• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • রেজারেকশান

    Sarit Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২২ এপ্রিল ২০১৭ | ১৪৬ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • রেজারেকশান
    সরিৎ চট্টোপাধ্যায় / অণুগল্প

    ব্যাঙ্গালুরু এয়ারপোর্টে বাসু এতক্ষণ একা একা বসে অনেককিছুই ভাবছিল। আজ লেনিনের জন্মদিন। একটা সময় ছিল ওঁর নাম শুনলেও উত্তেজনায় গায়ে কাঁটা দিত। আজ অবশ্য চারদিকে শোনা যায় কত লক্ষ মানুষের নাকি নির্মম মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই দিনগুলো আলাদা ছিল। তখন লেনিন ছিল ভালোবাসার নাম। আজও সেটা সবকিছু জানার পরও অটুট রয়ে গেছে।

    : আরে বললাম তো বাবা আমি ট্যাক্সি ধরে চলে আসব। কাউকে আসতে হবে না। এরা বেশি লেট করে না। আর মা'কে বলে দাও যেন না খেয়ে বসে না থাকে। ... আরে হ্যাঁ রে বাবা ওলা করে নেব। রাখছি।

    পাশের চেয়ারে বসা বছর চব্বিশের মেয়েটার কথাগুলো কানে আসতেই একবার ভালো করে ওর দিকে তাকালো বাসু। বেশ সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, চুলগুলো মাথার ওপরে টপ নট করা, গায়ে একটা সাধারণ টি-শার্ট আর জিনস্, আর গলায় একটা ইয়ারফোন ঝোলানো। এতক্ষণ মেয়েটা চুপচাপ বসে মোটাসোটা একটা বই পড়ছিল। একটু অবাকই হয়ে গেছিল বাসু, আজকাল তো এই বয়সের ছেলেমেয়েরা আর খুব একটা বইটই পড়ে না। বইয়ের নামটাও চোখে পড়ে গেল, দ ফাউনটেইনহেড।

    : কোথায় বাড়ি তোমার?
    : লেকটাউন।
    : ও! আমি কসবায় থাকি। বলোতো তোমায় নামিয়ে দিয়ে যেতে পারি মা। অনেক রাত হয়ে যাবে পৌঁছতে।
    : না না, আমি চলে যাব।
    : এখানে পড়াশুনো করো? কী নাম তোমার?
    : কৌশিকী রায়। ম্যানেজমেন্ট পড়ছি। এই সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হ'ল, বাড়ি যাচ্ছি।
    : কোন কলেজ?
    : আইআইএম ব্যাঙ্গালোর।
    : বাঃ! কেমন লাগছে এখানে?
    : ভালো। তবে কলকাতার সেই চার্ম নেই।
    : বইটা ভালো লাগছে? প্রায় তো শেষ করে এনেছ দেখছি।
    : অসাধারণ বই। দ্বিতীয়বার পড়ছি।
    : তাই! কোন ব্যাপারটা ভালো লেগেছে তোমার?
    : ওই যে, সমাজ এগিয়ে চলে কিছু একক ব্যক্তির প্রচেষ্টায়। ইন্ডিভিজুয়াল এফর্টে। সমষ্টি হিসেবে কখনও সমাজ এগোতে পারে না। এই হাইপোথিসিসটা।
    : হুম! প্রায় আট দশক আগে এই বইটা লিখে লেখিকা গোটা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। আজও ওনার প্রচুর ফলোয়ার আছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? একার প্রচেষ্টায় কি সবকিছু হয়? ধরো তুমি একটা রিসার্চ করছ। সেখানেও তো টিম-ওয়ার্ক লাগে, তাই না?
    : অবশ্যই। কিন্তু সেখানেও প্রত্যেকে নিজের নিজের সম্বৃদ্ধির জন্যই কাজ করে, সমষ্ঠির কথা ভেবে করে না।
    : তুমি তো সাংঘাতিক ভালো বাংলা বলো! কিন্তু তার মানে তুমি বলতে চাও যে মানুষমাত্রই স্বার্থপর প্রাণী?
    : হ্যাঁ।
    : শুনে দুঃখ পেলাম।
    : আপনি কি কমিউনিস্ট?
    : কেন বলো তো?
    : না, এমনিই মনে হ'ল। আমাদের আগের জেনারেশানের বাঙালি বেশিরভাগই তাই কিনা, সে জন্য বললাম।
    : হ্যাঁ, বলতে পারো আমি কমিউনিস্ট ছিলাম। তবে এখন আর শিওর নই।
    : আপনি কী করেন?
    : আমি এখন রিটায়ার্ড।
    : আগে কী করতেন?
    : একটা ওষুধের কোম্পানিতে ছিলাম। সেল্স-এ।
    : তাহলে তো আপনিও সারাজীবন নিজের জন্যই কাজ করেছেন। কোম্পানির মাল বিক্রী করে নিজের আখের গুছিয়েছেন।
    : ঠিক বলেছ।
    : তাহলে আমার কথায় দুঃখ পেলেন যে বড়ো?
    : সেটাই। কেন যে পেলাম নিজেও জানি না। আসলে, একসময় ভাবতাম জানো শুধু নিজের জন্য না, অন্যের জন্যও বাঁচব, কিন্তু সেটা আর পারলাম কই? এখন আপসোস হয়। তাই হয়ত মনের এক কোণে এখনও চাই পরবর্তী প্রজন্ম অন্যকিছু করুক, অন্যভাবে বাঁচুক।
    : বুঝলাম। আপনি যা করেছেন নিরানব্বই পারসেন্ট মানুষ সুযোগ পেলে তাই করতো, করবেও। সেটাই স্বাভাবিক।
    : আর বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ যে পুঁজীবাদীদের কবলে পড়ে না খেতে পেয়ে মরছে?
    : তাদের জন্যও কিছু করা দরকার, কিন্তু আগে নিজের জমি শক্ত করে, তারপর। প্লেনে দেখবেন পরিষ্কার বলা হয় যে আপাত পরিস্থিতিতে আগে নিজে অক্সিজেন মাস্ক পরুন, তারপর অপরকে সাহায্য করুন। আর পুঁজি না বলে আমি বলব সামর্থ। আগে ওয়েলথ সৃষ্টি তো করতে হবে! তারপর তো তার ডিস্ট্রিবিউশান!
    : কিন্তু ততক্ষণে তো ..! আচ্ছা, এই যে আমাদের দেশে এত সংখ্যায় শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে, সত্যি তোমার কষ্ট হয় না?
    : হয় তো। কিন্তু আমি তো এখনও আমার বাবার পয়সায় পড়াশুনো করছি। আপনি কী করছেন এদের জন্য?
    : কিচ্ছু না। একসময় আমি ট্রেড ইউনিয়ান করতাম। এখন তো কোম্পানিটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
    : ব্যাঙ্গালোরে কে থাকে? ছেলে?
    : হ্যাঁ। সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। এই ক'দিন হ'ল খোকা হয়েছে। আমরা দু'জনেই এসেছিলাম, গিন্নী আর দু'সপ্তাহ পরে ফিরবে।
    : বাঃ! আপনি নিশ্চয়ই খুব খুশি? কোথায় থাকেন আপনার ছেলে?
    : এই তো এয়ারপোর্টের কাছেই একটা ফ্ল্যাট কিনেছে।
    : তাহলেই দেখুন, আমরা সবাই ওই ছোট্ট পারিবারিক গণ্ডির মধ্যেই কোনরকমে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। আসলে গরীব দেশের মানুষ তো, এই করতেই সারা জীবন কেটে যায়।
    : সে তো বটেই মা। কিন্তু এখানেই তো সমষ্টির কথা এসে পড়ে। একা মানুষ না পারলেও অনেকে মিলে করতেই পারে।
    : সেটা ঠিক। কিন্তু বেশিরভাগই তো ওসব শুধু মুনাফা কামাবার জন্য করে। নাহলে নয় ধর্ম নাহয় রাজনীতির উদ্দেশ্যে।
    : আমরা জানো এতকিছু বুঝতাম না। সে সময়টাই ছিল অন্যরকম। রাজনীতি আমাদের নিয়েও কম করা হয়নি। কত তরতাজা ছেলে যে সেদিন প্রাণ হারিয়েছিল ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।
    : বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক? গণতন্ত্রে কমিউনিজম চলে না।
    : আমরা তো গণতন্ত্র চাইনি।
    : ঐতিহাসিক ভুল।
    : তাই হয়ত হবে। তুমি তার মানে বলতে চাও এইভাবেই আমরা ভালো আছি?
    : নিশ্চয়ই। মানুষের লাইফস্টাইল কত বেটার হয়েছে ভাবুন। এই যে আপনি প্লেনে করে ফিরছেন, ভালো না? এমনি করেই আস্তে আস্তে হবে।
    : মানে, ট্রিকলিং ডাউন থিওরি। ওই গড়িয়ে গড়িয়ে যতটা জল পায় ওরা সেটাই যথেষ্ট?
    : না, শুধু তাই না। ওদের উঠে আসার জন্য বাড়তি সুযোগ দিতে হবে। আর তা দেওয়া হচ্ছেও।
    : অথচ ওদের সংখ্যা বাড়ছে। অ্যাবসোলিউট পোভার্টি দিন দিন বেড়েই চলেছে।
    : সেটা সত্যিই দুঃখজনক। সেখানেই এতবছরের সরকারগুলোর অক্ষমতা বোঝা যায়।
    : সরকারের না সিস্টেমের?
    : সিস্টেম তো সরকারই বানায়।
    : আর আমরা সরকার তৈরি করি।

    ওদের ফ্লাইটের বোর্ডিং অ্যানাউন্স হয়ে গেল। মেয়েটা বইটা বন্ধ করে ব্যাকপ্যাকের মধ্যে রেখে উঠে দাঁড়াল। তারপর বাসুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, আসি জ্যেঠু। আমার কথাগুলো খারাপ লাগলে স্যরি। আমি কিন্তু মন থেকেই বললাম।
    বাসুও হেসে উঠে দাঁড়ালো। বলল, একটুও খারাপ লাগেনি। বরং তোমার চিন্তাশক্তির ক্ল্যারিটি দেখে আশ্চর্য হয়েছি বলতে পারো। একটা শেষ প্রশ্ন, পাস করার পর কী করবে? বিদেশে চাকরি?
    মেয়েটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, না জ্যেঠু, ব্যবসা করব। শিল্পপতি না, আমি পুঁজিপতি হব।
    মেয়েটা এগিয়ে গিয়ে প্লেনে চড়ার সর্পিল লাইনে দাঁড়িয়ে গেল।
    আর বাসু অবাক চোখে তাকিয়ে রইল এ দেশের পরবর্তী প্রজন্মর দিকে।

    -০-
  • বিভাগ : ব্লগ | ২২ এপ্রিল ২০১৭ | ১৪৬ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | 340112.231.126712.74 (*) | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০২:৩৯59516
  • আরে তাই তো! এখন শুধুই সিস্টেমের অংশ হয়ে যাওয়া।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন