ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • কোথায় তোমার দেশ গো বন্ধু? পর্ব ১৫  (পরের কিস্তিতে শেষ)

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ৩১ জানুয়ারি ২০২২ | ৫৯৪ বার পঠিত

  • “ভয় পেয়েছি,  ভীষণ ভয়, পেয়েছি ভয় ভীষণ,
    আত্মারাম ছেড়ে যাচ্ছে খাঁচার ইস্টিশন”
    অথচ  পরের দিন সকালটা ভাল ভাবে শুরু হয়েছিল। আমি ডেকে নিয়েছিলাম সিরাজুলকে। ওর অভিমান ভাঙাতে হবে।  তারচেয়ে বড় কথা ওর সংগে পরামর্শ করব কি করে সতীশভাউকে লেঙ্গি মারা যায়। দু’দিনের যোগী ভাতকে বলে পেসাদ! আমাকে ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ পড়াবে! আমি কি এতদিন বাঁশদ্রোণী বাজারে আঁটি বেঁধে কলমীশাক বেচেছি?
    কিন্তু হোল উলটো! সিরাজুল ব্যাটা মাথায় চড়ে গেছে। সেই যে বলে না  ‘তেঁতুল নয় মিষ্টি, নেড়ে নয় ইষ্টি’!
    ছি! ছি! এসব কী ভাবছি। না না, এসব আমার ভাবনা নয়। ওটা তো ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’র ভক্তপ্রসাদের ডায়লগ! কিন্তু ব্যাটা যে বড্ড মাথায় চড়েছে এ’নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এসে ফের সেই মিচকে মিচকে ফিচেল হাসি।
    আমি ওকে বলি কালকের ব্যাপারটা ভুলে যেতে। রেগে গিয়েছিলাম। আজকে কিছু কাজের কথা আছে। মিচকে মাথা নাড়ে। বলে কোন ব্যাপার আধাখ্যাঁচড়া করে ফেলে রাখতে নেই। আমি নরম গলায় বলি-আজ কিছু দরকারি কথা আছে। তোমার থেকে পরামর্শ চাই। ছ্যাবলা ইয়ার্কিগুলো আপাততঃ শিকেয় তুলে রেখে দাও । সিরিয়াস হও।
    ও গম্ভীর হয়ে যায় । তারপর বলে—বেশ,  একটু সাবজেক্ট অবজেক্ট নিয়ে কথা হোক।
    আমি ভ্যাবাচাকা। ব্যাটা এসব কী আগড়ম বাগড়ম বকছে?
    --কেন মাস্টারমশাই? সাবজেক্ট প্রেডিকেট, কর্তা করণের সাহায্যে কর্ম করে? কিন্তু আমার কথা হোল এসব কলোনিয়াল প্রভুদের গ্রামার, ওদের তৈরি শব্দের মানে। অথচ দেখুন ওরা প্রজাদের বলে ‘সাবজেক্ট’। তা কী করে হবে? নিজের এজেন্সি না থাকলে, নিজের স্বাধীন ইচ্ছে না থাকলে? প্রজা চাষ করে, কারখানায় খাটে কার জন্যে? স্বামীর বা প্রভুর জন্যে। তা হলে ও কখনই সাবজেক্ট নয়, অবজেক্ট মাত্র।
    --এসব কী ভাট বকছিস? মাথায় ঢুকছে না। লাইনে আয়।
    --আসছি; আপনি নীলছবি দেখেন? ওই ব্লু ফিল্ম? মানে কখনও দেখেছেন? জীবনে অন্ততঃ একবার? তা কেন দেখবেন? বাম রাজনীতি করে বেহ্মজ্ঞানী হবেন!  অথচ সেক্স নিয়ে অমন ছুঁৎ মার্গ লেনিনের ছিল না। উনি বলেছিলেন—ম্যারেজ= বায়োলজি+ কালচার।
    --কোথায় বলেছিলেন?
    --কোথাও না কোথাও বলেছিলেন। এইরকম চটজলদি ফর্মূলা দিতে উনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। যেমন কমুনিজম= সোশ্যালিজম + ইলেক্ট্রিসিটি।
    --এটা আমি জানি। কুইবিশেভ হাইড্রো-ইলেক্ট্রিসিটি প্রজেক্টের উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলেছিলেন।  কিন্তু আগেরটা?
    --শুনুন, অতসব আমার মনে নেই। কিন্তু এই দুটো ডায়লগ আপনি আপনার ওই মারাঠি ভদ্রলোক—সতীশ ভাউ না কি যেন—তার সামনে ঝেড়ে দিন, পুরো শ্যালা ব্যোমকে যাবে। প্রথমটার সোর্স আপনি জানেন। পরেরটার সোর্স ওকে খুঁজে নিতে বলবেন, বেশ ডাঁট নিয়ে। বুঝলেন তো স্যার?
    এবার কিছু সিরিয়াস আলোচনা করব।  ব্লু ফিলিম দেখে থাকলে আমার কথা খুব সহজে পটাপট বুঝে যাবেন।

    নীলছবির নীলকন্ঠ টীকা
     সেই যে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম না—মেয়েদের কী চোখে দেখেন বা ভাবেন? কথাটা এগোতে দেননি। একটু বুঝিয়ে দিচ্ছি, মাঝখানে বাধা দেবেন না।  মেয়েরা যে অবজেক্ট সেটা বুঝতে রবীন্দ্রনাথের এই গানটি দেখুনঃ
    আরো আরো প্রভু, আরো আরো।
    এমনি করে আমায় মারো!
    এটা হল’গে যে কোন নীলছবির থিম সঙ । বিশ্বাস হচ্ছেনা তো?
     ধরুন, কোন ছবি শুরু হোল।
    মেয়েটির খানিকক্ষণ দুম-তানা-তানা-নানার পর ‘লুকিয়ে থাকি আমি পালিয়ে বেড়াই, ধরা পড়ে গেছি আর কি এড়াই’?
    তারপরে ‘আমার যা কিছু আছে সব কাড়ো কাড়ো’ হয়ে গেল। মাঝখানে একটু সুর -তাল- লয় বদলে ‘আমার বুকের আঁচল  ঘেরিয়া তোমারে পরানু বাস’ হবে। অন্তঃস্থল থেকে হাহাকার উঠবে –‘আমার ভুবন শূন্য করেছি তোমার পুরাতে  আশ’।  আপনি ভাববেন, যাক শালা! এতক্ষণে শেষ হোল।
    ওমা, কোথায় কী? এবার শেষ সময়ে প্রজাবিদ্রোহ। নারী বিপরীত বিহারে সমাসীন। তখন ‘এবার যা করবার তা সারো সারো, আমি হারি কিংবা তুমি হারো’।
    কিন্তু ছুরি তরমুজে পড়ুক কি তরমুজ ছুরিতে—কাটা পড়বে তরমুজই! কারণ পুরুষ যে কর্তা!

    অনেক কষ্টে নিজের রাগ দমন করি। আজ ওকে পিছলে যেতে দেব না।
    --এমন উদ্ভট ব্যাখ্যা বঙ্কিমের ‘বেল্লিক রামায়ণে’র পরে আর শুনি নি। সে যাকগে, এর সংগে আমার সমস্যার কি সম্পর্ক?
    --আছে, আছে। সম্পর্ক আছে। ওদের চুহা-বিল্লি খেলায় আপনি হচ্ছেন চুহা, অর্থাৎ অবজেক্ট। আপনি যদি নিজেকে কর্তা ভেবে থাকেন তাহলে স্বপন দেখিছেন। কিন্তু শীগগিরই টের পাবেন, ওদের খেলা শেষ হয়ে আসছে। ওদের কাছে আপনার প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছে।
    আমার শরীর হিম হয়ে যায়। এসব কী বলছে? আমি কি এই গোলকধাঁধা থেকে আর বেরোতে পারব না? কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। আমি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকি। ওর সব কথা আমার মাথায় ঢুকছে না।
    --মাস্টারমশায়, আপনার লাস্ট চান্স। সক্রিয় হোন।  এবার  আপনার বিপরীত বিহারের সময়। কে জানে , এবার ‘দুবেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না’ ফরম্যাটে খেলে যদি ব্ল্যাকজ্যাকের দান লেগে যায়।  আমি আপনার স্ট্র্যাটেজি বানিয়ে দিচ্ছি।
    --স্ট্র্যাটেজি? এইসব সেক্সি জোকস্‌ আর রসালো চর্চা দিয়ে?
    সিরাজুল এবার ধেত্তেরি বলে আঙুল মটকায়। দুটো সিগ্রেট বের করে একটা আমাকে দেয়।
    --শুনুন স্যার। আমাদের প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যে কখনও কামকে হেয় করে দেখা হয়নি। চতুর্বগ ফলের মধ্যে কী কী আছে খেয়াল করেছেন? ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ। খেয়াল করুন, কামের স্থান ঠিক মোক্ষের আগে। মানে কামকে উপেক্ষা করেও মোক্ষলাভ মুশকিল।
    --থামবি?
    --আরেকটু শুনুন। ভক্তকবি জয়দেবের শ্রীগীতগোবিন্দম্‌। তার ভূমিকায় উনি স্পষ্ট করছেন কেন কেউ জয়দেবের মধুর কোমল কান্ত পদাবলী শুনবে? দু’রকমের লোক। যদি হরিনাম স্মরণ করতে ইচ্ছে হয়, এবং যদি বিলাসকলা শিখতে কৌতুহল জাগে। বিশ্বাস হচ্ছে না?

    যদি হরিস্মরণে সরসং মনো , যদি বিলাসকলাসু  কুতূহলম্‌,
     মধুরকোমলকান্তপদাবলীম্‌ , শৃণূ তদা জয়দেবসরস্বতীম্‌।।
    --তুই পাঠান, সংস্কৃতও জানিস নাকি?
    --আপনি উর্দূ জানেননা বলে আমি সংস্কৃত জানব না এমন কোন শর্ত আছে নাকি? বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশনে হিন্দু দর্শনের অধ্যাপকের নাম জানেন? শামীম আহমদ। উনি একা নন, আরো আছেন।
    আমি হাসি—ব্যাটা শয়তান!
    --তবে শুনুন শয়তানের গল্প, এটা মুজতবা আলীর সংগ্রহ।  এক জোয়ান ছেলে সন্ধ্যের সময় নামাজ না পড়ে অবেলায় ঘুমুচ্ছিল। সেই সুযোগে শয়তান এসে তাকে চেপে ধরল, ঘাড় মটকাবে। অনেক কাকুতি মিনতি করায় সে বলল—বেশ, তোকে ছেড়ে দেব ,যদি একটা কাজ করিস।
    ছেলেটা এককথায় রাজি। যা বলবে তাই করব, শুধু আমাকে প্রাণে মেরো না।
    --বেশ, যা গিয়ে তোর মায়ের গলা কাট।
    --ওরে বাব্বা, এটা পারব না। অন্য কোন কাজ বলুন।
    --আচ্ছা, গিয়ে তোর বোনকে রেপ কর।
    --দোহাই শয়তান বাহাদুর! দয়া করুন আর কোন কাজ দিন। একটু সহজ কোন কাজ।
    শয়তানের দয়া হোল। বেশ, একটু মদ গিলে নে’। তাহলেই তোকে ছেড়ে দেব।
    ছেলেটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।  খুশি খুশি মনে পুরো এক বোতল চোঁ চোঁ করে মেরে দিল। বলা বাহুল্য, এরপর যে দুটো কাজ আগে করব না বলে ছিল সেসব করে ফেলল।
    আমি হতভম্ব; এসব গল্প আমাকে শোনাচ্ছে কেন ?
    --বুঝলেন না? আপনি শয়তানের সংগে সন্ধি করেছেন। ভাবছেন অল্পের উপর দিয়ে রেহাই পেয়ে যাবেন। কিন্তু-- । যাকগে, আপনাকে হারাতে চাইনে স্যার। সতর্ক হোন।
    একটু ঘাবড়ে গেলেও হাল ছাড়ি নে।
    --সে আমি দেখে নেব। বেশি জ্ঞান না দিয়ে তোর স্ট্র্যাটেজি বল।

    ও আমাকে বোঝায় সতীশ ভাউয়ের সংগে রাষ্ট্র নিয়ে ফান্ডা লড়াতে গেলে মার্ক্স -লেনিন ছেড়ে অমর্ত্য সেনকে ধরতে। ও মাৎ খেয়ে যাবে।

    কিন্তু আমি যেমনটি ভেবেছিলাম ঠিক তেমনটি হল না। মাঝখান থেকে আমি সিরাজুলের কথায় বার খেয়ে ক্ষুদিরাম হয়ে গেলাম।  
    আমি তাল ঠুকে বললাম—দেখুন ভাউ, মার্ক্স-লেনিন নিয়ে ফালতু বক্কাবাজি করে কী লাভ?  রাশিয়ান কমিউনিজম ইজ ডেড। আপনি আমি দুজনেই তো অন্য ঘাটে মাথা মুড়িয়েছি। কাজেই আজকের ফ্রেমে প্র্যাকটিক্যাল কথা হোক । আমি বুড়ো হয়েছি, হেঁপো রুগী, কবে টেঁসে যাব জানি না। এখন আমাদের দেশে ইউরোপের ওয়েলফেয়ার স্টেট বা কল্যাণ রাষ্ট্রের মডেলে কিছু একটা  দেখে যেতে পারলেই আমার মানবজনম সার্থক হয়।
    ভাউ খুব খুশি। বলেন উনিও তাই ভাবছেন। ‘বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়’ আমাদের প্রাচীন রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি। তাই বলি নমো রাষ্ট্রদেবায়!
    কিন্তু আমি বলি ‘বহুজন’ হোল ‘সর্বজনে’র  সাব-সেট। অর্থাৎ কিছু প্রান্তিক মানুষ বা কমিউনিটি আছেন যাঁরা বহুজনের বাইরে।
    আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে উনি বলেন আমরা সবার কথা বলি। সবাইকে সাথে নিয়ে চলি। ‘সর্বে সুখিনা ভবন্তু, সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ’।
    আমাদের কথা এবং আড্ডা জমজমাট, রান্নাঘর থেকে তিনবার চা এসে যায়। কিন্তু গোল বাঁধল সিরাজুলের স্ক্রিপ্ট মেনে অমর্ত্য সেনের কথা টেনে আনায়। উনি খুব একটা খুশি হলেন না। দেশের দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের কথা লিখে নোবেল পাওয়া! এটা বাঙালিদের দুঃখ বিলাস। সেনও আদ্দেক বামপন্থী। সত্যজিৎ রায়ও প্রাইজ পেতে ওইসব করেছেন। আর অমন দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের খোঁজ আজকাল হাতে হ্যারিকেন নিয়ে খুঁজলেও ভারত বর্ষে মিলবে না। তাই আরেক বাঙালী পরিচালক ‘দুর্ভিক্ষের খোঁজে’ নাকি ওইরকম নামের একটা সিনেমা বানিয়ে দেখিয়েছেন যে আজকে গাঁয়ের অবস্থা আর অত খারাপ নয়।
    বাঙালী নিয়ে কথা বলায় আমার কোথায় যেন লাগে! আমি স্ক্রিপ্ট ভুলে তেরিয়া হয়ে লড়ে যাই।
    বলি—ভুল করছেন। অমর্ত্য সেনের কাছে মূল সমস্যা হোল ফ্রিডম বা ব্যক্তিমানুষের স্বাধীন হওয়ার। অর্থাৎ এমন সমাজ এমন পরিবেশ যেখানে মানুষ স্বাধীন হবে। রাষ্ট্রের কাজ এই পরিবেশ গড়ে তোলা এবং ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতা বা নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করার ক্ষমতাকে রক্ষা করা। হ্যাঁ, সেখানে উনি মার্ক্সের চিন্তাকে কোট করেছেন। যাতে মানুষ দিনগত পাপক্ষয় থেকে মুক্তি পাবে। শুধু দিনের মধ্যে অল্প কাজ, বিশ্রাম, ইচ্ছে হলে মাছ ধরা, শিকার করা, গান শোনা নয়।
    “ (যেখানে সমাজ সুনিশ্চিত করবে এমন পরিস্থিতি) যাতে আমি সকালে একরকম ও বিকেলে আরেকরকম কাজ আমার ইচ্ছে মত করতে পারি”।[1]
    স্পষ্টতঃ লেনিনের “রাষ্ট্র ও বিপ্লব” লেখাটিতে “শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বে” পরিচালিত এক পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে ছবি ফুটে ওঠে তার থেকে অমর্ত্য সেনদের কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা একেবারে ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে দাঁড়িয়ে।
    --আরে আমরাও তো তাই বলছি।বহুজনের হিত বাড়ছে কি কমছে, কী দিয়ে মাপবে? অবশ্যই জিডিপি বাড়ছে না কমছে দেখে। দেখ, আমরা প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ইকনমি হয়ে গেছি। করোনা  টরোনা – না হলে আরও পাঁচ বছর আগে হতাম। যাক গে, ‘দের আয়া দুরুস্ত আয়া’! সব ভাল যার শেষ ভাল।
    --হল না ভাউ। কল্যাণরাষ্ট্র সবার জন্য, একটু বেশি করে ভাগ্যের হাতে থাপ্পড় খাওয়া প্রান্তিক মানুষদের জন্য। দেখুন, আমাদের জিডিপি বাড়ছে, আমরা বড় মুখ করে বলছি। কিন্তু জিনি সূচক বাড়ছে—মানে অসাম্য বাড়ছে। ভারতের শীর্ষ ১% ধনীর হাতে গোটা দেশের সম্পত্তির ৭৩% বা নীচের দিকের ৭০% জনসংখ্যার সম্পত্তির চারগুণ।
    --তারপর কয়েক বছর কোভিডের হাঙ্গামা চলল। নইলে কবে –।
    --ভাউ আমি অন্য কথা বলছি। জন রলস বলছেন-  রাষ্ট্রকে পক্ষপাতহীন হতে হবে। তার জন্যে আগে রাজনৈতিক সংস্থাগুলোকে ঠিক করতে হবে। এক বিশেষ অর্থে আমরা সবাই সমান। আইনের চোখে সব নাগরিক সমান বললেই হবে না। দেখতে হবে কেউ যেন জন্মসূত্রে  বা অন্য কোন ভাবে প্রাপ্ত ধনবল অথবা সামাজিক মর্যাদার জোরে রাষ্ট্রের কাছে বেশি সুযোগ না পায় ।
    --উনি ঠিক বলেছেন। এবারে আমরা পক্ষপাতহীন।
    --কিন্তু ভাউ ওপরের ডেটাগুলো অক্সফ্যামের স্টাডি রিপোর্টে আছে।--ওই যেটা ওয়ার্ল্ড  ইকনমিক ফোরামের সামনে ২০১৮তে পেশ করা হয়েছিল।  বলা হয়েছিল যে ভারতের বিলিওনারদের সম্পত্তির পরিমাণ সরকারের একবছরের বাজেটের চেয়ে বেশি। আর করোনার সময় এই ধনী গরীব তফাৎটা আরও বেড়ে গেছল।
    --বুঝতে পারছ না, ওটা কোল্যাটারাল ড্যামেজ। কোন একটা নীতির ফল প্রথমে সবাই সমান ভাবে পায় না। ধীরে ধীরে বাকি অংশে ছড়ায়। দেখ, ভগবান নিজেই সব মানুষকে একরকম করে সৃষ্টি করেননি। বৈচিত্র্য ওনার লীলা। ওটাই ন্যাচারাল ল।
    --ভাউ এই প্রাকৃতিক নিয়মকে নিয়ন্ত্রিত করাই তো কল্যাণরাষ্ট্রের কাজ। নইলে আমরা কেন নদীতে বাঁধ দিই? পাহাড় খুঁড়ে টানেল বানাই? কৃষিতে কেমিক্যাল সার দিই? রেলগাড়ি এরোপ্লেন বানাই?
    --তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ খুলে বলত?
    --বলছি কোল্যাটারাল ড্যামেজ বা  ‘ফলেন পরিচীয়তে’ বলে এড়িয়ে গেলে হবেনা। রাষ্ট্রের চক্ষে সবাই সমান এটা দেখাতে হবে।
    --তোমার কী হয়েছে বলত? বড্ড ভাট বকছ। ‘এন্ড জাস্টিফায়েড মীন্স’ কমিউনিস্টরা সবসময় মানে। জন-সমুদায় ও রাষ্ট্রের হিত সবসময় ব্যক্তির হিত থেকে বড়। ছেলেমেয়ের পড়াশুনোর জন্য বাবা-মা নিজেদের অনেক সাধ-আহ্লাদ চেপে দেয় না? আচার দিয়ে শুকনো রুটি খেয়ে ওদের হোস্টেলের খরচা পাঠায় না? তারপরে যখন পরীক্ষার ফল বেরোয়!
    আর বামপন্থীরা কবে থেকে এত নখরা শিখল? সোভিয়েত রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য কথা ভেবে যৌথ খামার  রাষ্ট্রীয় খামার এসব করতে গিয়ে স্তালিনের রাশিয়াতে কিছু লোক কষ্ট পায় নি?  সন্দেহের ফলে কিছু কবি সাহিত্যিক জেলে যায়নি?
    -- ধেত্তেরি! এটা ভেবেছেন যে নৈতিক প্রশ্নে শুধু ফলাফল নিয়ে মাপতে গেলে মুশকিল আছে? ‘এন্ড জাস্টিফায়েজ মীন্স’ বা উদ্দেশ্য মহৎ হলে যেকোন পন্থা মেনে নেয়া  – সবসময় ঠিক নয়।
    ধরুন,  উন্মত্ত জনতা অন্য সম্প্রদায়ের কাউকে চুরি, গোহত্যা বা ছেলেধরার বা খুনের অভিযোগে ধরে এনেছে। এখানে ব্যক্তিটির দোষ সন্দেহাতীত নয় । কিন্তু জনতা চাইছে হাতে গরম ন্যায়। থানায় রয়েছে অল্প পুলিশ, তারা কি করবে? না বাঁচালে মবলিঞ্চিংর চোটে লোকটি মারা যাবে । কিন্তু একজনকে বাঁচাতে গিয়ে গুলি চালালে একাধিক লোক মরবে। তারপর দাঙ্গায় দুই সম্প্রদায়ের আরও লোকজন মারা যাবে। এখানে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি পুলিশ প্রশাসন কী করবে?
    --এখানে যা  কম -সে- কম  দুঃখ দেবে তাই করা উচিত, অর্থাৎ লোকটিকে উন্মত্ত জনতার থেকে ছিনিয়ে আনা উচিৎ নয় ।
    --এঃ,  একেবারে ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতায় মৈত্র মহাশয়ের অ্যাকশন!
    কিন্তু ব্যাপারটা এত সরল নয়। পালটা উদাহরণ দেখুন।
    যদি কাল জানাজানি হয়ে যায় যে অপদার্থতা ঢাকতে রাষ্ট্র একজন নিরপরাধের বলি চড়িয়েছে? তার প্রতিক্রিয়া?
    --কী বলতে চাও? ঝেড়ে কাশো।
    -বলছি, ১৯৯৪ সালে ইসরো’র বৈজ্ঞানিক নাম্বি নারায়ণ রাষ্ট্রের স্পেস টেকনোলজির গুরুত্ব পূর্ণ তথ্য বিদেশে ফাঁস করে দেওয়ার অভিযোগে, সোজা কথায় গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে , বন্দী হলেন। সম্মান চাকরি সব খোয়ালেন। পরে দেখা গেল অভিযোগটি সাজানো। তখন কোর্ট আদেশ দিল যে রাষ্ট্র বৈজ্ঞানিক নাম্বিয়ারকে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিক। এবং ফলস কেস সাজানো উঁচুপদের পুলিশ অফিসারদের শাস্তি দিক।
    --বাঃ , এটাই প্রমাণ করে আমাদের রাষ্ট্র কত নিরপেক্ষ, কত ন্যায়পরায়ণ।
    --কিন্তু শিশু চিকিৎসক কফিল খান? গোরক্ষপুরের  বাবা রাঘবদাস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে প্রায় ৭০ জনের মত শিশু মারা গেল। কারণ দু’জন অক্সিজেন সাপ্লায়ার বকেয়া ৬৩ লাখ টাকার পেমেন্ট না পেয়ে সাপ্লাই বন্ধ করে দিয়েছিল। আগের থেকে খবর পেলেও প্রিন্সিপাল এবং জেলার প্রশাসন ঠিক সময়ে পেমেন্ট করেনি। কিন্তু গ্রেফতার হোল লেকচারার কফিল খান যে সবাইকে প্রাণপণে রিকোয়েস্ট করছিল অক্সিজেন সাপ্লাই চালু করতে এবং নিজের গাঁটের পয়সা দিয়ে কিছু সিলিন্ডার আনিয়ে  কিছু শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছিল। পর পর দুটো বিভাগীয় তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে দাঙ্গায় উস্কানির অভিযোগে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা আইনে জেলে পোরা হোল। চারবছর জেলে থাকার পর হাইকোর্ট সব অভিযোগ থেকে কফিল খানকে মুক্তি দিল। কিন্তু তারপর সরকার তাকে ডিউটিতে গাফিলতির অভিযোগে বরখাস্ত করে দিল। নাম্বিয়ার আর কফীল খান;  মিল দেখুন— দু’জনেই সরকারি অফিসার, দু’জনেই  মিথ্যে অভিযোগে জেল খেটেছেন। চাকরি হারিয়েছেন। এবার অমিলটা দেখুন।
    --তো? কী বলতে চাও?
    -- ‘তবে কেন পায় না বিচার নিহত গোলাপ?
    --মানে?
    - ধরা যাক,  আমি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে চাই বা আমি কোন ধর্মে দীক্ষিত হতে চাই না। তাতে আমার প্রতি রাষ্ট্রের ব্যবহার যেন বদলে না যায়। রাষ্ট্রের দেখা উচিৎ-- আগে যেসব অধিকার ও মর্য্যাদা পাচ্ছিলাম তা যেন অটুট থাকে।
    --তুমি জোর করে ধর্ম পরিবর্তন, লাভ- জিহাদ এসবকে কোন গুরুত্ব দাও না?
    আমি তাচ্ছিল্যের মুদ্রায় হাত নেড়ে বুঝিয়ে দিই—ওসব পাত্তা দেওয়ার মত নয়, খামোকা বাড়িয়ে দেখানো হয়।
    আমি খেয়াল করিনি যে কালুর মোবাইলে গেম খেলা বন্ধ হয়ে গেছে। টি-শার্টের ভাঁজে ওর হাতের পেশিগুলো একটু ফুলে ফুলে উঠছে।
    বদলে যাচ্ছে সতীশভাউ দীঘের চেহারাও। অক্ষিগোলক বিস্ফারিত, বিস্ফারিত নাকের পাটা।  
       কিন্তু আমি নিজের উৎসাহে এসব কিছুই খেয়াল করছিনা। আমি টাচ লাইনের থেকে বল ধরে ভেতরে এসে ইন্সাইড ডজ করে সতীশকে পেছনে ফেলে দিয়ে গোলের দিকে এগিয়ে চলেছি। আমার কোমরের দোলায় ছিটকে গেছে ভাউ নামের ডিফেন্ডার।
     এবার দীঘেকে একটা ছোট্ট আউটসাইড ডজ!
    --দেখুন, জোর করে ধর্ম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে ১৯৬৭ সাল থেকে। সেই আইনের জোরে প্রথম পঞ্চাশ বছরে একজনকেও কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে?
    -কেন তুলবে? কয়েক দশক ধরে তো শুধু তুষ্টিকরণ চলেছে। খালি ভোটব্যাংকের চিন্তা।
    আজকের ভারতবর্ষে সবারই ধর্মাচরণের স্বাধীনতা রয়েছে, ধর্মপ্রচারের স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু  আজকের ভারতে কাউকে যদি জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়? রাষ্ট্র কি চুপ করে থাকবে? আমরা বুড়ো আঙুল চুষব?
    -- তা কেন, কোন ফ্রিঞ্জ গ্রুপ বা তমুক ভগিনী -সম্মান- রক্ষা দল হিন্দু-মুসলমান ছেলেমেয়ে এক সংগে দেখলে সেরেফ সন্দেহের বশে ঠ্যাঙাবে, হল্লা মচিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের সম্মান মাটিতে মেশাবে আর রাষ্ট্র এই গ্রুপগুলোকে কিছু বলবে না।  কোর্ট কতবার বলেছে যে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নিজের স্বাধীন ইচ্ছেয় কার জীবনসাথী হবে বা লিভ ইন করবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে বাইরের কোন গ্রুপ বা বাহিনী কোন ছার, মেয়ের বাপ-মারও নাকগলানোর অধিকার নেই।
    --বাজে কথা, কোন আদালত লিভ ইনের পক্ষে রায় দিয়েছে?
    --ভাউ, আমি খালি একটা কেসের কথা বলছি। হাঁড়ির একটা চাল টিপে দেখুন, ভাত কতটা সেদ্ধ হয়েছে বুঝে যাবেন।
    --বলে ফেল।
    --আজ থেকে বোধহয় দশ বছর  আগের কথা। মধ্যপ্রদেশের জবলপুর নিবাসী সাতাশ বছরের গুলজার খান প্রতিবেশি উনিশ বছরের আরতি সাহুকে সুভদ্রা হরণ করে  সোজা মুম্বাইয়ের বান্দ্রা কোর্টে হাজির হয়ে বিয়ে করে ফেলল।    বলা ভাল, মেয়েটি এর মধ্যে মুসলমান হয়ে গিয়েছে। তবে ছেলেটা বিয়ের পর তার সার্টিফিকেটের কপি সমেত চিঠি লিখে দুই পরিবারের বাপ-মা ও জবলপুরের সংশ্লিষ্ট থানায় ইন্টিমেশন পাঠিয়ে দিয়েছিল।
    তারপর ভালমানষির ফল হাতে নাতে পেল। জবলপুরের পুলিশ গিয়ে ওদের দু’জনকে তুলে ফেরত নিয়ে এল। মেয়েটিকে ওর বাবা-মা উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখে দিল।।
    --আরে, এতো ক্লিয়ার কাট লাভ জেহাদ! পুলিশ ঠিক করেছে। আর ওই রাসক্যালটাকে?
    -- যা ভেবেছেন তাই। ছেলেটাকে থানায় আটকে রেখে সারারাত হাতের সুখ করে পরের দিন ছেড়ে দিল। মেয়েটাকে ততক্ষণে ওর বাবা-মা নিয়ে গেছে। 
    কিন্তু ছেলেটা জবলপুর হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাসের রিট দায়ের করল। কোর্ট হুকুম দিল –গায়েব মেয়েটিকে পুলিশ আদালতে জাজের সামনে হাজির করুক।
    মেয়েটি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শপথ নিয়ে বলল—আমার বয়েস ১৯ বছর। সব সার্টিফিকেট দেখুন। আর এই বন্দী আমার প্রাণেশ্বর। আমি বাবা-মার কাছে ফিরে যাব না। আর আমি নিজের ইচ্ছেয় ধর্ম পরিবর্তন করেছি।[2]
    পাব্লিক প্রসিকিউটর প্রিয়ংকা মিশ্র বললেন--  এই রাজ্যে ধর্ম -পরিবর্তন বিরোধী অধিনিয়ম রয়েছে। তার  ধারা অনুযায়ী কোন ব্যক্তি স্রেফ বিয়ের জন্যে ধর্ম বদলাতে পারে না। মেয়েটি বাপের বাড়ি যেতে ইচ্ছুক না হলে তাকে নারী নিকেতনে পাঠানো হোক , কিন্তু কদাপি ওই মুসলিম ছেলের কাছে নয়। কারণ ধর্ম পরিবর্তনটাই অসিদ্ধ। ফলে বিয়েও অসিদ্ধ।
    জাস্টিস নন্দিতা দুবে’র সিংগল বেঞ্চ রাষ্ট্রের ,থুড়ি, পুলিশের যুক্তি মানলেন না। বললেন—হোক গে অসিদ্ধ। ছেলে মেয়ে দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক।  ওরা দুজনে একসঙ্গে থাকতে চাইলে থাকবে—বিয়ে করেই হোক, বা লিভ ইন করে। এব্যাপারে রাষ্ট্রের নীতি-পুলিশগিরি চলবে না।
    --জাজের ভুল হয়েছে। এই রায় নিশ্চয়ই হায়ার কোর্টে খারিজ হবে। এটা বিয়ের জন্যে ধর্ম পরিবর্তন, অতএব বেআইনি । আমি মানতেই পারি না  যে কেউ স্বেচ্ছায়, বিনা প্রলোভনে, আমাদের সনাতন ধর্ম ছেড়ে ওইরকম রসকষহীন ধর্ম গ্রহণ করবে। ওদের পুজোর জায়গায় গান গাওয়া বারণ। ওখানে মেয়েরা ঢুকতে পারে না। যা খুশি বললেই হল? প্রিয়ংকা উকিল ঠিক বলেছিল।
    --  আচ্ছা ভাউ, কবি গুলজার, সংগীত পরিচালক আল্লারাখা রহমান বা এ আর রহমান ভারতের গৌরব। উনি চেন্নাইয়ে জন্মে ছিলেন, আদি নাম এ এস দিলীপকুমার। আপনি কি বলতে চান ওনাকে জোর করে রহমান করা হয়েছে? আর বিখ্যাত কবি কমলা দাস, যাঁর ইংরেজিতে লেখা কবিতা স্কুলে পাঠ্য, উনি কি নিজের  ইচ্ছার বিরুদ্ধে বুড়ো বয়সে মুসলমান হলেন?
    --সেমসাইড করলে। গুলজার ধর্মপরিবর্তন করেননি। উনি পাঞ্জাবি সপূরণ সিং; গুলজার ওনার কবিতা লেখার পেন নেম।
    --বেশ, একটা ভুল হয়ে গেছে। এই শালার উর্দূ হিন্দি শব্দগুলো বেশ কনফিউজিং। কিন্তু বাকি দু’জন? আর সংবিধান প্রণেতা আম্বেদকর? উনি কয়েক হাজার অনুগামীকে নিয়ে হিন্দু ধর্ম ছেড়ে বৌদ্ধ হননি?
    - ফের গোলাচ্ছ। বৌদ্ধ হয়েছিলেন, মুসলমান বা ক্রিশ্চান হননি। বুদ্ধদেব হলেন বিষ্ণুর নবম অবতার। আর তুমি বড় বড় লোকের কথা বলছ,  লেখাপড়া জানা এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত লোকজন। সেরকম উদাহরণ দুদিকেই রয়েছে। উত্তর প্রদেশের শিয়া ওয়াকফ বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ওয়াসিম রিজভি  দশ বছর আগে ধর্ম বদলে জিতেন্দ্র নারায়ণ সিং ত্যাগী হলেন।
    - --হ্যাঁ, তারপর হরিদ্বারের ধর্মসংসদে কয়েক লাখ মুসলিমদের হত্যার ডাক দেওয়ার সংগে যুক্ত থাকার অভিযোগে কেস খেলেন।
    --গোলপোস্ট সরিও না। আমি বলছি আম আদমীর কথা। তলোয়ারের ধারে রাজশক্তির মদতে জোর করে মুসলমান করার কথা।  এমনকি আজকের ভারতে আইনকে কলা দেখিয়ে লাভ জিহাদের মাধ্যমে ধর্মান্তরণের কথা।
    -- কী যে বলেন! আরে ঔরংজেবের সময়ে যদি গোটা দিল্লি মুসলমান না হয়ে থাকে, তাহলে আজ ভয় কিসের?
    --আচ্ছা, তুমি বলতে চাইছ ভারতে জোর করে ধর্মান্তরণ করা হয়নি? তাহলে তোমাদের রবীন্দ্রনাথ কেন লিখলেনঃ
    সেই যে শিখ যুবক তরু সিংকে নিয়ে কবিতাটি। তাতে দেখ, তরু সিংকে বলা হচ্ছে বেণী কেটে ফেল, ছেড়ে দেব।
    --জানি জানি। “পাঠানেরা যবে বাঁধিয়া আনিল বন্দী শিখের দল”।
    তরু সিং কহে ,”করুণা তোমার হৃদয়ে রহিল গাঁথা-
    যা চেয়েছ তার কিছু বেশি দিব, বেণীর সংগে মাথা”।

     --বাঃ কবিতাটা জানা আছে দেখছি। কিন্তু এর পরেও বলবে ভারতে মুসলমান আমলে জোর করে ধর্মান্তরণ হয়নি?
    --এটা কিছু হোল ভাউ? এখানে ধর্মান্তরণ তো হচ্ছে না, ধর্ম তুলে অপমান করা হচ্ছে বেণী কেটে ফেলতে বলা হচ্ছে। সব বিজয়ীর দল যা করে। আর তখন রাজশক্তি ছিল ইসলামের পক্ষে। স্বাধীন ভারতে সেকুলার স্টেট, সেখানে কাউকে ধর্ম নিয়ে খাওয়াদাওয়া নিয়ে জোর করার কথা হবে কেন?
    -- আজকে রাষ্ট্র ইতিহাসের ভুল শোধরাবে। তাই অপারেশন ঘর -ওয়াপ্সি।  ফিরে চল আজ আপন ঘরে। প্রগতিশীল রাষ্ট্র ছেলেমেয়ে সবার বিয়ের বয়েস এক করেদিয়ে লিঙ্গ-বৈষম্য দূর করেছে। মুখের কথায় তিন তালাক দেওয়া বন্ধ করিয়ে অল্পসংখ্যক সম্প্রদায়ের মেয়েদের সুরক্ষা বাড়িয়েছে—এটাকে রাষ্ট্রের কল্যাণকারী পদক্ষেপ বলবে না। সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার। এবং ধর্মীয় আস্থার চেয়ে সংবিধান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
    -ঠিক বলেছেন ভাউ! আমারই বোঝার ভুল। মুম্বাইয়ের হাজি আলী দরগায় মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আদালতের রায়ে সেই অধিকার বহাল হোল। মেয়েরা অন্য একটা দরজা দিয়ে ঢুকে আল্লার কাছে পীরের কাছে  দোয়া-মোনাজাত সব করছে।
    --একদম ঠিক। এই দেশে আধুনিক আইন রয়েছে। মেয়েদের ধর্মের নামে দাবিয়ে রাখা যাবে না।
    -- অথচ কেরালার শবরীমালা মন্দিরে সুপ্রীম কোর্টের রায় এবং বামপন্থী সরকার --কিছুই মেয়েদের মন্দিরে ঢোকার অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারল না।
    হাততালি ! হাততালি!
    --বাঃ পাঠচক্রের মাস্টারমশাই আজ একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছেন। নাঃ , এটা আপনার উপযুক্ত জায়গা নয়। আপনাকে আবার নাকতলার ভারতী বালিকা বিদ্যালয়ের ডিটেনশন সেন্টার নং 1276/ WBতে ফেরৎ পাঠাতে হবে।
    আমি চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাই।
    আমার পেছনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন জোশীজি, সংগে কমিটির বাকি দু’জন আর সেই তালঢ্যাঙা লোকটা –যে আমাকে বলেছিল গল্প বলা চালিয়ে যেতে, উলের গোলার মত।
    এরা কখন ঢুকল ?
    --ওকে মিঃ তারিণী দত্ত। মনে হচ্ছে স্লীপার সেলের সন্ধান আমরা পেয়ে গেছি।
                                                                                          (আগামী পর্বে সমাপ্য)

    [1] অমর্ত্য সেন, “ইনইকুয়ালিটি রিএগজামিন্ড”, পৃঃ ৪১, ফুটনোট ৮।

    [2] ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৩১শে জানুয়ারি, ২০২২।
     
  • | বিভাগ : ধারাবাহিক | ৩১ জানুয়ারি ২০২২ | ৫৯৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Emanul Haque | ৩১ জানুয়ারি ২০২২ ২২:৩৯503381
  • বাহ।‌‌‌ চলতে পারতো। এখানে না থেমে 
  • Swati Ray | 117.194.34.65 | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১৩:১৭503427
  • এই পর্ব গুলো খুব ভাল লাগছিল।  শুধু একটাই কথা মনে হচ্ছিল কি যুক্তিতে ওই কথা গুলো একটা বড় সংখ্যক লোকের কাছে মান্যতা পায় সেই দিকেও যদি একটু আলোকপাত করা থাকত তো বেশ হত। 
  • Ranjan Roy | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১৬:৫৬503435
  • স্বাতী রায়,
      ঠিকই বলেছেন। আসলে আমিও এই ধাঁধার উত্তর হাতড়ে বেড়াচ্ছি। 
    সেটা এর  একটা সিক্যুয়েল লিখব। তাতে চেষ্টা করব। আসলে এটা লিখতে আমার বেশ যন্ত্রণা হচ্ছে। তাই তাড়াতাড়ি শেষ করলাম। ভয় হচ্ছিল, ব্যালান্স হারিয়ে ফেলব। নেসাসারি দূরত্ব হারিয়ে ফেলব।
     
    এখানে এই বলয়ে  লোকজনের যে ধরণের কথাবার্তা শুনি তা ভাবতেও পারবেন না।
  • স্বাতী রায় | ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১৬:১৩503698
  • এই রকম একটা লেখা লিখে উঠতে খুবই মনে চাপ পড়ে। বুঝতে পারছি। অন্য লেখাই হোক। 
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৬:১৩503723
  • রঞ্জনদা, একটা অসাধারণ দলিল লিখে রাখলেন আপনি। কুর্নিশ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন