এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • কালবেলার রৌদ্রছায়া - ২৭

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ জুলাই ২০২৬ | ১৯ বার পঠিত
  • ( ২৭ )

    স্বরাজ গোস্বামী সাতানব্বইয়ে পড়লেন। বয়সের তুলনায় শরীরের যন্ত্রপাতি বেশ ভালই আছে। একটাও অসংলগ্ন কথা বলেন না। কানে একটু কম শোনেন এখন, এইটুকুই। এটা ছাড়া তিনি যথেষ্ট সক্ষম আছেন। অতি বৃদ্ধদের মতো আবোল তাবোল বকা তার ধাতে নেই। তিনি তারকবাবুর বাবা।
    গড়ন ধরন, ধ্যান ধারণা, বিশ্বাস মূল্যবোধ সবদিক দিয়েই বাবা আর ছেলেতে আকাশ পাতাল ফারাক।

    স্বরাজবাবু কমিউনিস্ট টমিউনিস্ট নন, স্বাধীনতা আন্দোলনও করেননি। কিন্তু তিনি সাম্যবাদে বিশ্বাস করেন, যদিও তিনি জানেন সাম্যবাদ ধারণাটা বেশ ঘোলাটে। এ বিশ্বপ্রকৃতিতে সাম্যবাদ বলে কোন বস্তুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। সে মহাজাগতিক সাম্যই হোক কিংবা প্রাণীজগতের জাগতিক সাম্যই হোক।
    তিনি সেই যৌবনকাল থেকে অনেকের মুখে শুনছেন, লেনিন নাকি মোটেই সুবিধের লোক ছিলেন না। অপছন্দের অনেককে খুন করিয়ে দিতেন তার পোষা লোকজন দিয়ে। তা'লে আর হিটলার কিংবা মুসোলিনির সঙ্গে তার তফাৎ কী রইল ? কে জানে কী রইল, তা'বলে ধর্মতলায় লেনিনের মূর্তি ভাঙাটা তো ঠিক কাজ না। একদল লোক তাকে সামনে রেখে একটা আদর্শ নিয়ে চলছে হয়ত। যারা ভাঙছে তারা কি জেনে বুঝে এসেছে যে লেনিন ঠিক কেমন লোক ছিলেন। যেমন, যারা শ্রীরামচন্দ্রের নামে জয়ধ্বনি দেয় তারা কি জানে রামচন্দ্র ঠিক কেমন ছিলেন। তার সব কাজই সমর্থনযোগ্য ছিল কিনা।
    স্বরাজবাবু এখনও পড়াশোনার মধ্যেই থাকেন। কোথায় যেন পড়েছিলেন মনে নেই। কিন্তু কথাগুলো এখনও মনে আছে.....
    .... Empowerment of the powerless in a state by provoking to abhor the powerful men by exploiting their mediocre IQ is known as communism .
    তারপরই আছে....
    ..... But the stark paradox is that the most powerfuls are so often the most corrupt politicians in a landmass. So what is the worthwhile solution ?
    স্বরাজবাবু তার পঁচিশ বছর বয়স থেকে সাম্যবাদী ভাবধারার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তবে কখনও কোন খাতায় নাম লেখাননি, মানে কোন দলের সদস্য হননি কখনও। সারা ভারত তখন ভেসে যাচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রামের জোয়ারে।

    সে যাই হোক, তার ছেলে তারকনাথ গোস্বামী কিন্তু অন্য পথের পথিক, যদিও বাবার ওপর তার খাঁটি ও নির্ভেজাল শ্রদ্ধা আছে। সে ব্যক্তিগতভাবে কোন জটিল এবং বহুমাত্রিক ভাবধারার বাহক নয়। তার চিন্তাধারা সরলরৈখিক। খুব সহজ সরল চিন্তাধারা, এ দুনিয়ায় টাকা ছাড়া কিছু হয় না, তা সে যে উপায়েই হোক না। তার সঙ্গে ক্ষমতা হলে আরও ভাল।



    সোমনাথকে আর একজনকে সঙ্গে করে ঘরে ঢুকতে দেখে তারকবাবু বললেন, ' এই রে... এই সময় এলে। টাইম খুব শর্ট। ছ'টা থেকে মিটিং আছে। বেশি টাইম দিতে পারব না... যা বলার শর্টে বল... '
    সোমনাথ বসে পড়ল একটা চেয়ারে। তার দেখাদেখি একটু কুন্ঠিত ভঙ্গীতে অতীশও তার পাশের চেয়ারে বসল।
    অতীশকে দেখিয়ে সোমনাথ বলল, ' একে নিয়ে এলাম আপনার কাছে... আমার অনেকদিনের বন্ধু... '
    ----- ' অ... কী ব্যাপার ? '
    বলে একটা ব্যাগের ভিতর হাত ঢুকিয়ে কী একটা কাগজ খুঁজতে লাগলেন।
    অস্ফুটে বললেন, ' এখানেই তো ছিল... কোথায় যে কী রাখি... যাক পরে দেখব'খন... হ্যাঁ বল... '
    ----- ' তারকদা এর একটা ইনকামের রাস্তা দরকার... একটা সলিড কিছু আর কী ... '
    তারক গোস্বামী একবার অতীশের দিকে, একবার সোমনাথের দিকে তাকালেন তারপর ব্যাগটা গুটিয়ে কোলের ওপর রেখে বললেন, ' এখন কী করা হয় ? '
    অতীশ বিনীত মুখে বলল, ' বিজনেস... ওই একটা ছোট দোকান আছে ... '
    তারকবাবু আবার একবার এর দিকে একবার ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ' অ... তা কী করতে চাইছ ? '
    এবার সোমনাথ হাল ধরল।
    ----- ' না, মানে একটা দেবস্থান যদি দাঁড় করানো যায়... '
    তারকবাবু সোমনাথের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন প্রায় দশ সেকেন্ড। অনেক না বলা কথা, অনেক প্রশ্ন, অনেক সংশয় মেশানো নীরব দৃষ্টি।
    অবশেষে বললেন, ' কোথায় এখন ? '
    অতীশ আনাড়ির মতো তাকিয়ে রইল, সোমনাথ কিন্তু গোঁসাই মশাইয়ের কথাটা ঠিক ধরে নিল।
    বলল, ' না... কোথাও নেই ঠিক। একদম সাদা লোক। তবে আপনি যদি বলেন... '
    ----- ' এই তো মুশ্কিল। সাদার কোন দাম নেই এখন। ভ্যালুলেস। রঙ ছাড়া এখন কিছু হয় না ... যা হোক একটা। পরে দরকার মতো এদিক ওদিক করে নিলে হবে... '
    ---- ' হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি। আপনি একটু গাইড করুন না ... ' সোমনাথ এগোতে থাকে।
    ----- ' জায়গা আছে ? '
    ----- ' না... সেটাই তো প্রবলেম। সেই জন্যই আপনার কাছে আসা। একটু যদি দেখে দেন।
    আমিও পার্টনার হব ঠিক করেছি। কিছুটা পাবলিক সার্ভিসও তো হবে। যদি কিছু মনে না করেন জিনিসটা জমে গেলে আপনারও পারসেন্টেজ থাকবে...'
    তারকবাবু হাঁটুতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,
    ' না, সে ঠিক আছে... সেটা কোন ব্যাপার না... '
    --- ' সোর্স থেকে খবর পাই অনেকেই লাইনে আছে। ঠিকমতো লাগাতে পারলে হেবি প্রফিটেবল বিজনেস, দেখছি তো ... '
    সোমনাথ আর্জি পেশ করতে থাকে। অতীশ চুপচাপ বসে থাকে। মুখ খুলতে ভরসা করে না, পাছে আলগা কিছু বলে ফেলে। সে বুঝতে পেরেছে এসব জায়গা আঁটোসাটো কথাবার্তার জায়গা। দু একটা আনাড়ি এবং আলগা কথায় পাকা ঘুঁটি কেঁচে যেতে পারে। সোমনাথ সাত ঘাটের জল খাওয়া লোক। তারকবাবুর মতো লোক সামলানোর অভিজ্ঞতা তার আছে।
    সে যাই হোক, তারক গোস্বামী মশাই কিন্তু এত মসৃনভাবে লাইনে আসতে চাইছেন না। খালি পিছলে বেরিয়ে গিয়ে অন্য লাইনে চলে যাচ্ছেন।
    হাঁটুতে হাত বোলাতে বোলাতে মেঝের দিকে তাকিয়ে মিনিট খানেক ভেবে নিয়ে বললেন, ' দেখ, এক্ষুণি কিছু করতে যেও না। এরা তো সবে পাওয়ারে এসেছে। একটু মেপে নিতে হবে কিছুদিন ... '
    ----- ' আপনি তো এ পার্টিতে এলেন শুনলাম ... জানা নেই?
    ------ ' জানা থাকলেও জল মাপতে হয়, সময়টা পাকতে দিতে হয় ... যারা হুট করে কিছু করে তারা দুটো নৌকোর ফাঁকে পড়ে যায়... মানে তলিয়ে যায় অতলে। ... আমার সঙ্গে ঘোর কিছুদিন, সব বুঝতে পারবে। এস না...কাজের অভাব হবে না, কতরকম লাইন আছে। খাওয়া পরার অভাব থাকবে না। আরে... ওসব আশ্রম মন্দির তো রইলই ... ঠিক সময়ে সিগন্যাল দেব আমি... '
    অতীশের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ' ওই রঙের ব্যাপারটা কী বলছিলেন ... '
    তারকবাবু কিন্তু বিরক্ত হলেন না। বললেন, ' হ্যাঁ, ওইটাই, আদতে ওই জায়গাটাই আসল... খুব স্লিপারি। ঠিক আছে, ক'টা দিন ওয়েট কর... '
    সোমনাথের দিকে তাকিয়ে বললেন, ' ফোন কোর ফোন কোর ... '

    বাইরে বেরিয়ে সোমনাথ অতীশকে বলল, ' হয়ে যাবে... চিন্তা কর না। ওই পারসেন্টেজের টোপটা খেয়েছে মনে হয়। দেখি কোথায় জায়গা দেয়... '
    ---- ' হাবভাব ঠিক ক্লিয়ার হল না... ' অতীশ বলে হাঁটতে হাঁটতে।
    ----- ' হ্যাঃ হ্যাঃ হ্যাঃ... তা যা বলেছ। শ্যাওলা ধরা পিছল উঠোন ... এদের ক্লিয়ার কখনই পাবে না। কিন্তু এদেরকে ভাঙিয়েই আমাদের খেতে হবে। অত বাছবিচার করতে গেলে যেখানে আছ সেখানেই পড়ে থাকবে, বুঝলে তো। কী বাপের কী ছেলে... হ্যাঃ হ্যাঃ... কোথায় স্বরাজ আর কোথা তারক...'

    ( ক্রমশ )

    *****----******-***--- *************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল প্রতিক্রিয়া দিন