এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • দেবতারে প্রিয়  করি

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ জুন ২০২৬ | ৫২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • বাল্মিকী রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে শ্রীরামচন্দ্রের শম্বুক বধের কাহিনী আছে। রামায়ণের মূল গল্পের সঙ্গে এই ছোট্টো আখ্যানের বিশেষ কোনো সম্পর্ক আছে এমনটা নয়। যাদের স্মরণে নেই তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি গল্পটা।

    যুদ্ধজয় করে এসে রামচন্দ্র তখন আদর্শ রাজা হিসেবে অযোধ্যায় রাজত্ব করছেন। প্রজা মনোরঞ্জনার্থে সীতার নির্বাসন ইতিমধ্যে সম্পন্ন। এমন সময় এক ব্রাহ্মণ তার পঞ্চদশবর্ষীয় পুত্রের মৃতদেহ নিয়ে হাজির। তাঁর বক্তব্য সৎ, ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও তার বালক পুত্রের যে অকাল মৃত্যু হয়েছে তার জন্য শ্রীরামচন্দ্রই দায়ী। তাঁর রামরাজ্যে নিশ্চয় কোনো অধর্ম হচ্ছে যার ফলস্বরূপ ব্রাহ্মণের ছেলের প্রাণ গেছে। রাম তাঁর পরামর্শদাতাদের সঙ্গে বসলেন। নারদ জানালেন তারই রাজ্যের প্রান্তসীমায় এক নির্বোধ শূদ্র কঠোর তপস্যা করছে। তার এই কাজ ধর্মবিরুদ্ধ বলেই বাচ্চাটি মারা গেছে। কোনো রাজার রাজত্বে এরকম অধর্ম হলে ( শূদ্রের তপস্যা) সুখসমৃদ্ধি তো যাবেই, রাজার নরকবাসও নিশ্চিত।

    একথা শুনে রাম শম্বুককে খুঁজ্তে বেরোলেন আর পেয়েও গেলেন তাঁকে অরণ্যের মধ্যে তপস্যারত অবস্থায়। রাম তাকে সরাসরি বর্ণ জিজ্ঞেস করলেন। শম্বুক যখন জানালেন যে তিনি শূদ্র এবং দিব্য জীবন লাভের জন্য তপস্যা করছেন রাম বিনাবাক্যব্যয়ে তরবারি কোষমুক্ত করে শম্বুকের মাথা কেটে ফেললেন।

    বাল্মিকীর রামের মধ্যে শম্বুক হত্যার জন্য কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব আমরা দেখিনি। কিন্তু অষ্টম শতাব্দীতে রচিত ভবভূতির ‘উত্তর রামচরিত’ নাটকে রামকে দেখা যায় শম্বুক হত্যার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত। তিনি বিলাপ করেই বলেন যে মন না চাইলেও তাঁকে যেমন সীতাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে সেইরকম অপ্রিয় মনে হলেও কর্তব্য সম্পাদনের জন্য তাঁকে এই প্রাণদণ্ড কার্যকর করতে হবে। ফলে শ্রীরামচন্দ্রের চরিত্রটি এখানে মানবিক আবেগে দ্বিধান্বিত হলেও শম্বুক হত্যা থেকে কর্তব্যবোধে বিরত থাকতে পারেন না।

    আম্বেদকর তাঁর ‘ জাতপাতের বিনাশ’ প্রবন্ধে বলেছেন ধর্মগ্রন্থের বিধানগুলিকে অন্ধভাবে মেনে চলাই মানুষকে মানবধর্ম থেকে বিচ্যুত করে জাতপাতের মত ভয়াবহ ব্যাধিগুলিকে টিকিয়ে রাখে। কিন্তু ধর্মকে যদি নীতি এবং বিবেকবুদ্ধির দ্বারা প্রয়োগ করা হয় তবেই তা মানুষের জীবনযাপনে সদর্থক ভূমিকা পালন করতে পারবে। এর ব্যতিক্রম হলে ধর্ম মানুষের জীবনে অভিশাপ বয়ে আনতে পারে যেমনটা শম্বুকের জীবনে নামিয়ে এনেছিল ধর্মশাস্ত্র নির্দেশিত বিধান। শ্রীরামচন্দ্র সেখানে ছিলেন বর্ণাশ্রম নির্দেশিত বিধান লংঘন কারীর শাস্তিপ্রদানের কার্যকর্তা।
    আদি শংকরাচার্য্য সনাতন ধর্মের বড় সংগঠকও ছিলেন। নিজে বৈদান্তিক দর্শনের নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসক হলেও বিভিন্ন বিবদমান উপাসক সম্প্রদায়ের মতভেদ দূর করার জন্য সগুণ ব্রহ্মের সাকার রূপ হিসেবে পঞ্চ দেবতার উপাসনাকে তিনি স্বীকৃতি দেন। এগুলি হল সূর্য, বিষ্ণু, শিব, শক্তি এবং গণপতি। পরে ষণ্মত অনুসারে তিনি কার্তিকেয়/ স্কন্দ/মুরুগানের উপাসনাকেও অন্তর্ভুক্ত করেন। আলাদা করে শ্রীরামচন্দ্রের উপাসনার কথা তাকে বলতে হয় নি কারণ রামচন্দ্র বিষ্ণুর অবতার হিসেবে স্বীকৃত। দেখা যাবে এই ছয় দেবতা বা তাঁদের বিভিন্ন অবতারের উপাসনা ভারতের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে প্রাধান্য পেয়েছে। আমাদের বাংলায় বিষ্ণুর অবতার হিসেবে কৃষ্ণপূজার প্রচলন বেশি।রামচন্দ্র রঘুবীর নামে পূজা পেলেও তিনি আছেন দূর্গাপূজার অকালবোধনে, রামায়ণ পাঠে, কথকতায়। ফলে এখানে শ্রীরামচন্দ্রকে নিজের আদর্শমত গড়ে পিটে নেওয়ার সুযোগ বেশি।তাই বাংলার মাটিতে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বা ‘ লক্ষণের শক্তিশেল’ রচিত হতে পারে।

    এরকমই একটা উদাহরণ পাই কর্ণাটকের বিখ্যাত দলিত কবি, লেখক, শিক্ষাবিদ এবং মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য কুপ্পালি ভেঙ্কটাপ্পা পুটাপ্পা, যিনি কুভেম্পু (অনেকে কুয়েম্পু লেখেন) নামেই সমধিক পরিচিত, তাঁর’ শূদ্র তপস্বী’ নাটক থেকে। এই নাটকে রাম শম্বুককে হত্যা করেন না। ব্রাহ্মণ এখানে সরাসরি রামকে প্ররোচিত করেন শম্বুককে হত্যা করার জন্য। তাঁর মতে এটাই ধর্মের প্রতিষ্ঠা। রাম ব্রাহ্মণকে যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করেও বলেন ধর্মগ্রন্থের বিধান নয়, একমাত্র সঠিক বিবেকবুদ্ধি ও জ্ঞানের প্রয়োগেই ধর্মাধর্ম নির্ণয় করা উচিত।ব্রাহ্মণকে কিছুতেই বোঝাতে না পেরে রাম তপস্যারত শম্বুকের দিকে ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করার আগে বললেন, যে পাপী,অধার্মিক এই অস্ত্র তাকে ধ্বংস করুক। অস্ত্রটি শম্বুকের কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়ে দিক পরিবর্তন করে ব্রাহ্মণের দিকে ছুটে চলল। রাম তাঁকে বুঝিয়ে দেন যে শাস্ত্র পড়ে যে আরও মাথামোটা হয় এবং যে তার থেকে শ্রেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধাহীন সেই আসলে ধর্মচ্যুত এবং অধার্মিক।ব্রাহ্মণ তার ভুল বুঝতে পেরে শূদ্র তপস্বী শম্বুকের কাছে প্রণত হয়। তার ছেলে পুনর্জীবন লাভ করে।

    বাল্মিকীর বর্ণশ্রেষ্ঠত্ব রক্ষাকর্তা রামের তুলনায় কুভেম্পুর এই রাম আমাদের অনেক প্রিয় হবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। কবি তো আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ‘দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা’ আমরা দেবতাকে নির্মাণ করে নিই। তাই সগর্জন ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে আমাদের দেবতার উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে হয় না। ন্যায়সঙ্গত পৃথিবীর জন্য আমাদের স্বপ্নর মধ্যেই তিনি থাকেন।

     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন