ছোটখাটো হলেই চলবে... বুঝলে তো... '
    ----- ' সে তো বটেই সে তো বটেই... কিন্তু কোথায় হবে ? '
    ----- ' ওইটাই হচ্ছে মুশ্কিল.... তারকদার কাছে একবার যেতে হবে। একটু গাছপালাওয়ালা ছড়ানো জায়গা চাই, নইলে ঠিক জমবে না, কী বুঝলি ? একটা আধ্যাত্মিক পরিবেশ চাই তো...'
    ----- ' হ্যাঁ, তা বুঝলাম কিন্তু এসব হবে কীভাবে ? '
    তারকদার পরামর্শ নিতে হবে... কাল যাব, যাবি তো ... :
    ----- ' হ্যাঁ, কিন্তু তারকদা কে ? '
    ----- ' ওই তো, তারকনাথ গোস্বামী। গোকূল মহাবেদান্ত মঠের প্রেসিডেন্ট .... '
    ----- ' অ... তা দেখ যদি হয়.... '
    অতীশ বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে লাগল।
    ভরসা করে বলল, ' আর ওই যে... কঙ্কালের ব্যাপার... কী একটা বলছিলে... '
    ----- ' ও হ্যাঁ... ওটায় একটু ঝকমারি আছে। মেডিকেল কলেজগুলোয় ছাত্রদের পড়ানোর জন্য
    ওগুলো লাগে... ভাল লাভ আছে, তবে ধরা পড়লে ওখানেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে। কবর থেকে টাটকা বডি তুলতে হবে... বুঝতে পারছ তো... কাদের বডি কবর দেওয়া হয়। যাক, ও ব্যাপারটা পরে বলব'খন... '

    ( ক্রমশ)

    ********************************************

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন