এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • হ্যাঁ, রুজেভিচ।

    যদুবাবু লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ৩১ মে ২০২৬ | ২২৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)


  • “হ্যাঁ, রুজেভিচ। তাঁর সমসাময়িক যে কবিরা রয়েছেন, যেমন ধরো নিকানোর পাররা কি মিরোস্লাভ হোলুব কি ভাস্কো পোপা কি পোল্যান্ডেরই আরও কতজন রয়েছেন। তা, ওদের কবিতা যে ভালো লাগেনি, তা নয়। কিন্তু রুজেভিচের যে ব্যাপারটা, ওঁর সাফার, মানে ওঁরা দেখেছেন আগুনটা কোথায় জ্বলেছে। দেখেছেন যে, একটা বাচ্চা মেয়ে; তাকে ন্যাড়া করে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্যাস-চেম্বারে। এগুলোই তিনি লিখতে চেয়েছিলেন, আমার মনে হয়। এবং উনি বলেছিলেন ওই সমস্ত নান্দনিকতা নিয়ে, 'আমার কোনও সময় নেই। আই হ্যাভ নো টাইম টু থিংক আবাউট এস্থেটিক্স'”

    এইটা কার বলা বা লেখা জিজ্ঞেস করলে যে নামগুলি মাথায় আসবে তার মধ্যে ভাস্কর চক্রবর্তী পড়েন কী না বলা শক্ত। তবে এইটি ভাস্করের উত্তর। ২০০২ সালে, বোধশব্দকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে। ভাস্করের মৃত্যুর পরেই প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারের নাম, "যখনই মৃত্যুর কথা মনে পড়ে, সিগারেট ধরাই।"

    তা রুজেভিচের কোন কবিতার কথা ভাস্কর বলছেন সেইটি না বললে পুরোটা বোঝা হয়তো সম্ভব না, যেমন সম্ভব না রুজেভিচ সম্বন্ধে আরও একটা-দুটো কথা না বললে। সেই কাজটা সহজ করে দিয়েছেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদেশী সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের সাঁকো হয়ে ছিলেন যিনি, আমার ছোটবেলায়।
     


    বিভাব পত্রিকার ১৯৭৭ সালের একটি সংখ্যায়, “বিদেশী কবিতা” শিরোনামে একগুচ্ছে তাদেউশ রুজেভিচের (Tadeusz Różewicz) কবিতার অনুবাদ করেছিলেন মানবেন্দ্র। এবং সেই সঙ্গে অত্যন্ত সুলিখিত “রুজেভিচ সম্বন্ধে অনুবাদকের টীকা”। যে কবিতাটির কথা ভাস্কর বলেছেন সেইটির ছবি সঙ্গে রইলো। আর টীকার টেক্সট যথাসম্ভব ওসিআর করে উদ্ধার করে রইলো নিচে। রুজেভিচের বয়ানে এই কথাগুলোই আমার-ও কথা বলতে ইচ্ছে করে, তবে, আমার মনে হয় আর কোনোই কথা নেই।

    যাইহোক, টীকাটির ৩/৪ অংশ নিচে।

    “ধর্মের মতো কবিতাও এক বিপুল ধাপ্পা, তাদেউশ রুজেভিচ বলেন। না-হ'লে কেন হ'লো উপনিবেশগুলো, কেন পুঁজিবাদ ও শোষণ, কেন যুদ্ধ আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প? টোমাস মান স্তম্ভিতভাবে একবার বলেছিলেন কী ক'রে হিটলারের জার্মানিতে মস্ত প্রেক্ষাগৃহ ভিড় লোকের সামনে চমৎকারভাবে বাজানো হচ্ছিলো বেটোফেনের 'এরোইকা', যার বিষয়বস্তু নির্মম শ্লেষের মতো ছিলো স্বাধীনতা। কিন্তু মান তখন ছিলেন মার্কিন মুলুকে, নিরাপদে। আর রুজেভিচ? যুদ্ধ যখন বাঁধলো তাঁর বয়েস মাত্র আঠারো (তাদেউশ রুজেভিচ-এর জন্ম পোলান্ডের রাদোমস্কতে ১৯২১ সালে), লেখাপড়ায় এক হ্যাঁচকা টানে ইতি পড়েছিলো তাঁর অনেক সহযোগী লেখকদের মতোই, আর যুদ্ধের ঠিক এক বছর আগেই কিনা রুজেভিচের প্রথম কবিতাগুলো বেরুতে শুরু ক'রে দিয়েছিলো। তাঁর সমবয়েসী কবিদের মধ্যে বাচিনস্কি আর গাইৎসি মারা গিয়েছিলেন ভার্শাভা অভ্যুথানের সময়, ঝেইনিশ আর বেহারোভিশ ছিলেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে, আর জ্বিগিনিয়েভ হেরবের্ত প্রতিরোধ বাহিনীর ছদ্য কাজ করা ছাড়া কিছুই আর করেননি।

    যুদ্ধের সময় যা-যা হয়, সব ঘটেছিলো রুজেভিচের সেই সদ্য যৌবনে। নিছক বেঁচে থাকবার জন্য কুলির কাজ করেছেন, গুপ্ত সামরিক স্কুলে পাশ করেছেন পরীক্ষায়, প্রতিরোধে অংশ নিয়েছেন। চোরাগোপ্তা ভাঙাচোরা হাতে-বিন্যাস-করা প্রতিরোধ মুদ্রণালয় থেকে ছাপিয়েছেন তাঁর কবিতা। অবশেষে ১৯৪৫এ ভর্তি হয়েছেন ক্রাকুভ বিশ্ববিদ্যালয়ে, পাঠবিষয় আর্ট হিস্ট্রি। আর শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস পড়বার পর তাঁর বিশ্বাস আরো বদ্ধমূল হয়েছে যে 'শিল্প' চূড়ান্তভাবে মানুষের দুঃখবেদনাকে টিটকিরি দেয়, অপমান করে, অসম্মান করে।

    আর এই জন্যেই তিনি তৈরি ক'রে নিয়েছেন তাঁর নিজস্ব এক 'প্রতি-কবিতা,' 'অ্যান্টিপোয়েম'—কাব্যকবিতার সব কৌশলকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যা একান্তভাবেই নগ্ন, কৃশকায়, ও অসহায় আর নির্মমভাবে সৎ; এই প্রতি-কবিতার অব্যবহিত দাবি ও আঘাত আর আভান্তরীণ হিংস্রতা কেবল এক অসংবরণীয় দয়া ও মায়া দিয়েই শামাল দেয়া। এই বিশৃঙ্খলা ও দুর্বিপাকের মধ্যেও কী ক'রে লোক তথাকথিত সহজ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে—এটাই তাঁর আঘাতের লক্ষ্য—অর্থাৎ তথাকথিত সভ্যতাই তাঁর দ্বারা অভিযুক্ত, দায়রায় সোপর্দ। আর আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তিনি এই পশ্চিমী সভ্যতাকে কোনো ছলচাতুরীরই সুযোগ নিতে দেননি। আপোষ তাঁর ধাতে নেই। এদিক দিয়ে অন্য যাঁরা নানা দেশে প্রতি-কবিতার প্রতি উন্মুখ, তাদের সঙ্গেই তাঁর মিল। যেমন চিলির নিকানোর পার্রা, জার্মানির হান্স মাগনুস এনৎসেনসবের্গের, চেকোস্লোভাকিয়ার মিরোস্লাভ হোলুব, ইউগোস্লাভিয়ার ভাস্কো পোপা—আর পোলান্ডে তাঁর সহযোগী জ্বিগিনিয়েভ হেরবের্ত ও আরো তরুণ ইয়েশি হারাসিমোভিচ। নিকানোর পার্রা তরুণ কবিদের উদ্দেশ ক'রে বলেছিলেনঃ

    “যা খুশি তোমার, লেখো
    যে-শৈলীতে তোমার রুচি তাতেই
    সেতুর তলা দিয়ে বড়ো বেশি পরিমাণ রক্ত ব'য়ে গেছে
    এই বিশ্বাস নিয়েই
    যে কেবল একটা পথই নির্ভুল”
    মানবেন্দ্রর টীকা শেষ হচ্ছে এই বলে,

    “অন্য প্রতি-কবিতার লেখকদের সঙ্গে তাঁর তফাৎও আছে। অন্য অনেকের অবলম্বন ব্যঙ্গ, শ্লেষ, তীক্ষ্ণ-তির্যক আঘাত; রুজেভিচ এমনকি ব্যঙ্গও বাদ দিয়েছেন, কারণ হয়তো ব্যঙ্গ আর শ্লেষ খানিকটা ক্ষমা ক'রে দেয় ব্যাঙ্গের বস্তুকে। রুজেভিচ ক্ষমা করতে চান না। সভ্যতাকে না, কবিতাকেও না।“

    মাঝে মাঝে আমার-ও অনুরূপ ভ্রম হয়। আমিও জানি না, আমরা ক্ষমা করতে পারবো কী না সভ্যতাকে, কিংবা কবিতাকে, কিংবা আরও পাঁচটা সুমহান ধাপ্পাকে।




    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ৩১ মে ২০২৬ | ২২৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ৩১ মে ২০২৬ ০৯:৪৮740938
  • ধন্যবাদ এনার কোনো কবিতায় আমি পড়িনি পড়তে hobe.
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন