• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • রেড রাম অ্যান্ড ডার্বি

    Sarit Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ | ১০৫ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • রেড রাম অ্যান্ড ডার্বি
    সরিৎ চট্টোপাধ্যায় / থ্রিলার

    ঈগলের চোখের দৃষ্টি মানুষের চেয়ে অনেক বেশি প্রখর। কিন্তু মৃত্যুভয় মানুষের প্রতিটা ইন্দ্রীয়কে যেন আরো বেশি তীক্ষ্ণ করে তোলে। যেমন শাহনাজের। অসম্ভব সুন্দরী। বয়স তিরিশের নিচে। হাতে হাতকড়া। দু'পাশে কড়া পাহারায় দুই লেডি পুলিস। আলিপুর কোর্ট চত্তরে বেমানানভাবে কোথাও একটা রেডিওতে রফিসাহেবের গান বাজছে, রুখ সে, নকাব উঠা..দো, মেরে হুজুর!

    শাহনাজ দোতলার বারান্দায় প্রহরীদের নজরবন্দী হয়ে একটা লম্বা কাঠের চেয়ারে বসেছিল যখন মেয়েটা আলিপুর কোর্টের গেট দিয়ে ঢুকল। যেন টেলিপ্যাথির জোরে ও চোখ তুলে তাকাল। সুন্দর মুখটায় কি একঝলক কৌতুকের হাসি খেলে গেল? ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে আজ শুনানির তৃতীয় দিন। শাহনাজের নিয়তি তাকে আজ নিয়ে এসেছে এই পরিহাসের শেষ সীমান্তে। পাশের প্রহরী হাত ধরে টান দিল, বলল, চলো, অন্দর চলো!

    ফোনটা এসেছিল পাবলিক প্রোজিকিউটার প্রবীরেন্দ্র গোস্বামীর অফিসে, প্রায় দশদিন আগে। পুরো কেসটাকে এক লহমায় পাল্টে দিয়েছিল সেই মুহূর্ত। আবার করে সাজাতে হয়েছিল সমস্ত সাক্ষসবুত। কিন্তু শুনানির দ্বিতীয় দিনের শেষে যে প্রবীরেন্দ্র নিজেকে পরিতুষ্ট মনে করছিল সেটা অকারণে নয়।
    : বুঝলে অনুপম, শেখর চন্দকে প্রথম সাক্ষী হিসেবে পেশ করাটা ছিল দ শর্টেস্ট অ্যান্ড দ শিওরেস্ট ওয়ে!
    : মাস্টার স্ট্রোক স্যর। তিনদিনেই খেলা শেষ। কংগ্র্যাচুলেশনস স্যর।
    : হাহাহাহা, আরে আমার কোনো কৃতিত্বই নেই রে ভাই। খুনের মামলায় আই-উইটনেস থাকা মানে নব্বইভাগ কাজ হয়েই থাকল, বাকি দশ পারসেন্ট শুধু সাজিয়ে-গুছিয়ে নেওয়া। তবে জজসাহেবের মার্ডার বলে কথা, ভয়ঙ্কর চাপ ছিল এ ক'দিন।

    জাস্টিস মুকুল দত্ত। বত্রিশ বছর ধরে ক্যালকাটা ক্লাবের মেম্বার। মন্দ লোকে বলে থাকে তিনি নাকি জীবনে একদিনও ওকালতি করেন নি। তিনি ছিলেন, তাদের মতে একজন ফিক্সার। তবু দু'বার ভিজিলান্স এনকোয়ারি হওয়া সত্ত্বেও যখন তিনি বিচারপতির আসন পেলেন কেউই খুব একটা অবাক হয় নি।

    ২২ নভেম্বর বেলা সাড়ে বারোটার সময় মুকুল দত্ত আদালতের ভেতরেই তাঁর চেম্বারে বসেছিলেন। এক অজ্ঞাত আততায়ী সেখানে ঢুকে তাঁর মাথায় পরপর দুটো গুলি করে। পুলিসের তৎপরতায় কোর্ট প্রাঙ্গনেই ধরা পড়ে শাহনাজ। শাহনাজ মাত্র তিনদিন আগে দুবাই থেকে ফিরেছিল। দুবাইয়েই থাকছিল আজ বহুবছর। কলকাতায় উঠেছিল বেশ নামকরা এক হোটেলে। বলা বাহুল্য তার কাছ থেকে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায় নি কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায় শাহনাজের সেদিন কোর্টে থাকার কোনো উপযুক্ত কারণই ছিল না। আগ্নেয়াস্ত্রটি জজসাহেবের ঘরের মেঝেতেই পাওয়া যায়। বিদেশী মেক, সিরিয়াল নাম্বার মেটানো; কোনো আঙুলের ছাপ ছিল না। আর ঘটনাস্থলেই শাহনাজের ব্যাগ থেকে এক জোড়া পশমের দস্তানা বারামত হয়।
    কিন্তু এ সবই ছিল সারকামস্ট্যানসিয়াল এভিডেন্স। ফোন কলটা সব পাল্টে দিয়েছিল।

    স্বনামধন্য বিচারপতি তারকেশ্বর বাগচী স্বাস্থের কারণে বহুদিন খুনটুনের মামলা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন কিন্তু এই কেসটা প্রায় জোর করেই দেওয়া হয়েছিল ওনাকে। তারকেশ্বর, ওরফে বটু বাগচী। ডাকসাইটে উকিল ছিলেন একসময়।

    বটু বাগচী ভুরু কুঁচকে প্রবীরেন্দ্র গোস্বামীর দিকে তাকিয়ে একবার নাক দিয়ে বেখাপ্পা একটা শব্দ করে ছোট্ট একটা হুঙ্কার ছাড়লেন।
    : কয়ডা বাজে হে প্রবীর?
    : দশটা দশ স্যর।
    : লেডি আইনেস্টাইন কোথা?
    : জানি না স্যর।
    : তোমাগো হুইটনেস রেডি?
    : অবশ্যই স্যর।
    : আর দশ মিনিট দেখব, তারপর ...

    হন্তদন্ত হয়ে ডিফেন্স কাউন্সিল সোনালী সিং আদালতে এন্ট্রি করলেন। কালো কোট-এর বিদেশী কাট-টা পাঁচ ফুট চার, ৩২-২৬-৩৪ মাপের শরীরটাকে আরো আকর্ষনীয় করে তুলেছে। গলায় ফ্রিল দেওয়া দুধসাদা শার্ট, গ্রে-ব্ল্যাক লো-ওয়েস্ট ট্রাজার, সাথে চার ইঞ্চি ফ্রেঞ্চ হিল, বয়স তিরিশের কোনো একদিকে। সোনালী শাহনাজের পক্ষের উকিল। এর আগে আলিপুর কোর্ট চত্তরে এনাকে আগে কখনো দেখা যায় নি। বলা বাহুল্য, কোর্টরুম-এ একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। আজ আদালতে অনেকেই শুধু সোনালী সিং-কেই দেখতে এসেছে।

    : এক্স্ট্রিমলি স্যরি ইওর লর্ডশিপ। আপনি তো জানেনই কলকাতার বিউটি পার্লারগুলো সময়ের ব্যাপারে কী অসম্ভব পাংকচুয়াল!
    : এত্ত ভোরবেলা আফনে পার্লার গেসলেন!
    : কী করব স্যর, আজকে যে বিশেষ দিন, ঠোঁট উল্টে বলল সোনালী।
    : তা তো বটেই! কই প্রবীর, ডাকো দেহি তোমার সাক্ষীরে।

    শেখর চন্দ। ৪২। ব্যাকব্রাশ করা চুল। হ্যান্ডসাম দেখতে। কাঠগড়ায় কেমন একটা দায়সারা গোছের ভাব নিয়ে এসে দাঁড়াল।
    : প্রবীর, তোমাগো আর কোনো প্রশ্ন আসে নাকি? না? বেশ, ম্যাডাম ডিফেন্স কাউন্সিল, আপনি ক্রস একজামিন শুরু কইরতে পারেন।
    : থ্যাংক ইউ ইওর লর্ডশিপ। শেখরবাবু, আপনি গত ২২ নভেম্বর কী কারণে আদালতে এসেছিলেন?
    : আমার জাস্টিস দত্তের সাথে একটা জরুরি কাজ ছিল।
    : কী কাজ?
    : স্যরি, সেটা বলতে পারব না।
    : বেশ। আপনি আপনার জবানবন্দিতে বলেছেন যে আপনি মুকুল দত্তের চেম্বারে ঢুকতে গিয়ে দেখেন যে অভিযুক্ত শাহনাজ হাতে পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আর জজসাহেব গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন, কারেক্ট?
    : হ্যাঁ।
    : বাঃ, চমৎকার। আপনার সামনেই কি গুলি চালিয়েছিলেন তিনি?
    : না।
    : আপনি কী কাজ করেন শেখরবাবু?
    : আমি রোয়াল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের সদস্য।
    : রোয়াল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব ... মানে, ঘোড়দৌড়? রেসিং ক্লাব?
    : হ্যাঁ।
    : এটাই আপনার জীবিকা?
    : না। পৈতৃক একটা ব্যবসা আছে। আমাকে যদিও বিশেষ কিছু দেখতে হয় না।
    : বাঃ, আপনি তো ভাগ্যবান! আপনি অভিযুক্ত শাহনাজকে আগে থেকে চিনতেন?
    : না।
    : অথচ সেদিন একনজর দেখেই এক মাস পর পুলিসের সামনে ওনাকে নির্দ্বিধায় সনাক্ত করলেন?
    : আমি সহজে কোনো সুন্দরী মহিলার মুখ ভুলি না।
    : এক্সিলেন্ট! আর শাহনাজ প্রকৃতই সুন্দরী।
    : নিঃসন্দেহে।
    : আপনি রেস খেলেন?
    : অবজেকশন ইওর অনার! এই কেসের সাথে এসব প্রশ্নের সম্পর্ক কী? ইম্মেটিরিয়াল অ্যান্ড ইর্রেলিভ্যান্ট!
    : সোনালী দেবী, আপনি কী প্রমাণ কইরতে চাইতাসেন? সময় নষ্ট না কইরা চটপট মেইন কথায় আসেন।
    : অবশ্যই ইওর লর্ডশিপ। আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে প্রায় সব তথ্যই সারকামস্ট্যানসিয়াল। কোনরকমের মোটিভও পাওয়া যায় নি। শাহনাজ দুবাই থেকে একজন ট্যুরিস্ট হিসেবেই ১৮ তারিখ দুপুরে কলকাতায় আসেন। উনি ওনার কথামত নিছক কৌতূহলবশতই আদালতে ঢুকে পড়েন। ওঁর বিরুদ্ধে একমাত্র সাক্ষী শেখরবাবু। তাই ওনাকে ক্রস করার সময় একটু বড় পরিসরে প্রশ্ন করার অনুমতি চাইছি ইওর লর্ডশিপ। থ্যাংক ইউ। এবার প্রশ্নটার জবাব দিন শেখরবাবু। আপনি রেস খেলেন?
    : কখনোসখনো। শেষ জুলাই ডার্বি খেলেছি।
    : জাস্টিস মুকুল দত্ত কি রেস খেলতেন?
    : শখ ছিল। মাঠে দেখেছি।
    : নিয়মিত খেলতেন? বড় অ্যামাউন্ট?
    : বোধহয়।
    : সেদিন আপনি কারোকে না জানিয়ে চলে গেছিলেন কেন?
    : ভয় পেয়েছিলাম। চোখের সামনে মানুষ খুন হতে সেই প্রথম দেখলাম কিনা।
    : আচ্ছা, আপনি একমাস পর, তাও পুলিসকে না, সোজা পাবলিক প্রোজিকিউটারকে ব্যাপারটা জানালেন কেন?
    : পেপারে অভিযুক্তের ছবি দেখে মনে হলো এটা জানানো আমার কর্তব্য।
    : একমাস পর! হবে হয়ত। আর ওই রেড রাম-এর ঘটনাটা কবে যেন ঘটেছিল?
    অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটা শুনে চমকে উঠল শেখর। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে বটু বাগচী নিজেই প্রশ্ন করলেন।
    : এই রেড রাম কী বস্তু? রাম তো লালই হয় জানতাম!
    : ঘোড়া, ইওর লর্ডশিপ। রেসের ঘোড়া। যে সে ঘোড়া নয়, জুলাই মাসের ডার্বি জেতা ঘোড়া। গত ১৯ নভেম্বর ভোরবেলা তাকে তার মালিকের আস্তাবলে মৃত পাওয়া যায়। কণ্ঠনালি কেটে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাকে। এই চারটে ফোটোগ্রাফ আর নিউজপেপার কাটিং আমি ডিফেন্স একজিবিট 'এ' হিসাবে পেশ করছি।
    : প্রবীর?
    : প্রোজিকিউশন-এর আপত্তি নেই স্যর।
    : তাহলে শেখরবাবু, বলুন দেখি এই রেড রাম-এর মালিক কে ছিল? আপনি জানেন? না? বেশ, আমিই বলছি। ডার্বি জয়ী ঘোড়াটির মালিক ছিলেন জাস্টিস মুকুল দত্ত। আর তার দু'দিন পরই তার মালিকও খুন হলেন। কাকতালীয় না?
    : আমি এব্যাপারে কিছু জানি না।
    : অবশ্যই, জানবেনই বা কী করে! আচ্ছা, বলুন তো, শব্দের গতি কত?
    : অবজেকশন ইওর অনার।
    : সাস্টেইনড! সোনালীদেবী, এটা কি ভৌতশাস্ত্রের ক্লাস?
    : স্যরি। আমি প্রশ্নটা রিফ্রেজ করছি। শেখরবাবু, আপনি বলছেন আপনি সেদিন ভয় পেয়ে পালিয়ে যান। কারেক্ট?
    : হ্যাঁ।
    : আর এও বলেছেন অভিযুক্ত শেহনাজকে গুলি চালাতে আপনি দেখেন নি?
    : না, দেখি নি।
    : তার মানে, জাস্টিস দত্তর চেম্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে আপনি দু'বার গুলি করার শব্দ শুনতে পান। আর তার পরও আপনি সেই চেম্বারে ঢোকেন? আপনি তো অসীম সাহসী!
    সে মুহূর্তে আদালতে পিন পড়লেও বোধহয় তা শোনা যেত। প্রায় মিনিটখানেক শেখরকে জবাব দেওয়ার সুযোগ দিল সোনালী। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল শেখর।
    : কী, জবাব দিতে পারলেন না তো!
    : আপনি কোনো প্রশ্ন করেছিলেন নাকি? ও, বুঝতে পারি নি। বেশ, বলছি। ঘটনা এত দ্রুত ঘটে গেছিল যে আমি কিছু ভাববার আগেই ওই ঘরে ঢুকে পড়ি। আর পরক্ষণেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাই।
    : বাঃ, এই তো! আচ্ছা, গতকাল আপনার বাড়িতে পুলিস গেছিল, তাই না?
    : হ্যাঁ। একজন নাগরিক তার কর্তব্য পালন করতে গেলেও আজকাল বাড়িতে পুলিস আসে। এই জন্যই কেউ এসব ঘটনায় কিছু জানলেও এগিয়ে আসে না।
    : সত্যি, আপনার দায়িত্ববোধের তারিফ না করে পারছি না। এবার দেখুন তো, এই যে মোবাইল নম্বরটা, এটা তো আপনারই, তাই না?
    : হ্যাঁ।
    : গত ১১ থেকে ২১ নভেম্বর এই নম্বর থেকে জাস্টিস মুকুল দত্তর নাম্বারে বাইশটা ফোন আসে। শেষ তিনদিনে তেরোটা। শেষ কল ২১ তারিখ সন্ধ্যে সাড়ে আটটায় করা হয়। কী কথা হয়েছিল জানতে পারি?
    : বলেছি তো, আমাদের প্রফেশনাল পরিচিতি ছিল। ক্লাবের মেম্বার হিসেবে এটুকু রাখতেই হয়।
    : একশবার! কাল পুলিস আপনার একটা ডায়েরি উদ্ধার করেছে শেখরবাবু। তার একটি পাতার শিরোনাম অক্টোবর ডার্বি। আর তার নিচে পাঁচটা এন্ট্রি আছে। দ্বিতীয় নাম এম দত্তা। আর তার পাশে লেখা ২২.৮। এর মানে কী শেখরবাবু?
    : আমি এই প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নই।
    : জবাব না দিলে যে সন্দেহের কাঁটা আপনার দিকেই ঘুরে আসবে!
    : আপনি কি আমায় অ্যাকিউজ করছেন নাকি? আমি আমার উকিলের পরামর্শ ছাড়া আর একটা কথাও বলব না।
    : আরে দাঁড়ান দাঁড়ান। এখনো তো আস্তাবলের গার্ড রামস্বরূপের বিবৃতি শোনেনই নি। ১৮ নভেম্বর রাতে সে কা'কে দেখেছিল আস্তাবলের গেটের বাইরে সেটাও শুনে তারপর নাহয় ডাকবেন আপনার উকিলকে! মিলর্ড! আমি আদালতের কাছে আর্জি জানাচ্ছি যে শ্রীশেখর চন্দকে জাস্টিস মুকুল দত্তের খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হোক এবং আমার মক্কেল শ্রীমতি শাহনাজকে এই কেস থেকে বেকসুর মুক্তি দেওয়া হোক। আর আমার লারনেড ফ্রেন্ডকে বাহবা জানাচ্ছি! উনি গোটা কেসটাই আসল খুনির জবানবন্দীর ওপর সাজিয়েছেন। মার্ভেলাস! আর একজোড়া পশমের দস্তানা! এই দেখুন, আমার হ্যান্ডব্যাগেও একইরকম দস্তানা রয়েছে। দস্তানা রাখা কি কোনো অপরাধ নাকি?

    আদালতে তুলকালাম শুরু হয়ে যায়। গোটা দশেক ক্যামেরা শেখর চন্দের ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবাই হামলে পড়ছে কাছ থেকে তার চেহারা দেখতে। প্রবীরেন্দ্র গোস্বামী তখনো বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মতো বসে। সোনালী সিং বিজয়িনীর হাসি মুখে দাঁড়িয়ে জনতার সম্বর্ধনার শেষ চুমুকটুকু শুষে নিচ্ছে। বটু বাগচী চশমার ওপর দিয়ে সব কিছু দেখে প্রকাণ্ড এক হুঙ্কার ছাড়লেন।
    : সাইলেন্স! আর একখান শব্দ হইলে সবকটারে কনটেম্পট অফ কোর্ট কইরা দিমু! শ্রীশেখর চন্দ? আফনে কি আপোনার স্বপক্ষে কিসু কইতে চান?
    : আমার উকিলের অনুপস্থিতিতে আর একটা কথাও না।
    : বেশ! আমি পুলিসেরে হুকুম দিইতেসি যে ইহারে গেরেপ্তার কইরা ইহার বিরুদ্ধে ধারা ৩০২ অনুযায়ী জাস্টিস মুকুল দত্তের হত্যার কেস চালাইতে। দি কেস ইজ ...
    : আর শাহনাজ, লর্ডশিপ? প্রায় একমাস উনি কারারুদ্ধ রয়েছেন কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই। কী পরিমান মানসিক কষ্ট উনি ...
    : এখনই ওঁর বিরুদ্ধে কেস বাতিল করাডা অসম্ভব। তবে বেইল-এ ছাড়তে পারি। কিন্তু শহর ছাইড়া যাওয়ায় নিষেধ থাকব।
    : আমি আধঘণ্টার মধ্যে বেইল-এর কাগজ নিয়ে আসছি। থ্যাংক ইউ ইওর লর্ডশিপ।
    : ওয়েলকাম।

    সেদিন সবাই মিলে শুধু জয়ধ্বনি দিতে বাকি রেখেছিল। একজন টিভি চ্যানেলের ফটোগ্রাফার তো বলেই ফেলল, উরিব্বাস! এর কাছে তো বলিউড ফেল! কী দিলেন দিদিভাই!
    শাহনাজের চোখে জল। আনন্দের আতিশয্যে কোর্টের মধ্যেই জড়িয়ে ধরল সোনালীকে। সোনালীর মুখেও হাসি ধরে না। পরেরদিন ফলাও করে বেরোলো সেই খবর। প্রায় সপ্তাহখানেক চলল এই নিয়ে উন্মাদনা। অর্থনীতিবিদ থেকে ধর্মগুরু অবধি সকলেই রেসিং ও তার অবগুণ সম্পর্কে সচেতন করলেন দেশবাসীকে।

    দু'সপ্তাহ পর মাত্র একদিনের শুনানীতে শেখর চন্দের ওপর আনা কেস ডিসমিস হয়ে গেল। শীতকালিন ডার্বি আর রোয়াল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব নিয়ে ২২ নভেম্বর দুপুর বারোটা থেকে একটা পর্যন্ত একটি ইংরাজি খেলার চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল শেখর চন্দের ইনটারভিউ। এয়ার টাইট অ্যালিবাই। অন্তত কুড়িজন সাক্ষী মজুদ। পারজিউরির দায়ে দু'মাস কারাদণ্ড আর পাঁচহাজার টাকা জরিমানা করা হলো শেখরকে।

    শাহনাজের আর কোনো হদিস পাওয়া যায় নি। পাওয়া যায় নি সোনালী সিংকেও। এমন কি কোনো শহরের বার কাউন্সিল-এ সোনালী সিং নামে কোনো উকিলের নামই পাওয়া যায় নি। আর দত্তসাহেবের আস্তাবলে কশ্মিনকালেও রামস্বরূপ নামের কোনো গার্ডও নাকি ছিল না।

    নিউজিল্যান্ড-এর করোম্যান্ডেল পেনিনসুলার একটা ছোট্ট ইয়াট। তার ডেক-এ সূর্যস্নানরত বিকিনি পরিহিত সোনালি সিং। দু'হাতে দুটো ওয়াইনের গেলাস নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো শাহনাজ।
    সোনালীর পাশে বসে একটা গেলাস বাড়িয়ে দিয়ে আলতো করে ওর ঠোঁটে একটা চুমু খেল শাহনাজ। তারপর ওর কাঁধে মাথাটা নামিয়ে রেখে আদুরে গলায় বলল, কেন বলছ যে এটাই শেষ কন্ট্র্যাক্ট?
    : সববার এভাবে বাঁচাতে পারব, আমি?
    : হ্যাঁ।
    : কী দরকার এত রিস্ক নিয়ে?
    : ওটাই তো এঞ্জয় করি আমরা। নাহলে টাকার জন্য কি আর ...
    : না বাবা! এই শেষ। শেখরকে যদি রাজি না করাতে পারতাম কী হতো ভাবোতো!
    : ও ক্লাবের সেক্রেটারি ইলেক্ট হয়েছে। কাল মেসেজ করেছিল। শাহনাজ মুখ টিপে হাসে।
    : বুদ্ধিমান লোক। পুরো বেটিং সিন্ডিকেটটা একা হাতে চালাচ্ছে।
    : কিন্তু কী করে রাজি করালে?
    : বেশি কিছু বলতে হয় নি। শুধু বলেছিলাম আমার ঘোড়া বা পুরুষ, কোনোটাই খুব একটা পোষায় না। সে রেড রামই হোক, আর শেখর চন্দই হোক।

    সমাপ্ত

    ২৯১২২০১৬
  • বিভাগ : ব্লগ | ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ | ১০৫ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Sourav Bhattacharya | 57.15.220.75 (*) | ০৮ জানুয়ারি ২০১৭ ০৯:১৯58483
  • পোরে দরুন লগ্লো,বনন ভুল এর জন্য অন্তোরিক ধুখ্হিতো ,এই ভোয় এ অমি বন্গ্ল লিখি ন
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত