• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • হোমসিয়ানা

    ন্যাড়া
    বিভাগ : আলোচনা | ২৬ মার্চ ২০১৯ | ১৬০ বার পঠিত
  • ক্রিস্টোফার প্লামারকে মনে আছে? "সাউন্ড অফ মিউজিক" ছবির ক্যাপ্টেন? সেই ক্রিস্টোফার প্লামার সত্তরের দশকে একটি ছবিতে শার্লক হোমস সেজেছিলেন। যদিও সে গল্প কোনান ডয়েলের নয়।

    আমাদের মতন যারা আশির দশকে কলকাতায় বড় হয়েছি, তাদের কাছে অবশ্য হোমস মানেই জেরেমি ব্রেট। ইংল্যান্ডের গ্র্যানাডা টেলিভিশন ১৯৮৪ সালে মনস্থ করেন যে তারা হোমসের ওপর আরও একটি টিভি সিরিজ করবেন। জেরেমি ব্রেট হবেন হোমস, ডেভিড বার্ক ওয়াটসন। এর আগে অনেক ছবি হয়েছে হোমসকে নিয়ে। হয়েছে টেলিভিশন সিরিজ। কিছু বেশ ভাল, দর্শকদের মনে চিরস্থায়ী দাগ রেখে গেছে। যেমন অ্যামেরিকায় বেসিল র‍্যাথবোনের হোমস, সঙ্গে নাইজেল ব্রুসের ওয়াটসন। এই জুুুুড়ির যাত্রা শুরু হয়েছিল রেডিওয় শার্লক হোমসের অভিনয় দিয়ে, যার স্ক্রিপ্ট লিখতেন এডিথ মাইজার। এবং সে স্ক্রিপ্ট ছিল অতি উৎকৃৃৃষ্ট। এই র‍্যাথবোন-ব্রুস জুটি রেডিও থেকে টিভি হয়ে সিনেমা - সর্বত্রই তাদের নিজস্বতা বজায় রেখেছিলেন। কাজেই চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশকের দর্শক-শ্রোতার কাছে হোমস মানেই র‍্যাথবোন এমন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছিল। বিশেষতঃ অ্যামেরিকার দর্শক-শ্রোতার কাছে। কিন্তু সেই দর্শককুলও শেষ অব্দি জেরেমি ব্রেটের হোমসকে শুধু মেনেই নেননি, "র‍্যাথবোনকেও ভুলিয়া ছাড়লে গা" ধরণের স্বগতোক্তিও করেছিলেন। কোনান ডয়েলের ছোট মেয়ে ডেম জিন কোনান ডয়েল অবশ্য মনে করতেন র‍্যাথবোন সেরা। জেরেমি ব্রেটকেও অনেক নম্বর দিয়েছিলেন, যদিও প্রথমদিককার এপিসোড দেখে মনে হয়েছিল ব্রেটের হোমস "হাই স্ট্রাং, রুড"। পরের দিকে ব্রেটের চরিত্রায়ন পাল্টে গেছিল এবং কন্যাদেবীর আরও পছন্দ হয়েছিল।

    জেরেমি ব্রেট ধ্রুপদী শেকস্পিরিয়ান নাটকের অভিনয়ে শিক্ষিত। হলিউডে ভাগ্যান্বেষণে গেছিলেন। "মাই ফেয়ার লেডি'-তে আমরা ব্রেটকে ছোট একটা চরিত্রে দেখেছি। যখন গ্র্যানাডা ব্রেটকে হোমসে অভিনয় করার জন্যে যোগাযোগ করে, ব্রেট নিজেই ভাবছিলেন ইংল্যন্ডে ফিরে যাবেন। হলিউডে বিশেষ কিছু হচ্ছিল না। কাকতালীয়ভাবে, নতুন হোমস সিরিজ অ্যামেরিকায় দেখানোর ব্যাপারে যে টেলিভিশন কোম্পানির সঙ্গে গ্র্যানাডার চুক্তি হয়েছিল জেরেমি ব্রেটের স্ত্রী সেই কোম্পানি এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার। তৈরির আগেই যে গ্র্যানাডা টেলিভিশন অ্যামেরিকায় সিরিজ বেচতে চেয়েছিল তার অন্যতম কারণ ছিল অবশ্যই অর্থ। অ্যামেরিকার টাকা আগে পেলে সিরিজের বাজেট বাড়ানো যায়। বেড়েওছিল। অ্যামেরিকায় রাইটস বিক্কিরির টাকায় প্রায় কুড়ি শতাংশ বাজেট বেড়ে গিয়েছিল গ্র্যানাডার। সেটার প্রয়োজন ছিল। গ্র্যানাডার কর্তাদের, এবং প্রোডিউসার মাইকে কক্সের, উদ্দেশ্য ছিল যত অথেন্টিক প্রোডাকশন করা সম্ভব, তারা তাই করবে। বিশেষতঃ সত্তরের দশকে হোমসের চরিত্রায়ণের বদলের পরে। কীরকম বদল? একটা উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট হবে। ক্রিস্টোফার প্লামারের শার্লক হোমস ছবিতে কেঁদেছিলেন।

    গ্র্যানাডা টিভি ১৮৯০ দশকের বেকার স্ট্রিটের রেপ্লিকা তৈরি করেছিল একটা স্টুডিওর পেছনের ফাঁকা জমিতে - সেই সময়ের দোকানপাটের রেপ্লিকাসহ। এ প্রসঙ্গে একটা তথ্য খুব আকর্ষণীয়। কোনান ডয়েলের আমলে বেকার স্ট্রিট ছিল ছোট। বাড়ির সংখ্যা ছিল ৮৫ অব্দি। পরে বেকার স্ট্রিটের দৈর্ঘ্য বাড়ে এবং বাড়ির নম্বর ২২১ ছাড়িয়ে যায়। গ্র্যানাডা যে সেটে শুধু সেই সময়টা ধরেছিল তাইই নয়, বিভিন্নভাবে কোনান ডয়েলের মূলের যতটা কাছাকাছি থাকা যায়, সেই চেষ্টা করতে চেয়েছিল। যেমন, প্রথম স্ট্র্যান্ড পত্রিকায় যেখানে যেখানে প্যাজেটে ছবি ছিল, শুটিং-এর সময়ে সেই অংশে ঠিক সেই অ্যাঙ্গেলগুলো ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা করেছিলেন প্রোডিউসার মাইকেল কক্স। এছাড়াও স্ট্র্যান্ড পত্রিকার গল্পে প্যাজেট হোমসকে ডিয়ারস্টকার টুপি পরাত শুধু যখন হোমস লন্ডনের বাইরে যেত। কক্স চিত্রনাট্যে সেটাই রেখেছিলেন। লন্ডনের শটে ব্রেট-বেশী হোমস পরতেন তখনকার জেন্টলম্যানদের প্রচলিত পোষাক ও টুপি।

    প্রথম সিরিজ সমালোচকদের মন ভরালেও দর্শকচিত্ত যে একেবারে জয় করে নিয়েছিল, তা বলা যায়না। ভালই চলেছিল, কিন্তু সাফল্যের বহর এমন ছিলনা যে জোর দিয়ে বলা যেতে পারে যে গ্র্যানাডার কেষ্টবিষ্টুরা আরেকটা সিজিনের বরাত দেবেন। কিন্তু দিলেন। প্রথম আর দ্বিতীয় সিজন - এই সময়ের মধ্যে জেরেমি ব্রেটের ব্যক্তিগত জীবনে একটি ট্র্যজেডি ঘটে। ব্রেটের স্ত্রী, ক্যান্সারে ভুগছিলেন, এই সময়ে মারা গেলেন। ব্রেট যেন শোক ভুলতেই বেশি করে হোমস চরিত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এ কথা ভাবা ভুল হবে যে এর আগে ব্রেটের দায়বদ্ধতা কম ছিল। ব্রেট প্রথম সিজন থেকেই যেখানেই শুটিং করতে যেতেন, সঙ্গে নিয়ে যেতেন একটি অখন্ড শার্লক হোমসের কপি। সেটি বিভিন্ন মন্তব্য, টীকা ইত্যাদিতে অ্যানোটেটেড। কিন্তু এবার যেন ব্রেট চরিত্র আরও ডুবে গেলেন। হাঁটা, চলা, ভাবনা, চিন্তা - সবই হোমসের মতন করে তুলতে চাইছিলেন। এদিকে জেরেমি ব্রেট ছিলেন ম্যানিক-ডিপ্রেসনের রুগী। এইরকম কাজের বহর সহ্য হলনা। শুটিং-এর মাঝে অসুস্থ হয়ে ভর্তি হতে হল মানসিক হাসপাতালে। রটে গেল বউয়ের শোকে পাগল হয়ে গেছেন শার্লক হোমস। তবে সে যাত্রায় ফিরে এসেছিলেন ব্রেট। কিন্তু অনেক ওষুধ খেতে হত। তখন তাকে খুবই নির্ভরতা দিয়েছিলেন ডঃ ওয়াটসন। প্রথম সিজনের পরে ডেভিড বার্ক আর ওয়াটসনের চরিত্র অভিনয় করতে অস্বীকার করেন, মূলতঃ লন্ডন থেকে বাইরে শুটিং করলে ওনার থিয়েটারের অসুবিধে হচ্ছিল - এই কারণে। তার বদলে বার্কই তাঁর বন্ধু এডওয়ার্ড হার্ডউইকের নাম সুপারিশ করেন ওয়াটসন হিসেবে। এই হার্ডউইক ব্রেটের কঠিন সময়ে প্রকৃত বন্ধুর মতন পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত করেছিলেন। আর এমনই বাড়িয়েছিলেন, যে তার ছাপ পড়েছিল ছবিতেও। সমালোচকরা গ্র্যানাডা টেলিভিশনে জেরেমি ব্রেট-ডেভিড বার্ক-এডওয়ার্ড হার্ডউইক অভিনীত শার্লক হোমসের সিরিজকে শুধু উচ্চাঙ্গের ডিটেকটিভ সিরিজ হিসেবেই সনাক্ত করেননি, বন্ধুত্বের এক স্মারক হিসেবেও এর জনপ্রিয়তা। জেরেমি ব্রেট মারা যান ১৯৯৫ সাল

    এ সব তথ্যের অধিকাংশই জুটিয়েছি মাতিয়াস বস্ট্রমের "ফ্রম হোমস টু শার্লক" বই থেকে। দাম বেশি নয় ছ'শো পাতার এই বইয়ের। হঠাতই হাতে এসে পরে স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরির 'নিউ বুক' সেকশনে চোখ বোলাতে বোলাতে। হাতে সময় থাকলে, এবং হোমস-ভক্ত হলে অবশ্যপাঠ্য। সুখপাঠ্য বইটিতে পরিশ্রমের ছাপ সর্বাঙ্গে। গুডরিডসেও পাঁচে চার।

    এবার প্রাইজ। দেশে থাকতে গ্যাঁটের কড়ি খরচা করে গ্র্যানাডা টেলিভিশনের শার্লক হোমসের ভিডিও সংগ্রহ করি ফ্লিপকার্ট থেকে। আজ এই লেখাটা লিখিতে গিয়ে ওয়েব ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাত আবিষ্কার করে ফেললাম এই খজানা - ইউটিউবে গ্র্যানাডা টেলিভিশনের ১৬৩-টা এপিসোড দেখা যাচ্ছে ইউটিউবে। উল্লাস!!

    -------------------

    "এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন"
    -------------------------------------

    "এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন" - এই বোধহয় শার্লক হোমসের মুখে সব থেকে চেনা এবং জনপ্রিয় লব্জ। হোমসের ভক্তকুলের কথা ছেড়েই দিন, আমাদের মতন ল্যাল্যা পাবলিকও জানে শার্লক হোমসের মূল কোন গল্পেই কোনান ডয়েল সায়েব এই লব্জটি সরাসরি বসাননি। তাহলে এল কোত্থেকে এই অতি বিখ্যাত উক্তি?

    দেখা যাচ্ছে প্রথম এই উক্তিটি ঠিক এইভাবে লিখিত অবস্থায় বেরোয় অন্য একটা গল্পে। অন্য গল্প মানে হোমসের গল্প নয়। তবে সে গল্পের লেখকও অতি বিখ্যাত। তিনি হলেন রসিক চূড়ামণি পি জি ওডহাউস। ১৯১৫ সালে Psmith, Journalist নামের উপন্যাসে ওডহাউস নীচের দুলাইন লিখে লব্জটিকে অমর করে দেন না বুঝেই -

    “That’s right,” said Billy Windsor. “Of course.”
    “Elementary, my dear Watson, elementary,” murmured Psmith.

    ওডহাউস হোমসের গল্পের ভক্ত ছিলেন। অথচ এবং তা সত্বেও হোমসকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখতেও পিছপা হননি।

    যদিও লিখিতভাবে দেখা যাচ্ছে ওডহাউসই প্রথম, এই লব্জ বা এর খুব কাছের লব্জ ১৮৯৯ সালে ব্যবহার করেছিলেন অ্যামেরিকান নাট্যকার ও অভিনেতা উইলিয়াম জিলেট। কোনান ডয়েলের অনুমতি নিয়ে জিলেট সাহেব, "Sherlock Holmes: A Drama In Four Acts" নামে একটি নাটক লেখেন। শুধু অনুমতিই নয়, নাটকের সহ-নাট্যকার হিসেবে কোনান ডয়েলের নামও দেওয়া ছিল। নাটকটা খোদ লন্ডন-সহ ইংল্যন্ড ও অ্যামেরিকায় অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। নাটকে একটা লাইন পাওয়া যাচ্ছে, “Elementary, my dear fellow! Ho! (*Sneer) Elementary“. হয়ত কোন অভিনয়ে জিলেট-সাহেব, যিনি নিজে হোমসের ভূমিকায় অভিনয় করতেন, বলেছিলেন, "এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন"!

    অমর হয়ে গেল "এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন"।

    এ প্রসঙ্গে অন্য একটা গল্প বলি। কুইন ভিক্টোরিয়া মারা যাবার পরে ইংল্যন্ডের রাজা হন অষ্টম এডোয়ার্ড। তিনি ছিলেন মহা হোমস-ভক্ত। রীতি অনুযায়ী রানী মারা যাবার পরে রাজবংশে শোক চলে এক বছর। সে এক বছর রাজার পক্ষে ফুর্তিফার্তা করা একেবারে নৈব নৈব চ। ভিক্টোরিয়া মারা যাবার পরে এক বছরের শোক সমাপ্ত হবার পরেই নতুন রাজা তাঁর রানীকে নিয়ে ছুটলেন লিসিয়াম থিয়েটারে জিলেটের নাটক দেখতে। সঙ্গে নিয়েছিলেন লেখক কোনান ডয়েলকেও। নাটকের প্রথম অংক শেষ হবার পরে ইন্টারভ্যাল। দর্শকরা হল থেকে বেরিয়ে চা-জলখাবার খেয়ে, সিগারেট ফুঁকে ছোট-বড় বাইরে সেরে, গল্পগুজব করে এসে আবার নিজেদের সিটে বসেছে। কিন্তু নাটক আর শুরু হয়না। দশ মিনিট গেল, কুড়ি মিনিট গেল, আধঘন্টা পেরোল। দর্শকদের উশখুশানি আস্তে আস্তে গুঞ্জনে রূপান্তরিত হয়েছে। যতই হোক ব্রিটিশদের ভদ্রতা বলে কথা, তার ওপরে আজ রাজা-রানী নাকি নাটক দেখছেন। কাজেই বিরক্তি গুঞ্জনেই সীমাবদ্ধ আছে। পঁয়তাল্লিশ মিনিট ছেড়ে যখন এক ঘন্টার ওপর হয়ে গেল, তখন দর্শকদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল। শুরু হল চ্যাঁচামেচি, ক্যাটকল। কিন্তু তাও নাটক আর শুরু হয়না। হবে কী করে? প্রধান অভিনেতা জিলেটকে তো ইন্টারভালে রাজা নিজের বক্সে ডেকে মহা আড্ডা জুড়ে দিয়েছেন। এক ঘন্টা পেরিয়ে যাবার পরে চ্যাঁচামেচি শুনে রাজা জিলেটকে ছাড়লেন, আর নাটকও শুরু হল। সেটা ১৯০২ সালের প্রথম দিকের কথা। সে বছরেরই অক্টোবার মাসে কোনান ডয়েল নাইটহুড উপাধি পেয়ে স্যার আর্থার কোনান ডয়েল হয়ে যাবেন।

    লন্ডনে নাটকের এমন প্রখর জনপ্রিয়তা দেখে জিলেট ও তাঁর প্রযোজক চার্লস ফ্রোম্যান স্থির করেন যে আরও দুটি ভ্রাম্যমান দল তৈরি করবেন। একটা দল ইংল্যন্ডের উত্তরাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে এই নাটক করবে। আর একটা দল করবে দক্ষিণ দিকে। জিলেট স্বয়ং দল দুটির মহড়া দেখে সব ঠিকঠাক করে দেবেন। উত্তরের দলের নেতা ঠিক হলেন সেন্টসবেরি। তিনি শুধু নেতাই নন, হোমসের ভূমিকার অভিনেতাও বটে। সেন্টসবেরির শোনা যায় প্রতিভা চেনার নাকি বিশেষ দৃষ্টি ছিল। সেই সেন্টসবেরির নজরে পড়ে যায় চোদ্দ বছরের এক ছোকরা অভিনেতা। দলে, হোমসের পেজবয়ের ভূমিকায় সে অভিনয় করত। তার অভিনয়ের টাইমিং আর অনুকরণ করার ক্ষমতায় সেন্টসবেরি এতই মুগ্ধ হন, যে ছোকরার অভিনয়কে ঘষামাজা করতে নিজে স্বয়ং বেশ কিছু সময় ব্যয় করেন। ফলে ছোট রোল হলেও, দর্শকদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই নবীন অভিনেতা। সেন্টসবেরি প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি। ছেলেটির নাম চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন। এই ছিল চার্লি চ্যাপলিনের থিয়েটারে করা প্রথম সত্যিকারের অভিনয়।

    জিলেটের নাটক যে শুধু জনপ্রিয় হয়েছিল তাই নয়। শার্লক হোমসের যে সিগনেচার বাঁকান পাইপ, সেটাও জিলেটের দান। কোনান ডয়েলের গল্পে হোমসের ছিল সোজা পাইপ। কিন্তু নাটকের প্রয়োজনে দর্শকদের যাতে অভিনেতার ঠোঁটনাড়া দেখতে অসুবিধে না হয়, জিলেট ব্যবহার করল একরকম বাঁকান পাইপ। ব্যস, সেই থেকে হোমসের সিগনেচার হয়ে গেল এই বাঁকান স্টেমের পাইপ।

    হোমসের আরেক সিগনেচার উপাচার যে টুপি, সে টুপি অবশ্য জিলেটের দান নয়। সে দান শিল্পী প্যাজেটের। সেখানেও গল্প।

    একদম প্রথম জীবনে, পরে বিখ্যাত হওয়া, লন্ডনের স্ট্র্যান্ড পত্রিকার জন্যে হোমসের ছটা ছোটগল্প লেখার বরাত পেয়েছিলেন কোনান ডয়েল। তার আগে বেরিয়েছে হোমসের প্রথম উপাখ্যান - উপন্যাস "A study in the scarlet". হারবার্ট গ্রিনহাফ তখন স্ট্র্যান্ড পত্রিকার সম্পাদক। পত্রিকার প্রথম সম্পাদক। হোমসের ছটা গল্পের চিত্রকর কে হবে সে কথা ভাবতে ভাবতে গ্রিনহাফের মনে পড়ল শিল্পী প্যাজেটের কথা। প্যাজেটই নাম ছিল না শিল্পীর? ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজে যে জেনারেল গর্ডনের সঙ্গে সুদান অভিযানে গিয়েছিল। হ্যাঁ, পাজেটই বটে। তাকেই চিঠি পাঠালেন গ্রিনহাফ। নাম জানা নেই, তাই শুধু পদবী লিখলেন - "মিঃ প্যাজেট"।

    সে চিঠি পৌঁছল শিল্পী সিডনি প্যাজেটের কাছে। শুরু করল হোমসের ছবি আঁকতে। নিজের ঘরের আসবাবের সঙ্গে নিজের চেক-চেক ওভারকোটকেও ব্যবহার করল হোমসের গল্পের ছবি আঁকতে। তখনকার যে কোন ইংলিশম্যানের মতন হোমসও বাড়ির বাইরে গেলে মাথায় হ্যাট চড়াত গল্পে। সাধারণতঃ টপ হ্যাটের ছবিই আঁকত প্যাজেট। কিন্তু মাঝে মাঝে হোমসের মাথায় চড়িয়ে দিত একরকম কাপড়ের হ্যাট যাকে বলে "ডিয়ারস্টকার"। সেই ডিয়ারস্টকার হ্যাটটিই স্থান পেয়ে গেল হোমসের চিরপরিচিত চেহারায়।

    প্যাজেটের আরেকটা অভ্যেস ছিল। সে কোন চরিত্রই পুরোপুরি মন থেকে আঁকতে পারত না। কোন একজন মডেল খাড়া করতে হত তাকে। ঠিক যেমন কোনান ডয়েল তাঁর ডাক্তারি ছাত্রজীবনের শিক্ষক জোসেফ বেলকে শার্লক হোমসের অনুপ্রেরণা করেছিলেন, প্যাজেট খুঁজছিল হোমসের ছবির এক অনুপ্রেরণা। লম্বা, দোহারা চেহারার বর্ণনার মডেল খুঁজতে খুঁজতে চোখে পড়ে গেল তার ভাই ওয়াল্টারের দিকে। আরে, বর্ণনার সঙ্গে তো খাপে-খাপ মিলে যাচ্ছে। তাকেই হোমসের চেহারা মডেল করল সিডনি প্যাজেট। ভাই ওয়াল্টার প্যাজেট হল তার মডেল। ওয়াল্টার প্যাজেটের আদলেই যুগে যুগে হোমস হয়ে এসে নানা শিম্পীর ছবিতে। এদিকে ওয়াল্টার নিজেও ছিল শিল্পী। শুধু সিডনি আর ওয়াল্টারই নয়, প্যাজেটদের তিন ভাই ছিল শিল্পী। তার মধ্যে সিডনি আর ওয়াল্টারের স্টুডিও ছিল একটাই। শেয়ার করত। ওয়াল্টারই জেনারেল গর্ডনের সঙ্গে সুদানে গেছিল। অর্থাৎ হোমসের ছবি আঁকার বরাত এসেছিল আসলে ওয়াল্টারের কাছে। নামবিভ্রাটে সে বরাত চলে গেল ভাই সিডনির কাছে। ওয়াল্টারের চেহারা অবশ্য হোমসের মডেল হিসেবে আবহমান থেকে গেছে আজও। আর থেকে গেছে সিডনির আঁকা হোমসের ছবির আদল।

    ----------------------------------------
    এই লেখার অনেক তথ্যই পেয়েছি আগে বলা বইটা থেকে - "From Holmes to Sherlock". লিখেছেন সুইডিশ লেখক মাতিয়াস বস্ট্রয়ম। অসামান্য গ্রন্থ। যে কোন হোমসিয়ানের অবশ্যপাঠ্য। সুকুমার সেন বেঁচে থাকলে অবশ্যই এই বই নিয়ে প্রবন্ধ লিখতেন।
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৬ মার্চ ২০১৯ | ১৬০ বার পঠিত
আরও পড়ুন
বদল - ন্যাড়া
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • dc | 127812.49.6790012.76 (*) | ২৭ মার্চ ২০১৯ ০৫:৫৫49627
  • খুব ভালো লাগলো পড়তে, ন্যাড়াবাবুকে অনেক ধন্যবাদ। এই বইটা দেখছি অ্যামাজনেও আছে। কিনতেও লোভ হচ্ছে, কিন্তু পড়বার সময় পাবো কিনা জানিনা। গ্রানাডা টিভির সিরিজ অবশ্য টরেন্টেও পাওয়া যায়, বছর কয়েক আগে ডাউনলোড করে নিয়েছিলাম।

    ন্যাড়াবাবুর জন্য, শার্লক হোমসকে নিয়ে আমার ফেভারিট কোট লিখেছিলেন আর্থার সি ক্লার্ক ওনার একটা গল্পেঃ

    ...But for the moment he would enjoy the company of an old and beloved friend. The book he drew reverently out of its vacuum-sealed package was not merely a first edition; it was now the only edition. He opened it at random; after all, he knew practically every page by heart. He started to read, and fifty light-years from the ruins of Earth, the fog rolled once more down Baker Street.
  • b | 562312.20.2389.164 (*) | ২৭ মার্চ ২০১৯ ০৬:১১49628
  • আমাদের কচ্চি বয়সে, যখন টি ভিতে রোব্বারে শার্লক হোমস হচ্ছে, পাশাপাশি আনন্দমেলাতেও ঐ অনুবাদ বেরোচ্চে। মনে আছে, হোমসের ডান্সিং ম্যান দেখেছিলাম প্রথম। ফাইন্যাল সল্যুশন দেখে দুপুরে ঘুমাতে পারি নি, আর অসম্ভব রাগ হয়েছিলো, ডয়েলের অরিজিনাল পাঠকদেরই মতো।
    আনন্দমেলাতে টিভি রিভিউ-ও বেরোতো। সেখানে, যদ্দুর মনে পড়ছে, জেরেমি ব্রেটকে বলেছিলো হোমসের পক্ষে বেশি সুন্দর। আরেকজন কার নাম বলেছিলেন, ঠিক মনে পড়ছে না।
  • বিপ্লব রহমান | 340112.231.126712.75 (*) | ২৭ মার্চ ২০১৯ ০৬:৫০49629
  • অরে তাই? হোমসিনা উড়ুক
  • b | 562312.20.2389.164 (*) | ২৮ মার্চ ২০১৯ ০২:৩৮49630
  • ন্যাড়াবাবু এই একটা বিচ্ছিরি কাজ করলেন, কাল সারা দুপুর নষ্ট হল জেরেমি ব্রেট দেখে দেখে।
  • ন্যাড়া | 1278.202.5634.85 (*) | ২৮ মার্চ ২০১৯ ০৪:৪৮49631
  • নষ্ট কী মশাই, বলুন দুপুরটি বর্তে গেল!
  • ন্যাড়া | 172.68.143.65 | ২০ মার্চ ২০২০ ০৪:৩৪91594
  • "এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন" আংশটি যোগ করলাম।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত